রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

ইন্দ্রাণী সমাদ্দারের অণুগল্প : সৈনিক



ভোরের নামাজের শব্দে থমকে ওঠে গোপা। আজ শুতে আসার আগে সারা দিনের ক্লান্তিতে মনে হয়েছিল শুলেই দুচোখের পাতায় ঘুম নেমে আসবে কিন্তু এতো ক্লান্তিতেও ঘুম এলোনা।  মাথার  মধ্যে নানা চিন্তা মাকড়সার মতো জাল বুনে চলেছে। আজ জরুরি একটা কাজে বেরোতে হয়েছিল। এখন ছেলেকে স্কুলে নিয়ে  যাওয়া - আসার ঝামেলা নেই। এমনিতে স্কুল ৩১ শে মার্চ পর্যন্ত বন্ধ। বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। খাতা দেখানো হয়নি। তার আগেই ‘করোনা ’ নামক ভাইরাসের আগমনে স্কুলে ছুটি।

  কলকাতায় “করোনার”ছোবল বসেছে। আজ রাস্তায় বেড়িয়ে গোপা অবাক হয়ে যায়। তার চেনা শহরের কি যেন হয়েছে। কেউ হাঁচি কাশি দিলে লোকে এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে  এতো বেলাতেও মুদির দোকানে অস্বাভাবিক ভিড়। পাড়ার চেনা ঔষুধের দোকানেও ভিড়। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য গোপা ঔষুধের  দোকানে গেছিল।কিন্তু  হ্যান্ড  স্যানিটাইজার আউট অফ অর্ডার । কবে আসবে দোকানি জানেননা। বলেন, ‘এই কদিনে  হ্যান্ডসেনিটাইজার এত বিক্রি হয়েছে যা এক বছরেও বোধ হয় বিক্রি হয়না।এত হ্যান্ডসেনিটাইজার লোকে খাচ্ছে না মাখছে কে জানে!’ কথা শুনে হাসতে হাসতে গোপা বাড়ির পথে পা বাড়ায়। স্নান খাওয়া সেরে মোবাইল হাতে নিয়ে ‘করোনা’ সম্পর্কে গুগলের কাছে  জানতে গেলে মাথায় চিন্তার ভাঁজ পরে। ঠিক করে বিকেলে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস তুলে নেবে। হাতে মাত্র একদিন রবিবার ‘জনতা কারফিউ’। এরমধ্যে কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। লকডাউন চলছে। গোপা বাড়ির কাজের  মেয়েটিকে এক সপ্তাহ হল বারণ করে দিয়েছে। রান্না করা থেকে কাপড় কাঁচা, ঘর মোছা থেকে ছেলেকে দেখা – সমস্ত দায় দায়িত্ব সে হাসি মুখে পালন করছে। নিজেকে মনে হচ্ছে এক সৈনিক যে যুদ্ধক্ষেত্রে না গিয়েও  অজানা  শত্রুর সঙ্গে লড়ছে। দুধের প্যাকেট থেকে খবরের কাগজ- সবাই কেই সে সন্দেহের চোখে দেখে । কার মধ্যে লুকিয়ে আছে গুপ্ত শত্রু কে জানে। দোকান থেকে আসা দুধের প্যাকেটকে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে তবে সে ফ্রিজে চালান করে। তার কাজের শেষ নেই।

  জানলা দিয়ে ভোরের আলো আসছে।একটু আগেও মনে হচ্ছিল একটা বিশাল কালো  ভয়ঙ্কর পাখি এই দেশের আকাশে তার ডানা মেলে দাঁড়িয়ে। সমস্ত আলো, সমস্ত ভালো সে শুষে নিচ্ছে কিন্তু এই ভোরের আলোয় পাখি ভয় পাচ্ছে। সমস্ত বিভেদ ভুলে মানুষ যে লড়াই  করছে সেটা দেখে পাখিটা  পিছু হটছে। ভোরের আলোয় গোপার রাত্রি জাগার ক্লান্তি যেন ধুয়ে গেছে। মনের ভিতর থেকে একটা আওয়াজ আসছে এই ঝড় একদিন ঠিক থেমে যাবে।            

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন