সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি চন্দন চক্রবর্তী ও দেবাশিস দে


সম্প্রতি সাহিত্য আকাদেমি ২০১৯ এর 'সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার' প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেছে। এতে বাংলার স্বনামধন্য কথাশিল্পী শ্রী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও আছে। পারক পত্রিকার সম্পাদক সুজয় চক্রবর্তীর অনুরোধ এল শ্রী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নেবার জন্য। আগে থেকে ফোনে কথা বলে দিন স্থির হল। সেই মতো এক সুন্দর সন্ধ্যায় আমি চন্দন চক্রবর্তী আর দেবাশিস দে পৌছে গেলাম সাহিত্যিক শ্রী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। চা-এর সঙ্গে টা সহযোগে দারুণ জমে উঠল সেই সন্ধ্যা। একের পর এক আমি আর দেবাশিস প্রশ্ন করতে থাকলাম। উত্তর দিলেন '২০১৯ এর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার' প্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।


প্রশ্ন – ওড়িয়া ভাষায় প্রখ্যাত কবি সীতাকান্ত মহাপাত্রের ‘ভারতবর্ষ’ কাব্যগ্রন্থের বাংলায় অনুবাদের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্তি। এই বইটি সম্পর্কে যদি বিস্তারিত বলেন এবং ওঁর লেখার বিশেষত্ব কী ?

তপন – ভারতবর্ষ একটি দীর্ঘ কবিতা। বইটির ব্লার্বে লেখা আছে – ‘ভারতবর্ষ’ নামে এই ক্ষুদ্র কাব্যগ্রন্থ – এটি তিন স্রোতের মিলন এক প্রাচীন দেশের সময় – লাঞ্ছিত, বিশ্রুত শিল্পীদের অবদান – এই গ্রন্থ এক ইচ্ছা পত্র- স্বপ্নের আর আশার, ক্রোধের আর যন্ত্রণার। এ এক ধরনের স্মৃতিকথা।

প্রশ্ন – আপনি এই রকম আর কী কী পুরস্কার পেয়েছেন ?

তপন – ‘নদী মাটি অরণ্য’ উপন্যাসের জন্য রাজ্য সরকারের 'বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার’, 'মহুলবনীর সেরেঞ’ চলচ্চিত্রের জন্যে শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসাবে বি এফ জে এ (বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যসোসিয়েশন) অ্যাওয়ার্ড। তা ছাড়া আরও অনেক পুরস্কার যা এ রাজ্যের নানা সাহিত্য সংস্থা নানা সময়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন – অনেক পুরস্কার পেয়েছেন, কোনটিকে জীবনের সেরা পুরস্কার বলে মনে করেন  ?

তপন – পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অজস্র পাঠক জানান তাঁদের ভালো লাগার কথা – সেইটেই সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার।

প্রশ্ন – ছোটোবেলার কোনো বিশেষ ঘটনা এখনও মনে আছে ?

তপন – মানুষের শৈশব এক বিশাল সম্পদ। অজস্র রূপকথার সমাহার। বিশেষ কয়েকটি ঘটনা লিখতে গেলেও কয়েক ফর্মা কাগজের প্রয়োজন। আমার একটি গদ্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ‘মুক্তো দিয়ে বোনা’ (মডার্ন কলাম) - তাতে আত্মজীবনীর বেশ কয়েকটি টুকরো আছে।

প্রশ্ন – ওই সব ঘটনার থেকে কি কোনও গল্প সৃষ্টি হয়েছে ?

তপন – সম্প্রতি আমার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে – ‘সমগ্র শঙ্খচিল’ (দেজ পাবলিশিং) তাতে আমার বালককাল, শৈশব, কৈশোর ও প্রথম যৌবনের অনেকটাই ধরা আছে। রয়্যাল সাইজের ৬৫০ পৃষ্ঠা। পাঠক অনুমান করতে পারেন এই সাক্ষাৎকারের ক্ষীণ কলেবরে তার কিছুই ধরা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন – স্বাধীনতার ঠিক দু’মাস আট দিন আগে অর্থাৎ ৭ই জুন ১৯৪৭ এ বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় আপনার জন্ম। স্বাধীনতার কিছুদিন পর পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা। স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ভারতের তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন ছিল। বিশেষ কোনও ঘটনা যদি বলেন।

তপন – সবই লেখা আছে ’সমগ্র শঙ্খচিল’ এ। নতুন করে আর বলতে ইচ্ছা করছে না। উৎসাহী পাঠক বই দুটি পড়ে নিলে জানতে পারবেন বিশদে।

প্রশ্ন – আপনি গণিত শাস্ত্রের ছাত্র হয়েও সাহিত্যের সব বিভাগেই একজন সফল ব্যক্তিত্ব। আপনার লেখালেখির শুরু কীভাবে। পরিবারের কারও প্রভাব বা অণুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ?

তপন –আমার শৈশব-কৈশোর যেখানে কেটেছে, সেই বাদুড়িয়া গঙ্গার ধারে কাছে কোনও পাঠাগার ছিল না। ফলে সাহিত্যের প্রাথমিক প্রভাব পাঠ্যপুস্তকের গল্প-কবিতা পড়ে। কিছু কিছু গল্পের বই হাতে এসে যেত, সেই বইয়ে মুখ গুঁজে পার করতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। আমি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলাম। সাহিত্যের তুলনায়  গণিতের ফল তেমন ভালো হত না। উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান হিসাবে মানুষ হয়েছি প্রবল দারিদ্রের মধ্যে। ফলে বিজ্ঞান না-পড়লে চাকরি পাওয়া যবে না, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সায়েন্স নিয়ে কলেজে ভর্তি , পাকে চক্রে গণিতে অনার্স ও এম এসসি। বিশুদ্ধ গণিতে প্রথম শ্রেণিতে এম এস সি পাশ করা আমার জীবনের এক অঘটন। আসলে তখন চাকরি পেতেই হবে এই কারণে গণিতের পিছু দৌড়োনো। কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছ’বছর গণিতের পিছনে দৌড়ে একটা নতুন বিষয়ে বুৎপত্তি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী কালে তেমন কাজে লাগেনি। এই ছ’বছর সাহিত্য পড়লে আধ্যপকদের কাছে থেকে বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারতাম এমনটি মনে হয় এখন।

প্রশ্ন – আপনার লেখা গল্পের বই, উপন্যাস, কবিতার বই কী কী ?

তপন –এ পর্যন্ত আমার প্রকাশিত বই একশো ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি। আমার যে কোনো বইয়ে কিছু বইয়ের নাম লেখা আছে।

প্রশ্ন –  আপনার কোন কোন উপন্যাস পাঠকদের মন বেশি কেড়েছে ?

তপন – সুন্দরবনের একশো বছরের ইতিহাস নিয়ে লেখা উপন্যাস - ‘নদী মাটি অরণ্য’। নকশাল আন্দোলনের উপর লেখা উপন্যাস - ‘লাল শালু’,’প্রেমে মেঘের রং’,’তুষাগ্নি’। প্রশাসনিক জীবন নিয়ে লেখা - ‘লাল ফিতে’, ‘একটি জরুরী ফাইল’,’এজলাস’। আত্মজৈবনিক উপন্যাস - ‘সমগ্র শঙ্খচিল’। বেদ-উপনিষদের সময়কাল নিয়ে লেখা উপন্যাস - ‘তত্ত্বমসি’। বিংশ শতাব্দীর শেষ পাদের রাজনৈতিক লড়াই নিয়ে - ‘দ্বৈরথ’ । লেখকের কর্মজীবন নিয়ে আত্বজৈবনিক স্মৃতিচারণ - ‘আমলাগাছি’। স্যটায়ারধর্মী রচনা - ‘হরিপদ কেরানির ডায়েরি’, 'বসবৃত্তান্ত’।

প্রশ্ন – আপনার লেখালেখির রসদ বা উপাদান কোথা থেকে পান বা পেয়েছেন ? এ সব লেখায় ব্যক্তি আপনি কতখানি উপস্থিত ?

তপন – ছোটোবেলা থেকে জেনেছি লেখালেখির রসদ সংগ্রহ করতে হয় নিজের জীবন ও পারিপার্শ্বিক থেকে। এই বেদবাক্যটি মেনেছি অক্ষরে অক্ষরে। আমার বেশির ভাগ গল্প উপন্যাস লিখেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে।

প্রশ্ন – গল্প লেখার বিষয়ে আপনি কি উত্তম পুরুষে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, নাকি প্রথম পুরুষে লিখতে ভালো লাগে ?

তপন – উপন্যাসের কনটেন্ট-এর উপর নির্ভর করে প্রথম পুরুষে লিখব, না উত্তম পুরুষে। তবে যে কোনও কারণেই হোক, আমার প্রায় সব উপন্যাস লেখা তৃতীয় পুরুষে।

প্রশ্ন – কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায় অপেক্ষা  কথাশিল্পী তপন বন্দ্যোপাধ্যায় অধিক পরিচিতির কারণ ?

তপন – কবিতার পাঠক বরাবরই কম। আমি চার দশকেরও বেশি কবিতা লিখছি, এক ডজনেরও বেশি কবিতার বই আছে, কবিতার বইয়ের বাণিজ্যিক সাফল্য খুব কম। তুলনায় গল্প উপন্যসের পাঠক অনেক-অনেক বেশি। যে কোনো লাইব্রেরিতে গেলেই বোঝা যাবে পাঠক সেখানে যান প্রধানত উপন্যাসের খোঁজে। কখনও গল্পগ্রন্থ খোঁজে। আমার ধারণা  সেই কারণেই গদ্য-লেখক হিসেবে আমার পরিচিতি বেশি।

প্রশ্ন – ‘ঈর্ষার সবুজ চোখ’ এ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া গার্গীর প্রবেশ। এরপর তিনটি উপন্যাসে দেখতে পাই গার্গী কোন এক  কারণে জড়িয়ে গেছে খুনের ঘটনায়। চতুর্থ উপন্যাস থেকে দেখেতে পাই গোয়েন্দা গার্গীর একক প্রচেষ্টায় সমস্থ ঘটনার এক এক করে সমাধান। দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় ‘গোয়েন্দা গার্গী সমগ্র’ সাতটি খন্ড। এই গার্গী চরিত্রটি কীভাবে আপনার কল্পনায় আসে ? বাস্তবিক এই গার্গীর সঙ্গে কার মিল আছে ?

তপন – গার্গীর জন্মবৃত্তান্ত খুবই আকস্মিক। গত শতকের আশির দশকের শেষাশেষি আনন্দবাজার রবিবাসরীয়র পৃষ্ঠায় শুরু হয়েছে সমকালীন নানা বিখ্যাত লেখকদের ধারাবাহিক গোয়েন্দা উপন্যাস। যতদূর মনে পড়ে প্রথম উপন্যাসটি ছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের, তারপর সৈয়দ মুস্থাফা সিরাজ, তারপর মতি নন্দী, তারপর সমরেশ মজুমদার – ঠিক ক-জনের পরে ঠিক মনে নেই, একদিন রবিবাসরীয় ঘরে গিয়েছি গল্প দিতে, প্রতিদিনকার মতো বহু বিখ্যাত তরুণ লেখকের সমন্বয়ে জমে উঠেছে আড্ডা , হঠাৎ সম্পাদক রমাপদ চৌধুরী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রহস্য উপন্যাস লিখতে পারবেন ? আমার মগজে বিষয়টি সেঁধায়নি ঠিকমতো, আবাক হয়ে বললাম, রহস্য উপন্যাস ! আমি! কেন লিখতে বলেছেন তাও বুঝে উঠতে পারিনি তখনও, কিন্তু  আমার সেই বিস্ময়,অবিশ্বাসের চোখে তাকানো  উপেক্ষা করে বললেন, এখন যে উপন্যাসটা চলেছে, প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এর পরের রহস্য উপন্যাস আপনি লিখবেন। দিন পনেরোর মধ্যে চারটে কিস্তি লিখে জমা দিয়ে যাবেন আমার কাছে। রবিবাসরীয়র পৃষ্ঠায় একটি গল্প প্রকাশিত হলেই ধন্য হয়ে যায় একজন তরুণ লেখক, সেখানে ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস। যা কিনা এখন লিখছেন বিখ্যাত সব লেখক !আমাকে ভাবার কোনও সুযোগ না দিয়েই আবার বললেন, এক-একটি কিস্তিতে আড়াই হাজার মতো শব্দ থাকবে। আজ বাড়ি গিয়েই লিখতে বসে যান। আমি বিভ্রান্তের মতো বাড়ি ফেরার পথ ধরি। সত্যি কোনো রহস্য উপন্যাস লেখার ভাবনায় ছিল না তখন। বন্ধুদের আলোচনায় এও শুনতাম রহস্য উপন্যাস লিখলে অন্য লেখার ধার কমে যায়, লেখকের গুরুত্বও কমে যায় সিরিয়াস পাঠকের কাছে। আজ পর্যন্ত কোনও লেখক গোয়েন্দা উপন্যাস লিখে কোনও বড়ো পুরস্কার পাননি, তার একটাই অর্থ রহস্য ঔপন্যাসিক মানেই দ্বিতীয় শ্রেণির লেখক। তবু ভাবলাম আনন্দবাজার চাইছে যখন লেখাই উচিত, বিশাল রিডারশিপ, তবে এটাই প্রথম আর এটাই শেষ। তখন আমার কাছে এটাও একটা চ্যালেঞ্জ। কোনও কাজেই পিছপা হইনি কখনও আজই বা কেন হব। অতএব আনন্দবাজার অফিস থেকে ফেরার পথে ভাবতে শুরু করি। তারপর রাতে ঘুমের  মধ্যে দিনের কাজের অবকাশে ভাবতে শুরু করি সেরকম একটা কাহিনি লিখব যা পাঠককে সপ্তাহের পর সপ্তাহ টেনে রাখবে চুম্বকের মতো। আর আমার গোয়েন্দাও হবে আর পাঁচজন গোয়েন্দার থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। প্রচুর গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তাম। শার্লক হোমস গোয়েন্দাদের রাজা, জুতোর ডগা দেখে লোকটির পেশা বলেতে পারতেন, ফেলুদাও অনেকটা সেরকম, অতএব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমার গোয়েন্দা ঠিক এরকমটি হবে  না। এডগার ওয়ালেসের গোয়ান্দা জে বি রিডার, তার ছিল ঢিলে পোশাক, কালো রং এর লম্বা কোট, স্টাইপ দেওয়া ট্রাউজার্স। তার সংগে থাকত একটা ছাতা যেটি আসলে একটি অস্ত্র,অথচ তা কেই অনুমানই করতে পারত না। গোয়েন্দা পোয়ারোর ছিল কসমেটিক মাখানো গোঁফ, চা-কফি পছন্দ করতেন না, আসক্তি ছিল মিস্টি সিরাপ ও পানীয় চকোলেটে। কখনও পাতলা কাগজে তামাক জড়িয়ে টানতেন সিগারেটের মতো। ব্যোমকেশ বক্সীর ছিল খাঁটি বাঙালি পোশাক, পরতেন ধুতি-পাঞ্জাবি, তাতেই তাঁকে দেখাত হিরোর মতো (সৌজন্য উত্তমকুমার :  চিড়িয়াখানা)। দেবেন্দ্রবিজয়ের ছিল ফ্যাশনের সম্রাট পঞ্চম জর্জের মতো দাড়ি, পড়তেন শক্ত কাফওয়ালা শার্ট, সিল্কের বুকখোলা কোট, ধুতি ও মোজা।
অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম আমার গোয়েন্দা এঁদের কারও মতো হবে না, হবে একটি নতুন চরিত্র যা বাংলা সাহিত্যে হবে এই প্রথম। আরও ভাবলাম বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে নারী গোয়েন্দা নেই বললেই চলে, সে ক্ষেত্রে আমার গোয়েন্দা যদি এরকম কেউ হয় ! আমার যা পর্যবেক্ষণ তাতে বাঙ্গালি মেয়েরা খুব তীক্ষ্মধী হন, মানুষের চোখ দেখলে ধরতে  পারেন মানুষটি কেমন, তা ছাড়া যে মেয়েরা কথা একটু বেশি বলেন তাঁদের বিশ্লেষনী শক্তিও  অসাধারণ, অতএব –
অতএব সৃষ্টি হল গার্গী নামে এক মেধাবী তরুণীর যার তীক্ষ্ম বুদ্ধি আর অন্তদৃষ্টি অনুধাবন করে অবাক হয়ে যান গার্গীর স্রষ্টাও।

প্রশ্ন – গোয়েন্দা গল্পের যে ফরম্যাট,সেটার সংগে নিজেকে একাত্মবোধ করতে গিয়ে কোনও অসুবিধে হয়নি ?

তপন –   সাহিত্যের প্রায় সব ধারাতেই আমি লিখি। কবিতা-ছড়া, গল্প-উপন্যাস, কিশোর সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, গোয়েন্দা উপন্যাস, কাব্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনি, নানা রকম গদ্য রচনা...। একই দিনে দু’রকম তিনরকম লিখতে অসুবিধে হয় না কখনও। একসঙ্গে দুটো-তিনটে ধারাবাহিক লিখে গেছি বছরের পর বছর। তবে যখন যেটা লিখি, সেটাই মন দিয়ে লিখি। আমার একশোভাগ দিই।

প্রশ্ন – ‘ঈর্ষার সুবুজ চোখ’ রবিবাসরীয়তে প্রকাশের পর ‘ঈর্ষা’ নামে একটি টিভি সিরিয়ালও তো হয়, তাই না ?

তপন – ‘ঈর্ষার সবুজ চোখ’ যখন প্রকাশিত হচ্ছিল ধারাবাহিক, একটি দীর্ঘ চিঠি লিখে ঋতুপর্ণ ঘোষ, বলেছিলেন তিনি একটি টিভি সিরিয়াল করতে চান। আমার অনুমতি পেতেই কলকাতা দুরদর্শনে ‘ঈর্ষা’ সিরিয়াল শুরু করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, তার জীবনের প্রথম কাজ। অবশ্য চারটি এপিসোডের স্ক্রিপ্ট লিখে চলে যান অন্য একটি সিরিয়ালের কাজে। তখনও তিনি বিখ্যাত হননি। সিরিয়ালটির প্রয়োজকের কথা শুনলে পাঠক নিশ্চয় অবাক হবেন। প্রয়োজক ছিল এ বি সি এল (অমিতাভ বচ্চন কর্পোরেশন লিমিটেড)। টাকা জোগাচ্ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। কলকাতার দায়িত্বে ছিলেন প্রসেনজিৎ। গার্গীর ভুমিকায় ইন্দ্রাণী হালদার। বিষয়টি সত্যিই স্বপ্নের মতো।

প্রশ্ন – আমলা জীবনের ছুটি পেয়ে আপনার ‘আমলাগাছি’ লেখা। লেখাগুলি প্রকাশের পর কোনো রাজনৈতিক চাপে পড়তে হয়নি তো ?

তপন –এ ধরনের লেখা কোনো রাজনৈতিক নেতা পড়লে কিছু উষ্মার সৃষ্টি তো হবেই। তবে সুবিধে এই যে, রাজনৈতিক নেতারা খুব একটা সাহিত্য পড়ে না। তবে কাকদ্বীপর একজন বলেছিলেন আমি কাকদ্বীপে এবার গেলে গুলি করে মারবেন।

প্রশ্ন –  ‘মালবকৌশিক’ উপন্যাসটি প্রকৃত অর্থে ধ্রুপদী সংগীত ও ইতিহাসের এক অপূর্ব মিশ্রণ। কীভাবে মালবকৌশিক রচনার কথা আপনার মাথায় আসে ? পাশাপাশি জানতে ইচ্ছে করে আপনি কি সংগীত চর্চা করেন?

তপন – প্রথমেই বলে রাখি আমি গান শুনতে ভালোবাসি, কিন্তু কখনও  সংগীত চর্চা করিনি। ২০০৭ এ ভাবছি একটি নতুন উপন্যাসে হাত দেব, একেবারেই অভিনব কোনো বিষয় নিয়ে, সেসময় শিশু কিশোর আকাদেমির একজন আধিকারিক শর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, সংগীতে ডক্টোরেট, আমাকে একটি সাত পৃষ্ঠার প্রবন্ধ দিয়ে বলেছিলেন, ইনি একজন বিখ্যাত সংগীজ্ঞ বজ্জু পর ধর্মান্তরিত হয়ে বকসু নামে খ্যাত হন। তাঁর জন্ম  তানসেনের দশ বছর আগে, তানসেনের মতোই তাঁর সংগীতে দক্ষতা, কিন্তু তানসেনের যেমন খ্যাতি হয়েছে সম্রাট আকববের আনুকুল্যের কারণে, বকসুর তেমন কেউ মদতদাতা না-থাকায় তিনি হারিয়ে গেছেন স্মৃতির আড়ালে। তাঁকে যদি স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে। ‘সাত পৃষ্ঠার সেই প্রবন্ধ থেকে সাড় তিন বছর পরিশ্রম করে লিখলাম রয়্যাল সাইজের সাতশো পৃষ্ঠার উপন্যাস, যে উপন্যাসে ধ্রুপদ সংগীতের উত্থান,, রাগরাগিণীর বিচিত্র বর্নময় রূপ ও সংগীতের  ইতিহাসের পাশাপাশি ইসলামি ও মুঘল ইতিহাসের চরিত্ররা স্বমহিমায় বিরাজমান। এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীত বিষয়ে অর্জন করতে হয়েছিল কিছু বুৎপত্তি। সে বড়ো সুখের সময়। শাস্ত্রীয় সংগীত যে এমন বিশাল সমুদ্রের মতো, তার যে রূপ তা এই উপন্যাস না লিখলে অনুমান করাই যেত না।

প্রশ্ন – 'শিকড়ের খোঁজে মানুষ’ উপন্যাসে আপনি বলেছেন ১৬৯০ এর অনেক আগেই কলকাতা শহরের পত্তন  হয়েছে। সংক্ষেপে  যদি এর ব্যাখ্যা দেন ভাল হয়।

তপন –পুর্বতন রাজ্য সরকার ১৯৯০ এ কলকাতার তিনশো বছরের জন্মদিন পালন করার সময় আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল সত্যি কি জোব চার্নক কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা? তখনই পড়তে শুরু করলাম কলকাতা বিষয়ক বহু বই। জানতে পারলাম ১৬৯০ এর আগেও কলকাতার অস্তিত্ব ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা হয়ে গেল ‘শিকড়ের খোঁজে মানুষ’’।

প্রশ্ন – আমরা শুনেছি আপনার লেখার উপর কেউ গবেষণা করে পি এইচ ডি পেয়েছেন। জানতে চাই কে পেয়েছেন, আর এটা কি আপনার সামগ্রিক লেখার উপর না কোন বিশেষ বিভাগের লেখার উপর পেয়েছেন  ?

তপন – আমার নানা উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করেছেন নতুন প্রজন্মের গবেষকরা। ইতিম্যধ্যে পি এইচ ডি করেছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাম্পি বৈদ্য। এম ফিল করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহেব হেমব্রম। এম ফিল করেছেন আসাম ইউনিভারসিটির লক্ষ্ণী নাথ। এম ফিল করেছেন অন্ধ্র সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দীপিকা মহাপাত্র। সবাই আমার উপন্যাস নিয়েই গবেষণা করেছে। এ ছাড়াও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কয়েকজন গবেষকের কাজ এখন মধ্য পথে। সম্প্রতি ছোটো গল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন আর এক গবেষক সান্ত্বনা ঘরামি।

প্রশ্ন –  আপনার লেখা ‘মহুলবনীর সেরেঞ’ নামে একটি সিনেমা হয়? এটি কোন বইয়ের অংশ? এই সিনেমাটি কোনো পুরস্কার লাভ করেছিল ?

তপন – উপন্যাসটির নামই ‘মহুলবনীর সেরেঞ’ এই চলচ্চিত্রের জন্য ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার’ হিসেবে পেয়েছি বেংগল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার। সে বছর আরও আটটি অ্যাওয়ার্ড পায় ছবিটি।

প্রশ্ন –  আপনার আর কোনো লেখা নিয়ে সিনেমা বা টিভি সিরিয়াল হয়েছে ?

তপন – ‘ফড়িং হইল পঙ্খী’ গল্প অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল ‘যতনের জমি’ শর্ট ফিল্ম যা রাস্ট্রপতির স্বর্ণকমল লাভ করে। কয়েকটি উপন্যাস সিরিয়াল হয়েছে , ‘হলুদ খামের রহস্য’, ’বহে বিষ বাতাস’, ‘অভিশপ্ত অরণ্যে’।

প্রশ্ন –  অনেক সময় দেখা যায় প্রথিতযশা লেখকদের কিছু ফরমায়েসি লেখা লিখতে হয়। এই ফরমায়েসি লেখা লিখতে লেখকদের স্বাধীনতা বা আনন্দ ক্ষুণ্ণ হয় ? আপনার কোনো ফরমায়েসি লেখা পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছিল ?

তপন – বাংলা পত্রপত্রিকার অধিকাংশই তাদের চাহিদামতো লেখা চায়। আমার পক্ষে সম্ভব হলে আমি লেখা দেওয়ার চেষ্টা  করি। ‘ঈর্ষার সবুজ চোখ’ এরকমই ফরমায়েসি লেখা। লেখাটি এত সাড়াজাগিয়েছিল যে, সম্পাদক পর পর আরও তিনটি ধারাবাহিক লিখিয়েছিলেন আনন্দবাজারে। ‘ধুসর মৃত্যুর মুখ’, ‘নীল রক্ত নীল বিষ’, ’৭৭ সবুজ সরণি’। বাংলার সাহিত্যের অধিকাংশ লেখাই তো ফরমায়েসি লেখা।

প্রশ্ন – বানিজ্যিক পত্রিকার এক সফল লেখক হয়েও বিভিন্ন লিটল ম্যাগে আপনি লেখেন। অনেকে এমন আছেন যারা সারাজীবন লিটল ম্যাগাজিনেই লেখে গেছেন বা যাচ্ছেন। আবার কেও শুধু বাণিজ্যিক পত্রিকাতে। এব্যাপার আপনার মত ?

তপন – আমার ধারনা অধিকাংশ লেখকই বানিজ্যিক কাগজে লিখতে চান কেননা বহু পরিশ্রমে লেখা একটি গল্প বা উপন্যাস বাণিজ্যিক কাগজে প্রকাশিত হলে পৌঁছোবে বহু পাঠকের কাছে। কিন্তু বাণিজ্যিক কাগজে লেখার সুযোগ না পেলে তখন লিটল ম্যাগাগজিনের আশ্রয় নেন তারা। এটাই বাস্তব। মাত্র দু’চারজন লেখক হতো লিটল ম্যাগাজিনেই লিখতে চান।

প্রশ্ন –  ইতিহাসে তো অনেক উজ্জ্বল চরিত্র আছে। কিন্তু আপনি শুধু বীরবলকে নিয়ে উপন্যাস লিখলেন কেন ?

তপন – মালবকৌশিক লেখার সময় ইচ্ছে ছিল তানসেনকে নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার। লিখতে গিয়ে দেখলাম আকবরের প্রিয় সভাসদ বীরবল ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে উপেক্ষিত চরিত্র। তার কারণ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম অনেক অলিখিত তথ্য যা কোনো ইতিহাসে লেখা নেই। শুরু করলাম বীরবল লিখতে – একটু বদলে দিলাম মুঘলযুগের ইতিহাস। আমি দেখিয়েছি বীরবল না থাকলে আকবর কখনও আকবর দি গ্রিট হতে পারতেন না।

প্রশ্ন –  পারক যেহেতু গল্পের পত্রিকা তাই অবধারিত ভাবে গল্পের প্রসঙ্গে এসে যায়, আপনার কাছে জানতে চাইব বড়োগল্প আর উপন্যাসের কী কী পার্থক্য আছে ?

তপন – বড়ো গল্পের পরিধি ছোটো, বলার বিষয়ও কম। উপন্যাসের পরিধি অনেক বড়ো। গভীরতা অনেক বেশি।

প্রশ্ন –  একটি ভালো গল্পের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত ?

তপন – নারায়ণ গঙ্গোপাধায়ের ‘সাহিত্যে ছোটো গল্প’ গবেষণা গ্রন্থে ছোটগল্পের সংজ্ঞা  নির্ধারণে বহু বরেন্য লেখকের উক্তি সংকলিত, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এক-একজন গল্পকার তাঁর নিজের মতো সংজ্ঞা নির্ধারণ করে গল্প লেখেন। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। তা থেকে আমার ধরণা হয়েছে ছোটো গল্পের কোনও নিদিষ্ট সংজ্ঞা নেই। ছোটো গল্পকার তাঁর নিজের পছন্দমতো প্লট নিয়ে এমন গল্প লিখতে পারে যা ছুঁয়ে যাবে পাঠকের মন।

প্রশ্ন – গল্প নিয়ে এখন বিভিন্ন রকম কাজ হচ্ছে। আপনি কি এই রকম কি কোনও কাজ করেছেন ? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী ?

তপন – আমি প্রায় চারশো গল্প লিখছি। তন্নিষ্ঠ পাঠকের নিবিষ্ট পাঠ থেকে উঠে আসবে আমার কাজের বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন –  ইদানীং অণুগল্প নিয়ে বিভিন্ন রকম কাজ হচ্ছে। এই অণুগল্পের শব্দ সংখ্যা কত হওয়া উচিত ? অণুগল্প নিয়ে আপনার মতামত ?

তপন – অণুগল্পের কোনো নির্দিষ্ট শব্দ সংখ্যা থাকার কথা নয়। তিন লাইনেও একটি ভালো গল্প লেখা যেতে পারে, আবার তিরিশ লাইনেও। গল্পটা পাঠকের ভালো লাগল কিনা সেটাই আসল।

প্রশ্ন –  ইদানীং সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্লগ, অনলাইন, ওয়েবম্যাগ ব্যবহার হচ্ছে। ছাপা বই বা পত্রপত্রিকার নিরিখে এ ব্যাপারে আপনার মতামত?

তপন –মাধ্যম যত বাড়বে, পাঠকের সংখ্যাও বাড়বে।

প্রশ্ন –  সাহিত্যের বিভিন্ন আন্দোলনের কথা আমরা জানি। কিন্তু এই সব আন্দোলনে আপনাকে দেখতে পাই না কেন ? বা কোনো সাহিত্য গোষ্ঠীভুক্ত নন। এটা কি নিভৃতে সাহিত্য সাধনার জন্য না বিভিন্ন ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকার জন্য ?

তপন –লেখক লিখবেন তাঁর নিজের মতো করে। যারা আন্দোলন করেন, নিজেদের লেখার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আন্দোলন করেন তাতে আমার ধারণা নিজের লেখার প্রতি নিবিষ্টতার চিড় ধরে। তা ছাড়া আমার জিনেই হইচই করার কোনোও বাসনা নেই। নিবিষ্ট হয়ে লেখাই লেখকের কাজ। সেই কারণেই ‘নদী মাটি অরণ্য’ ‘দ্বৈরথ’, ‘মালবকৌশিক’,’সমগ্র শঙ্খচিল’ এর মতো ঢাউস উপন্যাস লিখতে পেরেছি – যা লিখতে কোনোটির দশ বছর, কোনটার সাত বছর, কোনটার চার-পাঁচ বছর লেগেছে।

প্রশ্ন – বাংলা সাহিত্যে এই মুহুর্তে উল্লেখযোগ্য, সম্ভাবনাময় ভালো লেখক কে কে ?

তপন – লেখক প্রচুর, ভালো লেখকও অনেক। একেবারেই তরুণ এমন কারও নাম এখনই বলা ঠিক নয়, কারণ আমার অভিজ্ঞতা বলে বহু তরুণ লেখক প্রবল প্রতিশ্রুতি নিয়ে লিখতে আসেন, পাঁচ কি সাত বছর ভালো লিখে কোথায় হারিয়ে যান। আবার অনেকেই গল্প ভালো লেখেন, কিন্তু উপন্যাসে সিদ্ধি নেই। উপন্যাসে সফল না হলে বড়ো লেখক হওয়া যায় না বলেই আমার ধারনা। অনিতাঅগ্নিহোত্রীর ‘মহানদী’ একবারেই অন্য স্বাদের। শুধু নদীকে প্রধান চরিত্র রেখে উপন্যাস, বোধ হয় এই প্রথম। তাঁর ‘মহাকান্তার’ আর এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। সবচেয়ে সাহসী তিলোত্তমা মজুমদার। রবিশঙ্কর বল বেশ কয়েকটি ভালো উপন্যাসে লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ‘দোজখনামা’ তো এক এপিক। প্রচেত গুপ্ত খুব জনপ্রিয় লেখক। রামকুমার মুখোপাধ্যায় লিখে চলেছেন একের পর এক ভিন্নধারার উপন্যাস। জয়ন্ত দে-র অনেকগুলি গল্প এখন পাঠকের মুখে মুখে ঘোরে। বেশ কয়েকটি ভালো উপন্যাস লিখেছেন। বেশ কয়েকটি ভালো উপন্যাস লিখেছেন অভিজিৎ তরফদার। আফসার আহমেদ ও সোহরাব হোসেন – দুজনেই অকাল প্রয়াত, কিন্তু খুব শক্তিমান। আমিতাভ সমাজপতি, স্মরণজিৎ চক্রবর্তী, তৃষ্ণা বসাক, যশোধারা রায়চৌধুরী বেশ খ্যতিমান। সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় যথেষ্ট জনপ্রিয়। সায়ন্তনী পুততুন্ড, কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, সৈকত মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম বসু, অংশুমান কর, উল্লাস মল্লিক, সুকান্তি দত্ত, তৃণাঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়, চন্দন চক্রবর্তী, তন্বী হালদার, অনিন্দিতা গোস্বামী, অহনা বিশ্বাস, তৃপ্তি সান্ত্রা, নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, অলোক গোস্বামী, উৎপলেন্দু মন্ডল, শ্যামল ভট্টাচার্য, সসীমকুমার বাড়ৈ – আরও অনেকে।

প্রশ্ন –  এখন কী লেখা লিখছেন ?

তপন – তথ্যকেন্দ্রে ‘আমলাগাছি’র পরের অংশ লেখা চলছে ধারাবাহিকভাবে। উত্তরবঙ্গ সংবাদ এ প্রতি রবিবার লিখছি ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস- ‘মুন্নারে মসলিন রহস্য’। তা ছাড়াও ছোটো বড়ো আরও বহু লেখা আমাকে লিখতে হয় নানা পত্রপত্রিকার আমন্ত্রণে। গড়ে রোজ চার-পাচ ঘন্টা লিখি, চার-পাঁচ ঘন্টা পড়ি।

প্রশ্ন – আগামী দিনগুলিতে আর কী কী কাজ করার ইচ্ছে আছে ?

তপন – উপন্যাস ও গল্প প্রচুর লিখেছি। এখন অন্য ধরনের লেখার কথা ভাবছি। আমার আমলাজীবন চল্লিশ বছরের। প্রথম খন্ডে লেখা হয়েছে প্রথম ছ’বছর, ইচ্ছে আছে গোটা আমলা জীবনে চার বা পাঁচ খন্ডে লিখব – যদি সময় পাই। অফিসের শুকনো ফাইল ঘেঁটে সরস আখ্যান লেখার মধ্যে এক অন্য উপলব্ধি। এধরনের লেখা বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়নি বলেই আমার আর ভগীরথ মিশ্রের এমন অভিনব প্রয়াস। আর লেখার ইচ্ছে আমার শৈশব-কৈশোর- যৌবনের দিনগুলি নিয়ে এক বা দু’খন্ডে আত্মজীবনী।

প্রশ্ন – এমন কি কোনো ইচ্ছে ছিল যে-ইচ্ছা বা আশা এখনও পুরণ হয়নি ?

তপন – ইচ্ছে তো বহু, কিন্তু লেখার সময় পেলাম কোথায়। বাংলায় রবীন্দ্রনাথ অনেকগুলো নৃত্যনাট্য লিখেছিলেন যা আজও নৃত্যশিল্পীদের একমাত্র আশ্রয়। তারপর এত কবি-লেখক এলেন কেউ এবিষয়ে কোনো কাজ করলেন না। আমি নিজে গান জানি না, ভালো সুরকার পেলে কিছু নৃত্যনাট্য বা গীতিনাট্য লেখার ইচ্ছে ছিল। আর লেখার ইচ্ছে ছিল কিছু কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস। কল্পবিজ্ঞান লিখব বলে অনেক তথ্যও সংগ্রহ করা আছে, কিন্তু সময়ের খুব অভাব।

প্রশ্ন –  আগামী লেখকদের জন্য আপনার উপদেশ ?

তপন – বাংলা সাহিত্যে আরও বহু কাজ করার আছে। নতুন বিষয় নিয়ে গবেষণামূলক ভালো উপন্যাস লিখতে পারলে বাংলা সাহিত্যের উপকার হয়।

আমরা – আজ সন্ধ্যেটা গল্পে গল্পে খুব ভালো কাটলো। ভালো থাকুন,সুস্থ থাকুন, আমাদের মতো পাঠকদের জন্য ভালো ভালো লিখুন।

তপন– আমারও আজ সন্ধ্যেটা ভালোই কাটলো। আপনারাও ভালো থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন