সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

দীপালোক ভট্টাচার্যের গল্প : ডানা ভাঙা ফড়িং




‘আই তাঞ্জিরুল, তাঞ্জিরুল... খাসীটাকে নিয়া আয় তো, যা। আকাশটা খারাপ করচে। যা, তাড়াতাড়ি যা’।
আজ বোধহয় আর খেলাটা হল না। পাশের পাড়ার সাথে ফুটবল ম্যাচ হবার কথা বড়বটতলার মাঠে। একশ টাকার ম্যাচ। এটা অবশ্য তাঞ্জিরুলের আম্মু জানে না। একশ টাকার ম্যাচ মানে দশজনের দলের প্রত্যেকে দশ টাকা করে দেবে। মোট একশ টাকা। দু দল মিলিয়ে দুশো। যে দল জিতবে, সে দল দুশো টাকা পাবে। মানে মাথাপিছু কুড়ি। গত পরশু তাঞ্জিরুলদের দল হেরে গেছিল। আজ বদলা নেবার দিন। এক দু দিন পর পর দশ টাকা জোগাড় করার ঝক্কি তো কম নয়। আব্বু বাড়িতে থাকলে তবু অন্য কথা। আব্বু তো ব্যাঙ্গালুরু বলে একটা শহর, যে শহর অনেক বড়, অনেক লোকজন, বড় বড় রাস্তা, আকাশ সমান উঁচু বাড়ি, সেখানে রংমিস্ত্রির কাজ করে। বছরে এক দু বার করে আসে। আব্বু বাড়ি আসার সেই স্বপ্নের দিনগুলোর স্বপ্ন দেখে তাঞ্জিরুল বছরের বাকি সময়টা। তবে প্রতিমাসে টাকা পাঠায় আব্বু। ওদের বড়খাসবস গ্রাম থেকে সব থেকে কাছের গঞ্জে বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা ছোট্ট ঘর আছে, এ টি এম ঘর। ওখানে একটা কার্ড ঢুকিয়ে চারটে নম্বর টিপতে হয়। তাঞ্জিরুলের মুখস্ত আছে সেই নম্বর চারটে। ও কাউকে বলে না। মেশিনের পেট থেকে পাঁচশো, দু হাজারের নোট বেরোয়। ওর আম্মু বিস্ময়ে একবার মেশিনের দিকে তাকায় একবার তাঞ্জিরুলের দিকে। আজব যন্ত্রের আজব কারবারে ঘোর লাগে। তবে তাঞ্জিরুল জানে, আম্মুর তখন খুব মন খারাপ হয়। আব্বুর জন্য। আব্বু তো একটা ঘরে অনেকে মিলে গাদাগাদি করে থাকে। চাল ডাল ফুটিয়ে খায়। মাঝে মাঝে মুরগীর ঝোল। আম্মু বলে, ‘আমরা তো তাও ভালো মন্দ খাই। জিয়াফৎবাড়ি যাই। তোর আব্বুটা খাইটা মরে’।  এ টি এম থেকে টাকা তুলে তাঞ্জিরুলের বায়নায় ওর আম্মুকে মোমো চাউমিনের ঠেলাগাড়ি দোকানে যেতে হয়।
 আজ ম্যাচটা জিতলে ডিম দেওয়া চাউমিন খেত তাঞ্জিরুল। হাফ প্লেট কুড়ি টাকা। বেশী করে সস দিয়ে। সেটা বোধহয় কপালে নেই। শনশন করে হাওয়া বইছে। গোটা আকাশটা মেঘে ঢেকে গেছে কিন্তু কী করে যেন যেখানে সূর্যটা আছে, সেখানটায় মেঘ জমেনি অতটা। পশ্চিম আকশটা টুকটুকে লাল হয়ে গেছে। চাউমিন-মোমোর ঠেলাগাড়ির দোকানের সসের মত টুকটুকে।
 ‘কাল্টি, কাল্টি... আঃ, আঃ, আঃ...’  তাঞ্জিরুল এক বিশেষ সুরে ডেকে চলে ওদের খাসীটাকে। ও জানে, মোক্তারচাচার দোলাজমি, হাড়গিলা পুকুরের পার কিংবা ওসমানদের পাটখেতের ভেতরের আল –যেখানেই থাকুকনা কেন, কাল্টি ঠিক সাড়া দেবে। মুরশেদের আব্বুর নার্সারিতে গেল নাকি আবার? তাহলে ঝামেলা বেধে যাবে। মাস কয়েক আগে একবার তাঞ্জিরুলদের খাসীটা নার্সারির চারাগাছ খেয়ে ফেলেছিল। তাঞ্জিরুলের মা দু’শো টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিল কাল্টিকে।
  ‘কাল্টি, কাল্টি... আঃ, আঃ, আঃ...’  আবার ডাকে  তাঞ্জিরুল। পাটখেতের ওদিকটাতেই খুঁজতে হবে মনে হচ্ছে। এবারে জল পেয়ে পাট খুব বেড়েছে। এইতো মাস খানেক আগে জমিতে নিড়ানি দেওয়া হল। এর মধ্যে কেমন লকলক করে মানুষ সমান হয়ে উঠেছে পাটগাছগুলো। সরসরে হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে পাটগাছের পাতা। একটা ফড়িং পাতার দুলুনির সাথে তাল মেলাতে চেষ্টা করছে। তাঞ্জিরুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফড়িংটার দিকে। বইয়ের ভাঁজে রাখা শিরা উপশিরা বেরোনো অনেক দিনের বিবর্ণ মলিন বট, অশ্বত্থ পাতার মত তার ডানা। পা টিপে টিপে কাছে এসে নিঃশ্বাস বন্ধ করে খুব ধীরে ধীরে ফড়িং টার দিকে এগোয় তাঞ্জিরুল। হাত দুটো ধীরে ধীরে ফড়িং এর কাছে আনে। খপাৎ করে ডানা দুটো ধরে ও। ডানা ফড়ফড় করে ঝাপটা ঝাপটি করে ফড়িং। কিন্তু পেরে ওঠে না। হঠাৎ কি মনে হল, ফড়িংটার একপাশের ডানা ফটাং করে ছিড়ে ফেলে তাঞ্জিরুল। তারপর ছেড়ে দেয়। ফড়িংটা একপাশের ডানা দিয়ে ওড়ার চেষ্টা করে একবার। টাল খেয়ে পড়ে যায় আল জমিতে। ঠিক তখন দূর থেকে ‘ম্যা ম্যা’ ডাক শুনতে পায় তাঞ্জিরুল। এ ডাকটা ওর খুব চেনা। ওদের কাল্টি।
  ‘কাল্টি, কাল্টি... আঃ, আঃ, আঃ...’
 কাল্টি ম্যা ম্যা করে উত্তর দেয়। পাশের আল থেকে উঁকি দিয়ে তাঞ্জিরুলকে দেখতে পেয়ে আরো জোরে ডেকে ওঠে খাসীটা। গত বছর দিব্বি তাঞ্জিরুলের কোলে কোলে ঘুরতো কাল্টি। তাঞ্জিরুল ওর গলায় আদর করে দিত। তখন গলাটা আরো উঁচিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে থাকত। তারপর একদিন আব্বু কাল্টিকে নিয়ে গেল পশু হাসপাতালে। খাসী করার জন্য। তাঞ্জিরুল জানে কী করে পাঠাকে খাসী করে। ওর বন্ধুরা ওকে বলেছে। শুনে তাঞ্জিরুলের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল আতঙ্কে। খাসী করার পর কেমন গায়ে গতরে বেড়ে মুশকো চেহারা হয়েছে কাল্টির। তাঞ্জিরুলের পা টা একবার শুঁকে ওর পিছু পিছু হাঁটা দেয় কাল্টি। হাওয়ার সাথে দু এক ফোঁটা বৃষ্টির ছাট গায়ে এসে লাগে। তাঞ্জিরুল দৌড় লাগায়। ম্যাম্যা করতে করতে তাঞ্জিরুলের পিছু নেয় কাল্টি।

ফুরিয়ে আসা ধুসর রঙের প্যাস্টেল কাঠি ড্রয়িং খাতার ওপর বোলাচ্ছে তাঞ্জিরুল। ড্রয়িং খাতায় পেনসিলে স্কেচ করা একটা আকাশ সমান উঁচু বাড়ী। একেবারে মাথার দিকে কোমরে দড়ি বাধা একটা লিলিপুটের মতন দেখতে মানুষ। হাতে রঙের ব্রাশ। উপর থেকে বাড়ীটা গোলাপী রঙা হয়ে নামছে নিচের দিকে। ছবিতে শুধুমাত্র উপরের খানিকটা অংশ মাত্র রঙ করা হয়েছে। একটা সময় গোটা বাড়ীটার প্লাস্টারের ওপর গোলাপী পোচ পরবে। আশপাশের উঁচু উঁচু বাড়ীর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে আকাশ। তাঞ্জিরুলের ইচ্ছে ছিল লোকটাকে, মানে রংমিস্ত্রীকে অনেকটা নিচের দিকে নামিয়ে আনবে, যাতে করে প্রায় পুরো বাড়ীটাকেই গোলাপি রঙে রাঙানো যায়। কিন্তু গোলাপী প্যাস্টেল ছোট হতে হতে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে পুরো বাড়িটার রঙ করার দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। তাই রংমিস্ত্রীকে অনেকটা ওপরে ওঠাতে হল।
 এই রংমিস্ত্রী পুরো বাড়িটার রঙ শেষ করে ট্রেনে চেপে আসবে তাঞ্জিরুলদের কাছে। টিকিটও কাটা হয়ে গেছে। বাড়ী আসার পর তাঞ্জিরুলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে ব্যাগ থেকে একে একে বের করবে নানান জিনিষ। ফোনে ফর্দ পাঠানো হয়ে গেছে। ব্যাটারী দেওয়া বন্দুক যেটার ট্রিগারে চাপ দিলে ঠিক টিভিতে দেখানো সিনেমার বন্দুকের মত শব্দ হয় আর লাল আলো বেরোয়। রাতে সে আলো যায় অনেকদূর।  নতুন একবাক্স প্যাস্টেল রঙও আসবে অনেক বড় সেই শহরের বড় দোকান থেকে। নতুন রঙের গন্ধ শুঁকবে তাঞ্জিরুল। এই বাক্সে আরো অনেক রঙ থাকবে যেসব রঙ আগে ছিল না তাঞ্জিরুলের। সব রঙের নাম সে জানেও না। কিন্তু রঙের ব্যাপারে সবজান্তা সেই লোকটা তাঞ্জিরুলকে বলেছে রঙের নাম না জানলেও নাকি ক্ষতি নেই। চারপাশে কত রঙ। কাঁচা আমের সবুজ আর করলার সবুজে যেমন সূক্ষ্ম তফাত আছে, ঠিক তেমনি কাঁঠাল গাছের মগডালে বসে থাকা হলুদ পাখি আর পাকা গমক্ষেতের হলুদেও অনেক তফাত। এই লোকটাই তাঞ্জিরুলকে রঙ চিনিয়েছে আরো ছোটবেলায়। আম্মু বলত, ‘রংমিস্ত্রীর বেটাকে রংমিস্ত্রী বানাইবা?’ উত্তরে সে বলত, ‘আমার ব্যাটা শিল্পী হবে। আমি তো পারলাম না। দেখি তাঞ্জিরুল  যদি পারে’।
 ‘আই তাঞ্জি, গোসল কর জলদি। ভাত হইচে’, তাঞ্জিরুলের দাদী হাঁক দিল রান্নাঘর থেকে।
 ‘যাই দাদী,  ছবিটা আর একটু বাকি’, তাঞ্জিরুল উত্তর দেয়।
 ক’দিন থেকে আম্মুর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। ক’দিন আগে হাসপাতালে দেখাতে গিয়েছিল তাঞ্জিরুলের দাদির সাথে। তাঞ্জিরুল জানে, ওর ভাই বা বোন কিছু একটা হবে।
 প্রথম বৃষ্টির জল পেয়ে তিস্তায় উথলে উঠছে জল। তাঞ্জিরুলদের বাড়ি নদীবাঁধের ধার ঘেঁষে। বারো নম্বর স্পার যেখান থেকে শুরু, সেখানে। এখন নদী কাছে এলেও  শুখা মরশুমে নদী সরে যায় অনেক দূরে। চর ছেয়ে যায় এক মানুষ সমান কাশ বনে। তাঞ্জিরুলরা বিকেলে লুকোচুরি খেলে সেখানে। ওদের বন্ধুদের দল লুকায় কাশ বনের আড়ালে। যে চোর হয়, সে খুঁজে বেড়ায় বাকিদের। একদিন তাঞ্জিরুল লুকোতে গিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছিল। দূর থেকে নদীর শব্দ পাচ্ছিল কিন্তু কাশ বনের আড়ালে দেখতে পাচ্ছিল না। বন পেরিয়ে সাদাটে চর। ভেজা ভেজা বালি ডিঙিয়ে নদীর কাছে গিয়ে চুপ করে বসে ছিল তাঞ্জিরুল।  ধূসর রঙের একদল বক মাছ খুঁজছিল জলে। এই বকগুলোকে এদিকে খুব একটা দেখা যায় না। ওদের ইস্কুলের জীবনবিজ্ঞান স্যার বলেছিল, এরা নাকি পরিযায়ী পাখি। শীতের দেশে খাবার পায় না বলে চলে আসে তুলনামূলক গরম জায়গায়। তাঞ্জিরুলের মনে হয়েছিল, ওর আব্বুও বকগুলোর মত। এখানে তেমন একটা কাজ নেই তো। তাই অনেক দূরের একটা শহরে গেছে। কিছুদিন কাজ করে আবার ফিরবে। কিছুদিন থেকে আবার যাবে। আবার আসবে। তাঞ্জিরুলের মনে হয়েছিল, ওর আব্বু যেমন জানে কোন ট্রেনে উঠলে বাড়ি আসা যায়, বকগুলো কী জানে ওদের বাড়ী ফেরার রাস্তা? এই বিরাট আকাশে যদি রাস্তা হারিয়ে ফেলে? একটা বক ছো মেরে তুলে নিল মাছ।
 ‘তাঞ্জিরুল... আই তাঞ্জিরুল...’
 দূর থেকে আসেদের গলা পেল। ওকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে।
 ‘টুকি...’, তাঞ্জিরুল গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে।
  গামছাটা পারে রেখে স্পারের পাথর থেকে জোরসে একটা লাফ দিল তাঞ্জিরুল। জলের ভেতরে বুকে জমিয়ে রাখা শ্বাস একটু একটু করে ছাড়ছে। ভুরভুর করে সে বাতাস জলের তলা থেকে উপরে গিয়ে মিলে যাচ্ছে বাতাসে। অনেকক্ষণ শ্বাস আটকে বাতাসের ভুরভুরি তোলে  তাঞ্জিরুল। একটা সময় পারে না। চিৎসাঁতার দিয়ে শরীরটাকে ভাসিয়ে রেখে বুক ভরে শ্বাস নেয়। তাঞ্জিরুল কোনোদিন সমুদ্র দেখে নি। ওর আব্বু কাছে শুনেছে সাগর নাকি ইয়া বড়, এই তিস্তার চেয়েও অনেক অনেক বড়। বিশাল ঢেউ আছড়ে পরে তীরে গর্জন করতে করতে। প্রথম বৃষ্টির জল পেয়ে তাঞ্জিরুলদের তিস্তাও সাগরের মত দেখাচ্ছে। ওই পারটা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর, কাশ বন, অস্থায়ী ক্ষেতখামার – সব এখন তিস্তার দখলে।
 আকাশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। তাঞ্জিরুলের মুখে চোখে লাগে সে বৃষ্টির স্পর্শ। ওর মুখেও যায় দু এক ফোঁটা। কিন্তু মুখ বন্ধ করে না তাঞ্জিরুল।
  ‘আই তাঞ্জি, ইস্কুল যাবি না?’, দূর থেকে হাঁক দেয় আসেদ। আসেদ আর ও একি ক্লাসে পড়ে। তবে সেকশন আলাদা। ছাত্র কম এলে আবশ্য তখন দুই সেকশন এক হয়ে যায়। একি সাথে ক্লাস হয়।
 আজ ইস্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না।  নদীতে আসতে বারন করেছিল দাদী। যা জল নদীতে। তাঞ্জিরুল অনেক বুঝিয়ে একটা মাত্র ডুব দিয়ে আসবে বলে এসেছে। কিন্তু নদীতে নামলে কী আর সহজে উঠতে মন চায়?
 ‘আজকে যাব না’, তাঞ্জিরুলও হাঁক দিয়ে জানায়।
 ‘আজকে কিন্তু ব্যাগ দিবে ইস্কুলে। আর ফুটবল টিমের জন্য নাম নিবে খেলার স্যার,’ আসেদ গা মুছতে মুছতে বলে।
 ওর আব্বু বলেছিল আসার সময় তাঞ্জিরুলের জন্য ব্যাগ নিয়ে আসবে। আব্বু কী কিনে ফেলেছে ব্যাগটা? আর দিন কয়েক পরেই ট্রেনে উঠবে। আজ ফোন করলে শুনতে হবে ব্যাগটা কিনে ফেলেছে কি না। না কিনে থাকলে বলতে হবে ইস্কুল থেকে সরকারি ব্যাগ দিচ্ছে। আর কিনো না। তারচেয়ে বরং একটা ফুটবল নিয়ে এসো। পাঁচ নাম্বার সাইজের।
 গা মুছতে মুছতে বাড়ীর দিকে এগোলো তাঞ্জিরুল। অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। এর পর প্রেয়ার মিস হয়ে যাবে।
 বারান্দায় একটা চৌকির ওপর ইতিহাস বই খুলে বসেছে তাঞ্জিরুল। বারবার চোখ যাচ্ছে পাশে রাখা নীল রঙের ব্যাগটার দিকে। গত পরশু ইস্কুল থেকে দিয়েছে ব্যাগটা। নতুন ব্যাগের আকর্ষনের থেকেও অন্য একটা ব্যাপার আছে অবশ্য। ব্যাগের সামনের ছোট চেনটার ভেতরে দুটো একশ টাকা আর একটা পঞ্চাশ টাকার নোট আছে।  ফুটবল খেলে জেতার টাকা। আজ তাঞ্জিরুল দুটো গোল দিয়েছে। সেই খুশীতে ওকে ভাগে বেশী দিয়েছে বন্ধুরা। টাকাটা দিয়ে কী কী করবে তার হিসেব করছিল মনে মনে। আম্মু জানতে পারলে সর্বনাশ। আব্বুকে ফোন করে বলে দেবে। রেগে গেলে তাঞ্জিরুলের আব্বু অন্যরকম হয়ে যায়। একবার না বলে তোষকের তলা থেকে দশ টাকা নিয়েছিল বলে দু দিন তাঞ্জিরুলের সাথে কথা বলে নি ওর আব্বু। কিছু জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর পায় নি। এর চেয়ে বাকি বন্ধুদের বাবারাই ভালো। কোনো দুষ্টুমি করলে দু চার ঘা লাগিয়ে দেয় তারা। ব্যাস। তারপর সব ঠান্ডা। কিন্তু তাঞ্জিরুলের আব্বু এরকম কঠিন শাস্তি দিলেও মনে হয় লোকটা অনেক অনেক আলাদা। কিন্তু কেন আলাদা সেটা ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারবে না তাঞ্জিরুল।
 এদিকে ব্যাগ নিয়েও একটা দুশ্চিন্তা রয়েই গেল। আজ ফোনে লাইন পায়নি আম্মু। বিকেলে ক’বার চেষ্টা করেছে ফোন করার। ফোন সুইচড অফ। চার্জ ফুরিয়ে গেছে বোধ হয়। আব্বু যদি কিনে ফেলে ব্যাগটা? ব্যাগের বদলে ফুটবল আনার কথাটা এখনো বলা হয়ে ওঠে নি। মানিকের ফুটবল দিয়েই ম্যাচ খেলা হয়। কিন্তু ওটার সেলাই খুলে গেছে যায়গায় যায়গায়। সেদিন ব্লাডার বেরিয়ে গেছিল চামড়া ফুড়ে। গত বছর চাঁদা তুলে ফুটবল কিনেছিল ওরা। কিন্তু সেটা কার কাছে থাকবে, সেটা নিয়ে ভীষন ঝগড়া হয়। এর চেয়ে নিজের একটা ফুটবল থাকলে কত ভালো। উঠোনেও নিজে নিজে খেলা যায়।
 রান্নাঘর থেকে ফোনের রিংটোন শুনতে পায় তাঞ্জিরুল। আব্বু ফোন করল কী? কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে। তখনি কড়াইতে ডাল ফোড়ন দেবার শব্দে আর কিছু শুনতে পায় না তাঞ্জিরুল। শুধু ‘কী বলতেছেন?’, ‘কী হাসপাতালে?’, ‘কখন?’ এরকম কিছু টুকরো কথা কানে আসে। কে আবার হাসপাতালে ভর্তি হল? নানার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না দিন কয়েক। যা খাচ্ছে বমি হয়ে যাচ্ছে। নানার কিছু হল নাকি?
 লন্ঠনের আলোর চারদিকে একটা পোকা পাক খাচ্ছে। কাঁচে ধাক্কা খেয়ে নিচে পরে যাচ্ছে। আবার উড়ে যাচ্ছে। আবার ধাক্কা খাচ্ছে। একটা সময় ইতিহাস বইয়ের খোলা পাতার উপর পড়ে ডানা ঝাপটাতে লাগল পোকাটা।
 ঠিক তখনি রান্নাঘর থেকে ফোঁপানির শব্দ পেল তাঞ্জিরুল। তার সাথে কিছু একটা পোড়া গন্ধ। সম্ভবত মুসুর ডাল পোড়ার গন্ধ। গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল। কুপির আলোয় আম্মির মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। তাঞ্জিরুলের মনে হল ওর আম্মি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।  দাদীও বাড়িতে নেই। ওর বড়ফুপুর  বাড়ী গেছে। কুপিটা হাতে নিয়ে দেখল মুসুরডাল কড়াইয়ের তলায় লেগে গেছে। বিকট গন্ধ আসছে সেখান থেকে। কড়াইটায় হাত দিতে গিয়ে বুঝল গরমে তেতে আছে। একটা শুকনো কাঁটা বাঁশ কড়াইয়ের দুটো কানে ঢুকিয়ে কড়াইটাকে পাশে রাখল। উনুন টা ধিকিধিকি জ্বলছে। এটাকে কি করে নেভানো যায়?
 হঠাৎ তাঞ্জিরুলের খুব ভয় করতে লাগল। আব্বুর কী কিছু হয়েছে? কে ফোন করল? আজ সকাল থেকে আব্বু একবারও ফোন করেনি। আম্মু দুবার চেষ্টা করেছিল বিকেল বিকেল। ফোনে পায় নি। ভেবেছে আব্বুর মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গেছে।
  ওর আম্মির সামনে হাটু গেড়ে বসল তাঞ্জিরুল। আম্মির হাত দুটো ধরল। আলো আধারিতে চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। আর নিজেকে সামলাতে পারল না আম্মু।
 ‘আম্মি, আব্বুর কিছু হইচে? মিথ্যা কথা কবা না’, চোখে চোখ রেখে বলল তাঞ্জিরুল।
 ‘তোর আব্বু বিল্ডিং রঙ করার সময়... উঁচা থেকে পড়ে... ’ আর বলতে পারল না আম্মি। সমানে কেঁদে চলেছে।
 হঠাৎ বজ্রপাতে চমকে যাওয়ার মত হল তাঞ্জিরুলের। স্যাঁতস্যাঁতে ভিজে রাতে কপালে জমা হল ঘামের ফোঁটা। ভীষন গুমোট লাগছে তাঞ্জিরুলের।
 ‘গোপাল না কে একজন নাম কইল। তোর আব্বুর সাথে একই বিল্ডিং এ রঙের কাজ করে। কইল যে,  ফালাটের বাইরেটা রঙ করতেছিল। উঁচা উঁচা পাইপ লাগায়, তার উপরে পাটাতন বসায় তার উপর দাঁড়ায়। এখন পা ই হড়কাইল, নাকি পাটাতন – পাইপ এইসব ভাঙল।   পাঁচ তলা উঁচা থাইকা...’ পুরোটা বলতে পারল না তাঞ্জিরুলের আম্মি।
 তাঞ্জিরুলের হাত পা অবশ হয়ে আসছে। ওদের ইস্কুল টা দোতলা। ইস্কুলের ছাদে উঠে নীচটা দেখলেই কেমন মাথা টলমল করে। পাঁচতলা মানে, ওদের ইস্কুলের সাথে আরো তিনটে তলা। সেখান থেকে পা হড়কে পড়া মানে তো...
 তাঞ্জিরুলের ইস্কুলের এক বন্ধুর বাবাকে একবার প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দূরের কোনো হাসপাতালে। খুব অসুস্থ ছিল। ওর কাছে শুনেছে প্লেনে নাকি দুই দিনের ট্রেনের রাস্তা কয়েক ঘন্টায় পৌছে যাওয়া যায়। কিন্তু অনেক দাম টিকিটের। কত দাম সেটা শোনা হয় নি। তাঞ্জিরুলের খুব ইচ্ছে করছে প্লেনে করে ওর আব্বুর কাছে চলে যেতে। সাথে আম্মিও থাকবে। ওর ব্যাগের ভেতরে কিছু টাকা আছে। কিন্তু সেটা দিয়ে বোধ হয় টিকিটের সবটা হবে না।
 ‘ওই লোকটা কইল ওরা নাকি সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মাথা, হাত পায়ের ছবি তুলচে। হাত পায়ের হাড্ডি নাকি ভাংচে। ভাঙা হাড্ডি তাও জোড়া লাগে। কিন্তু মাথা... মাথার ভিতর রক্ত...’, তাঞ্জিরুলের আম্মি পুরোটা বলতে পারল না।
 তাঞ্জিরুলেরও গলার কাছটায় কিছু একটা দলা পাকিয়ে এল।

 ‘আশি আর আঠারোয় কত হয় রে তাঞ্জিরুল?’, টাকা গুনতে গুনতে তাঞ্জিরুলের আম্মি ওকে জিজ্ঞাসা করে। দরজার পাল্লা আটকে বিছানায় বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন অংকের নোট এলোমেলোভাবে রয়েছে। তাঞ্জিরুল আর ওর আম্মি সেই টাকা গুনছে।
 তাঞ্জিরুলদের আত্মীয় স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী সবাই কিছু কিছু করে অর্থ সাহায্য করেছে। যে যেমন পেরেছে তেমন। ওর ইস্কুলের বন্ধুরা আর স্যার ম্যাডামরাও কিছু কিছু করে টাকা তুলেছে। ওদের পাড়ার পঞ্চায়েত বুদ্ধিটা দিয়েছিল তাঞ্জিরুলের আম্মিকে। হেডস্যারকে তাঞ্জিরুলের আব্বুর অবস্থা জানিয়ে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিল ও। তাঞ্জিরুলের মন থেকে খুব একটা সায় দেয়নি প্রথমে। কিন্তু ও বুঝতে পেরেছিল। টাকাটা খুব দরকার এই মুহূর্তে। আজ ইস্কুল থেকে টাকাটা নিয়ে এসেছে তাঞ্জিরুলের মা। সাথে তাঞ্জিরুলও গিয়েছিল মা’র সাথে। ওদের জীবন বিজ্ঞান স্যার আলাদা করে একটা দু হাজার টাকা দিয়েছে। সাথে এটাও বলেছে, এ সব ক্ষেত্রে নাকি যে বিল্ডিং রঙ করার কাজ করছিল তাঞ্জিরুলের আব্বু, তার কন্ট্রাক্টারকেই নাকি চিকিৎসার সব খরচ দেওয়ার কথা। এটাই নাকি নিয়ম। ওর আব্বুর সাথে যারা কাজ করে, তারা জানিয়েছে কন্ট্রাক্টর নাকি বিশ হাজার টাকা দিয়েছে হাসপাতালে। এত বড় অপারেশন, কুড়ি হাজারে কিছু হয় না। সেই স্যার জিজ্ঞেস করেছিল, কাজ করার সময় তাঞ্জিরুলের আব্বু মাথায় হেলমেট পরে ছিল কিনা। আর কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল কিনা। এটাই নাকি নিয়ম উঁচু বাড়ীর কাজ করার সময় এসব পরতে হয়। তাঞ্জিরুল আর ওর আম্মি তো এত কিছু জানে না। এত দূরের একটা শহর, যে শহরে ওরা কোনোদিন যায় নি, সেখানকার ভাষা জানে না; কার আছে অভিযোগ জানাবে ওরা?
 ‘আশি আর দশে নব্বই আর আটে আটানব্বই’, তাঞ্জিরুল মনে মনে অংক কষে হিসেব করল, ‘আটানব্বই টা একশ টাকার নোট মানে নয় হাজার আটশ’।
 ‘আর দুইটা হইলে পুরাপুরি দশ হাজার হয়’।
 আর দুটো নোট। তাহলেই দশ হাজার। ইস্কুল থেকে পাওয়া ব্যাগটার কথা মনে পড়ল তাঞ্জিরুলের। ওটার ছোট চেনটার ভেতরে আড়াইশ টাকা রাখা আছে। ফুটবল ম্যাচ জেতার সেই টাকাটা। টেবিলে রাখা ব্যাগটার চেন খুলে নোট দুটো বের করে তাঞ্জিরুল। নোটের বান্ডিলে ও দুটো যোগ করে গার্ডার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখে।
তাঞ্জিরুলের আম্মি কিছু একটা বলতে গিয়েও বলে না। চোখ দুটো ভিজে ওঠে। আম্মি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

 সাথে একটা গামছা থাকলে ভালো হত। নাকে পেঁচিয়ে নিলে এই বিদঘুটে গন্ধ কিছুটা কম লাগত নাকে। ডোবায় জাগ দেওয়া পাটের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ডোবার পারে বসে তাঞ্জিরুল এক মনে পচা পাট থেকে আঁশ বের করছে। আঁশ গুলোকে একপাশে ঢিপ করে রাখা হয়েছে আর পাটকাঠিগুলো আলাদা। এতক্ষন জল ঘেটে আঙুল গুলো জলে ভেজানো কিসমিসের মত লাগছে। আর এক বান্ডিল করলে আজকের মত কাজ শেষ। আম্মি না করেছিল। ইস্কুল বাদ দিয়ে এসব কাজ তাঞ্জিরুলের আব্বু একদম পছন্দ করত না। ‘করে’ আর ‘করত’ – তাঞ্জিরুলদের বাংলা স্যার শিখিয়েছিল ক্রিয়ার কাল পড়ানোর সময়। অতীত আর বর্তমান কালের তফাত বোঝানোর জন্য। তাঞ্জিরুলের আব্বু তাঞ্জিরুলের স্কুল বাদ দিয়ে কাজ করা আর পছন্দ করবে কিনা সেটা নির্ভর করবে আজ ওর মাথার অপারেশনটা ঠিকঠাক হবে কিনা সেটার উপর। ওর বড়খালু আর পাড়ার এক চাচা গিয়েছে ওখানে। টাকা নিয়ে। তাঞ্জিরুলের খুব ইচ্ছে ছিল ওর আব্বুর কাছে যাওয়ার। কিন্তু আম্মি ছাড়েনি ওকে। আম্মির শরীর টা ভালো যাচ্ছে না ক’দিন থেকে।
 দূরের মাঠে দেখা যাচ্ছে তাঞ্জিরুলের বন্ধুদের। ফুটবল খেলছে। আজ মধ্যপাড়ার  সাথে ম্যাচ। ওর বন্ধুরা খুব জোরাজুরি করছিল খেলার জন্য। ও রাজি হয় নি। চিৎকার শুনে বুঝল গোল হয়েছে। কে গোল করল? তাঞ্জিরুলের পাড়া নাকি বিপক্ষ দল? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল কিন্তু রাস্তাটা আড়াল করে আছে।
 এই পাটগাছটা বোধ হয় ঠিকমত পচে নি। আঁশ গুলোকে ছাড়ানো যাচ্ছে না সহজে। শরীরের সবটা শক্তি দিয়ে আঁশ ধরে টানল তাঞ্জিরুল। টানতে গিয়ে পাটকাঠিটা ভেঙে গেল। আঁশ রাখতে গিয়ে দেখল একটা ফড়িং বসে আছে সেখানে। একপাশের ডানা নেই। একদিকের ডানা দিয়ে ওড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। একটু উঠে আবার পড়ে যাচ্ছে আঁশের ঢিপির ওপর।
 তাঞ্জিরুলের আব্বুরও ডানদিকের হাতপা ভেঙেছে। বা পাশ টা ঠিকই আছে। শুধু বা হাত পা নিয়ে এই ফড়িং টার অবস্থা ওর আব্বুর। তাঞ্জিরুলের মনে হল, ও অনেকবার ফড়িংএর ডানা ছিড়ে ছেড়ে দিয়েছিল।
 ফড়িংটাকে হাতের চেটোয় নিল তাঞ্জিরুল। ওর চোখে চোখ রাখল। তাঞ্জিরুলের হাতের চেটোয় ফড়িংএর ডানা ঝাপটানির স্পর্শ লাগছে।
 যে প্লাষ্টিক ব্যাগে আম্মির দেওয়া চানাচুর মুড়ি মাখা এনেছিল, সেটায় ফড়িংটাকে রাখল তাঞ্জিরুল। মুখটা এটে দিল হাল্কা করে, যাতে একটু বাতাস ঢুকতে পারে এমনভাবে। আম্মির কাছ থেকে একটা পুরোনো কাঁচের বোতল চেয়ে নিতে হবে। সেখানেই রাখবে ওকে। যদি আবার ডানা ভাঙা ফড়িংটার ডানা গজায় নতুন করে। তখন ছেড়ে দেবে ওকে। ও উড়বে নিজের মত করে। নিজের খেয়ালে।

1 টি মন্তব্য: