সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

মলয় মজুমদারের গল্প : স্বপ্ন -- একটা যন্ত্রণার কাব্য


প্রকাণ্ড এক ঢেউ ছুটে আসছে, অথচ এই শহরের আশেপাশে তো কোন সমুদ্র নেই,  আছে একটা নদী, যা শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে । বর্ষাতেও এই নদী এই শহরকে প্লাবিত করে না।  অথচ এই ঢেউ এলো কোথা থেকে ? যা সুজাতার শরীরকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইছে । ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে কোন বিন্দুহীন দেশের ঠিকানায় । জন-মানব বর্জিত এক প্রান্তে সে দাঁড়িয়ে, শুধু বহু দূরে লিকলিক করে জ্বলছে জ্বলন্ত কিছু । বোঝা যাচ্ছে না ওটা আসলে কিসের আলো । কিন্তু জ্বলন্ত আলোটা তীব্রভাবে এসে লাগছে চোখের ভেতর । আলোটা অনেকটা লিকলিকে সাপের মতো ।  ঢেউটা সুজাতাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে ।  বুল-ডোজারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেই প্রকাণ্ড ঢেউয়ের চাক । শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঢেউকে যতবার আটকানোর চেষ্টা করছে, ঠিক ততো বেশি উদ্দোমে সেই ঢেউয়ের চাকটা এসে আছড়ে পড়ছে শরীরে ।

আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে  বিশাল প্রান্তর । রাত না দিন ? ঠিক করে উঠতে পারছে না কিছুতেই । চারিদিক ধূধূ করছে শুধু শূন্যতা । চাঁদ নেই । তারা নেই । কি আছে আশেপাশে ? সুজাতা দেখতে চাইলো । না কিছুই দেখা যাচ্ছে না । স্থবির একটা বেদনা , নাকি আনন্দ ! কি দেখছে এই সব ? চিৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে গেলো । গলার শ্বাসটা কেমন যেন রুদ্ধ হয়ে আসছে । জল-শরীর-মন একাকার । আর কিছু নেই । দৃশ্যের পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত । কখনো ধূধূ প্রান্তর । কখনো সমুদ্র । ধূধূ প্রান্তের মাঝখান দিয়ে ছুটে যাচ্ছে কালো কালো ঘোড়ার দল । প্রকাণ্ড ওই ঢেউ আর ঘোড়াদের গায়ের রঙ একই রকম । কালো কুচকুচে । ঘোড়াদের শরীরগুলো দুমড়ে মুচড়ে এমন আকার নিছে যেন সেই সামুদ্রিক ঢেউ পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে ঘোড়ার শরীরে, আর  ছুটে চলছে আবহমান কাল ধরে । গন্তব্য সেই বিন্দুহীন দেশের ঠিকানা ।

কি হচ্ছে এই সব ? অনেকক্ষণ ধরে বোঝার চেষ্টা করতে করতে, গায়ে একটা ঝাঁকুনি অনুভব  করলো, পিছন ফিরে দেখতে চাইলো, না কেউ নেই, তবে কে তার গায়ে হাত দিল । শরীরটা নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে  সে সব সময় , অথচ সে দেখতে পেলো না, কে তার শরীর স্পর্শ করলো ? কে সে নারী ? নাকি পুরুষ, তার শরীর তো ভেজা ! নাকি শুকিয়ে গেছে ! কিছু অনুভবে করতে পারছে না। তার শরীরের উপরেই তো আঁচড়ে পড়েছিল সামুদ্রিক  ঢেউয়ের চাক । আর সে ভিজছিল, শরীরের উষ্ণতাকে ছিবড়ে নিয়েছিল ঢেউ । গন্ধ অনুভব করেছিল , লবণের গন্ধ । অথচ এখন আর সেই গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে না । অজানা হাতের স্পর্শের পরেই সব কিছু  দুম করে কোথায় হারিয়ে গেলো ।  আর ঘুম ভেঙে গেলো সুজাতার ।

চোখ খুলেই বুঝলো আবার একটা স্বপ্ন , জীবনের পঞ্চাশটা বছর পার করার পরেও এই স্বপ্নগুলো তাকে ছেড়ে যায়নি । কবে থেকে শুরু হয়েছিল,সেটা এখন আর মনে করে উঠতে পারে না । প্রথম প্রথম মনে হতো বয়সের দোষ , তারপর সেটা কিভাবে  জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠলো , খেয়াল রাখেনি । উথাল-পাতাল এই জীবনে কখনো ভেঙে পড়েছে, আবার কখনো নতুন উদ্দোমে জেগে উঠেছে  বাঁচার জন্যে । ভাঙা-গড়ার এই দুই মিলনকে সঙ্গে করেই এতোটা বছর পার করেছে সে । থিতু হতে পারে না, একটা ভাঙা পথ পার হবার পরেই , কিছুটা শান্তির রাস্তা, তারপর আবার সেই ভাঙা পথ । আর ওই ভাঙা পথেই সে আবিষ্কার করে জীবনের নতুন নতুন বোধের অধ্যায় ।




(২)


দ্রুত বর্ধনশীল শহর এটা । যারা দু’মাস আগে শহরটাকে দেখে গেছে । আজ এলে চিনবে না অনেক কিছুই । এই শহরেই সুজাতার জন্ম ও বসবাস । নানা ভাষাভাষী, নানা ধর্ম, নানা জাত । একটা পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর এটা । অফিস থেকে বেরিয়েই আজ আর রিক্সা ধরলো না । রাতের স্বপ্নটাকে ভুলতে পারেনি সে এখনো । স্বপ্ন আগেও দেখেছে, কিন্তু কালকের স্বপ্নের ভয়াবহতা যেন এতদিনের সব স্বপ্নকে ছাপিয়ে গেছে । একটা ক্লান্তি । চোখে মুখে । শরীরে ও মনে । তবু হাঁটা পথে । কিছুটা এগোতেই মুখোমুখি সুবল । হতচকিয়ে গেলেও সামলে নিতে সময় লাগলো না সুজাতার । সুবল, কলেজ লাইভের পরিচিত একটা নাম, বখাটে ছেলে হিসাবে পরিচিত । ভোটে ভাড়া খাটা লোকজনদের একজন । থমকে দাঁড়ায় সুজাতা , সুবলকে কিন্তু একদম অচেনা লাগছে । পরনে দামী সুট । হাতে দামি সিগারেট । ঝাঁ চকচকে সানগ্লাস । হাতের চাবি দেখেই বোঝা যায় , ওটা কোন দামী গাড়ীর চাবি ।
কিরে কি খবর তোর ।
এই তো, তোর খবর কি ? একদম চেনা যাচ্ছে না ।
মুচকি হাসে সুবল । কিছু না বলে ফুটপাতের দিকটার দিকে ইশারা করে ।  যেখানে মানুষ জনের যাতায়াত কম । সুজাতা ইশারায় সারা দেয় ।
তা বেশ তো বড়লোকের মতো লাগছে দেখতে ।
শুধু লাগছে, বড়োলোক মনে হচ্ছে না?
সুবলের এই  রকম জবাবের জন্যে প্রস্তুত ছিল না সুজাতা । সুবল বললো, “চল, সামনে একটা কাফে আছে, ওখানে গিয়ে বসি, অনেকদিন পরে দেখা, তাড়াহুড়ো নেই নিশ্চয় ?”

কিসের আর তাড়াহুড়ো, এই অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি ।

রাজনীতির ভাড়াটে গুণ্ডা , আজ কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে না ।  ইলেকশনে যার মারুতি ভ্যানে বোঝাই থাকতো বোমা ও বারুদ । অবশ্য পার্টি অফিসের  নির্দেশ ছাড়া বোমা বারুদের  ব্যবহারে কোন অনুমতি ছিল না  । তাই  বিয়ারের বোতল নিয়ে এদিক ওদিক টহল দিতে দেখা যেতো সুবলকে । আশির দশকের পরের কথা । এতো কিছু একদিনে জানেনি সুজাতা । দাদার দলের ভাড়া খাটাতো সুবল । বাড়িতে যাতায়াত অবাধ । ধীরে ধীরে বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল । সেই সুবল এখন সুজাতার মুখোমুখি । সুবলের থেকেই ইলেকশনের গল্পগুলো শোনা । বেশ রসিয়ে ও গর্বের সঙ্গে বলতো  । কতটা সত্যি , সেটা অবশ্য প্রশ্নাতীত । তবে সত্যের যে একটা আভাস আছে, সেটা বুঝেছিল সেদিন । যেদিন প্রথম বুথে বোমা পড়লো । যার নায়ক বা খল-নায়ক ছিল সুবল ।

একটা ফাঁকা  টেবিল দেখে ওরা বসে পড়লো । কিছু অর্ডার করার আগেই, সুজাতা বললো,’এখানে ভালো কাটলেট পাওয়া যায়, ফিস কাটলেট ।’ কথা শেষ হতেই অর্ডার দিল ফিস কাটলেটের । এটা একটা দারুণ স্বভাব সুবলের । কোন কিছুতেই দেরি না।  সুবলের মতো ভাড়াটেদের পার্টির মেম্বারশিপ দেওয়া হতো না । শুধু খেপ খাটার জন্যে নেওয়া হতো ।

তোকে কিন্তু একদম অন্য রকম লাগছে, কি হয়েছে ? সামনে থেকেও মনে হচ্ছে কতো দূরে বসে আছিস। কোন প্রবলেম? ‘
সুবলের কথাতে সুজাতার চিন্তায় খেদ পরে, নিজেকে সামলে, “ না তেমন কিছু না । কিছু স্মৃতি মাথার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, ঠিক মেলাতে পারছি না।” কথাগুলো শুনে হোহো করে হেসে ওঠে সুবল । হাসতে হাসতে বলতে থাকে,”তুই বা তোর বাবা দুজনের কেউ ঠিক চেঞ্জ হলি না । তোর বাবা, যেদিন পার্টি ক্ষমতায় এলো, তারপরই পার্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। মাইরি তোর বাবা একটা ছিল বটে । ওই রকম ভাবতেও ভয় করে ।”


সেই জন্যেই তো আজকের এই অবস্থা, ভালো নতুন প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিলো, যাতে কোন প্রশ্ন না হয় । বাবার মতো বুড়োরা অনেক আগেই বুঝেছিল পার্টির এই পরিণতির কথা ।
এখনো তো বুড়োরাই পার্টিটাকে চালাচ্ছে ।
উপায় কি বল, ধান্ধাবাজগুলো দল-পরিবর্তন করেছে । বাকিরা এখন বউকে নিয়ে শপিং মলে লাইনে দাঁড়িয়েছে । আর বুড়োগুলো চেয়ারের লোভ এখনো ছাড়তে পারেনি।
তা যা বলেছিস ।
কিন্তু তোর এই পরিবর্তন কি করে, লটারী পেলি নাকি ?
সুজাতার এই রকম প্রশ্ন করবে যেন সুবল জানতোই । যেই প্রশ্ন সেই উত্তর । “ উত্তর খুব সহজ ! ঠিকাদারি আর সিন্ডিকেট । আর এখন তো জমানা পাল্টে গেছে । আগের মতো রাখঢাক নেই যারা তোর বাবাদের পার্টির হয়ে কাজ করতো, এখন সবাই সবুজে মিশেছে । তা তুই আবার বিয়ে করলি না কেন ?’

ধুর একবার বিয়ে করে যা দেখলাম, আবার সে সব কিছু দেখার ইচ্ছে নেই’
সবাই কি আর এক রকম হয় নাকি ?’
কে জানে , তবে ভয়টা তো একই রকম থেকে যায় ।
সেটা ঠিকই, তবে এগোতে হয় সব সময়, কোন কিছুই তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না ।
বাবা বেশ দার্শনিক হয়ে উঠেছিস দেখছি ।
দার্শনিকের কি আছে, এটা স্বাভাবিক কথা । সবাই জানে ।
তবে যাই বল, তোর কিন্তু ব্যাপক চেঞ্জ হয়েছে । যদিও অনেকদিন পরে দেখা, অনেকদিন মানে বেশ কিছু বছর পরে দেখা । তুই না চিনলে আমাকে , তোকে কিন্তু চিনতে অসুবিধা হতো আমার।
খুব কি চেঞ্জ হয়েছি ? আগের থেকে একটু মোটা হয়ে গেছি, এই যা ।
সেটা তো হয়েছি, তবে গ্লামারটা বেশ বেড়েছে, বউ ছেলে মেয়ে কেমন আছে ।
আছে, একদম ঠিকঠাক । একটাই ছেলে । স্কুলে পড়ে । ক্লাস সিক্সে । রাঘবদা তো এখন দিল্লীতে?
হা, সেই যে গেছে আর এমুখো হয়নি ।
বাড়িটা তো একদম প্রায় ফাঁকা তোদের ।
বাড়ি আর কোথায় ? এখন তো ফ্ল্যাট হয়ে গেছে ।
ও হা, আমিই ভুলে গেছিলাম ।
হা, কাকা ও কাকীমা, মাঝে মাঝে কাকার মেয়ে জামাই এসে থাকে । আর আমি তো একা । মেয়েটিকে হোস্টেলে দিয়ে রেখেছি । এখানে থাকলে আমিও সময় দিতে পারছিলাম না ঠিক করে । আর জানিস তো এখনকার ছেলে মেয়ে , চোখে চোখে না রাখলে কি থেকে কি করবে ঠিক নেই । হোস্টেলে একটা গাইডেন্স এর মধ্যে থাকে । খরচটা একটু বেশি ,এই যা ।
এক দিকে ভালো করেছিস । তবে ওই আর কি ছেলেমেয়েরা কাছে থাকলে আলাদা সুখ হয় ।
কি  করা যাবে, সবার তো সব সুখ জোটে না ।
এবার উঠবো রে । আমার ফোন নাম্বারটা নিতে পারিস ইচ্ছে করলে ।
হা দে, যদি কোন দরকার হয় ফোন করে জ্বালাতে পারবো ।
তোর নাম্বারটা বল, আমি মিস কল দিচ্ছি ।

দু’জনে বাইরে এসে দাঁড়ালো । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সুজাতা হাঁটা দিল বাড়ির দিকে, সুবল চলে গেলো অন্যদিকে ।  সুবলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনটা একটু অন্য রকম হয়েছে । গুমোট ভাবটা এখন আর নেই । মাঝে মাঝে ভৌতিক মনে হয় নিজেকে সুজাতার । অনেক স্বপ্নতত্বের বই পড়েছে , অনেক কিছু পেয়েছে , কিন্তু এই ভৌতিক স্বপ্নের কোন খোঁজ পায়নি । এখনো খুঁজে বেড়ায় । স্বপ্নতত্বের কোন বই পেলেই হলো । মাঝে মাঝে বইপাড়াতে যায়, শুধু স্বপ্নতত্বে বইয়ের খোঁজে । নতুন পুরনো যা জোটে কিনে ফেলে । এটা যেন অভ্যাস হয়ে গেছে এক প্রকার । মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো থেকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড শুরু করে ওয়াং চং, হিপোক্রেটস কেউ বাদ নেই, আরো কত নাম, মনেও থাকে না । অথচ কোন কিনারা পেলো না কোথাও  আজো ।

অফিসে যাবার সময় কাকিমা বলেছিল আজ বুল্টি আসবে । বুল্টি মানে কাকিমার মেয়ে । পড়াশুনায় ভীষণ ভালো ছিল । বি টেক করে বেঙ্গালুরে চাকিরও পেয়েছিল । কিন্তু যাওয়া হয়নি । যা হয় মধ্যবিত্ত পরিবারে, এখন বিয়ে করে পুরো সংসারি । তালা খুলতে খুলতে বুল্টি এসে হাজির ।

দিদি এতো দেরি করলি কেন ?
আরে ফেরার পথে সুবলের সাথে দেখা হয়ে গেলো । তোর মনে আছে সুবলের কথা ।
ওই যে গুন্ডা মতো ছেলেটা , দাদার কাছে খুব আসতো ।
হা , সেই গুন্ডাটা । এখন আর গুন্ডা নেই ।
ছাড় ওর কথা । জানিস কি হয়েছে,শিখাদির অ্যাসিডেন্টে মারা গেছে, মা ও মেয়ে ফিরছিল , দুজনেই স্পটে শেষ ।
কি বলিস রে । মেয়েটি কি সুন্দর দেখতে ছিল । কি দিন কাল পড়েছে রে । কার কখন কি হয় , কেউ বলতে পারে না ।

(৩)

বাড়ির লোকজন দেখেশুনে দিয়েছিল বিয়েটা । তার অনুমতি কেউ নেয়নি । সাত দিনেই বিয়ের দিন পাকা কথা ।  অশেষ বেশ ভালো চাকরি করে । দেখতেও বেশ ভালো । সুজাতা দেখতে মাঝারী ধরণের । খুব সুন্দরী না, তবে খারাপ না । দু’জনকে মানিয়েছিল বেশ । ওই টুকুই, আর কোন মিলছিল না ।  অশেষের বদমেজাজি স্বভাব, তার উপর সন্দেহবাতিক মন এবং টিপিক্যাল স্বার্থপরের মতো স্বভাব । নিজের আমিত্ব ছাড়া কিছু বুঝতো না । এমন ধরণের মানুষ সুজাতা কোনদিন দেখেনি, ছোট থেকে দেখেছে বাবা মাকে কোনদিন অবহেলা করেননি । বিয়ে পর থেকেই অশেষের অবহেলা ভীষণ ভাবে সুজাতাকে আঘাত করতো শুধু রাতের বাতি নিভে যেতেই, উন্মাদ-পশুর  মতো শরীরটা নিয়ে খেলা, আর খেলা শেষ হলেই সব চুপচাপ, ঘুমের মধ্যেই ডুবে যেতো, পাশে যে কেউ আছে, সে দিকে কোন দৃষ্টি থাকতো না। কিছু আগেই যে শরীর নিয়ে পাশবিক ভাবে নাড়াচাড়া করেছে, সেই  শরীরের কোন যে অস্তিত্ব আছে বিছানায়, সেটা অশেষের মনে হতো কিনা জানেনা । সুজাতা জেগে থাকতো । অন্ধকারের দিকে দুচোখ খুলে । মশারির দেওয়াল ভেদ করে চোখটা ছুঁয়ে ফেলতো কংক্রিটের ছাদ । তখন অন্ধকারকে আর অন্ধকার মনে হতো না । সব যেন স্বাভাবিক চোখেই দেখে ফেলা সবকিছু, ঘরের আসবাব,ড্রেসিং টেবিল, আলনা, আয়না, এমন কি টেবিলের উপরে রাখা পেনের স্ট্যান্ড পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যেতো । ফ্যানের ঘূর্ণায়মান দ্রুততা সুজাতার চোখের মতো স্থির হয়ে যেতো ।  কি অদ্ভুত লাগতো । মনে হতো ফ্যানটা আর ঘুরছে না । স্থির হয়ে বাতাস ছুঁড়ে দিচ্ছে সারাটা ঘরে । আর সেই বাতাসে সুজাতার শরীরটা কুঁকড়ে থাকতো বিছানার সঙ্গে । যেন একটা গাছের সব সতেজ ডালা পালার ভিড়ে, সুজাতার শরীর ঝুলে আছে মরা একটা ডালে ।


বিয়েটা ভেঙেছিল ছ’ মাসের মধ্যে । পুরুষ মানুষ যে এতো সন্দেহবাতিক হয় । জানাছিল না সুজাতার । বিয়ের দিন  থেকেই লক্ষ্য করেছিলো । বুঝেছিল সৌমিত্র বসুর কথার মাঝে অশেষ এর তির্যক মন্তব্যে । সৌ্মিত্রও বুঝেছিল ।  কথা না বাড়িয়ে চুপ করে চলে গিয়েছিল । সৌ্মিত্র একদা কম্যুনিস্ট পার্টি তাত্বিক নেতাও এখন পাল্টি খেয়ে যোগ দিয়েছে শাসক দলে । রিলেশনটা ছিল বাবার দিক থেকে । রাজনৈতিক রিলেশন । স্কুল লাইভ থেকেই রাজনীতি করতো সৌ্মিত্র । সময়টা ছিল সত্তরের দশকের শেষ দিকেরটা । বাবাও তখন রাজনীতিতে সক্রিয় । এমার্জেন্সির অন্ধকার থেকে মুক্তির হাওয়া চারিদিকে  । সুজাতা তখন ক্লাস এইটে ।

সৌমিত্রকে নিয়ে কত মন গড়ন কাহিনী দিয়ে দিনের পর দিন অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছে সুজাতা, অশেষের  কাছ  থেকে । বিয়ের দিনে শুধু ছোট্ট একটা ঠাট্টার কারণে । ছ’মাস মুখ বুজেই সব সহ্য করে গেছে। কিন্তু বেশিদিন  পারেনি । একদিন মধ্যরাতেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিল । তারপর আর ফেরেনি । মেয়ে জন্মানোর আগেই ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছিল । বাড়ি ও আত্মীয়-স্বজনরা  বলেছিল যে এটা ঠিক হচ্ছে না । কিন্তু সুজাতা কারো কথা শোনেনি । কারণ সুজাতা বুঝেছিল সন্তানকে বাঁচাতে হলে অশেষের থেকে মুক্তি ছাড়া উপায় নেই ।


বুল্টির ধাক্কায় সুজাতা ফিরে আসে তার অতীত থেকে, কথা বলতে বলতে কখন যে অতীতে তলিয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি ।

(৪)


সব রাতে স্বপ্ন আসে না । কবে আসে বুঝতে পারে না । কিন্তু আসবে । সেটা সুজাতা খুব ভালো করেই জানে । মধ্যরাত অব্দি বুল্টি বকবক করেছে । নিজেও ঘুমাইনি, সুজাতাকেও ঘুমোতে দেয়নি । দুই বোনের এই রাত জেগে খুনসুটি সুজাতার খারাপ লাগে না । ছোটবেলা-কার গল্পগুলো বেশ মনে রেখেছে বুল্টি । তবে একটা নাম যে এখনো বুল্টির মনের মধ্যে গেঁথে আছে, সেটা প্রাণখোলা হাসির মধ্যেও সুজাতা বুঝতে পারে । রূপম ! হা রূপমকে যে এখনো বুল্টি ভুলতে পারেনি, সেটা কাল রাতে আরো ভালো করে বুঝতে পারলো । স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস বুল্টির ভেতর যে কাজ করছিল । সেটা এড়িয়ে যেতে পারেনি । ষোল বছরের বিবাহিত জীবনও সেই ক্ষতটাকে বোজাতে পারেনি । সুজাতা কিছু বলেনি । কারণ কিছু কিছু স্মৃতি আর স্বপ্ন কখনো ভোলা যায় না ।

দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । প্রায় আটটা । সুজাতা বুল্টিকে একটা ধাক্কা দিল । বুল্টি চোখ না খুলেই জবাব দিলো,"ধুর ! ঘুমাতে দে । বাপের বাড়ি এসেছি একটু আরাম করেনি “। কলিং বেজে উঠলো । দরজা খুলেই দেখলো বুল্টি মেয়ে দাঁড়িয়ে । কাল এসেছে, কিন্তু একবারও দেখা হয়নি । দাদু-দিদার সঙ্গেই মেতেছিল । সুজাতাও ভুলে গিয়েছিল মেয়েটির কথা । খুব ভুল হয়ে গেছে । একবার ও ঘরে গিয়ে দেখা করা উচিত ছিল । “কিরে তুলি এতক্ষণ পরে আমাকে মনে পড়লো” ? সুজাতার কথাতে তুলি একটু লজ্জা পেলো, আমতা আমতা কিছু বলতে যাচ্ছিল । সুজাতা সামলে নিয়ে বললো ,”মজা করলাম রে, জানি তো দাদু-দিদা পেলে সবাই অনেক কিছুই ভুলে যায়, আমিও এই রকমই ছিলাম ।” তুলি বেশ মিষ্টি দেখতে, রঙটা একটু চাপা, কিন্তু গঠন খুব ভালো । নাক-চোখ-মুখ কোনখানে একটুও খুঁত নেই । ঘরে ঢুকেই বললো, “মা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি,তাই না”?
-নিজেই দেখে নে ।
-মা এখানে এলেই শুধু ঘুমায় ।
-ও, তাই বুঝি । বাড়িতে ঘুমায় না ।
-বাড়িতে তো ভোর পাঁচটায় উঠে আমাকে আর বাবাকে জ্বালিয়ে খায়, ওঠো ওঠো করে ।
-আজ তুই জ্বালিয়ে মাকে তোল ।
বলেই সুজাতা বাথরুমে ঢুকে পড়লো ।  ধীর সুস্থে বাথ রুম থেকে বেড়িয়ে দেখে মা ও মেয়ে পরস্পরকে জাপ্টে শুয়ে আছে । বেশ সুখ লাগলো দেখে । নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো । অনেকদিন যাওয়া হয়নি । গরমের ছুটির এখনো দু’মাস বাকি ।
-কিরে তুলি, মাকে ওঠাতে এসে দেখি তুইও শুয়ে পড়লি ।
-নাগো মাসি , মা-ই জোর করে জড়িয়ে ধরে শুইয়ে দিলো ।
-বুল্টি ওঠ, বেলা হয়েছে অনেক ।
তুলি বললো,”মাসি আজ আমাকে মলে নিয়ে যাবে । কতদিন মলে যাওয়া হয়নি “।
-ইস একদম পাকা বুড়িদের মতো কথাবার্তা । কেন ওতো মলে যাবার কি হলো ?
-আমার বন্ধুরা তো প্রায় যায় । বাপি শুধু বাড়ন করে । বলে পড়াশুনায় বিঘ্ন ঘটবে ।
-ঠিকই তো বলে তোর বাপি ।
-চলো না আজ আমি, তুমি আর মা , তিন জনে মলে যাই । খুব মজা হবে ।
-হা, চল রে দিদি, আমারও অনেক দিন শপিং করা হয়নি  ।
-সে দেখা যাবে, এখন তো ওঠ ।
-চা বানা আমি উঠছি ।

বিকেলের দিকে তিন জন মিলে রওনা দিলো ভেগামলের দিকে । এটা নাকি শহরে সব থেকে ভালো মল । তুলির ইনফরমেশন । আজকালকার বাচ্চাদের কাছে সব ইনফরমেশন থাকে, বিশেষ করে তুলির বয়সী ছেলে-মেয়েদের কাছে । একটা টোটো ভাড়া করে তিন জনে উঠে  পড়লো । বুল্টি ও তুলি দুজনে কি সব বিষয় নিয়ে খুব কথা বলছে, কথাগুলো কানে আসছে ঠিক, কিন্তু বুঝতে পারছে না । মোড়ের মাথায় আসতেই শিখাদির অ্যাকসিডেন্ট এর কথা মনে পড়লো । তার সঙ্গে জেঠু ও জেঠিমার চেহারা সামনে এসে দাঁড়ালো । ওরাও একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছিল । গাড়িটা প্রায় দুমড়ে মুচড়ে একাকার । তারপর লেগেছিল আগুন । জেঠু ও জেঠিমা ঝলসে গেছিল সেই আগুনে । সেটা দেখে জেঠুর একমাত্র ছেলে পরিতোষদা পাগল হয়ে কোথায় চলে গিয়েছে । কেউ জানে না । দাদা খুব চেষ্টা করেছিল । থানা পুলিস , পার্টির লোকজন । সব কিছু দিয়ে । কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ পায়নি কেউ ।

বুল্টির ধাক্কায় চিন্তায় ছেদ পড়ে সুজাতার । দেখলো টোটো দাঁড়িয়ে পড়েছে । তুলি বললো,”মাসি তোমার কি হয়েছে । সারা রাস্তা একটাও কথা বললে না । একদম গুমোট মেরে বসে থাকলে, তোমার ভালো লাগছে না মলে যেতে “ ।

আরে না না , সে রকম কিছু না । একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম ।

তিন জনে নেমে ভাড়া মিটিয়ে মলে ঢুকে পড়লো । বিশাল মল । গেট দিয়ে ঢুকতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরটাকে হাল্কা করে দিলো । শরীরের সাথে মনটাও বেশ ভালো হয়ে গেলো ।  এর আগেই দেখেছে , মলগুলোতে ঢুকলেই শুধু ঠাণ্ডা হাওয়া না, এক ধরণের মন ভোলানো সুগন্ধ  মন ও শরীরকে বেশ তরতাজা করে দেয় ।

তুলি আর বুল্টি এরই মধ্যে একটা দোকানে ঢুকে পড়েছে । কসমেটিকসের দোকান । সুজাতাও সেদিকে এগোতে থাকে । কিন্তু অনেকটা ভুত দেখার মতো যাকে দেখলো । কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি । সৌমিত্রদা । একদা কম্যুনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা । সে কিনা মলে, বউ বাচ্চা নিয়ে ।   সৌমিত্রকে দেখেই , দোকানে না ঢুকে সেই দিকেই এগিয়ে গেলো ।

কি ব্যাপার তুমি শপিং মলে , সূর্য আজ পূর্ব দিকে উঠেছে তো ।

আর বলিস না । এই তোর বউদি প্রায় ধরে বেঁধে নিয়ে এলো । তা তুই ভালো আছিস তো ? মেয়ে কেমন আছে ?
বউদি কেমন আছো ? মানতে হবে তোমাকে, তুমি খেল দেখিয়ে দিলে। সৌমিত্রদা মলে! শপিং করতে এসেছে সপরিবারে !
পার্টিটা ক্ষমতা থেকে গিয়ে বেঁচেছি । এখন তোর দাদাকে একটু আধটু কাছে পেতে পারি । আগে তো তুই ভালো করেই জানিস । তোকে আর কি বলবো ।


ডিভোর্সের পরে সৌমিত্রকে ধরেই চাকরিটা হয়েছিল । যদিও মন্ত্রী  নিরঞ্জন ভট্টাচার্য্য বলেছিল,  “ আমাদের পার্টিতে ওই রকম কিছু পাইয়ে দেওয়াতে রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখে না,তোকে আর নতুন করে কি বলবো” । সৌমিত্রদা  এখন অনেকটা ঝিমিয়ে গেছে । দলবদল করে কি লাভ হয়েছে, কে জানে ? কিছু তো হয়েছে ! নাহলে ছাড়বেই বা কেন ? ক্ষমতার লোভ ? কে জানে ? তবে কানাঘুষোতে শুনেছিল, কি সব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিল । লোক মুখে শুনেছে দলবদল না করলে হয়তো জেল হয়ে যেতো  । পুরোটা জানে না, লাল পার্টি তো , রেখে ঢেকে চলে । বাবাকেও তো দেখেছে । যখন কোন সিরিয়াস মিটিং হতো , দরজার খিল বন্ধ থাকতো , ভেতর থেকে ডাক না এলে কারো ওই মিটিং এর ঘরে ঢোকার ক্ষমতা ছিল না ।


একটু বুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখেছে বাবাকে এই পার্টি জন্যে দিন রাত এক করে দিতে । দিনের পর দিন বাবার দেখা পেতো না । এমার্জেন্সী চলছে তখন । মায়ের মুখ ভয়ে শুকিয়ে থাকতো সব সময় । দাদা তখন সবে ফুল প্যান্ট পড়তে শুরু করেছে । পাড়ায় মাঝে মধ্যেই বোমাবাজি লেগেই থাকতো । রাতে ঘুম ভেঙে যেতো বাইরেই লোকের চিৎকারে । পরের দিন উঠে শুনতো , কেউ মার্ডার হয়েছে । অথবা কারো হাত কেটে নিয়েছে রাম-দা এর কোপে । কথাগুলো ঠিক মতো করে  বুঝতো না, কিন্তু একটা ভয়ের অনুভব মন শরীরকে হিম করে দিতো । কিন্তু কি অদ্ভুত সাতাত্তরে পার্টি ক্ষমতা আসার পর থেকে বাবা কেমন নিজে সরিয়ে নিল পার্টি থেকে । এমনকি মেম্বারশিপ পর্যন্ত রিনিউ করালো না । পার্টি বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও কোন রাখঢাক করতেন না । বার বার একটাই কথা বলতে শুনেছে,”ক্ষমতার লোভ এই পার্টিকে ডুবিয়ে ছাড়বে “ ।


(৫)

তুলিরা চলে যেতেই , পুরো একা । বুল্টিদের গাড়িতে তুলে দিয়ে সুজাতা নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লো । ফ্ল্যাটটা বেশ বড়ো । সে একা । কিনতে হয়নি । বাড়িটা ঠিকাদারকে দিয়ে দাদা থাকাকালীনই বানিয়েছে । সুজাতা একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে । সেটাতে সে থাকে । অনেকেই চাপ দিয়েছিল আবার বিয়ে করার জন্যে । সুজাতা কারো কথা শোনেনি । একটু অগোছালো সুজাতা । কিন্তু আজ দেখে কেউ বলতে পারবে না । বুল্টি সারাদিন একটু একটু করে পুরো ঘরটা গুছিয়ে ফেলেছে । রাতে আজ আর কিছু খাবে না । মলে হাবিজাবি অনেক কিছু খাওয়া হয়ে গেছে । দুপুরেও বেশ রান্না করেছিল বুল্টি । খাবারগুলো ফ্রিজে রাখা আছে । এখন কোন কাজ নেই সুজাতার । টিভিটা চালিয়ে সোফাতেই আধশোয়া হয়ে দেখতে লাগলো । টিভি দেখতে দেখতে সুজাতার চোখ ঘুমে বুজে আসছে । সুজাতা হারিয়ে যাচ্ছে ঘুমের দেশে । ঘুমের গাঢ়তার সঙ্গে সুজাতার চোখ খুলে গেলো অন্য এক জগতে । চোখ খুলেই সে দেখতে পেলো ,তাকে ঘিরে আছে অনেক সাপ ।  চারিদিকে কিলবিল নানা জাতের সাপেদের দল । সুজাতা দেখলো সে পুরো নগ্ন । সেই নগ্ন শরীরের উপর সাপগুলো খেলা করছে । তার চামড়ার রঙ পালটে গেছে । সাপগুলোর মতোই তার শরীরটাও কেমন যেন আঁশটে খোলে জড়িয়ে আছে । ছোট বেলায় যে সব সাপের গল্প শুনেছিল বা বড়ো হয়েও দেখেছে টিভিতে, এই গুলো সে রকম না । কেমন যেন । লিকলিকে । চোখগুলো যেন ফেটে বেড়িয়ে আসছে মাথা থেকে । ওদের শরীর থেকে কেমন যেন একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে । সুজাতা বুঝতে পারছে না, সে আসলে কোথায় ? চারিদিকে শুধু সাপ আর সাপ । কিছু সাপ অবশ্য বেশ বড়ো , কেমন যেন খুনখার এর মতো লাগছে দেখতে । কিন্তু কামড়াচ্ছে না । গিলেও খাচ্ছে না  । শুধু চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে । মনে হচ্ছে এটা কোন সাপেদের দেশ ! সাপের দেশের গল্পটা মনে পড়লো । ঠাকুর্মা শুনিয়েছিল । কি যেন ছিল । কি যেন , ধুর শুধু গল্পের কথাটাই মনে পড়লো । কিন্তু গল্পটা মনে পড়লো না । কি যেন ছিল ? ভাবতে ভাবতে চোখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেখতে পেলো, কেউ শুয়ে আছে  । কে ? চেনা চেনা লাগছে । পুরুষই তো মনে হচ্ছে । হা একজন পুরুষ । মুখটা দেখা যাচ্ছে না । সুজাতার মতো নগ্ন সেই পুরুষ । কিন্তু মুখটা ঢাকা । সাপের খোলসে । পরিচিত কেউ কি ? কে জানে ? একবার ডাকার চেষ্টা করলো । এমা একি ? গলার স্বর কি অদ্ভুত । মানুষের আওয়াজ তো না । কিসের আওয়াজ বেরোচ্ছে । নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না । সাপগুলো বেশ মজা করে সুজাতার শরীরের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । নগ্ন শরীরের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সাপেদের দল । স্পর্শ করছে সুজাতার নগ্নতাকে । কিন্তু কোন অনুভব নেই । শুধু ঠাণ্ডার আমেজ । কোনো ক্লান্তি নেই । ওই পুরুষটাও সুজাতাকে দেখছে না । চোখ বন্ধ না খোলা । কিছুই বুঝতে বা দেখতে পারছে না । একবার মনে হলো উঠে দেখা যাক । কিন্তু উঠতে পারছে না । ঠাণ্ডার আবেশে নিথর পাথরের মতো শুধু চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই সুজাতার ইচ্ছেতে ধরা দিচ্ছে না । লজ্জা । অহংকার । ঘৃণা । ভয় । যন্ত্রণা । রাগ । অভিমান, । বিদ্বেষ ।  কিছু নেই  আজ আর সুজাতার মনে । নতুন এক মানুষ আজ সে সাপেদের দেশে ।
...
...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন