সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

তনুশ্রী পালের গল্প : মাইকেল হেমব্রম




-ঝুমা,বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখলাম বাজারে। বুঝলে। বেশ র‍্যালা আছে।
- অ। কিকরে বুঝলে খুব র‍্যালা।
- বোঝা যায় বোঝা যায়। অন্য টাইপের মহিলা।
- কিরকম। সকাল সকাল তাঁকে নিয়ে এত কথা! ব্যাপারটা কি বিতানবাবু
- সঙ্গে ড্রাইভার নিয়ে গেছে। ঝপাঝপ বাজার করছে। বেশ দরদাম করে।
 - ভালই ত। তাতে তোমার সমস্যা কী? আজ রোববারের বাজার। আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাও রান্নাঘরে। প্রচুর কাজ। বাথরুম-টাথরুম সব পরিস্কার করার আছে। বুবলুকে সাঁতারে নিয়ে যাওয়া আছে। ওর হোমটাস্কগুলো আছে। জামাকাপড় প্রেস করা আছে। সারা সপ্তাহে তো সময়ই পাইনা। অফিস-বাড়ি করেই দম শেষ।
- চিকেন আমি রান্না করে দিচ্ছি। চিন্তা নাই। কিন্তু কি বল তো
- আবার সেই বাড়িওয়ালার মেয়ে ? কেন ? এই বাড়িটাও যথেষ্ট ভাল। বাড়িওয়ালাও ভাল। সামনে কি সুন্দর বাগান। ওনার নাতনিদের সঙ্গে বুবলুর খুব ভাব হয়েছে ওরা খেলে একসঙ্গে। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলেও মাসিমা খেয়াল রাখেন। আমার তো খুব ভাল লাগে ওদের সবাইকে।
- সেসব তো ঠিকই আছে ; আমি অস্বীকার করছিনা। হার্ট অব দা টাউন এত বড় এত সুন্দর সব সুবিধাযুক্ত বাড়ি। বাজার, হাট, বাসস্টপ সব কাছে।  না সেসব ঠিক আছে। তবে ওই তোমার ম্যাডামের  ভাবভঙ্গী কেমন যেন মানে অন্যরকম।
- বাবা! তুমি গবেষণা করছ নাকি শমিতাকে নিয়ে? লাইন টাইন লাগিয়েছিলে নাকি? পাত্তাটাত্তা দেয়নি, ক্ষুব্ধ হয়ে আছ। হুমম তাই ? নাকি সেই তোমায় চোখ-টোখ মেরে ইশারা করেছে? কেষ্টঠাকুরের মতো চেহারা তো তোমার আছেই। তাই না?  
- আরে না রে বাবা। অত হাঁদা ভেব না। ছেলের ক্লাসটিচারের সঙ্গে ইন্টুমিন্টু হুঃ! কি যে বুদ্ধি তোমার। গবেষণা বললে না হুমম সেটা করতে একটু বাধ্য হচ্ছি।
- কেন গো? একটু আস্তে কথা বল। বুবলু শুনতে পাবে।
 বাজার গোছাতে গোছাতে কৌতূহলী হয়ে ওঠে ঝুমা। ভারি অবাকও হয়। শমিতাকে বেশ ভালই লাগে ওর। খুব একটিভ মেয়ে। চেহারা দেখে বয়স বোঝা যায়না মোটে, সুন্দরী না হলেও বেশ আলগা চটক আছে। মুখে সবসময় একটু হাসি লেগে থাকে।
  - শুনেছি বিয়ে হয়েছে তো বাপেরবাড়ি পড়ে থাকা কেন? চুলটুল কাটা মেয়েরা একটু খিটকেল টাইপের    হয়। বিয়ের কোনও চিহ্ণই তো নেই সাজসজ্জায়... ডিভোর্সি নাকী ? কই বরটরকে আসতে তো দেখিনা। কিন্তু.... 
- বাবা! তুমি দেখছি শরৎচন্দ্রের যুগের গ্রামের মোড়লের মতো কথাবার্তা বলতে শুরু করলে। ওর বর তো শুনেছি বীরপাড়ার ওদিকে কোন চাবাগানের যেন ম্যানেজার। ওখান থেকে স্কুলটুল করার মেলা অসুবিধে। এখানে বাচ্চারা পড়ে, ও নিজে চাকরি করে, বুড়ো মা বাবাকে দেখাশোনা করে। অসুবিধেটা কী?
- সেসব ঠিক আছে। কিন্তু
- শোন, অকারণে অন্যের বিষয়ে ভাবা টাবাগুলো কমাও। বুবলুর ক্লাসটিচার শমিতা ভুলে যেওনা। এমন কোনও ব্যবহার কোরোনা বাপু যাতে অসন্তুষ্ট হয়। মা-বাবার একটামাত্র মেয়ে থাকতেই পারে বাবার বাড়িতে।তোমার অসুবিধে হচ্ছে কেন? এখানে  বাড়ির কাছে স্কুল, দিব্যি স্কুটিতে দুইমেয়ে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে।
- সে তো ভাল কথা, কিন্তু ওর বরটর আসেনা এখানে? আমি ওকে সেদিন বিগবাজারের ওখানে দেখলাম, লালরঙের একটা জিপসি গাড়িতে উঠল। টুপি পরা একটা লোক ড্রাইভারের সিটে। অন্যসময় তোমার শমিতা দেখা হলে হাসে নয়ত কথা বলে, সেদিন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। আরেকদিনও দেখেছিলাম সিনেপ্লেক্স থেকে বেরোচ্ছে সঙ্গে সেই টুপিওয়ালা।
- বন্ধু টন্ধু হতে পারে। যাকগে আমাদের কী ? আমিও দেখেছি একদিন একটা জিপসিগাড়ি ওকে বাড়ির স্যামনে নামিয়ে দিয়ে গেল। প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা, ওনার পছন্দ মতোই চলবেন, আমাদের এত ভাবার কিআছে বল? বাদ দেও, তুমি আজ বিকেলে সাঁতারে নিয়ে যেও বুবলুকে। প্লিজ, পরে ক্লাবে যেও।

মুখে একথা বললেও, ঝুমার মনের কোনেও শমিতাকে নিয়ে কৌতূহলের মেঘ জমে। আর হঠাৎ বড়দিনের বিকেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায় ঝুমা-বিতান। ২৫শে ডিসেম্বরে সারাদিন খুব ঘুরে বেড়ায় ওরা। " দি লায়ন কিং' সিনেমাটা দেখে শুধু বুবলু নয় ওর মা বাবাও খুশি। তারপর প্রিয় রেস্তোরাঁ "বাদশা'র বিখ্যাত বিরিয়ানি খাওয়া হল। শেষে অন্যবারের মতোই "মাইকেল এঞ্জেল' চার্চে যায়, মোম জ্বালে বাইরের বেদিতে। ভেতরে গিয়ে খানিক বসে, বসে থাকতে ভাল লাগে ঝুমার কিন্তু ছেলে ছটফট করে বাড়ি যাবে। ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজছে, নদীর ওইপারে বিকেলের আকাশে মায়াবী রঙের আলো ছড়িয়ে সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে। তখনি মুখোমুখি হয়ে যায় শমিতা ওর দুইমেয়ে টিনা নিনা আর টুপিওয়ালা শক্তপোক্ত চেহারার লোকটির সঙ্গে। ওরা চার্চের ফাদারের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসছিল। শমিতা একটু হেসে আলাপ করিয়ে দেয় টুপিওয়ালা আদিবাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে ," ঝুমাবৌদি বিতানদা মিট মাই হাজবেন্ড মাইকেল, মাইকেল হেমব্রম। উনি টিনা নিনার ড্যাডি। মধুবাড়ি চা বাগানে আছেন। বাবা আগে ওই বাগানেই ডাক্তার ছিলেন, মাইকেল ওনারা বাবার টেন্যান্ট। ঝুমাবৌদি আর বিতানদা।' ভদ্রলোক মিষ্টি করে হেসে হাত বাড়িয়ে দেন বিতানের দিকে, হ্যান্ডশ্যাক করেন। ঝুমার দিকে চেয়ে বলেন " নমস্কার দিদি।' শমিতা ঝুমাকে একটু কাছে টেনে নিচু গলায় বলে, " মা ওকে পছন্দ করেনি প্রথমে তাই ও আমাদের বাড়িতে আসেনা। তবে শহরে আসে প্রতি সপ্তাহে।' শমিতা ঝুমাকে একটু কাছে টেনে নিচু গলায় বলে, ' মা-বাবা ওকে পছন্দ করেননা তাই ও আমাদের বাড়িতে আসেনা বৌদি। যদিও ছোটবেলা থেকেই মাইকেল আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশুনো করেছে। টি ম্যানেজমেন্ট কোর্স করে এসেছে আমার বাবার উৎসাহেই। ' একসঙ্গে অনেক কথা বলে  ফেলে শমিতা।খানিক চুপ করে থেকে একটু হেসে আবার বলে ওঠে ' একদম ছোট্টবেলার বন্ধু আমরা। ও শহরে আসে প্রতি সপ্তাহে, ছুটিতেও আমরা বাগানে চলে যাই।' কেমন একটু থতমত খেয়ে যায় ঝুমা আর বিতান! যেমন ওদের বিয়ে নিয়ে শমিতার আত্মীয় পরিজন, প্রতিবেশী, বন্ধু,কলিগ সবাই কি যেন এক অজানা কারণে থতমত খেয়েই আছে বিগত দশটি বছর ধরে!





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন