সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২০

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরীর অণুগল্প : যুগসন্ধি


 
লাট্টু খেলার জিনিসগুলো গুছিয়ে রেখে গল্প শুনতে গেল বিলিদের বাড়িতে । লাট্টুর দাদু অর্থাৎ মধু বাবু বসে ছিলেন ওদের মাটির ঘরের বারান্দায়। এখানে দেওয়ালের গায়ে কত  ছবি আঁকা, সব এঁকেছে লাট্টু। একটা এরোপ্লেন, একটা টিভি, একটা কারখানা । আরও যে কত কিছু! অথচ এসব কোনও দিন দেখেনি ও। সেই কবে পাওয়ার গ্রীড গুলো বসে গেলো একে একে । মানুষই থাকলো না বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার। এয়ারপোর্টে খেলনার মতো পড়ে আছে জং ধরা এরোপ্লেন । কারখানাগুলো একে একে  বন্ধ হয়ে গেল । মোবাইল কম্পিউটার সব হারিয়ে গেল কেমন করে। এক অতি উন্নত সভ্যতাকে চোখের সামনে মধুবাবু দেখলেন পাঁচ হাজার বছর পেছনে চলে যেতে। অথচ উনি কিছুই লিখতে পারলেন না। এক সময় কত সাহিত্য আসরে গেছেন !  কত লেখা বই হয়ে বেরিয়েছে, এমনকি অনলাইনেও --।  আর এখন!  ভাবতেই পারেন না লেখার কথা। কাগজ নাই,কলম নাই। সব কেমন এক ঝটকায় " নাই"  হয়ে গেল।  একটা মহামারী ----।

কি মনে হল , আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন মধু বাবু। ঘরের  বাঁশের দরজাটা বন্ধ করতে করতে বিরবির করছিলেন। কে ভেবেছিল একদিন গর্বের প্রতীক ওই উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যাবে আর সব ছেড়ে চলে আসতে হবে এই মাটি দিয়ে তৈরি কলোনিতে। পাহাড়ের গায়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিয়ে তৈরি এই সরকারি ক্যাম্প!

  মধুবাবু বিলিদের ঘরের সামনে পা রাখলেন। দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেছে, হাল্কা ঠান্ডার রেশ ছড়াতে শুরু করেছে। বিলির ঠাকুমা গল্পের ঝুলি খুলে বসেছেন, ওকে ঘিরে কলোনির সব বাচ্চারা। অবশ্য কটাই বা বাচ্চা আছে আর এখানে! বড়জোর  বারো কি পনেরো! কয়েকটা বউ আর পুরুষ মানুষকেও দেখা গেলো অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে বিলির ঠাকুমার গল্প শুনছে। ঠাকুমা বলছেন ----- তখন আনন্দ ফোন করে মিস্টার রায়কে  বলল, আমি আর আপনার প্রাইভেট কলেজে পড়াতে পারব না। এবার থেকে আমি বিনা পয়সায় গরিব ছেলে মেয়েদের পড়াব। বলেই রয়াল এনফিল্ড স্টার্ট করল। এটা একটা সিনেমার গল্প, মধুবাবু দেখেছিলেন।

   আজ লাট্টু বাড়ি ফিরে  নিশ্চয় স্মার্ট ফোনের ছবি আঁকবে, বাইকের ছবি আঁকবে। চোখে জল চলে এল। হঠাৎ কি মনে হতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ।  তিনি জানেন না কবে সব আগের মতো হবে, কতদিন! দশ  বছর নাকি দশ হাজার বছর। এই বিগত সভ্যতার কোনও কিছু কি আর অবশিষ্ট থাকবে তখন! এমন কি কোনও স্মৃতিও হয়তো ---। তার আগে ওনাকে লিখে রাখতে হবে সব। কোথায় জানেন না, কিভাবে জানেন না কিন্তু উনি লিখে রাখবেন বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ইতিহাস। না হলে তখন কেউ আর বিশ্বাস করবে না আমরা একটা অতি উন্নত সভ্যতার যুগ পার করে স্থাপন করেছিলাম অন্য একটি শিশু সভ্যতা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন