রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

সুবল দত্তের গল্প : চুমকির প্রতিশোধ




                               
গা গসগস করে।চতুর্দিকে ঝমঝম ঘুঙুরের মতো ঝিঁঝিঁপোকার আওয়াজ।শব্দ তো নয় ! যেন বেশ কয়েক জন নানান ভাষায় কথা বলছে।  অথচ কেউ কোথ্থাও নেই। কিন্তু ভয় করছে না ,কেমন যেন ভাল লাগা আমেজ। ইংরেজি,হিন্দী সাঁওতালিতে কথাবার্তা  পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে মুখ খুললেই যে কোনও ভাষায় কথা বেরবে। চুমকির আপনা থেকেই হাসি উথলে ওঠে।  ফিক ফিক করে হাসতে থাকে।ভিতর থেকে একটা প্রতিবাদ উঠে আসছে বটে কিন্তু আরেকটা মন হাসিতে সায় দেয় । কবে যে গাঁ থেকে এদের এখানে কাজ করতে এসেছে,তার মনে নেই,কিন্তু এখানে এসে যে হাসি ভুলে গেছে তা সে এখন বুঝতে পারছে । পাশের রুম থেকে মালিক সিনহাজির দাহাড় (গর্জন)। এ রকম ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। দু চার ঘা এবং রাতের খাওয়া বন্ধ। চুমকি কিন্তু আপন মনে। চোখের সামনে নির্জন ঘন সবুজ। যেন  নিস্তরঙ্গ জলাশয়ের গভীরে প্রতিটি জিনিষ, নিখুত চোখে ভাসছে । সারা গায়ে খুশির মোচড়, চোখে নেশা,কুছ পরওয়া নেই ভাব।
অথচ মন পুরোপুরি নিজের।পরিষ্কার মনে পড়ছে পুরোনো কথা। গুমলা থেকে বোলেরোতে চেপে ফিরছিল । ফিরতি পথে ঘন নির্জন পাহাড়ী জঙ্গলের ধারে গাড়ী দাঁড়ালো । চুমকি দেখল সেখানে যত দূর চোখ যায়  বনখেজুর আর  তুলসীর ঝোপ। রঙিন প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। সিনহাজি মদমত্ত হয়ে বেছে বেছে তুলসী ঝোপের উপর চুমকির সামনেই পেচ্ছাপ করল। মালকিন একটু মৃদু আপত্তি করেছিল। তুলসী গাছ বলে কথা,অন্তত অন্যের ভক্তি ভাবনাকে সন্মান করা উচিত্,তা ছাড়া ঝি মেয়েটাও বড় হয়েছে। এই কথা বলে মালকিন দু হাত জোড়  করে প্রণাম করল আর চুমকিকে জল দিয়ে তুলসী ঝোপটা ধুয়ে দিতে আদেশ করল। তারপর লুচি তরকারি চিকেন বার করে একটু দূরে শতরঞ্জি বিছিয়ে দুজন খেতে বসল, চুমকিকে পেচ্ছাপ করা জায়গাতেই দুটো বাসী রুটি আর একটু আচার কাগজে মুড়ে রেখে দিল। রোজকার মতন ব্যাপার,চুমকি খুব একটা আমল দিল না। প্লাস্টিকের  জলের বোতল দিয়ে তুলসী গাছটা ধুতে গিয়ে দেখল,ঝোপের ভিতরে টেনিস বলের মতো কিছু আটকে রয়েছে। তুলতে গিয়ে দেখে ছোট্টো এক শিশুর মুখ। এত সুন্দর এত সুন্দর...। তারপর চুমকির আর কিছু মনে নেই।

-কা রে চুমকিয়া? বইঠে রহেগী কা? আটা গুঁথনা হ্যায় কী নাহি?
পাশের রুম থেকে মালকিনের বাজখাই আওয়াজ।সিন্হাজি এসে নরম করে বলল
-উঠ। বসে থাকলে হবে?আটা মাখ,রুটি তরকারি কর,পরশুর বাসনগুলো মাজ,ঘরে ঝাড়ু লাগা,আমার জামাকাপড়গুলো ইস্ত্রী কর,কাল আবার অফিস আছে। বিছানা ঠিক কর। টায়ার্ড লাগছে,শোব।
চুমকির সেই ঘোর লাগা চোখে হাসতে থাকা আর মৃদু মৃদু দুলতে থাকা। সিনহাজি একটু ঝুঁকে কাঁধ ধরে নাড়া দিলো।
-কিরে কথাটা কানে যাচ্ছে না?
চুমকি সেই একইরকম।চুমকির চোখে মাদকতা দেখে সিহ্নাজী এবার একটু অসভ্যতা করলো। এ কাজটা বছরটেক হল মাঝে মাঝেই করে, চুমকি ওর হাত সরিয়ে নিলোনা। সিহ্নাজীর অসভ্যতা আর একটু বাড়ল। আর একটু আর একটু আর একটু আর একটু....আঃ বুড়িটা সমানে চিত্কার করে যাচ্ছে পাশের রুমটা থেকে। দরজাটা খিল দিয়ে আসি। এই ভেবে সিহ্নাজী  উঠে দাঁড়াতে যাবে এমন সময় কানে একটা  মর্মান্তিক ফটাস শব্দ। আঘাত ও আওয়াজটা কোথা থেকে এলো,ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে যেতেই ঘাড়ে প্রচণ্ড যন্ত্রনা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় নিচু করে এমন একটা দৃশ্য সিহ্নাজি জীবনে কখনো দেখেনি এখন দেখত  পেল, তা হল নিজেরই  পিঠ পাছা আর গোড়ালি।জ্ঞান হারানোর আগে কানের কাছে অসংখ্য চুমকির ফিস ফিসানি... বিহেভ ইওর সেলফ বিহেভ ইওর সেলফ বিহেভ ইওর সেলফ বিহেভ ইওর সেলফ বিহেভ ইওর সেলফ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন