রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

গৌতম দে'র গল্প : সাদাকালো ডোরা


ব্যস্ত সময়। একেবারে জিকজ্যাক প্রাইম টাইম। সবুজবাতি জ্বলছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই জ্বলবে হলুদবাতি। তারপর লালবাতি। তারপর নদীর স্রোতের মতো চলমান পাবলিক।

আমি সবার পিছনে। পিছন মানে পোঁদ। যা খুব সহজেই মারা যায়। বিভিন্ন সাইজের সেইসব ক্ষতবিক্ষত পাবলিক পোঁদের পিছনে আপাতত শেষ ব্যক্তি। একমাত্র আমিই। দাঁড়িয়ে আছি। না বোকার মতো। না চালাকের মতো। অনেকটা ক্যাবলার মতো। আমাকে দেখে কারোর মায়া হয় না। ভালোবাসা জাগে না। কেবল রাগ হয়। প্রচন্ড রাগ হয়।

কেন হয় এমনটা? জানি না। হয়তো বা জানি...।
সেইসব ক্ষতবিক্ষত পাবলিক পোঁদের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল ভাবি। ভাবতে থাকি অনেক কিছু। ভাবনা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ে না আমায়। কেবলই ভাবায়। অন্যের মতো আমারও শরীরে প্রচন্ড ক্রোধ আছে। তাতে কারোর যায় আসে না।

এইরূপ ভাবতে ভাবতে যখন ফুটপাত থেকে রাস্তায় পা রাখি অমনি সাদাকালো ডোরাকাটা চিহ্নগুলো মাদুরের মতো গুটিয়ে চলে এলো আমার পায়ের কাছে। হঠাৎ। একেবারে হঠাৎই। তারপর আমার গায়ে জড়িয়ে গেল। একনিমেষে আমি যেন মানুষ থেকে ‘জেব্রা’ নামক এক প্রাণী হয়ে উঠলাম। আমার ঠোঁটজোড়া প্রবলভাবে নড়তে লাগল। সাদা সাদা দাঁত প্রকাশিত হল। সারি সারি দাঁত দুই পাটিতে ধাক্কা মারতে লাগল। অথচ একটুও শব্দ বাইরে প্রকাশ পেল না। কেবল আমার কানে, কানের ভিতর দলা পাকানো শব্দের মহড়া শুরু হয়ে গেল।

রাস্তায় নামা হল না আমার। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম বেকুবের মতো। বড় বড় বাড়ি দেখতে লাগলাম। দামী দামী গাড়ি দেখতে লাগলাম। আর দেখতে লাগলাম ক্ষতবিক্ষত পাবলিক পোঁদের দ্রুত নড়াচড়া। ডচ করতে করতে তারা এগুচ্ছে। কেউবা ছুটছে।


কী আশ্চর্য! আশ্চর্য হবারই কথা। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে একটি অতি সুন্দর পূর্ণবয়স্ক জেব্রা।
পাবলিক অবাক দৃষ্টিতে দেখছে। কেউবা আবার জ্বালাধরা পোঁদ সবার সামনে বেমালুম চুলকোতে চুলকোতে দেখছে। অনেক প্রশ্ন উঁকি মারছে। বেশ বুঝতে পারছি। কেননা পাবলিকের কৌতূহলের শেষ নেই।

...আচ্ছা দাদা, কোথা থেকে এলো এই সুন্দর নিরামিষ প্রাণীটি?  আকাশ পথে ছুটে এল নাকি? সেই ছেলেবেলায় শোনা পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো?  নাকি মাটি ফুঁড়ে বেরুল?  প্রশাসন বলতে কি কিছু নেই?  দাদা, বনদপ্তরের ফোন নম্বর কারোর জানা আছে কি?
উত্তর  জানা নেই।

তো এইরকম হাজারও প্রশ্ন ভাবতে ভাবতে অনেক পাবলিক ভয়ে ভয়ে খুব কাছে এসে হাসিমুখে আমার শরীরে হাত বোলায়। লাথ খাওয়ার ভয়ে। একটু তফাতে থেকে। শরীর বলতে পোঁদ। জ্বালা জ্বালা ভাবটা তখনই বেমালুম উবে যায়। পোঁদের গুচ্ছ গুচ্ছ লোম মুহূর্তে জেব্রার লেজ হয়ে ওঠে। তারপর তিড়িক তিড়িক নাচতে থাকে। দুলতে থাকে।

অনেকেই মোবাইলে টপাটপ ছবি তুলছে। কেউবা আমাকে সামনে রেখে সেলফি নিতে ব্যস্ত।
আমার ভালো লাগছে। ভীষণ ভালো লাগছে। হাসিও পাচ্ছে। অনায়াসে দাঁত বের করছি। ঘাড় উঁচু করে গাড়ি দেখছি। বাড়ি দেখছি। ধস্ত পাবলিক দেখছি। পোঁদমারার কাঠিকলের খেলা দেখছি। প্রতিটি সময়ে। প্রতিটি দিনে। প্রতিটি বছরে।
দেখছি। শুধু দেখছি।

কোনও প্রতিবাদ নেই। আন্দোলন নেই। শুধু মোমবাতি আগুনের ন্যাকামোপনা আছে।
অথচ ঠোঁট নড়ছে আমার। দুই ঠোঁটের ভিতর আন্দোলনের গান থেমে আছে। থেমে আছে মিছিলের হাঁটার শব্দ। সব। স...অ...ব।
প্রকাশ পায় না। কিছুতেই না।
ফুটপাত দিয়ে আনমনে টুকুর টুকুর করে চলতে থাকি। টকাটক খুঁড়ের আওয়াজ হয়। বুঝতে পারি, পিছন পিছন অনেক মানুষ ধেয়ে আসছে। অনেকেই থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে সরল সাদাসিধা জীবটিকে।
কেউবা বনদপ্তরে ব্যাকুলভাবে ফোন করছে। হ্যালো...হ্যালো মিস্টার বড় পোঁদ, শিগগির রেসকিউ টিম পাঠান...দমকলের টিমও পাঠাতে পারেন...জলদি পাঠান ডিজাস্টার টিম...একটা জেব্রা...হ্যাঁ...হ্যাঁ... একটা যুবক জেব্রা.....নিশ্চিত চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়েছে...সার্কাস থেকেও হতে পারে...।


আমাকে এইরকম অবস্থায় বাড়ি আসতে দেখে বাবা আচমকা সিংহ হয়ে উঠলেন। বুঝতে পারলাম আমার ঘেঁটি কিংবা গলার নলিটা তার প্রথম পছন্দ। প্রথম আঘাত। প্রথম কামড়। পানবিড়ি খাওয়া দাঁতগুলো অনেকটা উচ্চতা নিয়ে ঝলকাচ্ছে যেন! ভয়ংকর পাড়াকাঁপিয়ে গর্জন করতে লাগলেন। মাটিতে পা-জোড়া দাবড়ালেন বেশ কয়েকবার। একটু ধুলো উড়ল। বাড়ির লাগোয়া জামগাছ থেকে কয়েকটা মরা পাতা ঝরে পড়ল। সেইসঙ্গে আচমকা চার পাঁচটি কাক, তিন চারটে শালিক, বেশ কয়েকটি চুড়ুই পুড়ুত করে জায়গা বদল করল।

তারপর কেশর ফুলিয়ে বিরাট থাবা উঁচিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবা-আর কতদিন এইভাবে আমার পোঁদ মারবে?
-মানে! আমি নিজের গলাটাকে দুহাতের তালুতে পেঁচিয়ে ধরে বললাম।
-মানে খুব পরিষ্কার। বলছি চাকরি-বাকরির চেষ্টা তো করতে হবে?
-তুমি কী ভাবছ, আমি চেষ্টা করছি না?
-সে তো দেখতেই পাচ্ছি। দিন দিন বাপের অন্ন ধ্বংস করছ, আর কাপ্তেন সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছ...।
-আঃ থাক না। মা আঁচলে ঠোঁট চেপে বলেন।
-তুমি থামো তো বাপু। তোমার আস্কারায় এমনটি হয়েছে। বাবার হুঙ্কারে আরও কয়েকটি পাতা অনেক দিনের পুরনো আমগাছ থেকে ঝরে পড়ল। আরও দূরে জায়গা বদল করল কাক শালিক চুড়ুই।
মা ভীষণ ভয় পেলেন। নিমেষে কচ্ছপ হয়ে গেলেন। তারপর নিজেকে খোলসের অনেক ভিতরে গুটিয়ে নিলেন। গুটিগুটি চলেছেন। রান্নাঘরে। তার কাজের জায়গায়। কাঁদছেন। খুব কাঁদছেন। হলুদের গন্ধে কান্না। জিরের গন্ধে কান্না। লালমরিচের গন্ধে কান্না। লবণের সাদা শরীরে কান্না। মা ভীষণ কাঁদছেন।
বার বার আঁচলে চোখ মোছেন। তখনও উনুনে অনেকটা আগুন ড্যাবড্যাবে চোখে মাকে দেখছে।


প্রতিনিয়ত সিংহের থাবা থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। অসম হারজিতের লড়াই চলতে থাকে মনের ভিতর। মগজের ভিতর থেকে ফোয়ারার মতো রক্ত ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। টের পাই। তারপর মোক্ষম ঝটকায় প্রাণ বাঁচাতে পড়িমরি ছুটি। কোথায় ছুটে চলছি? জানি না। ছুটতে ছুটতে বারবার পিছন ফিরি। তাকাই। চারদিকে ঘন গভীর মানুষের জঙ্গল। লাখো লাখো মানুষের হাত পা মুখ চোখ চুমু চিৎকার রাগ ঘৃণা কান্না রক্ত...।

ফুটপাতের ধারে চলে এসেছি প্রায়। রাস্তা পার হবো। ওপারে যাব। নতুন রাস্তায় যাব। যেখানে আমার পা পড়েনি এখনও। বুড়ো হাতির পিঠের মতো রাস্তা দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে গাড়িগুলো এলোমেলো ছুটছে। আমাকে রাস্তা পার হতে হবেই।

আচমকা সাদাকালো ডোরাকাটা খোলসটা শরীর থেকে আপনাআপনি খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। কখন যে ছড়িয়ে পড়ল বুঝতে পারলাম না। বরং অবাক হলাম। ভীষণ অবাক হলাম। নিমেষে নির্ভেজাল ছাপোষা মানুষ হয়ে গেলাম! অনেকে নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হচ্ছে। কেবল আমিই পার হতে পারছি না।
শুধু আমার দুই ঠোঁটের ভিতর মিছিলের শব্দ, আন্দোলনের শব্দ, গানের শব্দ ছিটকে বেরুতে লাগল বন্দুকের গুলির মতো।

ক্ষতবিক্ষত পোঁদ নিয়ে হাজার হাজার পাবলিক ঘুরে দাঁড়াল...।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন