সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

বাপ্পাদিত্য জানার অণুগল্প : প্রণাম






মানুষটার এতো কাছে থাকি, তবু কোনোদিন প্রণাম করতে পারিনি। শ্রদ্ধাশীল শিক্ষক বা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি হলে পথে-ঘাটের দেখায় মাথা নিচু হয়ে যেতো। সহজেই তাঁর পায়ের ধুলো কপালের সীমান্ত চুল মেখে নিতো।
    এই মানুষটা একটি চাষি। কৃষক।
    কৃষক অন্নদাতা। ঘাম পুড়িয়ে পুড়িয়ে সচল রাখে জমির মাতৃত্ব। সচল রাখে মানুষের বাঁচা। আমার কাছে এরাই  সভ্যতা চালক।
    একথা সব কৃষকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমি যে মানুষটার কথা বলছি, তিনি শুধু কৃষক নন। তিনি একটা  সামাজিক চলমানতা, একটা অধ্যায়।
    তৃতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া ছেড়ে চাষের কাজে নেমেছেন।অপক্ক কৈশোরে পিতৃবিয়োগে সংসারের জোল কাঁধে নেন। রীতিমতো বড় পরিবার। দুগন্ডা পেট  শুধু চাষ করে টেনে এসেছেন। ছিন্ন হওয়ার ভাবনা দূর দেশের যাত্রী । সবার আবদার রক্ষা করেছেন। কার্পণ্য দেখাননি।
    দেশ কিভাবে চলে, সিরিয়ায় কেন উদবাস্তু হয়, সোমালিয়ার শিশু কিভাবে অপুষ্টিতে মরে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট কেন দেশ ছেড়ে পালান, সুস্থ হয়ে বাঁচার নাম প্রতিবাদ --এসব তিনি জানেন না।
     সংসারের সবার মুখ সচল রাখাই তার ধ্যানজ্ঞান।
    ধান, পাট, সব্জি- সব চাষে পারদর্শী।  মোটা মোটা ধানের বোঝা, চার-পাঁচ তাড়ি  পাকাটি অনায়াসে মাথায় করে বাড়িতে আনতে পারতেন। এক বস্তা ধান মাথায় নিয়ে নিজেই চালকল থেকে ভাঙিয়ে আনতেন।
   কষ্ট পেলেও কাউকে কিছু  বলতে শুনিনি। নিজের মধ্যেই মিলিয়ে দিতেন।
   আজ সেই মানুষটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে! নিথর পড়ে। চোখ তুলে তাকাতে পারছেন না। হাত-পা নাড়ার শক্তিও হারিয়েছেন।
  আমি বেডের পাশে দাঁড়িয়ে। ভাবছি- মানুষের পরিণতি কি হতে পারে! মুখ বাদে সারা শরীর সবুজ কাপড়ে ঢাকা । কাপড় একটু উঠে পায়ের পাতা বেরিয়ে আছে। আমি একভাবে তাকিয়ে আছি পায়ের দিকে। ক্রমশই মাথা নিচু হয়ে আসছে।
   বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আত্মীয়-স্বজন।  ভাঁজ হওয়া কাপড় টেনে পায়ের পাতা ঢাকা দিতে গিয়ে পুরো হাত বুলিয়ে নিলাম পায়ে। তারপর মাথার সামনের চুল ঠিক করতে করতে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে।
   এতো ভক্তি ভরে কোনোদিন মাথার চুল ঠিক  করিনি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন