সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

গৌতম রায়ের গল্প : দুঃখবিলাস অথবা ঢ্যামনামো


সকালেই তুর্ণার ফোন পেল অর্ক।একটা ফোন দিনটা কেমন যেন ম্যাদামাড়া করে দিল তার।তুর্ণা জানতে চাইলো,আচ্ছা সৌম্যদার কোনো ফোন পাও নি?
না তো--বেশ টেনশন মেশানোগলায় বলবো না,বলবো না করেও বলে উঠলো অর্ক, 
তুমি ফোন পেয়েছো?
তুর্ণা ততোক্ষণে বুঝে গিয়েছে,অর্ক কোনো ফোন পায় নি। অর্থাৎ, অর্ক এবার বাতিলের খাতায়।মালটার লেখা এবার সিলেকটেড হয় নি "ময়ূখে"। সুতরাং অর্ক এ বছর মেন স্টিম থেকে আউট।
একটু ন্যাকামো মাখানো গলায় তুর্ণা বললো,দ্যাখো ফোন আসে কি না!
তুর্ণার ফোনটা ছাড়তে না ছাড়তেই প্রমোদের ফোন; আরে অর্ক,সৌম্যদা ফোন করেছিল?
হুল ফোটানোর যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রমোদের ফোন,সেটি অনেকটা যেন সফল করে দিল অর্কর হতাশা মাখানো উত্তর, ন্, না তো। তুমি ফোন পেয়েছো?
তুর্ণা বন্ধুর মতো গলায়  বন্ধুত্ব আর খচরামোর বন্ধুর পথে হেঁটেছিল।তেমন আধ চামচ ন্যাকামো ভরা গলায় ভীমরুলের ভনভননি নিয়ে না বলে নন্ গ্রাজুয়েটের শহুরে কেতার দেমাকের ঠমকী গলায় প্রমোদ জবাব দিল;দেখো ফোন আসে কি না।ওরা তো একদিনেই পরপর ফোনগুলো করতে থাকে।
ফোনের ওপারের কথার ঝাজ যেন বুঝেই উঠতে পারল না অর্ক।ততোধিক বোকামি জড়ানো গলায় প্রমোদের কাছে জানতে চাইলো ওর লেখা সিলেকটেড হয়েছে কি না।
প্রমোদ বুঝলো ঢ্যামনামোর যে সুমহান উদ্দেশ্য নিয়ে সক্কাল সক্কাল তার এই টেলিফোন বিষাদ যোগ,তা পুরোপুরি সফল।তাই আস্তে করে নিজের লেখা সিলেকটেড হয়েছে সেটা অর্ক কে জানিয়ে টুক করে মোবাইলটা ছেড়ে দিল
   আচ্ছা, প্রমোদ কি তাহলে শেষ অবধি জেনেই গেছে আমার লেখা সিলেকটেড হয় নি?সবকিছু বুঝেশুনে আমায় হ্যাটা করে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতেই ও ফোনটা করলো?না,একবার জিগ্যেসই করা যাক তুর্ণাকে।ও যদি কোনো সুলুক সন্ধান দিতে পারে।এই ভেবে আবার মোবাইলটা হাতে নিল অর্ক।
আচ্ছা তুর্ণা,তুমি কি বলো?আমি নিজেই কি একবার ফোন করে দেখবো সৌম্যদাকে?
একটু বিরক্তই হলো তুর্ণা।সেটা গোপন করে গলাটা যতোটা স্বাভাবিক রাখতে পারা যায় তার চেষ্টা করে বললো,আরে কি মুশকিল,তুমি ফোন করবে কি না করবে তা আমি কি করে বলি?
তুর্ণার জবাবটা পেয়ে আরও একটু যেন মিইয়ে গেল অর্ক।
না,মানে ভাবছিলাম কি জানো,ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না যে ফোনটা করা ঠিক উচিত হবে কি না।
তুর্ণা নিজে যখন কোনো ক্রাইসিসে পড়ে ফোনে অর্কর দিমাগ চাটতে দেরি করে না।তা বলে অর্ক র ক্রাইসিস তো এক্কেবারে ওর নিজের ব্যাপার।তা নিয়ে ভেবে কেন অহেতুক নিজেকে ওভারলোডেড করতে যাবে সে?সবথেকে বড়ো কথা হলো ,তুর্ণার গল্পটা সিলেকটেড হয়ে গেছে।এখন কোন বাল ছালের কি ছেঁড়া গেল তাতে ওর কি যায় আসে?তুর্ণা নিজে নিজে যখন একের পর এক সিরেটিভ নিয়েও রাতের পর রাত চোখের পাতা এক করতে পারে না,তখন কোন বাল চন্দ্র পাল আসে খবর নিতে?দুনিয়ার যতো ন্যাকা চোদনা নিজের ফ্যাসটেশন কাটাতে ওর ঝাট জ্বালায়।
ভাবতে ভাবতে ই অর্ক কে বল্লো,শোনো না,কেউ মনে হচ্চে ডাকছে।একটু পরে আবার কথা বলি?
অর্কর উত্তর টা শোনার আগেই মোবাইলটা ছেড়ে দিয়ে তুর্ণা ভাবছে,শাল্লা আমি ফোনে একটু বেশি হ্যাজালেই মালটা 'যাই-ই-ই,যাই'ডাক ছেড়ে বলে;আচ্ছা,শোনো তুর্ণা একটু ডাকছে।ছাড়ছি।
আর এখন ফাটা বাঁশে আটকে শালা দেখো কত্তো ঢ্যামনামি।এইসব মেনিমুখো মালগুলোকে এ ভাবেই ঢিট দিতে হয়--মনে মনে নিজের কাজের দিকে ঝোল টেনে একটু বুঝি বা আত্মপ্রসাদই পেতে চাইলো তুর্ণা।
তুর্ণার কাছ থেকে তেমন একটা পাত্তা না পেয়ে ন্যাতানো নিমকির মতো আরও একটু নেতিয়ে পড়লো অর্ক।মদো মাতাল বাপটা সারাটা জীবন ভাজাভাজা করে টেসে যাওয়ার পর বাপের মরার দুঃখবিলাসে একটু সহানুভূতি কুড়োবার ধান্দায় ছিল অর্ক।কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল।'ময়ূখ'গ্রুপ থেকে ছিটকে গিয়ে এবার না সবদিক থেকেই ঝাড় খেয়ে যায়!ভাবতে গিয়েই অর্ক র মনে হলো,ঝাড় খাওয়ার আর বাকি টাই বা কি আছে?
কি করবে এখন?সৌম্যদাকে একটা ফোন কপাল ঠুকে করেই দেখবে?--ভাবতে থাকে।ভেবেই চলে।ভাবার যেন থই থাওয়র নেই।এ তো আর ভবা পাগলার মতো প্রাকটিস করে ভাবার মকশো নয়।ভাবতে ভাবতেই দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ।

নিজের থেকে বেশ কসরত করে ফুটিয়ে তোলা দুখঃ দুখঃ মুখটা সুগতকে দেখে আর একটু বাংলার পাঁচের মতো করে বললো,এসো আলুদা।
সুগত শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে অর্কর দুসম্পকের আত্মীয়।তাই এই ডাক নামে ডাকা।
কি হয়েছে তোমার?
কয়েকদিন আগে অর্কর বাবা মারা গেছেন।সুগত ধরে নিয়েছে সেসব নিয়েই অর্কর আবার এই অবসাদ বিলাস।কোন আবেগে ভেসে ন্যাকাচৈতন্য ইংরেজির প্রাইভেট টিচার টাকে বিয়ে করতে গেল শ্রীতমা ,মাঝে মাঝে ভাবে সুগত।আপাতত সেসব চিন্তা ছেড়ে অর্ককে জিগ্যস করলো,আবার কি হলো?
সব শেষ গো আলুদা।ধরা গলায় বল্লো অর্ক।সুগত ধরেই নিয়েছে অর্কর মায়ের নিশ্চয় কোনো আপদ বিপদ হয়েছে।এই না হলে শালা বাঙালি?আর কিছু থাক না থাক,সেন্টু এক্কেবারে যাকে বলে কিনা ষোলআনার উপরে বত্রিশ আনা।বরটা আজীবন মাল খেয়ে ফুর্তি মারিয়ে লাইফ কাটিয়ে সুরুৎ করে ফুটে গেল।বউ টা চির জীবন মিউ মিউ করে আর বরের মালের উদ্গার পরিস্কার করেই চুল পাকিয়ে ফেললো।এখন দেখো কিনা মালখোরটার জন্যে তিনি একুশ শতকের সতী হচ্ছেন।মাইরি রামমোহন মালটা যদি এখন বেঁচে থাকতো তাহলে এই আধুনিক সতী কে দেখে ব্রিস্টলে মরার আগে গলার থেকে পৈতে টা খুলে রেখে দিতো!
অর্কর কেলিয়ে যাওয়া মুখের সঙ্গে তাল মলিয়ে সুগত বল্লো,কি হয়েছে?মাঐমার কিছু?
কাঠ বাঙাল বাড়ির ছেলে সুগত এ দেশীদের মতো কথায় কথায় মাশিমা বলতে পারে না।সম্পকিত বোনের শাশুড়িকে পূব বাংলার ঢঙে মাঐমাই বলে।শ্রীতমার শ্বশুরকে বলতো মাঐমশাই।
না,মা তো তনুর নাচের ক্লাস আছে বলে টিফিন বানাচ্ছে।
নিজের মাসতুতো বোন শ্রীতমা,তমালের তনুর ন্যাকামো সুগতর গা পিত্তি জ্বালিয়ে দিলেও আত্মীয়তার ডেকোরামে রিঅ্যাক্ট করতে মানা।তাই কিছু না বলে শেষের কারনটা জানতে অর্কর দিকেই আগ্রহ নিয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া উপায়ন্তর দেখলো না সে।
অপেক্ষা কাজে দিল।প্রায় কেঁদে ফেলা গলায় অর্ক বললো;জানো আলুদা আমার লেখাটা এবার রিজেক্টেড হয়েছে।
এতোক্ষণে ব্যাপারটা একটু ক্লিয়ার হলো সুগতর কাছে।
ওঃ এই ব্যাপার ।আমি তো ভাবলাম কি না কি।
তুমি ভাবতে পারছো না আলুদা।নিজেকে এক্কেবারে নিংড়ে দিয়ে লিখি।এসবের কোনো মূল্য নেই?কি লেখে প্রমোদ?শালা স্কুলের গন্ডিই কোনোদিন পেরোয় নি।খালি নিজের স্টাগলের গপ্পো ফেদে লোকের সিমপ্যাথি ড্র করবার চেষ্টা করে।শালা জন্মভোর মাগিবাজি করে একটা শাঁসালো চাকরিয়ালা মাল পটিয়ে বিয়ে করে তার পয়সায় খাচ্ছে আর সাহিত্য মারাচ্ছে।তুর্ণাকে জানো?পুরো পারভারটেড একটা মেয়ে।ড্রাগ অ্যাডিক্ট।ডিপ্রেসনের পেশেন্ট।আদ্দেকদিন ওসুধ খেয়ে গাঢ় উলটে পড়ে থাকে।
স্কুল মাষ্টার আর নব্য ইনটেলেকচুয়ালের খোলস ঝেরে ফেলে নিজের ভিতু আর লোভ এবং ধান্দাবাজের কম্বাইন ক্যারেক্টারটা শেষ পযন্ত মেলেই ধরলো অর্ক।
ভেতরের ঘর থেকে শ্রীতমা বেরিয়ে আলুদাকে দেখে বেশ অবাক।
আরে তুমি কখন এসে ঘাপটি মেরে বসে আছো?
শ্রীতমার কথার ধরনটাই এরকম।খুব একটা সাত পাঁচ ভেবে বলে না।ততোকিছু ভেবে কাজও করে না।ভেবে চিন্ত সব কিছু করলে আর যাই হোক এই মেগালোম্যানিয়াক অর্কর প্রেমে পড়তো না।মনে মনে ভাবলো সুগত।
আরে অনেকদিন আসি না।ভাবলাম একটু খবর নিয়ে যাই।
তার আলুদাকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে বেশ ঝাঁজের মাথায় শ্রীতমা বল্লো;তা এসে কি দেখলে?তোমার ভগ্নিপতির হতাশা?বৌভাতের রাত থেকে এসব দেখে দেখে আমি হেজে গিয়েছি।
ডোন্ট কেয়ার টোনে বললো শ্রীতমা।বোনের কথায় আশ্চয হলো না সুগত।সত্যিই অর্কর এই ন্যাকামো দেখতে দেখতে সবটা এখন গা সওয়া হয়ে গেছে।নোতুন করে কিছু হেলদোল হয় না।
বৌয়ের কথাতে অর্কর ও কোনো তাপ উত্তাপ দেখতে পাওয়া গেল না।সকলের কাছেই যেন ব্যাপারটা বেশ সয়ে গেছে।
    তুমি বলেছিলে না তাঐমশাইয়ের ইনসিওরেন্সের কাগজপত্র নিয়ে কি প্রবলেমে পড়েছো।ইনফ্যাক্ট সে জন্যই এসেছি--অর্ক কে বললো সুগত।অর্ক যেন শুনেও শুনলো না।একই রকম জুল জুল করে তাকিয়ে থেকেই বললো;সত্যি তোমরা বুঝতে পারছো না আলুদা।এটা আমার জীবনমরণের প্রশ্ন।কেন তোমরা বুঝছো না?
অর্ক সুগতের উদ্দেশে কথা গুলো বললেও ওর তুতুপুতু বৌ ততক্ষণে শাশুড়ির সাত সকালে উঠে তৈরী করা পরোটা আর কালোজিরে ,কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আলুর সাদা চচ্চরি খেয়ে তখন মেঘদূতের রিহারসালে যাওয়ার তাগিদে অর্কর কাছ থেকে কিছু টাকা ম্যানেজ করার ধান্দায় এসে দাড়িয়েছে।
তনু তুমি কিছু খেয়েছো তো?
অর্কর কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওর তনু পাঁচশো টাকার ন্যাকামি আবদার জুড়ে বসলো।বৌ যাতে বেশি ছেনালি না করে তাই অর্ক উঠে গিয়ে পার্শ থেকে টাকাটা বের করে ওর হাতে দিয়ে আবার সুগতর সামনে এসে বসলো।
মনে মনে ভাবছে সুগত,আবার শুরু হলো হ্যাজানো।
আচ্ছা অর্ক উঠি তা হলে?
উঠবে?আমার কি হবে আলুদা?
আপন মনে খিস্তি দিয়ে উঠলো সুগত।ব্যাড়া তুই কোথায় গাঢ় মারাবি তার ঠেকা নিয়ে বসে আছি বালটা!
মনের খিস্তি  নেই ভিতর চেপে অর্ক দিকে একটু হাসি হাসি  মুখ  করে সুগত বললো,আমায় একটু  রাজারডাঙ্গা হয়ে যেতে হবে।ইনভার্টার টা কদিন হলো বড্ড প্রবলেম দিচ্ছে ।যা লোডশেডিং শুরু হয়েছে ।এই গরমে বেশিদিন ধরে কারেন্ট না থাকলে আর দেখতে হবে না।ইনভার্টার ওয়ারেন্ট পিরিয়ডটা তো এখনও রয়েছে ।একবার  গিয়েই দেখি ।
আপন মনে কথা গুলো বলে সুগত যখন ওঠার তোড়জোড় করছে হঠাৎই  অর্ক এসে সুগতর হাত দুটো ধরে এক্কেবারে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললো।
করো কি,করো কি বলে প্রায় আজকে উঠলো সুগত।
তুমি তো জান আলুদা,আমার লেখায় কোনো ফাঁকি থাকে না।নিজেকে নিংড়ে দিয়ে লিখি ।যা লিখেছি বলতে পারো কজন এরকম লিখতে পারে?পারবে প্রমোদ চর্মমেঘের মতো কিছু লিখতে?চোখের মতো একখানা উপন্যাসের একটা লাইন লিখুক না তুর্ণা ।বুঝবো এলেম আছে ।শাকচুন্নীর মতো চেহারা চওড়া মেকআপ নিলেই কেউ সাহিত্যিক হয়ে যায় না-- এক নিশ্বাসে কথা গুলো  বলবার পর উত্তেজনার একটু হারাতে থাকলো অর্ক ।
হাপাতে হাপাতেই মোবাইলটা আবার খামচে ধরলো।
 সুগত দেখল কেটে পড়ার এই মস্ত সুযোগ।'চললাম 'বলে একসাথে বেরিয়ে এসে প্রায় দৌড়ে বাইকে স্টার্ট দিল সে।
আলুর চলে যাওয়ার দিকে তখন অর্কর আর তেমন একটা নজর নেই।সে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মোবাইলি বাখোয়াজিতে।
দুবার রিং হতেই অপরপ্রান্ত থেকে সাড়া পাওয়া গেল।উৎসাহ আর উৎকন্ঠা মেশানো গলায় অর্ক বললো,
হ্যালো, সুমিতাভদা,জানো তো আমার হয় নি।
ফ্রাসটেটেড বাঙালি লেখকের পারভার্টি প্রতিচ্ছবি হলো সুমিতাভ গজপতি নামক লেখক না লেখকের কিম্ভুতুরে ট্রাপিজে ঘুরপাক খাওয়া এই আধ বুড়ো লোকটা।আধবুড়ো সামনের দাঁত ভাঙা লোকটাকে এক ঝলক দেখলে মনে হয় উত্তম যুগের সিনেমার কান্দু পট্টির দালাল।
হয় নি?বেশি করে চেষ্টা কর।হাত ব্যথা হলেও থামবি না।চেষ্টা করতে করতেই হয়ে যাবে।আমার এই বয়সে ওভাবে হলে তোর হবে না কেন রে?তোর তো একনো কাঁচা যৌবন রে ছোঁড়া।
অ্যাঃ,  সব কিছু নিয়ে সব সময়ে ইয়ারকি ভালো লাগে না।শোনো সুমিতাভদা,আমার লেখা এবার সিলেকটেড হয় নি--অর্ক একটু বিরক্ত হয়েই সুমিতাভ গজপতির কথার জবাবে বল্লো।
ধুস,এই ব্যাপার।আমি ভাবলাম কি না কি।তা এবার সিলেকটেড হয় নি তো হয় নি,পরের বার হবে।এতে এত্তো আকাশ ভেঙে পড়ার কি হলো।শোন,আমি কবে থেকে লিখছি আর কবে ওঁরা প্রথম আমার লেখা ছাপলো জানিস তো তুই।
তাহলেও তোমায় দিয়ে ওরা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখিয়েছে--জাতে ঢ্যামনা হলেও তালে ঠিক লাইনেই আছে অর্ক।
আর জাতে পাগলা সেজে থাকলেও নিজের ঢাক বাজছে দেখলে কাঁসরে ডান্ডা নাড়তে কসুর করে না সুমিতাভ।সহজেই বুঝে নিল মুরগী জুটে গিয়েছে।জবাইটাই কেবল বাকি।
     শোন অর্ক,ব্যাপারটা নিয়ে একটু বসা দরকার।ফোনে যদি সবটা হতো,তাহলে তো হয়েই যেতো।
অপর প্রান্ত থেকে অর্ক বললো,দাঁড়াও দেখছি কতো তাড়াতাড়ি বসা যায়।
সুমিতাভ ভেবেছিলআজ বিকেলেই গান্ডুটার কিছু খসানো যাবে।সে একটু হতাশ গলায় তেই বললো,ঠিক আছে দেখ।তবে বেশি দেরি করিস না।ব্যাপারটা গরম থাকতে থাকতেই একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার।
এমন কনফিডেন্টওয়ালা টোনে সে বললো যেন ওই পত্রিকা গ্রুপের মালিক তার ইয়ার দোস্ত।
অর্ক ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে সত্যি সত্যি সুমিতাভদার সঙ্গে বসলে পরে কোনো সলিউশন বেরিয়ে আসতে পারে কি না।একবার ভাবছে এতো সিনিয়ার লেখক ,হয়তো কোনো বুদ্ধি বাতলে দিলেও দেতে পারে।আবার ভাবছে মালটা যা হ্যাজায়।তার ওপর আবার ওকে মাল খাওয়াও।তাতে নিজেরই ভালোরকম মাল খসে যাবে।শালাতো বেহেড না হওয়া অবধি থামবে না।এরা তো পরের পেছন মেরে খাওয়ার সময়ে গু খেয়ে লোহা হাগতেও কসুর করে না।
    আচ্ছা যদি কোনো মুরগি ম্যানেজ হয়? এতোটা সময় ধরে ল্যাদ খেয়ে থাকা অর্ক নতুন ভাবনায় বেশ চনমনে হয়ে উঠলো।ভাবতে লাগলো কার ঘাড়ে কাঠাল ভেঙেসুমিতাভদাকে তেল মেরে কাজটা হাসিল করা যায়।
আজকাল সব সময়ে ভাবনা অনুপাতে বুদ্ধির জোগান আসে না তার।ভাবনাটাকে একটু চাগিয়ে তোলার জন্য বিছানায় একটু গড়িয়ে নেওয়াটাই যেতে পারে ভাবলো।শুয়ে শুয়ে মনে হলো আরে বারাকপুরে শান্তনুদার বাড়িই তো যাওয়া যেতে পারে।শান্তনুদা বেশ পয়সাওয়ালা লোক,দিলদরিয়া টাইপের ও।যেমন ভাবা তেমন কাজের মতোই বারাকপুরের শান্তনু সান্যাল কে ফোনে ধরলো অর্ক।
           বেশি ধানাই পানাই করতে   হলো না অর্ককে শান্তনু সান্যালের কাছে।এর আগে একবার শান্তনুর বাড়ি গিয়েছিল অর্ক।সময়ে সময়ে নিজের ডিপ্রেসড হয়ে পড়ার কথা বলার পর শান্তনুই একপ্রকার অর্ককে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তার বিতনু সাহার কাছে।
    এই অঞ্চলে সাইক্রিয়াট্রিস্ট হিশেবে বিতনু সাহার ভালো নামডাক আছে।সাইকিয়াট্রিতে এম ডি হিশেবে বিতনুর খ্যাতি কম নয়।বিতনুর কাছে যাওয়ার কথটা দিয়ে শুরু করলে কেমন হয়?ভেবে নিয়ে ফোনটা করলো অর্ক।
বুঝলে শান্তনুদা,বাবা চলে যাওয়ার পর আমার সেই পুরনো সমস্যাটা,আরে যেটার জন্যে তুমি আমায় বিতনুদার কাছে নিয়ে গিয়েছিলে,আবার বেড়েছে।
কি মুশকিল,তুমিই তো ট্রিটমেন্টটা ঠিক মতো কনটিনিউ করলে না---শান্তনুর কথার জবাবে নিজেকে বাঁচিয়ে অর্ক জবাব দিল,তুমি তো জান,বাবা কে নিয়ে কী গেছে আমার কটা মাস।
শান্তনু যদিও জানে মোদো মাতাল,জুয়ারি বাপকে নিয়ে অর্কর কোনো দিনই কোনো তাপ উত্তাপ ছিল না।তর্কে না গিয়ে ফোন করে বিতনু কাছে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিল সে।
নাগো,বিতনুদা ওঁদের একটা অনুষ্ঠানে ডেকেছিলন।যেতে পারি নি।তুমি প্লিজ ওনাকে একটু ম্যানেজ করে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নাও।
আরে প্রবলেমটা যখন তোমার ,তুমি ফোনে কথা বলো।আমি তো পরিচয় করিয়েই দিয়েছি--দায় এড়ানো সুরে বললো শান্তনু।
দায় এড়াতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত দায় এড়িয়ে যেতে পারলো কই?অর্কর ঘ্যানঘ্যানানির জেরে বিতনু সাহার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিল।শান্তনু অর্ককে বলেছিল ডাক্তার দেখানোর দিন সকালের দিকে ওর বাড়িতে চলে এসে দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে বিকেলের দিকে বিতনুবাবুর কাছে যেতে।অর্ক আগের বারও ডাক্তার দেখাতে এসে এই রকমটাই করেছিল।
আসার আগের দিন রাতে শান্তনুর কাছে অর্কর ফোন।
বুঝলে শান্তনুদা সুমিতাভ গজপতি কে তুমি চেন তো?
এক লহমায় শান্তনু বুঝে পেল না কে এই হাতির বর!ঈদুলআলার মেয়েকে নিয়ে এমন নামের একজনকে নিয়ে অনেক কিছু রটেছিল।সেই মালটা নয় তো?প্রথমটায় ভেবেছিল শান্তনু।ওর ভাবনাকে হটিয়ে দিয়ে অর্ক বললো,তুমি আমাদের কাগজে সুমিতাভদার লেখা পড়েছো।ওর বইও আছে।
এবার খেয়াল  হলো শান্তনুর।সুমিতাভ গজপতির নাম শুনলেও তার লেখা আদৌ পড়া হয় নি।সেটা অবশ্য অর্ককে বুঝতে দেওয়ার মতো লোক ও নয়।
হ্যাঁ,হ্যাঁ বুঝেছি।
আমি সুমিতাভদাকে কাল আসতে বলেছি।
বলা নেই কওয়া নেই উনি নারদের নেমত্যন্ন সেরে ফেললেন।মনে মনে ব্যাজার হলেও সেটা তো আর বোঝানো যাবে না অর্ক কে।অগত্যা গলায় হাসি এনে মুখখানাকে  বাংলার পাঁচ করে বললো;না,না।ঠিক আছে।
অর্ক নিজের উদ্দেশ্য সফল হতে চলেছে দেখে শেষ চালটা চাললো।
   বলছি কি তুমি একবার ওনাকে ফোন করে একবার বলো।
বিরক্তি চাপা দিয়ে শান্তনু ফোনটা করেই দিল সুমিতাভকে।পরের দিন হঠাৎ সুমিতাভ সরাসরি ফোন করেছে শান্তনু কে।
শান্তনু দা,আমি আপনার ওখানে যাচ্ছি শুনে আমার এক ভ্রাতৃপ্রতিম কবি যেতে চাইছে।ও এমনিতে সিইএসসি খুব বড়ো অফিসার।কি করি বলুন তো?
মনে মনে বললো শান্তনু তা বালটা যেখানকার হনুদাস হোকনা কেন,তাতে আমার কি ছেঁড়া গেল।মুখে অবশ্য কোনো বিরক্তি প্রকাশ পেল না।
কি যে বলেন সুমিতদা,আপনার বন্ধু কে নিয়ে আসবেন,তা এত্তো হেজিটেড করছেন কেন?মনে মনে অবশ্য ঝাট জ্বলানোর অরণ্যজনিত প্রাচীন প্রবাদেরই শরণাপন্ন হলো।
শালা আপনি শুতে ঠাঁই পায় না শঙ্করাকে ডাকে।তোকে কে চাইছে তার ঠিক নেই,তুই বাল আবার একটা জালিবোট নিয়ে আয়।ভিতরের বিরক্তি চেপেই সুমিতাভ গজপতি আর তার কবি বন্ধুর সঙ্গে ন্যাকামো করে যেতে বাধ্য হচ্ছে শান্তনু।কারন অর্ক তখনও এসে পৌছয়নি।
এক এক জনের চেহারায় নন ইমপ্রেসিভনেসের চূড়ান্ত থাকে।তেমনই সুমিতাভকে দেখে প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল শান্তনুর।তার উপরে ওর সামনের ভাঙা দাঁত গলে কথার ততড়ে থুতুর ফোয়ারা শান্তনুকে টরম বিরক্ত করে তুলছিল।
জানেন তো শান্তনুবাবু আমাদের অর্ক যে কেন অহেতুক এত্তো টেনশন করে।এই যে আমরা এখানে আসছি সেটা যেন কাউকে না বলি সেটা বলার জন্য সকাল থেকে তিনবার ফোন করে ফেললো।কি যা তা ব্যাপার বলুন তো।আর ওর ফোন ছাড়ার পরই তুর্ণার ফোন।তারও প্রশ্ন,তোমরা কোথায়?
শান্তনু খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারলো ডাক্তার বউয়ের পয়সায় হোল লাইফ কাটিয়ে সাহিত্য মারানোর নাম করে এই গজপতি কেমন গাছ ঢ্যামনা হিশেবে নিজেকে মেলে ধরতে পারছে।
   সুমিতাভর কবি বন্ধুটি ইতিমধ্যে ঝোলা থেকে নিজের একটা কবিতার বই বের করে শান্তনুর নামটাম লিখে তার দিকে মেলে ধরেছে।শান্তনু দেখল বইটির প্রকাশক দ্বীপেশ বৈশ্য।কবি যশঃপ্রার্থীদের পকেট কেটে বই ছাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে দ্বীপেশের খ্যাতি আধুনিক কবিদের থেকে অনেকটাই বেশি।
কবিতার বইটা নিয়ে নাড়াচাড়ার ভিতরেই অর্ক এসে গেল।
ভেটকি,ট্যাংড়া সাঁটিয়ে সুমিতাভ যখন রয়াল স্টাগের ঘোরে সাত মাত্রার দাদরা তালের "ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে "বারো মাত্রার
আড় খ্যামটার কিম্ভুতুরে চেষ্টায় মত্ত অর্ক তখন নিজের হতাশার ভাব সমুদ্রে সাঁতার কাটছে।বিতনু সাহার কাছে যাওয়ার অজুহাতটা ভালোই কাজ দিয়েছে ভাবতে ভাবতে কবিবরের সঙ্গে মোবাইল নম্বর বিনিময়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।কবিটিরও স্বভাবত মনে নেই রবাহুত হয়ে শান্তনুর ঘাড় ভাঙার পর আর কোনো ভদ্রতা তার করার আছে।নিজের টাকায় বই ছাপানো কবি খুঁজে পেয়ে গিয়েছে বড়ো হাউসের উঠতি লেখক কে।অর্কওপেয়ে গিয়েছে শাঁসৃলো মক্কেল।
বেচারী সুমিতাভ গজপতি ফেরার সময়ে কবির গাড়িতে রেখে যাওয়া জল মেশানো ভদকার বোতলের খোঁজ করতেই অ্যাক্সেলেটারে চাপ দিল কবি।চল্ পানসি বেলঘরিয়া।





২টি মন্তব্য:

  1. ভালো গল্প। এই সময়ের এক ব্যর্থ লেখক আর তার আশেপাশের জলছবি চাঁচাছোলা ভাষায়। আর ধূর্ত কিছু লোকের সুযোগসন্ধানী ব্যবহার। খুব ভালো লেগেছে।

    উত্তরমুছুন