রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

নীহারুল ইসলামের দুটি অণুগল্প


মিথ্যা

মাটির দোতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঠিক গ্রামের মধ্যেখানে। বিদ্যালয়ের পেছনে বিশাল গোরস্থান। ভয় পাওয়ার কথা! কিন্তু কখনই ভয় পাইনি। পাশেই যে মসজিদ! মাদ্রাসা! একটু দূরে শিবমন্দির! পাশেই বিশাল বটগাছ! তার নিচে ফর্জনক্ষ্যাপার টুটাফুটা আস্তানা। সেই বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক ছিলেন- রোবানমাস্টার, শিবরঞ্জনমাস্টার, জালালমাস্টার, মুজফফরমাস্টার, ... ।  রোবানমাস্টার-শিবরঞ্জনমাস্টার ছিলেন খুব সাধারণ। শিক্ষক হিসেবে সবার খুব প্রিয়। কিন্তু জালালমাস্টার ছিলেন খুব রাশভারী। হেডমাস্টার বলে কথা! তাঁকে খুব ভয় পেতাম। আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম মুজফফরমাস্টারকে। তাঁর পকেটে থাকত একটু সরু লিকলিকে ছুরি, যার বাট আবার হরিণের সিং দিয়ে তৈরি! তিনি বলতেন। এবং সেটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি আমাদের শোনাতেন সেটি হল, ‘কেউ যদি মিথ্যা কথা বলেছো আর আমি যদি তা জানতে পেরেছি, তাহলে এই ছুরি দিয়ে আমি তার জিভ কেটে নেব।’ একথা শুনতে শুনতে আমি এতই ভয় পেয়েছিলাম যে, একদিন তাঁর সেই ছুরিটাই চুরি করে রংসাগর পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম।  হয়ত সেই থেকেই পৃথিবীর এই রংসাগরে এত মিথ্যার জোয়ার ...

-------------

মৌমাছি

আমার তখন হাইস্কুল। আমার তখন ষষ্ঠ শ্রেণী। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, আমাদের ভূগোল পড়াতেন। তাই আমরা তাঁকে  ভূগোলস্যার বলেই জানতাম। তিনি খুব ভাল ভূগোল পড়াতেন। সেই সঙ্গে তিনি আমাদের ভাল ভাল গল্পও শোনাতেন। যেমন, এভারেস্ট শৃঙ্গের গল্প। মারিয়ানা খাতের গল্প। সাহারা মরুভূমির গল্প। আমাজন জঙ্গলের গল্প। তাই আমরা তাঁর কাছে ভূগোল পড়া ছেড়ে বেশি বেশি করে গল্প শুনতে চাইতাম। এতে তিনি অতিষ্ট হয়ে একদিন এমন একটি গল্প শুনিয়েছিলেন যে, তারপর আমরা আর তার কাছে কোনদিন গল্প শুনতে চাইনি।
গল্পটি ছিল এরকম ঃ রাণী মৌমাছি খবর পেয়েছেন, তাঁদের আশ্রয় যে গাছে, সেটি কাটা পড়বে খুব শীঘ্রই। অতএব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আশ্রয় সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে অন্য কোথাও - অন্য কোনও গাছে। শ্রমিক মৌমাছিরা রাণীর কথায় সেই কাজে লেগে পড়ে।  এই পর্যন্ত বলে ভূগোলস্যার চুপ।
তখন আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তারপর?
একটা শ্রমিক মৌমাছি মোম-মধু যতটা সম্ভব মুখে নিয়ে উড়ে যায় নতুন আশ্রয়ের খোঁজে।
এটুকু বলে ভূগোলস্যার আবার চুপ। আবার আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তারপর?
 আর একটা শ্রমিক মৌমাছি মোম-মধু যতটা সম্ভব মুখে নিয়ে উড়ে যায় নতুন আশ্রয়ের খোঁজে।
ভূগোলস্যার আবার চুপ। আবার আমরা জিজ্ঞেস করি, তারপর? ভূগোলস্যার আবার ওই একই উত্তর দেন।
এর মধ্যে ক্লাস সমাপ্তির ঘণ্টা পড়ে। ভূগোলস্যার ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যান।
আর আমরা দেখি, যৎসামান্য আহরণ মুখে নিয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে একটার পর একটা মৌমাছিদের উড়ে যেতে ...  

৪টি মন্তব্য:

  1. সত্যিই পৃথিবীর এই রংসাগরে এখন মিথ্যার জোয়ার বইছে।

    উত্তরমুছুন
  2. দুর্দান্ত দুটো অণুগল্প পড়লাম দাদা। দ্বিতীয়টা অসম্ভব ভালো লাগল।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লাগলো স্যার । বিন্দুতে সিন্ধুর স্বাধ ।

    উত্তরমুছুন
  4. অনবদ্য... অণুগল্প-এর আঙ্গিকে অনবদ্য জীবন দর্শন

    উত্তরমুছুন