রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

অসমিয়া গল্পের অনুবাদ : বাসুদেব দাস



ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক কে?
বাসুদেব দাস

মূল গল্প : পঙ্কজ কুমার দত্ত


 -আজ মানুষটা ঘড়িটা নিতে আসবে।আজ ৩১ ডিসেম্বর।বছরের শেষ দিন।হুমায়ুন কেলেণ্ডারটার দিকে তাকালেন।

        মসজিদে আসা মানুষকে ছায়া দান করা গাছটা আরও বেশি বুড়ো হয়ে পড়েছে।শেষ ডিসেম্বরের শীতের তীক্ষ্ণতা।গাছটা এই ধরনের অনেক শীতের প্রকোপ
দেখেছে।আসলে,শহরের কয়েকটি প্রজন্মকে নিজের পাতাগুলির দ্বারা গাছটা ছায়া দিচ্ছে।শীতের কঠিন স্পর্শে জীর্ণশীর্ণ হতে চলা গাছটা যেন নিজেকেই বলল,আর ও একটি বছর শেষ হল।’

        রাজা-মহারাজার শাসন অতিক্রম করে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠারও সাক্ষী এই দুশো বছরের পুরোনো গাছটা।দোকানের ভেতর বসলেই সোজাসুজি গাছটা চোখে পড়ে।দোকানটা আরম্ভ করার প্রথম দিনটাতেই হুমায়ুনের কথাটা মনে হয়েছিল।বছরের প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে গাছটাও রঙ বদলায়।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা পুরোনো গাছটা প্রতিবছর হুমায়ুনকে যেন স্মরণ করিয়ে দেয় চিরন্তন সেই কথা।....

 -সময়ের ঘড়িতে আরও একটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল,হুমায়ুন।জীবনের আয়ুরেখায় বলিরেখা পড়ল।তুমি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলে।’

        সত্যিই বছরের শেষ দিনটা এলেই বৃদ্ধ হুমায়ুন উদগ্রীব হয়ে পড়ে।বিশেষ দিনটি আজই।আজ সন্ধ্যেবেলা মানুষটা ঘড়িটা নিয়ে যাবে।একটা পুরোনো অপেক্ষার অন্ত পড়বে।দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ মুহূর্ত।

        নিরন্তর অপেক্ষাঃ একটা ঘড়ির কথা…
        গত সাত বছর ধরে এই কাজটাই সে করে আসছে।পরিচ্ছন্নভাবে।কাজটা হল,তার ঘরের বিশেষ একটা রুমে থাকা কাঠের ছোট বাক্সটা খুলে ভেতরে থাকা ঘড়িটা ঠিক মত চলছে কিনা দেখা।বাক্সটাতে বহু বছর ধরে ঘড়িটা রেখে দেওয়া আছে।

        টিক টিক টিক,টিক টিক টিক …নদ-নদী প্রবাহিত হওয়ার মতো বইতে থাকে ঘড়ির টিক টিক।

        -ঘড়িটা বেঁচে আছে।নিশ্বাস বন্ধ হয়নি।–হুমায়ুন স্বগতোক্তি করল।

        প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনটিতে ঘড়িটা হুমায়ুনের স্পর্শে যেন বিশ্রাম ঘর
থেকে বেরিয়ে আসে।ঘড়িটার আলো দরিদ্র হুমায়ুনের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।ঘড়িটা নেড়ে চেড়ে দেখতেও তার ভয় করে।বুকটা ধপাশ ধপাশ করে কেঁপে উঠে।কে জানে মূল্যবান ঘড়িটার যদি কোনোকিছু খারাপ হয়ে যায়।

        সত্যি কথা বলতে,সাত বছর আগেই গ্রাহকের ঘড়িটা নিয়ে যাবার কথা ছিল।সাত বছরে বাজারে নতুন নতুন দোকান হয়েছে।কয়েকটা ভালো ঘড়ির দোকানও হয়েছে।কিন্তু হুমায়ুনের দোকানে সেই নির্দিষ্ট গ্রাহকটি ফিরে এলো না তো এলো না।একবারও সে ঘড়িটা নিতে এলো না।হুমায়ুন প্রতিবছর বাক্সটা খুলে।বছরের অন্তিম দিনটিতে প্রতিবার সে ঘড়িটা পরীক্ষা করে দেখে।একটা পৌ্নঃপৌ্নিক কাজ।গলার গামছাটা দিয়ে ঘড়ির কাঁচটা মোছে।খুব যত্নের সঙ্গে মোছে।ঘড়ির কাঁচে
প্রতিবিম্বিত হয় বৃদ্ধ এবং ক্লান্ত একজন মানুষের জীবন।উদ্যমহীন।

        এখানে ঘড়ি মেরামত করা হয়
        ‘হুমায়ুন ক্লক অ্যাণ্ড ওয়াচ রিপেয়ারিং।’এখানে ঘড়ি পাওয়া যায় এবং মেরামতি করা হয়।ঘড়ি মেরামতির জন্য নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।ছোট শহরের এই দোকানটিতে বহু বছর আগে বি্দেশি পর্যটকটি ঘড়িটা মেরামত করতে দিয়েছিল।বাজারের মূল চৌরাস্তায় জাঁকজমকহীন প্রাচীন ধরনের দোকানটিতে গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা
করতে থাকে বৃদ্ধ হুমায়ুন।এক সময়ের অত্যন্ত নামী দোকান।ঘরটির অন্য একটি
অংশে মীনা আর হুমায়ুন থাকে।দুই বৃদ্ধ-বৃ্দ্ধা আর পুত্র।কিছুটা দূরেই একটা
মসজিদ।বাড়ির গায়ে লাগোয়া একটা প্রেস এবং অন্যদিকে একটা স্কুল।শহরটা রাজ রাজড়ার আমলের শহর।

        জেসিমের কাহিনিঃজেসিমের জীবন
        জেসিম আজ অত্যন্ত সুখী।জেসিম নিজের বাড়িতেই মোবাইল ফোন মেরামতের দোকান খুলেছে।নিজের কষ্টের টাকা দিয়ে একটা কম্পিউটার কিনে একজন সহকারীর সাহায্যে সে রানিং দোকানটা চালাচ্ছে।জেসিম বেশি পড়াশোনা করেনি যদিও পৃথিবী দেখেছে।শহরে তার অনেক বন্ধু।এই পৃথিবীতে আপ টু ডেট হতে না পারলে,আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিতে না জানলে,পেছনে পড়ে থাকতে হবে।তাই জেসিম মোবাইল ফোন মেরামতের এই দোকানটা খুলেছে।পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য।নির্মল বাতাসের জন্য লড়াই।আজ সে সুখী।এই শহরের অলিতে গলিতে এখন মোবাইল ফোনের টাওয়ার।মোবাইল ছাড়া মানুষ চলতেই পারে না।তাই মোবাইল ফোনের
কাজটা করলেই যে পরিবারের  ভরণপোষণ ভালোভাবে করা যাবে সে কথা বোঝার জন্য ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক বুদ্ধির জেসিমের বেশিদিন লাগল না।

        প্রতিদিন বিকেলে জেসিম তার জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজটা করে।বড়শি দিয়ে মাছ ধরে।ভোরবেলা বাড়ির পাশের সরকারি পুকুরটাতে সে গোটা তিনেক জাল  পেতে রাখে।বিকেলের দিকে মাছ উঠাতে যায়...আর ঠিক সেই সময়টাতেই আনন্দে কিছুক্ষণ শিস দিতে দিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে।তারপরে কণটির সাহায্যে জালের মাছ ধরে।(কণটি একটি রাখাল ছেলে।পুকুরপারে ঘাসের জমিতে গরু ছেড়ে দিয়ে,রাখালের
কাজ করে)জেসিম একটা কম দামি হলেও কণটিকে সুন্দর মোবাইল উপহার
দিয়েছে।জেসিমের প্রতি কৃ্তজ্ঞ কণটি সারা দিন পাহারা দেয়,জেসিমের জালের
মাছ যাতে চোর চুরি করে নিয়ে না যায়।বিকেলের বাজারে এই মাছটা বিক্রি করে
জেসিম পরিবারের জন্য চাল জোগাড় করে।কখনও কখনও জেসিম কনটিকেও টাকা পয়সা দেয়।

        -জেসিম মাছ বিক্রি করে।জেসিম মোবাইল মেরামতির দোকান চালায়।জেসিম স্কুলে চৌকিদারের কাজও করে।জেসিমের সমস্ত কাজ সময়ের শৃঙ্খলায় বাঁধা।তার কাজ একটা নয়,তিন চারটে কাজ।চক্রাকার জীবন।কষ্টসাধ্য।মাঝরাতে ঘুমোতে যাবার আগে
নিজের সম্পর্কে চিন্তা করল জেসিম।আগামীকাল এবার ভোরে উঠতে হবে।

        কাকডাকা ভোরে তার জীবন শুরু হয়।সে অনেক কষ্ট করে।সকালের দিকে জেসিম হকার।সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি করে।সকাল ৮-৪৫ বাড়ির পাশে থাকা প্রাথমিক স্কুলটিতে ঘণ্টা বাজানোর কাজ করে।দিনটাতে তাকে চারবার ঘণ্টা বাজাতে হয়।প্রথমে স্কুল আরম্ভ হওয়ার সময়।পরে দুপুরের টিফিন পিরিয়ডে দুটো সংকেত।বিকেলে স্কুল ছুটির সংকেত।তার মাঝখানের সময়টুকু সে নতুন করে খোলা মোবাইল রিপেয়ারিংয়ের দোকানটিতে মনোনিবেশ করে।ছাত্র ছাত্রীর টিফিনের সময় সে ও বাড়ি এসে ভাত খেয়ে নেয়।

        এক অদ্ভুত ব্যস্ততার রুটিন জেসিমের।বিকেলে বাজারে মাছ বিক্রি করার পরে রাতে পুনরায় এগারো বারোটা পর্যন্ত বাড়ির পাশে খবরের কাগজ ছাপার প্রেসটাতে মেসিন মেনের সহকারী হিসেবে কাজ করে।ছাপাশালার যন্ত্রে কালো-লাল কালি ঢেলে দেওয়াই তার কাজ।

প্রতিদিনই,সে এই রুটিন অনুসারে চলে।স্কুল বন্ধের দিন মোবাইল মেরামতির দোকানে পুরো সময় দেয়।বিকেলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে,নাহলে একটা বিশেষ কাজে পাশের গ্রামে যায়।সেই গ্রামে তার প্রেমিকা থাকে।

       
ঘড়ির মালিক সেই নির্দিষ্ট গ্রাহকটি
 প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে।বাড়ির পেছনে থাকা উঠোনে দপদপ করে আগুন
জ্বলছে।হুমায়ুন আগুনের তাপ নিচ্ছে।আগুনের চারপাশে তিনজন
মানুষ।হুমায়ুন,তার ছেলে আর স্ত্রী।প্রত্যেকের গায়ে মাথায় গরম
কাপড়।ডিসেম্বর এলেই পাহাড়িয়া শহরটায় শীতের প্রকোপ বেড়ে যায়।দিনের বেলা রাস্তাঘাটে লোকজন থাকে না।শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কোথাও যেতে পারছে না।যে সমস্ত মানুষের জরুরি কাজ রয়েছে,তারা গরম কাপড় চোপড় পরে কোনোভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে।রাজপথে কেবল,কর্তব্য সম্পাদন করতে থাকা দুই চারজন আরক্ষীর লোক।তাছাড়া,প্রতিটি মানুষ নিজের নিজের ঘরের ভেতর আগুনের
তাপ নেওয়ায় ব্যস্ত।আগুন জ্বলা মানে যেন মানুষগুলির প্রাণটা বেঁচে থাকা।

        সাত বছর আগে এরকম এক ঠাণ্ডার দিনে হুমায়ুনের সঙ্গে মানুষটার দেখা
হয়েছিল।অভাবে পড়ে,এক প্রকার মরীয়া হয়েই হুমায়ুন ঘড়িটা মেরামতির দায়িত্ব
নিয়েছিল।ডিসেম্বরের হাত পা অবশ হয়ে যাওয়া বিকেলে গরম টুপি আর লম্বা
জ্যাকেট পরা বিদেশি মানুষটা দামি ঘড়িটা দিয়েছিল।কারুকার্যখচিত
ঘড়ি।অর্ধশিক্ষিত হলেও হুমায়ুন ভালো ঘড়ি মেকানিক।গাড়ি থেকে গম্ভীর
পদক্ষেপে নেমে আসা পর্যটক হুমায়ুনকে বলেছিলেন-‘ঘড়িটা ৩১ ডিসেম্বর
সন্ধ্যেবেলা এসে আমি নিয়ে যাব।আপনি ঠিক করে রাখবেন।যদি আমি না আসি ঘড়িটা আপনি নতুন বছরের উপহার বলে নিজের কাছে রেখে দেবেন।মানুষটা হুমায়ুনকে মেরামতির জন্য অগ্রিম টাকাও দিলেন।আর তারপরে এই অদ্ভুত প্রস্তাব।

        মানুষটার কথাগুলি ছিল রহস্যজনক।হুমায়ুন তার সমগ্র জীবনে এই ধরনের গ্রাহকের সাক্ষাৎ পায়নি।দোকানিকে গ্রাহকের ঘড়ি উপহার দেওয়া।

        -না,না মহাশয় আমি আপনার কাছ থেকে ঘড়িটা উপহার নেব কেন?এটা আপনার ঘড়ি।আপনি ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যেবেলা এসে ঘড়িটা নিয়ে যাবেন।আমি মেরামত করে রাখব।

        হুমায়ুন গ্রাহককে সেভাবে বলল ঠিকই কিন্তু মুশকিলটা হল,এর আগে এই ধরনের সুন্দর এবং দামি বিদেশি ঘড়ি হুমায়ুন দেখেই নি।মেরামতি করা পরের
কথা।কিন্তু তবুও অভাবী পরিবারটা চালানোর স্বার্থে পর্যটকের কাছ থেকে মোটা টাকার অগ্রিম নিতে বৃদ্ধ ঘড়ির মেকানিক হুমায়ুন কুণ্ঠা বোধ করল না।নানা কারুকার্যখচিত ঘড়িটা ঠিক করতে পারবে কিনা তা নিয়ে তার মনে কিছুটা দ্বন্দ্ব থেকে গেল।

        ঘড়ি মেকানিকের ঘর সংসার এক সময়ে রাজার শাসন চলা ছোট শহরটাতে হুমায়ুনই ছিল প্রথম ঘড়ির দোকানি।হুমায়ুনের পিতামহ এবং প্রপিতামহ রাজার ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক ছিলেন।তার পরিবার রাজার অধীনস্থ কর্মচারী।সাধারণ মানুষ যখন ঘড়ি দেখেইনি,তখন থেকে হুমায়ুনের পরিবার ঘড়ির মেরামতি,দেখাশোনার সঙ্গে জড়িত।

রাজার দিন শেষ হওয়ার পরেও হুমায়ুনের দাদু এবং পিতা ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক হয়েই জীবনটা পার করে দিয়েছে।এটা হুমায়ুনের বংশগৌ্রব।

        দাদুর সময়কার বৃত্তিটা কিছুটা পরিবর্তিত করে হুমায়ুন শহরটিতে প্রথম ঘড়ির দোকান খুলল।শহরের মানুষ নতুন ধরনের ঘড়ি দেখতে পেল।এটাই তার
আত্ম-গৌ্রব।শহরের সমস্ত মানুষকে সে ঘড়ি পরিয়েছে।কথাটা অবশ্য খুব একটা
মিথ্যা নয়,তাদের ছোট সমাজটিতে একসময়ে হুমায়ুনের ‘স্টেটাস’ই আলাদা
ছিল।ঘড়ির মেকানিক হুমায়ূন রাজমিস্ত্রি মাহতাবুদ্দিনের অতীব সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করাটা ছিল শহরের প্রধান খবর।বাজারের দোকানিদের মধ্যে হুমায়ুনই সেকেণ্ড হ্যাণ্ড হলেও প্রথম স্কুটার কিনেছিল। তখনকার দিনে শহরে
নতুন মডেলের ঘড়ি তার দোকানেই এসেছিল।

        তবে,সেটা ছিল দূর অতীতের কথা।হুমায়ুনের জীবনে এখন যৌবনের সুন্দর
স্মৃতিটুকুর বাইরে ভালো বলার মতো কিছুই নেই।অতীতকে কেন্দ্র করে, অতীতকে অবলম্বন করে বিধ্বস্ত একটা বর্তমানে সে বেঁচে রয়েছে।অসুস্থ শরীর।আর্থিক অনটন এবং নানা আনুষঙ্গি্ক সমস্যা।একসময়ে বন্ধুমহল তাকে সমীহ করতে বাধ্য হয়েছিল।কিন্তু আজ সমস্তই অতীত।নিমেষের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ল অহঙ্কারের সৌধ।যেন সময়ের শুকনো পাতা।

        -এখন আমি একেবারে নিঃসঙ্গ।পথের কুকুরের চেয়েও আমার অবস্থা খারাপ।

        এত খারাপ সময়।হুমায়ুন নিজেকেই নিজে বিড়বিড় করে অশালীন একটা গালি দিল।জীবন কতটা খারাপ হলে মানুষ নিজেকে নিজে এভাবে গালি দিতে পারে?অথচ একদিন ঘড়ির বিদ্যা তাকে মানুষ করেছিল।

        জীবনে সে একটা কাজই গুরুত্ব সহকারে করেছে,তা হল ঘড়ির মেরামতি
করা।পরিবারের মানুষের দৃষ্টিতে সে ভালো পিতা বা স্বামী হতে পেরেছে কিনা
জানে না।কিন্তু শহরে সে একজন ভালো এবং নামকরা ঘড়ির মেকানিক যে
ছিলেন,সেটাই তার অহঙ্কা্র।

        ঘড়িই ছিল হুমায়ুনের কাছে সমস্ত কিছু।ঘড়িই তার জীবন,তার
প্রেম। ঈশ্বর,আল্লা,গড।জীবনে ঘড়ি হুমায়ুনকে অনেক কিছু দিয়েছে।অন্যে ঈর্ষা করার মতো সুন্দরী স্ত্রী।নাম,যশ খ্যাতি।সত্যি ঘড়ি নামে ছোট যন্ত্রটার
কাছে হুমায়ুন কৃ্তজ্ঞ।তবে,আজ অভাব অনটনের মধ্যে জীবন ধারণ করতে গিয়ে
হুমায়ুন ক্লান্ত আর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।বার্ধক্য,অনটন,এবং নিঃসঙ্গতা যে
মানুষকে কতটা দুর্বল করে দেয়।

        প্রথম পুরুষে জেসিমঃমানুষ কতটা দৌড়াতে পারে?

        কাজ করে করে জেসিমের চুল পেকেছে।সে আর কত দৌড়াবে?সে তো আজ মেশিন নয়।মেসিনেরও কাজ করার একটা লিমিট থাকে।

        -মানুষের দৌড়ানর একটা সীমা থাকে।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চড়কির মতো ঘোরার একটা সীমা থাকে।এক একটি পয়সার জন্য,এক একটি ভাতের জন্য দৌড়াচ্ছি।সময়ের আগে আগে, সময়ের পেছনে পেছনে দৌড়ে চলেছি।ঘড়িও হয়তো আমার মতো দৌড়ায় না।

ঘড়ির গ্রাহক এবারও এলো না। বিদেশি গ্রাহক এবারও ঘড়িটা নিতে এলেন না।হুমায়ুনের রাগ।জীবন শেষ হতে
চলেছে। বালি ঘড়ি হয়ে।হুমায়ুন আগের মতো ঘড়িটাকে বাক্সের মধ্যে ভরে রাখল।রাগ গ্রাহকের ওপরে নয়,ছেলের ওপরে।হুমায়ুনের ছেলে ঘড়ির কাজ করে না।বাবাকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে যদিও, কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেয় না।ঘড়ির কাজের প্রতি ঘড়ির মেকানিকের ছেলের আগ্রহ নেই।দোকানটাতে সাহায্য করার মতো অবশিষ্ট একটি ছেলে মাত্র রয়েছে।

        -কতজনকে যে জীবনে কাজ শেখালাম।জীবনের কত তিক্ত-কষা অভিজ্ঞতা।হাত ধরে ধরে বুড়ো হুমায়ুন বহু ছেলেকে কাজ শিখিয়েছে।

        একদিন সেই ছেলেগুলিও দক্ষ মেকানিক হয়ে উঠল আর কাজ আয়ত্ত করে নিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিজের ব্যবসা খুলে বসল।কাজ শেখার পরে সাধারণত কেউ আর বেশিদিন থাকে না।বুড়ো বছরের পর বছর ধরে এই ঘটনার পুনরা্বৃত্তি দেখে আসছে।সেইজন্য সমস্ত পিতার মতো বুড়োর অন্তরেও একটিই মাত্র ইচ্ছা ছেলে ঘড়ির দোকানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিক।দোকানটা বেঁচে থাকুক,হুমায়ুনের মৃত্যুর
পরেও ব্যবসাটা বেঁচে থাকুক।

        পিতা-পুত্রের তর্কাতর্কিঃঘড়ির দোকান চলছে না।

রাজার দিনের শহরটির মধ্যিখানে পুরোনো ঘড়িস্তম্ভটা রয়েছে। রাজা সাজানো ঘড়িস্তম্ভটা শহরটির ঐতিহ্য আর মর্যাদার প্রতীক।এখন ঘড়ি স্তম্ভের কাজের জন্য দর যাচাই পত্র আহ্বান করা নিয়ে শহর উত্তাল।টিভি,খবরের কাগজে এই কয়েকদিন ঘড়িস্তম্ভের দর যাচাই পত্র নিয়ে গণ্ডগোলের খবর।দুটো প্রভাবশালী
ঠিকাদার গোষ্ঠী্র মধ্যে লড়াই।কে পাবে ঘড়িস্তম্ভের মেরামতের বিশাল অঙ্কের
ঠিকাদারির কাজ?

        -স্তম্ভে ঘড়ি লাগানোর জন্য একদল ঘড়ির মেকানিকের প্রয়োজন।

        কথাগুলি বুড়ো হুমায়ুনের কানে এসেছে।ঘড়ির সঙ্গে জড়িত পুরোনো পরিবার হিসেবে হুমায়ুনের ছেলেও নিয়মতে ঘড়িস্তম্ভে কাজ করার সুবিধাটা পাওয়া উচিত।সরকারের উচিত সুবিধটা তাদের পরিবারকেই দেওয়া।

        পুরোনো দিনের মানুষ হুমায়ুনের মনে এসব সহজ সরল হিসেব-নিকেশ।আধুনিক পৃথিবীর জটিল সব অঙ্ক বেচারা হুমায়ুন কীভাবেই বা বুঝতে পারবে?

        -বাবা আমাকে বলে –আমার ঘড়ির কাজ করা উচিত।ঘড়ির কাজ আমি কিছু কিছু জানি।কিন্তু,কী করব ঘড়ির কাজে আমার মন বসে না।বাবা বুঝতে পারেন না
যে,তিনি ‘আউট-ডেটেড’হয়ে গেছেন।

আজকাল পুরোনো ধরনের ঘড়ি বাজারে চলে না।মানুষ আর আগের মতো পুরোনো ঘড়ি মেরামতের জন্যও দোকানে দেয় না।এখন ডিজিটাল যুগ’।কম্পিউটারের যুগ।পুরোনো দিনের স্প্রিং আর চাবি লাগানো ঘড়ি এখন অচল হয়ে গেছে।মানুষ নতুনত্ব চায়।

        পুরোনো হয়েছে বলেই তো শহরের মাঝখানে উঁচু স্তম্ভে থাকা পুরোনো ঘড়িটা
বদলানোর জন্য জল্পনা কল্পনা চলছে।সেই ঘড়ি আর ঘড়ি মেকানিক হুমায়ুন দুজনেরই যুগ চলে গেছে।দুজনেই যেন দুটো পুরোনো যুগের প্রতিনিধি।

        -বাবার পুরোনো বিদ্যা উন্নত আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কীভাবে তাল মিলিয়ে চলবে?দোকানে গ্রাহকের সংখ্যা কমে গেছে।বাড়ির অবস্থাও দিনদিন খারাপ হয়েছে।

        -এসব কথা নিয়ে প্রায়ই আমার সঙ্গে বাবার তর্ক হত।তবে,আমার উদ্দেশ্য বাবার প্রতি কোনো প্রকার অশ্রদ্ধা প্রকাশ নয়।অভাবে আক্রান্ত হয়ে অকালে বুড়ো হয়ে যাওয়া বাবার সঙ্গে থেকে আমি আমাদের পরিবারের ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে সবল করতে চেয়েছিলাম।নিজের মনের মতো পরিশ্রম করে…।(কিন্তু বাবা একটা কথা জানেন না-ঘড়ি মেরামতি না করলেও যে আমি একটা ঘড়িতে পরিণত হয়েছি।)

        জেসিম সত্যিই ঘড়িতে পরিণত হয়েছে জেসিম নিজেই ঘড়িতে পরিণত হয়েছে।মানুষ ঘড়ি।জেসিম হুমায়ুনের
পুত্র।পরিবারের বোঝা কাঁধে নেওয়া পুত্র।

 পাখি জাগার আগেই সেই কাকভোরে পুকুরে নেমে মাছ ধরার জন্য জাল পাতে।দিনের অসংখ্য ব্যস্ততা থেকে শুরু করে রাত দুপুর পর্যন্ত প্রেসে কাজ।মোবাইল ফোনের মেরামতি।ঘরের বাজার-সামগ্রী।হকারের কাজ থেকে শুরু করে স্কুলে ঘণ্টা বাজানো পর্যন্ত অশেষ কষ্ট।স্বপ্নের যন্ত্রণা।শ্বাসরোধী ধোঁয়া।নিশ্বাস নেবার জন্য তার জীবনে কোনো রবিবার নেই।কেবল কাজ আর কাজ।সঙ্গের বন্ধুদের মতো অনেকদিন হাসি ঠাট্টা করতে পারেনি।ভালোভাবে হাসতে পারেনি।কী করব?আমাকে যে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে কাজ করতে হয়।দৌড়াতে হয়।এরকম মনে হয় যেন আমি নিজেই একটি ঘড়ি।আমার মধ্যে স্নায়ুর যুদ্ধ চলে। ঘড়ি এবং আমার মধ্যে এখন আর কোনো পার্থক্য নেই।

        সময় পার হয়ে গেলঃগ্রাহক এলো না এবং…
        সময় থেমে থাকল না।সময় পার হয়ে গেল।ডিসেম্বরের অন্তিম দিনটিতে আসব বলে গ্রাহকটি এলো না তো এলোই না।একদিন হুমায়ুনের দোকান একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।হুমায়ুন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ল।মাথায় দুনিয়ার চিন্তা ভাবনা নিয়ে কম সময়ের মধ্যে তার বয়স দ্রুত বেড়ে গেল।হুমায়ুন ঘর বন্দি হয়ে গেল।জীবন
যুদ্ধে ক্লান্ত হুমায়ুনের পত্নী মীনার একদিন মৃত্যু হল।রণভূমির বিধ্বস্ত সৈ্নিকের মতো হুমায়ুন একা বাড়ির ভেতরে বসে থাকে।জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে।কারও সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলে না।দোকান বন্ধ
হয়ে যাবার ছয় মাসের মধ্যে হুমায়ুনের বয়স দ্রুত দশ বছর বেড়ে যায়।

        এদিকে,যুবক বয়সে জেসিমেরও চুল পাকতে লাগল।হুমায়ুন টের পেল যে,সব শেষ।এখন আর কোনো মানুষ ঘড়ি মেরামতি করার জন্য আসবে না।তার মধ্যে শয্যাশায়ী অবস্থাতেই হুমায়ুন আশা করে,কেজানে সেই বিদেশি গ্রাহক হয়তো শীঘ্রই আসবে।ঘড়িটা হয়তো ফিরিয়ে নেবে।নিজের হাতে তৈরি ব্যবসার অপমৃত্যু দেখে হুমায়ুনের বুকে প্রচণ্ড শোক আঘাত করে।প্রতিদিনের ভোরের মতো আরও এক ভোরে ছোট শহরটাতে আজানের শব্দ ভেসে আসে।

        যন্ত্রের ঘড়িঃমানুষের ঘড়ি
        জেসিম বাবাকে ভাত খেতে দিলে বুড়োর পেটে ভাত যায় না।ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ল।প্রতিবেশীদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রায়ই হুমায়ুনের দোকানের বারান্দায় খেলাধুলো করতে আসে।একটি ছোট মেয়ে বেড়ার পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল।হঠাৎ ঘরের এক কোণে বহু বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকা,সেই সময়ের ‘সেকেণ্ড হ্যাণ্ড’স্কুটারটার দিকে হুমায়ুনের নজর পড়ল।

        স্কুটারটিতেও একটি ঘড়ি আছে-স্কুটারের মিটারটা।একটা সংখ্যা লেখা আছে,কত হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে স্কুটারটা।ওটা যেন স্কুটারটার জীবন মাপার ঘড়ি।–হুমায়ুনের মনে একটা অদ্ভুত চিন্তা এলো।

        সব জিনিসেরই একটা আয়ুকাল থাকে।দোকানটা বন্ধ হল।উপার্জন বন্ধ হল।গুরুত্ব হারাতে শুরু করল।অচল স্কুটারটার মরচে পড়া মিটারটার মতোই হুমায়ুনের জীবনকাল মাপা ঘড়িটাতেও যেন মরচে পড়তে শুরু করেছে।অচল হতে শুরু করেছে।

        -তারমানে,আমার দশাও স্কুটারের মতোই হবে নাকি?আমিও তাহলে অচল মুদ্রা হয়ে পড়লাম।এই ধরনের কথা ভাবতে ভাবতে হুমায়ুনের মাথাটা খারাপ হয়ে গেল।মৃত্যুর আশঙ্কা শেল হেনে স্নায়ুতে হাহাকার তোলে।মৃত্যুর অপেক্ষা যে বড় নিদারুণ অপেক্ষা।

        প্রথম পুরুষে জেসিমঃপিতার জন্য দুশ্চিন্তা
        -আমি জানি না আব্বার মনের ভেতর কী চলছে?আব্বাজান আজকাল দোকানে পূর্বপুরুষের দিনের একটি পুরোনো ঘড়ির দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকে।আমি জানি না,ঘড়িটা দাদুর কতটা আপন ছিল?আমি জানি না দাদুর স্বপ্ন কী ছিল?বাবা ঘড়িটার কাছ থেকে জানতে চাইছে নাকি দাদু কতটা পরিশ্রমী ছিলেন?দাদু কতটা দৌড়েছিলেন?বড়দাদু দাদুকে কী শিখিয়েছিলেন?দাদু ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক
ছিলেন।বাবা কিসের রক্ষক ছিলেন?ঘড়ির রক্ষক?না কি জীবনের দৌড় মাপা স্তম্ভের রক্ষক?

        -দাদু বড় দাদুর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে কিছুটা জমিমাটি হয়তো পেয়েছিলেন।আর পেয়েছিলেন কিছু প্রাচীন মূল্যবোধ।দাদুর স্বপ্ন হয়তো নিজের গ্রাম,বাড়ি বা মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।কিন্তু আমি আমার বাবাকে
দেখেছি,ঘড়ির পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াতে।বাবা নিজেকে নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠা।করেছিলেন।ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সমান তালে দৌড়েছিলেন।

        -কিন্তু আমাকে ঘড়ির আগে আগে দৌড়াতে হয়েছে।আমার স্বপ্ন কিন্তু দাদুর
দিনের বা বাবার দিনের নয়।এখন দিনগুলি বদলে গেছে।বাস্তবের আঘাতে মুক্তভাবে নিশ্বাস নেবার সময় নেই।অনেকদিন খোলা আকাশ দেখার সুযোগ পাইনি।আমি ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক নই।আমি স্তম্ভও নই,তাহলে আমি কী?আমি কে?আমি নিজেই ঘড়ি।নাকি?

        মৃত্যু শয্যায় হুমায়ুনঃবর্তমান শূন্য
        হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করে উঠল হুমায়ুন।এবার শেষ।সমস্ত যন্ত্রণার
শেষ।ডিসেম্বরের শীত বছর শেষ হওয়ার আভাস দিল।গ্রাহকটি এলে হুমায়ুন কী
উত্তর দেবে?

        -বর্তমান শূন্য মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে?যে মানুষের বর্তমান নেই,সেরকম
বর্তমান শূন্য মানুষ অতীতকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।তারফলে আমার বর্তমানই নয় ভবিষ্যতও শূন্য।

        ঋণগ্রস্ত হুমায়ুন ধার চাইতে পারে ভেবে প্রতিবেশীরা দেখতে আসা ছেড়ে
দিল।সরকারি পুকুরে মাছ ধরা এবং বাজারে বিক্রি করাও জেসিমের বন্ধ হয়ে
গেল।আকাশ থেকে খসে পড়ার মতো হঠাৎ একটি সরকারি পুকুরের পরিচালনা সমিতির জন্ম হল।সমিতি সিদ্ধান্ত নিল মাছ ধরা এবং বিক্রি করার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।বড় কোনো ব্যবসায়ীকে পুকুরটা লীজে দেওয়া হবে।জণগন একটা বাজার বসাবে এবং অঞ্চলটির মানুষ সস্তায় মাছ খাবে। বাবার শুশ্রূষায় লেগে থাকা ছোট ছেলে জেসিম এই সমস্ত কথার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারল না।জীবন যে মানুষকে হাত ধরে কোথায় নিয়ে যায়?

        তারচেয়েও খারাপ খবরটা হল হুমায়ুনের অসুখ আরও বেড়ে গেল।শরীর কাহিল হয়ে পড়ল।হাতে থাকা সামান্য টাকায় জেসিম বাবাকে শহরের একটি ছোট হাসপাতালে ভর্তি করাল।বিছানার পাশে থাকা জানালার পর্দাটা নাচতে থাকে।নাচতে থাকে,নাচতে থাকে।মৃত্যুর মুদ্রায়।

        -অপরিচিত বিদেশি গ্রাহকের মূল্যবান ঘড়িটা এত বছর আমার কাছে পড়ে আছে।ঘড়িটা তিনি ফিরে না পেলে খুব খারাপ হবে।জেসিমকে বলতে হবে,ঘড়িটা যেন যেভাবেই হোক না কেন গ্রাহক কে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

        জেসিমের মনের ভাব পরিবর্তনঃসে ঘড়ির কাজ করবে
        -ঘড়িটার দিকে তাকালেই সব কিছু উলটপালট হয়ে যায়।অপেক্ষা করার মতো সময়।নেই।বাবাকে সুস্থ করে তুলতে হবে।তাঁর ব্যবসায়ের দায়িত্ব নিতে হবে।বাবাকে চিকিৎসার জন্য বড় শহরের উন্নত মানের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

        মৃত্যু শয্যায় শায়িত বাবার মুখটা দেখতে দেখতে জেসিমের মনের ভাবের
পরিবর্তন ঘটতে থাকে।সে স্থির করল,বাবার কথা মেনে চলবে এবং সে ও ঘড়ির কাজ।করবে।যে কোনো প্রকারে টাকা পয়সা জোগাড় করে সে বাবার বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকান পুনরায় খুলবে এবং ব্যবসাটাকে ভালোভাবে দাঁড় করাবে।মোবাইল ফোনের দোকান এবং
ঘড়ির দোকান একসঙ্গে থাকবে।ঘড়ির সঙ্গে ওদের বংশের মর্যাদা জড়িয়ে
রয়েছে।বাবার সম্মানের কথা আছে।ছেলের এই সঙ্কল্পের কথা শুনে মৃত্যু
শয্যাতেও হুমায়ুনের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।বেঁচে থাকার বাসনা প্রথমবারের
মতো জেগে উঠল।

        ছেলের এই সঙ্কল্পের পরে আশ্চর্যজনক ভাবে হুমায়ুনের শরীরের উন্নতি হতে লাগল।মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অবস্থার বিপুল পরিবর্তন ঘটল।চিকিৎসকরাও অবাক হলেন।আসলে,অসুস্থ এবং বৃদ্ধ হুমায়ুনের অন্তরে বেঁচে থাকার আগ্রহ পুনরায় তীব্র হয়ে উঠল।জীবনের প্রতি,বেঁচে থাকার প্রতি আশ্চর্যভাবে হুমায়ুনের হঠাৎ মোহ বেড়ে গেল।হাসপাতাল ঘরের ঘড়ির টিকটিক শব্দের ছন্দে জানালার পর্দাটা নাচতে থাকে।নতুন বাতাস লেগে নতুন ছন্দে নাচতে থাকে।

        -‘বাবাকে বড় শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যা জেসিম।ভালোভাবে চিকিৎসা হলে ভালো হয়ে যাবে।আবার বেঁচে উঠবেন।’–ছোট শহরের ছোট হাসপাতালের চিকিৎসক জেসিমকে বলেছিল।অন্ধকারে দৌড়ে বেড়ানোর কী মানে হয়?

        টাকা,সময় এবং শ্বাস প্রশ্বাসঃ সময় এবং টাকা মানুষের কাছে হাত পেতে পেতে জেসিম ক্লান্ত হয়ে পড়ল।চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন।বাবার জীবনের প্রতিটি মিনিট,প্রতিটি সেকেণ্ড মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য টাকার প্রয়োজন।এখন একমাত্র টাকাই বাবাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

        জেসিম কষ্ট করে টাকা জোগাড় করল।তবু কিছুই হয় না।মাত্র কয়েক হাজার টাকা সংগ্রহ হলেই বাবাকে সে বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারবে।স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া বাবার জীবনে সংযোজিত হবে আরও কয়েকটি দিন,কয়েক ঘন্টা।চলতে থাকবে শ্বাস-প্রশ্বাস।

        -তার মানে টাকা দিয়ে বাড়ানো যায় জীবনের আয়ু ? জেসিমের মনে প্রশ্নের উদয় হয়।

        কয়েকমাস পরের কথাঃ বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল৷ বড় শহরের বড় হাসপাতালের বারান্দায় অনেক মানুষ রোগিকে পাহারা দিচ্ছে। কেউ
চেয়ারে,কেউ বারান্দার মেজেতে শুয়ে আছে বা বসে আছে। জেসিমের চোখে কিন্তু ঘুম নেই।দূর থেকে রাত দুটো বাজার সংকেত ভেসে এলো।জেসিম হাত ঘড়িটার দিকে তাকাল।মানুষ প্রার্থনা করে। বারান্দায় প্রার্থনার ধূপ।মৃত্যুর কালছায়া হয়ে ঘড়ি ঘিরে ধরে।ধূপ উড়ে যায়।

        -আর মাত্র তিন ঘণ্টার অপেক্ষা।সকাল পাঁচটার সময় সব শেষ হয়ে যাবে।

        জেসিমের জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং দুর্‍্যোগপূর্ণ এই রাতটা।পিতার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা।

        ঘড়িটার দিকে তাকালেই সমস্ত কিছু ওলোট পালট হয়ে যায়।রোদ চলে গিয়ে
বিবর্ণতা।মৃত্যুশয্যায় তাঁর জন্মদাতা।বিভিন্ন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে
রাতের বেলা হাসপাতালের বারান্দায় সে অপেক্ষা করে।অপরিচিত হয়েও মানুষগুলি যেন খুবই পরিচিত।মানুষের কী যে সহস্র আকূতি।সবার চেহারাতেই উদ্বিগ্নতার ছাপ।মানুষগুলি যেন একই সুতোয় বাঁধা।প্রতিজন না হলেও, হাসপাতালের বারান্দায় কেউ না কেউ অপেক্ষা করে রয়েছে আপন একজনের জীবন অন্ত পড়ার কঠোর খবেরর
জন্য। মানুষের মন আর মগজে কর্কটের মতো যেন ঘড়ির নির্দয়তা কিলবিল করতে থাকে।

        মৃত্যুর খবর এলেই এই অপেক্ষার অন্ত পড়বে।নিদারুণ।সময়ের প্রকাণ্ড ঘড়ি
প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলেছে।ঘড়ির ছায়া উঁচু থেকে উঁচু হতে থাকে।ঘড়ির বজ্র
আঘাতে সর্বাত্মক সংকট।প্রচণ্ড ঘণ্টা ধ্বনিতে সব শেষ।

        জেসিমের উপলদ্ধিঃমৃত্যু সম্পর্কে
        বাবা হাসপাতালে থাকতেই সে একটা ঘটনা দেখল।এটাই খুব কাছ থেকে তার প্রথম মৃত্যুকে দেখা।মায়ের মৃত্যুর সময় জেসিম কাছে ছিল না।দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত এক যুবককে চিকিৎসার জন্য আনা হল।ধনীঘরের যুবক।শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খারাপভাবে ক্ষতবিক্ষত।রক্তাক্ত দেহ।যুবকের হাতে একটা সোনার ঘড়ি।ঘড়িটা চলছে। জেসিমার চোখের সামনে জলজ্যান্ত ছেলেটি মারা গেল।স্পন্দন
স্তব্ধ হয়ে গেল।যুবকটির জীবনের সময় শেষ হল। কিন্তু হাত ঘড়িটা সেভাবেই
চলতে থাকল।জীবনের ঘড়ি বন্ধ হল,যন্ত্রের ঘড়ি চলতে থাকল। ঘড়ির রক্ষক হয়ে কে থেকে গেল?

        জীবনের ঘড়িঃমৃত্যুর ঘড়ি
        জেসিমের চোখের সামনে ভেসে আসে দুটো ঘড়ি।জীবনের ঘড়ি আর মৃত্যুর ঘড়ি।তিলে তিলে মৃত্যুর ঘড়ি গ্রাস করছে তার বাবার জীবন।সমস্ত কিছুই পূর্ব নির্ধারিত। সকাল পাঁচটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভেন্টিলেশন খুলে দেওয়া হবে।ঘড়ির সংকেতের সঙ্গে সঙ্গে।

        -ভেন্টিলেশন সরিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যাবে ঘড়ি মেকানিকের
ঘড়ি।মৃত্যুর ঘড়ির হাতের ইশারার কথা বিন্দুমাত্র আভাস না পেয়ে হৃদস্পন্দন
চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে।জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে যন্ত্রণাহীনভাবে চিরমুক্তি লাভ করবে। হুমায়ুন নামে ঘড়ি মেকানিক অতীত হয়ে যাবে।মানুষ বলবে,‘এখানে একজন ঘড়ির মেকানিক ছিল,এখানে একটি ঘড়ির দোকান
ছিল।’ঘড়িকে প্রত্যহ্বান জানানোর মানুষের কি স্পর্ধা আছে?চরম সত্যকে মানুষ মেনে নিতে বাধ্য।ঘড়ি চিরসত্যের প্রতীক।

        মানুষগুলি এক একটি ঘড়ি
        নির্দিষ্ট সময়ে ভেন্টিলেশন খুলে দেওয়া হল। সামনের একটি মসজিদ থেকে আজানের পবিত্র শব্দ ভেসে আসার সময় হুমায়ুন চিরবিদায় নিল।একটা ঘড়ি স্তব্ধ হল।বাবার মৃতদেহের সঙ্গে বিভিন্ন মানুষের মৃতদেহগুলি দেখার সঙ্গে সঙ্গে জেসিমের প্রথমে বুক কেঁপে উঠল।হিন্দু,মুসলমান,খ্রিস্টান বা পৃথিবীর কোনো ধর্মেরই পরিচয় নেই মর্গে।সৎ বা অসৎ,সমস্ত ধরনের মানুষ একসঙ্গে
চিরনিদ্রায়।একটাই মাত্র পরিচয়-এরা সবাই এখন এক একটি মৃতদেহ।

        -সমস্ত মৃতদেহগুলি যেন এক একটি স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি।নির্দিষ্ট সময়ে
বন্ধ হয়ে গেছে।বাবার নিথর দেহটা দেখে সমস্ত পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেছে বলে
মনে হল জেসিমের।

        কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু হলে কি পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়?পৃথিবী চলতে
থাকে,কোনো মানুষই পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য নয়।জেসিমের বাবার মৃত্যুর দিনেও রাজপথে মানুষের আগের মতোই প্রচণ্ড ব্যস্ততা।যানবাহনের নিয়মিত গতি
অব্যাহত।নগরের মানুষের চিরাচরিত এই অবিরাম ব্যস্ততা দেখে জেসিমের একটা
নতূন উপলদ্ধি হল-
        -সমস্ত মানুষ যেন ঘড়ির নির্দেশে চলেছে।অন্যদিকে তাকানোর মতো সময় নেই।

        ঘড়িকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার অবিরাম প্রতিযোগিতা।কারও কাউকে দেখার সময় নেই।সামনে মাত্র একটাই কথা।নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।সময়ের তীর সময়ে নিক্ষেপ করতে হবে।ঘড়ির কাঁটা সংকেত দেবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়।সমগ্র দিনের জন্য।দৌড়াতে হবে,বেঁচে থাকতে হবে।এটাই মূলমন্ত্র।দৌড়াতে না পারলে জীবনটাই যেন অচল।বোমা ফেটে মানুষের মৃত্যু
হোক,মহামারী,বন্যা,প্রলয় নেমে আসুক-কিছুই দেখার সময় নেই।সময়ের হিসেব সময়ে দিতে হবে।নিজের পেটের জোগাড় নিজেকেই করতে হবে।একটা স্বপ্নের ঘর তৈরি করতে হবে।প্রত্যেকের মনের ভেতরে যেন অবিরাম সতর্কবার্তা-সময় নেই যে হায়।

        জেসিম জানে না বিদেশি ঘড়িটার কী হল?

        কিন্তু জেসিম জানল না,অন্য একটি ঘড়ির কথা।বিদেশি গ্রাহককে সেই ঘড়িটা
ফিরিয়ে না দিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিল ঘড়ির মেকানিক হুমায়ুন।সেটা কোনো সাধারণ ঘড়ি ছিল না।বিদেশি ঘড়িটা ছিল মূল্যবান হীরায় কারুকার্যখচিত।বাজারে কম পক্ষে কোটি টাকা যার দাম।হুমায়ুন সেই রহস্য জানত।হুমায়ুন ইচ্ছা করলে হীরাখচিত ঘড়িটা বিক্রি করে জীবনের সমস্ত আর্থিক সমস্যার সমাধান করতে পারত।আর্থিক সঙ্কটে ক্ষতবিক্ষত হওয়া সত্তেও একবারও তার মনে এই চিন্তা আসেনি।

        ঘড়িটার বিষয়ে জেনেশুনেও ছেলেকে কিছুই বলে গেল না।হুমায়ুন কেবল একটি কথাই।বলেছিল-‘ঘড়িটা গ্রাহককে ফিরিয়ে দিতে হবে।মানুষটা ৩১ ডিসেম্বরের দিন ফিরে আসবে।এবছর নাহলে আগামী বছর।’এটাই ছোট শহরের ঘড়ি মেকানিক হুমায়ুনের মতো
সাধারণ মানুষগুলির সততা।সোনালী বিবেক।

        ঘড়ির নির্দেশে জরা-মৃত্যুঃসময়ের তীর সময়েই চালাতে হবে।

        আসলে,ঘড়ির নির্দেশে আমরা চলেছি।এই যে আমাদের জীবন,এই যে দৌড়া-দৌড়ি।সমস্ত কিছুই চলছে ঘড়ির নির্দেশে।‘সময়ের তীর সময়েই চালাতে হবে’-সেই যে বড় দাদু কথাটা শিখিয়ে গিয়েছিল।সেটাকেই শিরোধার্য করে যেন চলেছি।জীবনের সমস্ত কাজের জন্য আমরা একটা সময় ঠিক করে নিয়েছি।এই বয়সে বিদ্যা অর্জন,এই বয়সে
জীবিকা আর এই বয়সে বিয়ে।এভাবেই বার্ধক্য,জরা এবং মৃত্যু।পরম্পরা এবং রীতি নীতিতে আবদ্ধ একটা ঘড়ির নির্দেশে সমাজ এভাবেই চলছে।পুরুষ থেকে পুরুষান্তরে।প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।পৌ্নঃপৌ্নিক ভাবে।জেসিমের
জীবন,হুমায়ুনের জীবন বা আপনার জীবন ঘড়ির পেছনে দৌড়ে চলেছে, নিরন্তর দৌড়ে চলেছে।

        মানুষেরা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। জেসিম হাসপাতালের তৃতীয় তলা থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল,রাজপথে দৌড়াতে থাকা মানুষগুলি ঘড়িতে পরিণত হয়েছে।ঘড়িতে পরিণত হয়েছে জীবন্ত
মানুষগুলি।মানুষেরা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।এই শহরেও একটা ঘড়িস্তম্ভ
আছে। তবে,ঘড়িস্তম্ভের রক্ষক কে?
------


লেখক পরিচিতি :

স্বকীয় গল্পশৈ্লীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত পঙ্কজ কুমার দত্ত
সাম্প্রতিক অসমিয়া সাহিত্যের এক বলিষ্ঠ গল্পকার।১৯৭৯ সনে অসমের ডিব্রুগড়
জেলায় জন্ম।পেশায় দূরদর্শনের সাংবাদিক শ্রীদত্ত মুনীন বরকটকী বঁটা এবং অন্যান্য পুরস্কা্রে সম্মানিত।শ্রীদত্তের গল্প বাংলা,ওড়িয়া,হিন্দি,বড়ো
ইত্যাদি ভাষায় অনূদিত হয়ে সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ
করেছে। ‘ঘড়িস্তম্ভ’লেখকের সম্প্রতি প্রকাশিত গল্প সংকলন।
অনুবাদক পরিচিতি -১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের
জন্ম হয়। ১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে বাংলা সাহিত্য ও
ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা চারশো
পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে
অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সন্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া
ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য  Distinguished Life Membership
এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন