রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

কাজল সেনের ঝুরোগল্প : চাপ




স্টিল এক্সপ্রেস থেকে নেমে প্রায় এক্সপ্রেসের গতিতে ছুটছিলাম প্রিপেড ট্যাক্সির লাইন দেবার জন্য। কিন্তু থামতে হল। দেখলাম ছন্দিতাও ট্রেন থেকে নেমে শান্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চলতে চলতে হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে  যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি ধরে ফেললাম পেছন থেকে। এর আগে  কখনও ছন্দিতার শরীর আমি স্পর্শ করিনি, মানে সেই সুযোগই ঘটেনি। অথচ সেদিন অভাবিত ভাবে সেই সুযোগ পেয়ে আমি রোমাঞ্চিত হলেও একটা সৌজন্যবোধ ও কর্তব্যবোধের তাড়নায় ছন্দিতাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে দিলাম। সামলে  নিতে একটু সময় নিয়েছিল ছন্দিতা। তারপর আলতো হেসে আলতো ভাবেই আমার হাতের বেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল। অনেক ধন্যবাদ অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিল, ভাগ্যিস আপনি ছিলেন! না হলে কী যে বিপদে পড়তাম! আমি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলাম, তোমার কি হাইপ্রেশার? খুব সাবধানে থেকো। ছন্দিতা মাথা নেড়ে বলেছিল, না না, প্রেশার ট্রেশার নয়, এখন আমি ঠিক আছি। চলুন, এবার যাওয়া যাক।

অস্বীকার করে লাভ নেই, ছন্দিতার রূপ মারকাটারি। সেইসঙ্গে আমাদের মতো চ্যাঙড়াদের বুক তোলপাড় করা যৌবন। কিন্তু সবকিছুই দূর থেকে। মুখোমুখি হয়ে ছন্দিতাকে প্রেম নিবেদন করা বা বন্ধুত্বের অছিলায় টুক করে তার শরীর ছোঁয়ার হিম্মত আমাদের কারোরই নেই। আর তাই, অকল্পনীয়ভাবে সেই সুযোগ  লাভ করে এত তাড়াতাড়ি তার সমাপ্তি টানার একেবারেই ইচ্ছে হচ্ছিল না। বললাম, এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? আরও একটু বস। শরীরটা পুরোপুরি সুস্থ হোক। চিন্তা কোরো না, আমি তোমাকে তোমার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে তবেই  নিজের কাজে যাব। এভাবে একলা তোমাকে ছেড়ে যেতে তো পারি না! আবার যদি মাথা ঘুরে ওঠে!

ছন্দিতাকে আরও কিছুক্ষণ বসতেই হলো। বিপদের মুহূর্তে আমি পাশে দাঁড়িয়েছি। নিজের ওয়াটার বটল থেকে তাকে জল খাইয়েছি, চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়েছি, এমনকি ব্যাগ থেকে আমার নতুন রুমাল বের করে যত্ন করে তার মুখ মুছেও দিয়েছি। ভদ্রতাবোধ বলেও তো একটা ব্যাপার আছে! আমার  অনুরোধ পাশ কাটিয়ে সে চলে যেতে পারে নাকি!

কিছুক্ষণ গল্প হলো। আমি আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নিজের উচ্চশিক্ষার কথা ফলাও করে বললাম। এটাও জানিয়ে দিলাম যে, বিশাল অঙ্কের চাকরির অফার পেলেই স্টেটসে চলে যাব। যথাসময়ে গ্রীনকার্ডের জন্য অ্যাপ্লাইও করব।  তুমি তো এখন জুলজিতে মার্স্টার্স করছ, তাই না? খুব ভালো। তুমি স্টেটসে  গিয়ে এরপর পি এইচ ডি করতে পার। খুব বড় বড় নামকরা ইউনিভার্সিটি আছে। কোনো চিন্তা কোরো না। আমি গিয়ে সব ব্যবস্থা করব।

প্রিপেড ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে যথারীতি ট্যাক্সি ধরলাম। রফা হলো, প্রথমে মানিকতলায় ছন্দিতাকে তার কাকার বাড়িতে পৌঁছে দেব। তারপর আমি সেই ট্যাক্সিতেই যাব টালিগঞ্জ।

ছন্দিতা নীরবই ছিল। শুভানুধ্যায়ী আমি বললাম, তুমি কিন্তু ব্লাডপ্রেশারটা চেক  করিয়ে নিও! এবার ছন্দিতা মুখ খুলল। বলল, আপনি চিন্তা করবেন না। আসলে এখন তো আমার প্রেগন্যান্সির চারমাস চলছে। তাই হয়তো মাথাটা হঠাৎ...  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন