সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

রাজু বিশ্বাসের গল্প : জলকুমারী



সাইকেলটা কটর মটর আওয়াজ তুলে ছুটে চলেছে  ইছামতীর বড় বাঁকটার কাছে।  প্রায়  আট  দশ বছর হয়ে গেল ওখানে নদীর মধ্যে কচ্ছপের পিঠের মত একটা বড় চরার সৃষ্টি হয়েছে। পলি জমে জমে একটা সবুজ ঘাসের দেশ হয়ে গেছে। পাখিরা ঠোঁটে করে ফলের বীজ নিয়ে ফেলে সেই দেশে। দুএকটা করে গাছ জন্মাতে জন্মাতে ছোটখাটো একটা জঙ্গলও হয়ে গেছে। এখানে নদী বাঁকটা অনেকটাই ঘোড়ার খুড়ের মত। ওপারে সদর শহর। বাঁকের মুখেই একটা ছোট বিজলির ছাওনি দেওয়া ঘর। ওটা খেয়া খাট। একটাই নৌকা চলে। মাঝি বেচু বৈদ্য হাল টানা ছোট্ট ডিঙি নৌকায় যাত্রী পারাপার করে সারাদিন। সেই ভোর পাঁচটায় আসে, আর বাড়ি ফেরে রাত নটায়। মাঝখানে দুবার তার ভাইপো রাজা এসে কাকাকে খাবার দিয়ে যায়। সকালে আর দুপুরে। বেচু আগে মাছ ধরার কাজ করত। মাঝির আসল নাম বেচারাম বৈদ্য। দক্ষিন চব্বিশ পরগনার বাসন্তী গোসাবা ক্যানিং হয়ে সে সোজা নৌকা নিয়ে চলে যেত কাকদ্বীপ পর্যন্ত। তখন অল্প বয়স, শরীরে আর মনে ভয় বলে কোনও বস্তু ছিল না। রাতের পর রাত কাটিয়ে দিত নদীর বুকে। নদী থেকে পাড়ি দিত উত্তাল বঙ্গোপসাগরের গভীরে। আজো যাত্রীদের একা পেলে নদীতে ছোট্ট ডিঙি নৌকার হাল বাইতে বাইতে বেচু শোনায় তার অতীত দিনের দুঃসাহসিক সব অভিযানের গল্প।
সাইকেলটা এসে দাঁড়ায় নদীর বড় বাঁকটার কাছে। সওয়ারি মধু বিশ্বাস সাইকেলটা একটা কাঁটা ভরা বাবলা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে এসে দাঁড়ায় ঘাটের কাছে। নৌকা ওপারে। জলের স্রোত প্রবল গতিতে বয়ে যাচ্ছে ঘাটের কাছ দিয়ে। অথচ মাঝ নদীটা আশ্চর্য রকম শান্ত। মধু একটা বিড়ি ধরানোর চেষ্টা করে। প্রবল উত্তুরে হাওয়ায় বারবার নিভে যেতে থাকে দেশলাইয়ের কাঠিটা। বিরক্ত হয়ে খেয়াঘাটের বিজলির ছাওয়া ঘরটার ভিতর ঢুকে বিড়িটা ধরিয়েই ফেলে সে। লম্বা একটা সুখটান দিয়ে সামনে তাকায়। নদীর জলে একটা মরা গরু ভাসতে ভাসতে চলেছে। কয়েকটা কাক গোরুটার উপর বসে; তারাও স্রোতের টানে ভেসে চলেছে । মধু নাকে মাংস পচা গন্ধ পায়। এই গন্ধটা ছেলেবেলা থেকেই শুঁকছে সে, তাই তেমন বিকার নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে বেচু মাঝি এসে বসে ওদের মধ্যে। পারে বাঁধা নৌকাটা নদীর ঢেউয়ে আরামসে দোল খায়। দুপুর বেলা যাত্রী হয় না তেমন। বেচু এসে বসতেই মধু তার বড় ময়লা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা দেশি মদের পাইট বের  করতে করতে বলে, বেচু দা  তোমারে একটা কথা বলব?
কী কথা বল...
     বলতিচি তুমি আবার একটা বে করো। কদ্দিন আর মরা বউয়ির ভূত ঘাড়ে নে বেড়াবা! তুমি একা থাকো, একটা মানুষ এলি কত সুবিধে হয়।
বেচু আকাশের দিকে তাকায়। অনেক দূরে আকাশের গা ছুঁয়ে চিল উড়ছে। অত বড় আকাশে একাকী চিলটাকে দেখে বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। বেচু বলে, নাহ, বে থা আর করবো না। যদ্দিন বাঁচি এই নদীর সঙ্গেই থাকবো।
ধুত, তোমার মাথা খারাপ হয়ি গেচে, নদীর সঙ্গে কেউ থাকতি পারে?
আমি তো থাকি।
সে তো সব জেলেরাই থাকে, যারা মাছ ধরে...
না, সবাই নদীর সঙ্গে থাকতি পারে না। নদী যার তার সঙ্গে থাকে না। যে তারে মন দিয়ে ভালবাসে, নদী একমাত্র তার সঙ্গেই থাকতি রাজি হয়।
মধু প্লাস্টিকের গ্লাসে  পেগ বানাতে বানাতে বলে, নদী কি মানুষ নাকি?
নদী তো আসলে মানুষই। আস্ত একটা মানুষ। না... আসলে মানুষ নয়, মানুষী।
বেচু মদের  তেমন ভক্ত নয়। ওর চলে বাবার প্রসাদ। তবে একমাত্র মধু এলেই একটু আধটু পেটে পড়ে। মধু তার চেয়ে বছর ছয়েকের ছোট। বদ্যি পাড়াতেই বাড়ি। মধু সবজির ব্যবসা করে। সকালবেলা কলা কচু ওল লঙ্কা, নানান রকম শাক, কলাগাছের থোর, মোচা-এই সব জোগাড় করে নিয়ে যায় হরিপুরের বাজারে।  মধুর সংসারে চার মেয়ে। একজন ওর বৃদ্ধা মা, চোখে ভালো দেখতে পায় না। অন্য জন ওর বউ সুন্দরী; আর ওর পিঠোপিঠি দুই মেয়ে জয়িতা আর যূথিকা। মধুর মদ খাওয়া নিয়ে প্রায়শই তার বাড়িতে ভয়ানক অশান্তি হয়। একবার তো তার বউ গলায় দড়ি দিয়েই ফেলেছিল; কার্তিকের বউ পুকুর পারের আমগাছে শুকনো কাঠ ভাঙতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল বলে সে যাত্রায় রক্ষে। মধু তবু মদ খাওয়া ছাড়তে পারে না। অনেকটা পানের পর মধুর চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মত লাল হয়ে আসে। বেচু বলে, আর খাস না মধু, বাড়ি যেতে পারবি না।
মধু বেচুর কথার আমল দেয় না। কানে গুজে রাখা গাঁজা ভরা বিড়িটা বার করে দুই আঙ্গুলের মাঝখানে রেখে কয়েকবার পাক দিয়ে তারপর ধরিয়ে ফেলে।
নেশা চরার পর বাবার পোসাদ পেটে না পড়লে কী  হয়, আব আয়েগা মজা।
বেচু মধুকে নিয়ে বেকায়দায় পড়ে। উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই তার। মধুর লজঝরে সাইকেলটা তুলে নিয়ে তারপর মধুর পলকা দেহটাকে নৌকায় শুইয়ে বেচু রেখে আসে তাদের পাড়ার ঘাটে। মধুর বড় মেয়ে জয়িতা এসে  মদ্যপ বাবাকে সাবধানে ধরে নিয়ে যায়। জয়িতা বাবাকে অসম্ভব ভালবাসে। বাবার কোনও দোষেই সে  রাগ করতে পারে না ।
মধুকে দিয়ে বেচু নৌকা নিয়ে আবার চলে আসে খেয়া ঘাটে। ও পারে  একশো দিনের কাজে যাওয়া শ্রমিকদের ফেরার সময় হয়ে গেছে। সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। বেচুর ভাইপো রাজা কাকার জন্য ভাত নিয়ে বসে আছে নদীর ঘাটে। মধুকে রেখে ফিরতে গিয়ে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে আজ। বেচু তারাতারি করে নৌকার তলপেটের মধ্যে রাখা নারকোল তেলের শিশিটা বের করে মাথায় খুব করে তেল মেখে নৌকা থেকেই ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। ইছামতীর জল এখন বেশ মিষ্টি আর স্বচ্ছ। কিছু দিন পর নোনা জল ঢুকলে নদীর জল আবার ভীষণ ঘোলা হয়ে যাবে।  বেচু দ্রুত স্নান সেরে উঠে আসে ডাঙায়। রাজা ভাত নিয়ে বসে আছে কিশোর অশ্বত্থ গাছটার নীচে। অনেকটা শুকনো পাতা জমে আছে । ভাত খেতে বসেই বেচু ও পার থেকে শ্রমিকদের ডাক শুনতে পায়, ও... বেচুদা তারাতারি এস...।
বেচু হাঁক দিয়ে উত্তর দেয়, ভাত খাচ্ছি, একটু সবুর করো...।
এই বাঁকের মুখে নদীটা বেশ চওড়া। তবে নদীগর্ভ খুব বেশি গভীর নয়, পলি জমে জমে কেমন বুড়িয়ে এসেছে সে। তবে এপারের মানুষের ডাক ওপারে  চলে যায়।  বেচু খেতে খেতে ভাইপোর দিকে তাকায়। বছর একুশের তরুণ রাজা। বেশ ফরসা ছেলে। বাবার মত কালো হয়নি। তবে মুখের গঠন অনেকটা তার মতই। বুকের চওড়া ছাতি, মাথা ভরতি কুচকুচে কালো চুল, সুঠাম মাংসপেশি...সব মিলিয়ে রাজার মতই চেহারা তার।
নৌকা বাইতে বাইতে বেচুর মনে পড়ে ভাইপোর বয়সেই  অচিন দেশের  এক সমুদ্রকন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। সমুদ্র পাড়ে মাছ শিকারিদের জাল ঝারা কুচো মাছ কুঁড়াতো সে। বছর সতেরোর কুঁচবরণ কিশোরীটি...।  একুশ- বাইশের যুবক বেচারাম । ভরা বর্ষায় সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে ইলিশ মাছ ধরতে যায়  সে। ক্ষ্যাপা বঙ্গোপসাগরের  নীল ঢেউয়ের মাথায় চেপে তার তখন সে কী দুরন্ত উল্লাস! সারাদিন সমুদ্রে কাটিয়ে সন্ধে বেলা ট্রলার ভর্তি রুপোলী শস্য নিয়ে যখন পারে  ফিরত, রোজ দেখত সেই জলকন্যা বিস্তীর্ণ শাদা বালির উপর রাখা সার বাঁধা ট্রলারগুলোর কাছ থেকে থেকে কুচো মাছ কুঁড়িয়ে নিয়ে যায়। কোথায় যায়? একদিন পিছু নিয়ে বেচারাম দেখে এল মেয়েটার বাড়ি। বাড়ি নয়,  ঝাউ বনের ধারে অস্থায়ী বাসা। জেলেদের বাদ দেওয়া জাল আর চাঁচ দিয়ে ঘেরা, প্লাস্টিক ছাওয়া সে ঘরে ঠাকুমার সঙ্গে থাকে মেয়েটি। কুড়ানো মাছ বিক্রি করে কোনও রকমে চলে। বর্ষায় পেপার ফুটো হয়ে জল পড়ে সে ঘরে। সমুদ্রের উত্তাল হাওয়া ধুলোবালি উড়িয়ে নিয়ে ফেলে  ঘরের ভিতর। মেয়েটার ঠাকুমার বয়স আশির কাছে। বেচারাম খোঁজ নিয়ে জানে মেয়েটার বাড়ি আসলে মেদিনীপুর। ওর বাবা নৌকা তৈরির কাজ করত। একবার টাকা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় ট্রলার মালিকরা তার বাবাকে মেরে পুঁতে দেয় সমুদ্রের চরায়। বারো দিন পর ভেসে ওঠে সেই পচা গলা মাছে খাওয়া ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাশ। পুলিশ  আসে। কেউ ধরা পড়ে না। ট্রলার মালিকরা টাকা খাইয়ে পুলিশের মুখ বন্ধ করে দেয়। তার কিছুদিন পর মেয়েটার মা এক ট্রলার মালিকের হাত ধরে চলে যায়। যে ঘরে ভাড়া থাকত তার ঘর মালিক টাকা না পেয়ে সেই ঘর থেকে বার করে দেয় অসহায় এক বৃদ্ধা আর তার কিশোরী নাতনিটিকে। তারপর ঠাঁই হয় সেই সমুদ্রপারের ঝাউবনের ধারে। কাছাকাছি অস্থায়ীভাবে বাসা বেধে থাকে আরও দশ-বারোটা পরিবার।
 বেচারাম তখন সুদর্শন যুবক আর পাক্কা এক মাঝি। কালো ইস্পাতের মত শরীর নিয়ে একদিন সে এসে দাঁড়ায় মেয়েটার সামনে। মাছ কুঁড়াতে কুঁড়াতে সেই জলকন্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল এই ভিনদেশের ছেলেটার দিকে। মনের  বিবর্ণ আকাশে  বসন্তের  রঙিন আবির ছড়াতে বেশি দেরি হয়নি। মাঝি বুঝেছিল, এই জলকন্যাকে ছাড়া জীবন তার ব্যর্থ।  এক ভরা বরষার দিনে সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে গিয়েছিল মাঝি। ট্রলার  যখন  গভীর জলে, জালে উঠে আসছে অসংখ্য রূপোর চাঁদ, তখন সমুদ্রের আকাশ বীভৎস কালো হয়ে উঠল প্রবল ঝড়। কোনও রকমে সেদিন ট্রলার নিয়ে সে ফিরে আসে তীরে; কিন্তু ট্রলার জলের ঢেউয়ে ভেসে যায় মাঝ সমুদ্রের দিকে। উদ্ভ্রান্ত মাঝি সমুদ্রের চরায় শুয়ে পরে। ঝড় থেমে আসে মাঝ রাতের দিকে। জনশূন্য সমুদ্র পার। শুধু জলের ঢেউয়ের একটানা গর্জন। বিবশ হয়ে আসতে থাকে মাঝির শরীর। ঘুম নেমে আসে তার চোখে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সে অনুভব করে তার চুলের ভিতর একটা কোমল হাতের আঙুল চলাফেরা করছে। চোখ মেলে মাঝি দেখে সেই জলকন্যাকে । জলকন্যা কী জাদু জানে! ঝড়ের সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া মাঝিকে খুঁজতে খুঁজতে মেয়েটা চলে এসেছে সমুদ্র পারে। মাঝি উঠে বসে। মেয়েটা মাঝির হাত ধরে। তার পর নিঃশব্দে মাঝিকে নিয়ে মাঝ রাতের সমুদ্রসৈকতের নীল অন্ধকারে হেঁটে যায়। মাঝি নিশিপাওয়া মানুষের মত সেই  জলকন্যার সঙ্গে গিয়ে পৌঁছায় ঝাউবনের মধ্যে। জলকন্যা মায়াবী সতেরোটি পাপড়ি মেলে ধরে গর্ভকেশর উন্মুক্ত করে দেয়। সে ফুলের গন্ধে মাঝির বাইশ বছরের যৌবন মাতাল হয়ে ওঠে। ঝড়ের পর আশ্চর্য শান্ত সমুদ্র পারের আকাশে ভরাট চাঁদ; সে জ্যোৎস্নায় দুটি মানুষ এক হয়ে মিশে যায়।  মধুচন্দ্রিমা কী এর চেয়েও মধুর হতে পারে! মাঝি সেই প্রথম নারী শরীরের স্বাদ পেয়ে বুঝেছিল একজন নারী আসলে একটা সমুদ্রের চেয়েও গভীর। সেই গভীরে হাজার হাজার ট্রলার দিকভ্রান্ত হয়ে ভেসে যেতে পারে।
নৌকা পারে পৌঁছায়। শ্রমিকরা নেমে পড়ে । বেচু পয়সা গুনে নিয়ে ঘাটে নৌকা বেঁধে পারে উঠে যায়। বড় ক্লান্ত লাগছে। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হাল টেনে নৌকা বাওয়ার মত শক্তি তার ফুরিয়ে আসছে। এখন এ পার থেকে ওই পারে যেতে যেতেই হাঁপ ধরে যায় বুকে। তবু সে মাঝে মাঝে সে অনুভব করে সেই দুরন্ত নাবিকী রক্ত এখনো প্রবাহিত হয়ে চলেছে তার শরীরে। বেচু একটা বিড়ি ধরায়; তার পর গিয়ে বসে নদীর বাঁকটার কাছে। গৃহিণী নদীটার পারে বসে কান  পেতে সে শোনার চেষ্টা করে বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসা বঙ্গোপসাগরের উন্মত্ত গর্জন...। কিন্তু কিছুই শোনা যায় না। নদী এখানে শান্ত। নিঝুম দুপুরে ফ্যাকাসে আকাশ; বিবর্ণ নদীর জল। কেবল পারে গজিয়ে ওঠা আকন্দ ঝোপ থেকে শোনা যায় হট্টিটি পাখিদের নরম ডাক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন