রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

রাজশ্রী রাহা চক্রবর্তীর গল্প : তন্দ্রা





' বৌদি , বিস্কুট নেবে ? '
একটু অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটছিল রাজিয়া । অলসভাবে তাকাল  মেয়েটির দিকে । ওর চোখ সরাসরি পড়ল মেয়েটির করুন আকুতি ভরা দুটি চোখের ওপর ।
' নাও না বৌদি । '
'  বিস্কুট ? আমি এখনি কিনেছি । ' রাজিয়া বলল ।
' খুব ভালো বিস্কুট আছে বৌদি । খাস্তা , নোনতা , মিষ্টি , ক্রীম সব পাবে ।
রাজিয়া জোর করে না বলতে পারে না ।
' আচ্ছা চল ,  বাড়ি যাই , দেখি‌ কী বিস্কুট , পছন্দ না হলে নেব না‌ কিন্তু ।'
মিষ্টি হেসে মেয়েটি বলে , আমি তোমায় ঠিক জিনিসটাই দেব ।'
তালা খুলতে খুলতে জিজ্ঞাসা করে রাজিয়া -- ' তোমার নাম কি ? '
' তন্দ্রা '
' বাহ্ ! কী সুন্দর নাম ! ভেতরে এস ।  '
' না বৌদি , ট্রেনের কাপড় ! '
মিষ্টি হেসে রাজিয়া ফ্যানের গতি বাড়িয়ে দিল ।
নিজের জন্য এক গ্লাস নিয়ে , তন্দ্রার জন্য এক গ্লাস
জল এগিয়ে দিল । এক গাল হেসে তন্দ্রা বলল
' বাঁচালে বৌদি , যা রোদ , এবার এস , দেখে নাও ।'
তন্দ্রা একটা একটা করে প্যাকেট ব্যাগ থেকে বার করে , আর বলে -- এটা টক ঝাল , এটা মিষ্টি , এটা নোনতা ।
দেখে শুনে তিনটে প্যাকেট বেছে নেয় রাজিয়া ।
' বৌদি তিনটে ? বৌনির সময় ? ' আচ্ছা একটা ক্রীম বিস্কুট দাও ' ।
তন্দ্রা খুব খুশি । ' বৌদি তুমি খুব ভালো । '
তন্দ্রা চলে গেল । রাজিয়া আবার নিজের কাজে লেগে গেল ।
*            *            *             *              *              *
             কিছুদিন পর তন্দ্রা আবার এল ।  এর মধ্যে তন্দ্রার দিয়ে যাওয়া সব বিস্কুট খাওয়া হয়ে গেছে । নামী কোম্পানির বাইরে যে এমন নানা রকম বেকারি বিস্কুট পাওয়া যায় , জানা ছিল না রাজিয়ার । বেশ লেগেছে সবার । সাহস করে এবার নিজেই দেখেশুনে নিল রাজিয়া ।
             প্রায় প্রতি মাসেই আসে তন্দ্রা । অল্প অল্প গল্পও হয় এখন ওদের ।  তন্দ্রার বাড়িতে ছোট তিনটে ভাই-বোন । বাবা নেই । মা সংসার সামলান । আর এইভাবে যা রোজগার হয়, তাতে কোনরকমে সংসার চলে ।
             ভাই বোনরা এখনও স্কুলে পড়ছে । হায়ার সেকেন্ডারির পর বাবা মারা যাওয়ায় তন্দ্রার আর পড়া হয়ে ওঠেনি । বাবা যখন হঠাৎ অ্যাকসিডেন্টে
মারা গেলেন , তন্দ্রার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল । কী হবে এবার ?  বাবার  তেমন জমানো টাকা ছিল না । শুধু একতলা বাড়িটা , যেটা এখনও ওদের মাথা গোঁজার ঠাঁই । তবে ওটাও না থাকলে এই কাজটা করার মতো মনের জোর আর পেত না তন্দ্রা ।
               কোনো মতে শোক কাটিয়ে উঠে একজন প্রতিবেশীর পরামর্শে আর সাহায্যে মা দুটো বাড়িতে সকাল বিকেল রান্নার কাজ নিলেন । সকালে ভাই বোনদের স্কুলে পাঠিয়ে তন্দ্রা বাড়ির রান্না বান্না সেরে নিত । ভাই বোনরা বাড়ি ফিরলে ওদের খাইয়ে দাইয়ে    পড়াতে বসত । সঙ্গে আরও কয়েকজন বাচ্চাও পড়তে আসত । তখন ওদের কাছে  বাচ্চাদের পাঠিয়ে পাড়ার লোকেরাও অনেক সাহায্য করেছে ।
               সন্ধ্যায় রাজিয়া একা বাড়িতে ছিল । এক কাপ কফি নিয়ে ব্যালকনিতে এসে বসল । আকাশটা কুচকুচে কালো । সেই কালো আকাশের গায়ে ঝিকিমিকি তারারা সলমা জরির ছবি এঁকে রেখেছে । হঠাৎ তন্দ্রার কথা মনে পড়ল । কেন কে জানে । মেয়েটা কত কষ্ট করছে !
                এরকম কতজনই তো করছে , ভেবে মন থেকে তন্দ্রার কথা মুছে ফেলতে পারত , কিন্তু পারল না । একটা অদ্ভুত ভাবনা ওকে গ্রাস করল । যদি , রাজিয়া ওই বয়সে ওরকম কোনো অবস্থায় পড়ত ? চোখে তখন একরাশ স্বপ্ন । বড় হতে হবে , কিছু তো করতেই হবে ।  হেসে ফেললো রাজিয়া । অনেক কিছু হতে চেয়ে শেষ অবধি বিশেষ কিছুই হওয়া হল না । এই জন্যই বোধহয় পাখির চোখ হওয়া দরকার । লক্ষ্যে অবিচল । আসলে ওকে ঘিরে বেশ কিছু আশা  সবার মনে ঘুরত । মুখে না বললেও টের পেত রাজিয়া । তাই সব কিছুতেই দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপ । একসময়ে বুঝতে পারল কোনো বিষয়েই বিশেষ হয়ে ওঠার  সময় আর নেই ।  ডিপ্রেশনের একটা মৃদু আভাস পেতে শুরু করল রাজিয়া । আর তখনই দেখা শীর্ষর সঙ্গে ।
                কলিং বেলের শব্দে উঠে দাঁড়ালো রাজিয়া । এ সময়ে কে এল ? বাবানকে টিউটোরিয়াল থেকে নিয়ে আজ শীর্ষ ফিরবে । ফিরতে ফিরতে সাড়ে ন'টা । ভাবতে ভাবতে ঘড়ির দিকে চায়  । আটটা !!!  দরজা খুলে অবাক !!!
                তন্দ্রা !!!
  ' তুমি ?! এইসময়ে ? বাড়ি ফিরবে কখন ? ' চিন্তিত হয় রাজিয়া । আজ কোনো উপায় নেই বৌদি । এই ক'টা বিস্কুট আমাকে বিক্রি করতেই হবে ।
  ভাইয়ের স্কুলের ফি'জ জমা দিতে না পারলে কাল নাম কাটা যাবে । '
'  আচ্ছা , আচ্ছা আগে একটু জল খাও । বসো । ' রাজিয়া বলে ।
কুন্ঠিত ভাবে বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে বসল তন্দ্রা ।
জল আর মিষ্টি দিল রাজিয়া । কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে মেয়েটার ওপর ।
' কত টাকা লাগবে কাল ? এই বিস্কুট বিক্রি করলে টাকাটা উঠে যাবে ?' রাজিয়া জানতে চাইল ।
' মনে হয় ' । তন্দ্রা বলল ।
' কতগুলো বিস্কুট বাকি আছে ?'
' আট - দশটা । '
রাজিয়া একটু চিন্তায় পড়ে‌ --
' এতগুলো ? কখন বিক্রি করবে ?'
' এই তো এখান থেকে ভবানীপুর যাব , তারপর ' তন্দ্রা একগাল হেসে বলল ।
' তারপর আবার বালিগঞ্জে ফিরবে , তারপর বাড়ি , তাই তো ? ' রাজিয়া হাল্কা উষ্মা প্রকাশ করল ।
' শোন , তুমি ওগুলো আমাকে দিয়ে যাও । আমি নিজে রাখব , মা'কে দিয়ে আসব ।' রাজিয়ার কথায় তন্দ্রার মুখে হাসি ফুটল ।
' তুমি সত্যি নেবে বৌদি ? ' তন্দ্রা অবাক হয়ে জানতে চাইল । যে বৌদি বিস্কুট নেওয়ার আগে কত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ,  সে কি না না দেখেই নিয়ে নিতে চাইছে ?
' নেব তো , না হলে কি এমনি বলছি ?  বার করে ওই ব্যাগটায় রাখো । আমি পরে তুলে রাখছি । '
তন্দ্রা কথা মত কাজ করতে লাগলো । রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে রাজিয়া জানতে চাইল , -- ' কত  হল ? '
' দুশো আশি টাকা বৌদি '  , তন্দ্রা উত্তর দিল ।
' ঠিক আছে আমি আসছি । '
দুটো পাঁচশো টাকার নোট এনে আলগোছে টেবিলে রাখল রাজিয়া । একটা কৌটো তন্দ্রার হাতে জোর করে গুঁজে দিল ।
' এটা কি বৌদি ? '
' আমরা রাতে রুটি খাই , ক'টা রুটি বেশি হয়েছিল । তাই দিলাম । ট্রেনে যেতে যেতে খেয়ে নিও । রাত হবে তো পৌঁছতে । '  রাজিয়া বলল । ' সঙ্গে কেউ থাকলে ভালো হত ।'
টাকাটা নিতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল তন্দ্রা । ' বৌদি , কে থাকবে আমার সঙ্গে ? কে বিয়ে করবে আমায় ? '
' কেন ? '
' বৌদি আমার টাকাটা ... '
' হ্যাঁ ,  ওই তো  দিলাম  । '
' এখানে  , দুটো নোট আছে , এত টাকার খুচরো তো আমার নেই ।' টিকিট কাটতে হবে । '
" খুচরো লাগবে না , ওটা রাখো , আমার টাকা । ভেবো না , টাকা যদি কাল কম পড়ে ... ' !
দুই মায়াবী চোখে জল ভরে তন্দ্রা বলল , আজ  তুমি আমার জন্য যা করলে .... '
' এবার আর দেরি নয় । রওনা হয়ে যাও  । সাবধানে যাবে । এত রাতে , একা একা ! ' রাজিয়ার দুশ্চিন্তা চাপা থাকে না ।
' আমাকে কে বিয়ে করবে বৌদি ? এত দায়িত্ব , তবু যদি রঙটা একটু ফর্সা হত ! ' তন্দ্রা বলল ।
' না , আর দেরি কোরো না । ' এবার তাড়া দেয় রাজিয়া ।
*                 *                *               *              *       *
মাস খানেক কেটে গেল । তন্দ্রা আর আসেনি । ফোন নেই  , তাই খবরও নেওয়া হয়নি ।
দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেছে । মাঝে মাঝে রাজিয়ার মনে পড়েছে , কিন্তু কী করবে ।
একদিন বিকেলে রাজিয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ।
দূর থেকে হাসতে হাসতে , হাত নাড়তে নাড়তে কে আসছে !! রাজিয়া হঠাৎ চিনতে পারল না ।।
কাছে এলে বুঝতে পারলো ও  তন্দ্রা । গোধূলির আলো গায়ে মেখে , সুন্দর একটা শাড়ি পরে লাল সিঁদুর আর টিপে ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছে তন্দ্রাকে ।
খুশি হয়ে উঠল রাজিয়া । এমনটাই তো দেখতে চেয়েছিল মেয়েটাকে !
সব শুনল মন দিয়ে ।
অবাক হবার মতই ঘটনা বটে ।
সেদিন টাকা নিয়ে ফেরার সময়ে দুটো ছেলে পেছন পেছন আসছিল । হয়তো তন্দ্রার অতিরিক্ত সতর্কতা সেদিন ছেলেগুলো টের পেয়েছিল ।
সিঁড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্ম এ নামার সময়ে ওর ব্যাগ ধরে টান মারে ছেলেগুলো । জানতো না , ওর ব্যাগের সামনে দিকে একটা অতিরিক্ত শক্ত হাতল ও নিজে বানিয়ে নিয়েছে । সেটা সবসময়ে চেপে ধরে থাকে ।
এটাও জানত না ,  তন্দ্রা ট্রাম থেকে নামার পরে ওর বাড়ি পর্যন্ত একজন দূর থেকে খেয়াল রাখে ।
তন্দ্রা নিজেও জানত না ।
হঠাৎ ব্যাগে টান পড়ায় পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ে । অবাক হয়ে দেখে একজন আর একজনের কান ধরে বলছে ,  -- ' ওঠ বোস কর । '
সে তেড়ে ফুঁড়ে বলতে গেছে ,   --  ' কেন করব , তুই কে ? '
' দেখাচ্ছি মজা ,  থানায় চল , ম্যাডাম আপনিও চলুন ! '
' আমি ??? ' তন্দ্রা হতবাক ।
' ও তো আপনার ব্যাগ ধরে টানছিল ।'
' আমার দেরি হয়ে গেছে , বাড়ি ফিরতে হবে , অনেক দূরে বাড়ি । '  তন্দ্রা প্রায় মিনতি করে ।
' আমি পৌঁছে দেব । সঙ্গে গাড়ি আছে ।'
' ছেড়ে দিন ওকে , সারাদিন বোধহয় তেমন কিছু খায়নি ।' ছেলেটার হাতে কুড়িটা টাকা গুঁজে দিল তন্দ্রা । ছেলেটাকে বলল , -- ' মুটের কাজ করে খাও । চুরি কোরো না । থানায় গেলে ভালো লাগত ? '
ছেলেটা কেঁদে ফেলল ।
তন্দ্রা বলল , -- ' আমারও একটা ভাই আছে । তাই তোমাকে দেখে মায়া লাগল । সবার এমন নাও হতে পারত । '
কথা বলতে বলতে তন্দ্রার ট্রেন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল ।
তন্দ্রার মাথায় হাত । এবার কী হবে !
অচেনা মানুষটি এগিয়ে এলেন ।
' আমার সঙ্গে চলুন , আমি যাচ্ছি , আজ গাড়ি আছে সঙ্গে । '
' আপনি , কেন ? আপনার সঙ্গেই বা যাব কেন ? ' তন্দ্রা একটূ শঙ্কিত । কী করে ফিরবে ?  কিছু বুঝতে পারছেনা ।
আমিও সোনারপুরে থাকি । রোজ একই ট্রেনে ফিরি ।
' কিন্তু ... ' তন্দ্রা তবু ইতস্তত করে ।
' দ্বিধার কারণ নেই । আমি পুলিশে চাকরি করি । ' সন্ধ্যায় ডিউটি থাকলে রাতের গাড়িতে ফিরি । আপনাকে খেয়াল করেছি । আজ আপনার বাড়ি যাব ভেবেছি ।'
' আমার বাড়ি ! ' আকাশ থেকে পড়ল তন্দ্রা ।
•              *                 *            *              *            *
' তারপর ? ' রাজিয়া এতক্ষনে কথা বলে ।
' তারপর আর কী , একমাস পরে বড়রা দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিলেন । তেমন কিছু হয়নি । ক' জন আত্মীয়কে ডাকা হয়েছিল । খুব ভালো আছি বৌদি । খুব ভালো আমার শ্বশুর বাড়ি । '
একটু থেমে তন্দ্রা বলে , -- ' বৌদি , তোমার টাকাটা ।'
রাজিয়া ছুটে ঘরে চলে যায় , আলমারি খুলে বার করে একটা নতুন শাড়ি আর একটা শার্ট পিস বার করে আনল ।
' টাকা থাক ,  মিষ্টি খাবে ,  শাড়ি আর শার্ট পরবে । আর পরে একদিন দুজনে মিলে আসবে ।'
রাজিয়ার খুশি দেখে তন্দ্রার চোখে জল এল ।
             
                   
         
       
         

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন