সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

বিপ্লব বিশ্বাসের অণুগল্প : বেগ ও আবেগ







মা,আজ কেমন আছ? আমি বিজয় বলছি। হাঁটুর ব্যথাটা কমেছে?
ঘড়িতে সাড়ে এগারো। টেলিফোনে মাপা পর্দায় ওঠানামা করছে ব্যাঞ্জোসুর। হাতের কাছটিতে থাকলেও রাত তো কম হয়নি। বুড়িচোখের ঘুম লুকোচুরি করে। সবে ঝুঝকি এসেছিল। তার ওপর শীতআঁকড়া। পৌষশেষে খারাপ পড়েনি। কলকাতায় ১১.০৬। টিভিতে দেখাল। তাহলে এই মফসসলে আট সাড়ে আট তো বটেই। কেন যে সব রাত করে...!
কে বিজু?

জানতে চায় মায়াপুরের কুসুমপ্রভা। আসলে জানেও। প্রায়রাতের ঘটনা। তবুও অভ্যেসবশে...। ওপারে কথা বলে একমাত্র ছেলে বিজয়। থাকে বিলাসপুর। রেলের কম্যুনিকেশন এঞ্জিনীয়র।

হ্যাঁ মা,ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? হাঁটুতে যে কিটোপ্যাচ লাগাতে বলেছিলাম...
হ্যাঁরে লাগাচ্ছি। তুরা কেমন আছে রে? ঘুমিয়ে না থাকলে এট্টু দে তো দিদিভাইকে...
না মা,ঘুমোয়নি। পড়ছে ওঘরে। কাল থার্ড টার্মিনাল। পরে কথা বোলো। ব্যথা কেমন?
ব্যথা...!

খানিক হারিয়ে যায় কুসুমপ্রভা। বিজুর বাবার কথা মনে পড়ে। লেখাপড়া বেশি জানত না। ভটচাজ বামুনের ছেলে। নমোনমো টোলপাঠ সেরে পুরুতগিরি করে বেড়াত দিনরাত। ঠাকুরদেবতার থানে রোজকাজের অভাব ছিল না। যজমানও কম ছিল না। রোজগারপাতি যা হত তা দিয়ে ছেলেকে ভালোভাবে পড়িয়ে চলে যেত কোনওরকমে। তবে এ কাজে অনিয়মের পিত্তি শুঁষে নিয়েছিল রক্তের লাল। ছেলে কেশনগর বিপিসি থেকে পাশ করে রেলে চেপে বিলাসপুর গেল। বাপেও চলল পরপার। ব্লাড ক্যানসারে গোটা দেহটা শেষতক ছোট হয়ে ফুট দুয়েকে দাঁড়িয়েছিল। রোজগেরে ছেলের ভাত সবার কপালে না কি জোটে না! কারও মরে, কারও বা বেঁচে থাকতেই...!
কুসুমপ্রভা ভাবে, লোকটা চলে গেছে কব্বে! শেকড়টা পুঁতে গেছে ঝুরঝুরে মাটিতে। তা উপড়ে নড়তে পারেনি কুসুমপ্রভাও। ছেলে- বউ- নাতনী দূরে। অধরা। কাছে পেয়েছে আকাশরঙা এই কথাযন্ত্র। নিমেষে কাছে আসে দূরের মানুষ। কানে ধরলেই মাখনকথার প্রলেপ লাগে। নাকমুখে বাসও লাগে যেন! ব্যবস্থা চালু হতেই বিজুদের আসা- যাওয়া কমেছে। লেখালেখির পাঠও শেষ। গোটা গোটা হরফে তুরা লিখত আগে। নরম আঙুলের ঘ্রাণ থাকত তাতে! এখন শুধু দূরকথার পয়জার। সেই প্যাঁচেই লুকিয়ে থাকে স্নেহ - ভালোবাসা- মায়া- মমতা- ভাবনাচিন্তার ছোপছাপ। আবার চালাকিও। মিথ্যাও কি...!

যেমন এখন মা ছেলেকে বলে,ভালো আছি রে। তোর বলা প্যাচ লাগাচ্ছি...
আসলে তা নয়। কেশনগর রাইমারের দোকানে পাড়ার বীরুকে পাঠিয়ে জেনেছে, পিসপ্রতি পঁয়ত্রিশ টাকা। মেয়াদ চব্বিশ ঘণ্টা। পাবে কোথা! বিজু এখন পাঠাতে পারে না আগের মতো। বাড়ির দশটা গাছের ডাব- নারকেল - খিল বেচে হয়ই বা কত! তার মধ্যে উড়ান- পুড়ান। নারকোলের কথা মনে হতেই মা জানতে চায়,আরে বিজু,তোরা আসবি না বাঁউড়িতে এবার? ছাঁই করে রেখেছি...

কী যে বলো না মা? তোমার ঐ ছাই খেতে...  সামনে আমার আবার একটা প্রমোশনাল পরীক্ষা...
ও,তাই!
রাগ কোরো না মা,পরে দেখব। তুরার এন্যুয়ালটা হয়ে যাক। এখন রাখি।
আ... চ... ছা...
শব্দের শেষ না হতেই ওপারের লাইন কেটে যায়।

আবার আসে। পরের সপ্তাহে। বারের ঠিক থাকে না। ঠিক থাকে সময়ের।
এভাবেই আসতে আসতে একবার...
মা,আমি বিজু। এদ্দিনে ব্যথাটা গেছে নিশ্চয়?  জানো মা, তুরা না এবারে ফার্স্ট এসেছে...
তাই নাকি? দিদিভাইকে এট্টু দে ত...
ওতো ঘুমুচ্ছে মা। তোমার গলাটা ঘড়ঘড় করছে কেন? শরীর...
ঠিকাছে রে ঠিকাছে... লাইনটাই বোধায়...!

নিয়মের কথাচারিতা শেষ হয়। মায়ের ব্যথা নির্মূল হয়েছে জেনে তৃপ্ত বিলাসপুর।

     এদিকে মায়াপুরের মায়া কাটিয়ে শেষরাতে চলে গেছে কুসুমপ্রভা। ক্রেডেলছুট টেলিফোন বুকে জড়িয়ে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন