রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

গীর্বাণী চক্রবর্তীর গল্প : বুকের মধ্যে আগুন




শেষ বিকেলের কালচে হয়ে আসা আকাশের গভীর ছায়া রূপসী নদীর জলকে আরও কালো করে তোলে। প্রায় রোজদিনই এই সময়টা পাগলা ফটিক গ্রামের বাইরে রূপসী নদীর নির্জন ছন্নছাড়া এবড়োখেবড়ো ঘাটটার ওপর বসে আপনমনেই বিড়বিড় করে আর তার বড় প্রিয় কাস্তেটাকে শান দেয়। তারপর বেলাশেষের পড়ন্ত আলোর দিকে তুলে বেশ করে পরখ করে নেয় ঝিকমিকিয়ে ওঠা শানানো কাস্তের রূপালী ধারটাকে। তালপাতার সেপাই ফটিক তখন অন্য মানুষ। নাভিমূল থেকে উঠে আসা ফটিকের অট্টহাস্যে রূপসীর কালো জল তিরতির করে কেঁপে ওঠে। তারপর সব শান্ত। পাগলা ফটিক বাড়ির পথ ধরে।
                                               সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে দিতে ফটিকের বউ মালতী বিষণ্ণ চোখে দেখে হাতদুটো কাঁধের দু'পাশে ঝুলে পড়া একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি নিয়ে বিধ্বস্ত ফটিক বিড়বিড় করত করতে ঘরে ফিরছে। তারপর কাস্তেটা পাশে রেখে মাটির দাওয়ায় বসে গলা ছেড়ে ডাক দেয়, শালু….. শালু রে…. দে মা একটু জল। সেই ডাক মালতীর বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নড়বড়ে বাড়িটার পেছনে একবছর কর্ষণহীন আগাছায় ভর্তি ধানী জমিটার ওপর পাক খেতে খেতে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে থাকে। মালতীর বুক ঠেলে এক উথালপাতাল কান্না উথলে উঠতে চায়। এইরকমভাবেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর কখন যেন বিকেল ছুঁয়ে সন্ধ্যার বুকে মুখ লুকোয়, তারপর নামে এক গভীর আঁধার।
                                                আজ ভোরবেলা থেকেই চৈত্রের এলোমেলো বাতাস চারদিকটাকে বড় বেশি অস্থির করে তুলেছে। সকাল সকাল চান করে মালতী রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। বাড়ির রান্না করেই তাকে দৌড়তে হবে ঘোষেদের বাড়ি। সেখানে কয়েকমাস হল রান্নার কাজ নিয়েছে মালতী। আজকে ওই বাড়ির ছোট বউয়ের সাধ। তাই ঘোষগিন্নী একটু তাড়াতাড়ি যেতে বলে দিয়েছে। রান্নাঘরের পেছনে আমগাছটার ওপরে কয়েকটা কাক ভীষণ চেঁচামেচি করছে। রান্নাঘরের একচিলতে জানলাটা দিয়ে উঁকি মারতেই মালতীর বুকটা কেঁপে ওঠে। একটা কালো কুচকুচে কাক মরে পড়ে আছে গাছটার তলায়। আচ্ছা যেদিন শালু চলে গেল সেদিনও তো…….. চোখটা বুজে ফেলে মালতী। ভীষণ একটা কষ্ট বুকের মধ্যে ঘাঁই মারতে থাকে তার। আর তখনই শালু…...শালু রে সাড়া দিস না কেন? পাগলা ফটিকের প্রাণফাটা আর্তনাদ একবছর ধরে গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে থাকা বাড়িটাকে আরও অবসন্ন করে তোলে।
                             সারাদিনের ঝাঁ ঝাঁ করা রোদ হারিয়ে যাচ্ছে শেষ বিকালের আকাশে। এতক্ষণ থম মেরে বসে থাকা পাগলা ফটিক একটু দম নিয়ে নড়েচড়ে বসে। ডান হাতটা দিয়ে চোখটা আড়াল করে নদীর ওপর হেলে পড়া সূর্যটা দেখে একবার। তারপর হাতের কাস্তেটাকে শান দেওয়ার কাজে মন দেয়। পাগলা ফটিকের বুকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত শব্দ উঠে কাস্তে শানানোর শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
                                    রূপসী নদীর ওপর ঘোলাটে সন্ধ্যা জমাট বেধে থাকে। ওপারে বাঁশের ঝাড় আর আম গাছগুলোকে কেমন প্রেতের মত মনে হয়। চৈত্রের দমকা বাতাসে একটা ভুতুম প্যাঁচা ফটিকের মাথার ওপর দিয়ে ডানা ঝটপটিয়ে চলে যায় নদীর ওপারে। আর তখনই রূপসীর ভাঙা ঘাটটার নীচে যেখানে পায়ের পাতা ভেজানো শ্যাওলা পড়া জলটা ময়লা কাপড়ের মত পড়ে আছে সেখান থেকে ভেসে আসে পুরুষালি আস্ফালনের সাথে মেয়েলি আর্তনাদ।
                            কান খাড়া করে ফটিক। চুপিচুপি কখন যেন মেঘের একটা কালো পিন্ড মাঝ আকাশে চলে এসেছে। এইবার যেন মেয়েলি আর্তনাদটা একটু চাপা কিন্তু বেশ স্পষ্ট শুনতে পায় ফটিক। হাতে ধরা কাস্তেটা নিয়ে ভাঙা ঘাটটা টপকে রূপসীর শ্যাওলা ভেজা ধারটাতে গিয়ে পড়ে ও। চাপ চাপ কালো মেঘ ততক্ষণে আকাশটাকে গিলে ফেলেছে। প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়ার সাথে চোখে ধাঁধা লাগা বিদ্যুতের চমক। অবসন্ন সন্ধ্যার সাথে সাথে ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
                                   কালো আকাশের বুক চিরে নীলচে ঝিলিক ছুটে যায়। ভীষণ ভাবে চমকে গিয়ে ফটিক দেখে তার থেকে কয়েক হাত দূরে সতেরো আঠারোর একটা মেয়েকে প্রায় একরকম পাঁজাকোলা করে, মুখে চাপা দিয়ে দুটো লোক হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে রূপসী যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে গজিয়ে ওঠা ঝোপটার পেছনে। ঠিক সেইসময় কানফাটা বাজের গর্জনে পাগলা ফটিক স্পষ্ট যেন দেখতে পায় তার আদরের একমাত্র মেয়ে শালুর খোবলানো, বিবস্ত্র শরীরটাকে। একবছর আগে সারাদিন ধরে পাগলের মত খুঁজতে খুঁজতে ফটিক আর মালতী গভীর রাতে রূপসীর ওইপাড়ে বাঁশঝাড়টার তলায় ছেঁড়াখোঁড়া শালুর শরীরটাকে দেখতে পেয়েছিল।
                                                             অসহ্য রাগে ফটিকের চোখ জ্বলে ওঠে। শালুরে ভয় পাস না। আমি আছি………ফটিকের ভীষণ চিৎকারে লোকদুটো খানিকটা হতভম্ব হয়ে যায়। মেয়েটাকে ছেড়ে একটা লোক প্রায় দৌড়ে আসে ফটিকের সামনে। তারপর দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে, অ্যাই শালা চিৎকার করছিস কেন? তোর ভাগের মাল না কি! বেশি ফ্যাচফ্যাচ করবি তো মেরে ওই নদীর পাঁকে পুঁতে রাখব। যা ভাগ এখান থেকে।
                                                               মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঝলসে ওঠে ফটিকের ডানহাতে ধরা শানানো কাস্তেটা।  টুঁ শব্দ বেরুনোর আগেই গলা ধরে লুটিয়ে পড়ে ফটিকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা। অন্য লোকটা মেয়েটিকে ছেড়ে আচমকা এক ধাক্কা মারে ফটিককে। হাত থেকে ছিটকে পড়ে কাস্তেটা। আকাশে আগুন রঙা ঝলকানি। রূপসীর কাদামাখা ধারটায় পড়ে গিয়ে ক্ষণিকের বিহ্বলতা কাটিয়ে ফটিক দেখে বুকের কাছ থেকে অনেকটা ছিঁড়ে যাওয়া জামাটাকে কোনরকমে ধরে বিধ্বস্ত মেয়েটা কখন যেন ওই লোকটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে তার ঝিলিক  দিয়ে উঠছে রক্তমাখা কাস্তেটা। প্রচন্ড আক্রোশে মেয়েটা ঝাঁপিয়ে পড়ে গালভাঙা লোকটার ওপর। কর্কশ বাজের আওয়াজ, বিদ্যুতের চমক আর শানানো কাস্তের ছোবল মিলেমিশে একাকার তখন।
          বাতাসের তেজ এখন অনেকটা কম। বৃষ্টিও ধরে এসেছে। দূর আকাশে পাঁশুটে চাঁদ উঁকি মারছে। ফর্সা মেয়েটার মুখের ওপর ভেজা এলোমেলো চুলগুলো জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। পা ছড়িয়ে বসে থাকা মেয়েটার মাথায় আলতো হাত রাখে ফটিক তারপর ফিসফিস করে বলে, চল মা এবার ঘরে ফিরি।
                                                কালচে জলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা দুটো লাশের লাল রক্তে রূপসী নদী কাপালিকার সাজে যেন খলখল করে হেসে ওঠে। এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা রূপসীর দুই তীর ধরে জেগে থাকে। মেঘ ভাঙা চাঁদের আলোয় ঝিকিয়ে ওঠা কাস্তেটাকে একবার দেখে পরম মমতায় মেয়েটাকে ডেকে নেয় ফটিক। তারপর বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন