রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

পার্থসারথি রায়ের গল্প : একটি কিংবদন্তির জন্ম-মৃত্যু



ডুয়ার্সের পরিবেশ তিস্তা, তোর্সা, রায়ডাক, সংকোশ, কালজানি প্রভৃতি নদীর শীতল হাওয়ায় সিক্ত। সেখানকার ভয়ো চা-বস্তির কিশোর চিয়া গোলে। বস্তির অন্যদের মতো বাবা-মা সহ অভাব-অনটনে তারও দিন কাটে। তার লেখাপড়ার দৌড় বলতে আট ক্লাস। ইচ্ছে থাকলেও অভাবের তাড়নায় তা হয়ে ওঠে নি। একে একে কৈশোরেই সে তার বাবা-মাকে হারায়। তখন অনাথ চিয়ার দেখভালের দায়িত্ব নেন ফাবং টপ্পো। এই ফাবং কঙ্কালসার দেহের অধিকারী বছর পঞ্চাশের এক ব্যক্তি। তিনি দক্ষ শিকারি। অভাব, রোগ, শোক, অবহেলা এখন তাকে আর স্পর্শ করতে পারে না। চিয়ার বাবা-মা তাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। ফাবংয়ের বাগ্মিতার সঙ্গে চেহারার কোনও মিল নেই। তিনি চিয়াকে নেপালি, বাংলা, সাদরীর পাশাপাশি তামাং, বোড়ো, হিন্দি, ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে তোলেন। চিয়াও অনুসন্ধিৎসু প্রকৃতির। ফাবংয়ের সঙ্গে তার ডুয়ার্সের অতীত, কোচ ও ভুটান রাজের দ্বন্দ্ব, বক্সাদুয়ার দিয়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা যাত্রা, ধাপে ধাপে চা বাগিচার পত্তন, চা শ্রমিকদের দূরাবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে রুটিন করে চুলচেরা বিশ্লেষণ পর্ব চলতে থাকে। সাংস্কৃতিক মনোভাবাসম্পন্ন চিয়া কৈশোরেই নৃত্য ও নাটকের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তার প্রেরণাদাতাও ফাবং। চা বস্তির কাঠালতলায় চিয়ার ঘর সংলগ্ন এক চিলতে ছাউনিতে ফাবংয়ের ঘর সংসার। পরিবার বলতে বর্তমানে চিয়া ছাড়া তার আর কেউ নেই। স্ত্রী-সন্তান-বাবা-মা সকলেই অপুষ্টির কারণে মারা গেছেন। রোজ রাতে চিয়ার ঘরে তালিম চলে। চুটকা, মারুনি, ডম্পু নাচে সে কিছু দিনের মধ্যেই বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করে। আপন প্রচেষ্টায় সে গড়ে তোলে বেশকিছু নৃত্য ও নাটকের দল। ডুয়ার্সের গ্রামে-গঞ্জে নৃত্য ও নাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তার দিন কেটে যায়। নিজস্ব সংস্কৃতি ও সামাজিক নানা সচেতনতার বার্তা লোকের মধ্যে পৌঁছে দেওয়াই তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। কিছু দিনের মধ্যেই সে জনপ্রিয়তা লাভ করে। মানুষের ভালবাসাই সৃজনশীল কাজে তাকে প্রেরণা দেয়। এতে সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতাও বেড়ে যায়। কিন্তু তাকে নিয়ে ফাবংয়ের দুশ্চিন্তা ক্রমশ বেড়ে চলে। ফাবং বলে— ‘এই করে জীবন চল্বে নারে, উপার্জনের পথ তো খুঁজতে হবে, তোকে তো অনেক দায়িত্ব সামলাতে হবে, তুই পারিস এই বস্তিবাসী মানুষদের সঠিক দিশা দেখাতে, কিন্তু তার জন্য তো অর্থ চাই!’ কিন্তু অর্থ উপার্জন যে কত কঠিন চিয়া তা উপলব্ধি করতে থাকে, গভীর হতাশা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে থাকে। তবে জানার ইচ্ছেতেই তার মনে নতুন আশার আলো জাগিয়ে তোলে।

হাসিমারা বিমান বন্দর চত্বরে ফুটপাতের এক চায়ের দোকানে চিয়ার নিত্য যাতায়াত। একদিন সেখানে এক সহৃদয় ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। উনি বন্দরের অফিসার আয়ুস্মান খুরানা। একদিন চিয়া তাকে বলে— ‘সাহেব একটা কাজ চাই। মুই তো আট ক্লাস।’ এরপর চিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে দোকানদার জানান—‘অনাথ বাগান তল্লাটে আসর জমায়। বেশ নাম-ডাক আছে।’ ওই অফিসারের সৌজন্যে সে হাসিমারা বিমান বন্দরে একটি অস্থায়ী কাজে যোগ দেয়। এতে ফাবংয়ের মনে একটু হলেও স্বস্তি ফেরে। খুরানা সাহেব গুজরাটের জামনগরে বদলি হলে তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানেই তার কয়েক বছর কাটে। কিন্তু সেখানে কিছুতেই তার মন বসছিল না। চা বাগিচার মেটো পথ, শ্রমিকদের অসহায় জীবনের প্রতিচ্ছবি তাকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিতে থাকে। পোস্ট মারফৎ তার পাঠানো অর্থ ফাবংয়ের কাছে পৌঁছয়। চিয়ার ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়ে ফাবং বস্তিতে যতটা সম্ভব খাবার, ঔষধ, শিশুদের শিক্ষার কাজে ব্যয় করেন। বাকিটা চিয়ার ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখেন।

চিয়া ফাবংয়ের কাছে বস্তিতে ফিরবার জন্য তার অভিপ্রায়ের কথা চিঠিতে জানায়। কিন্তু এর কোনো উত্তর ফাবং দেন নি, তার পেছনে জীবন জীবিকার প্রশ্ন লুকিয়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়। আয়ুস্মান খুরানা সাহেব অনুভব করেন চিয়ার জীবনের উদ্দেশ্য সাধারণ আর পাঁচটা মানুষের মতো নয়, তাকে তো অনেক দূর ছূটতে হবে। তিনি শেষ অবধি চিয়ার ডুয়ার্সে ফেরার ব্যবস্থা করলেন। বিদায় বেলায় বললেন— ‘দ্য গোল অফ লাইফ ক্যান বি অ্যাচিভড ইফ দ্য এফোর্ট ইস ডেভোটেড।’ চা-বাগান ও বস্তিবাসীর টানে চিয়া ফিরে এল ডুয়ার্সের মাটিতেই। ত্রিশের যুবক চিয়ার চোখে তখন একরাশ স্বপ্ন। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করবার স্বপ্ন। ফেরার পর ফাবংয়ের সঙ্গে তার নানা বিষয়ে কথা হয়। ফাবংয়ের কথায় উঠে আসে চা শ্রমিকদের অসহায় জীবনের কথা। রোদ-জলে কাজ ক্রেও তাদের দুঃখের অন্ত নেই। দিনের পর দিন বেতন বন্ধ। শিক্ষার আলো নেই। বিনা চিকিৎসায় বস্তির লোকেরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ঘরের ঘটি-বাটি শেষ সম্বলটুকুও মহাজনের কাছে চলে গেছে। মেয়েরা দাসীর মতো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ভিন রাজ্যে। অথচ না আছে সরকারি কোনো তৎপরতা। মালিক বাবুরা সব মজা লুঠতে নেমেছেন যেন। চিয়া ফাবংয়ের কথায় মৃত্যুর লেলিহান শিখাকে প্রত্যক্ষ করে। একরকম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বলে— ‘জীবন থাকে তো এদের জইন্যে কিছু করবই বটে।’

গভীর রাতে ছাউনির ছেঁড়া পলিথিনের ফাঁক দিয়ে ফাবংয়ের চোখে চাঁদের আলো এসে পড়ে। সকলের অজান্তেই চাঁদের সঙ্গে তার প্রায়শই কথা হয়। তিনি চাঁদকে বারংবার একটি কথাই বলেন— ‘নিশানা।’ চিয়াই যেন তার জীবন ধনুকের শর। সে ভাবে এবার নিশানা স্থির করবার পালা। চিয়া একদিন শ্রমিক হিসেবেই বাগানের কাজে যোগ দেয়। এখান থেকেই তার জীবনের নতুন পর্বের সূচনা হয়। এ যেন লক্ষ্য পূরণের পথ চলা। সেপথে থাকবে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার পাইয়ে দেওয়ার সংগ্রাম।

বস্তিবাসীর জীবনের মান উন্নয়ন, কৃষ্টি-সমাজ-সংস্কৃতির বিকাশ সাধনই চিয়ার জীবনের নেশা হয়ে ওঠে। স্বরচিত কবিতা, সঙ্গীত, নাটক, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার কাজে সে ভূমিকা নেয়। নেপালি ও সাদরি ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে সে উভয় ভাষার সাহিত্য নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে অনেকের সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। তারাও তার একাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে নেপালি ভাষায় সে সম্পাদনা করে একটি পত্রিকা। প্রকাশিত এই পত্রিকা পাঠক সমাজের কাছে বেশ সাড়া ফেলে। রাজ্য গণতান্ত্রিক লেখক সংঘ এবং আদিবাসী লোকশিল্পী সংঘের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা হয়। উত্তরের লোকশিল্পী এবং আদিবাসী শিল্পীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাশাপাশি চা-বলয়ের সন্নিকটবর্তী শিল্পীদের সংগঠিত করে লোকচর্চার ক্ষেত্রেও তাকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা যায়।

এবার ফাবং অনেকটাই স্বস্তিতে। তার নিশানা বলে কথা! তবে একটু অন্যদিকে তাঁর ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি চিয়াকে বলেন— ‘সংস্থানতো হল। বিয়েটা করে ফেল। নাতি-নাতনির মুখ দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।’ চিয়া মৃদু হাসে। তাহলে আর বিলম্ব কেন ! বিয়ের আয়োজন করা হয়। বস্তিবাসীর মনে যেন উৎসবের আনন্দ। বস্তির এই তল্লাটে কখনও মহাধূমধামে এরকম অনুষ্ঠান হয়নি। নববধূ জুলিনা চিয়ার ঘর আলোকিত করে। বস্তিবাসী তাকে সাদরে কাছে টেনে নেয়। ডুয়ার্সের চা শ্রমিকদের স্বার্থে সে এক পর্যায়ে শ্রমিক আন্দোলনে পা বাড়ায়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। তাঁর আন্দোলনের ফল বস্তিবাসীর কাছে প্রভাতের সোনালী সূর্যের আলো হিসাবে ধরা দেয়। শ্রমিক দরদি মানসিকতা থেকে সে হয়ে ওঠে চা বাগানের শ্রমিক নেতা। এমনকি রাজ্য স্তরেরও।  সে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মেহনতি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার  প্রতিষ্ঠার প্রধান মুখ। নিজস্ব সংস্কৃতির মূল ধারাকে আগলে রাখার পাশাপাশি তাঁর প্রচার ও প্রসারে সে নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করে। তামাং সংস্কৃতির  সঙ্গীত , নৃত্য, নাটক, কবিতা প্রভৃতি চর্চার বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি করে সে। তামাং সংস্কৃতিকে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলকে সে মুক্তি দেয় বাইরের জগতে। তামাং জনজাতির মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় মুখোশ নৃত্য ‘বাকপা’ বাইরে জনসমক্ষে প্রদর্শন করার উদ্যোগ সে-ই প্রথম গ্রহন করে যা পরবর্তীকালে নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে সাড়া ভারতে পরিচিতি লাভ করে। এরপর সে প্রতিষ্ঠা করেন নেপালি ও তামাংদের জন্য সংস্কৃতি সংস্থা। এর মাধ্যমে ভারতের প্রায় সর্বত্র এই সংস্কৃতির অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের পরিচিতি ঘটে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণে সে তামং সংস্কৃতির ডালি নিয়ে হাজির হতে থাকে। তামাং সংস্কৃতির তার এই অবদানকে মানুষ সাধুবাদ জানাতে শুরু করেন।

সাধারণ ঘরের মেয়ে হলেও প্রথম কয়েক বছর ঘর সামলাতে জুলিকে ভীষণ বেগ পেতে হয়। এখন স্বামী ও পরিবারে দুই পুত্র সন্তান নিয়ে তাঁর ব্যস্ততম সংসার। কিন্তু ছোট্ট ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুখবন্ধ বস্তাভর্তি  জিনিসের রহস্য তাঁর অজানা। মাঝে মাঝে প্রয়োজনে তা তিনি খোলেন এবং নিজেই বন্ধ করেন। রাত জেগে টেবিলে বসে লণ্ঠনের আলোয় কী লেখা হয় সে কথাও মুখ ফুটে জুলি তাকে কখনও বলে নি। এক দুপুরে কাজের অবসরে কৌতুহলি মনে সে লেখায় চোখ বোলাতে শুরু করে। সে দেখে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত কবিতা। সেই কবিতাগুলিতে চা বাগিচা ও তাঁর বস্তিবাসীর কঠিন বাস্তব জীবনের নানা ছবি প্রানবন্ত রূপে ফুটে উঠেছে। কবিতার পাশাপাশি লেখা হয়েছে একাধিক নাটক ও সঙ্গীত। ডাইনি প্রথা, পরিবার পরিকল্পনা, বন সংরক্ষণ, সাক্ষরতাসহ সামাজিক কুসংস্কার বিরোধী নানা কবিতা, সঙ্গীত নাটকে চোখ বুলিয়ে চিয়ার অজানতে তাঁর দুপুরের অলস সময়গুলো কাটতে থাকে।

দেশের তামাং বুদ্ধিষ্ট অয়াসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে তাকে মনোনিত করা হয়। রাজ্য আদিবাসী লোকশিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও ডুয়ার্স লোকসংস্কৃতি সংস্থার সম্পাদক হিসাবেও সে দায়িত্ব পায়। ডুয়ার্সের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার নিদর্শন খুঁজে বের করে এই উৎসবে তা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিশেষ উৎসবে লোকসংস্কৃতি মঞ্চের নামকরণ তাঁর নামেই করা হয়। পাশাপাশি উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে তাকে সম্মান জ্ঞাপন করা হয়।

চিয়া এক সন্ধ্যায় জুলিকে বলে— ‘তোমাকে কিছু তৈরি করব বলে যে স্বপ্নের কথা বলেছিলাম, তা আজ বলার সময় হয়েছে। সুনয়না জুলি ব্যাকুলতার সঙ্গে জানতে চায়— ‘তা কি?’ উত্তর আসে ‘সংগ্রহ শালা’। ইতোমধ্যেই তৈরি নতুনঘরে এক এক করে বস্তাগুলো নিয়ে যায়। শুরু হয় সংগ্রহশালা সাজানোর কাজ। আর তার নির্দেশনায় থাকেন ফাবং। বিভিন্ন বিরল অমূল্য সামগ্রী সংগ্রহশালায় সাজাতে দিন কয়েক সময় লাগে। মাদানি, ফুরূ, কাঙলিংয়ের সঙ্গে চিয়া, ফাবং ও জুলিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে জানায়— ‘মাদানি হল কাঠের তৈরি একপ্রকার পাত্র যাতে করে তামাং গোষ্ঠীর মানুষ ঘি জমিয়ে রাখতেন। এটি ২১০ বছরের পুরানো। তামাং, লামাদের খাবার পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ফরূ, যা ২৫০ বছরের পুরানো। মানুষের পায়ের হার দিয়ে তৈরি বাঁশির নাম কাঙলিং। এটি প্রায় ১৩০ বছরের পুরাতন। চই নাচের সময় এটি বাজানো হত। তামাং পুরোহিতরা এই বিশেষ ধরণের বাঁশি বাজাতেন। ডুয়ার্সে একসময় ব্রিটিশ আমলের মুদ্রার প্রচলন ছিল। সেরকম অনেক প্রাচীন মুদ্রা, দুষ্প্রাপ্য পুঁথি সেখানে রাখা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে রাভা, মেচ, গাবো, ডুকপা, নেপালিদের মধ্যে রাই, লিম্বু, তামাং, গুরুং, ছেত্রী, নায়েক, দমাই, রাজপুত জনজাতি গোষ্ঠীর ব্যবহৃত বেশভূষা, বাসনপত্র, বন্যজন্তুর হাত থেকে আত্মরক্ষার অস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র সহ নানা জিনিসপত্র। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে দোতারার মতো টুংনা, চামড়ার তৈরি নাগপা, সানাইয়ের মতো গ্যালিং, বড়ো ঢোল, ঘ্যাংরা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সংগ্রহশালায় এমন কিছু দেয়ালচিত্র, বই ও পুঁথি স্থান পেল যা দুর্মূল্য।  সেখানে রাখা হল চায়ের কচিপাতা তোলা থেকে চা তৈরির পদ্ধতি নিয়ে নানা চিত্র, চা সম্পর্কিত ইতিহাসের উপাদান, চা বাগানের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী আসামের মনীরাম বড়ুয়ার দেওয়ানের তৈলচিত্র। এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করা হয়। সমাজের তাবর তাবর বিশিষ্ট লোকেরা সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। এই সংগ্রহশালার কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্তের বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষক পড়ুয়ারা এখানে আসতে শুরু করেন। চারিদিকে চিয়ার ভালো কাজের প্রশংসায় ফাবং শান্তি অনুভব করেন। তার শরীরের গতি খুব ভালো নয়। চিয়া-জুলি চিকিৎসা-সেবা-শুশ্রূষার কোনো ঘাটতি রাখেন না। বয়স জনিত কারণে ধীরে ধীরে ফাবং একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তখন সেখানে বস্তির যজ্ঞু, দোলস, চামেলি, গামা সকলেই উপস্থিত ছিলেন। শেষমুহূর্তে ফাবংয়ের কণ্ঠে অস্পষ্ট উচ্চারণ—‘দেদে’। অর্থাৎ যা হয়েছে তা ভালোই। এক কথার দ্বারা চিয়াকে ঘিরে ফাবংয়ের যে নিশানা ছিল তার অনেকটাই পূরণ হয়েছে বলে বোঝা গেল। তার মৃত্যুতে বস্তিবাসীর চোখে জল। চিয়ার জীবন থেকে ফাবংয়ের প্রস্থান একটি কঠিন বজ্রাঘাত। তবে চামেলিরা বোঝে যে সবাইকে একদিন নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে যেতে হবে। চিয়া-জুলি নিয়ম-নীতি মেনে নির্ধারিত দিনে বস্তিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ফাবংয়ের পারলৌকিক ক্রিয়াদি করে। এদিকে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য চিয়া দেশের তামাং বুদ্ধিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য পদ পায়। রাজ্যের আদিবাসী লোকশিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও ডুয়ার্সের লোকসংস্কৃতি সংস্থার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডুয়ার্সের বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে উৎসব শুরু হয়। সেখানে সে লোকসংস্কৃতি মঞ্চের যুগ্মসম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। ডুয়ার্সের নানা ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চার নিদর্শন খুঁজে বের করে এ ইউৎসবে তা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তার বিশেষ ভূমিকা দেখা যায়। চিয়ার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার লগ্ন সমাগত। যথারীতি সে অবসর নেয়। অবসরের পরেও তার নানা কর্মযজ্ঞ সমান তালে চলতে থাকে। শ্রমিক আন্দোলন, লেখালেখি ও চা বাগান নিয়ে গবেষণার কাজ কোনো কিছুই বাদ নেই। আজীবন খাদ্যাভ্যাসের কারণে তার দেহের যন্ত্রাংশ অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। এই সময়ে তার উপর বিশেষ নজরদারীর দায়িত্ব জুলিরা নেয়। সকাল হলেই বাড়িতে শ্রমিক, সাহিত্য-প্রেমী মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। তার সঙ্গে বস্তিবাসীর নানা অভাব-অভিযোগ তো থাকেই।  লামা পরিবারের দুই সহোদর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। সরকারী চাকরির বন্দোবস্ত না হওয়ায় তারা ফুলের ব্যবসা শুরু করেন। হঠাৎ চিয়া একদিন শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরে। তাকে উত্তরের একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের পক্ষে তাকে বাঁচানো সম্ভব হল না। চিয়ার প্রয়াণে জুলির স্বপ্নময় পৃথিবীটা নিমেষেই চৌচির হয়ে যায়। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দেহ নিয়ে বস্তিতে ফেরা হয়। গোলে-বাড়ির চত্বরে তখন জনস্রোত। কিন্তু চারিদিকে কোলাহল শূন্য। ডুয়ার্সের ভয়ো বস্তি ছাড়াও অন্যান্য বস্তিবাসীর পাশাপাশি বহুদূর হতে শুভানুধ্যায়ীরা তাকে শেষবার দেখতে গোলে-বাড়িতে ছুটে যান। বস্তিতে দ্বিতীয় বারের জন্য আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করা হয়। তবে তা বিরোহের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। চামেলিরা জুলিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— ‘চিয়া বাবু কোথাও যান নি। তিনি আছেন আমাদের মধ্যে। এবং চিরকাল থাকবেন। জুলি শোকার্ত মনে বলে— ‘ওর যাওয়াটা বড্ড সকাল সকালেই হল। কাজের বেশ কিছুটা বাকি থেকে গেল’। বাবার পরিচয়ে ছেলেদের গর্ব বোধ হয়। সংগ্রহশালার দেখাশুনা তারাই করে। একপর্যায়ে এই সংগ্রহশালার উন্নতিকল্পে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিছু আর্থিক অনুদানও মিলে। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তা থমকে যায়। তাঁর পরেও বাবার সৃষ্টিকে আগলে রেখে তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে দুই সহোদর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

চিয়া বেঁচে থাকবে তার অনুরাগিদের ভাবনায়, তাঁদের মাঝে চিয়া নেই। কিন্তু রয়েছে তাঁর রেখে যাওয়া নানাবিধ কর্মের স্মৃতি। উত্তর তথা উত্তরপূর্ব ভারতের চা বাগিচার লোকসংস্কৃতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে মনে রাখবেন সর্বস্তরের মানুষ। অচেনা উত্তরকে বাইরের জগতে তুলে ধরা, চা শ্রমিকদের স্বার্থে আন্দোলন, ডুয়ার্সের বিভিন্ন বস্তিবাসীর জীবনের লক্ষ্যে উন্নিত করার সংগ্রাম, কৃষ্ঠি- সংস্কৃতির বিকাশ প্রতিটি ক্ষেত্রে একটিই নাম— ‘চিয়া গোলে’ । প্রান্তিক উত্তরের অজানা এই জনপদে এমন কতশত নাম নিভৃতে সুপ্ত হয়ে আছে, কেউ তার হিসেব রাখেনি, রাখেনা, ডুয়ার্সের সবুজ সতেজ জীবনেও মিশে থাকে শত শত বৎসরের হতাশার ইতিহাস।  



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন