রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ছোটগল্প : মহাদেব মণ্ডল

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ছোটগল্প (নির্বাচিত) : পরিবেশের প্রত্যাঘাতের কাহিনি
মহাদেব মন্ডল
 
      স্বপ্নময় চক্রবর্তী বিশ শতকের সাতের দশকের কথাশিল্পী। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পের মধ্যে সমকালীন তাপ-ছাপ সুন্দরভাবে প্রতিভাত হয়েছে। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর প্রথম কর্মজীবন শুরু বিহারে দেশলাইয়ের সেলসম্যান হিসেবে। কিন্তু কাজে গরহাজিরার দরুন অর্থাৎ বিহার শরিফে ঠিকমত কাজ না করে নালন্দা দেখতে চলে যাওয়ায় তাঁর চাকরি চলে যায়। পরে তিনি পেইন্ট ভার্নিশ টেকনোলজি পড়তে আরম্ভ করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপোড়নে গল্পকার বাধ্য হয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের কানুনগোর চাকরি গ্রহণ করেন। কানুনগোর চাকরিতে থাকাকালীন তিনি গ্রামকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাই গ্রাম্য মানুষের জীবন,ভূমি, ভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামন্ত ও ভূমিদাস, উঁচুজাত নিচুজাত বিষয় গুলিকে তিনি দরদ দিয়ে অনুভব করতে পেরেছেন। ভূমি রাজস্ব দপ্তরের চাকরি ছেড়ে তিনি আবহাওয়া দপ্তরের চাকরি গ্রহণ করেন। বেশ কিছুদিন আবহাওয়া দপ্তরে চাকরি করার পর তিনি আকাশবাণীর ডিরেক্টর পদ গ্রহণ করেন। বিচিত্র কর্মজীবন লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীকে সুযোগ করে দিয়েছে জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের। এই অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবেই তিনি বহুমাত্রিক কাহিনি,ঘটনা ও বিষয়কে উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই তাঁর সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে সমাজ জীবনের নানা বাস্তব দিক। তার মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান বিষয় যা তাঁর গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পেয়েছে তা হল পরিবেশ দূষণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায়। তিনি তার গল্পগুলিকে নির্মাণ করেছেন ইকো-টেক্সট হিসাবে।
   সাহিত্য সমালোচনার দিকে তাকালে দেখা যায়, সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা সাহিত্যতত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভাবনা চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে তাই পরিবর্তন হয়েছে সাহিত্য সমালোচনার বিভিন্ন তত্ত্বের। বলা যায় অ্যারিষ্টটল ও আচার্য ভরত থেকে সাহিত্য বিচারের যে ধারা সূচিত হয়েছিল তা আজও বহমান।এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নানা তত্ত্বের উদয় যেমন ঘটেছে তেমনি বিলোপও ঘটেছে হয়তো অনেক।এই ধারার নবতম সংযোজন ‛ইকো-টেক্সট’,‛পরিবেশবাদী সাহিত্য’ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যতত্ত্ব ‛ইকো-ক্রিটিসিজম’ বা ‛পরিবেশবাদী সাহিত্যতত্ত্ব’ নামে পরিচিত। ইকোক্রিটিসিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন উইলিয়াম রাকার্ত তাঁর -‛Literature and Ecology:An Experiment in Ecocriticis’ প্রবন্ধে ১৯৭৮ সালে। ইকোক্রিটিসিজম এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে গল্টফেল্টি বলছেন –“Ecocriticism is the study of the relationship between literature and the physical environment”।১কিন্তু এই ইকোক্রিটিসিজম সাহিত্য সমালোচনা তৈরীর অনেক আগেই পরিবেশের বিপন্নতার কথা নিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করে গেছেন ‛আরণ‍্যক’(১৯৩৯)উপন্যাস। তারও আগে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টি জগতে পরিবেশ ভাবনার নানা দৃষ্টান্ত রেখেছেন ‛রক্তকরবী’,‛মুক্তধারা’ নাটক ‛বলাই’ গল্প এবং সবচেয়ে বেশি তাঁর পরিবেশ ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে ছিন্নপত্রাবলীতে।পরিবেশ সম্পর্কিত নানা পদক্ষেপ বিভিন্ন দেশে নানা ভাবে গ্রহণ করা হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিবেশ-বিষয়ক প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের জুন(৫-১৬)মাসে সুইডেনের স্টকহোম শহরে।এরপর ব্রার্জিলের রিও-ডি জেনেইরোতে পরিবেশ সংক্রান্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন জুন ১৪,১৯৯২ অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনটি বসুন্ধরা সম্মেলন নামেও পরিচিত। এই বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে যখন সর্বস্তরে ভাবনা শুরু হয়েছে ঠিক সেই সময় কথা সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী পরিবেশ ভাবনা নিয়ে যুগান্তকারী কিছু গল্প লিখলেন। গল্পগুলি হল ‛শনি’,‛ক‍্যারাক্কাস’ এবং ‛ফুল ছোঁয়ানো’ প্রভৃতি। এই গল্পগুলিতে পরিবেশ দূষণ এবং তার ভয়াবহতার চিত্র লেখক তাঁর সুনিপুণ লেখনী গুনে সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। যার ফলে এই গল্পগুলো ইকো-টেক্সটের মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠেছে।
      স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‛শনি’(অনুষ্টুপ,১৯৮৭) গল্পটি চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লির দুর্ঘটনার কিছুদিন পরেই প্রকাশিত হয়। বিগত শতাব্দীর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা হল এই চেরনোবিল গ্যাস দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনার ফলে আজও চেরনোবিল ভুতুড়ে নগরী হয়ে আছে। এই পারমানবিক দুর্ঘটনায় পরিবেশের ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধিত হয়। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমায় যা ক্ষতি হয়েছিল তার থেকেও পাঁচ গুণ বেশি ক্ষতি হয় এই দুর্ঘটনায়। তেজস্ক্রিয় ভস্ম ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এই দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত পারমাণবিক ভাবে সক্রিয় মেঘ ইউক্রেন রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে গ্রেট ব্রিটেনে এমনকি পূর্ব আমেরিকার উপর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। ‛শনি’ গল্পে সেই কথাই ব্যক্ত হয়েছে তাজু মিয়া ও তার স্ত্রীর সন্তান হওয়ার ঘটনার মধ্যে দিয়ে। গল্পে বলা হয়েছে হাঙ্গেরি চেকোস্লোভাকিয়া,পোল্যান্ডের পশুচারণ ভূমিতেও ছড়িয়ে পড়ে এই তেজস্ক্রিয় ছাই। পশু দুধে দেখা দেয় তেজস্ক্রিয়তা। গল্পের প্রধান চরিত্র তাজুউদ্দিন তার গর্ভবতী স্ত্রীকে সস্তার দুধ খাওয়ায়। তাই তাজুউদ্দিন যখন জানতে পারে বাংলাদেশ সরকার গুঁড়োদুধ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তখন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাই হাজি সাহেবের সর্তকতা শুনে আর্তনাদ করে উঠেছে তাজুউদ্দিন –“এই দুধ খেলে গর্ভবতীর কী হয়?”২ তার উত্তরে হাজি সাহেব বলেছেন –“সন্তান বিকলাঙ্গ হয়।”৩ একথা শুনে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে তাজুউদ্দিন কারণ অনেক কষ্টের পর তাজুউদ্দিনের স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছে। মুসলমানের দেবতাই শুধু নয় তিনি সন্তান লাভের আশায় হিন্দু দেবতা শনি ঠাকুরের পূজাও করেছেন। প্রতি শনিবারে তাজুউদ্দিন চাঁদপাড়া বাজারে পাঠিয়ে দেয় শনি পূজার জন‍্য  পাচঁসিকে করে টাকা। এত কিছুর পর তিনি পিতা হতে চলেছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারের সস্তা গুঁড়ো দুধ খাইয়ে তার যদি বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মায় সেই ভয়ে এবং কষ্টে সে অস্থির হয়ে ওঠে। ছুটে যায় বিপ্রদাস বাবুর চেম্বারে। বিপ্রদাস বাবু তাকে বলেন –“আমার মেয়ের তো বাচ্চা হবে, সে তো আমার কাছেই আছে। সেও তো কম গুঁড়ো দুধ খাইনি, কিসসু হবে না, গুজবে কান দিতি নাই।”৪ কিন্তু কিছুদিন পর বিপ্রদাস বাবুর মেয়ে সন্তান প্রসব করে মৃত এবং বিকলাঙ্গ। তাজুউদ্দিনের চিন্তা আরো বৃদ্ধি পায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে আসেন। তিনি ভাবেন – “বিশ্বচরাচরে এক্ষনি সর্বাত্মক হরতাল হয়ে যাওয়া উচিত।”৫ যদিও একটি খবরের কাগজে খবর বের হয়েছিল বাংলাদেশ গুঁড়ো দুধ পোল্যান্ড  থেকে আমদানি করে। বেশ কিছুদিন আগে রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক ছাই এর কিছু অংশ পোল‍্যান্ডের চারন ক্ষেত্রের উপর পরে। সেই অঞ্চলের গরুর দুধে তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন পাওয়া যায়। সেই দুধ থেকে তৈরি হয় গুড়োদুধ পোল‍্যান্ড বাংলাদেশে রপ্তানি করে দেয়। কিন্তু ভারত পোল্যান্ড থেকে দুধ আমদানি করে না তাই ভারতে গুঁড়ো দুধ খেয়ে ক্ষতি হওয়ার কোন ভয় নেই। তবুও যখন বিপ্রদাস বাবুর মেয়ে মৃত সন্তান জন্ম দেয় তখন চাঁদপাড়া হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক ভরসা দেয় তাজুউদ্দিনকে। বলে হাজার কারণে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে। তিনি জানান –“চেরনোবিল কি একটা? এরকম কত আছে ভারতবর্ষেও আছে।”৬ লেখক এখানে আমাদের দেশের পারমাণবিক দূষণ, কলকারখানার দূষণ, যানবাহনের দূষণ সমস্ত কিছুর প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।
   এছাড়াও লেখক বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যই যে পরিবেশ আজ এক ভয়ঙ্কর সংকটের মুখোমুখি সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ‛শনি’ গল্পটিতে। গদাধরের কথায়-“ছাইনছ মারাচ্ছে না সব,ছাইনছ্।….. সার দেচ্ছো মোটা মোটা মুলো খাচ্চো,রেডিও শোনচো, ঘরে ঘরে রেডিও। টিভিও কতগুলো এসিছে গ্রামে, বাতাসে ইলেকটিরিক ঘুরতিচে না?”৭ একথা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে আমাদের সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে যানবাহন,কলকারখানা যেমন বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দূষণ। তাই লেখক এই দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে পাঠককে সচেতন করেছেন। ‛শনি’ গল্পের শেষে আমরা দেখি লেখক হতাশার মধ্যেও প্রবল সংশয় বুকে নিয়েও আশার আলো দেখাতে চেয়েছেন। তাজুউদ্দিনকে ভয়ের শনি তাড়া করে। চেরনোবিল কতদূরে তাজুউদ্দিন জানে না। আতঙ্কের ‛ইবলিশ’ ওকে তাড়া করে- “বাতাস। বাতাসে রেডিও বিষ। মেঘের ওপারে আল্লাতালা? কেমন জানি না।”৮ পরম আকুতি ভরে আত্মজাকে বিশ্বাস দিতে দিতে ডাকে- “সমস্ত চেন্নোবিল, সমস্ত শনি,সাতঙা-দেওদের কেরদানিকে নাথি মারতি মারতি, নাথি মারতি আয়রে আমার আহ্লাদ। তুই কেমন জানি না।”৯
    লেখক এই গল্পে পরিবেশের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও সন্তান জন্মাবার আশাই প্রকাশ করেছেন। সমস্ত দূষণকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে এক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের বসবাসযোগ্য পরিবেশের স্বপ্ন দেখেছেন।
    ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা(১৯৮৪)চেরনোবিল গ্যাস দুর্ঘটনার(১৯৮৬) কিছুদিন পরেই লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী তাঁর ‛ক‍্যারাক্কাস’(শারদীয় বর্তমান, ১৯৯২)গল্পটি লেখেন। যান্ত্রিক সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পৃথিবীতে বৃদ্ধি ঘটছে কল-কারখানার আর কলকারখানার বৃদ্ধির ফলে দূষণের মাত্রাও বেড়েছে সবদিক থেকে। বায়ু দূষণ,জল দূষণ এর পাশাপাশি কারখানাগুলোতে গ্যাস দুর্ঘটনার চিত্রও এখন দেখা যায় অহরহই।সেই বিষয় নিয়ে লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী তাঁর ‛ক‍্যারাক্কাস’গল্পটির কাহিনি নির্মাণ করেছেন। এই গল্পের কাহিনির মূল উপজীব্য বিষয় হল কল কারখানার বর্জ্য পদার্থ ও রাসায়নিক পদার্থ জলকে কিভাবে বিষাক্ত করে তুলছে সেই চিত্র। গল্পে দেখি – “নালায় কালো জল ছরছর বইছে। আহা। জল তো নয়,অ্যাসিড।।শুধু কি অ্যাসিড? অ্যালডিহাইড-কিটোন- আর্সেনিক- সোডা…।”১১ এই জল থেকে বের হয় নানা রঙের ধোঁয়া। ঝাঁঝালো তার গন্ধ, কাশি আসে। কারখানার এই দূষণ শেষ করে দিতে পারে এক-একটি প্রজাতিকে।এই গল্পে একটি পুকুরে কারখানার বিষাক্ত জল জমা হয়। বিষাক্ত সেই জল শোষণ করে নেয় পাতার সবুজত্ব। পুকুরের আশেপাশের গাছগুলি মারা যায়। সেই বিষপুকুরে একদিন কারখানার এক কর্মচারী মাছ দেখতে পায়। সেই মাছ দেখার খবরটি কারখানার মালিককে দেয়। তিনি ছিপ দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। ছিপে চিংড়ি মাছ গেঁথে দিলে মাছটি কালো হয়ে কুকড়ে যায়। অবশেষে মাছ ধরতে সক্ষম হলে দেখা যায় এ এক নতুন প্রজাতির মাছ-“হাত খানিক লম্বা।ড‍্যাবা ড‍্যাবা চোখ।সারা গায়ে আঁশ নেই একটুও। খরখরে গা।গিরগিটির মতন।”১২ এই নতুন মাছ আবিষ্কার করে লাফিয়ে উঠেন কারখানার স‍্যার। তিনিই এই নতুন স্পেসিস আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিতে চান। তাই কর্মীটিকে ধাক্কা দিয়ে বিষ পুকুরের জলে ফেলে দেন। এই পুকুরের জলের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল এই জলে পড়ে কর্মীটির শরীরের জামা  কাপড় পুড়ে যায়। গায়ের চামড়া গিরগিটির চামড়ার মত খরখরে হয়ে যায়। তাকে দেখে কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে নিজের স্ত্রী পর্যন্ত ভয় পায়। ঐ পুকুরের মাছের চামড়া দিয়ে অ্যাসিড প্রুফ,রেডিও অ্যাকটিভিটি প্রুফ গ্লাভস তৈরি হয়। ফলে চামড়ার জন্য ক‍্যারাক্কাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। হঠাৎ একটি দুর্ঘটনায় কারখানায় সমস্ত শ্রমিক আহত হলেও নায়েকের কিছু হয় না। রহস্যটা আমাদের কাছে স্পষ্ট।কারখানায় নোটিশ জারি হয় সবাইকে বিষপুকুরে ডুব দিয়ে আসতে হবে। মালিকের অভিপ্রায় দুর্ঘটনা প্রুফ শ্রমিক শ্রেণী তৈরি করা। এদিকে নায়েকের স্ত্রী একদিন সেই পুকুরে স্নান করে পুনরায় স্বামীর দোসরে পরিণত হয়। তাদের সন্তান হয়- “বউ কাতরাচ্ছে।আমি বাপ হচ্ছি।….. একটু পরেই কান্না শুনলাম। শিশুর কান্না। আমার বুকের মধ্যে কারখানা ছুটির ভো বাজলো।বললাম, ছেলে না মেয়ে? ধাই বললে,জেবনে এই পরথম ভুতের জন্ম করালুম। পেত্নীর গভতে ভুতের জন্ম।… ছেলেটার চামড়া ঝোলা ঝোলা। সারা চামড়ায় গুড়িগুড়ি কাটা। মাথা থেকে বেরিয়ে এসেছে ড‍্যাবা ড‍্যাবা চোখ।”১৩ দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে এই অদ্ভুত শিশু দেখতে।একদিন আসে কারখানার মালিক ছেলেটিকে দেখতে- “স্যার মন দিয়ে দেখছেন। স্যার চামড়া টিপে টিপে দেখছেন,শিশুর চামড়া।স্যার স্যাম্পল দেখছেন, স্যাম্পল। স্যার হাসলেন। বললেন বা:।…. তারপর স্থির হলেন। চোখ স্থির, দেহ স্থির। মন্ত্র পড়ার মতন বলতে থাকলেন-ইউরেকা….. ইউরেকা…… নতুন প্রজাতি। নিউ স্পেসিস।ক‍্যারাক্কাস………নিউ ক‍্যারাক্কাস……
     ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে জলপাইগুড়ির করলা নদীতে প্রথম মাছের অকস্মাৎ মৃত্যু শুরু হয়, নদীর জলে বিষক্রিয়ার ফলে প্রচুর মাছ মারা গিয়েছিল। ২০১৫ সালে আবার করলা  নদীতে মাছের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত কীটনাশক বা রাসায়নিক বিষক্রিয়ার ফলে। ২০১৯ সালে করলা নদীতে বিষক্রিয়ার ফলে শুধু চিংড়ি মাছের মৃত্যু হয়। প্রাকৃতিক অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য জল যেভাবে দূষিত হচ্ছে তাতে বিশ্বজুড়ে পানীয় জলের সংকট তীব্র। এই দূষিত জল পান করার ভয়ংকর পরিণতি কী হতে পারে তার নিদর্শন ফুটে উঠেছে সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‛জলতিমির’ উপন্যাসে। মানুষ বাধ্য হয়ে দূষিত জল পান করছে। আর এই দূষিত জলের প্রধান উৎস কলকারখানার বর্জ্য। তার সঙ্গে রয়েছে কৃষি কাজে ব্যবহৃত নানা রাসায়নিক সার। ফলস্বরূপ জল দূষণে বিচিত্র শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত জল উত্তোলনের ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে জলে আর্সেনিক সমস্যা সেই চিত্র ফুটে উঠেছে  ‛জলতিমির’ উপন্যাসে- “গবেষণায় জানা গেছে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূস্তর যা আর্সেনিক পুষ্ট এবং কাদা পলি দ্বারা গঠিত ভূতল থেকে ৭০ এবং২০০ ফুট গভীরের মধ্যে অবস্থান করছে।”১৪ এই স্তরটি সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ছিল। কিন্তু আগে তো আর্সেনিক সমস্যা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে মানুষের খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে তাই কৃষিক্ষেত্রে ফসল বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত সেচের প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ বিপুল পরিমাণ জলের ব্যবহার রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে ফলে গরমকালে আর্সেনিক সমস্যা বেশি দেখা যায়।
   এই আর্সেনিক সমস্যা নিয়েই লেখা স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‛ফুল ছোঁয়ানো’(শারদীয় বর্তমান,২০০১)গল্পটি। গল্পের প্রধান চরিত্র হীরক ট্রেনে তার সিরিয়ালের স্কিপ লেখা খাতা ভুল করে ফেলে রেখে চলে যায়। সেই খাতা আসগর আলি যত্ন করে নিয়ে যায় নিজের বাড়িতে এবং নিজের টাকা খরচ করে আসগর বাবু টেলিফোন করে হীরককে সেই খাতা নিয়ে আসতে বলে।এই ঘটনার প্রেক্ষিতে হীরক পৌঁছে যায় গাইঘাটার বাঁশপোতা গ্রামে। সেখানে হীরক দেখে আসগর আলির নখের রং কালো, হাতের চামড়া গিরগিটির গায়ের মতো খরখরে। চামড়া মোটা ফাটাফাটা, আঙুলগুলো মোটা ফাটা, শুকনো রক্ত,ভ্রুতে চুল প্রায় নেই হীরক প্রথমে ভেবেছিল আসগর আলি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার ভুল ভাঙে। যখন হীরককে জল খেতে বলে হীরক যেন আঁতকে ওঠে, তখন আসগর আলি জানায়- “আর্ছেনিকের ভয়?এক গ্লাস খালি কিছু হবেনে। আমরা তো রোজ খাই।”১৫ শুধু আসগর আলি নয়,এই গ্রামের প্রতিটি মানুষ আর্সেনিক আক্রান্ত। সেই আর্সেনিক সমস্যা নিয়ে একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে গিয়েই হীরকের খাতাগুলি পেয়েছেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানের খবর প্রকাশিত কাগজটা আসগর হীরককে দেখতে দেয়। তাতে জানা যায়- “পশ্চিমবাংলার ৮টি জেলায় ৩২ লক্ষ মানুষ বিপদমাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিকযুক্ত জল খেতে বাধ্য হচ্ছেন।”১৬ আমাদের গ্রামবাংলায় চারপাশে জলের অভাব নেই ঠিকই কিন্তু পানীয় জলের বড়ই অভাব। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও গভীর নলকূপ গ্রামগুলিতে নেই বললেই চলে।সরকারের তরফ থেকে যে রানিং ওয়াটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা আজ পর্যন্ত অধিকাংশ গ্রাম গুলিতে পৌঁছায়নি।আর যেসব গ্রামে জলের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জল পৌঁছায় না।এই ঘটনার করুন চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সাধন চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‛জলতিমির’ উপন্যাসটিতে লেখক জানিয়েছেন সরকার যদিও ৪০ পাইপের কল অর্থাৎ ৮০০ ফুট গভীর কল নির্মাণের টাকা দেয় কিন্তু সেই কল নির্মাণ করা হয়নি। রাজনৈতিক টানাপোড়নে তা অনেক কম গভীর যুক্ত কল নির্মাণ হয়।তাই এই গল্পে দেখি আসগর আলি নিজেই আর্সেনিক সমস্যা নিয়ে কবিতা রচনা করেন–
“পৃথিবীর বক্ষ হতে অমৃত তুলিল
আর পৃথিবীর ভিতরেতে বিষ জন্মে গেল
সে বিষ কে সরাবে, কে ঘুচাবে ভাই
কালীয় সর্প আছে শ্রীকৃষ্ণ তো নাই।”১৭
   সাধনবাবু ‛জলতিমির’ উপন্যাসে যেমন মিথের ব্যবহার করেছেন তেমনি লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীও এখানে কালীয়র প্রসঙ্গ এনে মিথের ব্যবহার করেছেন। লেখক এখানে বলতে চেয়েছেন কালীয় যেমন কালীদহের জল বিষ দিয়ে বিষাক্ত করে তুলেছিল কিন্তু সেই সময় শ্রীকৃষ্ণ ছিল তাই শ্রীকৃষ্ণ কালীয়কে হত্যা করে কালীদহের জল মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে শ্রীকৃষ্ণ নেই কি করে এই আর্সেনিক দূষণ থেকে মুক্তি সম্ভব সেই বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। লেখক শ্রীকৃষ্ণের কালীয়র ফনা ভেঙে মটকে দেওয়া প্রসঙ্গে সাধনবাবু ‛জলতিমির’ উপন্যাসে জানিয়েছেন- “এগুলো যেন কালিয়র ভগ্ন ফনা নয়, জলের ব্যাকটেরিয়া, আর্সেনিক সিসা বা লোহার গ্রেডিয়েন্টের এক-একটি শক্ত অস্তিত্ব। চুন,ফিটকিরি,ক্লোরিন, থেকে শুরু করে এক একটি পরিশোধক ছড়ানো হচ্ছে, জল হয়ে উঠছে টলটলে।”১৮ তাইতো গল্পে দেখি গ্রাম বাংলার মানুষদের বিশুদ্ধ পানীয় জলের আর্তি।
     এভাবেই জল দূষণ থেকে মুক্তির কথা ভেবে লেখক ভাবান্বিত হয়েছেন। পৃথিবীর বিরাম হীনতার কারণে আরও দূষণের চিন্তায় লেখক গভীর সংকটের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন-“বসুন্ধরার তো বিশ্রাম নেই;কতবার ফসল দিতি হয়। আউশ, আমন, বোরো….। হাইবিরিড ধান পানি টানে বেশি আর ওই পানিতে আর্সেনিক। ধানের ভিতরেও কি আর্সেনিক মেশে না।”১৯ আজ খাবারে ভিটামিনের অভাব খাবার থেকে নানা রোগের সৃষ্টি তার মূল কারণ এই দূষিত জল ও রাসায়নিক সারের প্রচুর পরিমাণে কৃষি কাজে ব্যবহার। লেখক সেদিকটি আমাদের সামনে দেখিয়েছেন আসগর আলির কথার মধ্য দিয়ে।
    ‛ফুল ছোঁয়ানো’ গল্পের শেষে আমরা দেখতে পাই কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অবলুপ্তি ঘটেছে প্রজাপতি,ফড়িংসহ নানা কীটপতঙ্গের। তাই ফুলের পরাগ মিলন বর্তমানে প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটে না। এদিকে আর্সেনিকের প্রকোপে জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ রিকেট আক্রান্ত শিশু। তারপর হীরক জানতে পারে। এই  আক্রান্ত শিশুরা তাদের কচি কচি আঙুলে ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরাগ মিলন ঘটায়। ফসল ফলে- পটল,করলা, ঝিঙ্গে।কচি কচি আঙ্গুল কোন দিন আর পুষ্ট হবে না। আরো বড় সামাজিক সংকট হল এই গ্রামে কেউ নতুন করে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে না। পরিবেশ কিভাবে আমাদের সামগ্রিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তা কি ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে লেখক ‛ফুল ছোঁয়ানো’ গল্পটিতে তাই দেখাতে চেয়েছেন।
    পরিবেশ দূষণের মারাত্মক চেহারা উঠে আসছে বিভিন্ন সমীক্ষায়। ভূপালের গ্যাস দুর্ঘটনার প্রভাব আজও মানুষ ভোগ করছে। চেরনোবিলে আজও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। করলা নদীতে রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে মাছ। সাঁতরাগাছি ঝিলে দূষণের জন্য শীতে পাখিরা আসে না। এই বিচিত্র ভাবনার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশিত হয়েছে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গল্পের আকাশে। তাঁর লেখা এই পরিবেশ ভাবনা সমৃদ্ধ গল্পগুলি পাঠকদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে খণ্ডকাল এবং অখণ্ডকাল ধরে সাহায্য করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
তথ্যসূত্র:
১.Glotfelty, Cheryll and Harold From(eds.),The Ecocriticism Reader:Landmarks in Literary Ecology, University of Georgia,1996,P.XVII
২.চক্রবর্তী,স্বপ্নময়:শ্রেষ্ঠ গল্প,দেজ, প্রথম প্রকাশ-কলকাতা পুস্তকমেলা-২০০৩, পুনঃমুদ্রণ:জুন-২০১৭,কলকাতা-৭০০০৭৩,পৃ-৭৯
৩.তদেব,পৃ-৭৯
৪.তদেব,পৃ-৮০
৫.তদেব,পৃ-৮১
৬.তদেব,পৃ-৮২
৭.তদেব,পৃ-৮০
৮.তদেব,পৃ-৮৩
৯.তদেব,পৃ-৮৩
১০.তদেব,পৃ-১২৫
১১.তদেব,পৃ-১২৭
১২.তদেব,পৃ-১৩০
১৩.তদেব,পৃ-১৩০
১৪.চট্টোপাধ্যায়,সাধন: জলতিমির ও মাটির অ্যান্টেনা, গাঙচিল,প্রথম প্রকাশঃসেপ্টেম্বর-২০১৬,কলকাতা-৭০০১১১,পৃ-১১৪
১৫.চক্রবর্তী,স্বপ্নময়: শ্রেষ্ঠ গল্প, দেজ, প্রথম প্রকাশ- কলকাতা পুস্তকমেলা-২০০৩, পুনঃমুদ্রণ:জুন-২০১৭,কলকাতা-৭০০০৭৩,পৃ-২৫১
১৬.তদেব,পৃ-২৫২
১৭.তদেব,পৃ-২৫৩
১৮.চট্টোপাধ্যায়,সাধন: জলতিমির ও মাটির অ্যান্টেনা, গাঙচিল,প্রথম প্রকাশঃসেপ্টেম্বর-২০১৬,কলকাতা-৭০০১১১,পৃ-৪০
১৯. চক্রবর্তী,স্বপ্নময়: শ্রেষ্ঠ গল্প, দেজ, প্রথম প্রকাশ- কলকাতা পুস্তকমেলা-২০০৩, পুনঃমুদ্রণ:জুন-২০১৭,কলকাতা-৭০০০৭৩,পৃ-২৫৪

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন