মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২০

অমিত মুখোপাধ্যায়ের গল্প : লোহাগড়ের চুম্বকটান


সুরেলা বলেছিল,বদলি হয়ে তরাই এলে,দেখি কোথায় কেমন ঘোরাও!কাজ বাঁচিয়ে সেসব দেখার আয়োজন করতে বেশ কসরত করতে হয়েছে ইমনকে।ছেলে গবেষণা করতে বাইরে গেছে অনেক দিন।যা কিছু কাজ সেরে একা ঘরে সময় কাটানো সুরেলার পক্ষে কঠিন।একঘেয়েমি কাটাতে সে হাওয়াই মহলের অন্য বাসিন্দাদের সাথে আলাপ জমায়।বেশির ভাগ মহিলার সন্তান ছোট,তারা তাই ব্যস্ত শিক্ষা,পড়ুয়া-বীক্ষা,পরীক্ষা,স্কুল থেকে ফেরার প্রতীক্ষা,খাওয়ানোর পরই নির্জন কক্ষাগত করে লক্ষ্যাধিক জ্ঞান চাপানোর দীক্ষা দেওয়া নিয়ে।নব্য মায়েদের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষার বহর দেখার পরে যখন খুশি তাদের সঙ্গ ভিক্ষা করা চলে না।সামান্য যে-টুকু মেশার সুযোগ থাকে তাতেই  অনেক কিছু পাতিয়ে ফেলেছে সে,অবশ্যই নতুন যুগের কায়দায়।কাছেই থাকা বাড়িওলির মেয়ে কমবয়সী তো কী,তাকে বন্ধু করে নিয়ে তার স্কুটির পেছন থেকে শহরের হরণপ্রবণ হাওয়াই-বাজারগুলো চিনে নিয়েছে।স্বাদ-খ্যাত সূপকার-বিপণী থেকে শুরু করে সৌন্দর্য বাড়ানোর রূপ-কার চেনানোর উপকারও করে দেয় সেই মেয়ে।কিন্তু তারও বাচ্চা আছে,দিদিমার কাছে কতক্ষণ থাকবে?তাই  তার পরও সখীসমাবেশ চেয়ে আসনের প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছে সে।সেখানে নানা বয়সী পৃথুলার জটলায় গলা মিলিয়েছে।

  নতুন বছরে শীত জাঁকিয়ে এলে সুরেলা এখন জানতে চায়, দেখব কেমন জমকালো জায়গায়  পিকনিক কর তোমরা!কলকাতার মতো ওই সব ঘরসর্বস্ব গঙ্গাধার,বাড়িপ্রধান বাগান বা জুটমিল জুটিয়ে নিয়ে একঘেয়ে মুখস্থপড়া সিলেবাস যেন না-হয়!...সেই শুনে ইমন দপ্তরের লোকেদের সাথে ছুটছে,যখন যেখানে তারা স্থান নির্বাচনে চলেছে।চেষ্টা করছে চোখে-লাগা স্পট যাতে হয়।

ইমনের কাছে এ আরেক রকম ভ্রমণ। লোকে বলে প্রাচুর্যের প্যাঁচঘোচ,কিন্তু বলে না বেড়ানোর বেড়া-ভাঙার কথা।ঘুরতে বেরোলেই উত্তরবাংলার তরাই ঠিক ত্বরায় তরিয়ে দেয়।যে কোন পথের যে কোন পাশে যেতে থোড়াই ডরাই,এই কথা বলে তখন চড়াই ভেঙে এগিয়ে বড়াই করে বলতে হয়,জানো কি, ঘোরা কত রকম?এই একটু বেরিয়ে পড়া,বা ঢুঁ মেরে আসা,নয়ত এক বেলার খেলা,কর দিনভর সফর, টেনেটুনে  দু'দিনের পর্যটনে,ব্রেক নিয়ে  দিন তিনেক ট্রেক,অথবা ভেবেচিন্তে দীর্ঘ ভ্রমে ভ্রমণঃ এ সব তার সামান্য নমুনা মাত্র।

এর ঠিক পাশাপাশি চলে অন্যান্য নামকরা কেন্দ্রে যাওয়া, কম-পরিচিত ঘুপচিগুলোয় পা ফেলা।শহরের অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করা চারণিক প্রৌঢ়ের প্রশ্রয় পেয়েছে ইমন।তিনি শিক্ষকতার সাথে সারা জীবন ধরে পায়ে ও চাকায় তরাই চষে ফেলেছেন।কাগজে লিখে কিছু অচেনা কেন্দ্রকে পরিচিত করেছেন।নতুন জায়গার হদিশ দিয়েছেন।তাঁর কাছ থেকে জেনেও  কত দিকে গেছে সে।এক দিকে ভ্রমণ,অন্য দিকে কারও একাকীত্ব কাটানো।নিবিড় ভাবে টানা ঘুরে দর্শনীয় অঞ্চলকে বিস্তারিত জানার এমন সুযোগও তো জীবনে বারবার মেলে না!যে দিকে যাও,পথের দু’পাশে ছড়িয়ে আছে নতুন ভূখণ্ড,ঢুকে যাও সে দিকে,হতাশ হতে হবে না!

    আবার এদিকে সেই চলো যাই বনভোজনের কোণের খোঁজেতেও নানা রকম অভিজ্ঞতা জমতে থাকে।।বৃষ্টির সেই প্রাতঃ-স্নাত পথে স্মরণীয় আকৃতি প্রকৃতি দেখে আবিষ্কারের মেজাজে।কত জায়গা কত অযোগ্যতায় হয়ে গেল নাকচ,নাক উঁচু করে কিছু ময়না-তদন্ত,তারপর তিস্তা,বিস্তারহীন,জল আটকে রেখে উদোম পড়ে আছে বাঁধের পরের নদী। নগ্ন বালুশরীরে কত রকম পাথরের বিন্যাস।হাড়গোড় পড়ে আছে যেন!কোথাও বহিরাগত দেখে আর্তনাদ করা দেশি মুরগি এই হাজারো কার্ড-গজানো যুগে পরিচয়ের তাস দেখাবার ভয়ে পাখার নিচে  লুকিয়ে রাখে তার শিশুদের।বনবাংলোর তল্লাশে গিয়ে বাগানের দিশি আমলকি পেড়ে খাওয়া আর অবধারিত ভাবে মনে পড়াঃ পেয়েছে খবর পাতা খসাবার সময় হয়েছে শুরু!সত্যি কি হিমেল হাওয়ায় আমলকির মিহি চিকন পাতা কাঁপে!তত টক নয় বলে ইমনের  জিভ স্বাগত জানায় স্থানীয় ছোট আমলকির অম্লমধুর রসকে।অন্য কোন খোঁজের জায়গায় মেঘ কুয়াশা সরিয়ে বাঁকা ধারালো পথের শেষে দেখে কমলালেবুর মোহময় দোলন।ছোট বড় বর্তুল বাসন্তী রঙের কমনীয়তা-ঝোলানো গাছের সার সুবাস ছড়িয়ে বলেঃ

আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

কমলা রঙ নাকি আবেগ,কামনা আর নৈকট্যের প্রতীক!অথচ জীবনানন্দ তাতে অভূতপূর্ব কারুণ্য পেলেন,চেনা জনের আরোগ্য পেলেন।…এত লোভনীয় জমির পাশেও পিকনিকের অনুমতি মেলে নি।আরও খোঁজো,এত আছে বিকল্প!তারাপদ  তো রায় দিয়েইছেনঃবিকল্পের কোন পরিশ্রম নেই !

  ... তাই তো সে বলে এ বঙ্গের সাড়া মেলে যে কোন অজুহাতে বেরিয়ে পড়লেই!জবাব মেলে।তাই তো উত্তর-বঙ্গ সর্বদিকে উত্তরময়।তোমার পা যদি প্রশ্ন করে,তবে প্রান্তর,প্রবাহিণী,প্রপাত,পাহাড় থেকে শ্যামপর্ণী বাগিচা সমস্বরে দেবে উত্তর !
এই ভাবে দপ্তরের বনভোজনের জায়গা বাছাই একেক বার অদ্ভুত নানা কারণে বাতিল হয়ে চলেছে।তা ছাড়া যে কোন ভালো স্পট হলেই তো হবে না,বউ-বাচ্চার দল যাবে,কাছে হতে হবে,ছাউনি চাই,নিরাপত্তা চাই! কালিঝোরার ভেতর দিকে বনবাংলোর তিস্তাপারের বৃত্তান্ত অন্ত হলো, বড়সড় দল তাদের এমন সাজানো বাগানে মত্তহস্তীর তছনছ করে ফেলতে পারে, এই আতঙ্কে।নিউ চামটার চা-সাম্রাজ্যে সাঁতার-সরোবর, ব্যাডমিন্টন-আয়োজন,মাঠসহ সুসজ্জিত ব্যবস্থা গেল "অত কাছে সমতলের গেঁয়ো যোগী"-র তাচ্ছিল্যে।তারপর সৌরেনি বাতিল হলো,তারা খুব বেশি দর দেখানোয়।টিপুখোলা পছন্দ হলেও তেমন আস্তানা কিছু নেই,তা ছাড়া বুনো জন্তুর জায়গা,হাতি করিডর! চলছে রোজ নতুন খোঁজ।আলোচনায় অন্যান্য অনেক নাম উঠে এসেছে,নানা অসুবিধা বা অজুহাতে ধপাস্ করে পড়েও গেছে।তার মাঝে লোহাগড় ইমনের কাছে  অ-শোনা।হয়ত এভাবে প্রসঙ্গ না-উঠলে লোহাগড়ের নামই শোনা হতো না!

গত কয়েক মাসে চাপা বিরোধ চলেছে স্বামী-স্ত্রীতে।বিয়ে পরে হওয়া সখীদের কলকাতায় ছেড়ে এসে এখানে সুরেলা এখনো ক্ষতিটা পূরন করে উঠতে পারে নি।তা ছাড়া তার আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে চট করে অথবা বারবার শিলিগুড়িতে আসা কঠিন।ছেলে প্রথম দিকে বছরে এক বার করে হলেও দেশে ফিরেছে।এক বার তারা দু’জনেও গেছে।অথচ গত দু’আড়াই বছর দেখাসাক্ষাত নেই মায়ে-পোয়ে।ইমনের মনে হয় বিরোধের আদত উৎস সেটাই।তা ছাড়া ছেলের বিয়ে,বাড়ি সারিয়ে অনুষ্ঠানের উপযুকত করে তোলা- সে সব চিন্তাও উদ্বেগে রেখেছে তাকে।

এই সব সাত-পাঁচ মাথায় রেখে ইমনের মনে হয়,বনভাতির দেরি আছে, যাই তো দেখে আসি স্বাধীন চড়ুই হয়ে, যেখানে ভাতি হলো-না, কোন সে জায়গা!অতএব, হলেও-হতে-পারত-সারাটি–দিনের-প্রমোদ, তেমন এ  সফর, একটি বেলায় হ্রস্ব,কিন্তু সাথে আছে একলা সুরেলা,তাই গভীরতায় দীর্ঘ।প্রকৃতি যদি ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ থেকে জীবনানন্দের দুঃখ ভোলাতে পারে,তাদের ওপরে কি একটু কৃপা ছড়াতে পারে না!সুরেলার গভীরের শূন্যতার বহর কমিয়ে দিতে পারে না!

মহানন্দা,পঞ্চনোই,চামটা,বালাসোনকে জীর্ণ শীর্ণ মনে হলেও খেয়াল না-করার উপায় নেই।তাদের দুপাশের উন্মুক্ত বিস্তার ধারার বুক বেয়ে গিয়ে খানিক নিস্তার দেয় এ নষ্টযুগেও।বরং ব্যতিক্রম হয়ে আজ তাড়াহীন যাত্রায় মুখ তোলে বুড়ি বালাসোন, সে নজর কাড়ে উঁকি দিয়ে।আমরাও আছি কিন্তু : একে দুইয়ে বলে ওঠে সন্ন্যাসীঝোরা, টেপু ঝোরা,লালফা ঝোরা,চ্যাঙ্গা নদী,মাগুরমারি।পানিঘাটা মোড় থেকে ডানে ঘোরা।শান্ত কমলপুর চা, ঝোরা, ক্যাকটাস চার পাশের সীমানা বনেছে,বাঁশ ছেয়ে আছে,লোভনীয় খোলা মাঠ,গম্ভীর সুনসান মিলিটারি ছাউনি,প্রকৃতি বজায় রেখে গোছানো ব্যারাক,বাঁয়ে গল্ফ কোর্সে ছড়ি ঝোলা হাতে সহকারি,সামনে খেলোয়াড়।বন শুরু হতে অন্য রকম আরাম নামে চোখে, এলো বেঙডুবি বনবাংলো।সুরেলা ঝামেলার ছলে বলে, কী গো,আজ কি জোড়াতালি দিতে বেরিয়েছ?একবেলা টো টো  করে ছোটো করে নাকের বদলে নরুণ নয় তো?  পিকনিক হবে তো, না কি এ সব সান্ত্বনা, মন-টানার ছল?

শুনে তখনি কিছু মনে পড়তে সামান্য বিপথে গিয়ে সে বউকে দেখিয়ে আনে টিপুখোলা।সুন্দর বন, জলধারা,কিন্তু মহাশব্দে পিকনিক-প্যানিক!সে যে দিন এসেছিল, খুব কম লোক ছিল বলে বেশ রোমাঞ্চকর  লাগছিল।ডালপাতায় হাওয়ার শব্দ দারুণ লাগছিল।আজও লম্বা ঋজু বনস্পতির কী রূপ!জমি ছেয়ে আছে ফার্ণ আর প্রভাময় ঘাসে।কাঁচা পথে আগের বার হেঁটে গেছে সামনে সেন্ট্রাল ফরেস্ট বস্তিতে। অমন ফাঁকা  শান্ত মনোরম গাঁয়ের কী বিশ্রী নাম!পুনর্বাসন দেওয়ার সময় সরকারি লোকেরা নাকি দিয়েছে এই নাম!... ইমন আগে দেখেছে বলে না-গেলে সংসার মিলিজুলি থাকে না।বিনিময়ে সুরেলা তাকে বড়সড় ধনেশ পাখি দেখিয়ে ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়।তার গায়ের সাদা ও কালো সমান ঘন,চোখ-ধাঁধানো!ভয়ে উড়ে যাবার সময়ে তার মহিমার সীমা বাড়ে,ডানার সাদা খাঁজ বাঁকা কাঁটার মালা হয়ে যায়।

নতুন লাগানো বাচ্চা চা-চারা তাদের ঝাঁকের মাঝের গেরুয়া ফাঁকসহ মনোহর। ফের চলতে বন বদলায় নামঃ তাইপু বিট,চারপাশে কাঠের গুঁড়ি,জঙ্গল নির্জন।বাঁক নিতে পড়ে সুনসান ত্রিহানা চা,কদমা মোড়।ডান দিকে ঘুরতে বেলগাছি চা,খানিক বসতি,মান্জা নদী,খানিক বেলগাছি চা বাগান এদিকেও,পরে মানঝা চায়ের এলাকা শুরু হয়।নির্জনতা বাড়ে চা-দিগন্তে, মান্জা নদী তার সলিল-রিক্ততায় ডাঙ্গার প্রায় সমান হয়ে পাথরের শয্যায় টানা শুয়ে আছে।বর্ষায় বান এলে কী হাল হয় দুদিকে?তাই কি বিলকুল বিজন এ অঙ্গন?টিলা,বন দেখা যায় সামনে। মারাপুর চা আসার আগেই নির্জনতা বিস্তার পেয়ে আরও মোহময় হয়।নদী সরে গেছে বলে জেগেছে শ্রমিক বসতি,স্কুল,চার্চ,গুদাম,চা-কারখানা।সাইকেল-আরোহী চলে বস্তা-ঝোলা নিয়ে।কাঠ-হাতে ফেরে রাখাল,গরুর দলের তখনো মন ভরে নি,দু’এক চারপেয়ে যুবাকে শাসন করতে হয়। পথ দু'এক জায়গায় কাঁপুনি দিয়ে টলিয়ে দেয়।সুরেলাও বেসুরো বাজে,আহত করার মতলব নাকি এসব!কোমর তো আর থাকবে না!গাড়িও তো বিগড়ে যাবে মনে হচ্ছে,কত বছর নজর পড়ে নি এ রাস্তায় কে জানে!এর চেয়ে কাঁচা পথও তো ভালো!

নিজের দরকারমতো সময় তবু কাটে না দেখে পড়শির ছেলে আর বাড়িওলির নাতিকে পড়াতে শুরু করে সুরেলা।তাতে বেশ কাজ হয়।তাকে অনেকটা ধাতস্থ দেখায়।…তবু রাতে ঘুমের ঘোরে ছেলের সাথে কথা বলে,ঝগড়া করে কখনো।একবার তো কেঁদে উঠেছিল,ইমনের তখন বেশ কষ্ট হয়েছিল।অসহায় লেগেছিল।সভ্যতা যত জটিল হয়,অসহায়তা তত বুঝি বাড়ে।পাশের ঘরে তার পরের দিনও দুপুরে খাবার পরে চাপাকান্না টের পেয়েছে সে।বুঝেছে যে সেটা  রাতের জের।তবু দিনের বেলা বলে চিন্তা বেড়েছে তার।এখন ছেলের কাছে যাওয়াও ঠিক হবে না,গবেষণার প্রস্তাব অনুমোদন পাবার পরে সে এখন টানা লিখে চলেছে, বৃত্তির সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে পারলে ভালো,নয়ত সময় বাড়াবার আবেদন করতে হতে পারে।

এরই মাঝে দু'জায়গায় উঁচু বাঁকাপথ দেখে মনে হয় এসে গেলাম বুঝি!তাই লোক আবিষ্কার করে নিয়ে গন্তব্য জানতে হয়।ততক্ষণে কার্সিয়াং ডিভিশনের পানিঘাটা ফরেস্ট রেন্জের লোহাগড় বিটে ঢুকে পড়েছে তারা, বাঁয়ে কাঠের নিঃসঙ্গ বন-ব্যারাক,লোহাগড়ের,কর্মীরা কেউই নেই।দলবেঁধে হেঁটে হাটের দিকে হঠে গেছে বলে তাদের এমন হঠকারিতায় সেই নিরুপায় দোতলা আস্তানা আস্থা না-পেয়ে কাঠামো থেকে ভয়ে স্রেফ কাঠ হয়ে গেছে।সারা পথে চুপ করে থাকা চালক বলতে থাকে,পাশেই কোথায় রঙমোহন বস্তির ধানখেতে ছররা গুলি আর তড়িদাহত হবার ক্ষত শুঁড়ে নিয়ে পড়ে ছিল হাতি।টুকুরিয়া বা কলাবাড়ির জঙ্গল থেকে আসা বছর বারোর পুরুষটির চিৎকার শোনে নি কেউ,বিদ্যুতের তারও মেলে নি।অথচ দুদিকের জঙ্গলসহ প্রায় পঁচিশটি চা বাগানের সৌন্দর্য আর পাহাড়,নদী,ঝর্ণা ও আস্তানাসহ চা-পর্যটনের সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে না বলে অধিবাসীদের অভিযোগ প্রায়ই থাকে কাগজে।জঙ্গল-সাফারিও নাকি করা যেতে পারে।তা ছাড়া এখানকার ধিমাল বস্তির বিরল হতে চলা ধিমালদের জীবনও টোটোপাড়ার মতো আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।তা হলে রাস্তা উন্নত হয়,পরিত্যক্ত-ভাবটা ঘোচে,অর্থনৈতিক সুরাহা হয়।বন নষ্ট না-করে এমন প্রকল্প কত জায়গাতেই তো হয়েছে।

শুরু হয় ডানে চা,বাঁয়ে ঘন বন।কোন পথিকও নেই।জঙ্গুলে মেঠো পথে  ঝাঁকুনি খেয়ে চলতে পার হয় গুহে খোলা,সে-ই নুড়ি পাথর বোল্ডার, একই রকম বালুকা-বিস্তার।সেখানে কলাপীর স্বর,তা কিন্তু আলাপী নয়, আর্ত কেকারব!বালির মরুতে জলের নাকি খাদ্যের খোঁজে এসে লাফানো সাদা-দৈত্য দেখে সে ঝটিতি লেন্সের নিশানার বাইরে উধাও হয়।তার বড়সড় ময়ূরপুচ্ছ নাড়িয়ে পালানোর ছন্দ হাঁ করে দেখে সুরেলা। পথে ভোজালি ও রাইফেলধারী সেনাদল দেখে শোনা যায় নেপালের পাচারকারী মেচি নদী পেরিয়ে বনপথে চলে আসে। খানিক পরে আনন্দের জোরালো আর টানা হৈ চৈ,ছড়ানো শিলাসাম্রাজ্যে খেলে কারা!পা তো যাবে!দেখা যায় প্রকৃতি এক চৌকো আকৃতি মাঠ সরিয়ে রেখেছে নদীর গ্রাস থেকে,সেখানে প্রাণ-সই শৈশব -উৎসব!ইমন হাসে,চা-কর্মীদের বাচ্চারা সব জড়ো হয়েছে মরুদ্যানে!

এর খানিক পরেই সরু পথের ডানদিকে দেখা যায় খৈরবাণী বনবিশ্রামাগারের পথনির্দেশ,পাহাড়ের দিকে খাড়া উঠে গেছে।চালক বলে আর বেশি দূরে নয় লোহাগড় চা-বাগিচা।

অবশেষে যেখানে  গুহে খোলা ডানে বাঁক নেয়,ঠিক তার আগে খাড়া ঐদিকেই ওঠে টিলাপথ।বাঁয়ে ঢাল বেয়ে চা,ডানে ঘন গাছের ছা।মাথায় চড়ে পাক খেলে লোহাগড় চা বাগানের বাংলো,শত বছরের কত পুরনো টিনের চালের গোছানো বসত।ওরা দু’জনে ঘুরে বেড়ায় সেই সুনসান ছোট ভূখণ্ডে। ফুল ফল বাগান,ঘাসে ছাওয়া খোলা জায়গাঃইমনের মনে হয়, এখানে এলে আমাদের সহকর্মীরা,তাদের পরিবার এই সময়টায় ঘুরত!পাশে দু’দিকে দু’টো ছোট  মাঠ,কিন্তু দিব্যি খেলতে পারত ছোটোরা!দুই পাশে ছড়ানো বাড়তি কিছু ঘর,মহিলারা বিশ্রাম নিত!ওই ঘেরাটোপে হতো ঘ্রাণ-ছড়ানো রান্না ও কাটাকুটির বান্না!খানিক এদিক ওদিক ঘুরে দেখার পরে কোথা থেকে ফিরে এসে মালি তাকায় তাদের দিকে।ওদের নেপালি চালক তার দেশোয়ালি ভাইয়ের কৌতূহল মেটায়।তখনি সে বাগানের কাজে লেগে যায়।

ওদিকে বাংলো থেকে কুকুরের তীব্র প্রশ্ন ও প্রতিবাদ সামলাতে সেদিকে যেতে চায় সুরেলা।ইমনের বারণ না-শুনে সিঁড়ি,দোলনা,আর ফুল-অর্কিডের ঝুলন্ত টব পেরিয়ে ঢোকে।কী যে বলে তাকে,একেবারে চুপ করে যায় চারপেয়ে।দেখভাল করার মেয়েটি বারান্দায় এসে দেখতে পায় সুরেলাকে।ম্যানেজার এখন নেই বলে ব্যস্ততা নেই।ডাক পেয়ে ইমন গিয়ে দেখে আদর খেয়ে লেজ নেড়ে সুরেলার পায়ে লুটিয়ে পড়ে আছেন তিনি।কুঁ কুঁ কুঁই কুঁই  চলেছে।সব মিলিয়ে আপন হয়ে যায় অচেনা পৃথিবী।ইমনের মনে হয়,দূরে পড়তে যাওয়া ছেলের অভাব যেন কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ভুলেছে সুরেলা।এদিকের বাৎসল্য আর ওদিকের ভালোবাসা মিলে গেছে।

বাংলোর মেয়েটি বলছিল সারমেয়র জাতের কথা,সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান তারা।কী যেন নাম, বর্ডার কোলি!পরে হয়ত কিছু মিশ্রণ হয়েছে,তবে জাত সে তবু চিনিয়ে দেয়।এদের পূর্বপুরুষরা ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের মাঝের অঞ্চলে ভেড়া সামলাতে কাজে লাগত।কথা বা শিস ছাড়াও হাত নাড়া থেকে বুঝে নেয় কী করতে হবে।এরা খুব উপভোগ করে কাজকে।এক বারে শিখে নেয় অনেক কিছু,বুঝে যায় কত জিনিস।সমস্যায় পড়লে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে অবাক করে দেয়।তবে কাজ বা খেলা ছাড়া থাকতে চায় না,ছটফট করে জ্বালাতে থাকে,তখন বিপদ ঘটাতে পারে। অথচ এখন তাকে বাঁধা অবস্থায় বেশির ভাগ সময় বসে কাটাতে হয়।মনমরা হয়ে থাকে।পালাতে দক্ষ এরা,তালা খুলে ফেলতে পারে।তবে এ তেমন নয়।মেয়েটি,মালি বা ম্যানেজার পালা করে ঘোরায়,খেলা করায় তাকে।সত্যি সে যেন চোখেমুখে সব বুঝিয়ে দেয়।এক বারও আর গলা তোলে না।কেবল অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।সুরেলার মন যেন পড়তে পেরেছে সে।চরিত্র পড়তে পেরেছে।সে বুঝেছে এর ভালোবাসাও নিখাদ।তা পরই স্রেফ আত্মসমর্পণ করে বসেছে!

ধরার কী সুন্দর এক নিভৃত কোণ ধরা দেয় চোখে,যেখানে একক মালি ফুলের পরিচর্যা করে,বাংলোর মেয়েটি যেচে বড় রেকাবিতে সাজিয়ে আনে জলভরা গেলাস।লোভনীয় ভাবে টবে,চারায়,দোলনায় সাজানো সেই বারান্দায় নতুন করে নজর যায়।চোখে পড়ে কাজে বাইরে-যাওয়া ম্যানেজারের বই,খাতা,কলম,পত্রিকা,কত কী অপেক্ষায় রয়েছে টেবিলে!প্রথমে অত চেঁচানো সারমেয়টি অপরিমেয় ভালোবাসায়  এবার সুরেলার গায়ে মাথা রাখে!মাথা উঁচু করে নীরব ভাষায় আদর চায়।বলতে চায়,থেকে যাও,সঙ্গ দাও!আরও কী কী যে সে বেচারা করতে আর বলতে থাকে!বোঝা যায় নিঃসঙ্গতার যথেষ্ট বোঝা তার মাথায় আছে।আদর করতে থাকে সুরেলা।সমবেদনা পেয়ে মন ভরে গেছে বলে শরীর ছেড়ে দিয়ে পড়ে থাকে বর্ডার কোলি!

হ্যাঁ, এখানে হলেও হতে পারত তাদের বনভোজন!না হয় হবে কোনদিন! আঙিনা ভরে উঠে আনন্দগানে কাটবে সারাটি দিন! তারই কিছু পলের স্বাদ না-হয় পাওনা হলো এ যাত্রায়! তা কিন্তু কিছুতে দুধের স্বাদ ঘোলে নয় ....
আশ্চর্য এই যে, আবেগে না ভাসলেও, দু’জনেই ফেরার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছিল।কয়েকটা দিন,অন্তত একটি দিন থেকে যাবার বাসনা জেগেছিল।চায়ের জগতের মাঝে অন্যান্য কত রকম গাছ এক অন্য রকম পরিবেশ তৈরি করেছে।ছেয়ে থাকা বাঁশঝাড়,টিলার সুন্দর ঢাল,দূরের শৈলশ্রেণী,নদীর শুকনো খাত ভরে আছে বেদম দামী এক নীরবতায়!ভুবনের এই ডাঙ্গা বুঝি চরম মোহন হয়ে খড়ির গণ্ডী টেনে শেষ সীমা এঁকে আচমকা চুপ করে বসে পড়েছে!তার ফলে কিছু সৌন্দর্য কাঁচা অবস্থায় জীবন্ত রয়ে গেছে!বাইরে থেকে আসা আগন্তুকদের উপস্থিতি বেশ টের পেয়েছে বুঝি।বাতাসের ঢেউ আর পাখির ঠোঁট বেয়ে আন্তরিক সুরে তার বার্তা পাঠাচ্ছে!অথবা ডালপাতারা বুঝি বিচিত্র বাহারি চোখে পাল্টা মিনতি নিয়ে চেয়ে আছে!যেমন এখনো একদৃষ্টে চেয়ে আছে সারমেয়।প্রাণের টান বুঝেছে সে,কেবল এক কুকুর বলে অবহেলা পায় নি বেচারা।সত্তা হিসেবে সাড়া পেয়ে কৃতজ্ঞ সে।কেমন প্রণামের ভঙ্গিতে সুরেলার পায়ে পড়ে ছিল! তাতে কেমন বশ হয়ে গেছে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই।বিশেষ করে সুরেলার মুখ ঝলমল করে,যেন বলে,এই মাঠ,নদীর আঘাটা, শিশুরা,সবুজের গাম্ভীর্য,ওই পোষা প্রাণী-সকলে মিলে যেন শুষে নিয়েছে সব মনখারাপ!সুরেলা বলতে চায়, ধন্যবাদ ইমন,মন ভরিয়ে দেবার জন্য।পিকনিকের চেয়ে অনেক বেশি কিছুই আজ পেয়ে গেলাম!কত ছোট কিছু কেমন ভাবে বড় রকম রেহাই এনে দেয় !খুলে মেলে সহজ করে দেয় জট।


...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন