সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

বিপুল দাসের গল্প : লেখা থাকে


এক
অর্জুন সরেন যদি ঘটনার সামান্য একটু আভাসও পেত, তবে সেই লালগেঞ্জিটাই পরত সেদিন। কে জানত তাকে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে, কথা বলতে হবে। যদিও কথা বলতে তার কষ্টই হচ্ছিল, কিন্তু সেটা বোধহয় কেউ বুঝতে পারেনি। এমনি কথা বলার সময় তার ঠোঁটের ডানদিকটা একটু ভেঙে যায়, অনেকেই মনে করেছে সে বুঝি মৃদু হাসছে। অনেকে ভুল বুঝে মনে করে এটা বোধহয় বিদ্রূপের হাসি। আসলে অর্জুনের মুখের গড়নই ওই রকম। তার বাবা লাল সরেনেরও কথা বলার সময় মুখের ডানদিকের পেশিতে সামান্য টান ধরার ফলে মনে হত সে বোধহয় মুচকি হাসছে। পরে বোঝা যায় যে, এটা তার মুখের স্বভাবে জন্ম থেকেই আছে। বাপমায়ের শরীরের লক্ষণ কিছুটা আর কিছুটা স্বভাবচরিত্র বংশের নীচের দিকে গড়ায়। স্বভাবচরিত্র অবশ্য অনেক সময় মানুষের পালটে যায়, কিন্তু চলাফেরায় মুদ্রাদোষসহ চোখের মণির রং, চুলের কুঞ্চন, গায়ের রং, হাইট, দাঁতের গঠন – এসব পালটানো খুব কঠিন।  সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অর্জুনের চোখেমুখে কোথাও কষ্টের চিহ্ন সে বুঝে উঠতে দেয়নি, উপরন্তু সেই হাসিটা আরও একটু ছড়িয়ে দিয়েছিল সে। কিলিকঝিলিক ছবি উঠছিল অনেক। তখন তার লাল গেঞ্জিটার জন্য আপশোষ হচ্ছিল খুব। কে জানত আজ তার ছবি তুলবে টিভিওয়ালা। মুখের ভেতরে রক্তবাবদ নোনাস্বাদ টের পাচ্ছিল সে। তবু ডানদিকের ঠোঁটের ভাঙন আরও বিস্তৃত করে সে আনন্দ প্রকাশ করতে চাইছিল। বা বোঝাতে চাইছিল তার কোনও কষ্ট নেই।

অর্জুনকে অনেকেই বলেছে লালগেঞ্জি, কালো প্যান্ট আর সাদা জুতোটায় তাকে সুপার দেখায়। সে ঠিকই করে রেখেছিল আজ সে এটা পরেই মেলায় যাবে। আজ মেলা থেকে ফেরার পথে লক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা হওয়ার একটা চান্‌স আছে। সুযোগটা তৈরি করে নিতে হবে। দল থেকে আলাদা করে নিতে হবে লক্ষ্মীকে। তারপর মেলা থেকে কেনা ঝিলমিল-ঝিলমিল কানের দুলটা সে যদি নিজের হাতে লক্ষ্মীকে পরিয়ে দেয়, লক্ষ্মী কি আপত্তি করবে। অর্জুন জানে তখন কোনও মেয়ে না করে না। তখন তারা একটু বেশিই সোহাগ দেখায়।

পশ্চিম পাহাড়ের দিকে সূর্য নেমে যেতে তখনও অনেক দেরি। গরম মাটিতে মানুষের যে ছায়া পড়ছে, সেটা প্রায় মানুষের মতই লম্বা। সকালে-বিকালে সেটাই আবার কত বড় হয়ে যায়। ভরদুপুরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। আশ্চর্য ব্যাপার ! ঘরবাড়ি, মানুষজন, গাছপালা সব স্থির থাকলেও ওদের ছায়া দিব্যি নড়েচড়ে। এধার ওধার করে। ছোটবড় হয়। আর, সূর্যও তো আকাশে শুধু যে পুবপশ্চিম করে তা নয়; আকাশের উত্তরদক্ষিণেও তার কাত হওয়া আছে। তখন ছায়ারও বদল হয়। দক্ষিণমুখো বারান্দায় তখন সকালে বেশ কছুটা রোদ এসে পড়ে। শীতে বেশ আরামদায়ক সেই রোদ।

শালবনের ভেতর দিয়ে ফেরার সময় অর্জুন দেখল লক্ষ্মী দলছুট হয়ে সেদিকেই আসছে। মেলার মাঠে দোকানে দোকানে ঘোরার সময় ভিড়ের ভেতরে অর্জুন সে রকমই ইশারা করেছিল লক্ষ্মীকে। সোনামণি, পূর্ণিমা, টগর, ভানুমতী আর লক্ষ্মীদের দলটা মেলাজুড়ে খুব হইচই করে বেড়াচ্ছিল। ওদের দলটার দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল সবাই। বিটিছেল্যা তো নয়, যেন পাঁচটা আগুনের খাপরা। কিংবা চৈত্র মাসের ফুলেভরা পাঁচটা পলাশগাছ। একবার তাকালে লাল আভাটা চোখের ভেতর দিয়ে একেবারে মাথার ভেতরে ধিকি ধিকি আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারপর বুকের দিকে নামতে থাকে। তখন মেলার মাঠের পুরুষগুলো বড় নাচার হয়ে পড়ে। হাড়িয়ার আসরে গিয়ে না বসেও কেমন যেন নেশা-নেশা লাগে। পায়ে ছুরিবাঁধা লড়াইবাজ মোরগা যেন পাবলিকের একেবারে কলিজায় তীক্ষ্ণ ছুরিটা বসিয়ে দেয়। শুধু শরীরে নয়, মনের ভেতরেও মহুয়ার নেশা মাতাল করে দেয়।

সেই নেশায় ওরা দু’জনই মাতাল হয়ে ছিল। শালবন পেরিয়ে কয়েকটা মহুয়ার গাছ। তার মাঝে কিছু ঝোপঝাড়। প্রকান্ড বড় পূর্ণিমার চাঁদ পুব আকাশে ভেসে আছে। তার আলো থৈ থৈ করে ছড়াচ্ছে আকাশজুড়ে। শালবনের নীচে ঝিরিঝিরি আলোছায়ার নক্‌শা। সামান্য বাতাসেই সেগুলোর ডিজাইন বদলে যাচ্ছিল। ওদের দু’জনকে সেই নক্‌শার নীচে মনে হচ্ছিল সাদাকালো খোলসের আদিম একজোড়া সরীসৃপ। শঙ্খ লেগেছে। চৈতি রাতের পূর্ণিমার চাঁদ মহুয়া বনে ফাঁদ পেতে রেখেছে।

আহা, মহুয়া। একটু দূরে টিলার মাথায় সবচেয়ে বড় মহুয়া গাছটার দিকে তাকাতেই অর্জুনের মনে হল কাল মধ্যরাতের পর থেকে যত ফুল ঝরেছে, আজ সারা চৈত্র দুপুরের তাপে সেগুলো শুকিয়েছে। আর এখন চৈতি চাঁদের আলোয় শুকনো সেই ফুল ক্রমে মিশছে। মিশে যাচ্ছে, প্রথমে ঘোলা একটা দ্রবণ তৈরি হচ্ছে। আস্তে আস্তে এই জঙ্গলের বাতাস ছাঁকনির মত সেটাকে ছেঁকে প্রায় বর্ণহীন একটা তরল বানাচ্ছে। তারপর ছড়িয়ে দিচ্ছে এই জঙ্গলজুড়ে। বাতাস বয়ে গড়িয়ে এসেছে লক্ষ্মী আর অর্জুনের দিকে। ওদের ফুসফুসের ভেতর দিয়ে মাদক-বাষ্প রক্তে গিয়ে মিশছে। অর্জুন লক্ষ্মীর কানে ঝুটা-পাথরের দুল পরিয়ে দিল।

লক্ষ্মীর কানের সেই দুলের একটি হারিয়ে গেছে। সে রাতে বাড়ি ফেরার পথে সে একবার দু’হাত দিয়ে দুলদুটো ছুঁতে গিয়ে দেখল একটা দুল নেই। সর্বনাশ, এখন এই রাতে সে কোথায় খুঁজবে সেই দুল। হোক ঝুটা মোতি, কী সুন্দর ঝলমল করছিল আলো পড়ে। আসলি মোতি কেমন হয় কে জানে। সে সব বাবু, অফসরদের বউরা পরে। তার কাছে এটার দাম আসল মোতির চেয়েও বেশি। এটা অর্জুন তাকে মহুল বনের আলোছায়ায় বসে নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছে। তারপর লক্ষ্মী নিজেই অনেক সোহাগ দিয়েছে অর্জুনকে। ভেবেছিল আজ রাতে বারে বারে তার ছোট আয়নায় দেখবে তাকে কেমন দেখাচ্ছে। নিশ্চয় সেই বড় গাছটার নীচে কোথাও পড়ে আছে। ওখানেই তারা খুব ভালোবাসাবাসি করেছিল। কিন্তু এখন আর ওখানে যাওয়ার সময় নেই। চাঁদের আলোয় জঙ্গলের ভেতরে ওটা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। কাল ভোর না হতেই যেতে হবে। কিন্তু তার আগেই যদি ওটা কেউ কুড়িয়ে পায়, আলো ফুটলেই সেটা ঝিলমিল করে উঠবে। কারও না কারও চোখে পড়বেই। ওই তো অর্জুন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বলবে নাকি ওকে।

তাকে ঘরের দরজায় ছেড়ে অর্জুন একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। দেখল লক্ষ্মী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার দিকেই আবার ফিরে আসছে। কিছু কথা হয়তো অধুরা আছে তার। আরও কিছু দেওয়াথোওয়া বাকি আছে হয়তো।

এই অরণ্য অর্জুন খুব ভালো চেনে। শাল-মহুয়ার এই জঙ্গলেই সে বড় হয়েছে। তা ছাড়া লক্ষ্মীর হারিয়ে-যাওয়া কানের দুল এই রাতেই খুঁজে বের করা যেন একটা চ্যালেঞ্জ তার কাছে। সম্ভবত সেই বড় মহুয়া গাছটা, যার নীচে বসে তারা দু’জন খুব মাতাল হয়ে গিয়েছিল, ওখানেই কোথাও পড়েছে। তখন তারা পুরো বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল।

দুই
সাসাংবেডা রে বন জাত এনা হো। সেই প্রাচীন গান অর্জুনের বুকের ভেতরে বেজে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল এই শালবনই সেই চায়চাম্পা দেশ। সে ছিল  নিশ্চয় এক পাহাড়ি উপত্যকা। ঝরণা ছিল। মাদল আর বাঁশির সঙ্গে কামনার মদস্রাবী গন্ধ নিয়ে দুরন্ত যৌবনবতী মেয়েদের উদ্দাম নাচ ছিল। নাচতে নাচতে ওরা মঞ্জিথানে এলো। তখন ওরা নাচে অর্ধ-চন্দ্রাকারে। তারপর সাসাংবেডাতে এসে গোত্রে গোত্রে ভাগ হয়ে গেল ওরা।

কিন্তু আজ হঠাৎ একটা অজানা আতঙ্কে ভয় পাচ্ছিল অর্জুন। তার মনে হচ্ছিল মশাল হাতে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছে রাঁচি, হাজারিবাগ, পালামৌ, ময়ূরভঞ্জের গভীর জঙ্গল থেকে। জানগুরু তার দিকেই আঙুল তুলেছে।

অর্জুন ঠিক করেছিল বাঁধের ওপরের পথ দিয়ে গেলে সেখানে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে। চাঁদ তখন মাথার ওপরে উঠে এসেছে। শালের ঘন সবুজ বড় বড় পাতাগুলো এখন কালো জমাট সংঘ মনে হচ্ছিল। অর্জুন আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল জঙ্গলের কোন দিকটায় ওরা গিয়েছিল। কিন্তু এখন তার কেমন যেন সব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। এই অরণ্য তার চেনা অরণ্য নয়। মাথার ওপরের ওই চাঁদ তার চিরকালের চেনা চাঁদ নয়। অনেক কালের পুরনো কোনও উজ্জ্বল বস্তু ভেসে আছে আকাশে। প্রাচীন সেই থালা থেকে সোনাচাঁদির কণা ঝরে পড়ছে এই মহলে।

সে কতকাল আগে হড় জাতির মানুষেরা গিরু নাই পার হয়েছিল। তারও আগে সৃষ্টিকর্তা পিলচু হাড়াম আর পিলচু বুড়হি নামের আদি মানবমানবী সৃষ্টি করলেন। তাদের সাত ছেলে আর সাত মেয়ে হ’ল। তারপর সেই পিঁড়ি বেয়ে এল কত গোষ্ঠী। কিস্কু গোষ্ঠী পেল দেশ শাসনের ভার, হেমব্রম পেল তার দেওয়ানি, মুর্মুরা হ’ল পুরোহিত, কৃষিকাজের দায়িত্ব পেল মান্ডি গোষ্ঠী, সরেনের দল হ’ল সেপাই, টুডুরা পেল নাচগান করার অধিকার। এসব লেখা থাকে শাল-মহুলের পাতায়, শেকড়ে, বাকলের নীচে।

তেমন চওড়া বাঁধ নয়। তির্ণা এমন কিছু বড় নদী নয়। বর্ষাকালেই যা একটু তার ছলবলনি। চোতবোশেখে তো শুধু বালি। সরু বাঁধ। তার ওপর দিয়ে আরও সরু পায়েচলা পথ। মাটির বাঁধ। নদীর ঢালের দিকটায় বড় বড় গাছ অনেককাল আগে কেউ হয়তো বসিয়েছিল। সেই গাছের শিকড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বাঁধের মাটিকে। সে কারণেই নিশ্চয় এভাবে বনসৃজন করা হয়েছিল, বর্ষার জল যাতে মাটির বাঁধ ভাঙতে না পারে। তখন হয়তো এই তির্ণা আরও অনেক বেশি জল নিয়ে প্রবল বেগে বইত এই মহলের ভেতর দিয়ে। তখন এত জলকষ্ট ছিল না এই জঙ্গলের মানুষদের।

বাঁধের ওপরে সরু পায়েচলা পথকে ঠিক পথও বলা যায় না। পথের ইশারা। এ পথ বেয়ে যার কোথাও যাওয়ার দরকার হয়, দিনের বেলা হলে সে ঠিকই বুঝে নেয় কোন ইশারা বেয়ে বাঁ দিকে নেমে গেলে বসতি, আর কোন ইশারায় ঘন অরণ্য। কোথাও আবার হালকা সুতোর মত সে এঁকেবেঁকে পড়ে থাকা চিহ্ন ঘুরে গেছে ডানদিকেও। খুব অস্পষ্ট। নেশার ঘোরে অনেক দূর থেকে শোনা মাদলের বোলের মত। প্রায় যেন ধিঙদা হেতাঙ্‌ তিঙ্‌ দাতাঙ্‌ দাতাঙ্‌ তিঙ্‌দা। সহজাত প্রবৃত্তিতেই সবাই বোঝে নদীর ওপারে যেতে হলে ওই সুতো ধরে ডানদিকে নেমে যেতে হবে।

কিন্তু রাতে সব পালটে যায়। দিনের বেলায় যা থাকে সবুজ ঝোপঝাড়, শালশিমুলমহুয়াপলাশের জমাট সঙ্ঘ, রাতে সব কালো হয়ে যায়। একা একা গভীর রাতে সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন যেন অচেনা মনে হয়। অর্জুন ভেবেছিল প্রথমে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুটা গিয়ে বাঁধে উঠে পড়বে। তারপর বাঁধ যেখানে ঠিক প্রায় গোল হয়ে বাঁক নিয়েছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই ওরা কোথায়, কোন বড় গাছটার নীচে বসেছিল, তার একটা আন্দাজ পাবে।

বসতির কিছুটা পথ পার হয়ে জঙ্গলে ঢোকার একটু বাদেই অর্জুনের সব কিছু গুলিয়ে যেতে শুরু করেছিল। পুরো জঙ্গলজুড়েই মাটিতে বিছানো রয়েছে সাদাকালো চৌখুপি নকশার অনন্ত এক চাদর। পুরো মহলের মাথার ওপর শালপাতার যে বিস্তৃত এক ছাতা রয়েছে, তারই ফাঁকফোঁকর গলে চুঁইয়ে পড়ছে রুপোলি আলো। বড় পাতাগুলো তৈরি করেছে ছায়া। বাতাস উঠলে শুকনো পাতার ওপর বিছিয়ে-দেওয়া চাদরের ওপরেও ঢেউ ওঠে। এলোমেলো হতে থাকে সাদাকালো খোপগুলো। চেনা ছবি, তবু অর্জুনের মনে হ’ল আজ নক্‌শাগুলো একটু আলাদা মনে হচ্ছে। সেটা লক্ষ্মীর সঙ্গে আজ সন্ধ্যায় দেখা হওয়ার সুখে, নাকি লক্ষ্মীর কানের দুল হারিয়ে যাওয়ার দুঃখে – স্পষ্ট বুঝতে পারছিল না। কিন্তু দু’রকমের একটা হাওয়া সে টের পাচ্ছিল। চিরকালের চেনাজানা মায়ের মত জঙ্গল, আবার মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছিল আলো-অন্ধকার মাখা রহস্যময় এই জঙ্গলের প্রতিটি ছায়ার পেছনে অচেনা কোনও ভয় রয়েছে। ডাকাবুকো হিরো অর্জুনেরও কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। আড়াল থেকে কেউ তার ওপর নজর রেখেছে, এ রকম মনে হচ্ছিল।

এ রকম মনে হওয়ার পেছনে কারণ আছে। আজ হাটে ঘোরার সময় সে বরাবর লক্ষ্মীর দিকে নজর রাখলেও টের পাচ্ছিল আজ বরাবরের বাইরেও কিছু অচেনা লোক রয়েছে হাটে। তখন থেকেই তার মনে কেমন কু গাইছিল। আজ হাটের বাতাসে কিছু একটা অচেনা গন্ধ রয়েছে।

জঙ্গল পার হয়ে বাঁধে ওঠার মুখেই অর্জুন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। তার অরণ্যচারী ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করল। হাজার বছর ধরে রক্তে ঘোরাফেরা করে কিছু চেতাবনি। কিছু শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, উষ্ণতার তারতম্য বোঝার ক্ষমতা বেঁচে থাকার জন্য অনেক তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে অর্জুনদের। বাঁধের ওপরে কিছু নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে বুঝতে অসুবিধা হ’ল না।

আচমকাই তাকে ঘিরে ধরল পাঁচজন মানুষ। অন্ধকারেও বুঝতে অসুবিধা হয় না তাদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। দ্রুত ওর দুটো হাত পেছনে মুড়ে বেঁধে ফেলল, তারপর মুখও বাঁধল। অর্জুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই এসব ঘটে গেল। তারপর অর্জুন বাঁধে ওঠার মুখে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে ঝোঁপজঙ্গল সরিয়ে কী যেন দেখল ওরা।

সেই অচেনা মানুষগুলো নয়, অর্জুনকে মেরে পাট করে দিয়েছিল খাকি শার্ট, ধুতি আর বুট পরা কিছু মানুষ। চমৎকার ছিল তাদের মোচ আর হাত ও কাঁধের পেশি। জঙ্গলের মানুষগুলোর মুখ ঢাকা ছিল গামছা দিয়ে। ওরা জানতে চেয়েছিল এত রাতে অর্জুন সেখানে কেন এসেছে। তাদের অস্ত্রভান্ডারের কথা অর্জুন কতটুকু জানে। কানের দুলের কথা বলেছিল অর্জুন। বড় গাছটার কথা বলেছিল। ওদের একজন টর্চ নিয়ে চলে গিয়েছিল সেই গাছের খোঁজে। বুঝতে চেয়েছিল অর্জুন মিথ্যে বলছে কিনা। কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এসেছিল লক্ষ্মীর হারিয়ে যাওয়া দুল নিয়ে। হাসাহাসি করছিল ওরা।

কোনও কথা বলছিল না অর্জুন। কাল রাতেই পুলিশ জঙ্গল ঘিরে ফেলেছিল। ওদের কাছে সোর্স মারফত খবর ছিল অ্যাকশন হবে। কিন্তু বাইরের এই দলের সঙ্গে অর্জুনের যোগাযোগ ওরা কিছুতেই কোনও ভাবেই প্রমাণ করতে পারছিল না। প্রায় নাঙ্গা করে ওরা অর্জুনের তল্লাশি নিয়েছে। মারাত্মক কোনও অস্ত্র পাওয়া যায়নি। হতাশা থেকে ওরা আরও পাগল হয়ে যাচ্ছিল। শেষে একটা ঝুটাপাথরের কানের দুল পাওয়া গেলে ওরা বুঝতে পারে এটা কোনও চক্রান্তের অঙ্গ। এটা ছিনতাই বা ডাকাতি করা আসল হিরে। বিশেষ করে তখন সকালবেলার সূর্যের আলো ওটার ওপর পড়ে ভীষণ ঝলমল করছিল। সে কথা অর্জুনের মুখে শুনতে চাইছিল ওরা। লাঠি, বুট, এমন কী  একজন তার পেছনে সত্যি সত্যি বন্দুকের নল প্রচন্ড জোরে চেপে ধরলে আর সবাই খ্যা খ্যা করে হাসছিল।

মিডিয়া পটাপট ছবি নিচ্ছিল অর্জুনের। অর্জুন যদি জানত এভাবে তার ছবি উঠবে আজ, তবে সে নিশ্চয় লাল গেঞ্জিটাই পরে আসত। তার ঠোঁটের ডানদিকের ভাঙনের জন্য মনে হয় সে হাসছে। আসলে সে হাসে না। এটা জিনের কারসাজি। যেন হাজার বছরের লাঞ্ছনার উত্তরে এক টুকরো বিদ্রূপের হাসি গড়িয়ে আসে বংশ পরম্পরায়। ছড়িয়ে পড়ে আদিম জঙ্গলজুড়ে। জলের মত গড়ানো সেই হাসি শোষণ করে অরণ্যের শাল, শিমুল, মহুয়ার খয়েরি বাকল, সবুজ পাতা। জমা থাকে।

                       ।। ----------------------।।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন