শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২০

যুগান্তর মিত্রের গল্প : অবতরণ






কী শুনতে চাও?
আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা?
হ্যাঁ।
আমি তোমাকে কাছে পেতে চাই কিনা?
হ্যাঁ।
আমি তোমার আদর পেতে চাই কিনা?
হ্যাঁ।
শীতকালটা যাই-যাই করেও যাচ্ছে না। হালকা ঠান্ডা ছেয়ে আছে। তবু জানালাটা খুলে রেখেছে অভ্রজিৎ। বাইরে আঝোর বৃষ্টি। মাঝে মাঝে ডাকাতের মতো ঝলকে ঝলকে হাওয়া ঢুকে আসছে ঘরে। অন্ধকার চিরে বহুদূর থেকে ভেসে আসছে স্ট্রিট লাইটের আভা। আলো-অন্ধকার মাখা সুতো নেমে আসতে দেখে অভ্র। পাশেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে সুমনা। পিছন ফিরে শুয়ে আছে পাতলা কম্বল মুড়ি দিয়ে। সেইসময় হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে এল ঋতির কথাগুলো।
বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপের পর্দায় প্রশ্নটা ভাসিয়ে দিয়েছিল অভ্র। ‘এই যে আমাদের কথাবার্তা, নিজস্ব সংলাপ গড়ে ওঠা, এর মধ্যে অনেক না-বলা কথাও থাকে। সেই কথাগুলো কখনও বলো না তো? আমি যে শুনতে চাই ঋতি!’
তখন অফলাইন ছিল ঋতি। বেশ কিছুক্ষণ উত্তরের প্রত্যাশা নিয়ে নেট অন রেখেছিল অভ্র। জবাব আসেনি। মনের মধ্যে উসখুস ভাব। ছোট-বড় ঢেউ সামলাতে গিয়ে খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। অফিসের কাজের চাপে সেই উদ্দামতা কমে আসে ক্রমশ। তারপর অফিস শেষে ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরা। প্রায় ঘণ্টাখানেকের পথ। বাড়ি ফিরে ফোনটা চার্জে বসিয়ে ছেলেকে নিয়ে পড়াতে বসেছিল অভ্র।
সপ্তাহে দুদিন সন্ধ্যায় ছেলের পড়া থাকে না প্রাইভেট টিউটরের কাছে। এই দুদিন বাংলাটা দেখিয়ে দেয় সে। পড়ানো, তারপর সুমনার সঙ্গে টুকিটাকি সাংসারিক কথা বলা, খাওয়া আর বিছানায় চলে আসা সুমনার। সবই ঘটে রুটিন মাফিক। মাঝে মাঝে অভ্র মায়ের ঘরে গিয়ে টিভিতে চোখ রাখে কিছুক্ষণ। তবে নির্দিষ্ট কোনও সিরিয়াল দেখে না সে। দেখতে ভালোও লাগে না। যখন যা হয় তা-ই দেখে। না-গেলে মায়ের অভিমান হয়, বোঝে অভ্র।
রাতের খাওয়ার পর মশারির নীচে সুমনা চলে গেলেও অভ্র বিছানায় যায় আরও খানিকটা দেরিতে। এই সময়টায় ও লেখে। কবিতা বা মুক্তগদ্য। কখনও আবার গল্পও। মাত্রই কয়েক বছর হল লেখালেখি করছে অভ্র। স্যোসাল মিডিয়ার হাতছানিতে লেখালেখির দিকে চলে এল কীভাবে যেন। স্ত্রীকেও প্রবল আগ্রহ নিয়ে শোনাত অভ্র। কিন্তু এসব সুমনাকে তেমন টানে না। ফেসবুকের দৌলতে খানিকটা চেনপরিচিতি হয়েছে। পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হয়। এই জগৎটার প্রেমে পড়ে গেছে অভ্রজিৎ। এমনই এক ছাপা গল্পের সুবাদে ঋতির সঙ্গে আলাপ হয় অভ্রর। সেই আলাপপর্ব খুব দ্রুত বন্ধুত্বে টেনে আনে তাদের। তারপর ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া, হোয়াটসঅ্যাপে কথার ফুলঝুরি। একসময় দুজনেই বুঝতে পারে একটা অমোঘ সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে তারা। অমোঘ এবং অনিবার্য। কিন্তু ফলাফলশূন্য।
লেখালেখির নেশাটা যখন আঁকড়ে ধরল তাকে, তখন প্রথমদিকে সুমনা অনুযোগ করত, আলো জ্বালিয়ে রাখলে আমার ঘুম আসে না। প্লিজ, বন্ধ করে শুয়ে পড়ো।
টেবিল ল্যাম্পের আলোতেও…
হ্যাঁ, চোখে আলো পড়ে না বুঝি? আদুরে গলায় বলেছিল সুমনা।
তারপর থেকে বিছানা আড়াল করে বসে অভ্র, যাতে সেদিকে আলো না-যায়। তবু অনুযোগ থাকতই। একসময় তাও বন্ধ হয়ে গেল। তাদের দুজনের মধ্যে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় রাতের খাবার পরে। অভ্র বুঝেও চুপ করে থাকে। মেয়েকে নিয়ে অবশ্য কোনও সমস্যা হয়নি। ক্লাস সেভেন-এইট থেকেই মেয়ে তার ঠাম্মার কাছে শোয়।
এক রাতে সুমনা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল অভ্রকে। রাতে শোবার সময় অন্তর্বাসহীন নাইটি পরা সুমনার বরাবরের অভ্যেস। তার সেই জড়িয়ে ধরায় রোমাঞ্চিত হয়েছিল অভ্র। সুমনার আহ্বানে সাড়াও দিয়েছিল সে। সুমনা অনেকবার বলেছে, তুমি ভোরে উঠে লিখতে পারো না?
না সু, এই সময়টাতেই আমার মনে শব্দগুলো ভিড় করে আসে। লিখতে ইচ্ছে করে। বাধা দিও না প্লিজ।
সুমনার দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ফেলা নজর এড়ায়নি অভ্রর। অভিমানে বুক ভারি করে মেনে নিয়েছিল সুমনা। তবে প্রতিদিন নয়, মাঝে মাঝেই অভ্র তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।
কী হল? আজ তোমার শব্দরা ছুটি নিয়েছে? মজার ছলে সুমনা খোঁচা দেয়।
আজ হবে না। আমি বুঝতে পারি কোনদিন মাথা খুঁড়লেও লেখা ধরা দেবে না। স্মিত হেসে জবাব দিয়েছে অভ্র। তারপর সুমনাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থেকেছে।
অফিস থেকে ফেরার সময়ই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। অসময়ের বৃষ্টি। তখন থেকেই অভ্রর মনে হচ্ছিল আজ রাতে বৃষ্টি দেখবে সে। তাই জানালা খুলে রেখেছে। ঋতির দিকে ভাসিয়ে-দেওয়া প্রশ্নগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিল। নেট অন করতেই ঋতির জবাব দেখতে পায় অভ্র। রাত ন-টার পর ঋতি কখনও নেট অন করে না। তার মানে এখন তার ফিরতি জবাবের প্রত্যাশা নেই। ধীরেসুস্থে জবাব দিলেই হবে।
পঞ্চাশের দিকে বয়স ঢলে পড়ছে। এইসময় ঋতি তার জীবনে কেন এল? কোথাও কি ফাঁক থেকে গেছে? সেই ফাঁক দিয়েই ঋতি ঢুকে পড়ল? ঋতিও তো সংসার জীবনে সুখী। আসলে কি আপাতসুখী? ওর জীবনেও ফাঁক আছে কিছু? তাই কি ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে ঋতির জীবনে! হয়তো কোথাও একটা অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। কারও জীবনই কি পরিপূর্ণ হয়! চাওয়াপাওয়া মেলে? ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে যেতে অভ্র টের পায় তার মোবাইলটা ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল।
কী, খুশি তো?
ঋতি ঘুমোয়নি। আজ এইসময় নেট অন করল কেন? ওর মনেও কি আমার জবাবের প্রত্যাশা? তাই কি ঋতির ম্যাসেজে নীল টিক চিহ্ন পড়ার পরই বুঝতে পারে আমি অন লাইনে আছি? ভাবে অভ্র।
অনেক রাত পর্যন্ত কথা হল ঋতির সঙ্গে। একসময় ঋতিই বলে ওঠে, কত রাত হল খেয়াল আছে? ঘুমোবে না?
আজ দেরি হলে ক্ষতি নেই। কাল শনিবার, অফিস ছুটি।
আমার কিন্তু খুব ঘুম পাচ্ছে। টা-টা…
এরপর একটা লাভ চিহ্ন, যেমন প্রতিবারই শেষে দেয়। ঋতি সবসময়ই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় আর নেট অফ করে দেয়। অভ্রর ভালোবাসা-মাখা স্মাইলি অসহায়ের মতো পড়ে থাকে। ডাবল ঠিক পড়ে না। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অভ্র। তারপর সমস্ত চ্যাট মুছে ফেলে এক লহমায়। এটাই ঋতি ও অভ্রর চুক্তি। যা-কিছু কথা সব মুছে ফেলতে হবে। সবই। কোনও অসতর্কতায় যেন বাড়ির অন্য কেউ দেখে না-ফেলে।
(২)
ধৃতিমান অফিসে চলে গেছে। বাপ্পাও চলে গেল কলেজে। দোতলার বারান্দা থেকে রোজকার মতোই ছেলেকে হাত নেড়ে টা-টা জানাল ঋতি। তারপরই ঘরে এসে আলমারি খুলে বসল সে। কোন শাড়িটা পরবে ভাবে। শাড়িই পরবে, নাকি গোলাপি চুরিদারটা! থরে থরে সাজানো শাড়িতে হাত বোলায় ঋতি। তার কোমল স্পর্শে প্রতিটি শাড়ি প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটায়। অবশেষে ম্যাপল কালারের সিল্ক-সিফন বেছে নেয়। ধৃতিমান পছন্দ করে কিনে দিয়েছিল তাকে। প্রথম যেদিন অভ্রর সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন এই শাড়িটাই পরেছিল ঋতি।
ঠিক ছ-মাস একদিন বাদে গতকাল সকালে ফোনটা এল। অচেনা নম্বর। সেলস প্রোমোশনের ফোনকল ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিল ঋতি। দ্বিতীয়বার ফোন বাজতেই সংশয় নিয়ে বলে ওঠে, ‘হ্যালো’। কোন সুদূরের ধ্বনির মতো ভেসে এল কথা। ‘কেমন আছো’?
কষ্ট ফিকে হতে হতে একসময় সয়েও গিয়েছিল ঋতির। সারাদিন একটা মনখারাপ করা মথ ডানা মুড়ে চুপটি করে বসে থাকত তার মনবারান্দায়। আবার মাঝে মাঝেই বুকের ভেতরে একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত। সেইসঙ্গে হু-হু বাতাস। প্রথমদিকে সেই ঢেউয়ের আন্দোলনে সব কেমন এলোমেলো হয়ে যেত। সামলে নিতে খুব কষ্ট হত ঋতির। পরের দিকে তাও অভ্যেস হয়ে গেল। শুধু মন তার হিসেব রেখে চলত ১৭ দিন, ৩৬ দিন, ৪৯ দিন, ৬২ দিন, ৭৭ দিন… কোনও কথা নেই। কোনও যোগাযোগ নেই!
অভ্রর ফোন নম্বরই জানত শুধু ঋতি। ওর স্ত্রীর নামটাও কোনওদিন জিজ্ঞাসা করেনি। অভ্রও বলেনি। বাড়ির ঠিকানাও জানা নেই। প্রতিদিনই তো কথা হয় চ্যাটে। প্রায় সারাদিনই। অভ্রর কোনও কবিতাপাঠ থাকলে যেত ঋতি। তবে সবসময় যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হত না। সেই দেখা হওয়া-না-হওয়া খুব বেশি ছাপ ফেলত না মনে। কেননা কথায় আর ছবিতে দুজনে দুজনার স্পর্শ অনুভব করত। আসমানি আকাশ থেকে নেমে আসত আনন্দরঙের গুঁড়ো গুঁড়ো আলো। অজানা সুবাস ছেয়ে থাকত আশেপাশে।
অভ্র আচমকা সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় অভিমান নদীস্রোত হয়ে বয়ে যেত ঋতির মনে। এত বোঝাপড়া ছিল আমার সঙ্গে, আগের দিন অনেক রাতে পর্যন্ত কথা হল, পরদিন একেবারেই অফলাইন! দুপুর পেরিয়ে যাওয়ার পরে কয়েকবার অভ্রকে ফোন করেছিল সে। বন্ধ। ম্যাসেঞ্জারে জানতে চাইল কী হয়েছে? জবাব আসেনি। কয়েকদিন পরে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে চোখ আটকে গিয়েছিল ঋতির। অভ্রজিৎ রায় নিখোঁজ। তার কোনও খবর কেউ জানে না। এমনকি বাড়ির লোকও জানে না। অনেক থানাপুলিশ আর খোঁজখবর করেও জানা যায়নি। আরও অনেককিছু লেখা ছিল। চেনা-অচেনা অনেকের হাহাকার আর উদ্বিগ্নতা পড়তে পড়তে থমকে গিয়েছিল সে। তবে বেশিদূর পড়তে পারেনি। চায়ওনি। কেমন যেন অবশ হয়ে পড়ছিল ঋতির শরীর।
গলাটা শুনেই ঋতির ভেতরটা কেঁপে উঠল। অভ্র! এতদিন পরে? আমি ভালো আছি। তুমি তুমি…। গলা বুজে আসে। অবিরাম বৃষ্টিধারায় ভিজে যাচ্ছে তার কোমলাঙ্গ। ফোনের অপরপ্রান্তে নীরবতা। এই নীরবতাই তো গত ছ-মাস ধরে বুকের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে ঋতি। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলে যায় অনর্গল। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? কোথায়? কেন যোগাযোগ করোনি? আমার কথা মনে হয়নি একবারও? একটা ফোনও করলে না? বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখোনি শুনেছি। তোমার ফোনও বন্ধ ছিল। প্রতিদিন কতবার করে ফোন করেছি! তোমার কবিবন্ধুদেরও জিজ্ঞাসা করেছি। কেউ কিছু বলতে পারেনি। …কথা বলছ না কেন অভ্র? কথা বলো। জবাব দাও।
তুমি বলছ। আমি শুনছি।
শুধু শুনবে? বলবে না কিছু? এটা তো নতুন নম্বর। আগের নম্বরটা নেই?
নাহ্। নেই। ফোনটাও নেই।
হারিয়ে গেছে? নাকি চুরি?
না। ফেলে দিয়েছিলাম গঙ্গায়।
ফেলে দিয়েছিলে?
হ্যাঁ, আমি যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানে যাবার সময় মনে হল এই যোগাযোগের বন্ধনটার দরকার কী? তাই ফেলে দিলাম।
যেখানে মানে কোথায় অভ্র?
তা আমি বলব না। কাউকেই বলব না ঠিক করেছি।
আমাকেও বলা যায় না?
না। যায় না। আমাকে জিজ্ঞাসা কোরো না ঋতি। আমি বলতে পারব না।
থমকে যায় ঋতি। সরাসরি প্রত্যাখ্যানই নয়, বলবে না বলে দৃঢ়স্বরে ঘোষণাও করে দিয়েছে অভ্র। আমার কি তাহলে জানার অধিকার নেই? অভিমানের বৃষ্টি নামে ঋতির বুকে। তবু সেসব সরিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করে, এখন তুমি কোথায়?
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ধার দিয়ে হাঁটছি। একা।
বাড়ি ফিরেছ কবে?
গতকাল।
আমাকে ফোন করোনি কেন?
এই তো করলাম।
এরপর! এরপর আর কী বলবে ঋতি? আর কী কী অনুযোগে ভরিয়ে দেবে অভ্রর কর্ণকুহর? অভিমানে ভিজিয়ে দেবে অভ্রকে?
অভ্র বলে যায় তার সেই অজানা স্থানে যাওয়ার কথা। সেখানকার পাহাড় আর অরণ্যের হাতছানির কথা। গ্রামের লোকেদের দুঃসহ জীবনের কথা। এসব শুনতে ভালো লাগছিল না ঋতির। সে কবিতার কথা বলে। গল্পের কথা বলে। তাদের প্রাত্যহিক যোগাযোগের কথা মনে করায়। ফেলে-আসা দিনের প্রসঙ্গ আসতেই অভ্র কেমন যেন গুটিয়ে যায়। তরঙ্গহীন নদীর তিরতির বয়ে-চলা বুঝতে পারে ঋতি। অত্যন্ত শীতলকণ্ঠে অভ্র জানায়, পূর্বাশ্রমের কথা ভাবতে চাই না আর।
পূর্বাশ্রম! ঋতির ভেতরঘরে হু-হু বাতাস দুলে ওঠে। অভ্র কি সন্ন্যাস নিয়েছে? যেখানে গিয়েছিল, সেখানকার পাহাড়, অরণ্য তাকে ডাকছিল। যদিও কোনওদিন আগে যায়নি সেখানে। তবু কীভাবে ডাকল? কে ডাকল? সমস্ত মোহ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায়। আমার প্রতিও মোহ নেই? ভালোবাসা নেই? তবে কেন যোগাযোগ করল এতদিন পরে? নিশ্চয়ই ভালোবাসা আছে, মোহ আছে। নিজেকে সান্ত্বনা দেয় ঋতি। আর অপেক্ষা করে অভ্রর জন্য।
অভ্র কথা দিয়েছে আজ আসবে। এ বাড়িতে ধৃতিমান ও ছেলে ঋদ্ধির বন্ধুরা আসে নিয়মিত। ঋতির কলেজবেলার বন্ধুরাও আসে মাঝে মাঝে। তাই অভ্রর আসা নিয়ে কোনও সংশয় রাখেনি। সে নিজেই অভ্রকে আসতে বলেছে। আগে কখনও কেন বলেনি সেই আক্ষেপ ধোঁয়ার মতো রিনরিন করে উড়ে যাচ্ছে মনের ভেতরে। আজ অভ্র আসবে ভেবেই খুশি উপচে পড়ছিল ঋতির মনে। সাবানের ফেনার মতো ভরে যাচ্ছে তার সারা বুক। বুকের বাইরে, ঘরের মেঝেতে। থইথই দিবালোকের মধ্যে।
এগারোটায় আসার কথা। আসবে তো অভ্র? শেষপর্যন্ত তার কাছে আসবে? আশংকার মেঘ ঘনায় তার বুকে। কেমন দেখবে অভ্রকে? সন্ন্যাসীর পোশাকে?
কলিং বেলের শব্দে ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যায়। দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখে অভ্র দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলা থাকলেও কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে। কিশোরীর মতো চঞ্চল পায়ে নীচে নেমে যায় ঋতি। ইচ্ছে করছিল হাত ধরে নিয়ে আসার। কিন্তু পারে না। তার পেছন পেছন অভ্র উঠে আসে।
মাথার চুল কি খানিকটা পাতলা লাগছে? চোখটা আরও যেন উজ্জ্বল। চেহারা একই আছে। সাদা শার্ট আর স্কাই-ব্লু ট্রাউজারে বেশ লাগছে দেখতে। সোফায় বসে-থাকা অভ্রকে দু-চোখ ভরে দেখে ঋতি। অথচ অভ্রর চোখ বারান্দা পেরিয়ে বাইরের আকাশের দিকে যেন। ঋতি এই ভেবে স্বস্তি পায় যে অভ্র সন্ন্যাস নেয়নি।
অনেক কথা হল। ঋতিই বলল বেশি। অভ্র কি অন্যমনস্ক? তার সব কথা শুনছে না মনে হচ্ছে। কেন সে অন্যমনস্ক? ঘরে এখন কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। একবার কি অভ্রর হাতটা ধরবে? মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলবে, আর কোনওদিন কোত্থাও যাবে না অভ্র। কথা দাও। কিন্তু পারেনি।
চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেল না। ঘরে মিষ্টি আনা ছিল। সেসবও খেল না। কেবল যাই যাই!
এবার আসি ঋতি! আর বাধা দিও না।
বেশ যাও। কথাটা বলতে কষ্ট হল তার। তবু বলল। যে মানুষটাকে সে চিনত, সে যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এলোমেলো পথ ধরে এগিয়ে চলেছে কোন অনির্দেশের দিকে। তাকে আটকে রাখার সাধ্য নেই ঋতির। তার ভেতরে যে প্রদীপটা জ্বলে উঠেছিল গতকাল ফোনটা আসার পর, সেই প্রদীপটা দপ করে নিভে গেল যেন। সলতে থেকে ধোঁয়া উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়, ঋতি স্পষ্ট দেখতে পায়।
অভ্র চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ওর বউ স্কুলের দিদিমণি। ওদের কোনও অসুবিধা হবার কথা নয়। কেন যে এসব চিন্তা মাথায় ভিড় করছে, জানে না ঋতি। খাদের কিনারে এসে যে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে, সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে যেন ঋতি। সামনে এগোনোর আর পথ নেই। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকাই যেন নিয়তি। তবু কিছু-একটা আঁকড়ে ধরতে চায় সে। তাই প্রশ্নটা উঠে আসে। ভাসিয়ে দেয় অভ্রজিতের দিকে।
তুমি পূর্বাশ্রমের সবকিছু ভুলে যেতে চাও কেন?
জানি না।
কিন্তু পারবে না। পারবে না বলেই তো স্ত্রী আর মেয়ের কাছে ফিরে এসেছ। মায়ের কাছে ফিরে এসেছ। আমার কাছেও…
দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে অভ্র। কোনও জবাব দেয় না।
এবার আসি। ভালো থেকো।
অভ্র দরজার দিকে এগিয়ে যায়। আর অনুমতি চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। বারবার নানা প্রসঙ্গ টেনে এনে আটকাতে চাইছে ঋতি। যেন সেসব বুঝে চলে যাওয়ার কথা বলেই এগোতে থাকে সে।
আবার কবে আসবে অভ্র? ছুটে গিয়ে হাত ধরে ঋতি। সেই স্পর্শে কোনও উষ্ণতা খুঁজে পায় না সে।
আর কোনওদিন আসব কিনা এখানে, জানি না ঋতি। তুমি ভালো থেকো।
এখন কি বাড়ি ফিরবে? নাকি অন্য কোনও কাজে…
তাও জানি না।
হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় অভ্র। বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখে। ঋতির হঠাৎই মনে হয় অভ্রজিৎ রায় যেভাবে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, সেভাবেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে একসময় তার কাছ থেকেও। অভ্রর অবতরণ শেষ হবার আগেই ঘরের মধ্যে ঢুকে আসে ঋতি।
কাপ-প্লেট সিঙ্কে নামিয়ে রেখে কল ছেড়ে দেয়। কলের জলধারার সরসর শব্দ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। চোখ বন্ধ করে জলশব্দ শোনে ঋতি। একটানা…

৬টি মন্তব্য:

  1. খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লাম যুগান্তরদা। সম্পর্কের ক্রাইসিসটা চমৎকার ফুটেছে। শেষমেশ অভ্র এই সামাজিকতার চাপ কাটিয়ে বেরিয়ে এল একটা এসকেপিজমকে অবলম্বন করে। সমাজের গড়পড়তা মধ্যবিত্ত মানুষ যেমন হয় আর কী। গল্পটা আমার খুব ভালো লেগেছে তাই শেষে কোথায় পৌঁছয় জানতে এক নিঃশ্বাসে পড়েছি। নববর্ষের শুভেচ্ছা নিও।

    উত্তরমুছুন
  2. ভীষণ ভালো লাগলো।আদর্শ ছোটগল্প।মুগ্ধতা

    উত্তরমুছুন
  3. গল্পটি হাঁটছে । মানুষ চলতে ভালোবাসে। একেকটা স্টেশন আসে । খানিক বিরতি। বাবা মা বন্ধু প্রেম মিলন অমিলন স্বামী স্ত্রী ছেলেমেয়ে স্নেহ অমৃতধারা আরও আরও নতুন স্টেশন আবার স্টপেজ -- অভ্র চলছে --- শুভেচ্ছা যুগান্তর।

    উত্তরমুছুন
  4. আপনার অন্য গল্পের মতোই সুন্দর। গল্পগুলো যেনো শেষ হয়েও শেষ হয়না। আরও পড়তে ইচ্ছে করে।

    উত্তরমুছুন