সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

'তিস্তা উৎস থেকে মোহনা' রিভিউ : বিমান অধিকারী





বিমান অধিকারী
অভিজিৎ দাশের ''তিস্তা উৎস থেকে মোহনা" : তিস্তা-সম্পর্কীয় কথা-কাহিনির বৈচিত্র্যময় আঙিনা।


              'তিস্তা' শুধু নদীমাত্র নয়, কখনও সে যৌবনবতী প্রেমিকা,কখনও বিধ্বংসী রাক্ষসী, কখনো বা 'তিস্তাবুড়ি' নাম্নী দেবী হিসেবে পূজিতা।আবার বহু স্হানের মানুষের কাছে জীবনধারণের,আয়ের উৎস হিসেবে চিহ্নিত। এই নদীর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের মানুষের পরিচয় এবং কম-বেশী সখ্যতা রয়েছে। এর জলধারাও এতদ্ অঞ্চলের মানুষের কাছে বহু পরিচিত, তাদের কাছে আবেগের একটি নাম হল 'তিস্তা'।তিস্তা অববাহিকার অধিবাসীদের জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই নদী। উৎস থেকে মোহনা অবধি দীর্ঘ এই যাত্রাপথে বিভিন্ন সীমারেখা অতিক্রম করে বয়ে চলেছে প্রতিবেশী দেশে;আর এভাবে সম্পর্কটা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক।
         পনেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গ্রন্থটি বিভিন্ন সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হয়ে গ্রন্থকারের মুন্সিয়ানায় হয়ে উঠেছে অনন্য পরিচয়বাহী।
জীবনের অনেক টা সময় এই নদীর পাশে পাশে  থেকে কাটানো, ঘুরে- বেড়ানো, নদী সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য আহরণ করে নিজেকে এবং নিজের গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছেন গ্রন্থকার। নদীকে চিনে, জেনে এর অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বরাবর অনুসন্ধিৎসু মানসিকতাকে লালন করেছেন লেখক। 'তিস্তা' এই নাম সম্পর্কীয় প্রচলিত এবং প্রচারিত বিভিন্ন পুরাণ-কথা, ইতিহাস, সংস্কৃতি,উৎসব,উপন্যাস প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ মনোরম আলোচনা রয়েছে এ গ্রন্থে।
       গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে তিস্তা যে শুধুমাত্র একটি নদী নয় ---গ্রন্থকারের নিখুঁত বর্ণনায় তিস্তা এবং তিস্তাকেন্দ্রিক একটি আলেখ্য জীবন্তভাবে ধরা দিয়েছে। এমন মনোমুগ্ধকর বর্ণনা প্রতিটি সচেতন পাঠকচিত্তকে নিবিষ্ট করে রাখে গ্রন্থটি পাঠের প্রতি।
     অধ্যায় 'দুই'-এ গ্রন্থকার তিস্তা নদীর জন্মবৃত্তান্ত --আদি নাম, সম্ভাব্য বিভিন্ন নামের উৎস পুরাণাদির উদাহরণ সহযোগে ব্যাখ্যা করেছেন। নদীর জল ও বাহিত পলি মাটিকে ঊর্বরতা দান করে, জলপথ হিসেবে,পাণীয় জল রূপে নদীর উপযোগিতা, নদী সংরক্ষণ, জলের পবিত্রতা রক্ষা প্রভৃতি প্রসঙ্গ এনে তিস্তার স্বরূপ আলোচনা করেছেন গ্রন্থকার।
[3/27, 20:27] 176800: তৃতীয় অধ্যায়ে তিস্তার উৎস এবং প্রবাহপথ,বিভিন্ন প্রচলিত নাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে সংক্ষিপ্ত পরিসরে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়। এছাড়া চতুর্থ অধ্যায়েও তিস্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন উপনদী-কথা এবং প্রবাহপথ বর্ণিত হয়েছে।
          ইতিহাসে তিস্তার ঠাঁই পাওয়া এবং তিস্তার গতিপথের পরিবর্তনশীলতার ইতিহাস ---১৭৭৮ সাল এবং ১৭৮৭ সালে ঘটে যাওয়া বন্যায় উত্তরের নদী ভূগোলের ব্যাপকমাত্রায় পরিবর্তনসাধনের কথা গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়কে সমৃদ্ধ করে রেখেছে।
          তিস্তা অববাহিকার আয়তন, তিস্তা অববাহিকা নিয়ে গবেষণারত গবেষকদের  অভিমত, তিস্তার মোট অতিক্রান্ত যাত্রাপথে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিদ, বিচিত্র বন্য জন্তু,পাখি প্রভৃতির কথা রয়েছে ষষ্ঠ অধ্যায়ে।
   সপ্তম অধ্যায়ে উত্তরের প্রাণোচ্ছ্বল তিস্তার প্রেমকাহিনী বিভিন্ন স্হানের মানুষের মনের কল্পনার রসে জারিত হয়ে পরিণত হয়েছে একেকটি লোক-কথায়,ক্রমে লোককথাগুলি পরিণত হয় কিংবদন্তীতে।এই উত্তরণ তিস্তাসক্ত, তিস্তান্বেষীদের উন্মত্ততারই পরিচয়বাহী।
        তিস্তাকে নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন প্রকার লোকসংস্কৃতি, তিস্তার চর বরাবর যাত্রাপথের ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা নানারকম ছড়া, গানের সংমিশ্রণে তিস্তা-চরের লোকসংস্কৃতির উল্লেখের মাধ্যমে অষ্টম অধ্যায়কে গ্রন্থকার পাঠকের সামনে পরিবেশন করেছেন সুনিপুণভাবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সমারোহ হেতু তিস্তা অববাহিকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।নবম অধ্যায়ে গ্রন্থকার এই বিষয়টিকেই তুলে ধরেছেন। গ্যাংটকের অর্কিড উদ্যান,সিকিমের রুমটেক মনাস্ট্রি, কিছু বিখ্যাত ট্রেকিং রুটের বর্ণনা,তিস্তা ও রঙ্গিতের মিলনস্হল,লাভা-লোলেগাঁও, নেওড়া অরণ্য, মংপং, তিস্তার ওপর বিখ্যাত 'করোনেশন ব্রিজ', রোপওয়ে, গজলডোবায় তিস্তা ব্যারেজ, লাটাগুড়ি-গরুমারা জাতীয় উদ্যানে জঙ্গল সাফারি ---সবমিলিয়ে এক রোমহর্ষক বিচিত্রতার আস্বাদ বয়ে আনে এই পর্যটনস্হলগুলি। জলপাইগুড়ি, মেখলিগঞ্জ, চ্যাংরাবান্ধা হয়ে বাংলাদেশের লালমণিরহাট, সুন্দরগঞ্জ প্রভৃতি তিস্তা অববাহিকায় থাকা সুন্দর শহর এবং পর্যটনস্হল।
        দশম অধ্যায়ে দেখা যায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প এবং বাংলাদেশে এর ব্যাপ্তি তথ্য সহযোগে বর্ণিত হয়েছে এই অংশের আলোচনায়।
     তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন অধিবাসীদের যেমন---লেপচা, ভুটিয়া, শেরপা, নেপালী, নেওয়ার, তামাং, লিম্বু, রাই, মগর, সানোয়ার, গুরুং, মেচ,সাঁওতাল,ওরাও,অসুর,ব্যাধ,মুন্ডা,রাজবংশী এবং মুসলিমদের পরিচয়, ধর্মীয় রীতি-নীতি,লোককথা,জীবনধারণ এবং জীবনযাত্রার পরিচয় সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তথ্যসন্ধানী পাঠকদের অনতিবিলম্বেই আকৃষ্ট করে তুলতে সমর্থ এই একাদশ অধ্যায়টি।
      তিস্তা অববাহিকার অধিবাসীদের সঙ্গে পরিচয় করানোর পাশাপাশি অধিবাসী দের বিভিন্ন প্রকার সঙ্গীত, উৎসব, নৃত্য, পূজা-পার্বণ প্রভৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ দ্বাদশ অধ্যায়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে গান সহযোগে এই সংস্কৃতিগুলি তুলে ধরায় তা পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক।
         ত্রয়োদশ অধ্যায়ে তিস্তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রচিত উপন্যাস। যেমন---
উপন্যাসের নাম  উপন্যাসকার
_____________    __________
১.'রাক্ষসী তিস্তা'--------------অরুণ নিয়োগী।
২.'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত '---------দেবেশ রায়।
৩. 'তিস্তাপুরাণ'----------------------দেবেশ রায়।
      এই উপন্যাসগুলির শুরুর কথা, ঘটনাক্রম,কেন্দ্র প্রভৃতি বিষয় পটভূমি সহযোগে সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনন্যসুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন গ্রন্থকার। অধ্যায়টি সচেতন ভাবে পাঠের পর পাঠক-মনে একটা মুগ্ধতার রেশ থেকে যায়।
       শুধু বর্ণনা নয়, তিস্তা অববাহিকার ধস, হিমবাহের ক্ষয়কাজ, বন্যা, পরিবেশদূষণ,নদী ভাঙন, চা-বাগান গুলি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে নারী পাচারের মত বিষয়গুলি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চতুর্দশ অধ্যায়ে গ্রন্থকার এই সমস্যাগুলি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য জনসচেতনতা প্রবলভাবে বৃদ্ধি, শ্রমদিবস সৃষ্টির ব্যবস্থা, শিক্ষার প্রসারের কথা বলে চিন্তাশীল মানসিকতার ছাপ রেখেছেন।
      গ্রন্হটির পরিশেষ অধ্যায়, পঞ্চদশ অধ্যায়ে তিস্তার জলবন্টন বিষয়ে নানা তথ্য, নানা যুক্তি-প্রতিযুক্তি, রাজনৈতিক চাপান-উতোরের কথা আলোচিত হয়েছে। শেষে দুই দেশকে তাদের নিজেদের স্বার্থে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার, তিস্তাকে নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের কথা উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করেছেন গ্রন্থকার।
          গ্রন্থের প্রচ্ছদটি বর্তমান সময়ে তিস্তার এক বাস্তব মুহূর্ত, এক সতেজ জীবনচর্যা, জীবিকার পরিচয়বাহী হয়ে উঠেছে। গ্রন্থে থাকা অন্যান্য ছবিসমূহ পাঠকবর্গের কাছে এক জীবন্ত সমাজদর্পণ হিসেবে প্রতিভাসিত হয়েছে এবং পাঠকের কাছে প্রসাদগুণে হয়ে উঠেছে উত্তম।  এ গ্রন্হ তিস্তাপ্রেমী পাঠকদের কাছে আকর গ্রন্থ স্বরূপ এবং অবশ্যই তিস্তা-বিষয়ক নবীন গবেষকদের কাছে প্রবেশক গ্রন্থ হয়ে উঠবে অচিরেই।সর্বোপরি মানচিত্র যোগে গ্রন্হটির উপস্থাপনে তা চিত্তাকর্ষক হয়েছে।
           কাজেই প্রাণচঞ্চলা, প্রবাহিত পূর্বের তিস্তা এবং বর্তমান তিস্তার মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটেছে এই গ্রন্থে।গ্রন্হটি লেখকের দীর্ঘসময়ব্যাপী তিস্তাকে পর্যবেক্ষণের ফলে উঠে আসা মানসসাধনার ফসল। তিস্তা-সম্পর্কীয় নানা কথা-কাহিনির বৈচিত্র্যতার সমন্বয়ে গ্রন্হটির আঙিনা সর্বৈবভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। তিস্তাকে ঘিরে এই গ্রন্থে যেমন পুরাণ-কথা, রোমান্টিকতা স্থান পেয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে বাস্তব প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়ের তিস্তার হাল-হকিকতের প্রসঙ্গটিও সাযুজ্য সহকারে পরিবেশিত হয়েছে।
           

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন