শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২০

ছিটমহল সংক্রান্ত দুটি গল্প : রহমান আলী




বাংলা সাহিত্যের সম্ভারে ছিটমহল সমস্যা নিয়ে লেখা যে সমস্ত আঞ্চলিক কথাশিল্পীদের আমরা দেখতে পাই, তাঁদের মধ্যে মহম্মদ লতিফ হোসেন অন্যতম। সমাজের বিভিন্ন বাস্তব প্রেক্ষাপট অবলম্বনে তাঁর সৃষ্টিশীল গল্প ও ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা সত্যিই কোচবিহারের সাহিত্য প্রেমিক-বুদ্ধিজীবী মহলে প্রশংসার দাবি রাখে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প এবং গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখালেখির পাশাপাশি, তিনি বর্তমানে "জীবাশ্ম" নামক একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করে চলেছেন। আমরা মহম্মদ লতিফ হোসেনের রচনাশৈলী "টসা মাশান" এবং "আব্দুল রহমান কথা দিয়েছিল"- এই দুটি ছিটমহল বিষয়ক গল্পে খুঁজে পাই। দুটি গল্পই প্রকাশিত হয় বরেন্দু মন্ডল সম্পাদিত "ছিটমহলের গল্প" নামক একটি গ্রন্থে‌। গল্প দুটিতেই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হওয়ায় গ্রাম-বাংলায় ছিটমহলের বাস্তবচিত্র খুব সুন্দরভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে।

"টসা মাশান" গল্পটিতে ছিটমহলের পাহাড় সমতুল্য সমস্যার সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উঠে এসেছে। তিনি এই গল্পে তুলে ধরেছেন ছিটমহলে বসবাসকারী মানুষেরা সন্তান জন্ম দিয়েও প্রকৃত পিতা মাতা হতে পারে না। টাকার বিনিময়ে পিতা–মাতা ছিটমহলের বাইরে অন্য কাউকে বানিয়ে মানুষ হতে হয়। এই গল্পে জন্ম দেওয়া বাবা-মায়ের নিজ সন্তানের মুখ থেকেই ‘বাবা-মা’ ডাক না শুনতে পারার আর্তি বড়ো হয়ে উঠেছে। এছাড়া গল্পটিতে রয়েছে কিছু ঠকবাজ দালাল যারা ছিটমানুষের দুর্বলতা বা সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতো। কথাকার লতিফের এই গল্পটিতে আমরা দেখতে পাই— সমাজের ছিটমানুষের জীবন-দর্শন যে নরক সমতুল্য এবং তাদের সামাজিক,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বলে কোনও অধিকার নেই এই বিশ্ব-ভুবনে। গল্পটিতে আরেকটি অংশে দেখতে পাই ছিটমহলের মানুষেরা নিজ সন্তানদের মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিঃস্ব হয়ে অর্থ খরচ করলেও তার কোনো সুনাম থাকে না, এমনকি মেয়ের বিয়েতে প্রকৃত পিতা-মাতা হিসেবে আশীর্বাদ করতে পারে না, নকল পিতা-মাতাই কাগজে-কলমে মেয়ের প্রকৃত পিতা-মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়— " হামারে টাকাত বেটি বড়ো হইল,হামারে টাকাত নেকা পড়া, হামারে টাকাত বিয়াও হইবে আর হামারে উপরা দাদাগিরি মারে।ম‌ইরবে, শালার বেটা ম‌ইরবে। যারা ছিট বানাছিল তারা যেমন ম‌ইরছে,খগেশ্বর‌ও নারায়ণ‌ও মরবে। স্বপ্না নারায়ন মরবে। মাশানবাবা মারবে ওয়াক,টুটি চিপি মারবে।" এভাবেই গল্পে ছিটমহল সমস্যার বাস্তব কাহিনী অবলম্বনে অসহায়, অত্যাচারিত, বঞ্চিত মানুষের জীবন সংগ্রামকে খুঁজে পাই। আর এই অমানবিক, অসহনীয় যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেতে ছিটমানুষেরা কাকুতি-মিনতি কন্ঠস্বরে প্রার্থনা করছেন-টসা মাশান অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছে। গল্পটি পড়ার শেষে পাঠকবর্গের মনে বেদনা- ব্যঞ্জনাময় এক মানবিক অনুরণন ঘটে থাকে।

অপর আরেকটি গল্প "আব্দুল রহমান কথা দিয়েছিল"। এই গল্পটিতে আমরা দেখতে পাই, ছিটমহল বিনিময়ের পরবর্তী এক বাস্তব পরিস্থিতির কথা। গল্পে রয়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জমি হারানোর প্রবল আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনে উৎসাহ দেওয়া নেতার প্রতি অভিব্যপ্তি। ছিটবিনিময়ের পরবর্তী সময়ে পার্টি ও রাজনীতির চাপে পড়ে সেই বিশ্বস্থ নেতার দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।স্বার্থের লোভে পরে সাধারণ মানুষ সহ সরকারের লোকেরা অনেকেই সেই বিশ্বস্ত নেতার কথা এখন সেভাবে শোনে না— এই প্রসঙ্গটিও তুলে ধরেছেন।রাজনীতির বা পার্টির ক্ষমতায় জমি মাফিয়ারা একজনের জমি অন্যজন দখল করে নেওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি স্থান দিয়েছেন গল্পে ।রয়েছে মানুষের পূর্বপুরুষ তথা কোন রাজার আমলে আমল থেকে এই জমি উপভোগ করে আসার বিষয়টি। এরকমই মাফিয়াদের বারবারান্তের লেখা দেখেছিলাম অমর মিত্রের লেখা গল্পেও। আব্দুল রহমান কথা দিয়েছিল এ জমি হারাবার নয়। রহমানের কথা না শুনে এমন কেউ নেই। ছিটমহল সংগ্রাম কমিটির নেতা আব্দুল রহমান আজকাল কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। ধনেশ্বর বর্মন গর্জে উঠে বলে—“আব্দুল রহমান আমার সরকার,আব্দুল রহমান হামাক কথা দিচ্ছিল, এই জমি হারাবে না। এ জমি মোর, মোর বাপের, মোর দাদুর, কোচ রাজার মহল্লাত কাজ করছিল, ওমরা মাহুত ছিল, বড়ো বড়ো হাতিক দাবড়ে বশ ক‌ইরছে।" এই গল্পে একটি অংশে আমরা দেখতে পাই, ছিটমহল বিনিময়ের ফলে উন্নয়ন নিয়ে অনেক আশার কথা, স্বপ্নের কথা। রয়েছে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু সব স্বপ্ন বা আশাই যে সত্যি হয় না, কিছু স্বপ্ন যে সোনার পাথর বাটিও হয়-- সে বিষয়টিও কিছুটা তুলে ধরেছেন গল্পে। তিনি গল্পে তুলে ধরেছেন লোকসঙ্গীত, ভাওয়াইয়া গান অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বিনোদনের চিত্রটিও। গল্পে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন ছিটবাসীদের এক সময়ের পাওয়া অবৈধ নাগরিক কিংবা অনুপ্রবেশকারীর তকমা মুছে বৈধ নাগরিক সমাজের এক উজ্জ্বল আলোর পথিক রূপে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, চাকরি, জব কার্ড, ভারতীয় জামাই, ভারতীয় পুত্রবধূ, ছিট সরিয়ে ফিট হবার আশা, আর আছে আব্দুল রহমানের দেওয়া কথার ফলপ্রসূ হবার আশা।

 এইভাবে গল্প দুটি বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ছিটমহল বিনিময়ের আগের সমস্যা ও পরবর্তীকালেও বদলে যাওয়া অনেক সমস্যায় পীড়িত ছিটবাসীদের অন্তরতম অংশের দহন, আগামী কত প্রজন্মের পর এর সমাধান হবে, এ বিষয়ে আমরা কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না।


***লেখক সাবেক ছিট মশালডাঙার অধিবাসী এবং তিনি ছিটমহল আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন