সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

'দেখা' গল্প বার্ষিক রিভিউ : রাজেশ ধর

দেখা গল্প বার্ষিকঃ স্বপ্ন সংখ্যা—কিছু কথা

স্বপ্ন দেখত শশী, একটা কেয়ারি করা ফুল বাগান, লন আর লাল টাইলে ছাওয়া বাংলো। সেখানে অলস অপরাহ্নে বসে চা খাবে সে। সামনের খাঁচায় ক্যানারি পাখিরা নাচবে।  দামী ব্লাউজে ঢাকা বুক একটা বুক তখন তার বুকের কাছে স্পন্দিত হবে।  সেই স্বপ্নে বিভোর শশীর জীবনের গল্প শুনিয়ে মানিকবাবু দেখিয়েছিলেন, গল্পের শেষে কীভাবে শশী আর  স্বপ্ন দেখে না। এমনকি  স্বপ্ন দেখার ইচ্ছেটুকুও তার মুছে গেল।  তখন শশী কি সত্যি সত্যি কোন মানুষ  নাকি কোন যন্ত্র, রোবট নাকি আজকের ভাষায় হিউম্যানয়েড। যে নিছক বেঁচে থাকা আর তার উপর চাপিয়ে দেওয়া কর্তব্যটুকু করার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়!

                   বিশ্বসাহিত্যের একটা মাইলস্টোন ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’।  মানিকবাবু  সেখানে দেখালেন। আমাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের স্বপ্ন আছে বলেই  আমরা ‘টিকে’ থাকার বদলে ‘বাঁচি’! যেদিন থাকে না, সেদিন…সে তো অপরূপ উপন্যাসের বয়নেই আছে। আমাদের সব শিল্প আসলে এই স্বপ্নের , স্বপ্নহীনতার আর তাদের সাথে জড়িয়ে আমাদের আবেগের উপস্থাপনা নয় কী! সেই স্বপ্নেরা ছিল বলেই এক প্রজাতির ‘এপ’ আজকের মানুষ। কখনও সেই স্বপ্ন ছিল পেট ভরে খেতে পাওয়া, নিরাপদে থাকা আবার কখনও হয়েছে এই গ্রহের সীমানা ছাড়িয়ে মহাজগতের অন্য প্রান্তে নিজের চিহ্ন এঁকে দেওয়া। ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী হয়ে মানুষের স্বপ্নের অসংখ্য, অজস্র বিভিন্নতা শিল্পে, সাহিত্যে আমাদের মুগ্ধ করে, চমকে দেয়…কখনও স্তব্ধবাক করে দেয়।
                        আসানসোলের গল্পকার, গল্প নিবেদিতপ্রাণ মানুষ দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের (সম্পাদক) কাগজ ‘ দেখা গল্পবার্ষিক’ (১৯তম বছর) –এর স্বপ্ন বিষয়ক সংখ্যাটি পড়তে পড়তে বারবার উপরের কথাগুলোই মনে পড়ছিল।  আজকের দিনেও বিজ্ঞাপন না নিয়ে, সৌজন্য সংখ্যা বিক্রি না করে এবং অবশ্যই  পুরষ্কারের দিকে চোখ না রেখে যারা  লিটল ম্যাগাজিন করে। তাদের কাছে হয়ত এটাই সাফল্য যে তাদের কাগজটি পড়া শেষ হয়ে গেলেও পাঠকের মনের ভেতরটা কাঁপতে থাকবে।
এবং সুযোগ পেলেই সেই কম্পন  আঁকা হবে  কাগজে কলমে।  সেদিক থেকে সম্পাদক অবশ্যই সফল।  কাগজটি পড়ার  পর মনে হল গল্পপ্রিয় মানুষদের  এই সংখ্যাটি নিয়ে দুচার কথা বলতে হয়। আর তাই এই দু-তিন প্যারার ‘শিবের গীত’ ।
                   বিষয়কে ছোঁয়া যাবে এমন একটি প্রচ্ছদ। তারপর ২২টি ছোটগল্প, ১টি অনুবাদ গল্প, ২টি গল্প সংকলনের রিভিউ,  সম্পাদকের ‘প্রথম কলম’ এবং অবশ্যই ১টি প্রবন্ধ।  এক এক করে পড়লাম মানে পড়তে হল, থামতে পারলাম না।  শুরুতে প্রবন্ধটি নিয়ে বলি কারণ  সেটির নাম, ‘গভীর স্বপ্ন থেকে গল্পের ভুবনঃ কয়েকটি ছেঁড়া ভাবনা’।
                              আমাদের বাংলায় ‘ স্বপ্ন’ শব্দটিকে ‘পরম আশা’ বা ‘ চূড়ান্ত ইচ্ছা’ অর্থে যতটা ব্যবহার করা হয় তার থেকেও একটি দৈহিক-মানসিক প্রক্রিয়া, যা আমরা জেগে অথবা ঘুমিয়ে , অনুভব করি সেই অর্থে বেশি বলা হয়। এই অনুভুতির মধ্যে দেখাটা প্রবল হলেও, শোনা, বলা , ভাবা ইত্যাদি সবই থাকে।  পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে থাকে মস্তিষ্কে বা মতান্তরে মনের মধ্যে। বাকি শরীরের অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ সব অচেতন থাকে তখন। এই প্রক্রিয়ায় যে উপলব্ধি আসে তাকে নিয়ে, তার ব্যাখ্যা নিয়ে আমাদের জীবনে-সমাজে তার প্রভাব নিয়েও আমাদের সমাজে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সাহিত্যেও এই স্বপ্ন প্রক্রিয়া বিষয় ও কৌশল হিসাবে এসেছে।  অজস্র এমন উদাহরণ আছে। তবু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ইসমাইল কাদারের লেখা ‘দ্য প্যালেস অব ড্রিমস’-এর কথা। আবার চন্দ্রশেখর উপন্যাসের শৈবলিনীর স্বপ্নকে উপাদান রুপে ব্যবহার করে তো বঙ্কিম বাংলা সাহিত্যকে এক মুহূর্তে বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। যাই হোক ‘স্বপ্ন’ বিষয় হিসাবে বেছে নিলে এই দুটি অর্থই চলে আসে।  দুটি বিষয় আবার দারুণভাবে নিজেদের মধ্যে জড়িয়ে যায়। আমাদের পরম আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের চিন্তা-চেতনায়, সচেতনে-অচেতনে বাস করে। এবং আমাদের সব কাজকর্মেও তার ছাপ থাকে। তাই ‘স্বপ্ন’ নামের দৈহিক-মানসিক প্রক্রিয়াটি যতক্ষণ চলতে থাকে তাকে ঐ আগে বলা ‘ গভীর আশা’ অর্থের ‘স্বপ্ন’ দারুণভাবে প্রভাবিত করে। আমরা বাস্তবে ঐ ‘গভীর আশা’ পূরণ করতে পারি না বলে, অন্যান্য ইচ্ছেদের সঙ্গে তাকেও  ‘স্বপ্ন’  প্রক্রিয়ার মধ্যে খুঁজে পাই । আবার এটাও ঠিক    সুখস্বপ্ন দেখার যে  অপূর্ব সুন্দর অনুভূতি সেই একই অনুভূতি ঐ ‘ গভীর আশাটি’  পূর্ণ হলে পাব বলে ভেবে নি। তাই হয়ত একই ‘স্বপ্ন’ শব্দের এমন অভিধা আর ব্যঞ্জিত অর্থ।
                আবার ‘শিবের গীত’ এসে পড়ল।   আসলে প্রবন্ধকার  সুরজিত সুলেখাপুত্র আনতে বাধ্য করলেন।  না এই প্রবন্ধে  ‘স্বপ্ন’ শব্দের অর্থগত আলোচনা নেই।  কিন্তু যেভাবে খুব দরকারি আর আকর্ষণীয় অথচ সহজ ভাষায় ‘স্বপ্ন’ নামের দৈহিক-মানসিক প্রক্রিয়াটির বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা ও তার ইতিহাস এবং  তার সাথে গল্প শিল্পের সম্পর্ক বলেছেন প্রবন্ধকার  তাতে তাঁর থেকে ‘স্বপ্নের’ এই অসম্পূর্ণ আলোচনা ভবিষ্যতে পাওয়ার ‘স্বপ্ন’ গড়ে উঠল।                                  
                                 এবার ছোটগল্প । আছেন অলোক গোস্বামী ( আমি ও সে), শীর্ষেন্দু দত্ত (একটি সফল শট), দেবকুমার সোম (দুঃস্বপ্নের নগরী), উত্তমকুমার পুরকাইত (বৃষ্টীধারা), গৌতম দে ( যুযুধান), উৎপল মান (আবেশ), অরণ্যা সরকার (আমিজন্ম সাকিন পেরিয়ে যায়), সোমনাথ বেনিয়া ( ইচ্ছেবৃত্তান্ত), শমীক শান্নিগ্রাহী ( যেভাবে আমি রিয়াকে দেখেছি) র মত পরিচিত গল্পকারেরা এবং আরও বেশ কয়েকজন। আমরা  শুরুতে   স্বপ্নের বৈচিত্রের কথা বলেছিলাম।  এ কাগজে গল্প থেকে গল্পে বদলে যায় মানুষের ‘স্বপ্ন’।  কোথাও বঞ্চিতা নারীর সংসার-সন্তানের স্বপ্ন (বৃষ্টিধারা, ইচ্ছাবৃত্তান্ত), আবার কোথাও সমকামী যুবকের  এই সমাজে না পাওয়া প্রেমের স্বপ্ন ও সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রনা (প্রজাপতি, ট্রেনের গভীরে)। একটা জড়বস্তু, বেঞ্চির রূপকে নীচুতলার মানুষরা স্বপ্ন দেখে উপরের তলার মানুষদের ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে (যুযুধান) কোন গল্পে, আবার কোথাওবা  এক মধ্যবিত্ত যুবকের না পাওয়া ‘স্বপ্নের নারীর’ জন্য স্বপ্ন।  অন্যের কাছে যার হয়তো কোনো মূল্যই নেই কিন্তু যে স্বপ্ন  দেখছে তার কাছে সেটাই  একমাত্র বাঁচার কারণ (যেভাবে আমি রিয়াকে দেখেছি)। কবিতা , প্রেম আর জীবনকে একাকার করে না মেলাতে পারার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার অশ্রলিপি, কোন গল্পে (স্বপ্নের আবাহন)। আবার কোথাওবা অন্যের অস্তিত্বকে দখল করে বাঁচার অসম্ভব স্বপ্ন এবং সেই দ্বন্দ্বের ক্ষতবিক্ষত মানুষের মনের ছবি (আমিজন্ম সাকিন পেরিয়ে যায়)। হিপোক্রিট মানুষের প্রতি পলে বদলে যাওয়া স্বপ্ন আর দুস্বপ্নের কথাও আছে (উলটো চাকার গাড়ি),আবার একজন শিক্ষিত সৎ মানুষ যে মনে করে সমাজ-রাষ্ট্র না বদলালে মানুষের উন্নতি সম্ভব না ,  জীবনের প্রতি পর্বে অভিজ্ঞতার সাথে সাথে কীভাবে তার ‘স্বপ্ন’ বদলে যায় এবং তার জন্য একটা বিপ্লবীর জীবন সে কীভাবে বাঁচে সে গল্পেরও এখানে দেখা মিলবে। এই ২০২০র ভাঙনকালেও( সরোজ মিত্তিরের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা)। রয়েছে আরও বেশকিছু গল্প যেখানে এমনভাবে  বিচিত্র জীবনের বিচিত্র স্বপ্নের কথা আছে।  বলতে গেলে এই গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে;  আমাদের  মেধাজীবীরা কোন দৃষ্টিতে আমাদের আজকের বাংলার সমাজ ও  ব্যক্তির  চেতনাকে দেখছেন তার একটা প্রায় সম্পূর্ণ ছবি এখানে পাওয়া যাচ্ছে। এমন উপস্থাপনাও একটি লিটল ম্যাগাজিনের কম সাফল্য নয় ।
           গল্পের কাগজের স্বপ্ন সংখ্যা তাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখা বা স্বপ্ন নামের যে দৈহিক-মানসিক প্রক্রিয়ার কথা আগে আলোচনায় এসেছিল, সেই অনুভূতি , গল্পের বিষয় হিসেবে আসবে না, তা হয় না! বেশ কিছু গল্প এমনও আছে। মূলত এগুলো মনস্তাত্বিক গল্প। চরিত্রগুলোর স্বপ্ন বর্ণণা বা স্বপ্নের মধ্যে চরিত্রগুলোর যাওয়া আসা বলতে গিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের মনের গঠণ এবং নানা সামাজিক-ব্যক্তিক প্রসঙ্গে তাদের  অভিঘাত দেখিয়েছেন গল্পকারেরা। এখানেও ‘স্বপ্ন দেখার’ বৈচিত্র্য অবাক করে। নিয়তি রায়চৌধুরির গল্পে স্বপ্নের মধ্যে প্রেম তথা অবদমিত যৌনতার বহিপ্রকাশ (সওয়ারি), দেবকুমার সোমের গল্পে স্বপ্ন দেখার গণ-অসুখের মধ্যে সংখ্যালঘুর-আইডেন্টিটি ক্রাইসিস( দুঃস্বপ্নের নগরী), প্রকাশ ঘোষালের গল্পে আপাত একটা স্বপ্নের  কিন্তু ধাপে ধাপে বাস্তব-পরাবাস্তবে এগিয়ে পিছিয়ে একটা অদ্ভূত মনস্তত্ত্বের সন্ধান (স্বপ্নের ক্যালাইডোস্কোপ)। দেবনাথ সুকান্ত, ঝুমা চট্টোপাধ্যায়, চন্দন কুমার ভট্টাচার্যের গল্পগুলো মোটামুটি ঐ একইরকম, শেষমেষ মনস্তত্ত্বেরই ছায়া।  আর স্বপ্ন তো একদিকে মনেরই কারিকুরি।

                               স্বপ্নের দুই বৈচিত্র্য এভাবেই পাঠক খুঁজে পাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একান্তই পাঠক দাবী করে বসে গল্পের।  গল্প পাঠের শেষে বুকের ভেতরে মোচড়ের, গল্পকারের নজরের কাছে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার। তেমন পাঠকেরাও আশাহত হবেন না! অলোক গোস্বামী, শীর্ষেন্দু দত্তরা তো স্বমহিমায় রয়েছেন।  কিন্তু অমিত সরকার আর ঝিনুক চট্টোপাধ্যায় যেন পণ করে এসেছেন যে পাঠকের কলিজা না উপড়ে ছাড়বেন না।  প্লট আছে তাই যথেষ্ট ভাবেই ‘গোল গল্প’। গল্পহীনতার স্লোগানকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে  একজন;  প্রান্তিক যৌনতার জন্য যে চূড়ান্ত শোষণ এই সমাজ বরাদ্দ করে রেখেছে, নিজের পেটেন্ট ভাষায় তার ছবি একেছেন। অন্যজন মধ্যবিত্তের সারশূণ্য, হিপোক্রিট জীবনে শোষণ, বঞ্চনা এবং শেষমেষ নিরূপায় হয়ে শারীরিক ও মানসিক আত্মহননের কথাজাল বুনেছেন। হাসতে হাসতে ছুড়ি চালিয়েছেন দুজনে। কাগজটি পড়া শেষ হয়। চলে যায়, বুক র‍্যাকে। কাজে, অকাজে মেতে উঠতে হয়। আর মাঝে মাঝেই অদৃশ্য দুটো চাকু  খুচিয়ে দিয়ে যায় বুকের ভেতরটা।  সম্পাদক আশ্বস্ত করেন,  সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীর প্রয়োজন বা গবেষণার কাজ সে পরের কথা। আদতে গল্প তথা সাহিত্যের কাজ মানুষের গল্পরসের বা সাহিত্যরসের তৃপ্তিতে।  সময় যাবে , মেধা নিজের পরিচয় খোঁজার জন্য আরও আরও এক্সপেরিমেন্ট করবে গল্পের দেহ নিয়ে, আত্মা নিয়ে। কিন্তু গল্প আর পাঠক দুজন দুজনকে  খুজবে। সেটাই মানূষের সভ্যতাকে  চেনার একটা চিহ্ন। ‘দেখা’র সম্পাদক সেকথা মনে রেখে বিষয়ের সংখ্যা করলেও,  ‘গল্প’কে ভুলে যাননি। প্রশংসা তার সেখানেই। অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিনের লেখক-সম্পাদকদরাও গুরুত্ব দিয়ে তা ভাববেন ... বিনীত অনুরোধ থাকল।

২টি মন্তব্য: