সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

অমিতাভ দাসের গল্প : পাখি ও রাজকুমারী



কনকনগর । এক রাজা এক রানী আর এক রাজকন্যা । গল্পটা কেবল এই  তিনজনকে নিয়ে নয় । আরেক জন আছে । সে হল এক সাহসী যুবক   সুবর্ণকুমার । দরিদ্র । নগরের পশ্চিমে অরণ্যের আগে যে রিমঝিম নদী । সেই নদীর তীরে ছোট্ট এক কুটিরে সে থাকে । নৌকা চালায় । খেয়া পারাপার করে । বাবা - মা মরে গেছে অজানা এক জ্বরে কিশোরবেলায় । আছে বুড়ি ঠাকুরমা তার । সব ভাব- ভালোবাসা , আদর- আবদার ঠাকুরমার কাছে ।

একদিন সুবর্ণকুমারের নৌকায় উঠেছিল এক ভিনদেশী জাদুকর । সুবর্ণের মধুর ব্যবহারে খুশি হয়েছিল । অরণ্য গভীরে পর্ণকুটীরে কয়েকদিন বাস করেছিল জাদুকর । তাঁর সেবা করত সুবর্ণ । বন থেকে এনে দিত ফল- মূল- মধু ও কাঠ । রান্নাও করে দিত কোনো কোনো দিন ।

জাদুকর চলে যাওয়ার আগে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিল তাকে । সে মন্ত্রের গুণে রূপ বদলে পাখি হয়ে যেতে পারত সুবর্ণকুমার । তবে তা রাতের বেলায় । দিনের বেলায় ফলবে না মন্ত্র কখনো ।

খুব মজায় ছিল সুবর্ণকুমার । সারাদিন নৌকা চালানোর পর সে পাখি হয়ে মাঝে মাঝে উড়ে যেত দূর- বহুদিন । ফল খুঁটে খেত । ডালে বসত । দোল খেত গাছের শাখায় ।

একদিন উড়তে উড়তে সে ভুল করে গিয়ে পড়েছিল কনকনগরের রাজ উদ্যানে । ফল খাচ্ছিল খুঁটে । কী করে যেন পাখিটাকে দেখে ফেলে রাজকন্যা মালিনী । বড় ভালো লাগে তাঁর । মালিনীর সংসারে কত যে পাখি আছে । সে গান গায় । ছবি আঁকে । বাঁশি বাজায় ।

সে সখিকে ডেকে পাখি রূপী সুবর্ণকে দেখায় । বলে , কী সুন্দর পাখি । লাল পালকে নীলের ফুটকি । কী চমৎকার ঠোঁট । চোখটা কেমন কাজল-কালো । এমন পাখি তো দেখিনি কখনো । এ পাখি আমার চাই ।

রাজকন্যার চাই । খবর গেল রাজার কাছে । আর কী ,  ধরা পড়ল পাখি । সোনার খাঁচায় তাকে আনা হল রাজকন্যার কক্ষে ।

পাখি দেখে সে তো মুগ্ধ । সকলেই মুগ্ধ । কোন দেশের পাখি ! এমন পাখি জীবনে কেউ দেখেনি আগে । সে কথাই জানাল সবাই । রাজকন্যার খুশি আর ধরে না । সে নিজের হাতে দানা-পানি খাওয়াল পাখিকে । অথচ এ পাখির চোখে জল ।

সখিরা বললে , পাখিটার কী কপাল ! সোনার খাঁচায় থাকে , তবু ওর চোখে জল ! অন্য পাখিরা তো থাকে রুপোর খাঁচায় ।

সুবর্ণকুমার বুঝল সে বন্দী হল । কী করে বেরুবে সে রাজপুরী থেকে !  সকাল হলেই সে তো মানুষ হয়ে যাবে । কেউ শুনবে না তার কথা । সবাই জানবে রাজকন্যার ঘরে এসেছিল কাল রাতে কোনো এক অচেনা যুবক । বদনাম হবে রাজকুমারীর । আর তার হবে নির্ঘাত মৃত্যুদন্ড নতুবা যাবজ্জীবন কারাবাস । কী হবে তার বুড়ি ঠাকুরমার ?

সে আকার- ঈঙ্গিতে ঠোঁট নেড়ে , মাথা নেড়ে অনেক কথা বলতে চাইল অথচ কেউ বুঝল না পাখির ভাষা । বা বুঝতেই চাইল না । সখিরা এবং রাজকুমারী খুব হাসলে । আনন্দ করলে পাখিটাকে নিয়ে ।

রাজকুমারী গবাক্ষের কাছে উঁচু চৌপায়ার ওপর সোনার খাঁচার ভিতর পাখিকে রেখে ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর কোমল মখমলের নরম বিছানায় ।


ঘুম ভাঙলো রাজকুমারীর । সবে মাত্র ভোরের আলো ফুটেছে । চোখ গেল গবাক্ষের দিকে । কেননা ওই দিক দিয়েই সূর্যের প্রথম মেদুর আলো আসছিল ঘরে । আরে ওইখানেই তো খাঁচাটা ছিল । খাঁচার ভিতর পাখিও ছিল । নেই কেন ? কোথায় গেল ?

অল্প আলোয় সে দেখলে খাঁচাটা ভাঙা । পাখি কোথায় ! চমকে গেল রাজকুমারী । গবাক্ষের কিছুটা দূরে লম্বা লম্বা ঝালরের আড়ালে কে বসে আছে ? মাথাটা হাঁটুর ওপর রেখে । যেন ঘুমুচ্ছে ! অল্প আলোয় ছায়াছায়া মূর্তি । দেখলে ভয় পাওয়ার-ই তো কথা । কিন্তু না রাজকুমারী বলে কথা, ভয় পেলে তো চলবে না । সে এগিয়ে গেল ।

রাজকুমারীর পায়ের মলের শব্দে ঘুম ভাঙল সুবর্ণকুমারের । সে চোখ মেলে দেখলে সামনে পরমাসুন্দরী এক কন্যা । যাকে সে গত রাতেই দেখেছে পাখির চোখ দিয়ে ।এখন মানুষের চোখে দেখে মুগ্ধ , বিস্মিত হল । রাজকুমারীও সুবর্ণকুমারকে দেখে অবাক হল । চমকে গেল । ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল: কে , কে তুমি ? আমার ঘরে কী করছ ? চোর --- চোর---
সুবর্ণকুমার কিছু বলার আগেই রাজকুমারী মালিনীর খাস দাসী চলে এলো । সৈন্যসামন্ত চলে এলো । রাজার কাছে খবর গেল । রাজা এলো । রাণী এলো । সে এক হৈহৈ কান্ড বটে ।

বন্দী হল সুবর্ণকুমার ।

বিচার সভা বসল । সে কী করছিল  রাজকুমারীর ঘরে ? কেন গিয়েছিল ? সে কী অন্য কোনো রাজার দূত ? গুপ্তচর ? কেউ বললে , সে রাজকুমারী মালিনীকে হত্যা করতেই এসেছিল । কেউ বললে , ব্যাটার খারাপ উদ্দেশ্য ছিল । মালিনী কাঁদছিল । কারণ তাঁর পাখিটাকে সে খুঁজে পাচ্ছে না । ফলত , সে বললে , এই লোকটাই আমার পাখিকে চুরি করেছে । অথবা খাঁচা ভেঙে উড়িয়ে দিয়েছে । এর শাস্তি চাই ।

সুবর্ণকুমারের কথা কেউ শুনলে না । সেও চুপ করে থাকলে । রাজা বললে , লোকটা বোবা নাকি ?

সুবর্ণকুমার কেবল তাকিয়ে থাকলে মালিনীর দিকে । নীল চোখ মালিনীর । অতল-- গভীর । চোখের ভিতর যেন একটা দিঘি আছে । সে সেখানে ভাসতে চায় । ডুবতে চায় ।মালিনীর রূপ দেখে সে ভুলে গেল ক্ষুধা-তৃষ্ণা । কেবল তাকিয়ে থাকে ।

রাণী বললে , বোবা লোকটা তো বড্ড বেয়াদব । কেবল রাজকন্যার দিকে ড্যাবড্যাব করে  তাকায় । লোকটাকে ফাঁসিতে ঝোলাও ।সমবেত রাজার অনুচর- পরিচর আর সভাসদগণ বললে , ঠিক ঠিক । ফাঁসিতে ঝোলাও । রাজকন্যার ঘরে ঢুকেছে লুকিয়ে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে । তারপর পাখিটাকে মেরেছে বা উড়িয়ে দিয়েছে । আবার রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে থেকেছে । এত সব অপরাধের শাস্তি ফাঁসি । রাজা বললেন , তবে তাই হোক ।

ঠিক হল , পরদিন বধ্যভূমিতে সুবর্ণকুমারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে ।

কারাগারে বন্দী সুবর্ণ রাতের অপেক্ষায় ছিল । যথা সময়ে সূর্য ডুবে গেল । অন্ধকার নেমে এলো কনকনগরে । সুবর্ণ রূপ বদলে আবার পাখি হয়ে গেল । উড়ে সোজা চলে গেল রাজকুমারীর কক্ষে । গিয়ে বসলে পালঙ্কের উপর । পাখিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা মালিনী । সে পাখিকে কোলে তুলে নিলে  ।আদর করলে খুব । বললে , কোথায় গেছিলি তুই ?

পাখি বললে , কোথাও যাইনি । তোমার কাছেই ছিলাম । আর দেখা হবে না বলে দেখা করতে এলাম ।
--- কেন ? দেখা হবে না কেন ?
--- রাজামশাই যে ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন । তোমার সামনেই তো দিয়েছেন ।
মালিনীর মনে পড়ল সকালবেলার কথা । সেই বোবা লোকটা । যে তাকিয়ে ছিল ।
-- কে তুমি ? অবাক হয়ে জানতে চাইল রাজকুমারী মালিনী ।
সংক্ষেপে তাকে সব কথা খুলে  বললে সুবর্ণকুমার । মালিনী বললে , কাল তবে কথা বলনি কেন ?
সে বললে , সুযোগ পেলাম কোথায় ? তাছাড়া কেউ তো বিশ্বাস করবে না আমার কথা ।
রাজকুমারী মাথা নাড়লে । বললে , তাও তো ঠিক ।
পাখি রূপী সুবর্ণের চোখে জল । বললে , চলি রাজকুমারী ।
মালিনী বললে , কবে আবার দেখা হবে ?

-- যখন তুমি চাইবে ।বলে যেই উড়তে যাবে সুবর্ণ মালিনী বললে , কথা দাও , কাল রাতে আবার আসবে । তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে । আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম , কেমন ? কথা দাও কাল আবার আসবে ? আমি যে তোমার অপেক্ষায় থাকব ।
সুবর্ণ বললে , কথা দিলাম ।

উড়ে গেল সুবর্ণকুমার । রাত্রি তখন গভীর । গবাক্ষের  কাছে দাঁড়িয়ে থাকল রাজকুমারী । চোখের পাতায় জল ।

1 টি মন্তব্য: