রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

নির্মাল্য ঘোষের অণুগল্প : মধুচক্র




ছোট্ট রিয়া , নয় বছর বয়স। কোলকাতায় একটা হস্টেলে থেকে পড়ে।মন খারাপ সকাল থেকেই, দিদা নাকি মারা গিয়েছে খবর এসেছে এই মাত্র। দিদাই এই হস্টেলে রেখে গিয়েছিল মাস দুয়েক আগে জলপাইগুড়ি থেকে নিয়ে এসে।
দিদা মারা যাবার জন্য কান্না পাচ্ছে না রিয়ার…শুধুই মন খারাপ…ওকে এখন কে দেখবে??? এই এক রত্তি বয়সে মৃত্যু অনেক দেখেছে রিয়া। এই তো কয়েক দিন আগে মা মারা গিয়েছে কিডনির অসুখে। বাবা মা কে ছেড়ে দিয়েছিল অনেক দিন আগেই।লোকজন বলত  মা নাকি খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল তারপরে …আরেকটা লোকের কাছে গিয়ে থাকত…রিয়া কেও নিত না। দাদু টা অল্প বয়সে মারা যায় মদ খেতে খেতে। দাদুর চাকরীটা দিদিমা পেয়েছিল।
কত কিছুই না দেখল রিয়া এই বয়সে। মা মারা যাবার পর দিদার সঙ্গে শুত রিয়া.. একদিন মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় কথার আওয়াজে। দিদা পাশে নেই। কিন্তু দিদার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে পাশের ঘর থেকে..” আরো ৫০০ টাকা না বাড়ালে থাকতে দেব না এই ঘরে…”
“ না দিলে দেখে নেব তোমাকে…”
“ কি দেখে নিবি? মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করবি…আমি যে ঘর দিচ্ছি এটাই অনেক বেশী…” দিদার  এরকম শাঁসালো আওয়াজ রিয়া কোনদিনই শোনেনি আগে। ভয় পেয়ে বিছানা থেকে উঠে দেখতে গিয়েছিল পাশের ঘরে, কিন্তু দরজা মাঝখান থেকে বন্ধ। তুমুল ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল রিয়া…তারপরে আস্তে আস্তে আবার ওর ঘুম পেয়ে যায়…ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন দিদাকে জিগ্গেস করলে দিদা বলে, “ দুষ্টু লোক এসেছিল তাই বকা দিচ্ছিলাম।“ এসব কথা দিদা বাইরের কাউ কে বলতেও বারণ করে। এরপরেই দিদা একদিন ওকে কলকাতার হস্টেলে দিয়ে আসে…মন খারাপ হয়েছিল খুব.. তারপর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।
বাবার কথা মনে পড়ে না, কিন্তু দিদার কথা, মায়ের কথা আজকে খুব মনে পড়ছে হোস্টেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে। ছোট্ট অবস্থা থেকেই রিয়া বুঝতে পারত তাদের পরিবারটি আর চার পাঁচটি পরিবারের মত স্বাভাবিক নয়। কি যেন একটা গণ্ডগোল আছে। ওর বন্ধুদের পরিবারে যা আছে, ওদের পরিবারে যেন সেই খুশী কিম্বা স্বাভাবিকতার অভাব। ছোট্ট রিয়ার মন খারাপ হত কিন্তু কাউকে কিছু বলে বুঝাতে পারত না।
হোস্টেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রিয়া আকাশ দেখছিল, শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘগুলো কি সুন্দর ভেসে যাচ্ছে। দিদা আর কয়েকদিন পরেই হস্টেল থেকে বাড়ি নিয়ে যেত জলপাইগুড়িতে- পুজোর ছুটিতে খুব আনন্দ করত রিয়া ঠিক করে রেখেছিল ; কিন্তু দিদা তো মরেই গেল। আর একটা ব্যাপার খুব আশ্চর্যের লাগছিল রীয়ার কাছে -হোস্টেলের আণ্টিরা দিদা মারা যাবার পর থেকেই ওর দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে, যেটা রিয়ার একদমই ভালো লাগছে না। রিয়া গালের হাত দিয়ে ভাবতে বসল – দিদান চলে গেল…মা চলে গেল…বাবা থেকেও নেই…তাহলে ওর নিজের কে থাকল? দিদান প্রতি মাসে দেখতে আসত একবার করে জলপাইগুড়ি থেকে…তাহলে এখন কে আসবে?

ঠক্‌ করে একটা আওয়াজ হোলো। ব্যালকনিতে সুতোয় বাঁধা পেপার এসে পড়ল। পেপার কাকু প্রতিদিন এই সময় পেপার দেয়। রীয়া কোনদিনই খোলে না…কিন্তু আজকে কি মনে হল খুলে ফেলল। চমকে উঠল প্রথম পাতায় দিদার রক্তাক্ত বড় বড়  ছবি দেখে এবং তলায় বড় বড় করে হেড লাইন লেখা :
“ মধুচক্র চালাতে গিয়ে নৃশংস ভাবে আততায়ীর হাতে খুন জলপাইগুড়ির মাঝ বয়সী  মহিলা।“
তলায় বিস্তারিত খবর আছে। কিন্তু, দিদার রক্তাক্ত ছবিটা দেখে খুব কষ্ট হোলো রিয়ার। বাকিটা পড়তে ইচ্ছে করল না…হাত থেকে পড়ে গেল পেপার। শুধু মধুচক্রটা কি জিনিস সে বুঝতে পারল না।



1 টি মন্তব্য: