সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

বিনয়কৃষ্ণ বোসের 'ছিটমহল' : মহম্মদ লতিফ হোসেন





বিনয়কৃষ্ণ বোসের ‘ছিটমহল’: এনক্লেভ লিটারেচারের উল্লেখযোগ্য সংযোজন

মহম্মদ লতিফ হোসেন


বিনয়কৃষ্ণ বোসের ‘ছিটমহল’ প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের শারদীয় হাটেবাজারে পত্রিকা-য়। ২০১৮-য় গল্পটি পুনরায় সংকলিত হয় বরেন্দু মণ্ডল সম্পাদিত ‘ছিটমহলের গল্প’ গ্রন্থে।লেখক রচনাটিকে ‘রম্যরচনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘রম্যরচনা’ অভিধাটি নিয়ে বহুল মতপার্থক্য থাকলেও আমরা জানি যে রম্যরচনা হল একধরনের ‘লঘু-রচনা’ (fine-writing) যা সুচারু, পরিমার্জিত, সুললিত গদ্যে রচিত হয়। আবার কোনও ‘ব্যক্তিগত প্রবন্ধ’ও (familiar essay) রম্যরচনা হতে পারে। কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ‘রম্যরচনা’র বৈশিষ্ট্য নিরুপণ করতে গিয়ে বলেছেন –‘হালকা বৈঠকি চালে, ঘরোয়া মেজাজে, লঘু হাস্যরসাত্বক, রম্য কল্পনার স্পর্শযুক্ত যে কোনও  গদ্যরচনাকেই রম্যরচনা বলা যায়।’১ অনেক সময়ই ‘রম্যরচনা’ চলে আসতে পারে ছোটোগল্পের কাছাকাছি। কতিপয় চরিত্র ও ছোটো-ছোটো ঘটনার সুরম্য চিত্রণে যেন এক কাহিনিবৃত্তের আভাস পাওয়া যায় তাতে।২ বিনয়কৃষ্ণ বোস রচিত ‘ছিটমহল’ রচনাটিকেও আমরা ছোটোগল্প হিসেবেই পাঠ করতে পারি। এখানে ব্যক্তিগত প্রবন্ধের কোনও লক্ষণ নেই। পাঠক লেখকের জীবন-দৃষ্টির আভাস কিছুটা খুঁজে পেলেও, এই আখ্যান জুড়ে যেভাবে আমরা একটা নির্দিষ্ট কাহিনিকেই খুঁজে পাই, যেভাবে কয়েকটি নির্দিষ্ট চরিত্রই গল্পের প্রেক্ষাপট জুড়ে ক্রিয়া করে, তাতে রচনাটিকে কোনও ভাবেই ‘রম্যরচনা’ বলা চলে না। ছিটমহলের মত বিষয়কে, এর সাথে যুক্ত সেন্টিমেন্ট-কে বৈঠকিচালে, লঘুভাবে প্রকাশ করা আদৌ সম্ভব কিনা –এ বিষয়েও আমাদের মনে প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক।
এই রচনাটিতে লেখক ছিটমহলের পটভূমিতে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ের এক ছবিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তুরি বেওয়া, মরির মা, মুনসি ভাইয়া, যুবতি মালতি, ইলিয়াসের মতো চরিত্রেরা এখানে যেভাবে পাশাপাশি সহাবস্থান করে তাতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে যে কোনও বিভেদ রেখা থাকতে পারে, আমরা পাঠকেরা তা অনুধাবন করতে পারি না। পারস্পরিক বেঁচে থাকায় এরা সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি পারিবারিক ক্ষেত্রেও একত্রে মিলেমিশে গেছে। প্রোটাগনিস্ট চরিত্র ইলিয়াসকে লেখক অঙ্কন করেছেন সে সমাজের সর্বময় কর্তা রূপে, সে ছিটবাসীর সমস্ত বিপদের সহায়, দুঃসময়ের রক্ষাকর্তা। হিন্দু মালতির বিবাহের আয়োজক ইলিয়াসকে আমরা তাই সর্বধর্মের সমন্বায়ক বলতে পারি। বাস্তবেও ছিটমহল গুলিতে এই সমন্বয়ের চিত্রকেই খুঁজে পাওয়া যায়। আসলে বহুবিধ সংকটে আচ্ছন্ন ছিটবাসীদেরজীবনে ধর্মগত বিভেদকে আলাদা করে গুরুত্ব দেবার কোনও অবকাশছিল না। ছিটমহল বিনিময় পূর্বে একটি সাক্ষাৎকারে নলগ্রামের বাসিন্দা দীনুবর্মণ জানান –‘হামরা হিন্দুরও শুয়োর নোয়াই, মোসলমানেরও গোরু নোয়াই, হামাক কাও দাম না দেয়’৩ (আমরা হিন্দুরও শুয়োর নই, মুসলিমেরও গোরু নই, আমাদের কেউ দাম দেয় না)। অর্থাৎ ছিটবাসীদের হীনমন্যতার জায়গাটি এতটাই প্রবল ছিল যা তাদের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং সংগঠিত হবার প্রেরণা দিত। ‘ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় সমিতি’ কিংবা ‘ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিল’-এর মত ছিটমহল অন্দোলনে সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠনগুলিতেও হিন্দু-মুসলিম সদস্যের সমানুপাতিক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এরা সম্মিলিতভাবেই তাদের দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করে। ধর্ম তাদের ঐক্যের পথে কোনও বাঁধা হয়ে ওঠে নি। ছিটমহল গবেষক দেবব্রত চাকীও এক সাক্ষাৎকারে৪ এই হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ের প্রসঙ্গকে স্বীকার করেন এবং তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টিকেও আলোকপাত করেন। ‘ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় সমিতি’র সহকারী সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত এক সাক্ষাৎকারে৫ জানান – ছিটমহলগুলিতে হিন্দু-মুসলিম মেলবন্ধন এতটাই গভীর যে সামাজিক কিংবা পারিবারিক কোনও অনুষ্ঠানে পুরোহিত কিংবা মৌলবিদের অনুমতি বা পরামর্শের চাইতে প্রতিবেশী হিন্দু কিংবা মুসলিমদের সহযোগিতা ও পরামর্শ তাদের কাছে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে হত। আসলে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাত্রায় বাহ্যিক আক্রমণকে প্রতিহত করবার জন্য শুধু নয়, দীর্ঘদিনের পাশাপাশি বসবাস করবার সুবাদেও এই সম্মিলন ঘটেছে বলে আমাদের মনে হয়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এটাও যে ছিটমহলগুলিতে কোনও সংসদীয় গণতন্ত্র না থাকায়, পপুলার পলিটিক্স সেখানে যতদিন অবধি প্রবেশ করতে পারেনি, ততদিন অবধি ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণ সেখানে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে উস্কে দিতে পারেনি,বিনিময় পরবর্তী সময়ে যা ছিটবাসীদের একটি বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলগুলিতে সংখ্যালঘু নির্যাতন কিংবা এদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলগুলিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘু তোষণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে আঘাত করছে না বা ভবিষ্যতে করবে না –এ বিষয়ে আমরা নিঃসংশয় হতে পারিনা।
এই রচনায় কোনও নির্দিষ্ট ছিটমহলের উল্লেখ নেই। লেখক নিজেও ছিটমহলের অবস্থান বিষয়ে সচেতন নন। তাই আমরা লক্ষ করি লেখক এখানে দুপাশের কাঁটাতারে আবদ্ধ ৫-৭ টি পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি গ্রামকে ছিটমহল বলে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে তিনি যখন সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে সীমান্ত গেট খোলবার কথা উল্লেখ করেন, তখন তা অপ্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্তরেখার ১৫০ মিটারের মধ্যে কোনও রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো নির্মাণ করা যায় না। বেড়া দেওয়া হয় সীমান্তরেখার ১৫০ মিটার ছেড়ে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দেখা যায় অনেক জায়গায় প্রায় আধ কিলোমিটারেরও বেশি ভারতীয় ভূখণ্ড কাঁটাতারের ওপারে প্রায় বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থান করেছে। সেখানে বসবাসকারী  বাসিন্দারা কিন্তু ছিটবাসী নন, তারা ভারতীয়। কেবল তাদের মূল ভূখণ্ডে চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয় বি.এস.এফ.-র মর্জির ওপর।৬ সরকারি ভাবেও এই অঞ্চল গুলিকে কেন্দ্র করে কিছু নিয়ম-নীতি নির্দিষ্ট আছে। আলোচ্য গল্পের পাঠে আমাদের মনে হয় লেখক হয়তো এই অঞ্চলগুলির সাথে ছিটমহলকে এক করে ভেবেছেন। পূর্বোক্ত গল্পের আলোচনায় আমরা ছিটমহল বিষয়ক চর্চার অবলম্বন হিসেবে যে আঞ্চলিক অবস্থান, লোককথা, স্থানীয় মানুষের সেন্টিমেন্ট কিংবা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হবার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলাম, এক্ষেত্রেও আমাদের একই প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে হয়।
আখ্যানে চরিত্রদের ক্রিয়াকলাপ ছিটবাসীদের জীবনযাপনকেই মনে করায়। ইলিয়াসের ভাবনার অনুষঙ্গে লেখক যখন বলেন –
স্কুল পাঠশালার কথা অনুভব করে, কেননা সে বি.এ পাশ করেছিল, হিন্দুস্থানের ভেতর থেকে, আজ তাকে হিন্দুস্থানি ভাবতে লজ্জা হয়, বাংলাদেশি তারা কেউ নয়।৭
এই বক্তব্য ছিটবাসীদের অন্তর্লীন যন্ত্রণাকেই উন্মোচন করে। লেখক এখানে ছিটমহলকে কেন্দ্র করে একটি এমন দেশকে কল্পনা করেছেন যেখানে ধর্ম-বর্ণ নেই, জাত-পাত নেই। ইলিয়াসের ভাবনায় লেখকের ভাবনার সমর্থনেই তাই আমরা খুঁজে পাই –
কখনো  ক্রোধে গর্জে অয়হে, যেন ভিমের মত-একটানে ছিঁড়ে ফ্যালে সমস্ত কাঁটাতার, ভাবে ভীষণ একটা আন্দোলন করে, হিন্দুস্থান নয়, পাকিস্তান নয়, হিন্দু নয় মুসলমান নয়, একই অঙ্গনের মত দেশটা হোক...৮
এ স্বপ্ন যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরই স্বপ্ন। ছিটমহল সমস্যা কিংবা ছিটমহল আন্দোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা হিন্দু-মুসলিম ছিটবাসীদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের বুকে নিরন্তর সাম্প্রদায়িক বিবাদে লিপ্ত থাকা সংকীর্ণপন্থীদের অন্তত এ স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এভাবেই রচনাটির কেন্দ্রে লেখকের আবেগ-মনন-উপলব্ধি এক সার্বজনীন সত্যভূমি রচনা করে। যাকে কেবল রম্যরচনার আঙ্গিকেই নয়, ছোটোগল্পের প্রকরণে রেখেও পাঠ করা যেতে পারে। অন্তত এই রচমায় নিহিত নিবিড় ইশারাকে কখনোই রম্যরচনার লঘু বিষয়ের সঙ্গে এক করে দেখা সম্ভব নয়।
…………………………………….


তথ্যসূত্র :
১. চট্টোপাধ্যায়, কুন্তল, সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, রত্নাবলী, কলকাতা, আগস্ট ১৯৯৫, পৃ. ৩৬৩
২. পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৬৪
৩. ছিট নলগ্রামের আধিবাসী দীনু বর্মণের সাক্ষাৎকারে প্রদত্ত বক্তব্য অনুসারে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, নলগ্রাম, শীতলকুচি, কোচবিহার
৪. ছিটমহল গবেষক দেবব্রত চাকীর সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত বক্তব্য অনুসারে। ২ মার্চ ২০১৭, কোচবিহার
৫. ‘ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় সমিতি’র সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্তের সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত বক্তব্য অনুসারে। ১ মার্চ ২০১৭, কোচবিহার
৬. বাড়ৈ, সসীমকুমার, ‘ছিটমহল: এক যে ছিল কাঁটাতারের জীবন’ (প্রবন্ধ), শকুন্তলা সান্যাল (সম্পাঃ), দেবলা, শারদ সংখ্যা ১৪২৩, পৃ. ৬
৭. বোস, বিনয়কৃষ্ণ, ‘ছিটমহল’ (গল্প), মিতা চক্রবর্তী (সম্পাঃ), হাটেবাজারে পত্রিকা, বর্ধমান, উৎসব ১৪২২, পৃ. ৬৪
৮. পূর্বোক্ত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন