সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

আফসার আহমেদের ছোটগল্প : রাব্বীনূর আলী





আফসার আমেদের ছোটগল্পে মুসলমান সমাজ
রাব্বীনূর আলী

সাহিত্য কখনও জাত-পাতের উপর ভিত্তি করে রচিত হয় না। সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্যই হল মানুষ, মানবধর্ম এবং সমাজ বাস্তবতা। সেখানে কল্পনার একটি জায়গা থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রাধান্যই বেশি। সত্তরের দশকের কথাসাহিত্যিক আফসার আমেদের (১৯৫৯) লেখায় এই বাস্তব উপাদান এবং সামাজিক চেতনার সার্বিক রূপ ফুটে উঠেছে। তাঁর সাহিত্য রচনার উৎসই মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজ এবং এই সমাজের যথার্থ রূপকার তিনি। মুসলমান সমাজের কথা বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে। মুসলিম মেয়েদের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিভিন্ন বিষয়কে তিনি তুলে ধরেছেন। ১৯৯৮ সালে ‘সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার’ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত স্মারক পুস্তিকায় তাঁর সম্পর্কে বলা হয়-
          “বাংলার  মুসলমান  সমাজ আফসারের কথাসাহিত্যের মূল ভিত্তি। এই সমাজের নিজস্ব বাস্তবতা এবং  নারী জীবনের জটিল অবস্থান তেমন করে প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার আলোকে এপার-বাংলার কথাসাহিত্যে এযাবৎ বিশেষ উঠে আসেনি।...গ্রামীণ মুসলমান নারীজীবনের অর্থনৈতিক সামাজিক শোষণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আফসারের গল্প উপন্যাসের মূল কাঠামো তৈরি করেছে।”১
বস্তুত বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলমান সমাজের কথা রবীন্দ্রনাথের লেখায় যেমন এসেছে তেমনি উঠে এসেছে শরৎচন্দ্রের রচনাতেও। আবার পরবর্তীকালে কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের রচনাতেও দেখা যায় মুসলমান চরিত্র ও তাদের সামাজিক অবস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবণতা আরও বেশি করে দেখতে পাওয়া যায় সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সোহারাব হোসেন, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, আবুল বাশার প্রমুখ সাহিত্যিকদের রচনায়। কিন্তু আফসার আমেদের লেখায় শুধু মুসলিম চরিত্র বর্ণনা নয়, উঠে এসেছে মুসলমান সমাজের সার্বিক চাল-চিত্র, সামাজিক রীতি-নীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস। তিনি নিজেই সে কথা স্বীকার করে বলেছেন-
           “আমার লেখার  পাত্র-পাত্রীরা  মুসলমান সমাজের হওয়ায়, অনালোকে এই সমাজের সুবিধে আমি পেয়েছি। আর  এটুকু  বলতে পারি, এই সমাজ  নিয়ে  লেখার অনেক কিছু আছে। নিরন্তর লিখে চলা যায়। অনেক কিছু বলার আছে। পাত্র পাত্রীরা একটা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের, আমি এই মানুষদের মধ্যে স্বাধীন মানুষেরই অনুসন্ধান করেছি।...যদি বলেন, মুসলমান সমাজের প্রতি আমার পক্ষাবলম্ব, যথেষ্ট  আছে, এই  সমাজেরই  মানুষ আমি। কিন্তু রক্ষণশীল নই, সমাজেরই লেখক পরিচয় নিয়ে থাকতে চাই, মাথা উঁচু করে।”২
তাঁর অধিকাংশ গল্পের প্রেক্ষাপটেই রয়েছে মুসলমান সমাজের আচার-আচরণ, ইসলামি শরীয়ত কিংবা মৌলবি-শাসিত নিয়মনিষ্ঠা। এপার বাংলার গ্রামীণ মুসলমান সমাজের কথা এবং লোকায়ত জীবনের নানা জটিলতা ও পারিবারিক টানাপোড়নের চিত্র তুলে ধরাই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিশেষত খেটে খাওয়া মানুষদেরই তিনি তাঁর গল্পের হাতিয়ার করে তুলেছেন।
        আটাত্তরের বিধ্বংসী বন্যায় বানভাসি মানুষদের নিয়ে লেখা গল্প ‘জনস্রোত, জলস্রোত’। ১৯৭৯ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় এই গল্প লিখে পাঠকদের কাছে তিনি সমাদৃত হয়ে ওঠেন। দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে নুরু ও তার স্ত্রী ফুলু, জিকরিয়া, কাসেমদের মতো নিরীহ মানুষেরা আশ্রয় নিয়েছে ত্রাণশিবিরে। তাদের বিশ্বাস এই দুর্যোগ থেকে একমাত্র আল্লাহ্‌-রসুলই তাদের রক্ষা করতে পারে। তাই প্রাণভরে তারা আল্লাহ্‌কে ডাকে। বন্যার অবস্থা বেগতিক দেখে জিকরিয়া নুরুর কাছে গিয়ে তাকে আযান দিতে বলে। তাদের কাছে এ বন্যা আল্লাহ্‌র গজব ব্যতীত অন্য কিছু নয়। তাই জিকরিয়ার কথামতো নুরু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কানে আঙুল দিয়ে আল্লাহ-হু আকবর বলে আযান দেওয়া শুরু করে। বন্যার জলে তাদের সবকিছু ভেসে যাচ্ছে দেখে নুরু আফসোস করে বলে- ‘হায় আল্লা মোরা ভিখিরি হনু গো।’৩
        ক্ষুধায় কাতর হলেও তাদের কাছে খাওয়ার মতো কিছু নেই। অগত্যা নদীতে মরা গরু দেখে জিকরিয়া ছাদ থেকে নদীতে লাফ দেয় তাকে ধরার জন্য। এদিকে নুরু তার ছেলের দুধ খাওয়া দেখে সেও ‘ফুলুর বুকের শ্বেত-পানীয়’৪ খাওয়ার কথা ভাবে। ক্ষিদের চোটে তারা কার্যত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অবশেষে বান কমা শুরু হলে তারা জলে সাঁতার দিয়ে বাঁধের কাছে লাইন দিয়ে রুটির প্যাকেট নিয়ে আসে। কিন্তু সাময়িক ক্ষুধা নিবারণ হলেও থাকার জায়গা তাদের নেই আর। সবুরনের মা তাই আক্ষেপ করে বলে ওঠে- ‘ও গো মাথা গুঁজবার খোপটাও চলে গেল গো।’৫ আটাত্তরের বন্যা কেড়ে নেয় তাদের বাড়িঘর, মাথার চাল। সেসব ভাঙনের সামনে দাঁড়িয়ে নুরুরা অপেক্ষা করে একটা সুসময়ের।
         মুসলমান সমাজ-বাস্তবতা এবং পাপ-পুণ্যের ভিত্তিতে নির্মাণ করেছেন ‘গোনাহ’ গল্পটি। পাশাপাশি তুলে ধরেছেন  নারীর উপর পুরুষের দৈহিক কামনার প্রবৃত্তিকে। জয়নুদ্দিন কাজীর বাড়ির ষোলো বছরের কাজের মেয়ে ফরিদা। তার দৈহিক অনুরণন এবং পরিশ্রমকে দক্ষতার সঙ্গে গল্পকার তুলে ধরেছেন। জয়নুদ্দিন কাজির বাড়িতে মিলাদ-মহফিল। কলকাতা থেকে মৌলানা এসেছেন। ফরিদা তার জন্য পান-শরবৎ, নাস্তা তৈরি করছে। এ বাড়ির কাজের মেয়ে হওয়ার দরুণ তাকে সংসারের যাবতীয় কাজ যেমন করতে হয় তেমনি আবার জয়নুদ্দিন কাজীর বড়ো ছেলে মালেকের দৈহিক চাহিদাও তাকে মেটাতে হয়- আর এই দুয়ের মাঝেই ফরিদার অবস্থান। তবে ফরিদাও মালেককে কামনা করে, তার মতো বর পাওয়ার বাসনা তার মনেও জেগে ওঠে। তাই সে রুমালে তার কল্পিত বরের নাম হিসেবে আবদুল খালেকের জায়গায় আবদুল মালেক লেখে। রান্নাঘরে বাসন মাজার সময় তাকে ডাকার অছিলায় মালেক হোঁচট খেয়ে তার শরীরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মালেকের শরীরের স্পর্শ তাকে অস্থির করে তোলে। তবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সে মৌলানার জন্য পান-শরবৎ তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
          কাজি বাড়িতে অনুষ্ঠিত মিলাদে গ্রামের সব লোক জড় হয়েছে। গ্রামের মেয়েরাও এসে বাড়ির ভিতরে আড়ালে বসেছে। জয়নুদ্দিন কাজি সুফি লেবাস পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে মহফিলের আসরে বসেছে। মুসুল্লিরাও টুপি মাথায় দিয়ে মৌলানার চারপাশে বসে পড়েছে। ছয়টা বালিশের মাঝখানে বসে মৌলানা দরুদ শরীফ পড়া শুরু করেছেন এবং উপস্থিত মুসুল্লিদের সামনে বয়ান করে ইসলামের অবস্থানকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন-            
               “ভাইসব, আমরা কেউ ইসলামের পথে থাকছি না, নামাজ-রোজা হজ-জাকাত সব ভুলে বসে
                আছি...হক হালাল বেছে খাই না,  হারাম খাচ্ছি। অসৎ পথে চলছি, জোচ্চুরি, অবিচার, জেনা
                (অবৈধ যৌনাচার)  করছি। এই গোনাহগার  বান্দাদের  আখেরাতে দোজখের আগুনে জ্বলতে
                হবে......”৬
একদিকে মৌলানা সবাইকে ধর্মপথে চলার বিষয় সতর্ক করে চলেছেন, অন্যদিকে মালেক ফরিদার কাছে দেশলাই চাইতে এসে তার সঙ্গে দৈহিক তৃপ্তিতে মেতে ওঠে। অন্ধকারে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মিথুন-মূর্তি হয়ে যায়। মৌলানার বয়ান শুনে ফরিদা ভয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে- “ও মালেকভাই, গোনাহ্‌ হবে না ত?”৭  আর তখনই চারদিকে একটা কলরব শুরু হয়ে যায়। ফরিদা যে ছুঁচ দিয়ে রুমালে নাম লিখেছিল তা ভুলবশত বালিশে আটকে থাকার ফলে মৌলানার বুকে লেগে যায়। জয়নুদ্দিন কাজি মালেককে হুঙ্কার দিয়ে ডাক দিলে মিথুন মূর্তি ভেঙে মালেক দৌড় দেয়, ফরিদা পেঁপে গাছতলায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফরিদা জানে অন্ধকারে কেউ তাকে চিনতে না পারলেও এটা যে তার কাজ সবাই তা বুঝতে পারবে। ফলে সারাদিনের আনন্দ শেষে সে নিমেষেই নুইয়ে পড়ে। আসলে গল্পকার মিলাদ-মাহফিলের সওয়াবের কাজকে মালেক-ফরিদার অবৈধ গোনাহের কারণে ছুঁচ দিয়ে তা কেটে দিয়েছেন- এ কথা বলাইবাহুল্য। স্বভাবতই পাপ-পুণ্যের এরকম নিদর্শন আফসার আমেদের শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
            নারীদের জীবন যন্ত্রণার করুণ চিত্র নিয়ে লেখা আর একটি অসাধারণ গল্প ‘জিন্নত বেগমের বিরহমিলন’। এ যন্ত্রণা কেবল জিনতের একার নয়, এ যন্ত্রণা পাড়ার সকল মেয়েদের। পাড়ার অধিকাংশ মেয়েদের স্বামীগুলো নদী, হাট পেরিয়ে শহরে গিয়ে কাজ করে। প্রতি শনিবার তারা ঘরে ফেরে। জিনত, কুলশান, মর্জিনার মতো যুবতী মেয়েরা শিমুলতলার ঘাটে তাদের জন্য প্রিয় মানুষটার আসার অপেক্ষা করে। অনেকে ফেরে, আবার অনেকে ফেরে না।  গল্পকার লিখেছেন-
                  “মরদগুলান  নদীর  পথ  পেইরে চলে যায় শহরে। শহরে গিয়া মাগেদের মুখ ভুলে যায়।...
                   উঁচা উঁচা মোকাম, গাড়িঘোড়া লোকজন, ফরশা ফরশা মেয়ে। হাতে ঘড়ি, পায়ে উঁচা জুতা।
                   ভাতারগুলোর তাক লেগে গেছে। মুখে লাথি তোদের।”৮
মুসলমান সমাজে নারীরা আজও শিকলবদ্ধ। আজও তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাই তো জিনতের শরীরের ঢেউ দেখে পাড়ার ছেলেরা তাকে ‘মাগের পারা’ দেখে, মসজিদের মেঝেতে বসে আল্লার খাস বান্দা কালাম পড়া থেকে তার দিকে কুদৃষ্টিতে তাকায়, আবার নালার পানিতে মাছ ধরার সময় তার বুকের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে গোঙা তাগড়া যুবক। কিন্তু জিনত এসবের পরোয়া করে না, সে খেটে খাওয়া মেয়ে। কারও চোখ-রাঙানির ধার সে ধারে না। সে নির্ভয়ে বড়োচাচিদের বাকুল পর্যন্ত হেঁটে যায়। সেখানে জিনতের মতো লাঞ্ছিত আর এক যুবতী কুলশন আঁতুড়ঘরে প্রসবরত অবস্থায় রয়েছে। এর আগে পরপর দুবার মেয়ে সন্তান হওয়ার ফলে শাশুড়ির কাছে তাকে প্রতিনিয়তই কড়া কথা শুনতে হয়েছে, মার খেতে হয়েছে। কুলশান তা মুখ বুজে সহ্য করে শুধু মরার ইচ্ছা কামনা করেছে। ব্যথায় কাতর হয়ে সে অনুপস্থিত স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে-
                  “ওগো হাসিনার বাপ, তুমি দেড়মাস ঘরে আইসনি গো, জলদি এইস, মোর মরা মুখ দেখবা
                   গো ও ও অ....ট্যাকাও  পাঠাও  নাই, পেটেও দানা নাই, ব্যথা খাইতে খাইতে মইরে যাইছি,
                   জু  চেঁদিয়ে  যায়ছে, মোর  মরা মুখে দেইখতে শহর হইতে গাড়ি ধইরা লৌকো করে এসো
                   গো ও ও ও....”৯
প্রসব ব্যথায় অস্থির হয়ে কুলশন দাঁত কিড়মিড় করে। জিনত এবং আসমানির মা কুলশনের পাশে থাকে, কিন্তু তার শাশুড়ি ক্রমাগত তাকে উদ্দেশ্য করে মুক বেঁকে কটু কথা শোনায়। আসমানির মা তার শাশুড়ির মুখে ঝামটা দিয়ে বুড়িমাগি বলে সেখান থেকে চলে যেতে বলে এবং আক্ষেপ করে বলে-
                  “এই  গাঁয়ের  মরদরা  সক্‌কলেই শহরে গেলে ভেড়া হইয়ে যায়। ই কুলশনের নশিব লয়,
                   সারে গাঁ কো নসিব।”১০
লেখক এখানেই গাঁয়ের মেয়েদের সঙ্গে জিনত-কুলশনকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এ শুধু জিনত কিংবা কুলশনের একার যন্ত্রণা নয়। প্রথাবদ্ধ সমাজে এ যন্ত্রণা প্রতিটা নারীর। মেয়ে হয়েছিল বলে কুলশনের শ্বাশুড়ি বাচ্চার মুখে নুন দিতে বলেছিল। আবার এখন ছেলে হয়েছে দেখে পড়ি মড়ি মধু আনার জন্য ছোটে। বাস্তবতার এ এক নির্মম দৃষ্টান্ত।            
        প্রতি শনিবার রাতে শিমুলতলার ঘাটে নৌকা আসে। জিনতরা ঘাটে গিয়ে দলবেধে বসে থাকে। বহুদিন যাবত টাকা না পাঠানোর ফলে তাদের ঠিক মতো খাবার জোটেনি। আজ সব কিছুর অবসান ঘটবে। দীর্ঘপ্রতীক্ষায় তারা নৌকার জন্য বসে আছে। একটা নৌকা আসতে দেখে তারা খুশিতে লাফিয়ে উঠে। কিন্তু মর্জিনার স্বামী ব্যতীত আর কেউ সে নৌকায় ফেরে না। রওশনের বউ, বাহারনের মা-রা ক্লান্তিবশত আর অপেক্ষা করতে পারে না। একমাত্র জিনত একা একা নদীর পাড়ে বসে থাকে, নৌকার অপেক্ষায়, স্বামীর অপেক্ষায়। তার ভয় বলতে কিছু নেই, পশু-পাখি, ভূত-পেত্নী কোনোকিছুই তার মনে ভয়ের সঞ্চার করতে পারে না। কিন্তু মানুষের ভয়? হ্যা, তার শরীরের উপর লোভনীয় দৃষ্টি যে এ গাঁয়ের সকল পুরুষের। আর সেই লোভেই জিয়াদ শুকটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়, জিনতের শরীর জাপটে ধরে ঝোপের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বাঘের মতো টানা হিঁচড়া শুরু করে। শেষমেশ গোঙা তাকে বাঁচাতে এসে লাঠি দিয়ে জিয়দকে খুন করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একটা নারীকে শৈশব থেকেই এই লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়। এভাবেই বেঁচে থাকে তারা, এভাবেই কেটে যায় জিনত, কুলশনদের ভাঙা-গড়া জীবন।  
          পবিত্র কোরানকে অস্বীকার করা নাস্তিক হাসানের অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে লেখা একটি অসাধারণ গল্প ‘রক্তলজ্জা’। ফতিমার পনেরো বছরের বিবাহিত জীবনের পাঁচ বছর কেড়ে নিয়েছে হাসান। সে সম্পর্কে ফতিমার চাচাতো দেওর। একই ভিটেতে লাগোয়া ফতিমার ঘর। তারও স্বামী-সন্তান রয়েছে। তথাপী সে হাসানের প্রতি প্রেমে আসক্ত। পাঁচ বছর ধরে তারা তাদের অবৈধ সম্পর্ককে গোপন করে রেখেছে। মাঝে হাসান বিয়ে করলেও তাদের মধ্যে সেই সম্পর্ক ছিল। হাসানের স্ত্রী সেলিমা, দেখতে সুন্দরী, শান্তস্বভাবের। কিন্তু হাসান তার স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে তৃপ্তিবোধ করে না, কেননা সংসারের ভিড়েই তার স্ত্রী ব্যস্ত থাকে। তাই সে কাজ থেকে ফিরে সুযোগ পেলেই ফতিমার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ফতিমার স্বামী শাকিল বাড়িতে থাকে না। কলকাতার এন্টালিতে  ইলেকট্টিকের দোকান থাকে সে। ব্যবসার জন্য তাকে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। প্রতি শনিবার রাতে বাড়ি ফিরে রবিবারটুকু থেকেই আবার দোকানে ফিরে যায়। তবে ফতিমা হাসানের শরীরকে চিনলেও স্বামীর প্রতি তার দায়বদ্ধতা রয়েছে। স্ত্রীর কর্তব্য সে যথাযথ পালন করে। কিন্তু তার শরীরের ক্ষুদা নেভাতে পারে প্রেমিক হাসান, আর সে সেটাই কামনাও করে। হাসানই তার শরীরকে ছিনিয়ে নিয়েছে-
                   “প্রেম  শুধু  চোখের  দেখায়  থাকে  না। শরীরের  ভেতরও নতুন করে খুঁজে পায় ফতিমা
                   প্রেমকে। শরীর  ছোঁয়ারও  অর্থ  খুঁজে  পেয়েছে  সে  হাসানের  স্পর্শের ভেতর। স্তনাগ্রের
                   ওপর স্পর্শের উত্তেজনা স্তন জুড়ে সারা বুকে ছড়িয়ে পড়ে, জননে স্পর্শ জনন জুড়ে ছড়িয়ে
                   পড়ে, সারা  শরীরে। আশরীর প্রেম। হাসান  ফতিমাকে  তার শরীর চেনাতে পারে। হাসান
                   চেনে তার শরীর।”১১
হাসান সরকারি চাকরি করে কলকাতায়, তবে সে বাড়ি থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে। জানালার পাশে বসে ফতিমা তার ঘরে ফেরার অপেক্ষা করে। জানালা দিয়ে ফতিমাকে উঁকি দিলেই ফতিমা বুঝে নেয় আজ হাসান আসবে। হাসান চুপি চুপি ছাদে গিয়ে অন্ধকার জায়গায় বসে থাকে। হাসানকে দেখেই ফতিমার হৃদয়ে কামনার আগুন জ্বলে ওঠে। সে বিছানার দিকে লক্ষ্য করে তার সন্তানেরা ঘুমিয়ে কিনা। কেননা তারা না ঘুমানো পর্যন্ত সে হাসানের কাছে যেতে পারবে না। ওরা ঘুমিয়ে গেলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করে সেজেগুজে হাসানের কাছে গিয়ে বসে। হাসানকে সে তার প্রেমিক মনে করে, তার কাছে নিজের শরীরকে উজাড় করে দিতে সে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। আবার হাসানের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক থাকলেও সে ধর্মীয় নিয়ম, আচার নিষ্ঠা সহকারে পালন করে। প্রতিদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়ে কোরান পাঠ করে। সে বিশ্বাস করে কোরানের পবিত্রতাকে ও কোরান পাঠের পুণ্যলাভকে। একমাত্র কোরান পাঠের সুরেলা কণ্ঠস্বরের মধ্যে সে খুঁজে পায় সংসারে নিজের কৃতিত্ব ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশকে। এই নিত্যদিনের অভ্যাসেই তাকে সকলে দেখে, শুধু গোপন থেকে যায় তার অবৈধ প্রেম। হাসানের কাছ থেকে সে শুধু প্রত্যাশা করে তার ভালোবাসার জবাব- “সত্যি সত্যি আমাকে ভালোবাসো তো?”১২ হাসান তার দেহ ভোগ করার লোভে ফতিমার কথায় সম্মতি জানিয়ে হ্যা বলে। কারণ সে ভালোভাবেই জানে ফতিমা তার কাছ থেকে শুধু উত্তর কামনা করে। উত্তর পেয়ে গেলে ফতিমা তার শরীরের সবটুকুই তাকে দিয়ে দেবে। আসলে হাসানের মনে তার প্রতি যতটা না প্রেম, তার থেকে বেশি ফতিমার শরীর। সে শুধু ফতিমার শরীরকে চায়। তার জন্য সে মিথ্যা কসম খেতেও দ্বিধাবোধ করে না। গল্পকার লিখেছেন-
                 “...ফতিমার  মধ্যে  বিশ্বাসের  ভিত্তিভূমি  শক্ত  করতে ‘আল্লার কসম’ খায়। প্রেমের যা যা
                   সম্ভাষণ  করা  উচিত  সে  সব  করে, এবং  আদর  সোহাগ সেই মতোই করে। ‘কসম’
                   খাওয়াটা সে-রকমই।”১৩
সে ঈশ্বরকে অমান্য করে। কিন্তু সেই অমান্য চরমতম হয়ে ওঠে যখন সে তার অবৈধ সম্পর্কে ধরা পড়ে যায়।  একদিন মাঝরাতে ফতিমার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তার মেজ ভাবি সখিনা তাকে দেখে ফেলে। পরদিন ভোরবেলা হাসানের স্ত্রী সেলিমার কোরান পাঠ করার সময় সখিনা হাসানের কাছে জানতে চায় যে সে রাতে কোথায় গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে হাসান ধরা পড়ে যায়। ফতিমা তার ঘর থেকে হাসানের ধরা পড়ার দৃশ্য দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে। এদিকে সেলিমা এই ঘটনায় কান্নায় ভেঙে পড়ে হাসানের কাছে জানতে চায়, সে রাতে ফতিমার কাছে গিয়েছিল কিনা। কিন্তু নাস্তিক হাসান সেলিমার কাছে মিথ্যা কসম খায়–
                   “যাই নি, আল্লার  কসম, বাইরে গিয়েছিলাম।’...দে, কোরানটা  আমার  হাতে  তুলে দে,
                    আমি কোরান ছুঁয়ে বলছি- তবে তোমাদের বিশ্বাস হবে।”১৪
সেলিমা হাসানকে কোরান দেয় না, কিন্তু হাসান জোর করে কোরান হাতে নিয়ে বলে-
                  “এই কোরান ছুঁয়ে বলছি, তোমরা ভেবেছ ফতিমার সঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক আছে- নেই।
                   আমি  রাতে  ওর  কাছে  যাই  নি। এই  কোরান  ছুঁয়ে  বলছি, যাই নি, যাই নি, যাই নি-
                   তিন সত্যি!”১৫
হাসানের কোরান ছুঁয়ে মিথ্যা কসম খাওয়ার দৃশ্য ফতিমা দেখে ফেলে। স্বভাবতই এই দৃশ্য দেখে সে হতচকিত হয়ে বিছানায় গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে হাসানকে ভালোবাসে, কিন্তু হাসানের কোরান ছুঁয়ে মিথ্যা কসম খাওয়াকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে। সে মনে করে এখন হাসানকে ভালোবাসলে কোরানকে অপবিত্র করা হবে। হাসানকে মনপ্রাণ দিয়ে চাইলেও সে আর তাকে ভালোবাসতে পারবে না। গল্পের শেষার্ধে তাই দেখা যায় সে নিজের শরীরকে পাক-পবিত্র রেখে ওজু করে কোরান হাতে নিয়ে বসে। পবিত্র কোরানকে অবহেলা করলে যে ভয়ানক শাস্তি পাওয়া যায়, সে কথা ফতিমা গ্রামবাসীদের মুখে শুনেছে। কোরান হাত থেকে পড়ে যাওয়ায় কেউ তিনদিনের মধ্যে রক্তবমি করে মারা গেছে, কেউবা শুকনো মাটিতে বজ্রাঘাতে মারা গেছে। সেই পবিত্র কোরানকে হাসান অবমাননা করেছে। ফতিমা তাই চাইলেও আর হাসানকে তার ভালোবাসার জায়গায় ঠাঁই দেবে না। হাসানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তার মন থেকে মুছে গেছে। কিন্তু কল্পনায় যেন সেই হাসান তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তার শরীর কেপে ওঠে, সে ক্রমশ পাগলের মতো হয়ে যায়। মনকে স্থির রাখার জন্য সে কোরান পাঠ করতে বসে।
                 “কোরানের পৃষ্ঠায় ডানদিক থেকে বাঁদিকে বর্ণমালার নীচে ডান তর্জনী বুলোয় ফতিমা।”১৬
       মুসলিম ধর্মান্ধতার এক অলৌকিক বাতাবরণ ফুটে উঠেছে ‘নোঙর’ গল্পে । রিজিয়ার শাশুড়ির অলৌকিক কথাবার্তায় গল্পটি অগ্রসর হয়েছে। রিজিয়া তার ছেলের চার নম্বর বউ। আগের তিনজনের সন্তান না হওয়ার দরুণ ছেলে হালিমের সঙ্গে  মিলে তিনি তাদের বিদায় করেছেন। তাই রিজিয়াকে বিয়ের পর থেকেই চোখে চোখে রাখে তার শাশুড়ি। ছেলে-বউয়ের ঘরের বাইরে তিনি অপেক্ষা করে থাকেন তাদের সঙ্গম শেষ হওয়ার। রিজিয়া ঘর থেকে বেরোলেই তিনি তার শরীরের ওপর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেন সে পোয়াতি হল কিনা। তিনমাসে একবারও সে পোয়াতি হয়নি, আর এটা তার শাশুড়ি নিমেষেই ধরতে পারে, এক অন্যরকম ঘ্রাণশক্তি তার।
      তার শাশুড়ি চোদ্দ বছর ধরে ছেলের সন্তানের অপেক্ষা করছে। এই চোদ্দ বছরে তিনি চোদ্দটি আচারের বোয়েম সাজিয়েছেন। হালিমের প্রথম বউ চোদ্দ বছর আগে এসেছে, তখন থেকে তিনি প্রতি বছর একটি করে বোয়েম সাজিয়ে রেখেছেন। রিজিয়ার কাছে সব বোয়েম তিনি রাখতে দেন এবং তাকে আরো তিনমাস সময় দেন পেটে ছেলে ধরবার। সে পোয়াতি না হলে তাকে তিনমাস পর বিদায় নিতে বলেন। রিজিয়ার চুলের ডগায় ব্যথার কথা শুনে তিনি অলৌকিক প্রসঙ্গকে সামনে নিয়ে আসেন।
             “কেউ  যদি পরপুরুষের সঙ্গে অবৈধ সঙ্গ নেয়, তাহলে তার চুলের ওপর বেনিয়ম টানা হেঁচড়া চলে,
              সে  তো আর বিছনা পায় না বাপু, ফলে চুলে একটা ব্যথা জন্মায়। আর স্তনের বোঁটায়, বেশি বেশি
              আদর করে ফেলবার এটা ফল।...সে রকম পরপুরুষকে তুমি ভাব? ভাবলেও চুলে ও স্তনের বোঁটায়
              এমন ব্যথা জন্মাতে পারে। কেন না আমাদের এই কাজি মহালে এই পুরোনো বাড়িটার অলৌকিক
              ক্ষমতা আছে।”১৭
শাশুড়িকে ঘিরে রিজিয়ার বিস্ময়ের শেষ নেই। তিনি তার ছোটমেয়ের বাড়ি যাবেন বলে রিজিয়াকে খইয়ের গা থেকে ধানের আঁশ ছাড়ানোর কাজ দিয়ে যান এবং যাওয়ার আগে দেওয়ালের মধ্যে দুটি চোখ এঁকে রাখেন। যাতে রিজিয়ার উপর তার নজর সর্বক্ষণ থাকে। তিনঘণ্টার কাজ রিজিয়া আধ ঘন্টায় শেষ করে নিজস্ব নোঙর গাঁথার সম্ভাবনায় আত্মমগ্ন হয়ে পড়ে। মুহূর্তেই তার শাশুড়ির কণ্ঠস্বর সে অনুধাবন করতে পারে। তার শাশুড়ির ধরে ফেলে যে রিজিয়া কাজটি আধ ঘন্টায় শেষ করেছে, এখন তার প্রশ্ন বাকি আড়াই ঘন্টা সে কি করল? স্বভাবতই সন্দেহের দৃষ্টি ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে ওঠে রিজিয়ার উপর। রিজিয়া তার কথার খেলাপ করেছে জন্যে তিনি আর একটি অলৌকিক মায়াজালের কথা শুনিয়ে দেন-
                  “এই মহালে একজন জিন আছে, তার খবর তুমি আগে পাওনি।...জিনটা তোমাকে সারাক্ষণই
                   চোখে চোখে রাখে।... তুমি  অন্যায়  করলে তোমাকে  তিষ্টোতে  দেবে না। সারাক্ষণ তোমার
                   পেছনে  লেগে  থাকবে। তোমার নিদ্রা-জাগরণ কেড়ে নেবে তোমাকে বাঁচতে দেয়া হবে তার
                   একমাত্র কাজ। এটা কাজি মহালের একটা গোপন সংবাদ, তোমাকে জানালাম।”১৮
কাজি মহালে আসার পর থেকে রিজিয়ার মনেও একটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু জিনটা যে একটা সাজানো ব্যাপার এটা রিজিয়া উপলব্ধি করতে পারে। তার প্রতি শাশুড়ির এরকম আচরণে সে নিজেকে একটা তুচ্ছ তৃণখণ্ড মনে করে। শাশুড়ি তার কাছে গর্ভাধান চেয়েছে, কিন্তু তার স্বামী গর্ভসঞ্চার করতে পারেনি। আর পারেনি বলেই তার শাশুড়ির এত কড়া নজরদারি। কিন্তু রিজিয়া তো চেয়েছিল শুধু একটুকরো ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার মধ্যেই সে খুঁজে পেতে চেয়েছিল তার নিজস্ব নোঙর।
        মুসলিম নারীর অবস্থান পর্দার আড়ালে- এই প্রেক্ষাপটকে নিয়েই লেখা ‘দুই নারী’ গল্পটি। গল্পের দুই নারী হল মৌলানার স্ত্রী নাসিরা এবং তার দূর সম্পর্কের চাচি। মুসলমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের কিছু বিধিনিষেধ আছে,  পরপুরুষ যাতে মুখ দেখতে না পারে তার জন্য বাড়ির বাইরে বের হলে তাদের বোরখা পড়ে বের হতে হয়। নাসিরা মৌলানার বিবি হওয়ার দরুণ রাস্তায় বেরোতে পারে না। তার স্বামীর কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাইরে গেলে বোরখা পড়ে বেরোতে হবে। মৌলানার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর নাসিরার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাই বয়সের ব্যবধানটাও তাদের মধ্যে রয়েছে। মৌলানার পঞ্চাশ, নাসিরার বত্রিশ-তেত্রিশ। তাদের বিয়ে হওয়ার প্রায় চোদ্দো বছরে হতে চলল। তাদের দুই ছেলে আবার মৌলানার প্রথমা স্ত্রীরও দুই ছেলে রয়েছে। তারা মৌলানার জুতোর দোকানেই থাকে। নাসিরা মৌলানার আদেশকে অমান্য করতে পারে না। তাই কোন জায়গায় গেলে তাকে বোরখা পরেই বেরোতে হয়। বোরখা পড়া অবস্থাতেও মৌলানা তাকে চিনতে পারে। তবে তার স্বামী মৌলানা নয়, মানুষই তাকে মৌলানা  নামটা দিয়েছে-
                    “কোরান হাদিস অত্যধিক চর্চা করার ফলে, লোকে তার জ্ঞান ও ইসলামি আদব কায়দা
                      অত্যধিক পালন করতে দেখে, মৌলানা বলেই ডাকে, সম্মান দিয়ে থাকে।”১৯
নাসিরার বেশিরভাগ ভাগ সময় বাড়িতেই কাটে তার স্বামীর বয়স্ক ও বিধবা চাচির সঙ্গে। একই সঙ্গে থাকার ফলে দুজনের মধ্যেই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার প্রতি চাচিরও রয়েছে গভীর স্নেহ, ভালোবাসা। কিন্তু মৌলানার বিধিনিষেধে সে যেন অতিষ্ট। তারও যে স্বাধীনতা রয়েছে, খোলা মনে মুক্ত বাতাসে নিজেকে মেলে ধরবে সেটা নাসিরার হয়ে ওঠে না। তার খুব সখ টিভি দেখার, টেপ-রেকর্ডার বাজাবার, কিন্তু মৌলানার স্ত্রী হওয়ার দরুণ তার সে সেটা করতে পারে না। মৌলানা কাছে এসব দেখা-শোনা গুনাহের কাজ। তাই নাসিরা মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই মৌলানাকে না জানিয়ে বাইরে বের হয়। যেমন। প্রচণ্ড গরমের জন্য সে বাজার থেকে তরমুজ আনতে চায়, চাচী তাকে বাধা দেয়। বলে-
                     “ভাইপো যে মৌলানা। মৌলানা বিবি হয়ে বাজার যাওয়া তুমার বারণ যে।”২০
নাসিরা বোরখা ছাড়াই বাজার যায়, কেননা সে মনে করে বোরখা পড়ে গেলে যদি তার স্বামী তাকে চিনতে পারে। কিন্তু মৌলানা তাকে চিনতে পারে না। উত্তেজনা ও আনন্দে নাসিরা তরমুজ নিয়ে বাড়ি এসে চাচির সঙ্গে ‘তারিয়ে তারিয়ে’ গোটা তরমুজটা খেতে থাকে। বস্তুত আফসার আমেদ খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন মুসলমান সমাজের অবস্থানকে। বাগনান, কোলাঘাট, মেটিয়াবুরুজ, গার্ডেনরীচ প্রভৃতি শহরের কিংবা গ্রামের মানুষের জীবন থেকেই তিনি তাঁর গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেছেন এবং যা দেখেছেন তাই তুলে ধরেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতায় পুষ্ট তাঁর গল্প শুধুমাত্র তাই মুসলমানের সমাজের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে সর্বাঙ্গীণ।



তথ্যের সন্ধানে
১.  সৃজন পত্রিকা, সম্পাদক লক্ষণ কর্মকার, ঘাটাল, পূর্ব মেদিনীপুর, ছোটোগল্প বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা, বর্ষ ২৪,
    ডিসেম্বর ২০১৬, পৃ- ১১১
২.  কিস্‌সা : অন্তরালের কথা, ‘কোরক’, প্রাক্‌ শারদ সংখ্যা, ১৪১৫, মে-আগস্ট, ২০০৮, পৃ- ১৬৯
৩.  ‘জনস্রোত, জলস্রোত’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ,
    সেপ্টেম্বর ২০১২,  পৃ- ১৬
৪.  তদেব, পৃ- ১৭
৫.  তদেব, পৃ- ১৮
৬.  ‘গোনাহ্‌’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১২,
     পৃ- ২৫
৭.  তদেব, পৃ- ২৬
৮.  ‘জিন্নত বেগমের বিরহমিলন’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ,
    সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃ- ২৭
৯.  তদেব, পৃ- ২৯
১০. তদেব, পৃ- ৩০
১১. ‘রক্তলজ্জা’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১২,
     পৃ- ১৩৫
১২. তদেব, পৃ- ১৩৬
১৩. তদেব, পৃ- ১৩৬
১৪. তদেব, পৃ- ১৪৯
১৫. তদেব, পৃ- ১৪৯
১৬. তদেব, পৃ- ১৫৩
১৭. ‘নোঙর’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১২,
     পৃ- ১৫৭
১৮. তদেব, পৃ- ১৬১
১৯. ‘দুই নারী’, আফসার আমেদ, সেরা পঞ্চাশটি গল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০১২,
     পৃ- ১৭৮
২০. তদেব, পৃ- ১৮০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন