শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২০

পিংকি খাতুনের গল্প : লকডাউনের দিনগুলি



দুমাস হল কাকিমাদের ভাড়া দেওয়া হল না। আমি যাদবপুর ছেড়ে রামপুরহাটের বাড়িতে চলে এসেছি। একরকম পালিয়েই বলা চলে।
মাঝে মাঝে চিন্তা হয় ওদের জন্য। বিস্তর ব্যাংক লোন করে ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। কাকিমাকে অনেকবার বলতে শুনেছি— জানো সুমি লোন শোধ করতে করতেই আমাদের ভিখিরি দশা। যে কটা টাকা ভাড়ায় ওঠে ও দিয়ে সংসার চালানোই দায়।
হ্যাঁ, কাকিমাদের জন্য এখন খুব চিন্তা হয়। এই লকডাউনের দিনগুলিতে ওদের সংসার কীভাবে চলছে জানি না। চারিদিকে বিষাক্ত পরিবেশ। মানুষ মানুষের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। কত লোক না খেতে পেয়ে মরতে বসেছে। সব কিছু ভাবলে মনে হয়, আতঙ্কগুলো যেন দৈত্য হয়ে গিলতে আসছে।

যাদবপুর ছাড়ার পর থেকেই আমার ভোডাফোন নম্বরটি বন্ধ। একরকম ইচ্ছে করেই ফোনটি বন্ধ রেখেছি। কিন্তু কেন বন্ধ রেখেছি জানি না। গোপন কোনও ভয় থেকে কি ! বলা ভালো কাকিমাদের কাছে এই নম্বরটিই দেওয়া আছে।

আর থাকতে পারলুম না। একমুখ লজ্জা নিয়েই কাকিমাকে ফোন করলাম। প্রথমবার রিং হলেও ফোন রিসিভ করলেন না। আর করব কিনা ভাবছিলাম। অগত্যা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে পুনরায় ফোন করলাম। উনি ফোন ধরলেন—
  —হ্যালো!
ফোনের বিপরীতে কাকিমার গলা শুনে আতঙ্কিত হলাম। লজ্জা তো ছিল অবশ্যই। নিজেকে কেমন ছোটলোক ছোটলোক মনে হচ্ছিল।
—কাকিমা সরি। আই অ্যাম ভেরি ভেরি সরি। এই পরিস্থিতিতে আমার এমনটা করা উচিৎ হয় নি। সরি কাকিমা, আমি খুবই লজ্জিত। আমি এমনটা করতে চাইনি। আসলে…
আসলে কী, সেটা বলার সুযোগ না দিয়েই কাকিমা একরকম অবাক হয়েই প্রশ্ন করলেন—
 —আশ্চর্য এরকম হেজিটেড ফিল করছো কেন ? হঠাৎ কী হল ? কী এমন করেছ যে ক্ষমা চাইছ? আগে বল এই করোনার আতঙ্কে তোমরা কেমন আছো ?
কেমন আছি বলতে পারি নি, কিন্তু অবাক হলাম। নিজেকেই নিজে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কাকিমার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসছিল। যাক আজও মানুষদের মধ্যে দয়ামায়া বেঁচে আছে। গলায় শ্রদ্ধা মাখিয়েই বলে উঠলাম— কাকিমা আসলে দুমাস ভাড়া দেওয়া হয় নি। ফোনটাও সুইচ অফ করে রেখেছি।
—ওহ!!! এই ব্যাপার ! আমি ভাবলাম বিশাল কোনও অপরাধ করে ফেলেছ। নো প্রোবলেম্‌ মাই ডিয়ার। তোমার যখন খুশি তখন দিও।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— আপনাদের সংসার কীভাবে চলছে ?
—উপরে ভগবান আছে, সব চলে যাচ্ছে ঠিকঠাক। শুধু একটা বিষয়ে খুব চিন্তায় আছি তোমার কাকু আর আমি।
—কী বিষয়ে ?
—আসলে আমাদের আরেকটা নতুন ফ্ল্যাট কেনার কথা চলছে। পুরনো বাড়িটা আর ভালো লাগছে না, তাই ঠিক করলাম গড়িয়ায় নতুন ডিল্যাক্স থ্রি-বিএইচকেটা কিনেই নেই। জানো ত্রিশ লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট হয়ে গেছে, অথচ কাগজপত্র কিছুই ঠিক হয় নি। তারপর তো লকডাউন। এদিকে ওনারা টাকাও ফেরৎ দিচ্ছেন না। তোমার কাকু খুব টেনশনে আছেন। রাতে ঠিকঠাক ঘুমোতে পাচ্ছেন না।
—কাকিমা আপনিই তো বলেছিলেন, ভাড়ার টাকায় আপনার সংসার চলে।
—ও, আচ্ছা। এখন বুঝলাম তোমার অপরাধ প্রবণতার কারণটা। আসলে ব্যবসায় ওরকম মাঝে মাঝে বানিয়ে বলতে হয়, নাহলে কি আর ব্যবসা চলে !
এবার আর অবাক হই নি। আমার চোখে তখন ভেসে আসছিল অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল। একরকম প্রবোধ দেওয়ার ছল করেই বলে উঠলাম—
—কাকুকে বলবেন যেন টেনশন না করে।
—তুমিও সাবধানে থেকো।
আমি আর উত্তর দিতে পারিনি। শ্রীমতী আরতি চন্দ ফোন কাটলেন। মনে মনে ভাবছি, হ্যাঁ সাবধানে থাকব বৈকি, খুব সাবধানে থাকব।

আজ অনেক দিন বাবার চোখে ঘুম নেই। দুমাস হল দোকান বন্ধ। ঘরে নুন কেনারও পয়সা নেই। ব্যাংক ব্যালেন্স ! না নেই। পাওনাদারদের ফোনে ফোনে বাবাও কেমন পাগল পাগল হয়ে উঠেছে। সেদিন গভীর রাতে লজ্জার মাথা খেয়ে বাবা এসে বললো— মারে কটা টাকা জোগাড় করে দিতে পারবি ?
না, উত্তর দিতে পারি নি। লজ্জা পেয়েছি। এখন পিএইচ.ডি করছি। এতো বড়ো হলাম। বাবাকে কেবল মানুষকে দিতে দেখেছি, অনেক মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। অনেক অভাব থাকা সত্ত্বেও আমাদের ভাই-বোনের পড়াশুনায় বাবা কোনও দিন অর্থাভাব বুঝতে দেন নি। সেই বাবা আজ আমার কাছে হাত পেতেছেন। আমিই বা টাকা পাবো কোথায় ! আজ কতদিন হল শেষ ফেলোশিপের টাকা হাতে পেয়েছিলাম মনে পড়ে না। কী জবাব দেব বাবাকে বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেকক্ষণ নিরুত্তর দেখে বাবা বললো—
—দেখ না মা ! যদি তোর কোনও বড়োলোক বন্ধু-বান্ধবী থাকে, এই দুঃসময়ে যদি একটু উপকার করতে পারে !
এবার লজ্জা নয়, ভয় পেলাম। ‘বড়োলোক’ কথাটাতেই আসল ভয়। বানিয়ে তোলা ক্রাইসিসে গড়ে ওঠা শৌখিন দালানগুলিতেই আমার ভয়।…    
পুনরায় মনে এলো বুভুক্ষু মানুষের মিছিল। তারা শুধু হাঁটছে… কেবলই হেঁটে চলেছে…
 

৮টি মন্তব্য:

  1. খুব সরল স্বাভাবিকভাবে গল্পের উপস্থাপন

    উত্তরমুছুন
  2. Golpo ta porlam valo legeche kintu sesher dike kotha gulo biswas kore uthte parini

    উত্তরমুছুন