রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

রুমা মোদকের অণুগল্প : মায়া



আহা মায়া! রাজা সারথী নিঃস্ব হয়ে উদভ্রান্ত জলে জঙ্গলে ঘোরেন। কিন্তু সংসারের মায়া তাঁকে বিষাদাক্রান্ত করে পুন-পুনশ্চ।

মহিলা পুলিশটি এগিয়ে এসে খপ করে বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে ডান হাতে কষে দুটো বাড়ি লাগায় ডান হাতের লাঠি দিয়ে,যেনো দীর্ঘদিন খুঁজে ফেরা ফেরারী আসামীকে এবার বাগে পাওয়া গেছে। কানে ধরে উঠ বস করতে বলার আদেশটি তার মুখে বাঁধা মাস্ক আর খাস সিলেটী আঞ্চলিকতা দুই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে  ঠিক পরিষ্কার হয় না। সাথের অফিসারের ভাষা পরিষ্কার।  টিভিতে খবর পড়া মেয়েদের মতো।মাস্কের প্রতিবন্ধকতায় অস্পষ্ট থাকে না। তার স্পষ্ট আদেশে কানে হাত দিয়ে উঠবস করেন চন্দনা রাণী। থামে না অফিসার,সঙ্গের পুলিশকে রূঢ় আদেশ দেয়, তিনমাসের ডিটেনশন দেন। নো মার্সি। মাস্ক নেই। দয়ামায়ার কোন লক্ষন নেই দৃঢ় আদেশে।

বাড়িতে ঢোকার মুখে লাল নীল নিশানের ঝালরে ম্লান উৎসবের রঙ। চন্দনা রাণী থমকে দাঁড়ান। এটা চৈত্র মাস। এবার চৈতের রোদের আঁচ কেমন কেটে ফেলে দেয়া নখের মতো অচেনা। চারদিকের নীরবতার নিরুত্তাপ যেনো শুষে নিয়েছে চেনা চৈত্রের দাহ।মনেই ছিলো না এটা বসন্তকালের শেষ মাস।

হ্যা বাসন্তী পূজাই। প্রতিবছর চারদিন রায় বাড়িতে দুবেলা পাত পেরে খিচুড়ি খাওয়া বান্ধা,বিয়ে হয়ে আসার পর কুড়ি বছরে বাদ যায়নি কোনোবছর।সে একা নয়, পুরো জালো পাড়ার বউ ঝি সকলেই। হবেই বা না কেনো, ভোটের দিনে দলবেঁধে তারাই যে পাঁচ বছর পরপর ভোট দিয়ে রায় বাবুকে ওয়ার্ড কমিশনার বানায়। রায়বাবু বাসন্তী পূজায় খিচুড়ি খাইয়ে ঠিক প্রতিদান দেয় নাকি কৃতজ্ঞতা জানায় চন্দনা রাণী জানেনা। জানার দরকারও পড়ে না খুব একটা।একটা উপলক্ষে তারা নেমতন্ন পায়, ইমিটেশনের নেকলেস গলায় লাগানোর সুযোগ হয়,চাল-চুলার দুশ্চিন্তাহীন দিন, বসে বসে ঢাকের বোল আর ধুপতী নাচ দেখার কিশোরী আনন্দ। আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজায় সারা শহর যখন ঝকমারি আলো আর পাল্লা দেয়া ডিজের সাউণ্ডে মাখামাখি করে বড়লোকের বিয়ে বাড়ির মতো তখনো এতো আনন্দ হয়না চন্দনা রাণীর। বাসন্তী পূজার দিনগুলোই বরং উৎসবের রঙে নির্ভার কাটে। রায়বাবুর বাড়িতে কাঁসার থালা বাসন মেজে দেয়, টিউবওয়েল  চেপে খিচুড়ির চাল ধুয়ে আনে,কেমন নিজের বাড়ি বাড়ি মনে হয়।

পরের বাড়ির অযাচিত পোলাওয়ের চেয়ে নিজের বাড়ির লবণ ভাত খাওয়াও অনেক সুখের তখন টের পায় সে। অনেক কাঙ্ক্ষিত তারা তখন এ বাড়িতে। নিজের মনে করেই জালো পাড়ার বৌ ঝিরা পুরো পূজার যাবতীয় খুচরা কাজ সেরে দেয়।
অথচ এবছর তারা জানেই না বাসন্তী পূজা হয়ে যাচ্ছে ! অবশ্য এ বছরের কথা বলে লাভ কী! সবই তো উল্টেপাল্টে ছ্যাড়াব্যাড়া  হয়ে গেছে।


শাড়িটা নিয়ে বের হওয়ার সময় মেয়েটা দেখে ফেলে। ওর চোখে জল জমে। ভীষণ মায়া হয় চন্দনা রাণীরও। আহা মায়া। কিন্তু এই মূহুর্তে বেঁচে থাকাই যে বড় দায়! শাড়ির মায়ায় মেয়ের প্রতি দুর্বল হওয়ার দুর্বল সময় যে নয় এটা।
মেয়েটা শখ করে শাড়িটা  রেখেছিলো পহেলা বৈশাখে পরবে।ম্যাচিং করে পোড়ামাটির গয়না আর চুড়ি শাড়িটার উপর রাখা ছিলো।সব ঢেলে রেখে শাড়িটা নিয়ে বের হতে তার যে কষ্ট না খাওয়া কষ্টের চেয়ে তা কম নয়।
ভারতীয় চোরাই শাড়ি বাড়ি বাড়ি হেঁটে  শাড়ি বিক্রি করাই একমাত্র জীবিকা চন্দনা রাণীর। আঙুলের কড়ে গুণে, আজ পনেরো দিন,শাড়ি আসেনা। কেনাবেচা বন্ধ।

রায়বাবুর বউয়ের শাড়ি কেনার বাতিক আছে।এই শাড়িটা রাখলে আপাতত কয়েকশ টাকা হাতে আসে।খেয়ে বাঁচবে। এই আশাতেই আসা। বাঁচলে বৈশাখ আবার আসবে।


শাশুড়ির সাথে ঘরে বসে দুধের ক্ষীরে সন্দেশ বানাচ্ছে রায়বাবুর বঊ। দূর থেকে চন্দনা রাণীকে দেখেই  খ্যাকখ্যাক করে ওঠে শাশুড়ি। অহন যাও, অহন যাও। বাইর অইছো ক্যান,জানোনা পুলিশে মাইর দ্যায়।এইবার প্রসাদ নাই। যাও....যাও...।

শাড়িটা ব্যাগ থেকে বের করে দেখানো হয় না। বলা হয়না আজ তিনদিন ভাত খাওয়া হয়নি।

জিজ্ঞেস করা এই মূহুর্তে অর্থহীন জেনেও ক্ষীন কণ্ঠে জানতে চায়,আজ্ঞে রায়বাবু বাসাত নাই? চন্দনা রাণীর কণ্ঠটা অনেকটা মৃত্যু শয্যায় মূমুর্ষু পিতার সন্তানের চেহারা শেষবারের মতো দেখার ইচ্ছের মতো শোনায়।

রায়বাবুর মা এবার এই প্রজাসম সামান্য ভোটারের ধৃষ্টতায় আরো ক্ষেপে যায়। হে অহন ঘুমায়,ডাক দেওন যাইতো না। কাইল পরশু পৌরসভাত যাইও।সাহায্য পাইবায়। এই দুইদিন কাটে ক্যামনে,রাস্তাত যে পুলিশ আটকায়, কথাগুলো পাল্টে বলার জোর তার কণ্ঠে আর জুড়ায় না। সাহসের অভাবে নাকি খাবারের অভাবে কে জানে!

ঢোকার সময় ক্ষীন আশা ছিলো,এসেই পড়েছে যখন দুপুরে নিশ্চয়ই তাকে একটু খিচুড়ি খেতে ডাকবে।কিন্তু মেয়েটাকে রেখে খাবার যে পেটে যাবে না তার। কিন্তু কোথায় কি! এদের তাচ্ছিল্যে স্পষ্টই তাড়িয়ে দেয়ার আভাস। যদিও বাতাসে তীব্র পাঁচফোড়নের গন্ধ সে তাচ্ছিল্য না বুঝেই নাকে হানা দেয়। নাক পেরিয়ে পেটে গিয়ে বিরাটাকার দৈত্যের মতো তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে বিক্ষত করে জানান দেয়,তিনদিন ভাত নেই পেটে।


মেয়ের উৎকণ্ঠিত নির্বাক মুখে অনেক অপেক্ষা। ক্ষিদের সাথে যুগল মিলনে ভাষাহীন প্রশ্নের অপার মায়ায় মেয়েটার চোখদুটো ম্লান। বড়ো মায়া হয় চন্দনা রাণীর। মেয়েরে কেমনে বলে, খালি হাতে ফিরেছে সে!

যা থাকে কপালে,পুলিশের লাঠির বাড়ি খেলে খাবে। শাড়িটা নিয়ে শহরের দিকে হাঁটা দেয় চন্দনা রাণী।

কাঁসার থালায় পঞ্চব্যঞ্জন আর পাথরের খাদায় পায়েসে মৃন্ময়ী বাসন্তী দেবীর সামনে ভোগ সাজিয়ে পুরোহিত তখন রায়বাড়িতে শাস্ত্রজ্ঞান ঝারেন। এবার দেবীর ঘোটকে আগমন,ছত্রভঙ্গ পৃথিবী...।

অভুক্ত  মেয়েটা দেখে, কেমন বিষাদের মতো পড়ন্ত দুপুর টুপ করে বিকালের গায়ে ঝরে পড়ছে।আহারে তিনদিন অভুক্ত মা এখনো শাড়ি নিয়ে কোথায় কোথায় হাঁটছে কে জানে...মায়ের জন্য ভীষণ মায়া হয় মেয়ের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন