রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

শুভাশিস দাশের গল্প : খণ্ডিত ভূমি




না এবার আর ফসল ভাল হবে না মনে হচ্ছে । চারিদিকে কেমন শুখা শুখা একটা ভাব , আষাঢ়ের দশ দিন হয়ে গেলো এখনো এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখা নাই । কাল বাদ পরশু অম্বুবাচী । মা বলতেন অম্বুবাচীতে বৃষ্টি হবেই । দেখেওছি এই তিথিতে বৃষ্টি হতে । কী জানি কিসের অভিশাপ এসে পড়ল এই গাঁয়ের উপর ! কথাগুলো আপন মনেই বলছিল বিষ্ণুপুর গ্রামের হরিহর মাঝি । এই গাঁয়ের পুরনো মানুষ । বয়স প্রায় আশি । পয়ষট্টি সালে পাক ভারত যুদ্ধে ওপার থেকে চলে এসেছিল এই বাংলায় ।

ওপারের দিনাজপুর থেকে অনেকের সাথে হরিহরও শুধু প্রাণ টা হাতে করে পালিয়ে এসেছিল সপরিবারে । পরিবার বলতে ছেলে রতন আর ওর মা ফুলমালা । রতন তখন ছোট । এই বিষ্ণুপুরের বিকাশ বারুই তাঁর জমিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন , নইলে কোথায় ভেসে যেতো একথা সবাইকে আজও গলা উঁচিয়ে বলে । অনেকে কু কথাও বলেছে এ নিয়ে । হরিহর মাঝির বউ টা নাকি ভীষণ সুন্দরী ছিল । বিকাশ বারুই এর  নাকি একটু আধটু দোষ ছিল ।
এনিয়ে অবশ্য হরিহর কোনদিন ভাবেনি । কেননা ফুলমালা ওরকম নয় সে জানত ।
জমির আলে বসে হাতে হুকো নিয়ে একটা লম্বা সুখটান মেরে উঠতে যাবে এমন সময় গ্রামের পঞ্চায়েত দীপক এলো বললো আরে কাকা এখনো দেখি তুমি হুকোতেই রয়েছো ?
কী আর করবো বলো ? সবই তো গেছে । চোদ্দপুরুষের কোন স্মৃতিই তো নাই শুধু এই হুকোটাই । এটা আমার ঠাকুরদার আমলে । ওপার থেকে পালিয়ে আসার সময় হাতের কাছে এটা ছিল । পুটলিতে বেঁধে এপারে নিয়ে এসেছি । ভিটে মাটি তো আর নেই । অন্যের জমি চাষ করি আর খাই । কত্ত বার তোমাকে বললাম একটা পঞ্চায়েতের ঘর দাও । তুমি কত অজুহাত খাড়া করলা ! বলছিলাম তো ঘরের টাকা ঢুকলে তোমার ভাগটা নিও । নগদ অগ্রিম দেবার সামর্থ আমার নেই , তুমি শুনলে না । অন্যের বাড়িতে তো জীবনটাই কেটে গেলো বাবা !
কেন ? রতন নাকি বাইরে গেছে কাজ করতে ? মাসে মাসে নাকি ভাল টাকা পাঠায় ?
সব ঠিক বলেছো বাবা কিন্তু টাকাটা তো ওর বৌয়ের কাছে পাঠায় । সে টাকায় আমাদের বুড়ো বুড়ির কোন অধিকার নেই ।
বিকাশ বাবুর বড় ছেলে খ্গেন আছে বলে আমরা দুটো খেতে পাচ্ছি । আমি তো এখন আর জমি চাষ করতে পারি না । ওই চাষের সিজিনে একটু দেখাশুনা করি । অবশ্য বিকাশ বাবু মরার আগে ছেলেকে বলে গিয়েছিল ---ওদের একটু দেখিস !
খ্গেন কথা রেখেছে । ওর বৌটাও বেশ ভাল । জ্যাঠা ছাড়া ডাকে না ।

দীপক বললো এবার কোটা এলে তোমায় ঘর  দেবো ।

আর ঘর দিয়ে কী হবে ? দুটো প্রাণীর জন্য ওরা জায়গা করে দিয়েছে । নিজের সন্তান তো দেখলো না । মরলে শ্মশানে গিয়ে একটা খড়ি দিয়ে আসিস তাহলেই হবে ।

কী যে বলো কাকা ? তুমি এখনো অনেক দিন বাঁচবে !
নারে বাবা আর বাঁচার ইচ্ছে নাই । এই দেশ ছাড়ার আগে যেন মরতে পারি । যা শুনছি চারদিকে ! কী সব কাগজ পত্তর লাগবে এখানে থাকতে গেলে । এক দেশ কত বার টুকরো হবে রে ?
ওসব রাজনীতি , বুঝলে কাকা ওসব রাজনীতি ! কিচ্ছু হবে না । শুধু ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করছে ওরা ।
এই গ্রামটা এখনো ভাল আছে । কবে যে আবার অশান্তি ছড়ায় কে জানে !
দীপক বললো না কাকা এখানে আমরা যতদিন আছি কেউ আর অশান্তি করতে পারবে না ।

দুজনের গল্পের মাঝে খ্গেন এলো । বললো এই যে দীপক দা এখানে যে ! তোমার সালিশি নেই ? আমার একটু কথা ছিল । তোমার ওখানেই যাচ্ছিলাম । আমাদের জমি নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে আমাদের ছোট বাবু ঝামেলা পাকাচ্ছে ।
হরিহর খ্গেনের কথাকে টেনে নিয়ে বললো এবার একটা বিহিত করে দিও তো দীপক ।

বাপের জমি দুই ভাই সমান ভাগ পাবে কিন্তু ছোট বাবুর অন্যায় কিছু আবদার আছে !
আসলে খণ্ডিত হবার খেলাটা বোধহয় দেশ থেকে শুরু হয়ে ঘর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে ।
তা যা বলেছো কাকা , কিন্তু শুনলাম তোমাদের ছোট বাবু নাকি দিল্লিতে গেছে মেম্বরশিপ আনতে । এটা কি সত্যি ? দীপক এসব বলতেই খ্গেন বললো একটু একটু আমিও শুনেছি । তাতে কী হয়েছে ? তুমি আছো তোমার পার্টির লোকরা আছে , সামনেই তো ইলেকশন ! তোমার ফান্ডে দিয়ে দেবো আমার উত্তরের এক বিঘা ।
ঠিক আছে তোমার কোন চিন্তা নেই সামনের সপ্তাহেই সব হিল্লে হয়ে যাবে । এখন চলি তবে এই বলে দীপক চলে যায় ।
হরিহর বলে আবার যে কী গোল পাকাবে ছোট বাবু কে জানে ?
দূর জ্যাঠা তুমি অতো ভেবে করবে কী ? যা হবার তা তো হবেই ।
নারে বাবা এমনি কী আর ভাবি ! তোর বাবা যে আমাকে এই দেশে আশ্রয় দিয়েছিল , নইলে কোথায় ভেসে যেতাম ! এখনো তো তোদের দয়ায় বেঁচে আছি । এই জীবনে আর কত যে ভাঙনের খেলা দেখবো !
হঠাৎ আকাশটা কেমন কালো হয়ে এলো । হরিহর বললো লক্ষণ ভালো ঠেকছে না এটা ঝড়ের আকাশ । চল বাড়ি চলে যাই ।
####################
একসময়ের জোতদার বিকাশ বারুই এর জমি আজ ভাগ হবে । দুটো দিকে দুই ভাই বসে । ওদের মাঝখানে গ্রাম পঞ্চায়েত দীপক আর তাঁর কিছু সাগরেদ । একটু দূরে কপালে হাত দিয়ে বসে আছে অনেকদিনের এই বারুই পরিবারের সাথে জড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ হরিহর । একটা মায়া পড়ে গেছে ওদের উপর । ছোট বাবু একটু বেশি মেজাজি । হরিহর ভাবে সবাই তো আর সমান হয়না ।
ওদের চাষের জমি প্রায় ষাট বিঘা , বাড়ি চালা বাদ দিয়ে । তিরিশ তিরিশ হবে । এটা সবাই জানে কিন্তু এইসব কথা উঠতেই বিকাশ বাবুর বৃদ্ধা স্ত্রী লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে এসে হরিহর এর হাতে দলিল টা দিয়ে বললো আপনি পঞ্চায়েতকে বলুন এটা দেখতে ।
গিন্নি মার হাত থেকে দলিলটি নিয়ে হরিহর এগিয়ে গিয়ে দীপকের হাতে দলিল টা দিলো । দলিল খুলে দেখে অবাক হয়ে গেলো দীপক । এই জমির দলিলের পুরো জমিটি হরিহর এর নামে করা আছে ।
দলিলের লেখা বয়ানটি পড়ে শোনাল পঞ্চায়েত দীপক ।
মুহুর্তে একটা থমথমে ভাব দেখা গেলো সবার মধ্যে ।
খ্গেন এবার সালিশি সভার মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে বললো তাহলে ষাট বিঘা জমি  পাচ্ছে আমাদের হরিহর জ্যাঠা । আমাদের আর কোন দাবি রইলো না এই জমির উপর ।
সবার মাঝে বৃদ্ধ হরিহর কেঁদে ফেললেন ।
না এই জমি কে আমার জীবন থাকতে ভাগ হতে দেবো না । আমার পুত্র রতন তো আমাকে ছেড়ে গেছে কিন্তু খ্গেন , ছোট বাবু ?
হরি হর এগিয়ে গেলো । ছোটবাবুর মাথায় হাত রেখে বললো আর রাগ করিস না । তোদের জমি তোদের নামেই থাক । এটা আমার শেষ ইচ্ছা । এই জমিকে আর খণ্ড হতে দেবো না ।
সকাল থেকে মেঘ করা আকাশে সূর্য দেব উঁকি দিলো । হরিহর হাঁটু গেড়ে ভূমিকে প্রণাম করলো ।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খ্গেনের মায়ের চোখে তখন জল ঝরছে !


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন