রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

'ইবলিশনামা'র রিভিউ : অরিন্দম রায়

লতিফ হোসেনের ‘ইবলিশনামা’: অজানা ডুয়ার্সের ইতিবৃত্ত
     

(ইবলিশনামা। লতিফ হোসেন। অভিযান পাবলিশার্স। কলকাতা। জানুয়ারি ২০২০। মূল্য ২০০ টাকা)

গল্পকার লতিফ হোসেন গল্পের হয়ে ওঠা নিয়ে একদা বলেছিলেন- “গল্প কখনো কখনো k2 হয়ে চেপে বসে স্রষ্টার ফুসফুসে।”- তখন স্রষ্টা অনুভব করেন সৃষ্টির তাড়না। লেখক ব্যক্তিগতভাবে চোখে দেখেছেন ছিট-মানুষদের যাপিত জীবনকে, ব্যথিত হয়েছেন তাদের বেদনায়। ‘ইবলিশনামা’ গল্পগ্রন্থের ছিটমহল বিষয়ক গল্পগুলি সেই চোখে দেখে অনুভব করার তাগিদ এবং তাড়নার ফসল। যা লেখককে ‘ছিটমহলের গল্পকার’ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। এই সঙ্কলনে স্থান পেয়েছে ছিটমহল বিষয়ক চারটি গল্প। উত্তরের এই প্রতিশ্রুতিবান লেখককে ছিটমহল চর্চা আলাদা পরিচিতি দিলেও তাঁর জার্নি শুধু ছিটমহলের আর্তনাদেই থেমে থাকে না; মনন-মনীষা আর চিন্তার চুলচেরা বিশ্লেষণে সে যাত্রাপথ আরও সুদূর প্রসারী। ‘ইবলিশনামা’র বাকি আটটি গল্পে লেখকের  সেই প্রতিভাকেই আমারা উপলব্ধি করি। কথাকার লতিফ হোসেনের বেশিরভাগ গল্পের প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে উত্তরবঙ্গের তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চল। সেখানকার নদ-নদী, রাজবংশী-নস্যশেখ সম্প্রদায়ের মানুষ, তাদের দৈনন্দিন রীতি-রেওয়াজ, অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে গল্পকার নির্মাণ করেছেন তাঁর আখ্যান ভুবন। উত্তরবঙ্গের লোকদেবতা মাশান, হুদুম দেও, কোচবিহারের রাজ-রাজড়াদের ইতিহাস আর পুরাণ প্রসঙ্গও গল্পে উঠে এসেছে নানাভাবে। কখনো কখনো পুরনো মিথকে ভেঙে অবিনির্মান করেছেন। প্রবাদ-প্রবচনের যথাযথ ব্যবহার এবং উপমা ও চিত্রকল্পের সুনিপুণ প্রয়োগ এই সঙ্কলনের প্রতিটি গল্পকে শিল্পসার্থক করে তুলেছে।
 
    ‘ইবলিশনামা’ গ্রন্থের প্রথম গল্পটি ‘বাস্তুশাপ’। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ছিটমহল সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান ৩১ জুলাই ২০১৫ সালে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে করা হলেও; বাংলাদেশে অবস্থিত যে সমস্ত ভারতীয় ছিটের মানুষ বাংলাদেশ থেকে অপশনে ভারতে চলে আসে তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বাদ অচিরেই বিলীন হয়ে যায় বঞ্চনার অন্ধকারে। তাদের স্থান হয়েছিল অস্থায়ী শিবিরে। ভিটে-মাটি ছেড়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হতে চাওয়া লোকেদের ট্র্যাজিক পরিণতি নিয়েই ‘বাস্তুশাপ’ গল্পটি রচিত। মোতালেব মিয়া ইবলিশ, সে জানে কি
  করে অসহায়দের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া যায়। চড়া সুদে টাকা দিয়ে ফাঁদ পাতে সে; আর তাতেই ফাঁসতে হয় মোমেনুর, মেহমুদা, সন্তোষদের। মোমেনুরের সুদে নেওয়া লাইসেন্স হীন টোটো আটকা পরে থানায়। মোতালেবের লালসা তখন সুদের বদলে মেহমুদার শরীর চায়। ইচ্ছা মিশে থাকা ‘ভাবি’ ডেকে মোতালেব বলে-‘আশাকরি মোমেন আলির চেপা লেবুর তিতা স্বাদ বদলে ফজলি আমের স্বাদ দিবার পাইম।’ ছিটমহলের সাহিত্যের একটা বিশেষ মোটিফ হল ভয়। সেই গ্রাস করা ভয়ের আতঙ্ক নিয়ে মেহমুদা বলে-‘এতকাল ‘নাই দ্যাশে’র ভিতরা ছিনং। বেটি ছাওয়ালের শরীরত ভয় ছিল বান্ধা। অ্যালা এই দ্যাশের ভিতরা আসিয়াও ভয় গেইল না, এমন ভয় আর না দেখান মোতালেবভাই, বড়ো ভয় নাগে।’- মোমেনুররা জানে বাস্তু যদি মানুষকে না ধারে তাহলে সে ভিটেতে অশান্তি লেগে থাকে, শেষে হয়তো সে ভিটেয় ঘুঘু নাচে; আর মোমেনুর মেহমুদা, সন্তোষ, দীপক বুড়োরা তো নিজের সাত পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে এসেছে। তাই তাদের বারবার আক্ষেপ করতে শোনা যায়। মোমেনুর বলে-‘সে আসায় কাল হইছে কাকা, বড়ো  ভুল হইছে। জন্মভূমি ছাড়ি আসিয়া গোনাহ করিছুং বাও, খুব গোনাহ করিছুং।’- দীপক বুড়ো বলে-‘এইল্যা বাস্তুর অভিশাপ। হামরা খুব খারাপ করিছি, তায় এলা ফল ভোগ করি।’

    এতকাল নাই দেশের ভিতরে বন্দি থেকে এখন দেশের ভেতরে বন্দি দশা তাদের কাটা ঘায়ে নুন ছেটানোর মতই অনুভূতি দেয়। জন্মভূমি, বাস্তু ছেড়ে আসা ভারত তাদের কাছে হয়ে ওঠে ‘সতাল মায়ের আঁচল’। সেই বাস্তুর অভিশাপকেই তারা যেন বয়ে বেড়াচ্ছে নিয়তি হিসেবে। কিন্তু মেহমুদা দায়ী করে সেই রাজা-নবাবদের যারা এই বাস্তু-জমি-নারী বাজি ধরেছিল, জন্মভূমিকে বাজির পাল্লায় বসিয়েছিল। মেহমুদা বলে-‘ ছিট হইল রাজা-নবাবদের বাজির খেলে, জুয়া খেলার ফসল।’ ‘বেহুলার ভেলার মতোন’ ভাসতে থাকা মেহমুদা স্বামীকে বাঁচাতে চায়। মেহমুদার চোখে মোতালেফ মিঞা হয়ে ওঠে রংপুরের নবাব আর মোমেনুর আলি হয়ে ওঠে কোচবিহারের রাজা। শেষ বাজি নিজেকেই রাখে মেহমুদা। সাদাকালমেঘে ভেসে বেড়ানো দাশিয়ারছড়া, শালবারি, নটকটকা, বালাপুকুরির আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারার মতো মেহমুদাও হয়ে ওঠে একটি ছিট। সে বলে-‘ এই শেষ বাজি মহারাজ।! আল্লা যেন মোক দিয়্যাই এই শেষ বাজি লেখে! আল্লা যেন আর কোনো বাস্তুক ছিট না বানায়’। ম্যাজিক রিয়ালিজম এর সার্থক প্রয়োগে ছিট মানুষের এই যন্ত্রণা আরও ব্যঞ্জনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

   ‘ইবলিশনামা’ গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় গল্পটি নাম গল্প। ‘ইবলিশ,… চারিপাকে ইবলিশ, ক্যাং করি বাঁচপু ইবলিশের হাত থাকি?’- জকু মিঞার এই প্রশ্ন দিয়েই গল্পের শুরু। গল্পকার দেখাতে চেয়েছেন আমাদের চারপাশে অজস্র শয়তান মৃত্যু ফাঁদ পেতে বসে আছে। লেবেল ক্রসিং থেকে ঝুলন্ত ফ্যানে ওঁত পেতে আছে মৃত্যুদূত ইবলিশ। গল্পের শুরুতে ইবলিশের ভয় জকুমিঞাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তাই টেঁপির নৌকা ডুবার কথায় ভয় পায় সে। কুসাইদ কথা কওয়া টেঁপিকেই  তার ইবলিশ বলে মনে হয়। দিন বদলায়, যন্ত্র গিলে খায় মাঝির বৈঠা। তবু ইবলিশের হাত থেকে বাঁচার উপায় মানুষ খুঁজে পায় না। ইবলিশের কাছে মানুষ অসহায়। জকুমিঞা ইবলিশ দেখে টেঁপির কথায়, মাঝিদের চোখে। তাই সে বলে ওঠে-‘ইবলিশ ভর কইচ্ছে তোমার গুলার উপরা, বালের তানে মাইনষের জীবন নিয়া খেলেন।’ জকুমিঞা যেন গ্রাস করতে চায় টেঁপির শৈশবকে, তার চোখে টেঁপি হয়ে ওঠে জরাগ্রস্ত হাবশি বুড়ি ও নায়লা ভূত। আর টেঁপির শৈশবকে গ্রাস করে সে হয়ে উঠতে চায় চির-জোয়ান। তাই সে বলে ওঠে-‘হাঃ হাঃ হাঃ… নায়লা রে নায়লা, কাও তোক বাঁচেবার পাইবে না। তোর মরণ আইচ্ছে, মরণ…। পাপ, হ্যাঁ হ্যাঁ পাপ। স্বর্গ-মর্ত-পাতাল-ব্যাপী পাপীর রাজত্ব। হাঃ হাঃ হাঃ।’ হঠাৎ জকুমিঞার সমস্ত ভয় এক নিমেষে উধাও হয়ে গিয়ে অট্টহাস্যে রূপান্তরিত হয়। আসলে জকুমিঞাই ইবলিশ। তাই মিনতি বর্মনের ‘মরণের বুড়া মরেও না’-এর জবাবে জকু বলে-‘মুই মরিম না মরিম না, মোর বটগাছের জীউ। বচ্ছরের পর বচ্ছর ধরি বাঁচি থাকিম, কাও মারির পাইবে না।’ ইবলিশ অগণিত মানব আত্মায় ভর করে নিরন্তর ডেকে আনে মৃত্যু, গিলে খায় নারী, শিশু, মাঝি। লেখক ইবলিশ আর আজরাইলের মিথকে ডি-কন্সট্রাকসন-করে আধুনিক মানুষের কুমতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সমগ্র গল্পগ্রন্থে এই সুর ধ্বনিত হয়।

    ‘টশা মাশান’ এই সঙ্কলনের ছিটমহল বিষয়ক একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ির রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকেরা ভয় থেকে বাঁচার জন্য এই অপদেবতার পুজো করে থাকে। প্রবাদ আছে এই অপদেবতা কারও উপর ভর করলে কোনো প্রার্থনাই আর শোনেন না। কারণ তিনি টশা। ছিটমহলের জ্যোৎস্না বর্মন আর খগেশ্বর বর্মন মেয়ে মনাকে তুলে দেয় খগেশ্বর নারায়ণের হাতে ছিটের কুকুর-শেয়ালদের হাত থেকে বাঁচাতে, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, ইন্ডিয়ান জামাই আর বৈধত্বের শিলমোহরের জন্য। তাছাড়া দালাল বছিরুদ্দি কথা দিয়েছিল-‘বেটি তোমার, তোমারে থাইকপে। নেকা-পড়া, জামা-কাপড়, স্নো-পাউডার থাকি সিঁথির সেঁন্দুর সইক তোমার, খালি পোষিবার ভার হামার। মাস্টারদা কথা দিছে খগেশ্বর খগেশ্বরে থাইকপে। খালি বর্মন হইবে নারায়ণ।’ – ছিটের মানুষরা এভাবেই ‘ভুয়ো বাবা’ বানিয়ে তাদের সন্তানদের মানুষ করতে চায়। কিন্তু মায়ের মন কি নাড়ির টান ভোলে; মেয়ের মুখে একবার মা ডাক শোনার জন্য আকুল হয়ে ওঠে জ্যোৎস্না বর্মন। কিন্তু ছিটের মানুষের প্রার্থনা কেউ শোনে না, আটিয়া কলা আর ভাজা চালের ভোগ পাওয়া মাশানও নয়। বরং বছিরুদ্দি দালালের হাতে শোষিত হয় খগেশ্বর। বাইশ বছরে দু’বার দেখা হওয়া মেয়ের বিয়েতে তাই খগেশ্বর জ্যোৎস্নার মতো ছিট বাবা-মার স্থান হয় গোয়াল ঘরে। অধিকার হারায় তারা নিজের কন্যার সম্প্রদানে। গোয়াল ঘরের ফাঁক দিয়ে তারা নিজের মেয়ের বিয়ে দেখে, সমস্ত বিয়ে বাড়িতে গোয়াল ঘর হয়ে উঠে একখণ্ড খলিশামারি, ফলনাপুর। তবু মায়ের মন শেষবারের মতো মা ডাক শুনতে চায়। কিন্তু ছিটের মানুষ যে গরু-ছাগল। বছিরুদ্দি, দীনু, খগেশ্বর নারায়ণ সেই গরুর দুধ দুয়ে নেয় বাছুর আটকে। তাই ভর রাতের বিয়ের সানাই যখন বাছুর সুরে কাঁদে, ছিটের গরু জ্যোৎস্না বর্মনের বুক ব্যাথায় ভরে ওঠে, তার প্রার্থনা মাশান বাবাও শোনে না। চিত্র কল্পের এমন অসাধারণ ব্যবহার এ গল্পের পাঠকদের জ্যোৎস্না বর্মনের আর্তনাদ হয়েই বুকে হানে।

   ‘একটি চিন্তার অপমৃত্যু’ গল্পটি এক সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার গল্প। উত্তম পুরুষ কথক তাঁর চিন্তাটিকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন এক বিচ্ছিন্ন সমুদ্রতট। কথক ভেবেছিলেন তাঁর চিন্তাটা শেষ অবধি সার্থক হবে; তাই সকলে পাগল ভাবলেও, আব্বা, আম্মা, আপা বিশ্বাস না করলেও  তিনি সরে আসেননি। সে কারণে চিরকাল নীতিবাদী আদর্শের বুকে লাথি মারলেও সেই চিন্তাটিকে ছাড়তে পারেননি। আপন মুদ্রাদোষে সবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া কথক নিজের বন্ধুত্বের মিথ্যে ফানুস কে বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি। আর যে সমাজ ধারণ করেছে পালন করেনি, নগ্ন করেছে আড়াল করেনি সেই সমাজ থেকে অনায়াসেই নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু যেদিন তার প্রেমিকা (চিন্তা) বলে –‘ তোমার চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তার কোন মিল নেই। তুমি নিরাকারে বিশ্বাসী আমি সাকারে বিশ্বাসী’, তখন এক লহমায় ভেঙে যায় চিন্তা রাজ্যের লোনাতট, ভেঙে যায় এতদিনের অন্ধ বিশ্বাস। প্রেমিকা তখন চলতি স্রোতে শরীর মিলিয়ে অস্বীকার করে সম্পর্ককে। তখনি কথক নিজের গলা টিপে চিন্তাটিকে মেরে ফেলেন আর মরে যান নিজে লজ্জায়, ঘৃণায়, অনুতাপে। এভাবে অজস্র চিন্তাই যে মরে যায় প্রতিনিয়তই; বিশ্বাস হীনতার এই ছবিই কথক এঁকেছেন এই গল্পে।
   
   কলকাতার মেস কালচারে থেকেও ‘অলৌকিক নয়’ গল্পের কথক শুনতে পান কোনো এক অদৃষ্ট নারী কণ্ঠের অস্পষ্ট সুর। নিঃসঙ্গ চিন্তার সেই জগতে কথককে তাড়া করে বেড়ায় ‘মুক্তি দাও’ সুর। কোনো এক পাপবোধ আক্রান্ত করে কথককে। তাই একসঙ্গে  থেকে অরিন্দম শুনতে না পেলেও তিনি শুনতে পান। কথকের মনে হয় তিনি যেন লাশকাটা ঘরে শুয়ে আছেন। আর দেখতে পান সমগ্র বিশ্বব্যাপী শুধু জ্বলন্ত চিতা আর অসংখ্য মানুষের মৃত্যু মিছিল। পশ্চিমের দেশগুলি থেকে ভেসে আসা মৃত্যু সাইরেনেও কথক শুনতে পান সেই একই মুক্তির দাবি। এ মুক্তি আসলে প্রতীকী মুক্তি, এ যেন কোটি কোটি মুক্তি কামী মানুষের আর্তনাদ, যারা বেঁচে থেকেও মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করে যায়। এভাবেই ‘অলৌকিক নয়’ গল্পটি ব্যক্তিগত চিন্তার জায়গা থেকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উত্তীর্ণ হয়। আপাত মানসিক রোগে আক্রান্ত পোস্ট-মডার্ন কথক এভাবেই ভাবিয়ে তোলেন পাঠককে।
   
   ছিটমহলের বাসিন্দারা সারাজীবন শুধু স্থানীয় নেতাদের কাছে প্রতিশ্রুতি পেয়েই এসেছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। কথা রাখেনি আবদুল রহমানও। বিনিময় পরবর্তী ছিটমহলের মানুষদের সঙ্কট নিয়ে ‘আবদুল রহমান কথা দিয়েছিল’-গল্পটি রচিত। গোলজার, মনসুর, ধনেশ্বর, দীনুদের বিশ্বাস ছিল তাদের জমি তাদেরই থাকবে; কেননা আবদুল রহমান তাদের কথা দিয়েছিল। কিন্তু সরকারি কাগজে দাগ-নম্বর, খতিয়ান নম্বর না থাকায় সেই জমি হারানোর আশঙ্কা তাদের প্রবল হয়ে ওঠে। এছাড়া এই গল্পে একদিকে ছিটের আগামী প্রজন্ম নব্য ভারতীয় রাব্বিনুর; সে স্বাধীনতার নতুন স্বপ্নে বাঁচতে চায়; অপরদিকে ধনেশ্বর, গোলজার, মনসুর, দীনুদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। বিনিময় পরবর্তী ছিটের দুই প্রজন্মের স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গের চিত্রকে এভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। গল্পের শেষে লেখক বলেন ছিটবাসীদের ‘আছে শুধু আশা। একরাশ আশা,…ছিট সরিয়ে ফিট হওয়ার আশা’। ধনেশ্বর, মনসুর, গোলজার, দীনুরা সেই ‘আশায় মরা চাষা’। ‘আবদুল রহমান কথা দিয়েছিল’ ছিটবাসীদের সেই আশা ভঙ্গের গল্প।

    মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারের মেয়ে আফরোজা নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিল তার বিশ্বাসকে। তার সে সাহস জুগিয়েছিল বাবা ও অতীতের আয়েশা সিদ্দিকি। নিপাট মিথ্যাগুলিকে সে ভাঙতে চেয়েছিল। কিন্তু দাদু হাজি সাদেক আলি ও আম্মা নার্গিস বেগমের কণ্ঠে শুনতে পায় ‘জল্লাদের নিনাদ’; যেন পুলসিরাতের ব্রিজ অতিক্রম করতে গিয়ে ইবলিশের নজরে পড়ে গেছে সে। প্রতিবাদী আফরোজা যেন বসরার যুদ্ধে বাবার মুখে আবু বক্‌করের মিল দেখে নিজে হয়ে ওঠে আয়েশা সিদ্দিকি। নির্মাণ করে আর একটি বসরার পটভূমি। মুসলিম ঘরের মেয়ে হয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার ছিল হৃদয়ের টান। তাই প্রথাগত ধর্মকে মেনেও আফরোজার কাছে বড়ো হয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের মানবধর্ম। রবি ঠাকুরের আত্মা যেন তার উপর ভর করে। বাবা তাকে শিখিয়েছিল-‘আমারা যতোটা না মুসলমান তার চাইতেও বড়ো ভারতীয়। দেশ রক্ষাও তো ধর্ম।…ধর্ম নয় সংস্কৃতির মিলই মানুষকে মেলায়।’ এভাবেই জুড়তে থাকা পুলসিরাতের ব্রিজ পেরিয়ে আফরোজা তখন পৌঁছে যায় তার নিজস্ব ভুবনে, যা তাকে উপলব্ধ করায় ‘জান্নাতি সুখ’। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে পঁচিশে বৈশাখ আর আফরোজার জন্মদিন। লেখক এভাবেই ইসলামী মিথ ভেঙে পুনর্নির্মাণ করতে চান আধুনিক পুলসিরাতের ব্রিজ।

    উত্তম পুরুষ কথকের সামনে বড়ো হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সঙ্কট। প্রেমিকার কঙ্কালের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব মিশিয়ে কথক হারিয়ে ফেলেন তাঁর নিজস্ব সত্ত্বাকে। তাই নিজেকেই প্রশ্ন করেন-‘আমার অস্তিত্ব কোথায়? ‘একটি চিন্তার অপমৃত্যু’ গল্পের ‘চিন্তা’-টি যেমন সাকার নিরাকারের প্রশ্ন তোলে, তেমনি ‘শুষে খায়’ গল্পের ‘ও’ কথকের ধর্মকে বদলাতে বলে। প্রেমিকার-‘তোমার আদৌ কি কোন অস্তিত্ব আছে?- এই প্রশ্নে কথক বার বার মরে যান, আবার পুনর্জন্ম লাভ করেন। সন্তোষ কুমার ঘোষ বন্ধু প্রাণতোষ ঘটকের মৃত্যুতে বলেছিলেন- ‘আমরা আসলে নিজের মৃত্যুতেই কাঁদি। এ মৃত্যু সম্পর্কের মৃত্যু, মূল্যবোধের মৃত্যু।’-মৃত সম্পর্ক নিয়ে কথকের চোখে প্রেমিকাই তখন হয়ে ওঠে জোঁক। তাই তিনি বলেছেন-‘আজ আমি বুঝতে পেরেছি জোঁক আর ওর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। ‘ও’ আমায় কঙ্কাল ধার দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গত একশো বছর ধরে আমার রক্ত শুষে খেয়েছে।’ এভাবেই বিশ্বাসঘাতিনী শুষে খায় প্রেমিকের রক্ত। তৃতীয় বিশ্বের দেশ শুষে খায় শ্রমিক, মজুরের রক্ত। চাকরি হারানো বাবাকে তাই বলতে শোনা যায়-‘বাগান থকে ভাস্যা আস্যা রোজ সকালের বাঁশিটা আর বাজবে না হাসিনা।’ ইস্টারের রাতের নানা রঙের বেলুনে কথক দেখে অজস্র ‘ও’-এর মুখ। এভাবেই প্রতারক প্রেমিকার স্বার্থপরতাকে এবং ধনিক শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষদের নিরন্তর শোষণকে কথাকার এক সরলরেখায় এনে দাঁর করান। তখন প্রেমিকা কিংবা শাসকশ্রেণী উভয়ই হয়ে ওঠে এনিলিডা গোত্রের জোঁক।

   হুদুম দেও লোকায়ত কৃষি দেবতা। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজে আজও প্রচলিত এই দেবতার পুজো। কৃষকদের অসহায়তা, হতাশা ও আত্মহনন নিয়ে ‘হুদুম দেও’-শীর্ষক গল্পটি রচিত। এই গল্পের বৃদ্ধ চরিত্রটির মাত্র দুই বিঘা জমি। সে জমিতে বুড়ো আলু চাষ করেছে। কিন্তু আলুর ফসল বেশি হলেও দাম পায়না তারা। সরকারও আলু কিনতে চেয়েও কেনে না। আলু বেচে বিষ কেনারও টাকা হয়না তাদের। এমনকি গরুও খায়না সে আলু। বুড়োর চোখে এই আলুর চাষ হয়ে ওঠে ‘মরণ চাষ’। মরণ চাষ করেছে ভোল্লো, বজলেরাও। শালটিয়ার বাতাসে বুড়ো মরণ দেখে-‘মর খাটন খাটছি। মইরবে মইরবে সগুলায় মইরবে এলা।’ অঙ্কুশ, ওস্তাদ, ডাইথেন আর ইন্দোফিল এম পঁয়তাল্লিশ দিয়ে এতদিন আলুর পোকা মারা মানুষগুলোই পোকা হয়ে ওঠে বুড়োর চোখে। ভোল্লো-র মৃত্যু যেন আর একটা পোকার মৃত্যু মাত্র। আরও যেন কত মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। এক একটা মৃত্যুতে বুড়ো দেখে রুষ্ট হুদুম দেও। তাই শেষবার নিজের পালা ভেবে বুড়ো বলে ওঠে- ‘মার হুদুম মার, আর একটা পোকা মার।’- কৃষিজীবী মানুষের প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণকে লেখক অসামান্য ব্যাঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

    সম্পর্কগুলো আজ বড়ো ঠুনকো; অবিশ্বাস আর মিথ্যে হাওয়া ভরা ফানুসের মতো। সে রকমই একটা বিশ্বাসহীনতা ও সম্পর্ক ভাঙার আখ্যান হল ‘অন্তর্ঘাত’। এই গল্পের প্রধান চরিত্র সুবিরেশ আসলে নিজেই বিশ্বাসঘাতক। তাই সে স্বপ্ন দেখে তার প্রেমিকা মৌ কোনো দ্বিতীয় সম্পর্কে লিপ্ত। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে সুবিরেশ অঙ্গছেদন করেছে। কিন্তু গল্পের শেষে পৌঁছে বুঝতে পারি এ আসলে স্বপ্ন। তাই প্রেমিকার কাছে কাকতালীয়ভাবে  লাজবন্তীর বিশ্বাস ঘাতকতা এবং তার প্রেমিক সুব্রতর পুরুষাঙ্গ কেটে আত্মহত্যার কথা শুনে সুবিরেশের শরীর কেঁপে ওঠে।  আসলে প্রতারণা আর সন্দেহ আধুনিক সম্পর্কের একটা বৈশিষ্ট্য। তাই যে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আমরা গল্পে প্রবেশ করি গল্পের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে সেই ধারণাই সমূল বদলে যায়। খল চরিত্র  মৌ নয় প্রকৃত ভিলেন হয়ে ওঠে সুবিরেশই। তার পলিগ্যামি মন একটি সম্পর্কে থেকেও অপর নারীর প্রতি প্রলুব্ধ হয়েছে। এ গল্প আসলে আধুনিক ব্যক্তিসমাজের অন্তর্ঘাতের আখ্যান।
   
     উত্তরবঙ্গের নদ-নদী আখ্যানকার লতিফ হোসেনের অনেক গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে। নদীর প্রবহমানতায় মানুষের জীবন মিশে গিয়ে কখনো গতি-পায়; কখনো বা মজা জলের কচুরি পানার মতো থেমে যায় তাদের জীবন। ‘দাঁতুয়া’ গল্পে বিনতা আর নিয়তি হয়ে ওঠে তিস্তা ও তোর্ষা নদী। এই গল্পের চ্যারকেটু বাপ হয়ে ভোগ করতে চায় মেয়ের শরীর। মড়া তোর্ষার মজা জলে দাতালের আঘাত হানতে চায় চ্যারকেটু। দাতুয়া হয়ে চ্যারকেটু গিলতে চায় নতুন রক্ত পড়া মেয়ের শরীর।। বাপের চোখে আজরাইলের মুখ দেখে নিয়তি। চ্যারকেটুর নারী লোলুপতাকে দাঁতুয়ার খিদের চিত্রকল্পে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।

    ‘ইবলিশনামা’ সঙ্কলনের শেষ গল্পটি ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’। এটি অণুগল্প। ছিটের আছিমন  বিবি, মানুমিঞারা স্বাধীনতা চায়। ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের মধ্য দিয়ে তারা শুধু খুঁজে পেতে চেয়েছে ইন্ডিয়ান নাগরিকত্ব। তাই মনুমিঞার সাধ প্রকৃত ইন্ডিয়ান হয়ে তবেই বিয়ে করবে আছিমন বেওয়ার কন্যাকে। আর বৃদ্ধা আছিমন শেষ বয়সে শান্তিতে মরবে বলেই শুধু সাড়ে তিন হাত মাটি পেতে চেয়েছে। ছিটের মানুষ হয়ে এর থেকে বেশি আশাও তারা করেনি। মাত্র কয়েক লাইনেই ছিটমহলের মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্নকে সার্থক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আখ্যানকার।
 
    ‘ইবলিশনামা’ প্রায় সবকটি গল্পেই ধুয়ো পদের মতো ফিরে আসে ইবলিশের প্রসঙ্গ। আর প্রতিটি গল্পেই আছে এক গভীর জীবনদর্শন। উত্তরবঙ্গের লোকায়ত ভাষায় অসামান্য ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন চরিত্রদের আবেগ-অনুভূতিকে। তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলের নদী, জঙ্গল, লোকায়ত দেবদেবীর মিথ, কিংবদন্তীগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছেন তাঁর গল্পে। গল্পগুলিতে লেখকের অসাধারণ মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। পরিশেষে আমরা বলতেই পারি লেখকের কলম্বাসি সৃষ্টির তাড়না থেকে নির্মিত ‘ইবলিশনামা’র প্রতিটি গল্পই ছুঁতে পেরেছে ধ্রুপদী শিল্পের চর।      



৩টি মন্তব্য:

  1. বাস্তুশাপের আলোচনা টা দারুণ লেগেছে। আমার প্রিয় গল্প এটি।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো হয়েছে অরিন্দমের আলোচনা। ওকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন