রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

সুমন্ত কুন্ডুর অণুগল্প : প্রতারক



কি দুরন্ত লড়াই ! সামান্য একটা পোকা, ক্ষুদ্র, তুচ্ছ তবু কি অদম্য জেদ। লক্ষপূরণের লক্ষ্যে জীবনের সবটুকু শক্তি একত্র করেছে। একবার নয়, বারবার, ব্যর্থ হচ্ছে তবু হাল ছাড়েনি। আমি অনুভূতিহীন স্থির তাকিয়ে দেখছি।

সাধারণ সন্ধ্যে একটা। একলা নিজের ঘরে জীবনের হিসাবপত্র নিয়ে নানারকম অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত ছিলাম। অজান্তেই চোখ পড়ল দেওয়ালে। পোকাটাকে দেখলাম। মাছির মত ছোট, সরু ফিনফিনে, কাঠি কাঠি ঠ্যাং। একজোড়া পাখা আছে বটে কিন্তু নিতান্তই কৃশাকার।

পায়ে পায়ে দেয়াল বেয়ে উঠছে, সিলিং অব্দি পৌঁছাতে চায়, কিন্তু পারছে না। বারবার পিছলে পরে যাচ্ছে। আমি নিস্পলক দেখছি। অনেকটা উঁচু অব্দি পৌঁছে গেছে এবার, এখানে দেওয়ালটা একটু স্লিপারি। পোকাটা চেষ্টা করছে, ক্ষীণ বুকে ভর করে, সরু পায়ে জোর এনে, তবু এবারেও পারল না, পড়ে গেল।

আবার উঠল, আবার পড়ল, আবার উঠল, আবার পড়ল। বারবার। কখনও মোজাইক টালির বর্ডার থেকে, কখনও আর একটু ওপরে। উঠছে-পড়ছে-উঠছে-পড়ছে। এতবার পতন তবু বিরক্তি নেই, যেতে ওকে হবেই। কি নিদারুণ উদ্যম !

একটু আগে জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখছিলাম এই উদ্যমটাই মূলধন বানাতে পারিনি কখনও। আমি এতবড় মানুষ পারিনি অথচ ওইটুকু ফিনফিনে পোকা পেরে গেল।

খোলা জানলায় ফুরফুরে হাওয়া আসছে। আমার মন ভরে যাচ্ছে। শক্ত হাতের মুঠোয় যেন ধরার মতো কিছু একটা পাচ্ছি। ফিনফিনে একটা পোকা আমায় প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।



পোকাটা আবার নতুন উদ্যমে শুরু করেছে। এবারে অনেকখানি উঠে গেছে। ডেটো, মোজাইক পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত সিলিঙের কাছে। এবার ওর সফলতা নিশ্চিত। সাত-সত্তর-সাতশবারের পরেও, ও জিতবেই। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। পোকাটা এগোচ্ছে। আর কয়েক পা, পৌছে যাবে। ওর উদ্যম, আমার উত্তেজনা। উঠছে, উঠছে। ওই তো সিলিং। আর একটু। হার না মানা লড়াইয়ের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। আমি বিমুগ্ধ, যেন নিজেকেই দেখছি।

ধপাস ! শেষ মুহুর্তে আবার ছন্দপতন। উঁচু সিলিং থেকে, সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত দোরগোড়া থেকে সটান নীচে। উফ! আমি স্তম্ভিত। কি নিষ্ঠুর পতন ! আবার উঠবে পোকাটা ? সাতশো একবার ! লক্ষ্য অজেয় এখনও। আমি অধীর তাকিয়ে আছি পতিত পোকাটার দিকে। হে বীর ওঠো !

নড়ছে, নড়ছে, উঠবে। ওই তো উঠলো। আর তারপরই অমানুষিক ভাষায় তীব্র বিতৃষ্ণা উগড়ে দিয়ে, সিলিঙে একটু বুড়ি ছোঁয়ার মত হুলটা ছুঁইয়ে সাঁই করে জানলা দিয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল।

আমি ব্যাধবাণে পর্যদুস্ত হরিণ-শাবকের ন্যায় নিরুপায় এবং অবুঝের মতো খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এতক্ষণ ইয়ার্কি মারছিল আমার সাথে। ওর যে ডানা ছিল ভুলেই গিয়েছিলাম। সাতশো একবার চেষ্টা করেও যে সিলিঙে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানেই তাচ্ছিল্য ভরে একটু হূল ঘষে দিয়ে, ভেংচি কেটে বেরিয়ে গেল।

আমি পড়লাম বিপদে, বাকি হিসাবপত্র এবার কি করে মেলাব !




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন