সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

আহসান হাবিবের গল্প : বিছা







তখনো ভাল করে ভোর হয়নি, বেশি অন্ধকার সামান্য আলো এই নিয়ে যখন সময়টা ভোরের কিনারে এসে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখন কিসের জন্য বাড়ির বাইরে এসেছিল মনে করার আগেই ভুত দেখার মত চমকে ওঠে রবিউল । বাড়ির পেছনে যে ঝাঁকড়া আম গাছটা তার মোটা ডালে কে যেন ঝুলে আছে ! গলায় তার শাড়ি পেঁচানো, জিভটা বেরিয়ে এসেছে বিচ্ছিরি রকমের । দেখা মাত্র রবিউল প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল, কোন রকমে সামলে নিয়ে সে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে । আমরা আন্দাজ করতে পারি রবিউল হয়তো প্রস্রাব করার জন্য অতো ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পেছনে গিয়েছিল । এছাড়া আর অন্য কোন কারণ থাকার মত কারণ খুঁজে পাচ্ছি না আমরা । কারণ আমরা জানি রবিউল কোন কৃষক নয় যে অতো ভোরে সে লাঙল কাঁধে নিয়ে সামনে দুটো বলদ হাঁকিয়ে মাঠে যাবে, কিংবা তার ঘর লাগোয়া কোন টয়লেট আছে । রবিউল স্বাধীনতা যুদ্ধে তার শরীরে ছ’ ছটা গুলি খেয়ে বেঁচে যাওয়া এক মধ্য বয়সী মানুষ, এখন স্থানীয় হাই স্কুলে পিয়নের চাকরি করে । তার একটাই কাজ, ঘণ্টা বাজানো । ঠিক দশটার সময় সে একবার ঘণ্টা বাজাবে, তারপর ক্লাশ শুরু হয়ে গেলে সে কখন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় এক ঘণ্টা হবে জন্য তার অপেক্ষা করতে থাকে । এগারটা বাজলেই সে দেবে দ্বিতীয় ঘণ্টা, এইভাবে সে বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় একবার করে ঘণ্টা বাজিয়ে যাবে । একটা সেকেন্ড এদিক ওদিক হওয়ার জো নাই । এর বাইরে সে কিছু ফাই ফরমাস খাটে, হয়তো শিক্ষকদের বসবার ঘরটি ঝাড় মুছ করে রাখা, চেয়ারগুলি ঠিকঠাক করা, চা বিস্কিট পানি এগিয়ে দেয়া । তার শরীরে পাক বাহিনীর ছ’ ছটা গুলি খাওয়ার দাগ থাকার কারণে স্কুলের কেউ তাকে আদেশ করে না, বরং সম্মান জানিয়ে কথা বলে । তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানই দেয়া হয় যদিও সে অস্ত্র হাতে কখনো যুদ্ধ করে নাই । না করুক, সে যে পাক বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয়েছে, সেতো স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্যই । যদি যুদ্ধ না লাগতো, তাহলে হয়তো তাকে গুলি খেতেই হতো না । রবিউল কি করে সেদিন বেঁচে গেছিল, এই কাহিনী বহুবার বলেছে, তাকে বলতে হয়েছে ।এখন এই অঞ্চলের প্রায় সব মানুষ জানে রবিউল কি করে সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে এসেছিল । সেই কাহিনী যদি প্রয়োজন হয়, আমরা বলবো উপযুক্ত সময়ে ।
সেই রবিউল ভোরের আলো না ফোটার আগেই বাড়ির পেছনে গিয়ে প্রস্রাব করতেই চেয়েছিল, কিন্তু প্রস্রাব করার আগেই তার চোখে পড়ে যায় সেই অদ্ভুত দৃশ্যটি- কে যেন ডালে ঝুলে আছে । কে ঝুলে আছে এটা দেখার তার ইচ্ছাই জাগেনি, তার আগেই সে অজ্ঞান হওয়ার হাত নিজেকে রক্ষা করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে । ঢুকেই সে কাউকে কিছু না বলে নিজের বিছানায় আবার ঘুম যাওয়ার ভান করে শুয়ে পড়েছে । তার শরীর ততক্ষণে ঘেমে উঠেছে, তার বুক হাপরের মত উঠা নামা করছে, মনে হচ্ছে এখনি তার দম বেরিয়ে যাবে । পাক বাহিনীর গুলিতে সে মারা যায়নি বটে, কিন্তু এখন কোন গুলি না খেয়েই তার মারা যাবার উপক্রম হয়েছে । বাড়ির তখনো কেউ ঘুম থেকে উঠে নাই । এখন চলছে গরমকাল, সবাই বেহুশের মত ঘুমাচ্ছে । সবাই মানে রবিউলের একমাত্র স্ত্রী, এখনো তার কোন সন্তান নেই । রাতে এতো গরম যে ঘুম ঠিকমত আসে না, ভোর রাত্রের দিকে যখন একটু ঠাণ্ডা হয়ে আসে পৃথিবী, তখন চোখে ঘুম এঁটে আসে, সেই ঘুম ভাংতে ভাংতে সকাল সাতটা আটটা বেজে যায় । রবিউলের স্কুল দশটায়, কিন্তু তাকে আরও আগে যেতে হয় । স্কুল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হয় তাকে ।দশটার আগেই প্রায় সব শিক্ষকগণ চলে আসেন, ছাত্র ছাত্রীরা ন’টা থেকেই আসা শুরু করে । এসেই তারা নানা রকমের খেলাধুলা করতে থাকে । কেউ ফুটবল খেলে, কেউ চু বুড়ী আবার কেউ বা গা ছুঁয়া ছুয়ী । স্কুলের পাশেই বিরাট মাঠ, মাঠে সবাই যার যার খেলা নিয়ে মেতে ওঠে । ঠিক দশটা বাজার পাঁচ মিনিট আগেই সবাই যার যার ক্লাশে ঢুকে পড়ে । রবিউল ততক্ষণে তার প্রথম ঘণ্টাটি বাজিয়ে ফেলে ।

রবিউল যে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল প্রাকৃতিক কাজ সারবার জন্য, এখন সেটা সে একদম ভুলে গেছে । তার প্রস্রাবের বেগ হাওয়া হয়ে গেছে, বরং এখন তার মনে হচ্ছে প্রস্রাব করার মত কোন বিষয় শরীর নামক বস্তুটার নাই বা কোনকালেই ছিল না । তলপেট তার একদম খালি, কোন অনুভুতি নাই । সে যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেনি, এটা বুঝতে পারছে, কিন্তু চোখের সামনে থেকে সেই দৃশ্য কিছুতেই মুছে যাচ্ছে না । সে দেখতে পাচ্ছে কে যেন আম গাছের শক্ত মোটা ডালে ঝুলে আছে, গলায় শাড়ি পেঁচানো । যখনই দৃশ্যটা ভালভাবে ভেসে উঠছে, অজ্ঞান হওয়ার মত পরিস্থিত হয়ে যাচ্ছে, সে কোনরকমে তা সামলে উঠছে । তখন থেকে এমনি হয়ে চলেছে, অজ্ঞান হয়ে যেতে যেতে জ্ঞান ফিরে পাওয়া । কি করবে রবিউল ঠিক করতে পারে না । একবার ভাবল তার স্ত্রী দোলেনাকে ঘটনাটি বলে আবার কি ভেবে চুপ করে থাকে । ক্রমে ভোর হয়ে আসছে । পাখি ডাকতে শুরু করে দিয়েছে, বাড়ির ভেতর থেকে মোরগের ডাকও ভেসে আসতে শুরু করেছে । রবিউল তখন বিছানা থেকে উঠে ঘুমন্ত স্ত্রী দোলেনার কাছে যায়, পাশাপাশি খাট, গিয়ে দোলেনাকে খুব নীচু স্বরে ডাকতে থাকে ।দোলেনা অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ খুলে, রবিউলের দিকে তাকায়, তাকিয়েই চমকে ওঠে, সে তড়াক করে উঠে বসে বিছানায়-
‘কি হয়েছে তোমার ? তোমাকে এমন লাগছে কেন’ ?
রবিউল কি করে কথাটা বলবে ভেবে পাচ্ছে না, কথাটা শুনেই যদি দোলেনাও অজ্ঞান হয়ে যায়, তাহলে ? রবিউল চুপ করে থাকে । ফ্যাল ফ্যাল করে দোলেনার দিকে তাকিয়ে থাকে,
‘কি হয়েছে বলবা তো’ ?
রবিউল যেন সম্বিৎ ফিরে পায়, বলে-
‘আমগাছের ডালে কে যেন ঝুলে আছে’ !
‘ঝুলে আছে’ এই কথা শুনেই দোলেনা চমকে ওঠে, কিন্তু জ্ঞান হারাবার মত কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় না, রবিউল বুঝতে পারে দোলেনা তার মত ভীতু নয় । আসলে সেও কি ভীতু ছিল নাকি, পাক বাহনীর অত্যাচার তার ভেতর থেকে সব সাহস নিংড়ে নিয়ে চলে গেছে । দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে আজ কয়েক মাস, তবু সেই দুঃস্বপ্ন থেকে সে এখনো বের হতে পারেনি, জীবনেও পারবে কি না সন্দেহ । দোলেনা বিছানা থেকে নেমে আসে-
‘চল তো কোথায়’ ?
রবিউল নড়ে না, তার যাওয়ার মত সাহস নাই, কিন্তু মুখে বলতে পারে না,
‘কি হল চল’
‘না, তুমি যাও, আমাদের বাড়ির পেছনের আম গাছের নীচে’
দোলেনা কিছু বলে না, সে একাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে, রবিউল বাড়ির মধ্যেই থেকে যায় ।

দোলেনা অকুস্থলে পৌঁছে যায় তীর বেগে, যেন তার কোন ভয়ডর নাই । কেউ ঝুলে আছে শুনেই তার ভেতরে অজানা এক আশংকা উঁকি মেরেছে, সে বুদ্ধিমতী মেয়ে, ভবিষ্যৎ পড়তে পারে সামান্য হলেও । সে ভেবেই ফেলেছে নিশ্চয় কেউ গলায় দড়ি কিংবা অন্যকিছু পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বসেছে । যেহেতু এটা তাদের বাড়ির পেছনে, নিজেদের আমগাছের ডালে, পরে এই নিয়ে অনেক হাঙ্গামা হতে পারে । তাই সে তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছে দেখতে । পৌঁছেই সে দেখে হ্যা সত্যি কে একজন ঝুলে আছে, জিভ বেরিয়ে গেছে, পরনে একটা ফ্রক, পাজামা, বুকে কোন ওড়না নাই । দোলেনা কাছে যায়, ভাল করে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে- সাবিহা, জমির চাচার মেয়ে ।কি করবে এখন সে ? সাবিহাকে ডাল থেকে সে নামানোএ চেষ্টা করে না, ছুটে যায় জমির চাচার বাড়ি । জমির চাচার বাড়ি তাদের পাশের বাড়িটায়, এক মিনিটের মধ্যে ঢুকে পড়ে বাড়িতে । জমির চাচা ঘুম থেকে উঠে লাঙল কাঁধে নিয়ে বলদ দুটিকে গোয়ালের ঘর থেকে বের করছে, দোলেনা দৌড়ে সেখানে জমির চাচার সামনে দাঁড়ায়, জমির চাচা দোলেনাকে দেখে চমকে ওঠে-
‘তুমি এখন এখানে’ ?
দোলেনা কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না, কি করে বলবে সাবিহা আম গাছে ঝুলে আছে, আর বেঁচে নেই ! চুপ করে থাকে, জমির চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে এক বোবা দৃষ্টি মেলে
‘কি হয়েছে দোলেনা, রবিউলের কিছু হয়েছে’ ?
দোলেনা মাথা নাড়ে- না, রবিউলের কিছু হয় নাই ।
‘তাহলে এইসময় কেন এখানে’ ?
‘চাচা, আপনি লাঙল জোয়াল রাখেন, আমার সংগে আসেন’
‘কি হয়েছে আগে বলবা তো । আমার তো জমিতে লাঙল দিতে যেতে হবে’
দোলেনা কিছু না বলে জমির চাচার হাত ধরে টানতে থাকে, জমির চাচা অগত্যা দোলেনার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে । হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে আসে আমগাছের নীচে, দোলেনাকে আর কিছু বলতে হয় না, জমির চাচা দেখে সাবিহা ঝুলে আছে, নিঃসাড়, জিভ বেরিয়ে আছে, চোখ বিস্ফারিত । জমির চাচা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ঝুলন্ত সাবিহার দিকে, কিছু বলে না, কণ্ঠ থেকে কোন ধ্বনি ফুটে না, শুধু দেখতে থাকে সাবিহাকে ।দোলেনা কি করবে ভেবে পায় না, এর মধ্যে গুটি গুটি পায়ে রবিউল এসে দাঁড়িয়েছে, তার মুখমণ্ডল ভয়ার্ত, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ।
জমির চাচা এগিয়ে যায় সাবিহার দিকে, গলা থেকে শাড়ির প্যাচ খুলে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে ।বারান্দায় খাটের উপর শুইয়ে দেয় এবং একটা সাদা কাপড় দিয়ে সাবিহাকে ঢেকে দেয় ।তখন  ধীরে ধীরে রোদ উঠে এসেছে, কি করে যেন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে সাবিহা আম গাছে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে ।জমির চাচার বাড়ি ক্রমে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে ।কেউ বুঝতে পারে না সাবিহার মত মাত্র চৌদ্দ বছরের একটি চঞ্চল মেয়ে কেন আত্মহত্যা করে বসলো ?

এখনো দোলেনার কানে সেই বিকট শব্দ কানে লেগে আছে । মাত্র তো মাস পাঁচেক হয়েছে, কিছুই যেন ধাতস্ত হয়নি, একটা ভয় আতঙ্ক এখনো চোখে মুখে লেগে আছে । শুধু দোলেনার কেন, এই অঞ্চলের যে কোন মানুষের মুখের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায় ভয় তাড়িত মানুষের চেহারা । সেদিন যে ঝড় এই এলাকার মানুষের উপর দিয়ে বয়ে গেছে, তার কোন তুলনা নাই । সারা বাংলাদেশের উপর দিয়ে নয়মাস আর বিশেষ করে অক্টোবরের ৬ তারিখ এই এলাকার উপর দিয়ে একটা হীমশীতল ভয়ার্ত দিন নেমে এসেছিল ।
আগের দিন রাতেই জানাজানি হয়ে গেছিল যে আজ ৬ অক্টোবর পাক বাহিনী আক্রমণ করতে আসবে । এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সারা অঞ্চলে নেমে এলো আতঙ্ক । স্থানীয় স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের যে ক্যাম্পটি ছিল, সেখান থেকে সবাই পিছু সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, কারণ সামরিক শক্তির দিক থেকে তারা সেই সময় সমকক্ষ ছিল না । সন্ধ্যা থেকেই একটা ভুতুড়ে অবস্থায় ছেয়ে গেল সম্পূর্ণ ইউনিয়ন । যে যেমন করে পারলো, বিশেষ করে যারা যুবক ছিল তারা ভারতে চলে গেল, কারণ যুবক কাউকে দেখতে পেলেই তারা মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে মেরে ফেলবে এই ভয় ছিল ।নারী শিশু এবং বৃদ্ধরা নিজের নিজের বাড়িতে ঢুকে আলো নিভিয়ে দিল । তারা যেন ভুলে গেল নিঃশ্বাস নিতে । তাদের ভয় যদি নিঃশ্বাসের শব্দ ওদের কানে চলে যায়, টের পেয়ে যাবে, তখন তাদের আর বেঁচে থাকার কোন উপায় থাকবে না !
কিন্তু রবিউল বাড়ি থেকে কোথাও গেল না, সে বাড়িতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল । দোলেনা যেন প্রমাদ গুনল, ভয়ে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগলো ।
‘তুমি যে বাড়িতে থেকে গেলা’ ? দোলেনা রবিউলের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
‘আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না’
‘এটা তোমার পাগলামি, ভোরে এসে যদি তোমাকে বাড়িতে দেখে, ওরা তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে, মেরে ফেলবে’
‘ফেলুক, তবুও যাবো না’ রবিউলের সহজ নিষ্কম্প উত্তর,
দোলেনা যেন এই উত্তরে পাথর হয়ে গেল, মুখ দিয়ে আর কোন কথা সরল না, শুধু রবিউলের মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল । দোলেনার ভয় সীমাহীন কিন্তু রবিউলের এই সিদ্ধান্তে তার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা সুখের অনুভুতি জেগে উঠলো, কিছু সাহসও যেন বেড়ে গেলো । তার মনে হতে লাগলো যতই বিপদ আসুক, দুজনে মিলে সামলাবে । দোলেনা আর কোন কথা না বলে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো, পাশে রবিউল । দুটি মানুষ যেন এক ঝটকায় বদলে গেছে । একে অপরের নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছে, কেউ কিছু বলছে না । তাদের চোখে কোন ঘুম নেই, ঘুম বলে কোন কিছু আছে, এটা যেন তাদের চোখে কিংবা মস্তিষ্ক ভুলে গেছে । চোখ খোলা নেই, কিন্তু ঘুমও নেই ।
‘ঘুমিয়ে গেছ’ ? রবিউল কথা বলে ওঠে,
‘না, ঘুম আসছে না’
‘আগামীকাল যদি আমাদের ওরা মেরে ফেলে’ ?
‘আমাদের মারবে কেন ? আমরা তো কোন অপরাধ করি নাই’
‘যুদ্ধ এসব বাছ বিচার করে না, দোলেনা’
দোলেনা চুপ করে যায়, যেন এই একটা মাত্র বাক্য তার মুখের সমস্ত ভাষা কেড়ে নিয়েছে । একটু আগে তার বুকে যে সাহস এসে জমা হয়েছিল, এখন সেটা যেন কর্পূরের মত উবে গেল !
‘ধর, আমাকে যদি ওরা মুক্তিফৌজ ভেবে মেরে ফেলে’ ?
দোলেনা রবিউলের মুখ চেপে ধরে । রবিউল আর কোন কথা বলে না, চুপ করে থাকে । রাত বাড়তে থাকে, অন্ধকার যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে। কোথাও কোন শব্দ নাই । রাত যে এমন নিঃশব্দ, তারা জানেই না, আজ জেগে তারা টের পাচ্ছে । বুকের ধুকবুকানি বেড়ে চলছে । রাত যতই গভীর হচ্ছে, ততই তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ধীর হয়ে আসছে ।
হঠাৎ রবিউল গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, সে দোলেনার আরও ঘনিষ্ঠ হয়, তার একটা হাত দোলেনার স্তন স্পর্শ করে, দোলেনা কিছু বলে না, সে চুপ করে থাকে, সে যেন আজ এই হাতের স্পর্শ অচেনার মত অনুভব করে । রবিউল ধীরে ধীরে দোলেনার শরীর থেকে সমস্ত বস্ত্র খুলে ফেলে, দোলেনা কিছুই বলে না । রবিউল জেগে ওঠে যেন অন্য এক মানুষরুপে । এই ভয়ের রাতে রবিউল কিভাবে এমন করে উঠতে পারে, দোলেনার মাথায় আসে না, কিন্তু কোন বাধা দেয় না । রবিউল দোলেনার ভেতর নিজেকে প্রবেশ করায়, দুটি শরীর একে অপরের দেহের সংগে মিশে যায় ।
অবশেষে ভোর আসে, কিন্তু না আসলেই মনে হয় ভাল ছিল । চারদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মর্টারের মুহুর্মুহু শেল বর্ষণে । সারা অঞ্চল যেন ভুমিকম্পের মত কেঁপে ওঠে । কোন পাখির ডাক শোনা যায় না, ঘর থেকে কেউ মাঠে যায় না, দরজা জানালা বন্ধ সব মানুষ ঘরের মধ্যে পড়ে থাকে ।রবিউলদের বাড়ির পিছন দিকে সামান্য একটু দূর দিয়ে একটা বড় রাস্তা চলে গেছে, রবিউল ঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখে বিশাল এক বহর নিয়ে পাক হানাদার বাহিনি এগিয়ে আসছে । সেখান থেকেই মর্টারের শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে । রবিউল ঘরে ফিরে আবার গুটিসুটি মেরে বসে থাকে । দোলেনাও একই ভঙ্গিতে বসে থাকে । আজ তাদের কোন ক্ষুধা নাই, রান্না ঘরে যাওয়ার কোন তাড়া নাই । এমন দিন তাদের জীবনে আর আসেনি ।
কয়েক মিনিটের মধ্যে অঞ্চলটি যেন পাক বাহিনীর কব্জায় বন্দী হয়ে পড়ে । রবিউল অচিরেই দেখতে পায় তাদের বাড়ির পেছনে পাক বাহিনী এসে হাজির হয়েছে, তাদের বুটের আওয়াজ তার কানে আসে । বুক ধড়ফড় করে ওঠে, কি হবে সে বুঝতে পারে না । দোলেনার মুখে কোন কথা নাই । হুড়মুড় করে কয়েকজন পাক আর্মি বাড়িতে ঢুকে পড়ে, তারা রবিউলকে দেখতে পায়, তাকে ঘর থেকে বের করে আনে, দোলেনাকে কিছু বলে না, শুধু দেখে, দোলেনা মুখ নীচু করে বসে থাকে । রবিউলকে তারা টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায় । দোলেনা কিছুই বলতে পারে না, শুধু শুধু চেয়ে দেখে, দেখে তার সহজ সরল স্বামীকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে চলে গেল । তার মুখ যেন রক্তশুন্য হয়ে পড়েছে, তার ভাগ্যে কি আছে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে । সে এখন একা ঘরে ।

গ্রামের সব শেষ বাড়িটি রবিউলদের । বাড়ি থেকে বেরুলেই বিশাল মাঠ, মাঠের ওপারে ঘন সবুজ বন, তার ওপারেই ভারতীয় বর্ডার । পায়ে হেঁটেই যাওয়া যায় । প্রায় সবাই চলে গেছে, গ্রামে এখন যুবকদের মধ্যে কেউ নাই, কিছু কিশোর থেকে গেছে । রবিউল যেন নিজের হাতে নিজেকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিল, অথচ দোলেনার কান্নারও যেন অধিকার নাই, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ঘরের মধ্যে লুকিয়ে আছে । আবার কখন এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়, বলতে পারে না । দোলেনা যেন মৃত্যুর ঠিক কাছেই দাঁড়িয়ে আছে । বাড়ির পেছনে পাক বাহিনীর বাজখাই গলা শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে গ্রাম থেকে যেন অনেককে ধরে নিয়ে এসেছে । দোলেনা ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতর থেকে ফুটা দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে, দেখে কারা যেন মাটি খুঁড়ছে । কেন মাটি খুঁড়ছে, দোলেনা বুঝতে পারে না । দোলেনার বাংকার সম্পর্কে কোন ধারণা নাই । বাংকারের মধ্যে লুকিয়ে থেকে ওরা যে বর্ডারের দিকে মর্টার এল এমজি তাক করে রাখবে, এটা সে ধারণা করতে পারে না । সে শুধু দেখে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে চলেছে ।দোলেনা চুপ করে বিছানার উপর শুয়ে থাকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ।
বুটের আওয়াজ পেয়ে সচকিত হয়ে ওঠে দোলেনা, চোখ মেলে দেখে তিনজন পাক আর্মি তার সামনে দাঁড়িয়ে, সংগে কালো পোশাক পরা একজন বাঙালি, সে রাজাকারের নাম শুনেছে, চোখে দেখেনি, মনে মনে ভাবল এই লোকটাই রাজাকার । সেই দোলেনাকে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে বলল । দোলেনা ভয়ে ভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, সেই রাজাকার তাকে নির্দেশ দিল-
‘এই তোমার নাম কি’ ?
‘দোলেনা’
‘বাড়িতে আর কে আছে’ ?
‘কেউ নাই, স্বামীকে একটু আগে ধরে নিয়ে গেছে’- দোলেনা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দেয় । পাক আর্মি তিনজন ওদের কথা শুনে । দোলেনা তাকিয়ে দেখে এই তিনজন আর্মির গায়ের রঙ ফর্সা নয়, কালো ।দোলেনার নিজের গায়ের রঙও বেজায় কালো, এই নিয়ে তাকে প্রায়ই খোঁটা শুনতে হয় । সে শুনেছে পাঞ্জাবীরা লম্বা ফর্সা হয়, তাহলে কি এরা বিহারী ? হতে পারে, বিহারী তিনজন দোলেনাকে কিছুই বলল না, যা বলার সব সেই রাজাকারটা বলল । দোলেনাকে রান্না ঘরে গিয়ে যা আছে তাই রান্না করে দিতে বলল । দোলেনা যেন প্রাণ ফিরে পেলো, সে ভেবেছিল হয়তো তাকেও তার স্বামীর মত ধরে নিয়ে যাবে । সে রান্না ঘরে গিয়ে রান্না করতে বসলো । ততক্ষণে বিহারী তিনজন ফিরে গেছে বাড়ির পিছনে, শুধু রয়ে গেছে সেই রাজাকার । সে তাকে কি রান্না করতে হবে তার ফরমায়েশ দিতে থাকে । কিন্তু দোলেনার বাড়িতে তো তেমন কিছু নাই, ভোরবেলা তারা গমের রুটি বানিয়ে খায় । রাজাকার তাকে রুটি আর ডিম ভেজে দিতে নির্দেশ দিল, দোলেনা সেটাই রান্না করতে শুরু করে দিল । রান্না শেষ হলে রাজাকারের হাতে তুলে দেয় খাবার, নিজের জন্য বুদ্ধি করে কয়েকটা রুটি আর ডিম রেখে দেয় । রাজাকারটা চলে গেলে সে তখন রুটি আর ডিম মুখে দেয় । মুখে দেয়া মাত্র তার রবিউলের কথা মনে পড়ে যায়, মুখ থেকে খাবার বেরিয়ে আসে, সে থালায় খাবার ঢেকে রেখে দেয় । কিন্তু রবিউল কি আর ফিরে আসবে ? কে জানে ?
মাঝে মাঝেই গুলির শব্দ ভেসে আসে, যতবার সে গুলির শব্দ শুনে, ততবারই তার বুক ধক করে ওঠে- এই বুঝি রবিউলকে তারা মেরে ফেললো ।গ্রামের ভেতর কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, এই যে গুলির শব্দ হচ্ছে, কে মারা যাচ্ছে, কাকে নির্মমভাবে হত্যা করছে, কিছুই বুঝার উপায় নাই । বাড়ি থেকে বের হলেই দোলেনার মনে হয় আর্মিরা তাকে মেরে ফেলবে কিংবা রবিউলের মত কোথাও ধরে নিয়ে চলে যাবে । সে না খেয়ে মুখ বুজে পড়ে থাকে । মাঝে মাঝেই রাজাকারটা এসে রান্নার ফরমায়েশ দিয়ে যায় । দুপুর বেলা সে কোথা থেকে কয়েকটা মুরগী নিয়ে এসে বলল- ‘রান্না কর, এখনি’ ! দোলেনা কোনকিছু না বলে রাঁধতে শুরু করে দেয় । সে ভাবতে থাকে রান্না করে যদি তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সেটাই ভাল, এখন বেঁচে থাকাই আসল কথা । রান্না শেষ হলে রাজাকারটা এসে নিয়ে চলে যায় । সে আশ্চর্য হয় এই রাজাকার কিংবা বিহারীরা তাকে কোনকিছু বলে না । প্রথমেই এসে একদল মারমুখী পাক বাহিনী রবিউলকে ধরে নিয়ে চলে গেছে । রবিউল কি বেঁচে আছে ? দোলেনার বুক কেঁপে ওঠে অজানা আতংকে ।  

সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে, দোলেনা ঠিক বুঝতেও পারে না এখন সকাল নাকি দুপুর নাকি সন্ধ্যা । দিনের আলো দেখে সে বুঝতে পারে এখনো সন্ধ্যা নামেনি, তবে লক্ষ্য করে আঁধার হয়ে আসছে । ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, চারদিক নীরব, নিথর, আজ কোন পাখিও ডাকছে না, কোন কিচিরমিচির শব্দও নাই । ওরাও যেন বুঝে ফেলেছে কোন শব্দ করা যাবে না । এই অঞ্চলে এখন নেমে এসেছে এক ভয়াবহ সময় । প্রতিদিন ভোরবেলা তাদের আঙিনায় নানা রকম পাখি এসে বসে, আজ কোন পাখি আসেনি, আঙিনা একদম ফাঁকা, কোন চঞ্চলতা নাই । দেখতে দেখতে রাত নেমে এলো । দোলেনার জীবনে এমন দিন কখনো আসেনি, এই যে রাত সামনে, এমন রাতও আসেনি । একলা একটা বাড়িতে সে কি করে থাকবে ? ভাবতেই তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে । রাতে যদি হানাদাররা এসে হামলা করে, তখন সে কি করবে ? ভয়ে কুঁকড়ে থাকে । আজ সারাদিন কিছুই খায়নি, তবু তার পেটে কোন ক্ষুধা নাই যেন । ভয় দিয়ে পেট ভরে আছে । সে ভাবতে থাকে রাত কি পার হবে ?

রাত পার হয়, দিন আসে, সেই রাজাকার আসে, ভোরবেলা রান্না করে দিতে বাধ্য হয় দোলেনা, তারপর দীর্ঘ সময় কেউ আসে না । দুপুর গড়িয়ে এখন সম্ভবত বিকেল, দোলেনা ঘর থেকে বের হয়ে আসে, বাড়ির পেছনে উঁকি দিয়ে দেখে কোথাও কেউ নেই । দুপুর থেকে কোন গুলির শব্দও সে শুনতে পায় না । তার বুক হাল্কা হয়ে আসতে থাকে । কিন্তু রবিউলের জন্য তার মন কেমন করতে থাকে, সে কি আদৌ বেঁচে আছে ?
কি করবে এখন দোলেনা ? সে কি ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসবে নাকি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে ? তার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে । তার ইচ্ছা করছে এখনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের আর সবাই কেমন আছে দেখে আসতে, কিন্তু পেঁচিয়ে থাকা ভয় তাকে সে সাহস দেয় না । উঁকি দিয়েই আবার সে ফিরে আসে ঘরে, ঘরের মধ্যে এবার সে পায়চারি করতে থাকে । কি করবে এখন সে ?
কাল সকাল থেকে কারো সংগে দেখা নাই, কেউ ভুল করেও এই বাড়ির দিকে পা রাখেনি । কি করে রাখবে ? সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, কেউ জানে না বেঁচে থাকবে কি থাকবে না । সে কি একবার জমির চাচার বাড়ি যাবে, দেখে আসবে সাবিহারা কেমন আছে ? না, কে জানে কোথায় কে আছে ? বের হলেই যদি আবার পাক আর্মিদের চোখে পড়ে যায় ? সে ঘরের মধ্যেই বসে থাকে । কোথাও কোন সাড়াশব্দ নাই, মনে হচ্ছে ঝড়ের পর সবকিছু থেমে গেছে । বাতাস স্থির, কোন গাছপালা নড়ছে না, কোন পাখির ওড়া উড়ি নাই । একটা নিস্তব্ধতা যেন এই অঞ্চলকে পেঁচিয়ে ধরেছে ।
যত সময় যায়, দোলেনার ছটফটানি বাড়তে থাকে । রবিউল এখনো ফিরে আসে নাই, তাকে কোথায় ধরে নিয়ে গেছে সে জানে না । মাঝে মাঝেই স্কুলের দিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছিল । তাকে কি তাহলে স্কুলের মাঠে নিয়ে গেছে ? আরও অনেককে ধরে নিয়ে এসেছে ? তাদের ধরে নিয়ে এসে একসঙ্গে গুলি করে মেরে ফেলে দিয়েছে ? কিছুই জানে না দোলেনা । রবিউলের জন্য তার বুকের ভেতর কুঁকড়ে যেতে থাকে । তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে চায়, কাল থেকে মুখে দানা পড়েনি, অথচ ক্ষুধা নাই, খাওয়ার কোন ইচ্ছাই নাই । বাড়িতে কোন খাবারও নাই, যা ছিল সব রান্না করে দিয়ে দিয়েছে ।
সেই দুপুর থেকে দোলেনা কারো সাড়াশব্দ পাচ্ছে না । সে ভাবে তাহলে কি পাক বাহিনী চলে গেল এলাকা ছেড়ে ? স্কুলে যে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প ছিল সেটা কি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ? এটাই কি ওদের লক্ষ্য ছিল ? মুক্তিবাহিনী তাদের প্রতিরোধ করার কোন চেষ্টা করেনি, আগের রাতেই ক্যাম্প ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে । হঠাৎ দোলেনা কার যেন পায়ের শব্দ পায়, সে সচকিত হয়ে ওঠে, সেই রাজাকারটা নয় তো ? আবার ভয় তাকে ঘিরে ধরে, সে ভেবেই বসেছিল তারা চলে গেছে । সে দম বন্ধ করে বসে থাকে ঘরে ভেতর । তার নাম ধরে কে যেন ডাকছে, মনে হচ্ছে জমির চাচা, জমির চাচার গলা শুনে তার ধড়ে পানি আসে, সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, দেখে ঠিকই জমির চাচা দাঁড়িয়ে । জমির চাচার দিকে তাকিয়ে দোলেনার মনে হয় যেন একটা দিনের মধ্যে একটা মানুষের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে । শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে যাওয়া একজন মানুষ । কে জানে কি অত্যাচার করেছে তার উপর ?
‘মা, সাবিহাকে দেখেছ’ ? জমির চাচা অসহায়ের মত জিজ্ঞেস করে । কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কি দেবে দোলেনা ! সে তো কাল থেকেই এই ঘরে একরকমের বন্দী হয়ে আছে । কে কোথায় আছে কিছুই জানে না সে । রবিউল কোথায় এটাই সে জানে না, সাবিহা কোথায় কি করে বলবে ?
‘না তো চাচা, সাবিহা তো এখানে আসেনি’
জমির চাচা আর কিছু বলে না, ফিরে যায়, দোলেনা আর কিছু জিজ্ঞেস করতেও পারে না, চুপ করে থাকে, জমির চাচার চলে যাওয়া দেখে, একটা ভেঙে পড়া মানুষকে দেখে ।
কি করবে এখন দোলেনা তাহলে ? এখন তার মনে হচ্ছে নিশ্চিত পাক বাহিনী এলাকা ছেড়ে চলে গেছে । সে ঘর থেকে আবার বাইরে বেরিয়ে আসে, ভয়ে ভয়ে পেছন দিকে উঁকি মারে, না কেউ নাই । যেখানে মাটি খুঁড়ে বাংকার তৈরি করেছিল, সেদিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নাই, সুনসান নীরবতা । একবার তার মনে হল বাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়ে স্কুলের দিকে যায়, আবার সে থমকে দাঁড়ায়, না, যদি ঐদিকে এখনো ওরা থেকে যায় ? সে বাড়ির পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে । এক পা দুই পা করে, ভয়ে ভয়ে । হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে যায় ব্যাংকারগুলোর দিকে । বেশ কয়েকটা বাংকার খোঁড়া, একদম কাছে গিয়ে দেখে না কেউ নাই, খালি পড়ে আছে ব্যাংকারগুলো । দোলেনার কি যেন হয়, সে একটা বাংকারের মধ্যে উঁকি মারে, উঁকি মারতেই তার চোখে পড়ে সাদা কি যেন একটা পড়ে আছে ! এদিক অদিক তাকিয়ে দেখে সে, না কোথাও কাউকে চোখে পড়ছে না । সে বাংকারের মধ্যে নেমে পড়ে, হ্যা, সেই সাদা জিনিসটা আর কিছু নয় একটা বিছা ! বিছাটা হাতে নিয়ে সে স্বগদোক্তি করে- ‘এটা তো সাবিহার বিছা’ !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন