সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২০

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরীর অণুগল্প : যুগসন্ধি


 
লাট্টু খেলার জিনিসগুলো গুছিয়ে রেখে গল্প শুনতে গেল বিলিদের বাড়িতে । লাট্টুর দাদু অর্থাৎ মধু বাবু বসে ছিলেন ওদের মাটির ঘরের বারান্দায়। এখানে দেওয়ালের গায়ে কত  ছবি আঁকা, সব এঁকেছে লাট্টু। একটা এরোপ্লেন, একটা টিভি, একটা কারখানা । আরও যে কত কিছু! অথচ এসব কোনও দিন দেখেনি ও। সেই কবে পাওয়ার গ্রীড গুলো বসে গেলো একে একে । মানুষই থাকলো না বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার। এয়ারপোর্টে খেলনার মতো পড়ে আছে জং ধরা এরোপ্লেন । কারখানাগুলো একে একে  বন্ধ হয়ে গেল । মোবাইল কম্পিউটার সব হারিয়ে গেল কেমন করে। এক অতি উন্নত সভ্যতাকে চোখের সামনে মধুবাবু দেখলেন পাঁচ হাজার বছর পেছনে চলে যেতে। অথচ উনি কিছুই লিখতে পারলেন না। এক সময় কত সাহিত্য আসরে গেছেন !  কত লেখা বই হয়ে বেরিয়েছে, এমনকি অনলাইনেও --।  আর এখন!  ভাবতেই পারেন না লেখার কথা। কাগজ নাই,কলম নাই। সব কেমন এক ঝটকায় " নাই"  হয়ে গেল।  একটা মহামারী ----।

কি মনে হল , আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন মধু বাবু। ঘরের  বাঁশের দরজাটা বন্ধ করতে করতে বিরবির করছিলেন। কে ভেবেছিল একদিন গর্বের প্রতীক ওই উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যাবে আর সব ছেড়ে চলে আসতে হবে এই মাটি দিয়ে তৈরি কলোনিতে। পাহাড়ের গায়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিয়ে তৈরি এই সরকারি ক্যাম্প!

  মধুবাবু বিলিদের ঘরের সামনে পা রাখলেন। দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেছে, হাল্কা ঠান্ডার রেশ ছড়াতে শুরু করেছে। বিলির ঠাকুমা গল্পের ঝুলি খুলে বসেছেন, ওকে ঘিরে কলোনির সব বাচ্চারা। অবশ্য কটাই বা বাচ্চা আছে আর এখানে! বড়জোর  বারো কি পনেরো! কয়েকটা বউ আর পুরুষ মানুষকেও দেখা গেলো অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে বিলির ঠাকুমার গল্প শুনছে। ঠাকুমা বলছেন ----- তখন আনন্দ ফোন করে মিস্টার রায়কে  বলল, আমি আর আপনার প্রাইভেট কলেজে পড়াতে পারব না। এবার থেকে আমি বিনা পয়সায় গরিব ছেলে মেয়েদের পড়াব। বলেই রয়াল এনফিল্ড স্টার্ট করল। এটা একটা সিনেমার গল্প, মধুবাবু দেখেছিলেন।

   আজ লাট্টু বাড়ি ফিরে  নিশ্চয় স্মার্ট ফোনের ছবি আঁকবে, বাইকের ছবি আঁকবে। চোখে জল চলে এল। হঠাৎ কি মনে হতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ।  তিনি জানেন না কবে সব আগের মতো হবে, কতদিন! দশ  বছর নাকি দশ হাজার বছর। এই বিগত সভ্যতার কোনও কিছু কি আর অবশিষ্ট থাকবে তখন! এমন কি কোনও স্মৃতিও হয়তো ---। তার আগে ওনাকে লিখে রাখতে হবে সব। কোথায় জানেন না, কিভাবে জানেন না কিন্তু উনি লিখে রাখবেন বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ইতিহাস। না হলে তখন কেউ আর বিশ্বাস করবে না আমরা একটা অতি উন্নত সভ্যতার যুগ পার করে স্থাপন করেছিলাম অন্য একটি শিশু সভ্যতা।

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২০

অলোক গোস্বামীর অণুগল্প : হারানো-প্রাপ্তি-নিরুদ্দেশ।। পারক গল্পপত্র



লকডাউন যে শেষ হবে, সত্যি বলতে কী, ভাবতেই পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল হয়ত তার আগেই শেষ হয়ে যাব। যদিও আমার কোনো উপসর্গ ছিল না তবু জীবনের কি কোনো গ্যারান্টি থাকে?

যাক, বেঁচে তো গিয়েছি শেষ পর্যন্ত সুতরাং এটাকে সেলিব্রেট করতেই হবে। কতদিন বন্ধুদের মুখ দেখি না। বেঁচে থাকার অন্যতম একটা কারণ তো বন্ধুসঙ্গও।

দরজা খুলেই আমাকে দেখে নিলয় অবাক। বললো, সদ্য দুঃসময় কেটেছে, এত তাড়াতাড়ি না বেরুলে চলছিল না?

আমি হাতের প্যাকেট থেকে জনি ওয়াকারের বোতলটা দেখিয়ে বললাম, আমার চলছিল, এই সাহেবের চলছিল না।

চোখ চকচক করে উঠলো নিলয়ের। এটুকু দেখার জন্যই বেঁচে থাকা।

নিলয়ের বউয়ের রান্নার হাত দারুণ। সামান্য ভাজাভুজিও এত তরিজুত করে বানায় যাকে বলে লা জবাব। এক লিটারের বোতলের অধিকাংশটাই নিমিষে উড়ে গেল। হয়ত পুরোটাই যেত কিন্তু বাড়ি থেকে ঘনঘন ফোন আসছে। রাস্তা নাকি পুরো ফাঁকা হয়ে আসছে। ওফ, লোকের আর ভয় গেল না!

বাড়ি যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই নিলয়ের বউ কী যেন একটা ইশারা করলো নিলয়কে। কিন্তু ব্যাটা ততক্ষণে এমন বেতালা যে খেয়ালই করলো না। অগত্যা আমিই বললাম, কিছু বলবে?

নিলয়ের বউ লজ্জিত গলায় বললো, তেমন কিছু নয়। গ্লাস, প্লেট আর চামচগুলো সেন্টার টেবিল থেকে নামিয়ে এক কোণে রেখে দিলে ভালো হয়।

অবাক হয়ে তাকালাম নিলয়ের দিকে। নিলয় সমর্থন করলো বউকেই, হ্যাঁ হ্যাঁ রেখে দে। সাবধানের মার নেই।

আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ঠাকুমার কথা। ঠাকুমা বলতেন, দেশের বাড়িতে নাকি নীচু জাতের লোকদের খাওয়ার পর বাসন মেজে দিয়ে যেতে হোত। ওদের মধ্যে কেউ নিলয়ের আত্মীয় ছিল নাকি! তাদের উত্তরপুরুষ হিসেবে নিলয় শোধ তুলছে?

বললাম, বাসনগুলো মেজে দিয়ে যাই?

তেড়ে এলো নিলয়, রান্নাঘরে ঢুকবি, মানে! ইয়ার্কি হচ্ছে? মদ খাওয়ানোর বাহানায় মেরে যেতে চাইছিস? যা বলা হয়েছে সেটুকু করে আপাতত বিদেয় হ। কাল ঝি বেটি এসে মাজবে। এখন আমাকে সারা ঘরে স্যানিটাইজার ছিটিয়ে তারপর স্নান করতে হবে। যা পালা।

বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২০

করোনা ভাইরাস : ডঃ শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় (উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ)

করোনা ভাইরাস ও পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপট


করোনা ভাইরাস পরিবারের প্রথম ভাইরাসের সংক্রমণ হয় 2002 সালে। সার্স (Severe acute respiratory syndrome ) ভাইরাস। পরে মার্স (MIDDLE EAST RESPIRATOY SYNDROME) ভাইরাস। জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে এই ভাইরাস ফিরে এসেছে কোভিড 19 নামে আরো বেশি সংক্রামক হয়ে।

এই ভাইরাস গঠনগতভাবে ফ্যাট এর ওপর নির্ভরশীল, তাই সাবান এর শত্রু। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুলে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো যাবে।

করোনা সংক্রমণজনিত লক্ষণ : সর্দি, মাথাব্যথা, গলাব্যাথা, জ্বর, কাশি, গন্ধ পাওয়া কমে যাওয়া ইত্যাদি।

ঝুঁকি বেশি : ডাযাবেটিস, হাইপারটেনশন. হাঁপানি, ষাটোর্ধ বৃদ্ধ /বৃদ্ধা।

করোনা ভাইরাস সক্রিয় থাকে:
দরজার হাতল- ৫ দিন
কাঠের আসবাব- ৪ দিন
লিফ্টের বোতাম - ৩ দিন
প্লাস্টিক /স্টীলের জিনিস - ৩ দিন
কার্ডবোর্ড - ১ দিন
কাচের জিনিস - ৫ দিন
কাগজ - ৫ দিন

সাবধানতা :
1) বারবার হাত সাবান দিয়ে ধোবেন।
2) স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার  করবেন।
3) মোবাইল নিয়ে বাইরে
যাবেন না।
4) হাতে আঙটি পরবেন না।
5)বাইরে থেকে যা কিছু কিনে আনবেন  সাবান জলে ধোবেন, না সম্ভব হলে স্যানিটাইজার দিয়ে মুছে রোদে রাখুন দুদিন।
6)বাইরে বের হলে মাস্ক অবশ্যই পরবেন।
7) শারীরিক দূরত্ব ২ মিটার রাখুন।
8) বাইরে বের হলে কোনো রেলিঙ-এ, বাসে, ট্রেনে হাতলে হাত রাখবেন না, হাত পড়লে স্যনিটাইজার দিয়ে তখনই হাত পরিষ্কার করুন।

এখনো করোনা ভাইরাসের কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক বের হয়নি, তাই উপরোক্ত সাবধানতাগুলি মেনে চলুন। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আমরা আশাবাদী, একদিন নতুন সূর্য উঠবেই, ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হলেই আবার আমরা ভালোবাসার পৃথিবীটাকে ফিরে পাবো।



মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২০

অমিত মুখোপাধ্যায়ের গল্প : লোহাগড়ের চুম্বকটান


সুরেলা বলেছিল,বদলি হয়ে তরাই এলে,দেখি কোথায় কেমন ঘোরাও!কাজ বাঁচিয়ে সেসব দেখার আয়োজন করতে বেশ কসরত করতে হয়েছে ইমনকে।ছেলে গবেষণা করতে বাইরে গেছে অনেক দিন।যা কিছু কাজ সেরে একা ঘরে সময় কাটানো সুরেলার পক্ষে কঠিন।একঘেয়েমি কাটাতে সে হাওয়াই মহলের অন্য বাসিন্দাদের সাথে আলাপ জমায়।বেশির ভাগ মহিলার সন্তান ছোট,তারা তাই ব্যস্ত শিক্ষা,পড়ুয়া-বীক্ষা,পরীক্ষা,স্কুল থেকে ফেরার প্রতীক্ষা,খাওয়ানোর পরই নির্জন কক্ষাগত করে লক্ষ্যাধিক জ্ঞান চাপানোর দীক্ষা দেওয়া নিয়ে।নব্য মায়েদের এমন ত্যাগ-তিতিক্ষার বহর দেখার পরে যখন খুশি তাদের সঙ্গ ভিক্ষা করা চলে না।সামান্য যে-টুকু মেশার সুযোগ থাকে তাতেই  অনেক কিছু পাতিয়ে ফেলেছে সে,অবশ্যই নতুন যুগের কায়দায়।কাছেই থাকা বাড়িওলির মেয়ে কমবয়সী তো কী,তাকে বন্ধু করে নিয়ে তার স্কুটির পেছন থেকে শহরের হরণপ্রবণ হাওয়াই-বাজারগুলো চিনে নিয়েছে।স্বাদ-খ্যাত সূপকার-বিপণী থেকে শুরু করে সৌন্দর্য বাড়ানোর রূপ-কার চেনানোর উপকারও করে দেয় সেই মেয়ে।কিন্তু তারও বাচ্চা আছে,দিদিমার কাছে কতক্ষণ থাকবে?তাই  তার পরও সখীসমাবেশ চেয়ে আসনের প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছে সে।সেখানে নানা বয়সী পৃথুলার জটলায় গলা মিলিয়েছে।

  নতুন বছরে শীত জাঁকিয়ে এলে সুরেলা এখন জানতে চায়, দেখব কেমন জমকালো জায়গায়  পিকনিক কর তোমরা!কলকাতার মতো ওই সব ঘরসর্বস্ব গঙ্গাধার,বাড়িপ্রধান বাগান বা জুটমিল জুটিয়ে নিয়ে একঘেয়ে মুখস্থপড়া সিলেবাস যেন না-হয়!...সেই শুনে ইমন দপ্তরের লোকেদের সাথে ছুটছে,যখন যেখানে তারা স্থান নির্বাচনে চলেছে।চেষ্টা করছে চোখে-লাগা স্পট যাতে হয়।

ইমনের কাছে এ আরেক রকম ভ্রমণ। লোকে বলে প্রাচুর্যের প্যাঁচঘোচ,কিন্তু বলে না বেড়ানোর বেড়া-ভাঙার কথা।ঘুরতে বেরোলেই উত্তরবাংলার তরাই ঠিক ত্বরায় তরিয়ে দেয়।যে কোন পথের যে কোন পাশে যেতে থোড়াই ডরাই,এই কথা বলে তখন চড়াই ভেঙে এগিয়ে বড়াই করে বলতে হয়,জানো কি, ঘোরা কত রকম?এই একটু বেরিয়ে পড়া,বা ঢুঁ মেরে আসা,নয়ত এক বেলার খেলা,কর দিনভর সফর, টেনেটুনে  দু'দিনের পর্যটনে,ব্রেক নিয়ে  দিন তিনেক ট্রেক,অথবা ভেবেচিন্তে দীর্ঘ ভ্রমে ভ্রমণঃ এ সব তার সামান্য নমুনা মাত্র।

এর ঠিক পাশাপাশি চলে অন্যান্য নামকরা কেন্দ্রে যাওয়া, কম-পরিচিত ঘুপচিগুলোয় পা ফেলা।শহরের অভিভাবকের মতো ভূমিকা পালন করা চারণিক প্রৌঢ়ের প্রশ্রয় পেয়েছে ইমন।তিনি শিক্ষকতার সাথে সারা জীবন ধরে পায়ে ও চাকায় তরাই চষে ফেলেছেন।কাগজে লিখে কিছু অচেনা কেন্দ্রকে পরিচিত করেছেন।নতুন জায়গার হদিশ দিয়েছেন।তাঁর কাছ থেকে জেনেও  কত দিকে গেছে সে।এক দিকে ভ্রমণ,অন্য দিকে কারও একাকীত্ব কাটানো।নিবিড় ভাবে টানা ঘুরে দর্শনীয় অঞ্চলকে বিস্তারিত জানার এমন সুযোগও তো জীবনে বারবার মেলে না!যে দিকে যাও,পথের দু’পাশে ছড়িয়ে আছে নতুন ভূখণ্ড,ঢুকে যাও সে দিকে,হতাশ হতে হবে না!

    আবার এদিকে সেই চলো যাই বনভোজনের কোণের খোঁজেতেও নানা রকম অভিজ্ঞতা জমতে থাকে।।বৃষ্টির সেই প্রাতঃ-স্নাত পথে স্মরণীয় আকৃতি প্রকৃতি দেখে আবিষ্কারের মেজাজে।কত জায়গা কত অযোগ্যতায় হয়ে গেল নাকচ,নাক উঁচু করে কিছু ময়না-তদন্ত,তারপর তিস্তা,বিস্তারহীন,জল আটকে রেখে উদোম পড়ে আছে বাঁধের পরের নদী। নগ্ন বালুশরীরে কত রকম পাথরের বিন্যাস।হাড়গোড় পড়ে আছে যেন!কোথাও বহিরাগত দেখে আর্তনাদ করা দেশি মুরগি এই হাজারো কার্ড-গজানো যুগে পরিচয়ের তাস দেখাবার ভয়ে পাখার নিচে  লুকিয়ে রাখে তার শিশুদের।বনবাংলোর তল্লাশে গিয়ে বাগানের দিশি আমলকি পেড়ে খাওয়া আর অবধারিত ভাবে মনে পড়াঃ পেয়েছে খবর পাতা খসাবার সময় হয়েছে শুরু!সত্যি কি হিমেল হাওয়ায় আমলকির মিহি চিকন পাতা কাঁপে!তত টক নয় বলে ইমনের  জিভ স্বাগত জানায় স্থানীয় ছোট আমলকির অম্লমধুর রসকে।অন্য কোন খোঁজের জায়গায় মেঘ কুয়াশা সরিয়ে বাঁকা ধারালো পথের শেষে দেখে কমলালেবুর মোহময় দোলন।ছোট বড় বর্তুল বাসন্তী রঙের কমনীয়তা-ঝোলানো গাছের সার সুবাস ছড়িয়ে বলেঃ

আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

কমলা রঙ নাকি আবেগ,কামনা আর নৈকট্যের প্রতীক!অথচ জীবনানন্দ তাতে অভূতপূর্ব কারুণ্য পেলেন,চেনা জনের আরোগ্য পেলেন।…এত লোভনীয় জমির পাশেও পিকনিকের অনুমতি মেলে নি।আরও খোঁজো,এত আছে বিকল্প!তারাপদ  তো রায় দিয়েইছেনঃবিকল্পের কোন পরিশ্রম নেই !

  ... তাই তো সে বলে এ বঙ্গের সাড়া মেলে যে কোন অজুহাতে বেরিয়ে পড়লেই!জবাব মেলে।তাই তো উত্তর-বঙ্গ সর্বদিকে উত্তরময়।তোমার পা যদি প্রশ্ন করে,তবে প্রান্তর,প্রবাহিণী,প্রপাত,পাহাড় থেকে শ্যামপর্ণী বাগিচা সমস্বরে দেবে উত্তর !
এই ভাবে দপ্তরের বনভোজনের জায়গা বাছাই একেক বার অদ্ভুত নানা কারণে বাতিল হয়ে চলেছে।তা ছাড়া যে কোন ভালো স্পট হলেই তো হবে না,বউ-বাচ্চার দল যাবে,কাছে হতে হবে,ছাউনি চাই,নিরাপত্তা চাই! কালিঝোরার ভেতর দিকে বনবাংলোর তিস্তাপারের বৃত্তান্ত অন্ত হলো, বড়সড় দল তাদের এমন সাজানো বাগানে মত্তহস্তীর তছনছ করে ফেলতে পারে, এই আতঙ্কে।নিউ চামটার চা-সাম্রাজ্যে সাঁতার-সরোবর, ব্যাডমিন্টন-আয়োজন,মাঠসহ সুসজ্জিত ব্যবস্থা গেল "অত কাছে সমতলের গেঁয়ো যোগী"-র তাচ্ছিল্যে।তারপর সৌরেনি বাতিল হলো,তারা খুব বেশি দর দেখানোয়।টিপুখোলা পছন্দ হলেও তেমন আস্তানা কিছু নেই,তা ছাড়া বুনো জন্তুর জায়গা,হাতি করিডর! চলছে রোজ নতুন খোঁজ।আলোচনায় অন্যান্য অনেক নাম উঠে এসেছে,নানা অসুবিধা বা অজুহাতে ধপাস্ করে পড়েও গেছে।তার মাঝে লোহাগড় ইমনের কাছে  অ-শোনা।হয়ত এভাবে প্রসঙ্গ না-উঠলে লোহাগড়ের নামই শোনা হতো না!

গত কয়েক মাসে চাপা বিরোধ চলেছে স্বামী-স্ত্রীতে।বিয়ে পরে হওয়া সখীদের কলকাতায় ছেড়ে এসে এখানে সুরেলা এখনো ক্ষতিটা পূরন করে উঠতে পারে নি।তা ছাড়া তার আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে চট করে অথবা বারবার শিলিগুড়িতে আসা কঠিন।ছেলে প্রথম দিকে বছরে এক বার করে হলেও দেশে ফিরেছে।এক বার তারা দু’জনেও গেছে।অথচ গত দু’আড়াই বছর দেখাসাক্ষাত নেই মায়ে-পোয়ে।ইমনের মনে হয় বিরোধের আদত উৎস সেটাই।তা ছাড়া ছেলের বিয়ে,বাড়ি সারিয়ে অনুষ্ঠানের উপযুকত করে তোলা- সে সব চিন্তাও উদ্বেগে রেখেছে তাকে।

এই সব সাত-পাঁচ মাথায় রেখে ইমনের মনে হয়,বনভাতির দেরি আছে, যাই তো দেখে আসি স্বাধীন চড়ুই হয়ে, যেখানে ভাতি হলো-না, কোন সে জায়গা!অতএব, হলেও-হতে-পারত-সারাটি–দিনের-প্রমোদ, তেমন এ  সফর, একটি বেলায় হ্রস্ব,কিন্তু সাথে আছে একলা সুরেলা,তাই গভীরতায় দীর্ঘ।প্রকৃতি যদি ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ থেকে জীবনানন্দের দুঃখ ভোলাতে পারে,তাদের ওপরে কি একটু কৃপা ছড়াতে পারে না!সুরেলার গভীরের শূন্যতার বহর কমিয়ে দিতে পারে না!

মহানন্দা,পঞ্চনোই,চামটা,বালাসোনকে জীর্ণ শীর্ণ মনে হলেও খেয়াল না-করার উপায় নেই।তাদের দুপাশের উন্মুক্ত বিস্তার ধারার বুক বেয়ে গিয়ে খানিক নিস্তার দেয় এ নষ্টযুগেও।বরং ব্যতিক্রম হয়ে আজ তাড়াহীন যাত্রায় মুখ তোলে বুড়ি বালাসোন, সে নজর কাড়ে উঁকি দিয়ে।আমরাও আছি কিন্তু : একে দুইয়ে বলে ওঠে সন্ন্যাসীঝোরা, টেপু ঝোরা,লালফা ঝোরা,চ্যাঙ্গা নদী,মাগুরমারি।পানিঘাটা মোড় থেকে ডানে ঘোরা।শান্ত কমলপুর চা, ঝোরা, ক্যাকটাস চার পাশের সীমানা বনেছে,বাঁশ ছেয়ে আছে,লোভনীয় খোলা মাঠ,গম্ভীর সুনসান মিলিটারি ছাউনি,প্রকৃতি বজায় রেখে গোছানো ব্যারাক,বাঁয়ে গল্ফ কোর্সে ছড়ি ঝোলা হাতে সহকারি,সামনে খেলোয়াড়।বন শুরু হতে অন্য রকম আরাম নামে চোখে, এলো বেঙডুবি বনবাংলো।সুরেলা ঝামেলার ছলে বলে, কী গো,আজ কি জোড়াতালি দিতে বেরিয়েছ?একবেলা টো টো  করে ছোটো করে নাকের বদলে নরুণ নয় তো?  পিকনিক হবে তো, না কি এ সব সান্ত্বনা, মন-টানার ছল?

শুনে তখনি কিছু মনে পড়তে সামান্য বিপথে গিয়ে সে বউকে দেখিয়ে আনে টিপুখোলা।সুন্দর বন, জলধারা,কিন্তু মহাশব্দে পিকনিক-প্যানিক!সে যে দিন এসেছিল, খুব কম লোক ছিল বলে বেশ রোমাঞ্চকর  লাগছিল।ডালপাতায় হাওয়ার শব্দ দারুণ লাগছিল।আজও লম্বা ঋজু বনস্পতির কী রূপ!জমি ছেয়ে আছে ফার্ণ আর প্রভাময় ঘাসে।কাঁচা পথে আগের বার হেঁটে গেছে সামনে সেন্ট্রাল ফরেস্ট বস্তিতে। অমন ফাঁকা  শান্ত মনোরম গাঁয়ের কী বিশ্রী নাম!পুনর্বাসন দেওয়ার সময় সরকারি লোকেরা নাকি দিয়েছে এই নাম!... ইমন আগে দেখেছে বলে না-গেলে সংসার মিলিজুলি থাকে না।বিনিময়ে সুরেলা তাকে বড়সড় ধনেশ পাখি দেখিয়ে ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়।তার গায়ের সাদা ও কালো সমান ঘন,চোখ-ধাঁধানো!ভয়ে উড়ে যাবার সময়ে তার মহিমার সীমা বাড়ে,ডানার সাদা খাঁজ বাঁকা কাঁটার মালা হয়ে যায়।

নতুন লাগানো বাচ্চা চা-চারা তাদের ঝাঁকের মাঝের গেরুয়া ফাঁকসহ মনোহর। ফের চলতে বন বদলায় নামঃ তাইপু বিট,চারপাশে কাঠের গুঁড়ি,জঙ্গল নির্জন।বাঁক নিতে পড়ে সুনসান ত্রিহানা চা,কদমা মোড়।ডান দিকে ঘুরতে বেলগাছি চা,খানিক বসতি,মান্জা নদী,খানিক বেলগাছি চা বাগান এদিকেও,পরে মানঝা চায়ের এলাকা শুরু হয়।নির্জনতা বাড়ে চা-দিগন্তে, মান্জা নদী তার সলিল-রিক্ততায় ডাঙ্গার প্রায় সমান হয়ে পাথরের শয্যায় টানা শুয়ে আছে।বর্ষায় বান এলে কী হাল হয় দুদিকে?তাই কি বিলকুল বিজন এ অঙ্গন?টিলা,বন দেখা যায় সামনে। মারাপুর চা আসার আগেই নির্জনতা বিস্তার পেয়ে আরও মোহময় হয়।নদী সরে গেছে বলে জেগেছে শ্রমিক বসতি,স্কুল,চার্চ,গুদাম,চা-কারখানা।সাইকেল-আরোহী চলে বস্তা-ঝোলা নিয়ে।কাঠ-হাতে ফেরে রাখাল,গরুর দলের তখনো মন ভরে নি,দু’এক চারপেয়ে যুবাকে শাসন করতে হয়। পথ দু'এক জায়গায় কাঁপুনি দিয়ে টলিয়ে দেয়।সুরেলাও বেসুরো বাজে,আহত করার মতলব নাকি এসব!কোমর তো আর থাকবে না!গাড়িও তো বিগড়ে যাবে মনে হচ্ছে,কত বছর নজর পড়ে নি এ রাস্তায় কে জানে!এর চেয়ে কাঁচা পথও তো ভালো!

নিজের দরকারমতো সময় তবু কাটে না দেখে পড়শির ছেলে আর বাড়িওলির নাতিকে পড়াতে শুরু করে সুরেলা।তাতে বেশ কাজ হয়।তাকে অনেকটা ধাতস্থ দেখায়।…তবু রাতে ঘুমের ঘোরে ছেলের সাথে কথা বলে,ঝগড়া করে কখনো।একবার তো কেঁদে উঠেছিল,ইমনের তখন বেশ কষ্ট হয়েছিল।অসহায় লেগেছিল।সভ্যতা যত জটিল হয়,অসহায়তা তত বুঝি বাড়ে।পাশের ঘরে তার পরের দিনও দুপুরে খাবার পরে চাপাকান্না টের পেয়েছে সে।বুঝেছে যে সেটা  রাতের জের।তবু দিনের বেলা বলে চিন্তা বেড়েছে তার।এখন ছেলের কাছে যাওয়াও ঠিক হবে না,গবেষণার প্রস্তাব অনুমোদন পাবার পরে সে এখন টানা লিখে চলেছে, বৃত্তির সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে পারলে ভালো,নয়ত সময় বাড়াবার আবেদন করতে হতে পারে।

এরই মাঝে দু'জায়গায় উঁচু বাঁকাপথ দেখে মনে হয় এসে গেলাম বুঝি!তাই লোক আবিষ্কার করে নিয়ে গন্তব্য জানতে হয়।ততক্ষণে কার্সিয়াং ডিভিশনের পানিঘাটা ফরেস্ট রেন্জের লোহাগড় বিটে ঢুকে পড়েছে তারা, বাঁয়ে কাঠের নিঃসঙ্গ বন-ব্যারাক,লোহাগড়ের,কর্মীরা কেউই নেই।দলবেঁধে হেঁটে হাটের দিকে হঠে গেছে বলে তাদের এমন হঠকারিতায় সেই নিরুপায় দোতলা আস্তানা আস্থা না-পেয়ে কাঠামো থেকে ভয়ে স্রেফ কাঠ হয়ে গেছে।সারা পথে চুপ করে থাকা চালক বলতে থাকে,পাশেই কোথায় রঙমোহন বস্তির ধানখেতে ছররা গুলি আর তড়িদাহত হবার ক্ষত শুঁড়ে নিয়ে পড়ে ছিল হাতি।টুকুরিয়া বা কলাবাড়ির জঙ্গল থেকে আসা বছর বারোর পুরুষটির চিৎকার শোনে নি কেউ,বিদ্যুতের তারও মেলে নি।অথচ দুদিকের জঙ্গলসহ প্রায় পঁচিশটি চা বাগানের সৌন্দর্য আর পাহাড়,নদী,ঝর্ণা ও আস্তানাসহ চা-পর্যটনের সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে না বলে অধিবাসীদের অভিযোগ প্রায়ই থাকে কাগজে।জঙ্গল-সাফারিও নাকি করা যেতে পারে।তা ছাড়া এখানকার ধিমাল বস্তির বিরল হতে চলা ধিমালদের জীবনও টোটোপাড়ার মতো আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।তা হলে রাস্তা উন্নত হয়,পরিত্যক্ত-ভাবটা ঘোচে,অর্থনৈতিক সুরাহা হয়।বন নষ্ট না-করে এমন প্রকল্প কত জায়গাতেই তো হয়েছে।

শুরু হয় ডানে চা,বাঁয়ে ঘন বন।কোন পথিকও নেই।জঙ্গুলে মেঠো পথে  ঝাঁকুনি খেয়ে চলতে পার হয় গুহে খোলা,সে-ই নুড়ি পাথর বোল্ডার, একই রকম বালুকা-বিস্তার।সেখানে কলাপীর স্বর,তা কিন্তু আলাপী নয়, আর্ত কেকারব!বালির মরুতে জলের নাকি খাদ্যের খোঁজে এসে লাফানো সাদা-দৈত্য দেখে সে ঝটিতি লেন্সের নিশানার বাইরে উধাও হয়।তার বড়সড় ময়ূরপুচ্ছ নাড়িয়ে পালানোর ছন্দ হাঁ করে দেখে সুরেলা। পথে ভোজালি ও রাইফেলধারী সেনাদল দেখে শোনা যায় নেপালের পাচারকারী মেচি নদী পেরিয়ে বনপথে চলে আসে। খানিক পরে আনন্দের জোরালো আর টানা হৈ চৈ,ছড়ানো শিলাসাম্রাজ্যে খেলে কারা!পা তো যাবে!দেখা যায় প্রকৃতি এক চৌকো আকৃতি মাঠ সরিয়ে রেখেছে নদীর গ্রাস থেকে,সেখানে প্রাণ-সই শৈশব -উৎসব!ইমন হাসে,চা-কর্মীদের বাচ্চারা সব জড়ো হয়েছে মরুদ্যানে!

এর খানিক পরেই সরু পথের ডানদিকে দেখা যায় খৈরবাণী বনবিশ্রামাগারের পথনির্দেশ,পাহাড়ের দিকে খাড়া উঠে গেছে।চালক বলে আর বেশি দূরে নয় লোহাগড় চা-বাগিচা।

অবশেষে যেখানে  গুহে খোলা ডানে বাঁক নেয়,ঠিক তার আগে খাড়া ঐদিকেই ওঠে টিলাপথ।বাঁয়ে ঢাল বেয়ে চা,ডানে ঘন গাছের ছা।মাথায় চড়ে পাক খেলে লোহাগড় চা বাগানের বাংলো,শত বছরের কত পুরনো টিনের চালের গোছানো বসত।ওরা দু’জনে ঘুরে বেড়ায় সেই সুনসান ছোট ভূখণ্ডে। ফুল ফল বাগান,ঘাসে ছাওয়া খোলা জায়গাঃইমনের মনে হয়, এখানে এলে আমাদের সহকর্মীরা,তাদের পরিবার এই সময়টায় ঘুরত!পাশে দু’দিকে দু’টো ছোট  মাঠ,কিন্তু দিব্যি খেলতে পারত ছোটোরা!দুই পাশে ছড়ানো বাড়তি কিছু ঘর,মহিলারা বিশ্রাম নিত!ওই ঘেরাটোপে হতো ঘ্রাণ-ছড়ানো রান্না ও কাটাকুটির বান্না!খানিক এদিক ওদিক ঘুরে দেখার পরে কোথা থেকে ফিরে এসে মালি তাকায় তাদের দিকে।ওদের নেপালি চালক তার দেশোয়ালি ভাইয়ের কৌতূহল মেটায়।তখনি সে বাগানের কাজে লেগে যায়।

ওদিকে বাংলো থেকে কুকুরের তীব্র প্রশ্ন ও প্রতিবাদ সামলাতে সেদিকে যেতে চায় সুরেলা।ইমনের বারণ না-শুনে সিঁড়ি,দোলনা,আর ফুল-অর্কিডের ঝুলন্ত টব পেরিয়ে ঢোকে।কী যে বলে তাকে,একেবারে চুপ করে যায় চারপেয়ে।দেখভাল করার মেয়েটি বারান্দায় এসে দেখতে পায় সুরেলাকে।ম্যানেজার এখন নেই বলে ব্যস্ততা নেই।ডাক পেয়ে ইমন গিয়ে দেখে আদর খেয়ে লেজ নেড়ে সুরেলার পায়ে লুটিয়ে পড়ে আছেন তিনি।কুঁ কুঁ কুঁই কুঁই  চলেছে।সব মিলিয়ে আপন হয়ে যায় অচেনা পৃথিবী।ইমনের মনে হয়,দূরে পড়তে যাওয়া ছেলের অভাব যেন কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ভুলেছে সুরেলা।এদিকের বাৎসল্য আর ওদিকের ভালোবাসা মিলে গেছে।

বাংলোর মেয়েটি বলছিল সারমেয়র জাতের কথা,সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান তারা।কী যেন নাম, বর্ডার কোলি!পরে হয়ত কিছু মিশ্রণ হয়েছে,তবে জাত সে তবু চিনিয়ে দেয়।এদের পূর্বপুরুষরা ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের মাঝের অঞ্চলে ভেড়া সামলাতে কাজে লাগত।কথা বা শিস ছাড়াও হাত নাড়া থেকে বুঝে নেয় কী করতে হবে।এরা খুব উপভোগ করে কাজকে।এক বারে শিখে নেয় অনেক কিছু,বুঝে যায় কত জিনিস।সমস্যায় পড়লে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে অবাক করে দেয়।তবে কাজ বা খেলা ছাড়া থাকতে চায় না,ছটফট করে জ্বালাতে থাকে,তখন বিপদ ঘটাতে পারে। অথচ এখন তাকে বাঁধা অবস্থায় বেশির ভাগ সময় বসে কাটাতে হয়।মনমরা হয়ে থাকে।পালাতে দক্ষ এরা,তালা খুলে ফেলতে পারে।তবে এ তেমন নয়।মেয়েটি,মালি বা ম্যানেজার পালা করে ঘোরায়,খেলা করায় তাকে।সত্যি সে যেন চোখেমুখে সব বুঝিয়ে দেয়।এক বারও আর গলা তোলে না।কেবল অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।সুরেলার মন যেন পড়তে পেরেছে সে।চরিত্র পড়তে পেরেছে।সে বুঝেছে এর ভালোবাসাও নিখাদ।তা পরই স্রেফ আত্মসমর্পণ করে বসেছে!

ধরার কী সুন্দর এক নিভৃত কোণ ধরা দেয় চোখে,যেখানে একক মালি ফুলের পরিচর্যা করে,বাংলোর মেয়েটি যেচে বড় রেকাবিতে সাজিয়ে আনে জলভরা গেলাস।লোভনীয় ভাবে টবে,চারায়,দোলনায় সাজানো সেই বারান্দায় নতুন করে নজর যায়।চোখে পড়ে কাজে বাইরে-যাওয়া ম্যানেজারের বই,খাতা,কলম,পত্রিকা,কত কী অপেক্ষায় রয়েছে টেবিলে!প্রথমে অত চেঁচানো সারমেয়টি অপরিমেয় ভালোবাসায়  এবার সুরেলার গায়ে মাথা রাখে!মাথা উঁচু করে নীরব ভাষায় আদর চায়।বলতে চায়,থেকে যাও,সঙ্গ দাও!আরও কী কী যে সে বেচারা করতে আর বলতে থাকে!বোঝা যায় নিঃসঙ্গতার যথেষ্ট বোঝা তার মাথায় আছে।আদর করতে থাকে সুরেলা।সমবেদনা পেয়ে মন ভরে গেছে বলে শরীর ছেড়ে দিয়ে পড়ে থাকে বর্ডার কোলি!

হ্যাঁ, এখানে হলেও হতে পারত তাদের বনভোজন!না হয় হবে কোনদিন! আঙিনা ভরে উঠে আনন্দগানে কাটবে সারাটি দিন! তারই কিছু পলের স্বাদ না-হয় পাওনা হলো এ যাত্রায়! তা কিন্তু কিছুতে দুধের স্বাদ ঘোলে নয় ....
আশ্চর্য এই যে, আবেগে না ভাসলেও, দু’জনেই ফেরার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছিল।কয়েকটা দিন,অন্তত একটি দিন থেকে যাবার বাসনা জেগেছিল।চায়ের জগতের মাঝে অন্যান্য কত রকম গাছ এক অন্য রকম পরিবেশ তৈরি করেছে।ছেয়ে থাকা বাঁশঝাড়,টিলার সুন্দর ঢাল,দূরের শৈলশ্রেণী,নদীর শুকনো খাত ভরে আছে বেদম দামী এক নীরবতায়!ভুবনের এই ডাঙ্গা বুঝি চরম মোহন হয়ে খড়ির গণ্ডী টেনে শেষ সীমা এঁকে আচমকা চুপ করে বসে পড়েছে!তার ফলে কিছু সৌন্দর্য কাঁচা অবস্থায় জীবন্ত রয়ে গেছে!বাইরে থেকে আসা আগন্তুকদের উপস্থিতি বেশ টের পেয়েছে বুঝি।বাতাসের ঢেউ আর পাখির ঠোঁট বেয়ে আন্তরিক সুরে তার বার্তা পাঠাচ্ছে!অথবা ডালপাতারা বুঝি বিচিত্র বাহারি চোখে পাল্টা মিনতি নিয়ে চেয়ে আছে!যেমন এখনো একদৃষ্টে চেয়ে আছে সারমেয়।প্রাণের টান বুঝেছে সে,কেবল এক কুকুর বলে অবহেলা পায় নি বেচারা।সত্তা হিসেবে সাড়া পেয়ে কৃতজ্ঞ সে।কেমন প্রণামের ভঙ্গিতে সুরেলার পায়ে পড়ে ছিল! তাতে কেমন বশ হয়ে গেছে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই।বিশেষ করে সুরেলার মুখ ঝলমল করে,যেন বলে,এই মাঠ,নদীর আঘাটা, শিশুরা,সবুজের গাম্ভীর্য,ওই পোষা প্রাণী-সকলে মিলে যেন শুষে নিয়েছে সব মনখারাপ!সুরেলা বলতে চায়, ধন্যবাদ ইমন,মন ভরিয়ে দেবার জন্য।পিকনিকের চেয়ে অনেক বেশি কিছুই আজ পেয়ে গেলাম!কত ছোট কিছু কেমন ভাবে বড় রকম রেহাই এনে দেয় !খুলে মেলে সহজ করে দেয় জট।


...

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

তনুশ্রী পালের গল্প : মাইকেল হেমব্রম




-ঝুমা,বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখলাম বাজারে। বুঝলে। বেশ র‍্যালা আছে।
- অ। কিকরে বুঝলে খুব র‍্যালা।
- বোঝা যায় বোঝা যায়। অন্য টাইপের মহিলা।
- কিরকম। সকাল সকাল তাঁকে নিয়ে এত কথা! ব্যাপারটা কি বিতানবাবু
- সঙ্গে ড্রাইভার নিয়ে গেছে। ঝপাঝপ বাজার করছে। বেশ দরদাম করে।
 - ভালই ত। তাতে তোমার সমস্যা কী? আজ রোববারের বাজার। আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাও রান্নাঘরে। প্রচুর কাজ। বাথরুম-টাথরুম সব পরিস্কার করার আছে। বুবলুকে সাঁতারে নিয়ে যাওয়া আছে। ওর হোমটাস্কগুলো আছে। জামাকাপড় প্রেস করা আছে। সারা সপ্তাহে তো সময়ই পাইনা। অফিস-বাড়ি করেই দম শেষ।
- চিকেন আমি রান্না করে দিচ্ছি। চিন্তা নাই। কিন্তু কি বল তো
- আবার সেই বাড়িওয়ালার মেয়ে ? কেন ? এই বাড়িটাও যথেষ্ট ভাল। বাড়িওয়ালাও ভাল। সামনে কি সুন্দর বাগান। ওনার নাতনিদের সঙ্গে বুবলুর খুব ভাব হয়েছে ওরা খেলে একসঙ্গে। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলেও মাসিমা খেয়াল রাখেন। আমার তো খুব ভাল লাগে ওদের সবাইকে।
- সেসব তো ঠিকই আছে ; আমি অস্বীকার করছিনা। হার্ট অব দা টাউন এত বড় এত সুন্দর সব সুবিধাযুক্ত বাড়ি। বাজার, হাট, বাসস্টপ সব কাছে।  না সেসব ঠিক আছে। তবে ওই তোমার ম্যাডামের  ভাবভঙ্গী কেমন যেন মানে অন্যরকম।
- বাবা! তুমি গবেষণা করছ নাকি শমিতাকে নিয়ে? লাইন টাইন লাগিয়েছিলে নাকি? পাত্তাটাত্তা দেয়নি, ক্ষুব্ধ হয়ে আছ। হুমম তাই ? নাকি সেই তোমায় চোখ-টোখ মেরে ইশারা করেছে? কেষ্টঠাকুরের মতো চেহারা তো তোমার আছেই। তাই না?  
- আরে না রে বাবা। অত হাঁদা ভেব না। ছেলের ক্লাসটিচারের সঙ্গে ইন্টুমিন্টু হুঃ! কি যে বুদ্ধি তোমার। গবেষণা বললে না হুমম সেটা করতে একটু বাধ্য হচ্ছি।
- কেন গো? একটু আস্তে কথা বল। বুবলু শুনতে পাবে।
 বাজার গোছাতে গোছাতে কৌতূহলী হয়ে ওঠে ঝুমা। ভারি অবাকও হয়। শমিতাকে বেশ ভালই লাগে ওর। খুব একটিভ মেয়ে। চেহারা দেখে বয়স বোঝা যায়না মোটে, সুন্দরী না হলেও বেশ আলগা চটক আছে। মুখে সবসময় একটু হাসি লেগে থাকে।
  - শুনেছি বিয়ে হয়েছে তো বাপেরবাড়ি পড়ে থাকা কেন? চুলটুল কাটা মেয়েরা একটু খিটকেল টাইপের    হয়। বিয়ের কোনও চিহ্ণই তো নেই সাজসজ্জায়... ডিভোর্সি নাকী ? কই বরটরকে আসতে তো দেখিনা। কিন্তু.... 
- বাবা! তুমি দেখছি শরৎচন্দ্রের যুগের গ্রামের মোড়লের মতো কথাবার্তা বলতে শুরু করলে। ওর বর তো শুনেছি বীরপাড়ার ওদিকে কোন চাবাগানের যেন ম্যানেজার। ওখান থেকে স্কুলটুল করার মেলা অসুবিধে। এখানে বাচ্চারা পড়ে, ও নিজে চাকরি করে, বুড়ো মা বাবাকে দেখাশোনা করে। অসুবিধেটা কী?
- সেসব ঠিক আছে। কিন্তু
- শোন, অকারণে অন্যের বিষয়ে ভাবা টাবাগুলো কমাও। বুবলুর ক্লাসটিচার শমিতা ভুলে যেওনা। এমন কোনও ব্যবহার কোরোনা বাপু যাতে অসন্তুষ্ট হয়। মা-বাবার একটামাত্র মেয়ে থাকতেই পারে বাবার বাড়িতে।তোমার অসুবিধে হচ্ছে কেন? এখানে  বাড়ির কাছে স্কুল, দিব্যি স্কুটিতে দুইমেয়ে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে।
- সে তো ভাল কথা, কিন্তু ওর বরটর আসেনা এখানে? আমি ওকে সেদিন বিগবাজারের ওখানে দেখলাম, লালরঙের একটা জিপসি গাড়িতে উঠল। টুপি পরা একটা লোক ড্রাইভারের সিটে। অন্যসময় তোমার শমিতা দেখা হলে হাসে নয়ত কথা বলে, সেদিন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। আরেকদিনও দেখেছিলাম সিনেপ্লেক্স থেকে বেরোচ্ছে সঙ্গে সেই টুপিওয়ালা।
- বন্ধু টন্ধু হতে পারে। যাকগে আমাদের কী ? আমিও দেখেছি একদিন একটা জিপসিগাড়ি ওকে বাড়ির স্যামনে নামিয়ে দিয়ে গেল। প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা, ওনার পছন্দ মতোই চলবেন, আমাদের এত ভাবার কিআছে বল? বাদ দেও, তুমি আজ বিকেলে সাঁতারে নিয়ে যেও বুবলুকে। প্লিজ, পরে ক্লাবে যেও।

মুখে একথা বললেও, ঝুমার মনের কোনেও শমিতাকে নিয়ে কৌতূহলের মেঘ জমে। আর হঠাৎ বড়দিনের বিকেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায় ঝুমা-বিতান। ২৫শে ডিসেম্বরে সারাদিন খুব ঘুরে বেড়ায় ওরা। " দি লায়ন কিং' সিনেমাটা দেখে শুধু বুবলু নয় ওর মা বাবাও খুশি। তারপর প্রিয় রেস্তোরাঁ "বাদশা'র বিখ্যাত বিরিয়ানি খাওয়া হল। শেষে অন্যবারের মতোই "মাইকেল এঞ্জেল' চার্চে যায়, মোম জ্বালে বাইরের বেদিতে। ভেতরে গিয়ে খানিক বসে, বসে থাকতে ভাল লাগে ঝুমার কিন্তু ছেলে ছটফট করে বাড়ি যাবে। ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজছে, নদীর ওইপারে বিকেলের আকাশে মায়াবী রঙের আলো ছড়িয়ে সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে। তখনি মুখোমুখি হয়ে যায় শমিতা ওর দুইমেয়ে টিনা নিনা আর টুপিওয়ালা শক্তপোক্ত চেহারার লোকটির সঙ্গে। ওরা চার্চের ফাদারের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসছিল। শমিতা একটু হেসে আলাপ করিয়ে দেয় টুপিওয়ালা আদিবাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে ," ঝুমাবৌদি বিতানদা মিট মাই হাজবেন্ড মাইকেল, মাইকেল হেমব্রম। উনি টিনা নিনার ড্যাডি। মধুবাড়ি চা বাগানে আছেন। বাবা আগে ওই বাগানেই ডাক্তার ছিলেন, মাইকেল ওনারা বাবার টেন্যান্ট। ঝুমাবৌদি আর বিতানদা।' ভদ্রলোক মিষ্টি করে হেসে হাত বাড়িয়ে দেন বিতানের দিকে, হ্যান্ডশ্যাক করেন। ঝুমার দিকে চেয়ে বলেন " নমস্কার দিদি।' শমিতা ঝুমাকে একটু কাছে টেনে নিচু গলায় বলে, " মা ওকে পছন্দ করেনি প্রথমে তাই ও আমাদের বাড়িতে আসেনা। তবে শহরে আসে প্রতি সপ্তাহে।' শমিতা ঝুমাকে একটু কাছে টেনে নিচু গলায় বলে, ' মা-বাবা ওকে পছন্দ করেননা তাই ও আমাদের বাড়িতে আসেনা বৌদি। যদিও ছোটবেলা থেকেই মাইকেল আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশুনো করেছে। টি ম্যানেজমেন্ট কোর্স করে এসেছে আমার বাবার উৎসাহেই। ' একসঙ্গে অনেক কথা বলে  ফেলে শমিতা।খানিক চুপ করে থেকে একটু হেসে আবার বলে ওঠে ' একদম ছোট্টবেলার বন্ধু আমরা। ও শহরে আসে প্রতি সপ্তাহে, ছুটিতেও আমরা বাগানে চলে যাই।' কেমন একটু থতমত খেয়ে যায় ঝুমা আর বিতান! যেমন ওদের বিয়ে নিয়ে শমিতার আত্মীয় পরিজন, প্রতিবেশী, বন্ধু,কলিগ সবাই কি যেন এক অজানা কারণে থতমত খেয়েই আছে বিগত দশটি বছর ধরে!





বিপুল দাসের গল্প : লেখা থাকে


এক
অর্জুন সরেন যদি ঘটনার সামান্য একটু আভাসও পেত, তবে সেই লালগেঞ্জিটাই পরত সেদিন। কে জানত তাকে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে, কথা বলতে হবে। যদিও কথা বলতে তার কষ্টই হচ্ছিল, কিন্তু সেটা বোধহয় কেউ বুঝতে পারেনি। এমনি কথা বলার সময় তার ঠোঁটের ডানদিকটা একটু ভেঙে যায়, অনেকেই মনে করেছে সে বুঝি মৃদু হাসছে। অনেকে ভুল বুঝে মনে করে এটা বোধহয় বিদ্রূপের হাসি। আসলে অর্জুনের মুখের গড়নই ওই রকম। তার বাবা লাল সরেনেরও কথা বলার সময় মুখের ডানদিকের পেশিতে সামান্য টান ধরার ফলে মনে হত সে বোধহয় মুচকি হাসছে। পরে বোঝা যায় যে, এটা তার মুখের স্বভাবে জন্ম থেকেই আছে। বাপমায়ের শরীরের লক্ষণ কিছুটা আর কিছুটা স্বভাবচরিত্র বংশের নীচের দিকে গড়ায়। স্বভাবচরিত্র অবশ্য অনেক সময় মানুষের পালটে যায়, কিন্তু চলাফেরায় মুদ্রাদোষসহ চোখের মণির রং, চুলের কুঞ্চন, গায়ের রং, হাইট, দাঁতের গঠন – এসব পালটানো খুব কঠিন।  সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অর্জুনের চোখেমুখে কোথাও কষ্টের চিহ্ন সে বুঝে উঠতে দেয়নি, উপরন্তু সেই হাসিটা আরও একটু ছড়িয়ে দিয়েছিল সে। কিলিকঝিলিক ছবি উঠছিল অনেক। তখন তার লাল গেঞ্জিটার জন্য আপশোষ হচ্ছিল খুব। কে জানত আজ তার ছবি তুলবে টিভিওয়ালা। মুখের ভেতরে রক্তবাবদ নোনাস্বাদ টের পাচ্ছিল সে। তবু ডানদিকের ঠোঁটের ভাঙন আরও বিস্তৃত করে সে আনন্দ প্রকাশ করতে চাইছিল। বা বোঝাতে চাইছিল তার কোনও কষ্ট নেই।

অর্জুনকে অনেকেই বলেছে লালগেঞ্জি, কালো প্যান্ট আর সাদা জুতোটায় তাকে সুপার দেখায়। সে ঠিকই করে রেখেছিল আজ সে এটা পরেই মেলায় যাবে। আজ মেলা থেকে ফেরার পথে লক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা হওয়ার একটা চান্‌স আছে। সুযোগটা তৈরি করে নিতে হবে। দল থেকে আলাদা করে নিতে হবে লক্ষ্মীকে। তারপর মেলা থেকে কেনা ঝিলমিল-ঝিলমিল কানের দুলটা সে যদি নিজের হাতে লক্ষ্মীকে পরিয়ে দেয়, লক্ষ্মী কি আপত্তি করবে। অর্জুন জানে তখন কোনও মেয়ে না করে না। তখন তারা একটু বেশিই সোহাগ দেখায়।

পশ্চিম পাহাড়ের দিকে সূর্য নেমে যেতে তখনও অনেক দেরি। গরম মাটিতে মানুষের যে ছায়া পড়ছে, সেটা প্রায় মানুষের মতই লম্বা। সকালে-বিকালে সেটাই আবার কত বড় হয়ে যায়। ভরদুপুরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। আশ্চর্য ব্যাপার ! ঘরবাড়ি, মানুষজন, গাছপালা সব স্থির থাকলেও ওদের ছায়া দিব্যি নড়েচড়ে। এধার ওধার করে। ছোটবড় হয়। আর, সূর্যও তো আকাশে শুধু যে পুবপশ্চিম করে তা নয়; আকাশের উত্তরদক্ষিণেও তার কাত হওয়া আছে। তখন ছায়ারও বদল হয়। দক্ষিণমুখো বারান্দায় তখন সকালে বেশ কছুটা রোদ এসে পড়ে। শীতে বেশ আরামদায়ক সেই রোদ।

শালবনের ভেতর দিয়ে ফেরার সময় অর্জুন দেখল লক্ষ্মী দলছুট হয়ে সেদিকেই আসছে। মেলার মাঠে দোকানে দোকানে ঘোরার সময় ভিড়ের ভেতরে অর্জুন সে রকমই ইশারা করেছিল লক্ষ্মীকে। সোনামণি, পূর্ণিমা, টগর, ভানুমতী আর লক্ষ্মীদের দলটা মেলাজুড়ে খুব হইচই করে বেড়াচ্ছিল। ওদের দলটার দিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল সবাই। বিটিছেল্যা তো নয়, যেন পাঁচটা আগুনের খাপরা। কিংবা চৈত্র মাসের ফুলেভরা পাঁচটা পলাশগাছ। একবার তাকালে লাল আভাটা চোখের ভেতর দিয়ে একেবারে মাথার ভেতরে ধিকি ধিকি আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারপর বুকের দিকে নামতে থাকে। তখন মেলার মাঠের পুরুষগুলো বড় নাচার হয়ে পড়ে। হাড়িয়ার আসরে গিয়ে না বসেও কেমন যেন নেশা-নেশা লাগে। পায়ে ছুরিবাঁধা লড়াইবাজ মোরগা যেন পাবলিকের একেবারে কলিজায় তীক্ষ্ণ ছুরিটা বসিয়ে দেয়। শুধু শরীরে নয়, মনের ভেতরেও মহুয়ার নেশা মাতাল করে দেয়।

সেই নেশায় ওরা দু’জনই মাতাল হয়ে ছিল। শালবন পেরিয়ে কয়েকটা মহুয়ার গাছ। তার মাঝে কিছু ঝোপঝাড়। প্রকান্ড বড় পূর্ণিমার চাঁদ পুব আকাশে ভেসে আছে। তার আলো থৈ থৈ করে ছড়াচ্ছে আকাশজুড়ে। শালবনের নীচে ঝিরিঝিরি আলোছায়ার নক্‌শা। সামান্য বাতাসেই সেগুলোর ডিজাইন বদলে যাচ্ছিল। ওদের দু’জনকে সেই নক্‌শার নীচে মনে হচ্ছিল সাদাকালো খোলসের আদিম একজোড়া সরীসৃপ। শঙ্খ লেগেছে। চৈতি রাতের পূর্ণিমার চাঁদ মহুয়া বনে ফাঁদ পেতে রেখেছে।

আহা, মহুয়া। একটু দূরে টিলার মাথায় সবচেয়ে বড় মহুয়া গাছটার দিকে তাকাতেই অর্জুনের মনে হল কাল মধ্যরাতের পর থেকে যত ফুল ঝরেছে, আজ সারা চৈত্র দুপুরের তাপে সেগুলো শুকিয়েছে। আর এখন চৈতি চাঁদের আলোয় শুকনো সেই ফুল ক্রমে মিশছে। মিশে যাচ্ছে, প্রথমে ঘোলা একটা দ্রবণ তৈরি হচ্ছে। আস্তে আস্তে এই জঙ্গলের বাতাস ছাঁকনির মত সেটাকে ছেঁকে প্রায় বর্ণহীন একটা তরল বানাচ্ছে। তারপর ছড়িয়ে দিচ্ছে এই জঙ্গলজুড়ে। বাতাস বয়ে গড়িয়ে এসেছে লক্ষ্মী আর অর্জুনের দিকে। ওদের ফুসফুসের ভেতর দিয়ে মাদক-বাষ্প রক্তে গিয়ে মিশছে। অর্জুন লক্ষ্মীর কানে ঝুটা-পাথরের দুল পরিয়ে দিল।

লক্ষ্মীর কানের সেই দুলের একটি হারিয়ে গেছে। সে রাতে বাড়ি ফেরার পথে সে একবার দু’হাত দিয়ে দুলদুটো ছুঁতে গিয়ে দেখল একটা দুল নেই। সর্বনাশ, এখন এই রাতে সে কোথায় খুঁজবে সেই দুল। হোক ঝুটা মোতি, কী সুন্দর ঝলমল করছিল আলো পড়ে। আসলি মোতি কেমন হয় কে জানে। সে সব বাবু, অফসরদের বউরা পরে। তার কাছে এটার দাম আসল মোতির চেয়েও বেশি। এটা অর্জুন তাকে মহুল বনের আলোছায়ায় বসে নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছে। তারপর লক্ষ্মী নিজেই অনেক সোহাগ দিয়েছে অর্জুনকে। ভেবেছিল আজ রাতে বারে বারে তার ছোট আয়নায় দেখবে তাকে কেমন দেখাচ্ছে। নিশ্চয় সেই বড় গাছটার নীচে কোথাও পড়ে আছে। ওখানেই তারা খুব ভালোবাসাবাসি করেছিল। কিন্তু এখন আর ওখানে যাওয়ার সময় নেই। চাঁদের আলোয় জঙ্গলের ভেতরে ওটা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। কাল ভোর না হতেই যেতে হবে। কিন্তু তার আগেই যদি ওটা কেউ কুড়িয়ে পায়, আলো ফুটলেই সেটা ঝিলমিল করে উঠবে। কারও না কারও চোখে পড়বেই। ওই তো অর্জুন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বলবে নাকি ওকে।

তাকে ঘরের দরজায় ছেড়ে অর্জুন একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। দেখল লক্ষ্মী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার দিকেই আবার ফিরে আসছে। কিছু কথা হয়তো অধুরা আছে তার। আরও কিছু দেওয়াথোওয়া বাকি আছে হয়তো।

এই অরণ্য অর্জুন খুব ভালো চেনে। শাল-মহুয়ার এই জঙ্গলেই সে বড় হয়েছে। তা ছাড়া লক্ষ্মীর হারিয়ে-যাওয়া কানের দুল এই রাতেই খুঁজে বের করা যেন একটা চ্যালেঞ্জ তার কাছে। সম্ভবত সেই বড় মহুয়া গাছটা, যার নীচে বসে তারা দু’জন খুব মাতাল হয়ে গিয়েছিল, ওখানেই কোথাও পড়েছে। তখন তারা পুরো বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল।

দুই
সাসাংবেডা রে বন জাত এনা হো। সেই প্রাচীন গান অর্জুনের বুকের ভেতরে বেজে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল এই শালবনই সেই চায়চাম্পা দেশ। সে ছিল  নিশ্চয় এক পাহাড়ি উপত্যকা। ঝরণা ছিল। মাদল আর বাঁশির সঙ্গে কামনার মদস্রাবী গন্ধ নিয়ে দুরন্ত যৌবনবতী মেয়েদের উদ্দাম নাচ ছিল। নাচতে নাচতে ওরা মঞ্জিথানে এলো। তখন ওরা নাচে অর্ধ-চন্দ্রাকারে। তারপর সাসাংবেডাতে এসে গোত্রে গোত্রে ভাগ হয়ে গেল ওরা।

কিন্তু আজ হঠাৎ একটা অজানা আতঙ্কে ভয় পাচ্ছিল অর্জুন। তার মনে হচ্ছিল মশাল হাতে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছে রাঁচি, হাজারিবাগ, পালামৌ, ময়ূরভঞ্জের গভীর জঙ্গল থেকে। জানগুরু তার দিকেই আঙুল তুলেছে।

অর্জুন ঠিক করেছিল বাঁধের ওপরের পথ দিয়ে গেলে সেখানে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে। চাঁদ তখন মাথার ওপরে উঠে এসেছে। শালের ঘন সবুজ বড় বড় পাতাগুলো এখন কালো জমাট সংঘ মনে হচ্ছিল। অর্জুন আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল জঙ্গলের কোন দিকটায় ওরা গিয়েছিল। কিন্তু এখন তার কেমন যেন সব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। এই অরণ্য তার চেনা অরণ্য নয়। মাথার ওপরের ওই চাঁদ তার চিরকালের চেনা চাঁদ নয়। অনেক কালের পুরনো কোনও উজ্জ্বল বস্তু ভেসে আছে আকাশে। প্রাচীন সেই থালা থেকে সোনাচাঁদির কণা ঝরে পড়ছে এই মহলে।

সে কতকাল আগে হড় জাতির মানুষেরা গিরু নাই পার হয়েছিল। তারও আগে সৃষ্টিকর্তা পিলচু হাড়াম আর পিলচু বুড়হি নামের আদি মানবমানবী সৃষ্টি করলেন। তাদের সাত ছেলে আর সাত মেয়ে হ’ল। তারপর সেই পিঁড়ি বেয়ে এল কত গোষ্ঠী। কিস্কু গোষ্ঠী পেল দেশ শাসনের ভার, হেমব্রম পেল তার দেওয়ানি, মুর্মুরা হ’ল পুরোহিত, কৃষিকাজের দায়িত্ব পেল মান্ডি গোষ্ঠী, সরেনের দল হ’ল সেপাই, টুডুরা পেল নাচগান করার অধিকার। এসব লেখা থাকে শাল-মহুলের পাতায়, শেকড়ে, বাকলের নীচে।

তেমন চওড়া বাঁধ নয়। তির্ণা এমন কিছু বড় নদী নয়। বর্ষাকালেই যা একটু তার ছলবলনি। চোতবোশেখে তো শুধু বালি। সরু বাঁধ। তার ওপর দিয়ে আরও সরু পায়েচলা পথ। মাটির বাঁধ। নদীর ঢালের দিকটায় বড় বড় গাছ অনেককাল আগে কেউ হয়তো বসিয়েছিল। সেই গাছের শিকড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বাঁধের মাটিকে। সে কারণেই নিশ্চয় এভাবে বনসৃজন করা হয়েছিল, বর্ষার জল যাতে মাটির বাঁধ ভাঙতে না পারে। তখন হয়তো এই তির্ণা আরও অনেক বেশি জল নিয়ে প্রবল বেগে বইত এই মহলের ভেতর দিয়ে। তখন এত জলকষ্ট ছিল না এই জঙ্গলের মানুষদের।

বাঁধের ওপরে সরু পায়েচলা পথকে ঠিক পথও বলা যায় না। পথের ইশারা। এ পথ বেয়ে যার কোথাও যাওয়ার দরকার হয়, দিনের বেলা হলে সে ঠিকই বুঝে নেয় কোন ইশারা বেয়ে বাঁ দিকে নেমে গেলে বসতি, আর কোন ইশারায় ঘন অরণ্য। কোথাও আবার হালকা সুতোর মত সে এঁকেবেঁকে পড়ে থাকা চিহ্ন ঘুরে গেছে ডানদিকেও। খুব অস্পষ্ট। নেশার ঘোরে অনেক দূর থেকে শোনা মাদলের বোলের মত। প্রায় যেন ধিঙদা হেতাঙ্‌ তিঙ্‌ দাতাঙ্‌ দাতাঙ্‌ তিঙ্‌দা। সহজাত প্রবৃত্তিতেই সবাই বোঝে নদীর ওপারে যেতে হলে ওই সুতো ধরে ডানদিকে নেমে যেতে হবে।

কিন্তু রাতে সব পালটে যায়। দিনের বেলায় যা থাকে সবুজ ঝোপঝাড়, শালশিমুলমহুয়াপলাশের জমাট সঙ্ঘ, রাতে সব কালো হয়ে যায়। একা একা গভীর রাতে সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন যেন অচেনা মনে হয়। অর্জুন ভেবেছিল প্রথমে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুটা গিয়ে বাঁধে উঠে পড়বে। তারপর বাঁধ যেখানে ঠিক প্রায় গোল হয়ে বাঁক নিয়েছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই ওরা কোথায়, কোন বড় গাছটার নীচে বসেছিল, তার একটা আন্দাজ পাবে।

বসতির কিছুটা পথ পার হয়ে জঙ্গলে ঢোকার একটু বাদেই অর্জুনের সব কিছু গুলিয়ে যেতে শুরু করেছিল। পুরো জঙ্গলজুড়েই মাটিতে বিছানো রয়েছে সাদাকালো চৌখুপি নকশার অনন্ত এক চাদর। পুরো মহলের মাথার ওপর শালপাতার যে বিস্তৃত এক ছাতা রয়েছে, তারই ফাঁকফোঁকর গলে চুঁইয়ে পড়ছে রুপোলি আলো। বড় পাতাগুলো তৈরি করেছে ছায়া। বাতাস উঠলে শুকনো পাতার ওপর বিছিয়ে-দেওয়া চাদরের ওপরেও ঢেউ ওঠে। এলোমেলো হতে থাকে সাদাকালো খোপগুলো। চেনা ছবি, তবু অর্জুনের মনে হ’ল আজ নক্‌শাগুলো একটু আলাদা মনে হচ্ছে। সেটা লক্ষ্মীর সঙ্গে আজ সন্ধ্যায় দেখা হওয়ার সুখে, নাকি লক্ষ্মীর কানের দুল হারিয়ে যাওয়ার দুঃখে – স্পষ্ট বুঝতে পারছিল না। কিন্তু দু’রকমের একটা হাওয়া সে টের পাচ্ছিল। চিরকালের চেনাজানা মায়ের মত জঙ্গল, আবার মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছিল আলো-অন্ধকার মাখা রহস্যময় এই জঙ্গলের প্রতিটি ছায়ার পেছনে অচেনা কোনও ভয় রয়েছে। ডাকাবুকো হিরো অর্জুনেরও কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। আড়াল থেকে কেউ তার ওপর নজর রেখেছে, এ রকম মনে হচ্ছিল।

এ রকম মনে হওয়ার পেছনে কারণ আছে। আজ হাটে ঘোরার সময় সে বরাবর লক্ষ্মীর দিকে নজর রাখলেও টের পাচ্ছিল আজ বরাবরের বাইরেও কিছু অচেনা লোক রয়েছে হাটে। তখন থেকেই তার মনে কেমন কু গাইছিল। আজ হাটের বাতাসে কিছু একটা অচেনা গন্ধ রয়েছে।

জঙ্গল পার হয়ে বাঁধে ওঠার মুখেই অর্জুন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। তার অরণ্যচারী ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করল। হাজার বছর ধরে রক্তে ঘোরাফেরা করে কিছু চেতাবনি। কিছু শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, উষ্ণতার তারতম্য বোঝার ক্ষমতা বেঁচে থাকার জন্য অনেক তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে অর্জুনদের। বাঁধের ওপরে কিছু নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে বুঝতে অসুবিধা হ’ল না।

আচমকাই তাকে ঘিরে ধরল পাঁচজন মানুষ। অন্ধকারেও বুঝতে অসুবিধা হয় না তাদের হাতে অস্ত্র রয়েছে। দ্রুত ওর দুটো হাত পেছনে মুড়ে বেঁধে ফেলল, তারপর মুখও বাঁধল। অর্জুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই এসব ঘটে গেল। তারপর অর্জুন বাঁধে ওঠার মুখে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে ঝোঁপজঙ্গল সরিয়ে কী যেন দেখল ওরা।

সেই অচেনা মানুষগুলো নয়, অর্জুনকে মেরে পাট করে দিয়েছিল খাকি শার্ট, ধুতি আর বুট পরা কিছু মানুষ। চমৎকার ছিল তাদের মোচ আর হাত ও কাঁধের পেশি। জঙ্গলের মানুষগুলোর মুখ ঢাকা ছিল গামছা দিয়ে। ওরা জানতে চেয়েছিল এত রাতে অর্জুন সেখানে কেন এসেছে। তাদের অস্ত্রভান্ডারের কথা অর্জুন কতটুকু জানে। কানের দুলের কথা বলেছিল অর্জুন। বড় গাছটার কথা বলেছিল। ওদের একজন টর্চ নিয়ে চলে গিয়েছিল সেই গাছের খোঁজে। বুঝতে চেয়েছিল অর্জুন মিথ্যে বলছে কিনা। কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এসেছিল লক্ষ্মীর হারিয়ে যাওয়া দুল নিয়ে। হাসাহাসি করছিল ওরা।

কোনও কথা বলছিল না অর্জুন। কাল রাতেই পুলিশ জঙ্গল ঘিরে ফেলেছিল। ওদের কাছে সোর্স মারফত খবর ছিল অ্যাকশন হবে। কিন্তু বাইরের এই দলের সঙ্গে অর্জুনের যোগাযোগ ওরা কিছুতেই কোনও ভাবেই প্রমাণ করতে পারছিল না। প্রায় নাঙ্গা করে ওরা অর্জুনের তল্লাশি নিয়েছে। মারাত্মক কোনও অস্ত্র পাওয়া যায়নি। হতাশা থেকে ওরা আরও পাগল হয়ে যাচ্ছিল। শেষে একটা ঝুটাপাথরের কানের দুল পাওয়া গেলে ওরা বুঝতে পারে এটা কোনও চক্রান্তের অঙ্গ। এটা ছিনতাই বা ডাকাতি করা আসল হিরে। বিশেষ করে তখন সকালবেলার সূর্যের আলো ওটার ওপর পড়ে ভীষণ ঝলমল করছিল। সে কথা অর্জুনের মুখে শুনতে চাইছিল ওরা। লাঠি, বুট, এমন কী  একজন তার পেছনে সত্যি সত্যি বন্দুকের নল প্রচন্ড জোরে চেপে ধরলে আর সবাই খ্যা খ্যা করে হাসছিল।

মিডিয়া পটাপট ছবি নিচ্ছিল অর্জুনের। অর্জুন যদি জানত এভাবে তার ছবি উঠবে আজ, তবে সে নিশ্চয় লাল গেঞ্জিটাই পরে আসত। তার ঠোঁটের ডানদিকের ভাঙনের জন্য মনে হয় সে হাসছে। আসলে সে হাসে না। এটা জিনের কারসাজি। যেন হাজার বছরের লাঞ্ছনার উত্তরে এক টুকরো বিদ্রূপের হাসি গড়িয়ে আসে বংশ পরম্পরায়। ছড়িয়ে পড়ে আদিম জঙ্গলজুড়ে। জলের মত গড়ানো সেই হাসি শোষণ করে অরণ্যের শাল, শিমুল, মহুয়ার খয়েরি বাকল, সবুজ পাতা। জমা থাকে।

                       ।। ----------------------।।


'অদ্ভুত আঁধার'-এর রিভিউ : পুরুষোত্তম সিংহ

অলোক গোস্বামীর 'অদ্ভুত আঁধার' : বিপন্ন সময়, বিপন্ন মানুষ
পুরুষোত্তম সিংহ


  ধান ভানতে শিবের গীত :
ইতিমধ্যেই বাংলা উপন্যাস তার যাত্রাপথের দেড়শো বছর অতিক্রম করে ফেলেছে। তবে আজও সস্তা রোমান্টিকতার কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠা আখ্যানই উপন্যাস বলে বাজার মাত করে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের তরলায়িত জীবনের ফানুস কাহিনি ফুলিয়ে ফাপিয়ে যে আখ্যান রচনা করছে তা বাঙালি পাঠকের বড় প্রিয়। ভিন্ন জীবনচেতনা বা জীবনবোধের শিল্পী যে আসেনি তা নয়। কিন্তু একজন লেখক যখনই বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় যাচ্ছেন বা ভিন্ন জীবনবোধের সংগ্রামের গল্প শোনাচ্ছেন তখনই পাঠক হারিয়ে ফেলছেন। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের শুরুই হয়েছিল সেজন্য। প্রচলিত থেকে বা বাণিজ্যিক পত্রিকার পাঠক তা পছন্দ করবে না বলে সম্পাদক তা ছাপবে না, কিন্তু লেখক একটু অন্য কথা বলতে চান বলে নিজেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করে ফলেছেন। কিন্তু একজন লেখককে আর কতদিন এই সংগ্রাম করতে হবে ? যেহেতু বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি তাই বড় প্রকাশক ছাপবে না অথচ তিনি একশ শতাংশ প্রকৃত লেখা লিখিছেন। লেখকের এই আত্মহনন ও পাঠকের এই আত্মঅবমানার দায়িত্ব নেবে কে ?

  রাষ্ট্রের দলদাস বা শাসক দলের তাবেদারি করা লেখকের কাজ নয়। লেখক সবসময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে কলম ধরবেন। কিন্তু আজ সিংহভাগ লেখক রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থেকে, সম্পাদকের তবেদারি করে সাহিত্য ছাপছেন । কিন্তু প্রকৃত লেখক দাঁড়াবে কোথায় ! প্রকৃত লেখকের প্ল্যাটফর্ম দেবে কে ? এ দায়িত্ব নিতে হবে পাঠককেই। বাণিজ্যিক পত্রিকা বা সুমহান সাহিত্যিক পত্রিকা বা সাহিত্য গোষ্ঠী ‘সাহিত্য’ বলে যা চালিয়ে দিচ্ছেন তা থেকে আজ বুঝি পাঠকের বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। তবে সব পাঠকই তো ভিন্ন ধরণের সাহিত্য পড়বে না কিছু মানুষ পড়বেন। এই ‘কিছু’ কেই আজ বড় প্রয়োজন। আসলে ‘মধ্যবিত্ত পাঠক সত্তা’ থেকে বাঙালির কবে মুক্তি হবে তা আমাদের জানা নেই। আর প্রকৃত লেখকও কোন হলফনামা লিখে দিয়ে বসেনি যে পাঠকের রুচিকে সামনে রেখে কলম ধরবেন। সাহিত্যগোষ্ঠী, লেখক ও পাঠকের গোলকধাঁধায় প্রকৃত সাহিত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে।  আজ বুঝি সময় এসেছে এসবকে অতিক্রম করে যাবার।

  সময়ের বিপন্নতাই তো একজন লেখকের হাতে কলম তুলে দেবে বা শিল্পীর হাতে তুলি তুলে দেবে, গায়ক নতুন সুর তুলবেন। সময়ের জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের আত্মকথাই বুঝি আজকের উপন্যাসের প্রধান বিষয় হওয়া প্রয়োজন ! তবে এই সময়কে শিল্পে পরিণত হতে হবে। আর বড় শিল্পী সময়কে কীভাবে শিল্পে পরিণত করতে হয় তা জানেন। সময়ের বিবরণ দিয়েই বা ফটোকপি করেই যিনি আখ্যান লিখে যাবেন তা কখনও উপন্যাস হতে পারেনা।
সময় ও শিল্পের দ্বন্দ্ব সমাসে যে নতুনতর আখ্যানবিশ্ব লেখক পুননির্মাণ করবেন তাই হবে আজকের যথার্থ উপন্যাস। কেননা এক ভয়ংকর সময় সত্যের মধ্য দিয়ে আজকের প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রব্যুহ থেকে মুক্তির পথ আজ লেখকেই দেখাতে হবে। বহুল প্রচলিত শরৎচন্দ্রের সেই ‘সমাজ সংশোধন লেখকের কাজ নয়’ আজ আর মনে রাখার সময় নেই। উপরের এই উপস্থাপিত বক্তব্য এতক্ষণ যারা শুনলেন বা দেখলেন তাদের কাছে এমন একটি উপন্যাসের নাম বলার জন্য এই প্রাককথন তা হল অলোক গোস্বামীর ‘অদ্ভুত আঁধার’( ২০১৬)
  অলোক গোস্বামীর ব্যক্তিজীবনের পরিচয় বা সাহিত্যজীবনের পরিচয় আপনারা নিজেই জেনে নেবেন। সে পরিচয় দেবার কোন দায়বদ্ধতা আমি রাষ্ট্রের কাছে স্বীকার করে বসিনি। পাঠক বলতে পারেন ‘লেখকের পরিচয় পেতে যদি তাঁর অন্য লেখাই পড়তে হয় তবে আপনার এ রচনা বা সংক্ষিপ্তসার পড়ব কেন?” সুতরাং পাঠক, আপনি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবেন কেন ? নিজেই না হয় একবার ‘ঘেঁটে ঘ’ করে দেখবেন। শুধুমাত্র মফস্‌সল পাঠকের গোচরার্থে জানানো যেতে পারে যে লেখকের গল্পগ্রন্থগুলি হল – ‘সময়গ্রন্থি’ (২০০০), ‘জলছবি’ (২০০৩), ‘আগুনের স্বাদ’ (২০০৫), ‘কথা অথবা কাহিনি’ ও উপন্যাস ‘বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর’ ( ২০০৫) , ‘অদ্ভুত আঁধার’ (২০১৬ )। পাঠকের আর বেশিদূর যাবার দরকার নেই এই ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’ থেকেই বুঝে নেওয়া যেতে পারে লেখক অলোক গোস্বামী গল্প উপন্যাসে কী লিখতে চান। হ্যাঁ অলোক গোস্বামী সেই লেখক যিনি সময়ের রন্ধে রন্ধে ঘটে যাওয়া বড় ভূগোলের মধ্যে যে ছোট ভূগোল, সময় যন্ত্রণা ও সময় ব্যাধির নিপূণ শল্যচিকিৎসক। এ উপন্যাস লেখক উৎসর্গ করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্পের কুরি বাড়ির ছোটবউ চন্দরাকে। যিনি শেষবাক্যে ‘মরণ’ নামক শব্দে পুরুষশাসিত সমাজ ও সময়ের বুকে চাবুক হেনে গিয়েছিলেন। সেই রহস্য সময় বা ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরি’ থেকে নারী সমাজ আজও রক্ষা পায়নি। ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় পাওয়া বোধহয় সম্ভবও নয়। এ উপন্যাসেও নারীর বিপন্নতা আছে, তবে লেখক বিজুর পরিণতিকে মিলিয়ে দিয়েছেন সময়ের সঙ্গে।
 কথা ও কাহিনি কিংবা কাহিনির কথা :
 অলোক গোস্বামী সাহিত্যে কী লিখতে চান ? যেনে নেওয়া যেতে ‘হলফনামা’ শীর্ষক বয়ন থেকে –“সাহিত্য নিছকই  বিনোদনের মাধ্যম নয়। নয় ভাতঘুমের সহায়ক বটিকা। পাঠক রুচি নামক ইয়োটোপিয়াকে সামনে রেখে শিল্প সংস্কৃতির যে বেসাতি চালু আছে তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা নয়, জনচেতনাকে দাবিয়ে রাখাও। সাহিত্য এবং জীবনকে একই মুঠোয় ধরতে হয়।“ সেই জনচেতনা ও সময়কে সামনে রেখেই গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের আখ্যান। উপন্যাসের বীজ রোপন করেন শীতকালকে সামনে রেখে। হেমন্ত বিদায় নিয়েছে, হেমন্তের ঝরা পাতারা মাটিতে নুইয়ে পড়েছে আর লেখকও যেন বলতে বসেছেন –‘ঝড়া পাতা গো আমি তোমারাই দলে’। এই ঝরাপাতা হল উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষ। প্রমোদনগর কলোনিকে সামনে রেখেই কাহিনি এগিয়ে যায়। অলোক স‍্যাটোয়ারের মাস্টারপিস লেখক। এই মুহূর্তে বাংলা গদ্যে স্যাটায়ারে তাঁর দোসর যে কেউ নেই একথা অতিবড় আহম্মকও মেনে নিতে বাধ্য হবেন ! যাঁদের জীবনে উল্লাসের কোন উৎসব নেই সেই উদ্বাস্তু কলোনির নাম প্রমোদনগর কলোনি। আসলে নগরের সঙ্গে যুক্ত থাকে উল্লাস, আনন্দ, রোমান্টিকতা। কিন্তু শহরতলির খবর কে রাখে ? সে খবর রাখতে হয়ে সাহিত্যিককে। শহরের প্রান্তে গজিয়ে ওঠা শিবির থেকে মানুষ শহরের বিনোদন দেখতে পায় কিন্তু সে বিনোদনে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অর্থ কোনটাই শিবিরের থাকে না। আজ কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার নাম ও রঙ পরিবর্তনের উৎসবে মেতেছে। ব্যক্তি ইতিহাস ও সামাজিক ইতিহাসকে মুছে দিতে রাষ্ট্র যখন অতীব তৎপর তখন কী এ উপন্যাসের নাম মনে পড়ে না ! আসলে কলোনি মাত্রই সর্বহারা। কিন্তু সরকার সে দৈন্য বুঝতে দেবে না অথচ নিজেও সাহায্য করবে না। তবে তো কল্পনায় ভেসে যেতে বাধা নেই। ফলে লেখক বস্তি জীবনকে ভাসিয়ে দিতে চান শহরের সঙ্গে। কিন্তু তা মেলা সম্ভব নয়। লেখকও বাস্তবতা ছেড়ে অন্য পথে যাননি।

  উপন্যাস তো এক হিসাবে ইতিহাস। তবে সে বুনন ইতিহাসের থেকে আলাদা। লেখক সামাজিক ইতিহাসই লিখতে চান উপন্যাসে।  আর লেখক যখন অলোক গোস্বামী তাঁর বিশ্লেষণ ও দেখা যে আলাদা হবে তা বলাই বিধেয়। প্রমোদনগর কলোনির নাম ছিল ‘সর্বহারা কলোনি’। যেহেতু এ নাম রাষ্ট্রের কাছে , সরকারের কাছে সম্মানহানির ব্যাপার তাই নাম পরিবর্তন বিধেয়। প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে মানুষ যখন বাঁচতে চাইছে, বলা ভালো পাঠকের সত্তা গড়ে উঠেছে তা অলোক গোস্বামীতে এসে ভেঙে যায়। তিনি দেখান মানুষ শেকড় বিহীন নয়, বরং শেকড়বাজ। দেশভাগে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষগুলিকে আবার ওপারে পাঠিয়ে দেওয়ার সম্ভবনা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ভোটের জন্য তাদের শহরের বুকে রেখে মানুষ নয় ‘মানুষের মত’ করে রাখা হল। কেননা রাষ্ট্র বিশ্বের কাছে নিজের প্রকৃত রূপ দেখাতে চায় না। স্নিগ্ধতার বাতাবরনে রেখে মানুষকে শোষণ করাই রাষ্ট্রের কাজ। আর তা ধরা পড়ে যায় লেখকের চোখে –
         “না, শেষ অবধি তাদের ফেরাল না এই শহর। কেনই –বা ফেরাবে। যারা সীমানা ডিঙোয় তারা যতই অনুপ্রবেশকারী হোক, ভোটার তো বটে। তাছাড়া, শহরটাকে ঠিকঠাক গড়ে তুলতে গেলে শ্রমিকের যোগানটাও তো অপ্রতুল থাকা প্রয়োজন। সুতরাৎ সেইসব হাড়-হাভাতেদের নিয়ে পত্তন হলো জবরদখল বসতি। সেটা শহরের প্রান্তে নয়, একেবারে শহরের প্রাণকেন্দ্রে। এবং সে-সবকে আদৌ পাড়া বলা যায় না। চলতি ভাষায় যাকে বলা হয় বস্তি। সভ্য ভাষায় বলা যেতে পারে কলোনি। অর্থাৎ শহরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য মোতাবেক এখানেও গজিয়ে উঠলো সর্বহারা অঞ্চল। উচ্ছেদ করা হলো না বটে তবে অলিখিত শর্ত রইল, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের নামে কোনো আন্দোলন বরদাস্ত করবে না প্রশাসন। কারণ, এখানকার অধিবাসীরা যদিও ভোটার তবু বিধিসম্মত নাগরিক নয়, নিছক উদ্বাস্তু। সরকারি বয়ানে ‘পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি’।‘’ ( অদ্ভুত আঁধার, প্রথম উর্বী সংস্করণ ২০১৬, পৃ. ২৭ )

 একদিকে প্রমোদনগর অন্যদিকে মাতঙ্গিনী কলোনিকে সামনে রেখে লেখক আখ্যান পরিক্রমা শেষ করেছেন। এই কলোনি থেকেই বড় হয়ে উঠেছে বিজু ও রতুরা। পাশাপাশি রয়েছে গোপাল চক্রবর্তী, মিনতিবালা, বকাই সেন সহ বহু চরিত্র। আসলে লেখক বস্তির সম্পূর্ণ জীবনচিত্র অঙ্কন করতে চেয়েছেন। ফলে একটি সমাজের , একটি গোষ্ঠীর সমস্ত স্তরের চরিত্ররা এসেছে।  এইসমস্ত চরিত্র থেকে তিনি বিজুকে বৃহৎ জীবনচেতনায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিণতিতে তিনি বাস্তববাদী। মার্কসীয় জীবনদর্শন থেকে দূরে থাকেন। ফলে চরিত্রের অবধারিত যে পরিণতি তাই দেখিয়ে দেন।

সময় সময় কাহিনিতে তোমার মন নাই কুসুম :
   গল্প উপন্যাস কখনোই কাহিনির উদযাপন হতে পারে না। কাহিনিকে ফেনিয়ে বলার দিন আজ প্রায় শেষ। বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে সাহিত্য আর মানুষ কতদিন পড়বে ? এসসব তত্ত্বকথা বরং থাক, আমরা প্রবেশ করি আলোচ্য উপন্যাসে। উপন্যাসের নামকরণ থেকেই পাঠক একটা আভাস পেয়ে যাবেন লেখক কোন সময়ের কথা বলতে চান। প্রাককথন হিসাবে পাঠককে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে দেশভাগ পরবর্তী উদ্বাস্তু মানুষের এপারে আসা ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী হিন্দু মানুষের  যে স্রোত এপারে এসেছিল সেই সময় এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। শিলিগুড়ির উপকন্ঠে এসেছে কিছু উদ্বাস্তু মানুষ। বড় ভূগোলের অভ্যন্তরে যেমন ছোট ভূগোল থাকে তেমনি বড় সময়ের অভ্যন্তরে থাকে ছোট সময়। সমুদ্রের স্রোতের একটা প্রাবল্য অবশ্যই থাকে কিন্তু সমুদ্রের ঢেউও তো কিছু কথা বলে। সেই পরিবর্তিত সময়, সময়ের পরিবর্তনে মূল্যবোধের পরিবর্তন, সময়ের স্রোতে নতুন প্রজন্ম কীভাবে বেরিয়ে আসছে তা তিনি দেখান।  উপন্যাসের শুরুই হয়েছে তরুণ প্রজন্মের নষ্ট সময়কে সামনে রেখে। আসলে উদ্বাস্তু কলোনির নতুন প্রজন্ম কোন ভবিষ্যতের দিকে যাবে ? এক উদ্দেশ্যহীন ভবিষ্যৎ, যেনতেন প্রকারে নিজেকে স্থায়ী করা যুবকের ইতিবৃত্ত আমরা শুনতে পাই। এক মূল্যবোধহীন সময়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সবাই সবার অধিকার বুঝে নিতে চায়। ফলে বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যেও কোন সামঞ্জস্য নেই। ‘জোর যার মুলুক তার। গুলি মারো কেতাবি বচনে। সুতরাৎ গ্রীষ্ম, বর্ষা যথারীতি দাদাগিরি চালাতো।‘ ( তদেব, পৃ. ১১ ) কিন্তু এই পরিবর্তিত সময়ের কাছে মানুষ কখনোই বশ্যতা স্বীকার করে না। স্বীকার করেনি নায়ক বিজন চক্রবর্তী ওরফে বিজুও। সময়কে সে প্রথম থেকেই ঘৃণা করত, আর এই ঘৃণাবোধ প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল পিতা গোপাল চক্রবর্তী। ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে গোপাল রাগ করত ঠিকই, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেনি। অথচ লেখক সেই ভাবনাকে আর ব্যঙ্গ করে তোলেন সময়কে শ্যামা সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে –“সোমায় বহিয়া যায়, মা / যে জন বুজে না হায় ..” তবে স্ত্রী মিনতিবালা কোন ভদ্রতার ধার ধারেনি। ডিউটি থেকে ফিরে এসে যদি দেখত ছেলেমেয়ে এখনও ঘুমাচ্ছে তবে সরাসরি ‘ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ’ করে গায়ে জল ছিটিয়ে দিত। তখন থেকেই বিজু বুঝছে বন্দি সময়ের কথা। এই ইতিবৃত্ত থেকে সে বের হতে চাইলেও উপায় নেই। আসলে তখনও সে সেই বয়সে পৌঁছায়নি। বিজু নিজের স্বাধীন জীবন খুঁজে পেতে চাইলেও তা পাওয়া যায়নি। কেননা সে তখনও মানুষের স্বাধীন হবার জন্য যে বয়স প্রয়োজন অর্থাৎ বাল্য কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছায়নি। সে জানতে চেয়েছিল কাকে বলে নিজস্ব সময়, কাকে বলে ব্যক্তি স্বাধীনতা।

   সময়ের পরিবর্তনে ইতিহাস কীভাবে মুছে যায় লেখকের দৃষ্টি সেদিকেও আছে। তাই অবিভক্ত বাংলার রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুম ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, লেখকের বয়ান অনুসারে –“ স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মহান কর্তব্যই তো ইউরোপিয় ঠাঁটবাট চুরমার করে দেয়া।“ ( পৃ. ৭১ ) তেমনি কলোনিতে ক্লাব গড়ে ওঠা থেকে  ইরফান খুনের মামলায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, রাজনীতির সুবিধার জন্য আজ বড় কৌশল সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প , তা থেকে মধ্যবিত্তের আত্মখণ্ডন ও আত্মসুখ, বর্তমান রাজনীতি, শাসন ব্যবস্থার গলদ, কলোনিকে সমনে রেখে রাজনৈতিক মুনাফা লুঠ সব লেখক দেখেন ও আমাদের দেখান। তেমনি ছিল প্রমোদনগরে গড়ে ওঠা ক্লাবের নাম কী রাখা হবে, শেষে নানা নামের মধ্য দিয়ে ঠিক হয় ‘ভাই ভাই সঙ্ঘ’। লেখক এসবই অতীব সুন্দর করে এঁকেছেন –“যেহেতু নামকরণ সংক্রান্ত সমস্যা এই কলোনির জন্মলগ্ন থেকেই চালু আছে, তখন ক্লাবের ক্ষেত্রেই বা তার ব্যত্যয় হবে কেন ! যথারীতি মিটিং ডাকতে হলো কামাক্ষাকে। এবার সামনের সারিতে দুটো চেয়ার। পাশের চেয়ারে গোপাল চক্রবর্তীকে বসিয়ে কামাক্ষা প্রস্তাব করল ক্লাবের নাম প্রমোদ সঙ্গ রাখা হোক। কেননা এই নামের জাদু কতটা কার্যকরী সেটা কলোনির সবাই নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝেছে !” ( পৃ. ১০৮ )
 এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউরের পৌষমাস :
  ভাষা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট সব লেখককেই করতে হয়। জীবন ও শ্রেণিচেতনা বুঝে ভাষার প্রয়োগ করতে হয়। তেমনি চরিত্রের  সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা যেন সেই অঞ্চলকেই নির্দিষ্ট করে দেয়। তেমনি লেখক যে সময়ের কথা , জীবনের কথা বা ভূগোলের কথা শোনাতে চাইছেন ভাষাকেও সেই জীবন অনুসারী হতে হবে। অবশ্য এও সত্য বহু লেখক ভাষাকে গুলিয়ে ফেলেন, সংলাপে একই বাক্যে সাধু চলিতের গুরুচণ্ডালী দোষে মিশ্রণ করে বসেন। অলোক গোস্বামী এ উপন্যাসে এক কলোনির ইতিবৃত্ত লিখেছেন। ফলে ভাষাকেও সেই জীবনের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হয়েছে। ওপার বাংলার বাঙালি উপভাষার মানুষদের ওপর এপারের আদর্শ চলিত ভাষা চেপে গিয়ে সৃষ্টি হল এক জগা –খিচুড়ি ভাষা। আসলে সমাজপতিরা ভেবেছিল ভাষা দিয়েই যেহেতু স্বপ্ন রচিত হয় তাই সেই ভাষাটাকেই গুড়িয়ে দেওয়া আগে প্রয়োজন। তবে সব ক্ষেত্রে সমাজপতিরা জয়ী হয়নি –“ভাষা সন্ত্রাসকে সম্পূর্ণ প্রতিহত করা যায়নি। অর্ধেক পরাজয় মেনে নিতেই হয়েছে। অর্ধেক, কারণ পরবর্তী প্রজন্ম দ্বিগুন উৎসাহে নতুন ভাষাসংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে নিয়েছে। নিজের সন্তানের মুখে নতুন ভাষা, নতুন আচরণ, নতুন ভঙ্গী দেখে মানুষগুলো যত আতঙ্কিত হয়েছে ততই নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কারগুলোকে আরও বেশি বেশি করে আঁকড়ে ধরেছে।“ ( তদেব,পৃ. ৩০ ) এ উপন্যাস যেহেতু বস্তি জীবনের ইতিবৃত্ত তাই শব্দ প্রয়োগেও লেখককে সেই জীবনের কাছে যেতে হয়েছে। শব্দগুলি আপাত অর্থে দৃষ্টিকটু হলেও লেখক এমন এক বৃত্তান্ত রচনা করেন যেখানে অশ্লীলতা উড়ে গিয়ে জীবনের গভীর তলদেশে পাঠককে নিয়ে যান। আমরা সামান্য দৃষ্টান্তে তা দেখব, সম্পূর্ণ জানার জন্য মূল উপন্যাস পাঠ ব্যতিত অন্য উপায় নেই। বিজুর স্কুলের ঘটনা। বাদল ও কালু মার্বেল খেলছিল। প্রথমে বাদল জিতলেও পরে হারতে শুরু হওয়া মাত্র অনিয়ম বা ‘চোট্টামো’ শুরু করে। যেহেতু কালুর শক্তি কম তাই প্রহারে সব মার্বেল দিয়ে দেয়। কালু জানতো মারপিট বৃথা, পরিবর্তে সে অমোঘ বাণ প্রয়োগ করে –“নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত কয়েক-পা পিছিয়ে এলো। তারপর প্যান্টটা ঝপ করে নামিয়ে নুঙ্কুটা বের করে কোমর দুলিয়ে বলল, ‘তোর মায়েরে চুদি।‘’ (তদেব,পৃ. ১১২ ) শহরের আপাত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে এ শব্দ অশ্লীল মনে হতে পারে কিন্তু  বস্তিজীবনে এ শব্দ স্বাভাবিক। এ দৃশ্যের পর লেখক যে ঘটনা বলয় তৈরি করলেন তাই মূল লক্ষ। এ শব্দ উচ্চরণে কালুর স্কুলে আসা বন্ধ হওয়ার ফলে রুটি পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বস্তির মানুষের কাছে শিক্ষা অপেক্ষা রুটিই যে প্রধান তা লেখক দেখান। বাড়িতে রুটি না পৌঁছানোয় কালুর বাবা ঘটনাটি জানতে পেরেছে, নচেৎ নয়। তেমনি এ ঘটনাকে সামনে রেখে লেখক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক-শিক্ষিকার অবৈধ সম্পর্ক ও মেরুদণ্ডহীন বাঙালির যে চিত্র অঙ্কন করলেন তা এক কথায় অনবদ্য।

  বিজুর মাতা মিনতিবালা। তিনি যেহেতু রীতিমত রোজগার করে সংসার চালান তাই পুত্র কন্যা সহ স্বামীকে কোন মধুর বাক্যে সম্বোধন করেন না। কন্যা রতুকে উদ্দেশ্য করে ইরফানরা গালি দিয়েছিল। সেও বস্তির বাস্তব চিত্র। এ ঘটনা শোনার পর মিনতিবালা কন্যাকে উদ্দেশ্য করে যা বলে তাও বাস্তব –“চুল ধরে টানতে টানতে রতুকে এনে ফেলে উঠোনে। লাথি, কিল, থাপ্পড় মারতে মারতে গর্জে চলে, ‘খারাপের এ্যাহনই দেখছস কী ? মায়ে মুখে রক্ত তুইল্যা রাইতভর অইন্যের গু-মুত ঘাটে, আর মেইয়ে গরম খাইয়া বেরায়। কুনহানে তুর অ্যাতো গরম থাহে আইজ দেখমু।“ (তদেব, পৃ. ৮৭ ) এক নিদারুণ ব্যঙ্গের চাবুকে লেখককে এসব অঙ্কন করতে হয়েছে। তবে সে ব্যঙ্গে এক মধু মিশে থাকে। পাঠকের চোখ যেন নতুন করে খুলে যায়। তিনি আঘাত করেন, কখনও ছুড়ি চলান কিন্তু তাঁতে রক্তের দাগ লেগে থাকে না। না বিষয়ে তাঁকে মোপস্যার সাথে তুলনায় বসছি না, অতবড় আহম্মক নই। কিংবা সমাজকে কোন শিক্ষা দেবার জন্যও তিনি কলম তুলে নেননি। আসলে জীবন ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন। আর তা পেরেছেন সার্থকভাবে , তা বলাই বিধেয়।

স্বপ্ন... স্বপ্ন... স্বপ্ন...স্বপ্ন দেখে মন... :
মধ্যবিত্ত- নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন স্বপ্নের মূল্য কতটুকু ? অথচ স্বপ্ন নিয়েই তো জীবন গড়ে তোলা। সেই স্বপ্ন ও স্বপ্নহীনতার আখ্যান এ উপন্যাস। তবে এও বলে রাখা ভালো সেই জীবনস্বপ্ন গড়ে তুলতে গিয়ে তিনি কোন দর্শনে পা দেননি। চরিত্রের যা স্বাভাবিক পরিণতি তাই দেখিয়েছেন।বিজু দেখেছিল পিতার সমস্ত স্বপ্ন কীভাবে ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু তা বিচার বিশ্লেষণের বয়স তখন তাঁর হয়নি। সেই স্বপ্নহীন পিতার সন্তান হিসাবে সে কোন স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু জীবনে বা নির্মাণে তো ভাঙার আগে থাকে গড়ার ইতিবৃত্ত। স্বপ্ন ভাঙার আগে থাকে স্বপ্ন গড়ার কথা, লেখক সেদিকে নজর দেন –
“বাবার স্বপ্নভঙ্গের ঘটনাগুলো বিজুর চোখের সামনে ঘটেছিল ঠিকই কিন্তু বিজু দেখেনি সেসব। অর্থাৎ, তখন যা বয়স ছিক সে বয়সে বোধ-বুদ্ধি জন্মায় না। সুতরাৎ স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নভঙ্গ, দুটো বিষয়ই তখন ছিল বিজুর নাগালের বাইরে। নাহলে ঘটনাগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে বিজু বুঝতে পারত স্বপ্ন চুরমার হওয়ার অর্থ তার স্বপ্নও চুরমার হয়ে যাওয়া। মানুষ তো স্বপ্ন দেখে তার সন্তানের জন্যই। অবশ্যই তখন টের পায়নি মানেই তো এ নয় যে জীবন স্বপ্নভঙ্গের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু ভাঙার গল্প তো আসে পরে, প্রথমে থাকে গড়ার গল্প। সুতরাৎ বিজুর জীবনের প্রথম স্বপ্নটার কথাই হোক আগে।“ (পৃ. ৬৬)

বিজু প্রথমে পাড়ার মস্তান বকাই সেনকেই আদর্শ মানুষ হিসাবে মনে করেছিল। কিন্তু বকাইয়ের মৃত্যুতে সে পড়াশোনায় মন দেয়। ভেবেছিল বৃহৎ জীবনে পৌঁছে যাবে। এমনকি মিষ্টির দোকান থেকে পুরাতন বই নিয়েও সে পড়াশোনা চালায়। বৃহৎ জীবন চেতনায় সে গিয়েওছিল, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের ইন্দ্রজিতের মত ভেবেছিল ‘আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি’। বস্তির স্কুল থেকে শহরের স্কুলে যেতে চেয়েছিল তবে শেষপর্যন্ত সে হয়েছে চৌকিদার। বিজু ভেসে গিয়েছিল কল্পনায় মাধুরীর প্রেমে। বিজু  ও মাধুরীকে কেন্দ্র করে লেখক কল্পনা থেকে জাদুবাস্তবে গিয়েছেন। আসলে প্রত্যেক পুরুষের কল্পনাতেই কোন না কোন নারী থাকে, যার সঙ্গে কল্পনায় কথা বলা যায়, মাধুরীও যেন তেমন। বিজু প্রথমে চাকরি পেয়ে আনন্দিত হলেও পরে তা বিষাদে পরিণত হয় কেননা একজনের পেটে লাথি মেরে এই চাকরি জুটেছিল। লেখক বিজুকে নিয়ে গেছেন অবচেতন জগতে , সেখানে মাধুরী ছাড়াও সে মিশেছে অনুর সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত বিজু ফাঁসিতে এগিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের কাছে বিজুর মত সাধারণ মানুষের মূল্য কতটুকু। আর লেখকও আমাদের শোনান –
“যদি ছেড়ে দেয় জেল থেকে, কী করব ? ফের স্বপ্ন দেখব আর দেখে যাব সে সব স্বপ্নের লাগাতার ভেঙে পড়া? না গো বাকাইদা, আর পারব না সহ্য করতে। তাই সব স্বপ্নটা জমাট বাঁধার আগেই চুরমার করে দিতে ওভাবে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করেছি। স্বপ্ন আমাকে ফের একবার হারিয়ে দেওয়ার আগে আমিই জীবনে প্রথমবার স্বপ্নকে হারিয়ে দিতে চাই। একজন জন্মজব্দ মানুষের কি মৃত্যজব্দ হতেও ভালো লাগতে পারে বকাইদা ?” ( পৃ. ২৪২ )

রতু বা রত্না চক্রবর্তীর স্বপ্নও ভঙ্গ হয়েছে। রত্না একে ইরফান, বকাই সেন ও সুরেশের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে কিন্তু কোনটিতেই সফলতা আসেনি। বন্ধুর কাছে প্রতিজ্ঞা রাখতেই সে ইরফানের সঙ্গে জড়িয়েছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ইতিবৃত্তের জন্যই মৃত্যু ঘটেছিল ইরফানের। আর লেখক এ ঘটনাকে জড়িয়ে দিয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিমের সাম্প্রদায়িকার সঙ্গে। এরপর রতু জড়িয়ে যায় বকাই সেনের সঙ্গে। সে ইতিবৃত্ত বিজু জানতো কিন্তু অর্থ লোভের কাছে পরাজিত হয়। আসলে নিম্নবিত্ত তো এভাবেই হেরে যায়, সামান্য অর্থের জন্য, সুখের জন্য বৃহত্তর ফাঁদে পা দেয়। এই রত্নাই হারিয়ে গেছে, বিজু শত চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি। সে দিদির খোঁজে পতিতালয় পর্যন্ত গিয়েছিল কিন্তু সেখানের খোঁজ মেলেনি। কিছু নিম্নবিত্তের স্বপ্ন বুঝি এভাবেই হারিয়ে যায়। মিনতিবালা চেয়েছিল হসপিটাল সুপার থাকতে থাকতে ছেলের একটা চাকরির ব্যবস্থা করে নেবে কিন্তু সুপার পরিবর্তন হতেই মিনতিবালার স্বপ্ন অন্ধকারেই থেকে যায়।

এবার বিদায়বেলার সুর ধরো ধরো ও চাঁপা, ও করবী :
সময়, সমাজ, উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক  সংকট, ভণ্ডামী, মানুষকে শোষণের কলাকৌশল, বিশ্বাস- সংস্কারের দ্বন্দ্ব, সংস্কার থেকে নতুন প্রজন্মের বেরিয়ে আসা, স্বপ্নের হাতছানি  ও ব্যর্থতা, পুরাতন ধ্যান ধারণাকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা, কল্পনা, চেতন-অবচেতন, মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিয়তিবাদ, মধ্যবিত্তের বেঁচে থাকার মিথ্যা অভিনয় সমস্ত মিলিয়ে এক অনবদ্য আখ্যান নির্মাণ করেছেন অলোক গোস্বামী এ উপন্যাসে। আর সে নির্মাণ এগিয়ে গেছে যথার্থ ভাষা প্রয়োগে। আসলে ভাষা ও শব্দ ব্যবহারের অব্যর্থ কৌশলেই তো উপন্যাসের নান্দনিক সৌন্দর্য গড়ে ওঠে। শুধু এ গ্রন্থ নয় অলোক গোস্বামী সব গল্প উপন্যাসেই শব্দ ও ভাষা প্রয়োগে সচেতন, এজন্যেই বোধহয় তাঁর লেখার পরিমাণ কম ! পাঠককে সামান্য গদ্যের স্বাদ দেওয়া যেতে পারে, যদিও তা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো –
“সত্যকে তুলে ধরতে, ধর্মকে পুনর্স্থাপন করতে যুগে যুগে কেউ না কেউ হাজির হয়ই। তাকে দাবানো যায় না। সে  হয়ে ওঠে যুগপুরুষ। সেই যুগপুরুষের দায়িত্ব শেষ হলে আসে নতুন যুগপুরুষ। যেমন ছিল মোহিত ঘোষ। যেমন কি না গোপাল চক্রবর্তী। যথারীতি এই ঘটনাও চোখের পলক ফেলার মতো নিমেষে ঘটে না। যেভাবে কলোনি প্রতিষ্ঠার পর চার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল মোহিত ঘোষের আবির্ভাবের জন্য, সেভাবেই তার অন্তর্ধানের পর আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয় গোপাল চক্রবর্তীর আবির্ভাবের জন্য।“ ( পৃ. ৩৯ )
 এ কলোনির মানুষদের ওপারে যাবার সম্ভবনা থাকলেও ভোটের মুনাফা লুঠের জন্য রাজনৈতিক দল গুলি পাঠায়নি। সে সময় চালু হয়েছিল অনুপ্রবেশ আইন। কিন্তু আজ ‘NRC’ এর কারণে ওপার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষেরা এক ভয়ংকর সংকটের মুখে। সে সংকটকে সামনে রেখে অলোক গোস্বামী নতুন কোনো উপন্যাস লিখবেন কি না তা আমাদের জানা নেই ! আর সেটা জানার জন্য অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই !


মলয় মজুমদারের গল্প : স্বপ্ন -- একটা যন্ত্রণার কাব্য


প্রকাণ্ড এক ঢেউ ছুটে আসছে, অথচ এই শহরের আশেপাশে তো কোন সমুদ্র নেই,  আছে একটা নদী, যা শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে । বর্ষাতেও এই নদী এই শহরকে প্লাবিত করে না।  অথচ এই ঢেউ এলো কোথা থেকে ? যা সুজাতার শরীরকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইছে । ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে কোন বিন্দুহীন দেশের ঠিকানায় । জন-মানব বর্জিত এক প্রান্তে সে দাঁড়িয়ে, শুধু বহু দূরে লিকলিক করে জ্বলছে জ্বলন্ত কিছু । বোঝা যাচ্ছে না ওটা আসলে কিসের আলো । কিন্তু জ্বলন্ত আলোটা তীব্রভাবে এসে লাগছে চোখের ভেতর । আলোটা অনেকটা লিকলিকে সাপের মতো ।  ঢেউটা সুজাতাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে ।  বুল-ডোজারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেই প্রকাণ্ড ঢেউয়ের চাক । শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঢেউকে যতবার আটকানোর চেষ্টা করছে, ঠিক ততো বেশি উদ্দোমে সেই ঢেউয়ের চাকটা এসে আছড়ে পড়ছে শরীরে ।

আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে  বিশাল প্রান্তর । রাত না দিন ? ঠিক করে উঠতে পারছে না কিছুতেই । চারিদিক ধূধূ করছে শুধু শূন্যতা । চাঁদ নেই । তারা নেই । কি আছে আশেপাশে ? সুজাতা দেখতে চাইলো । না কিছুই দেখা যাচ্ছে না । স্থবির একটা বেদনা , নাকি আনন্দ ! কি দেখছে এই সব ? চিৎকার করে উঠতে গিয়ে থেমে গেলো । গলার শ্বাসটা কেমন যেন রুদ্ধ হয়ে আসছে । জল-শরীর-মন একাকার । আর কিছু নেই । দৃশ্যের পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত । কখনো ধূধূ প্রান্তর । কখনো সমুদ্র । ধূধূ প্রান্তের মাঝখান দিয়ে ছুটে যাচ্ছে কালো কালো ঘোড়ার দল । প্রকাণ্ড ওই ঢেউ আর ঘোড়াদের গায়ের রঙ একই রকম । কালো কুচকুচে । ঘোড়াদের শরীরগুলো দুমড়ে মুচড়ে এমন আকার নিছে যেন সেই সামুদ্রিক ঢেউ পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে ঘোড়ার শরীরে, আর  ছুটে চলছে আবহমান কাল ধরে । গন্তব্য সেই বিন্দুহীন দেশের ঠিকানা ।

কি হচ্ছে এই সব ? অনেকক্ষণ ধরে বোঝার চেষ্টা করতে করতে, গায়ে একটা ঝাঁকুনি অনুভব  করলো, পিছন ফিরে দেখতে চাইলো, না কেউ নেই, তবে কে তার গায়ে হাত দিল । শরীরটা নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে  সে সব সময় , অথচ সে দেখতে পেলো না, কে তার শরীর স্পর্শ করলো ? কে সে নারী ? নাকি পুরুষ, তার শরীর তো ভেজা ! নাকি শুকিয়ে গেছে ! কিছু অনুভবে করতে পারছে না। তার শরীরের উপরেই তো আঁচড়ে পড়েছিল সামুদ্রিক  ঢেউয়ের চাক । আর সে ভিজছিল, শরীরের উষ্ণতাকে ছিবড়ে নিয়েছিল ঢেউ । গন্ধ অনুভব করেছিল , লবণের গন্ধ । অথচ এখন আর সেই গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে না । অজানা হাতের স্পর্শের পরেই সব কিছু  দুম করে কোথায় হারিয়ে গেলো ।  আর ঘুম ভেঙে গেলো সুজাতার ।

চোখ খুলেই বুঝলো আবার একটা স্বপ্ন , জীবনের পঞ্চাশটা বছর পার করার পরেও এই স্বপ্নগুলো তাকে ছেড়ে যায়নি । কবে থেকে শুরু হয়েছিল,সেটা এখন আর মনে করে উঠতে পারে না । প্রথম প্রথম মনে হতো বয়সের দোষ , তারপর সেটা কিভাবে  জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠলো , খেয়াল রাখেনি । উথাল-পাতাল এই জীবনে কখনো ভেঙে পড়েছে, আবার কখনো নতুন উদ্দোমে জেগে উঠেছে  বাঁচার জন্যে । ভাঙা-গড়ার এই দুই মিলনকে সঙ্গে করেই এতোটা বছর পার করেছে সে । থিতু হতে পারে না, একটা ভাঙা পথ পার হবার পরেই , কিছুটা শান্তির রাস্তা, তারপর আবার সেই ভাঙা পথ । আর ওই ভাঙা পথেই সে আবিষ্কার করে জীবনের নতুন নতুন বোধের অধ্যায় ।




(২)


দ্রুত বর্ধনশীল শহর এটা । যারা দু’মাস আগে শহরটাকে দেখে গেছে । আজ এলে চিনবে না অনেক কিছুই । এই শহরেই সুজাতার জন্ম ও বসবাস । নানা ভাষাভাষী, নানা ধর্ম, নানা জাত । একটা পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর এটা । অফিস থেকে বেরিয়েই আজ আর রিক্সা ধরলো না । রাতের স্বপ্নটাকে ভুলতে পারেনি সে এখনো । স্বপ্ন আগেও দেখেছে, কিন্তু কালকের স্বপ্নের ভয়াবহতা যেন এতদিনের সব স্বপ্নকে ছাপিয়ে গেছে । একটা ক্লান্তি । চোখে মুখে । শরীরে ও মনে । তবু হাঁটা পথে । কিছুটা এগোতেই মুখোমুখি সুবল । হতচকিয়ে গেলেও সামলে নিতে সময় লাগলো না সুজাতার । সুবল, কলেজ লাইভের পরিচিত একটা নাম, বখাটে ছেলে হিসাবে পরিচিত । ভোটে ভাড়া খাটা লোকজনদের একজন । থমকে দাঁড়ায় সুজাতা , সুবলকে কিন্তু একদম অচেনা লাগছে । পরনে দামী সুট । হাতে দামি সিগারেট । ঝাঁ চকচকে সানগ্লাস । হাতের চাবি দেখেই বোঝা যায় , ওটা কোন দামী গাড়ীর চাবি ।
কিরে কি খবর তোর ।
এই তো, তোর খবর কি ? একদম চেনা যাচ্ছে না ।
মুচকি হাসে সুবল । কিছু না বলে ফুটপাতের দিকটার দিকে ইশারা করে ।  যেখানে মানুষ জনের যাতায়াত কম । সুজাতা ইশারায় সারা দেয় ।
তা বেশ তো বড়লোকের মতো লাগছে দেখতে ।
শুধু লাগছে, বড়োলোক মনে হচ্ছে না?
সুবলের এই  রকম জবাবের জন্যে প্রস্তুত ছিল না সুজাতা । সুবল বললো, “চল, সামনে একটা কাফে আছে, ওখানে গিয়ে বসি, অনেকদিন পরে দেখা, তাড়াহুড়ো নেই নিশ্চয় ?”

কিসের আর তাড়াহুড়ো, এই অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি ।

রাজনীতির ভাড়াটে গুণ্ডা , আজ কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে না ।  ইলেকশনে যার মারুতি ভ্যানে বোঝাই থাকতো বোমা ও বারুদ । অবশ্য পার্টি অফিসের  নির্দেশ ছাড়া বোমা বারুদের  ব্যবহারে কোন অনুমতি ছিল না  । তাই  বিয়ারের বোতল নিয়ে এদিক ওদিক টহল দিতে দেখা যেতো সুবলকে । আশির দশকের পরের কথা । এতো কিছু একদিনে জানেনি সুজাতা । দাদার দলের ভাড়া খাটাতো সুবল । বাড়িতে যাতায়াত অবাধ । ধীরে ধীরে বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল । সেই সুবল এখন সুজাতার মুখোমুখি । সুবলের থেকেই ইলেকশনের গল্পগুলো শোনা । বেশ রসিয়ে ও গর্বের সঙ্গে বলতো  । কতটা সত্যি , সেটা অবশ্য প্রশ্নাতীত । তবে সত্যের যে একটা আভাস আছে, সেটা বুঝেছিল সেদিন । যেদিন প্রথম বুথে বোমা পড়লো । যার নায়ক বা খল-নায়ক ছিল সুবল ।

একটা ফাঁকা  টেবিল দেখে ওরা বসে পড়লো । কিছু অর্ডার করার আগেই, সুজাতা বললো,’এখানে ভালো কাটলেট পাওয়া যায়, ফিস কাটলেট ।’ কথা শেষ হতেই অর্ডার দিল ফিস কাটলেটের । এটা একটা দারুণ স্বভাব সুবলের । কোন কিছুতেই দেরি না।  সুবলের মতো ভাড়াটেদের পার্টির মেম্বারশিপ দেওয়া হতো না । শুধু খেপ খাটার জন্যে নেওয়া হতো ।

তোকে কিন্তু একদম অন্য রকম লাগছে, কি হয়েছে ? সামনে থেকেও মনে হচ্ছে কতো দূরে বসে আছিস। কোন প্রবলেম? ‘
সুবলের কথাতে সুজাতার চিন্তায় খেদ পরে, নিজেকে সামলে, “ না তেমন কিছু না । কিছু স্মৃতি মাথার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, ঠিক মেলাতে পারছি না।” কথাগুলো শুনে হোহো করে হেসে ওঠে সুবল । হাসতে হাসতে বলতে থাকে,”তুই বা তোর বাবা দুজনের কেউ ঠিক চেঞ্জ হলি না । তোর বাবা, যেদিন পার্টি ক্ষমতায় এলো, তারপরই পার্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। মাইরি তোর বাবা একটা ছিল বটে । ওই রকম ভাবতেও ভয় করে ।”


সেই জন্যেই তো আজকের এই অবস্থা, ভালো নতুন প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিলো, যাতে কোন প্রশ্ন না হয় । বাবার মতো বুড়োরা অনেক আগেই বুঝেছিল পার্টির এই পরিণতির কথা ।
এখনো তো বুড়োরাই পার্টিটাকে চালাচ্ছে ।
উপায় কি বল, ধান্ধাবাজগুলো দল-পরিবর্তন করেছে । বাকিরা এখন বউকে নিয়ে শপিং মলে লাইনে দাঁড়িয়েছে । আর বুড়োগুলো চেয়ারের লোভ এখনো ছাড়তে পারেনি।
তা যা বলেছিস ।
কিন্তু তোর এই পরিবর্তন কি করে, লটারী পেলি নাকি ?
সুজাতার এই রকম প্রশ্ন করবে যেন সুবল জানতোই । যেই প্রশ্ন সেই উত্তর । “ উত্তর খুব সহজ ! ঠিকাদারি আর সিন্ডিকেট । আর এখন তো জমানা পাল্টে গেছে । আগের মতো রাখঢাক নেই যারা তোর বাবাদের পার্টির হয়ে কাজ করতো, এখন সবাই সবুজে মিশেছে । তা তুই আবার বিয়ে করলি না কেন ?’

ধুর একবার বিয়ে করে যা দেখলাম, আবার সে সব কিছু দেখার ইচ্ছে নেই’
সবাই কি আর এক রকম হয় নাকি ?’
কে জানে , তবে ভয়টা তো একই রকম থেকে যায় ।
সেটা ঠিকই, তবে এগোতে হয় সব সময়, কোন কিছুই তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না ।
বাবা বেশ দার্শনিক হয়ে উঠেছিস দেখছি ।
দার্শনিকের কি আছে, এটা স্বাভাবিক কথা । সবাই জানে ।
তবে যাই বল, তোর কিন্তু ব্যাপক চেঞ্জ হয়েছে । যদিও অনেকদিন পরে দেখা, অনেকদিন মানে বেশ কিছু বছর পরে দেখা । তুই না চিনলে আমাকে , তোকে কিন্তু চিনতে অসুবিধা হতো আমার।
খুব কি চেঞ্জ হয়েছি ? আগের থেকে একটু মোটা হয়ে গেছি, এই যা ।
সেটা তো হয়েছি, তবে গ্লামারটা বেশ বেড়েছে, বউ ছেলে মেয়ে কেমন আছে ।
আছে, একদম ঠিকঠাক । একটাই ছেলে । স্কুলে পড়ে । ক্লাস সিক্সে । রাঘবদা তো এখন দিল্লীতে?
হা, সেই যে গেছে আর এমুখো হয়নি ।
বাড়িটা তো একদম প্রায় ফাঁকা তোদের ।
বাড়ি আর কোথায় ? এখন তো ফ্ল্যাট হয়ে গেছে ।
ও হা, আমিই ভুলে গেছিলাম ।
হা, কাকা ও কাকীমা, মাঝে মাঝে কাকার মেয়ে জামাই এসে থাকে । আর আমি তো একা । মেয়েটিকে হোস্টেলে দিয়ে রেখেছি । এখানে থাকলে আমিও সময় দিতে পারছিলাম না ঠিক করে । আর জানিস তো এখনকার ছেলে মেয়ে , চোখে চোখে না রাখলে কি থেকে কি করবে ঠিক নেই । হোস্টেলে একটা গাইডেন্স এর মধ্যে থাকে । খরচটা একটু বেশি ,এই যা ।
এক দিকে ভালো করেছিস । তবে ওই আর কি ছেলেমেয়েরা কাছে থাকলে আলাদা সুখ হয় ।
কি  করা যাবে, সবার তো সব সুখ জোটে না ।
এবার উঠবো রে । আমার ফোন নাম্বারটা নিতে পারিস ইচ্ছে করলে ।
হা দে, যদি কোন দরকার হয় ফোন করে জ্বালাতে পারবো ।
তোর নাম্বারটা বল, আমি মিস কল দিচ্ছি ।

দু’জনে বাইরে এসে দাঁড়ালো । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সুজাতা হাঁটা দিল বাড়ির দিকে, সুবল চলে গেলো অন্যদিকে ।  সুবলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনটা একটু অন্য রকম হয়েছে । গুমোট ভাবটা এখন আর নেই । মাঝে মাঝে ভৌতিক মনে হয় নিজেকে সুজাতার । অনেক স্বপ্নতত্বের বই পড়েছে , অনেক কিছু পেয়েছে , কিন্তু এই ভৌতিক স্বপ্নের কোন খোঁজ পায়নি । এখনো খুঁজে বেড়ায় । স্বপ্নতত্বের কোন বই পেলেই হলো । মাঝে মাঝে বইপাড়াতে যায়, শুধু স্বপ্নতত্বে বইয়ের খোঁজে । নতুন পুরনো যা জোটে কিনে ফেলে । এটা যেন অভ্যাস হয়ে গেছে এক প্রকার । মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো থেকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড শুরু করে ওয়াং চং, হিপোক্রেটস কেউ বাদ নেই, আরো কত নাম, মনেও থাকে না । অথচ কোন কিনারা পেলো না কোথাও  আজো ।

অফিসে যাবার সময় কাকিমা বলেছিল আজ বুল্টি আসবে । বুল্টি মানে কাকিমার মেয়ে । পড়াশুনায় ভীষণ ভালো ছিল । বি টেক করে বেঙ্গালুরে চাকিরও পেয়েছিল । কিন্তু যাওয়া হয়নি । যা হয় মধ্যবিত্ত পরিবারে, এখন বিয়ে করে পুরো সংসারি । তালা খুলতে খুলতে বুল্টি এসে হাজির ।

দিদি এতো দেরি করলি কেন ?
আরে ফেরার পথে সুবলের সাথে দেখা হয়ে গেলো । তোর মনে আছে সুবলের কথা ।
ওই যে গুন্ডা মতো ছেলেটা , দাদার কাছে খুব আসতো ।
হা , সেই গুন্ডাটা । এখন আর গুন্ডা নেই ।
ছাড় ওর কথা । জানিস কি হয়েছে,শিখাদির অ্যাসিডেন্টে মারা গেছে, মা ও মেয়ে ফিরছিল , দুজনেই স্পটে শেষ ।
কি বলিস রে । মেয়েটি কি সুন্দর দেখতে ছিল । কি দিন কাল পড়েছে রে । কার কখন কি হয় , কেউ বলতে পারে না ।

(৩)

বাড়ির লোকজন দেখেশুনে দিয়েছিল বিয়েটা । তার অনুমতি কেউ নেয়নি । সাত দিনেই বিয়ের দিন পাকা কথা ।  অশেষ বেশ ভালো চাকরি করে । দেখতেও বেশ ভালো । সুজাতা দেখতে মাঝারী ধরণের । খুব সুন্দরী না, তবে খারাপ না । দু’জনকে মানিয়েছিল বেশ । ওই টুকুই, আর কোন মিলছিল না ।  অশেষের বদমেজাজি স্বভাব, তার উপর সন্দেহবাতিক মন এবং টিপিক্যাল স্বার্থপরের মতো স্বভাব । নিজের আমিত্ব ছাড়া কিছু বুঝতো না । এমন ধরণের মানুষ সুজাতা কোনদিন দেখেনি, ছোট থেকে দেখেছে বাবা মাকে কোনদিন অবহেলা করেননি । বিয়ে পর থেকেই অশেষের অবহেলা ভীষণ ভাবে সুজাতাকে আঘাত করতো শুধু রাতের বাতি নিভে যেতেই, উন্মাদ-পশুর  মতো শরীরটা নিয়ে খেলা, আর খেলা শেষ হলেই সব চুপচাপ, ঘুমের মধ্যেই ডুবে যেতো, পাশে যে কেউ আছে, সে দিকে কোন দৃষ্টি থাকতো না। কিছু আগেই যে শরীর নিয়ে পাশবিক ভাবে নাড়াচাড়া করেছে, সেই  শরীরের কোন যে অস্তিত্ব আছে বিছানায়, সেটা অশেষের মনে হতো কিনা জানেনা । সুজাতা জেগে থাকতো । অন্ধকারের দিকে দুচোখ খুলে । মশারির দেওয়াল ভেদ করে চোখটা ছুঁয়ে ফেলতো কংক্রিটের ছাদ । তখন অন্ধকারকে আর অন্ধকার মনে হতো না । সব যেন স্বাভাবিক চোখেই দেখে ফেলা সবকিছু, ঘরের আসবাব,ড্রেসিং টেবিল, আলনা, আয়না, এমন কি টেবিলের উপরে রাখা পেনের স্ট্যান্ড পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যেতো । ফ্যানের ঘূর্ণায়মান দ্রুততা সুজাতার চোখের মতো স্থির হয়ে যেতো ।  কি অদ্ভুত লাগতো । মনে হতো ফ্যানটা আর ঘুরছে না । স্থির হয়ে বাতাস ছুঁড়ে দিচ্ছে সারাটা ঘরে । আর সেই বাতাসে সুজাতার শরীরটা কুঁকড়ে থাকতো বিছানার সঙ্গে । যেন একটা গাছের সব সতেজ ডালা পালার ভিড়ে, সুজাতার শরীর ঝুলে আছে মরা একটা ডালে ।


বিয়েটা ভেঙেছিল ছ’ মাসের মধ্যে । পুরুষ মানুষ যে এতো সন্দেহবাতিক হয় । জানাছিল না সুজাতার । বিয়ের দিন  থেকেই লক্ষ্য করেছিলো । বুঝেছিল সৌমিত্র বসুর কথার মাঝে অশেষ এর তির্যক মন্তব্যে । সৌ্মিত্রও বুঝেছিল ।  কথা না বাড়িয়ে চুপ করে চলে গিয়েছিল । সৌ্মিত্র একদা কম্যুনিস্ট পার্টি তাত্বিক নেতাও এখন পাল্টি খেয়ে যোগ দিয়েছে শাসক দলে । রিলেশনটা ছিল বাবার দিক থেকে । রাজনৈতিক রিলেশন । স্কুল লাইভ থেকেই রাজনীতি করতো সৌ্মিত্র । সময়টা ছিল সত্তরের দশকের শেষ দিকেরটা । বাবাও তখন রাজনীতিতে সক্রিয় । এমার্জেন্সির অন্ধকার থেকে মুক্তির হাওয়া চারিদিকে  । সুজাতা তখন ক্লাস এইটে ।

সৌমিত্রকে নিয়ে কত মন গড়ন কাহিনী দিয়ে দিনের পর দিন অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছে সুজাতা, অশেষের  কাছ  থেকে । বিয়ের দিনে শুধু ছোট্ট একটা ঠাট্টার কারণে । ছ’মাস মুখ বুজেই সব সহ্য করে গেছে। কিন্তু বেশিদিন  পারেনি । একদিন মধ্যরাতেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিল । তারপর আর ফেরেনি । মেয়ে জন্মানোর আগেই ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছিল । বাড়ি ও আত্মীয়-স্বজনরা  বলেছিল যে এটা ঠিক হচ্ছে না । কিন্তু সুজাতা কারো কথা শোনেনি । কারণ সুজাতা বুঝেছিল সন্তানকে বাঁচাতে হলে অশেষের থেকে মুক্তি ছাড়া উপায় নেই ।


বুল্টির ধাক্কায় সুজাতা ফিরে আসে তার অতীত থেকে, কথা বলতে বলতে কখন যে অতীতে তলিয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি ।

(৪)


সব রাতে স্বপ্ন আসে না । কবে আসে বুঝতে পারে না । কিন্তু আসবে । সেটা সুজাতা খুব ভালো করেই জানে । মধ্যরাত অব্দি বুল্টি বকবক করেছে । নিজেও ঘুমাইনি, সুজাতাকেও ঘুমোতে দেয়নি । দুই বোনের এই রাত জেগে খুনসুটি সুজাতার খারাপ লাগে না । ছোটবেলা-কার গল্পগুলো বেশ মনে রেখেছে বুল্টি । তবে একটা নাম যে এখনো বুল্টির মনের মধ্যে গেঁথে আছে, সেটা প্রাণখোলা হাসির মধ্যেও সুজাতা বুঝতে পারে । রূপম ! হা রূপমকে যে এখনো বুল্টি ভুলতে পারেনি, সেটা কাল রাতে আরো ভালো করে বুঝতে পারলো । স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস বুল্টির ভেতর যে কাজ করছিল । সেটা এড়িয়ে যেতে পারেনি । ষোল বছরের বিবাহিত জীবনও সেই ক্ষতটাকে বোজাতে পারেনি । সুজাতা কিছু বলেনি । কারণ কিছু কিছু স্মৃতি আর স্বপ্ন কখনো ভোলা যায় না ।

দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । প্রায় আটটা । সুজাতা বুল্টিকে একটা ধাক্কা দিল । বুল্টি চোখ না খুলেই জবাব দিলো,"ধুর ! ঘুমাতে দে । বাপের বাড়ি এসেছি একটু আরাম করেনি “। কলিং বেজে উঠলো । দরজা খুলেই দেখলো বুল্টি মেয়ে দাঁড়িয়ে । কাল এসেছে, কিন্তু একবারও দেখা হয়নি । দাদু-দিদার সঙ্গেই মেতেছিল । সুজাতাও ভুলে গিয়েছিল মেয়েটির কথা । খুব ভুল হয়ে গেছে । একবার ও ঘরে গিয়ে দেখা করা উচিত ছিল । “কিরে তুলি এতক্ষণ পরে আমাকে মনে পড়লো” ? সুজাতার কথাতে তুলি একটু লজ্জা পেলো, আমতা আমতা কিছু বলতে যাচ্ছিল । সুজাতা সামলে নিয়ে বললো ,”মজা করলাম রে, জানি তো দাদু-দিদা পেলে সবাই অনেক কিছুই ভুলে যায়, আমিও এই রকমই ছিলাম ।” তুলি বেশ মিষ্টি দেখতে, রঙটা একটু চাপা, কিন্তু গঠন খুব ভালো । নাক-চোখ-মুখ কোনখানে একটুও খুঁত নেই । ঘরে ঢুকেই বললো, “মা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি,তাই না”?
-নিজেই দেখে নে ।
-মা এখানে এলেই শুধু ঘুমায় ।
-ও, তাই বুঝি । বাড়িতে ঘুমায় না ।
-বাড়িতে তো ভোর পাঁচটায় উঠে আমাকে আর বাবাকে জ্বালিয়ে খায়, ওঠো ওঠো করে ।
-আজ তুই জ্বালিয়ে মাকে তোল ।
বলেই সুজাতা বাথরুমে ঢুকে পড়লো ।  ধীর সুস্থে বাথ রুম থেকে বেড়িয়ে দেখে মা ও মেয়ে পরস্পরকে জাপ্টে শুয়ে আছে । বেশ সুখ লাগলো দেখে । নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো । অনেকদিন যাওয়া হয়নি । গরমের ছুটির এখনো দু’মাস বাকি ।
-কিরে তুলি, মাকে ওঠাতে এসে দেখি তুইও শুয়ে পড়লি ।
-নাগো মাসি , মা-ই জোর করে জড়িয়ে ধরে শুইয়ে দিলো ।
-বুল্টি ওঠ, বেলা হয়েছে অনেক ।
তুলি বললো,”মাসি আজ আমাকে মলে নিয়ে যাবে । কতদিন মলে যাওয়া হয়নি “।
-ইস একদম পাকা বুড়িদের মতো কথাবার্তা । কেন ওতো মলে যাবার কি হলো ?
-আমার বন্ধুরা তো প্রায় যায় । বাপি শুধু বাড়ন করে । বলে পড়াশুনায় বিঘ্ন ঘটবে ।
-ঠিকই তো বলে তোর বাপি ।
-চলো না আজ আমি, তুমি আর মা , তিন জনে মলে যাই । খুব মজা হবে ।
-হা, চল রে দিদি, আমারও অনেক দিন শপিং করা হয়নি  ।
-সে দেখা যাবে, এখন তো ওঠ ।
-চা বানা আমি উঠছি ।

বিকেলের দিকে তিন জন মিলে রওনা দিলো ভেগামলের দিকে । এটা নাকি শহরে সব থেকে ভালো মল । তুলির ইনফরমেশন । আজকালকার বাচ্চাদের কাছে সব ইনফরমেশন থাকে, বিশেষ করে তুলির বয়সী ছেলে-মেয়েদের কাছে । একটা টোটো ভাড়া করে তিন জনে উঠে  পড়লো । বুল্টি ও তুলি দুজনে কি সব বিষয় নিয়ে খুব কথা বলছে, কথাগুলো কানে আসছে ঠিক, কিন্তু বুঝতে পারছে না । মোড়ের মাথায় আসতেই শিখাদির অ্যাকসিডেন্ট এর কথা মনে পড়লো । তার সঙ্গে জেঠু ও জেঠিমার চেহারা সামনে এসে দাঁড়ালো । ওরাও একটা অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছিল । গাড়িটা প্রায় দুমড়ে মুচড়ে একাকার । তারপর লেগেছিল আগুন । জেঠু ও জেঠিমা ঝলসে গেছিল সেই আগুনে । সেটা দেখে জেঠুর একমাত্র ছেলে পরিতোষদা পাগল হয়ে কোথায় চলে গিয়েছে । কেউ জানে না । দাদা খুব চেষ্টা করেছিল । থানা পুলিস , পার্টির লোকজন । সব কিছু দিয়ে । কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ পায়নি কেউ ।

বুল্টির ধাক্কায় চিন্তায় ছেদ পড়ে সুজাতার । দেখলো টোটো দাঁড়িয়ে পড়েছে । তুলি বললো,”মাসি তোমার কি হয়েছে । সারা রাস্তা একটাও কথা বললে না । একদম গুমোট মেরে বসে থাকলে, তোমার ভালো লাগছে না মলে যেতে “ ।

আরে না না , সে রকম কিছু না । একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম ।

তিন জনে নেমে ভাড়া মিটিয়ে মলে ঢুকে পড়লো । বিশাল মল । গেট দিয়ে ঢুকতে একটা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরটাকে হাল্কা করে দিলো । শরীরের সাথে মনটাও বেশ ভালো হয়ে গেলো ।  এর আগেই দেখেছে , মলগুলোতে ঢুকলেই শুধু ঠাণ্ডা হাওয়া না, এক ধরণের মন ভোলানো সুগন্ধ  মন ও শরীরকে বেশ তরতাজা করে দেয় ।

তুলি আর বুল্টি এরই মধ্যে একটা দোকানে ঢুকে পড়েছে । কসমেটিকসের দোকান । সুজাতাও সেদিকে এগোতে থাকে । কিন্তু অনেকটা ভুত দেখার মতো যাকে দেখলো । কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি । সৌমিত্রদা । একদা কম্যুনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা । সে কিনা মলে, বউ বাচ্চা নিয়ে ।   সৌমিত্রকে দেখেই , দোকানে না ঢুকে সেই দিকেই এগিয়ে গেলো ।

কি ব্যাপার তুমি শপিং মলে , সূর্য আজ পূর্ব দিকে উঠেছে তো ।

আর বলিস না । এই তোর বউদি প্রায় ধরে বেঁধে নিয়ে এলো । তা তুই ভালো আছিস তো ? মেয়ে কেমন আছে ?
বউদি কেমন আছো ? মানতে হবে তোমাকে, তুমি খেল দেখিয়ে দিলে। সৌমিত্রদা মলে! শপিং করতে এসেছে সপরিবারে !
পার্টিটা ক্ষমতা থেকে গিয়ে বেঁচেছি । এখন তোর দাদাকে একটু আধটু কাছে পেতে পারি । আগে তো তুই ভালো করেই জানিস । তোকে আর কি বলবো ।


ডিভোর্সের পরে সৌমিত্রকে ধরেই চাকরিটা হয়েছিল । যদিও মন্ত্রী  নিরঞ্জন ভট্টাচার্য্য বলেছিল,  “ আমাদের পার্টিতে ওই রকম কিছু পাইয়ে দেওয়াতে রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখে না,তোকে আর নতুন করে কি বলবো” । সৌমিত্রদা  এখন অনেকটা ঝিমিয়ে গেছে । দলবদল করে কি লাভ হয়েছে, কে জানে ? কিছু তো হয়েছে ! নাহলে ছাড়বেই বা কেন ? ক্ষমতার লোভ ? কে জানে ? তবে কানাঘুষোতে শুনেছিল, কি সব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিল । লোক মুখে শুনেছে দলবদল না করলে হয়তো জেল হয়ে যেতো  । পুরোটা জানে না, লাল পার্টি তো , রেখে ঢেকে চলে । বাবাকেও তো দেখেছে । যখন কোন সিরিয়াস মিটিং হতো , দরজার খিল বন্ধ থাকতো , ভেতর থেকে ডাক না এলে কারো ওই মিটিং এর ঘরে ঢোকার ক্ষমতা ছিল না ।


একটু বুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখেছে বাবাকে এই পার্টি জন্যে দিন রাত এক করে দিতে । দিনের পর দিন বাবার দেখা পেতো না । এমার্জেন্সী চলছে তখন । মায়ের মুখ ভয়ে শুকিয়ে থাকতো সব সময় । দাদা তখন সবে ফুল প্যান্ট পড়তে শুরু করেছে । পাড়ায় মাঝে মধ্যেই বোমাবাজি লেগেই থাকতো । রাতে ঘুম ভেঙে যেতো বাইরেই লোকের চিৎকারে । পরের দিন উঠে শুনতো , কেউ মার্ডার হয়েছে । অথবা কারো হাত কেটে নিয়েছে রাম-দা এর কোপে । কথাগুলো ঠিক মতো করে  বুঝতো না, কিন্তু একটা ভয়ের অনুভব মন শরীরকে হিম করে দিতো । কিন্তু কি অদ্ভুত সাতাত্তরে পার্টি ক্ষমতা আসার পর থেকে বাবা কেমন নিজে সরিয়ে নিল পার্টি থেকে । এমনকি মেম্বারশিপ পর্যন্ত রিনিউ করালো না । পার্টি বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও কোন রাখঢাক করতেন না । বার বার একটাই কথা বলতে শুনেছে,”ক্ষমতার লোভ এই পার্টিকে ডুবিয়ে ছাড়বে “ ।


(৫)

তুলিরা চলে যেতেই , পুরো একা । বুল্টিদের গাড়িতে তুলে দিয়ে সুজাতা নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লো । ফ্ল্যাটটা বেশ বড়ো । সে একা । কিনতে হয়নি । বাড়িটা ঠিকাদারকে দিয়ে দাদা থাকাকালীনই বানিয়েছে । সুজাতা একটা ফ্ল্যাট পেয়েছে । সেটাতে সে থাকে । অনেকেই চাপ দিয়েছিল আবার বিয়ে করার জন্যে । সুজাতা কারো কথা শোনেনি । একটু অগোছালো সুজাতা । কিন্তু আজ দেখে কেউ বলতে পারবে না । বুল্টি সারাদিন একটু একটু করে পুরো ঘরটা গুছিয়ে ফেলেছে । রাতে আজ আর কিছু খাবে না । মলে হাবিজাবি অনেক কিছু খাওয়া হয়ে গেছে । দুপুরেও বেশ রান্না করেছিল বুল্টি । খাবারগুলো ফ্রিজে রাখা আছে । এখন কোন কাজ নেই সুজাতার । টিভিটা চালিয়ে সোফাতেই আধশোয়া হয়ে দেখতে লাগলো । টিভি দেখতে দেখতে সুজাতার চোখ ঘুমে বুজে আসছে । সুজাতা হারিয়ে যাচ্ছে ঘুমের দেশে । ঘুমের গাঢ়তার সঙ্গে সুজাতার চোখ খুলে গেলো অন্য এক জগতে । চোখ খুলেই সে দেখতে পেলো ,তাকে ঘিরে আছে অনেক সাপ ।  চারিদিকে কিলবিল নানা জাতের সাপেদের দল । সুজাতা দেখলো সে পুরো নগ্ন । সেই নগ্ন শরীরের উপর সাপগুলো খেলা করছে । তার চামড়ার রঙ পালটে গেছে । সাপগুলোর মতোই তার শরীরটাও কেমন যেন আঁশটে খোলে জড়িয়ে আছে । ছোট বেলায় যে সব সাপের গল্প শুনেছিল বা বড়ো হয়েও দেখেছে টিভিতে, এই গুলো সে রকম না । কেমন যেন । লিকলিকে । চোখগুলো যেন ফেটে বেড়িয়ে আসছে মাথা থেকে । ওদের শরীর থেকে কেমন যেন একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে । সুজাতা বুঝতে পারছে না, সে আসলে কোথায় ? চারিদিকে শুধু সাপ আর সাপ । কিছু সাপ অবশ্য বেশ বড়ো , কেমন যেন খুনখার এর মতো লাগছে দেখতে । কিন্তু কামড়াচ্ছে না । গিলেও খাচ্ছে না  । শুধু চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে । মনে হচ্ছে এটা কোন সাপেদের দেশ ! সাপের দেশের গল্পটা মনে পড়লো । ঠাকুর্মা শুনিয়েছিল । কি যেন ছিল । কি যেন , ধুর শুধু গল্পের কথাটাই মনে পড়লো । কিন্তু গল্পটা মনে পড়লো না । কি যেন ছিল ? ভাবতে ভাবতে চোখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেখতে পেলো, কেউ শুয়ে আছে  । কে ? চেনা চেনা লাগছে । পুরুষই তো মনে হচ্ছে । হা একজন পুরুষ । মুখটা দেখা যাচ্ছে না । সুজাতার মতো নগ্ন সেই পুরুষ । কিন্তু মুখটা ঢাকা । সাপের খোলসে । পরিচিত কেউ কি ? কে জানে ? একবার ডাকার চেষ্টা করলো । এমা একি ? গলার স্বর কি অদ্ভুত । মানুষের আওয়াজ তো না । কিসের আওয়াজ বেরোচ্ছে । নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না । সাপগুলো বেশ মজা করে সুজাতার শরীরের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । নগ্ন শরীরের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সাপেদের দল । স্পর্শ করছে সুজাতার নগ্নতাকে । কিন্তু কোন অনুভব নেই । শুধু ঠাণ্ডার আমেজ । কোনো ক্লান্তি নেই । ওই পুরুষটাও সুজাতাকে দেখছে না । চোখ বন্ধ না খোলা । কিছুই বুঝতে বা দেখতে পারছে না । একবার মনে হলো উঠে দেখা যাক । কিন্তু উঠতে পারছে না । ঠাণ্ডার আবেশে নিথর পাথরের মতো শুধু চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই সুজাতার ইচ্ছেতে ধরা দিচ্ছে না । লজ্জা । অহংকার । ঘৃণা । ভয় । যন্ত্রণা । রাগ । অভিমান, । বিদ্বেষ ।  কিছু নেই  আজ আর সুজাতার মনে । নতুন এক মানুষ আজ সে সাপেদের দেশে ।
...
...

অমিতাভ দাসের গল্প : পাখি ও রাজকুমারী



কনকনগর । এক রাজা এক রানী আর এক রাজকন্যা । গল্পটা কেবল এই  তিনজনকে নিয়ে নয় । আরেক জন আছে । সে হল এক সাহসী যুবক   সুবর্ণকুমার । দরিদ্র । নগরের পশ্চিমে অরণ্যের আগে যে রিমঝিম নদী । সেই নদীর তীরে ছোট্ট এক কুটিরে সে থাকে । নৌকা চালায় । খেয়া পারাপার করে । বাবা - মা মরে গেছে অজানা এক জ্বরে কিশোরবেলায় । আছে বুড়ি ঠাকুরমা তার । সব ভাব- ভালোবাসা , আদর- আবদার ঠাকুরমার কাছে ।

একদিন সুবর্ণকুমারের নৌকায় উঠেছিল এক ভিনদেশী জাদুকর । সুবর্ণের মধুর ব্যবহারে খুশি হয়েছিল । অরণ্য গভীরে পর্ণকুটীরে কয়েকদিন বাস করেছিল জাদুকর । তাঁর সেবা করত সুবর্ণ । বন থেকে এনে দিত ফল- মূল- মধু ও কাঠ । রান্নাও করে দিত কোনো কোনো দিন ।

জাদুকর চলে যাওয়ার আগে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিল তাকে । সে মন্ত্রের গুণে রূপ বদলে পাখি হয়ে যেতে পারত সুবর্ণকুমার । তবে তা রাতের বেলায় । দিনের বেলায় ফলবে না মন্ত্র কখনো ।

খুব মজায় ছিল সুবর্ণকুমার । সারাদিন নৌকা চালানোর পর সে পাখি হয়ে মাঝে মাঝে উড়ে যেত দূর- বহুদিন । ফল খুঁটে খেত । ডালে বসত । দোল খেত গাছের শাখায় ।

একদিন উড়তে উড়তে সে ভুল করে গিয়ে পড়েছিল কনকনগরের রাজ উদ্যানে । ফল খাচ্ছিল খুঁটে । কী করে যেন পাখিটাকে দেখে ফেলে রাজকন্যা মালিনী । বড় ভালো লাগে তাঁর । মালিনীর সংসারে কত যে পাখি আছে । সে গান গায় । ছবি আঁকে । বাঁশি বাজায় ।

সে সখিকে ডেকে পাখি রূপী সুবর্ণকে দেখায় । বলে , কী সুন্দর পাখি । লাল পালকে নীলের ফুটকি । কী চমৎকার ঠোঁট । চোখটা কেমন কাজল-কালো । এমন পাখি তো দেখিনি কখনো । এ পাখি আমার চাই ।

রাজকন্যার চাই । খবর গেল রাজার কাছে । আর কী ,  ধরা পড়ল পাখি । সোনার খাঁচায় তাকে আনা হল রাজকন্যার কক্ষে ।

পাখি দেখে সে তো মুগ্ধ । সকলেই মুগ্ধ । কোন দেশের পাখি ! এমন পাখি জীবনে কেউ দেখেনি আগে । সে কথাই জানাল সবাই । রাজকন্যার খুশি আর ধরে না । সে নিজের হাতে দানা-পানি খাওয়াল পাখিকে । অথচ এ পাখির চোখে জল ।

সখিরা বললে , পাখিটার কী কপাল ! সোনার খাঁচায় থাকে , তবু ওর চোখে জল ! অন্য পাখিরা তো থাকে রুপোর খাঁচায় ।

সুবর্ণকুমার বুঝল সে বন্দী হল । কী করে বেরুবে সে রাজপুরী থেকে !  সকাল হলেই সে তো মানুষ হয়ে যাবে । কেউ শুনবে না তার কথা । সবাই জানবে রাজকন্যার ঘরে এসেছিল কাল রাতে কোনো এক অচেনা যুবক । বদনাম হবে রাজকুমারীর । আর তার হবে নির্ঘাত মৃত্যুদন্ড নতুবা যাবজ্জীবন কারাবাস । কী হবে তার বুড়ি ঠাকুরমার ?

সে আকার- ঈঙ্গিতে ঠোঁট নেড়ে , মাথা নেড়ে অনেক কথা বলতে চাইল অথচ কেউ বুঝল না পাখির ভাষা । বা বুঝতেই চাইল না । সখিরা এবং রাজকুমারী খুব হাসলে । আনন্দ করলে পাখিটাকে নিয়ে ।

রাজকুমারী গবাক্ষের কাছে উঁচু চৌপায়ার ওপর সোনার খাঁচার ভিতর পাখিকে রেখে ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর কোমল মখমলের নরম বিছানায় ।


ঘুম ভাঙলো রাজকুমারীর । সবে মাত্র ভোরের আলো ফুটেছে । চোখ গেল গবাক্ষের দিকে । কেননা ওই দিক দিয়েই সূর্যের প্রথম মেদুর আলো আসছিল ঘরে । আরে ওইখানেই তো খাঁচাটা ছিল । খাঁচার ভিতর পাখিও ছিল । নেই কেন ? কোথায় গেল ?

অল্প আলোয় সে দেখলে খাঁচাটা ভাঙা । পাখি কোথায় ! চমকে গেল রাজকুমারী । গবাক্ষের কিছুটা দূরে লম্বা লম্বা ঝালরের আড়ালে কে বসে আছে ? মাথাটা হাঁটুর ওপর রেখে । যেন ঘুমুচ্ছে ! অল্প আলোয় ছায়াছায়া মূর্তি । দেখলে ভয় পাওয়ার-ই তো কথা । কিন্তু না রাজকুমারী বলে কথা, ভয় পেলে তো চলবে না । সে এগিয়ে গেল ।

রাজকুমারীর পায়ের মলের শব্দে ঘুম ভাঙল সুবর্ণকুমারের । সে চোখ মেলে দেখলে সামনে পরমাসুন্দরী এক কন্যা । যাকে সে গত রাতেই দেখেছে পাখির চোখ দিয়ে ।এখন মানুষের চোখে দেখে মুগ্ধ , বিস্মিত হল । রাজকুমারীও সুবর্ণকুমারকে দেখে অবাক হল । চমকে গেল । ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল: কে , কে তুমি ? আমার ঘরে কী করছ ? চোর --- চোর---
সুবর্ণকুমার কিছু বলার আগেই রাজকুমারী মালিনীর খাস দাসী চলে এলো । সৈন্যসামন্ত চলে এলো । রাজার কাছে খবর গেল । রাজা এলো । রাণী এলো । সে এক হৈহৈ কান্ড বটে ।

বন্দী হল সুবর্ণকুমার ।

বিচার সভা বসল । সে কী করছিল  রাজকুমারীর ঘরে ? কেন গিয়েছিল ? সে কী অন্য কোনো রাজার দূত ? গুপ্তচর ? কেউ বললে , সে রাজকুমারী মালিনীকে হত্যা করতেই এসেছিল । কেউ বললে , ব্যাটার খারাপ উদ্দেশ্য ছিল । মালিনী কাঁদছিল । কারণ তাঁর পাখিটাকে সে খুঁজে পাচ্ছে না । ফলত , সে বললে , এই লোকটাই আমার পাখিকে চুরি করেছে । অথবা খাঁচা ভেঙে উড়িয়ে দিয়েছে । এর শাস্তি চাই ।

সুবর্ণকুমারের কথা কেউ শুনলে না । সেও চুপ করে থাকলে । রাজা বললে , লোকটা বোবা নাকি ?

সুবর্ণকুমার কেবল তাকিয়ে থাকলে মালিনীর দিকে । নীল চোখ মালিনীর । অতল-- গভীর । চোখের ভিতর যেন একটা দিঘি আছে । সে সেখানে ভাসতে চায় । ডুবতে চায় ।মালিনীর রূপ দেখে সে ভুলে গেল ক্ষুধা-তৃষ্ণা । কেবল তাকিয়ে থাকে ।

রাণী বললে , বোবা লোকটা তো বড্ড বেয়াদব । কেবল রাজকন্যার দিকে ড্যাবড্যাব করে  তাকায় । লোকটাকে ফাঁসিতে ঝোলাও ।সমবেত রাজার অনুচর- পরিচর আর সভাসদগণ বললে , ঠিক ঠিক । ফাঁসিতে ঝোলাও । রাজকন্যার ঘরে ঢুকেছে লুকিয়ে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে । তারপর পাখিটাকে মেরেছে বা উড়িয়ে দিয়েছে । আবার রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে থেকেছে । এত সব অপরাধের শাস্তি ফাঁসি । রাজা বললেন , তবে তাই হোক ।

ঠিক হল , পরদিন বধ্যভূমিতে সুবর্ণকুমারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে ।

কারাগারে বন্দী সুবর্ণ রাতের অপেক্ষায় ছিল । যথা সময়ে সূর্য ডুবে গেল । অন্ধকার নেমে এলো কনকনগরে । সুবর্ণ রূপ বদলে আবার পাখি হয়ে গেল । উড়ে সোজা চলে গেল রাজকুমারীর কক্ষে । গিয়ে বসলে পালঙ্কের উপর । পাখিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা মালিনী । সে পাখিকে কোলে তুলে নিলে  ।আদর করলে খুব । বললে , কোথায় গেছিলি তুই ?

পাখি বললে , কোথাও যাইনি । তোমার কাছেই ছিলাম । আর দেখা হবে না বলে দেখা করতে এলাম ।
--- কেন ? দেখা হবে না কেন ?
--- রাজামশাই যে ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন । তোমার সামনেই তো দিয়েছেন ।
মালিনীর মনে পড়ল সকালবেলার কথা । সেই বোবা লোকটা । যে তাকিয়ে ছিল ।
-- কে তুমি ? অবাক হয়ে জানতে চাইল রাজকুমারী মালিনী ।
সংক্ষেপে তাকে সব কথা খুলে  বললে সুবর্ণকুমার । মালিনী বললে , কাল তবে কথা বলনি কেন ?
সে বললে , সুযোগ পেলাম কোথায় ? তাছাড়া কেউ তো বিশ্বাস করবে না আমার কথা ।
রাজকুমারী মাথা নাড়লে । বললে , তাও তো ঠিক ।
পাখি রূপী সুবর্ণের চোখে জল । বললে , চলি রাজকুমারী ।
মালিনী বললে , কবে আবার দেখা হবে ?

-- যখন তুমি চাইবে ।বলে যেই উড়তে যাবে সুবর্ণ মালিনী বললে , কথা দাও , কাল রাতে আবার আসবে । তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে । আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম , কেমন ? কথা দাও কাল আবার আসবে ? আমি যে তোমার অপেক্ষায় থাকব ।
সুবর্ণ বললে , কথা দিলাম ।

উড়ে গেল সুবর্ণকুমার । রাত্রি তখন গভীর । গবাক্ষের  কাছে দাঁড়িয়ে থাকল রাজকুমারী । চোখের পাতায় জল ।