শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

সাদিয়া সুলতানার গল্প : ডুবসাঁতার

সাদিয়া সুলতানা
ডুবসাঁতার

আজ আমার মোনালিসা আপার সঙ্গে দেখা হবে। তিন বছর আট মাস ছয় দিন পর। মোনালিসা আপা, আমাদের মোনা আপা। যার কাছ থেকে আমি পালাতে চেয়েও ধরা দিয়েছি বারবার। কী করে মোনালিসা আপার মুখোমুখি হবো ভেবে রাতের পর রাত নির্ঘুম থেকেছি, দিনের আলোতেও লুকোচুরি খেলেছি নিজের সঙ্গে।

গতকাল রাতে আমি একদম ঘুমাতে পারিনি। সারারাত বিছানায় শুয়ে ছটফট করেছি। রহস্যময় বাতিঘরের চূড়ায় বসে আবছায়াতে সমুদ্রজলের ওঠানামা দেখেছি। জলের বিস্তার সিঁড়ি হয়ে আমাকে অচেনা গন্তব্যে নিয়ে গেছে। নীল জলের সিঁড়ি ভেঙে আমি এক বিস্তীর্ণ বালুচরে পৌঁছেছি, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছি হাওয়ায় লেগে থাকা নীল চুম্বনের দাগ। একটা ডিঙি নৌকা ঢেউয়ের তালে দুলতে দুলতে পাড়ে এসেছে। আমাকে ফিরিয়ে নেবে ভেবে নৌকাতে যেই পা রেখেছি, পা হড়কে তলিয়ে গেছি অতল জলে। ডুবতে ডুবতে ফের ভেসে উঠেছি। ঘুমের আবেশে রাশেদ গড়িয়ে পড়েছে আমার শরীরে, ওর আঙুলেরা বারবার আমাকে আলিঙ্গনে টেনেছে। সাড়া না পেয়ে পাশ ফিরে শুয়ে রাশেদ বেঘোরে ঘুমিয়েছে। আর আমি হৃদপিণ্ডের তোলপাড় করা ঢেউয়ের মাঝে দুলে দুলে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছি।
আজ ছুটির দিন। রাশেদের অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই, আমার চটজলদি নাস্তা বানানোর তাগিদ নেই। অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাতের ঘুমটুকু তাই পুষিয়ে নেবো ভেবেছিলাম। আরাধ্য ঘুম আসেনি। মোনালিসা আপার মুখোমুখি হবো বলেই হয়তো নিজের ভেতরে এত উৎকণ্ঠা কাজ করেছে আমার। রূপালি রাঙতায় মোড়ানো স্মৃতিবাকসো খুলে যাবার উত্তেজনা শিহরিত আমাকে এক ফোঁটা ঘুমাতে দেয়নি। বহুদিন পর বুকের গোপন সিন্দুকটা খুলে দেখবো ভেবে নির্ঘুম রাত কাটিয়েও উতল আমি কাকভোরে বিছানা ছেড়েছি। চারদিকের থমথমে ভাব সরে গিয়ে সকাল সকাল মেঘ ছাড়াই উথালপাথাল ঝড় হয়েছে, স্মৃতিচিহ্নের গ্লানি ভেজা মাটিতে লেপ্টে গিয়ে বেকায়দা হেসেছে। বিনা নোটিশে খুব গোপনে কেউ এসে বুকের ভেতরটা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে রেখে গেছে। আগুনহীন সেই দহনে পুড়তে পুড়তে আমি আমূল ভিজে গেছি। ভেজা শরীরে কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় ফিরে গেছি। ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। ঘুম আসেনি। ঘুমের বদলে কেউ এসে খুব যতনে বুকের ঠিক মাঝখানে টুকটুক...টুকটুক করে পেরেক গেঁথেছে, কানের কাছে ঢিমাতালে কেউ তারাপদ রায়ের কবিতা আবৃত্তি করেছে,
বছরের পর বছর, দিনের পর দিন
গ্রীষ্ম নেই, বর্ষা নেই, শুধু শীত আর শীতের হাওয়া
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন, স্বপ্নের মধ্যে অভিমান
শীতল অভিমানে জড়ানো ঠা-া হাওয়ায় ঝরা পাতা
এলোমেলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে রোদের উজ্জ্বলতায়।
তুমি উদাসীন চলে গেছো
কোনোদিন তাকিয়ে দেখোনি,
তুমি কোনোদিন শুনলে না
আমার ডুগডুগি, আমার বাঁদরনাচের বাজনা।

সেই মুহূর্তে মেসেঞ্জারে মোনালিসা আপার মেসেজ এসেছে, ‘আমি এসেছি। তুই চলে আয়। আজ দুপুরে আমার এখানে খাবি।’
উৎকণ্ঠিত রাশেদকে আশ্বস্ত করে আমি একাই বাসা থেকে বের হয়েছি। ও প্রথমে আমাকে একা ছাড়তে চায়নি। কিন্তু মোনালিসা আপার সঙ্গে দেখা হবার ক্ষণটিতে আমি সামান্য গোপনীয়তার আয়োজন রাখতে চেয়েছি। যদিও উৎকণ্ঠায় সারাক্ষণ আমার বুকের ভেতরে চকমকি পাথরের ঠোকাঠোকি হচ্ছে। আমি রাশেদকে বুঝতে দিইনি।
রাশেদ মানুষ হিসেবে মোটামুটি সহজবোধ্য। একেবারে আটপৌরে সংসারী মানুষ সে। এতদিন ধরে ওকে দেখছি, কোনো জটিলতা নেই ওর ভেতরে। আমাকে নিয়ে ওর টানের সুতো আমিই জটিল অংকে শিথিল করে রাখি। এক পুরনো হিসেবের কারণে আমি চাইলেও দাম্পত্য সম্পর্কের সুতো টানটান রাখতে পারি না। রাশেদ অবশ্য সচেতন অভিভাবকের মতো সর্বক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, আমাকে ধরেবেঁধে রাখতে চায়। এই যেমন আজও কিছুতেই ও আমাকে একা ছাড়তে চাইছিল না। যদিও বাসা থেকে খুব একটা বাইরে বের হই না আমি। তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না। আমার সব প্রয়োজন রাশেদ দক্ষ হাতে মিটিয়ে দেয়। আমি কোথাও যাচ্ছি শুনলে প্রথমে রাশেদ খুব অবাক হয়, অহেতুক বাঁধ সাধে। তারপর আমি কথা শুনবো না নিশ্চিত হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। আজও তাই করেছে। আমি পোশাক পাল্টে তৈরি হয়ে দেখেছি, ও নেটফ্লিক্সে মুভি দেখতে শুরু করেছে।
বাসা থেকে বের হয়ে দেখি রোদে পথঘাট সব চকচক করছে। অনেকদিন পর আলোর মুখোমুখি দাঁড়ালে যেমন দৃষ্টিবিভ্রম হয় তেমনি বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে আমি বাহন খুঁজতে থাকি। এই শহর এখন ব্যাটারিচালিত রিকশায় সয়লাব। আমি হাত উঁচু করতেই একজন বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা তার প্যাডেলচালিত রিকশা নিয়ে এগিয়ে আসে। আমার তাড়া আছে। তবু বৃদ্ধের ঘামে ভেজা পরিশ্রান্ত মুখ দেখে আমি এই রিকশাতেই উঠে পড়ি।
রিকশাতে উঠতে আর নামতে গিয়ে মাথায় দুই দুইবার বাড়ি খাই। হুডে বাড়ি খেয়ে আমার রাশেদের কথাটা মনে পড়ে। নিজের অজান্তেই আমি শব্দ করে হেসে ফেলি। আমার মনের ভেতরের ঝড় সেই হাসিতে চাপা পড়ে যায়। বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা খুচরো ফেরত দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। তিনি কী বুঝেছেন তা ‘আমি বুঝে পাই না।’ আমার আবার হাসি পায়। আমার সঙ্গে রাশেদ যতোবার রিকশায় ওঠে ততোবারই হুডে মাথা ঠেকে হয় আমার চুল আটকে যায় নয়তো আমি মাথায় ভীষণ শব্দে বাড়ি খাই। রাশেদ হৈহৈ করে ওঠে, ‘ঘাড় নিচু করে রাখতে পারো না? পোনে পাঁচফুটি একটা মানুষের মাথা কীভাবে হুড পর্যন্ত যায় আমি বুঝে পাই না।’
‘আমি বুঝে পাই না’ রাশেদের ঠোঁটে সবচেয়ে মানানসই আর দু’বছরের বিবাহিত জীবনে আমার বহুলশ্রুত একটা বাক্য। আমি বের হবার সময় রাশেদ বলেছিল, ‘এই ছুটির দিনে তুমি কোথাও না গিয়ে উনাকেই বাসায় নিয়ে আসতে পারতে, আমি বুঝে পাই না, বিদেশ থেকে আসা মানুষ, বাড়িতে কেউ নেই, সে তোমাকে কী দাওয়াত খাওয়াবে। তাও আবার রেস্টুরেন্টে হলেও হতো, বাড়িতে। ঠিকঠাক বাড়ি চিনে যেতে পারবে তো? আমি বুঝে পাই না।’

এই শহরের পথ আমি চিনবো না? এই শহর আমার পুরনো শহর। আমার ছেলেবেলার শহর। আমার চিরচেনা শহর। আর মোনালিসা আপাদের বাড়িটা আমার করতলের মতো চেনা। আপন। এই যে এই রাস্তার মাথাতে দাঁড়িয়েও আমি আপাদের নারিকেল গাছ ঘেরা বাড়িটা ঠিকঠাক চিনতে পারছি। এদিকটায় দীর্ঘবছর আমরা ভাড়া বাসায় ছিলাম। বাবার অফিস গনেশপাড়ার সামনের রাস্তা ধরে ঢাকা বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে পশ্চিমের বড় রাস্তার ধারে ছিল। অফিসের কাছাকাছি ছিল আমার স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে রোজ বিকালে আমরা কজন আপাদের বাড়িতে যেতাম।
সেই সময়ে মোনালিসা আপাদের বাড়িটা ছিল গনেশপাড়ার সবচেয়ে আধুনিক বাড়ি। এখন আপাদের বাড়ির আশেপাশের ফাঁকা জায়গাগুলো আর ফাঁকা নেই। উঁচু উঁচু ইট-পাথরের দালান উঠে গেছে। আপাদের বাড়ির একটা বাড়ি পরেই আমরা ভাড়া থাকতাম। সেই পুরনো দোতলা বাড়িটা ভেঙে নতুন একটা পাঁচ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। ঐ বাড়িটা ভেঙে ফেলার তোড়জোর শুরু হলে আমরা এই পাড়া ছেড়েছিলাম। মুলাটোলায় একটা বাড়িতে ভাড়া ছিলাম কিছুদিন। ঐ সময় বাবাও আমাদের বাড়ির কাজ ধরেছিল। পরে আমাদের বাড়ি এক তলা উঠে গেলে আমরা সাগরপাড়ায় চলে আসি।

মোনালিসা আপা আর নাহিদ ভাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় আবদুর রহমান চাচা বাড়ি ফেলে রেখে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। আপাদের পরিবার ঢাকা যাবার আগ পর্যন্ত আমাদের দুজনের নিয়মিত দুই বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল। আপা রিতা বা কলিকে দিয়ে আমাকে খবর দিতো। আমি বুভুক্ষের মতো ছুটে যেতাম। মাঝেমাঝে পালিয়েও থাকতে চাইতাম। শুধু মোনা আপার কাছ থেকে না, নিজের কাছ থেকেও। সেই গল্প থাক। আজ আমি নিজেই ধরা দিতে উন্মুখ।
আমি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছি। এখানকার বাতাসে শৈশব-কৈশোরের আদি ঘ্রাণ। আকাশে স্মৃতির মাতম। আমার পা লেগে আসে। বুকের ভেতরের অভিমানের ঢেউ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। কত কী জড়িয়ে আছে এই পাড়ার মানুষগুলোর সঙ্গে। পুরনো কেউ কি আছে? পুরনো স্মৃতির মতো পুরনো মাটি আঁকড়ে ধরে?
ঐ তো সেই বাড়ি। আমি স্কুলছাত্রীর ফিতে বাঁধা ঝুঁটির মতো নেচে উঠি। অবাক হয়ে দেখি, চারপাশে এতকিছু বদলে গেছে, বদলায়নি কেবল আবদুর রহমান চাচার আদি বাড়ির ঐ ঝুল বারান্দাটা। এই বাড়িটার দক্ষিণের ঝুল বারান্দায় একটা চেনা দৃশ্য আঁকা থাকতো। আমি ওপরে তাকাই। বারান্দায় পাতা রট আয়রনের রঙচটা চেয়ারে এক হাতে বই আর আরেক হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মোনালিসা আপা ঝকঝকে রোদের ক্যানভাসে সেই চিরচেনা দৃশ্যটি এঁকে বসে আছে।

আকাশে মেঘ দুলছে। পুরো আকাশজুড়ে মনুষ্যাকৃতির অদ্ভুত বিষণ্ন সব মেঘ। গত বছর নভেম্বরে কালিম্পং, দার্জিলিংয়ে এমন মেঘ দেখেছিলাম। পরিবারের সদস্যের চাপে পড়ে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে আমাদের দুজনকে বেড়াতে যেতে হয়েছিল। ততোদিনে রাশেদ টের পেয়েছে, নিতান্ত অনিচ্ছাতে আমি বিয়েটা করেছি। যদিও ও এখন পর্যন্ত টের পায় না, আমি ঠিক কতোটা যন্ত্রণা নিয়ে গোপনে গুমরে গুমরে কেঁদে মরি। দাম্পত্যচর্চার দুঃসহ ভার নিতে না পেরে দিনরাত মরমে মরি।

রাশেদের স্বপ্নেরা প্রেতের মতো আমাকে ধাওয়া করে। ওকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারি না, আমার কাছে ওর জন্য কোনো প্রেম নেই। রাশেদ ভাবে, সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, বিয়ের পর মানিয়ে নিতে সব মেয়েরই একটু সময় লাগে। অভিভাবকসুলত হাসিতে ও আমার অস্থিরতাকে উপেক্ষা করে। যেন আমি অবোধ কিশোরী, আমাকে খুশি করতে এটা-সেটা উপহার দেয়, সপ্তাহে একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যায়। আমাকে ভালোবেসে প্রগাঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে। আমার শরীরে একতরফা বুঁদ গিয়ে ব্যর্থ রাশেদ একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। তবে এটা সত্যি আমাকে ও দোষারোপ করে না। শুধু কোনো কোনোদিন শিশুসারল্যে আমার প্রাক্তনের কথা জানতে চায়, জানতে চায় কেন এত বিষণ্ন আমি। আমি ওর প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। ওর কৌতূহলী চোখে বিদ্ধ হতে হতে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমি ওকে বলতে পারি না, সেই কবে থেকে আমি বিষাদের ঘেরাটোপে আটকে আছি, এ থেকে আমার মুক্তি নেই।

মা যখন আমার বিয়ে ঠিক করে তখন নিজের ভেতরের দমবন্ধ করা কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারছিলাম না। কথা ভাগাভাগির মানুষ মোনালিসা আপা তখন মেঘের দেশ পাড়ি দিয়ে অনেক দূরে, মেধাবৃত্তি পেয়ে মেলবোর্নে পড়তে গেছে। স্কুলের বান্ধবীরা কে কোথায় হারিয়ে গেছে। পরে কলেজে পড়াকালীন কারো সঙ্গে সেভাবে ঘনিষ্টতাও হয়নি। নিজের মতো থাকতে থাকতে আমি পাথরের নিষ্প্রাণ মূর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। এখনো হয়তো তাই-ই আছি। অদ্ভুত নিস্পৃহতায় জীবনকে টেনে চলছি শুধু।

রাশেদের সঙ্গে দার্জিলিংয়ে কাটানো সপ্তাহটিতে আমার জীবনের বেদনার সকল ঘড়া পূর্ণ হয়েছিল। ঐ কয়েকটা দিন রাশেদ আমার যতো ঘনিষ্ট হতে চাইতো, আমি ততো আড়ষ্ট হয়ে যেতাম। মেঘের ছায়ামাখা কাঞ্চনজঙ্ঘা আর সিকিমকে দূর থেকে দেখে আমার শরীর-মন জুড়ে থাকা বিষণ্নতা নীল মেঘের ডানা লাগিয়ে উড়তে চাইতো। একদিন আমি আনমনে পর্যটকদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে যেতে ভাবছিলাম উড়ে যাবো, উড়ে উড়ে চলে যাবো অনেক দূরে। রাশেদ আত্মবিস্মৃত আমাকে টানতে টানতে হোটেলে ফিরিয়ে এনেছিল। সে রাতে মুখোমুখি বসে রাশেদ ছেলেমানুষের মতো আকূল হয়ে কেঁদেছিল। নিজে থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছিল, আমি সহজ না হলে এসব বিষয়ে ও কখনো আমাকে জোর করবে না।

প্রথম প্রথম রাশেদকে আমি খুব সন্দেহের চোখে দেখতাম। মনে হতো সারাক্ষণ ও আমাকে উত্যক্ত করবে, অধিকারের মাত্রা দিয়ে চিহ্নিত করে দেবে আমার করণীয়, আমাকে নিজের মতো থাকতে দেবে না। আমাকে অবাক করে রাশেদ ওর কথা রেখেছে। সেকারণেই হয়তো ওকে ছাড়তে পারিনি।

রাশেদ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। সে নিজেও পড়ালেখায় ডুবে থাকতে ভালোবাসে। রাশেদ চায় আমিও আবার পড়ালেখা শুরু করি। কিন্তু আমার বাসার বাইরে যেতে ভালো লাগে না। অথচ একটা সময় আমি হৈ হৈ করে উড়তাম। আমার অবিরত উড়ানে বিরক্ত মা আমাকে শাসন-বারণে রাখতো। বি.এ. পাস করার পর বাবা মারা যাওয়ায় মা আমাকে চেপে ধরে বিয়ে দিয়েছিল। মোনালিসা আপার বাবাও তখন মারা গেছেন। আপা, চাচী, নাহিদ ভাই ঢাকাতেই থাকতো। মোনালিসা আপা ফোন করলেই বলতো, চাচী উনার বিয়েশাদি নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেছেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রাখবে না আপা। দেশ ছেড়ে পালাবেন।

আপা পালিয়েছিল। পালানোর পর আমাদের আর দেখা হয়নি। দেখা হয়েছিল অনেক আগে, সেই সেবার, যেবার আপার পরিবারের সবাই ঢাকায় চলে গেলো। সেদিন আপার বিষণ্ন চেহারা দেখে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। আমাকে বাচ্চামেয়ের মতো আলতো করে জড়িয়ে ধরে আপা বলেছিল, ‘তোর সাথে সবসময় যোগাযোগ থাকবে রে।’
আপার সঙ্গে বরাবর আমার যোগাযোগ ছিল। ফেসবুকে, ভাইবারে। দুজনের রাশি রাশি মেসেজে মেসেজবক্স উপচে যেতো। সেই ছোটবেলার মতো শাসনে-প্রশ্রয়ে আপা আমাকে আগলে রাখতো। কিন্তু এতে আমার বিষণ্নতা তিল পরিমাণও কমেনি। গোপন কষ্টের ভার দিনদিন বেড়েছে শুধু। এসব ফুলকো-ফুলকো কষ্টকে দুরছাই বলে উড়িয়ে দেয়ার মতো আপন একটা মানুষও নেই না আমার। আমার আছে সুখ-অসুখে বোঝাই করা এক ওজনদার সিন্দুক। যার ভার বইতে গিয়ে আমি কখনোই জীবনের ক্লান্তিকে অতিক্রম করতে পারিনি।

মোবাইলের তীক্ষ্ম রিংটোনে আমি কেঁপে উঠি। মোনালিসা আপার কল। আর একটু পরেই আপার মুখোমুখি হবো আমি। মোনালিসা আপা, আমাদের মোনা আপা, আমাদের জীবনে ছিল একটা স্ফুলিঙ্গের মতো। আমাদের বলতে আমাদের মহল্লার ছেলেমেয়েদের কাছে। আপার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ-মুখ, সুডৌল শরীর, পিঠের ঢেউ খেলানো চুল, বয়সের তুলনায় ভারিক্কি চাল দেখলে যে কোনো যুবকেরই গলা শুকিয়ে আসতো। বুকের ভেতরে চেনা-অচেনা অনুভব পুষে রেখে কোনো কোনো যুবক আপাদের বাড়ির সামনের রাস্তার ধারের সেলুনে দিনভর বসে থাকতো। কেউ কেউ রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টে কায়দা করে এক পায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, এক সিগারেটের পেছনে আরেক সিগারেট লাগিয়ে ধোঁয়াবাজি করতে করতে গোটা প্যাকেট ফুরিয়ে ফেলতো।
আমরা ভীষণ গর্ব করতাম আপাকে নিয়ে। ছুটে ছুটে আপাকে এসে খবর দিতাম, ‘হিরো ভাই এইবার শাহরুখ কাট দিছে। ফয়সাল ভাই আমির কাট। যা লাগতাছে না দুইজনরে আপা। পুরা দা নিউ লায়ন সার্কাসের জোকার।’ স্কুল থেকে ফিরে নাকেমুখে দুটো খেয়ে নিয়ে আমি, রিতা, কলি মোনালিসা আপার কাছে তার প্রণয়প্রার্থীদের নানান বোকামানুষির গল্প নিয়ে হাজির হতাম। আপা সময়ে-অসময়ে বারান্দায় বসে চা খেতো। মাঝেমাঝে আমরা আপার হাতের বিখ্যাত লেবু চায়ের ভাগ পেতাম। নিতান্ত লোভীর মতো চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জ্যাঠামো করতাম, ‘আজ ফয়সাল ভাইরে দেখছো আপা? এত ফাজিল না ছ্যামড়াটা! আসার সময়ও দেখলাম, দোকানে বইসা সিগারেট খায়। কলিরে ডাক দিয়া কয়, তোর মোনালিসা আপারে বলিস, আমি রক্ত দিয়া তার নাম লিখ্যা যামু।’ মোনালিসা আপা নির্লিপ্তভঙ্গিতে আমাদের কথা শুনতে শুনতে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতো। তারপর আমাদের চকচকে উৎসাহে পানি ঢেলে দিয়ে হাতে থাকা তারাপদ রায়ের বই থেকে আবৃত্তি করতো,
‘সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম
কিনে এনেছিলাম আকাশী রঙের বিলিতি হাওয়াই চিঠি’
এভাবে কবিতা পড়তে পড়তে হুট করে একদিন মোনালিসা আপা কবিতার মতো রহস্যময় হয়ে গেলো। আপার গোছা গোছা চুল বিনা নোটিশে কেটে ফেলল। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, আপার ভারি ভারি চোখের পাঁপড়ি কেমন ঘন হয়ে উঠছে। হুট করে কেমন যেন বড় হয়ে গিয়েছিল আপা, বদলে গিয়েছিল। আপার হাসি, চাহনি, কণ্ঠস্বর সবকিছুই তখন আমাদের সবাইকে ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলে দিতো। তখন আমি কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় আছি। কলি একদিন আমার হাতে চিমটি কেটে বললো, ‘মানুষ প্রেমে পড়লে এমন হয়রে...আপা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে দ্যাখ গিয়ে। পটকা খাস্তগীরকে দেখলাম আপাদের বাড়ির উল্টোদিকের ঐ বাড়ির ছাদে পাহারা দেয়। ছি, ছি, আপার রুচি এতো খারাপ। ফয়সাল ভাইরে একেবারে আমির খানের মতোন লাগে। কত ঘুরলো আপার পিছে, পাত্তা দিলো না।’ আমি কলির কথা পাত্তা দিতাম না। আমিও ততোদিনে বড় হয়ে গেছি।

পুরো বাড়িতে ভেজা ভেজা গন্ধ। সিঁড়িঘরের নিচে রাখা ফুলের টবগুলোতে শুষ্ক মাটি, গাছের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বোঝা যায়, বাড়ির মানুষজনের আসা-যাওয়া নেই তেমন একটা। সিঁড়ির ধাপ ভেঙে উঠতে উঠতে দেখি মোনালিসা আপা একটা গাঙশালিকের মতো উড়ে উড়ে আসছে। আমাকে দেখেই আপা চিৎকার করে ওঠে, রিক্তা...তুই কত বড় হয়ে গেছিস রে!
আমি হাসি, ‘এ কী কথা আপা! আমি তো বড়ই ছিলাম!’ মোনা আপা আমার হাত ধরে সিঁড়ির ধাপ পার করায়, যেন আমি ছোট্ট রিক্তা।
‘তা তো ছিলিই। এখন পুরো অন্যরকম হয়ে গেছিস।’
‘ফেসবুকে তুমি আমার ছবি দ্যাখোনি?’
‘ইস! তা তো দেখিই। কিন্তু সামনাসামনি দেখার মধ্যে পার্থক্য কত বল তো! আর আমাদের কত বছর পর দেখা!
আমি নিচু স্বরে বলি, ‘তিন বছর আট মাস ছয় দিন পর।’
মোনা আপা বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। বলে, ‘তুই দেখি দিন তারিখ একেবারে গুণে রেখেছিস!’
আমি সুযোগ পেয়ে ছোট্ট রিক্তার মতো গাল ফুলাই, ‘তা তো রেখেছিই। আমি কি আর তোমার মতো?’
‘আমি কী রে! পড়ার জন্যই তো গেলাম।’
‘পড়ার জন্য না ছাই। আমাদের ছেড়ে, সবাইকে ছেড়ে...।’
‘আমারও খুব খারাপ লেগেছে রে রিক্তা।’
‘ছাই খারাপ লেগেছে। ওখানে তো নতুন বন্ধু পাতিয়েছো তুমি, সমস্যা কী?’
মোনা আপা শব্দ করে হাসে, আমি চমকে যাই। কী সুন্দর হয়েছে আপা! মসৃণ চুল, দীপ্তিময় মুখশ্রী। উজ্জ্বল চোখে গাঢ় কাজলরেখা। শরীরের কমলা রঙ ফেটে পড়ছে। লং স্কার্ট আর হাইনেক গেঞ্জিতে আপাকে বিদেশী কোনো মডেলের মতো লাগছে। আপা আমার হাত টানে, ‘আয় তো, কত কথা যে আছে তোর সঙ্গে।’
রাশেদ ফোন করেছে, পৌঁছেছি কিনা জানতে চেয়ে। আমার কথা শেষ হতেই মোনা আপা হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়, ‘এক্কেবারে সুইচড অফ করে রাখ। কারো সঙ্গে আজ কোনো কথা নেই। আগে বল কী খাবি?’
মোনা আপার কথা না ফুরাতেই একজন মাঝবয়সী মহিলা ট্রেতে করে দুই গ্লাস শরবত নিয়ে আসে।
‘ভাল হয়েছে মানুষ পেয়েছো, এত দিনের পড়ে থাকা বাড়ি, কারো হাত পড়েনি কতদিন। কে করতো এত কাজ।’
‘এসব সাংসারিক কথা বাদ দে, কী খাবি দুপুরে বল?’
‘সবকিছুর আগে তোমার হাতের চা চাই।’
ঠিক এই মুহূর্তে আমি আর মোনা আপা ঝুল বারান্দায় বসে ‘মোনালিসা আপার বিখ্যাত লেবু চা’ খাচ্ছি। উষ্ণ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা মুগ্ধচোখে দেখছি, আকাশের বুকে মেঘের আশ্চর্য নিমগ্নতা। কোথাও কোনো শোরগোল নেই। আমাদের দুজনের মুখে কোনো শব্দ নেই। মনের ভেতরে না বলা কথার বুদবুদ। সুখ-দুঃখের ফিসফিসানি। বাতাসও ফিসফিস করে ওঠে, ‘এসো, শরীরে জড়িয়ে নাও মেঘের পালক।’ হাওয়ার খেলায় দুলতে দুলতে মেঘেরা রেখার আদলে বদলে যেতে থাকে। মেঘের সাদা, নীল, ধূসর পালকগুলো কোণাকোণি জুড়ে গিয়ে আকাশে অদ্ভুত এক অবয়ব তৈরি হয়। শব্দহীন মোনা আপা আর আমি, দুজনে চুপচাপ বসে সমকোণে নিমগ্ন মেঘ দেখতে থাকি।
সুন্দরের নিবিড় নিমগ্নতা ভেদ করে বহু দূর থেকে মোনা আপার কণ্ঠ শোনা যায়, ‘কেমন আছিস তুই?’
বুকজুড়ে থাকা অভিমান আমার কণ্ঠনালীতে আছড়ে পড়ে, ‘কেমন থাকবো আবার?’ এতক্ষণ নিজেকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ করে আমি ভেঙে পড়ি। দার্জিলিংয়ে কাটানো রাতগুলোতে রাশেদের অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শের কথা মনে পড়ে। আমার সমস্ত শরীর পুড়তে থাকে, জ্বলতে থাকে তুমুল ক্ষোভে। যেন শত শত মৌমাছি হুল ফোটাচ্ছে আমার নিরাভরণ শরীরে। সেই বিষ আমি উগড়ে দিই বাতাসের স্রােতে, ‘তুমি তো ভালোই ছিলে। রায়নাকে নিয়ে। আমার কথা ভেবেছ একবারও?’
‘রায়না আর তুই এক হলি?’
‘হুম, আমি তোমার কে?’
‘তুই? তুই আমার প্রিয়তম পাপ। হাহাহা।’ মোনা আপার হাসিতে আপার সৌন্দর্যের ছটা। দেখে আমার ভীষণ রাগ হয়।
‘এত কঠিন কথা বুঝি না মোনা আপা।’ বলতে বলতে আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমি ভেজা চোখে সামনে তাকাই। মোনালিসা আপার ঠোঁটের কোণে ভিঞ্চির মোনালিসার হাসি। আমি মুগ্ধচোখে আপাকে দেখি, এত সুন্দর মানুষ হয়! এই সুন্দরের পাশে সাদামাটা সালোয়ার কামিজ পরনে বিষণ্ন রিক্তা একেবারে দীনহীন ভিখারির মতো দাঁড়িয়ে আছে।
মোনালিসা আপা আমার পুরনো প্রেমিকের মতো আমার দিকে হাত বাড়ায়। আমার সেই প্রেমিক আমাকে বলেছিল, ভালোবাসি কথাটা জীবনে একবারও না বলে সহস্রবার সহস্রভাবে অনুভব করা যায়। সেই বিচিত্র অনুভবে বহুদিনপর আমার শুষ্ক শরীর প্লাবিত হয়। আমি সম্মোহিতের মতো মোনার হাত ছুঁই। নিমীলিত চোখে অপেক্ষা করতে করতে তলিয়ে যাই গভীর খাদে। মোনা আমাকে গভীর প্রশ্রয়ে টেনে তোলে। আমি মোনার হাত ছুঁয়ে কবুতরের ডানা পেয়ে যাই, ঘাড়-গলার পালক ফুলিয়ে মোনার কানের কাছে বাকবাকুম করি, ‘এতোদিন কোথায় ছিলে।’ কথা না বলে মোনা নরম রোদের উত্তাপ ছড়ায়।

আমি জানি ও কোথায় ছিল। আমার ঠোঁটে-গালে-নাকে মোনার ঠোঁটের অবিনাশী উত্তাপ লেগে আছে। মোমের মতো গলে গলে টের পাই মোনার স্পর্শের উষ্ণতা আজও সেই পাপের মতো নিবিড়, যার রঙ ছিল বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল। মোনা কাঁদে, আমি কাঁদি, প্রবল সুখের অনুভবে। ঠিক তখনই বিজলির আখ্যান ভেঙে বৃষ্টিবিরতির রঙধনু আকাশের বহুতল মেঘের পরে শরীর এলিয়ে দেয়। মনভুলানো বাহারের এ রঙধনু রহস্যময় সুন্দর। বিমূঢ় আমরা এর রহস্য বুঝি না। কেবল বুঝি, এই রঙধনুই জানে, একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের গড়ে ওঠা সম্পর্কে কতো গোপন পরত থাকে, প্রতি পরতের থাকে আলাদা আলাদা গোপন ঘ্রাণ।

আমি আর মোনা শরীরে মেঘের পালক লাগিয়ে সেই ঘ্রাণের সরোবরে ডুবসাঁতার কাটতে থাকি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন