শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

খোকন বর্মন - মধ্যরাতের ঘরবদল : সেলিনা হোসেন

খোকন বর্মন
মধ্যরাতের ঘরবদল : সেলিনা হোসেন


আকাশের সীমান্ত নেই।মেঘেদের কি কখনো দেশভাগ হয়? তবে ধরণীর সীমান্ত আছে ,মানুষের তৈরি সীমান্ত  সেই সীমান্তের অংশ ছিটমহল ।

আমরা হিন্দুরো শুয়োর নোয়াই আর মুসলিমেরও গরু নোয়াই আজকের মধরাতের  পর থেকে আর এই অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করবে না। কিছুক্ষন পর আমরা পাব নতুন সূর্য, একটা  নতুন ভোর সেই ভোরের আলো গায়ে মেখে  আমরা শামুকের মতো খোলস ছড়াব।এখন থেকে আমরা শক্ত পায়ে হাঁটব ,হামাগুড়ি দেওয়ার দিন ফুরিয়ে এসেছে ,আজ থেকে আমরা বন্দী মানুষ না মধ্যরাতের পর থেকে আমরা স্বাধীন আমরা স্বাধীন।
ছিটমহলের কথা শুনলেই আমাদের হৃদয়ের রংমহল যেন মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে আসে । এই মানবজীবন ,ধরলা নদী, প্রেমপ্রীতি ,গাঢ় স্মৃতিকে এক সূত্রে গেঁথে ছিটজীবনের সাতরং আঁকলেন  ওপর বাংলার গল্পকার সেলিনা হোসেন। ছিটবাসীদের গ্লানিময়জীবন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে তুলে ধরলেন "মধ্যরাতের ঘরবদল " এ।

ইউনিক একটি সমস্যাকে তুলে ধরলেন জীবনের কঠোর বাস্তবতায়। ছিটমহলবাসীদের আঁতের কথা তুলে আনলেন আমাদের সামনে। নাগরিকত্ব এবং নিখাদ প্রেমের মধ্যে স্বাধীনতা প্রাপ্তির স্বাদকে সামনে রেখে তিনি বের করে আনলেন  আঁতের কথা, সৃষ্টি করলেন একটি স্বতন্ত্র ধারার।সোলেমান মিয়া মনে করেন এতদিন বাদে সে মানুষ হল অন্যদিকে  অবনীশ জন্মভূমি  কিছুতেই ছাড়বে না  প্রয়োজনে প্রেম ছাড়বে
খুব সহজেই যেন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে প্রথম প্রেমের স্মৃতি আঁকড়েই সে না হয় বেঁচে থাকবে ।প্রেমকে উপেক্ষা করে অবনীশের কাছে বড়ো হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়,দেশপরিচয়।

আশায় বাঁচে চাষা ।এতদিন পাটগ্রামের ভুয়ো ঠিকানা নিয়ে লেখাপড়া করেছে, এতদিন তার মনে ছিল প্রবল ভয়। সে এখানকার ডিগ্রি দিয়ে চাকরি করতে পারবে না কিন্তু আজ মধ্যরাতের পর থেকে সে ভয় আর তার মধ্যে থাকল না।এখন সে দেশ পাবে ,নাগরিকত্ব পাবে ,চাকরি পাবে, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে ।
সেমন্তী চায় না কেউ তাকে ছিটমহলের বাসিন্দা বলুক ,এখন সে দেশ পাবে ।এ আশায় যেন মিশে রয়েছে তার স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ। এসবের ঘোর কেটে গেলে সে আবার দুঃখে ডোবে।এভাবেই একটি প্রেম   মধ্যরাত্রে  অগ্রসর হতে থাকে মৃত্যুর দিকে।

সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তান দুটো দেশ তৈরি হয় কিন্তু ছিটবাসীরা কোনো দেশ পায় নি তখন থেকেই তাদের মনে দেশপ্রাপ্তির আকাঙ্খা  ।সেই দিন টিও ছিল শুক্রবার আর আজকের মধ্যরাত্রের স্বাধীনতার দিনটিও শুক্রবার  ,মাঝখানের আটষট্টি বছরের স্মৃতি রোমন্থন করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে হারাধন। তাদের জীবনের আর একটি শুক্রবার এবং মধ্যরাত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার আনন্দ মিলে মিশে এক হয়ে যায়,স্মৃতি তাদের কাঁদায়  ,আনন্দে চোখের জল বেরিয়ে আসে । ছিটবাসীদের তীব্র যন্ত্রণার কথা তিনি তুলে আনলেন।মেঘলা আকাশে যেন পূর্ণিমার আলোছায়া সৃষ্টি হয়। হারাধন এবং সোলেমান মিয়ার মধ্যে ।

ধরলাতে জল নেই,ঢেউ নেই ,এর পর আর ধরলা নদীকে দেখতে পাবে না সোহন বণিক।
ধরলা তাকে কত সুখ দিয়েছে দুঃখ দিয়েছে,কতবার তাকে কাঁদিয়েছে ,কতবার তাকে দিয়েছ সুখ  এসব  তার কাছে শুধুই স্মৃতি নয় ,ধরলা তাকে যেন বাঁচতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম । এই নদী তার ভিটেমাটি ভেঙেছে বহুবার ,সে গাছতলায়  থেকেছে। আবার ধরলার পাশে বসেই সে পেয়েছে আনন্দ ।ধরলা এখানে যেন একজন মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ। মধ্যরাতের পর থেকে সে আর ধরলা নদীকে দেখতে চাইলেও দেখতে পাবে না ,তার মন ভারী বিষণ্ণ ।মায়ের উপর রেগে গিয়ে আবার মায়ের কোলে মাথা ঠেকিয়েই যেন চিরসুখ। এবার সে কার কোলে মাথা ঠেকাবে?এভাবে পরিচয়হীন মানুষের কষ্ট দূর করেছে ধরলা।তার নেওয়ার মতো কিছু নেই এই ধরলার স্মৃতি ছাড়া।

একদিকে নিখাদ ভালোবাসার টান এবং অন্যদিকে জন্মভূমির টান ,সালমা ও মনোয়ারকে সামনে রেখে  তাদের মনস্তত্ত্বকে আবিষ্কার করলেন গল্পকার।অনেকেই জন্মভূমিকে ছাড়তে নারাজ ,যে জমির ধান খেয়ে বেঁচে আছে ,যে জমি বাঁচিয়ে রাখে তাকে কি ছেড়ে যাওয়া যায় । কোনো মুসলিম তো এই সুনীলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নি তবে কেন আমি এই জন্মভূমি ছাড়ব ।আমি  কি ভারতে যাওয়ার আবেদন করবে পারি?

যারা একবার ইন্ডিয়া যাওয়ার আবেদন করেছিল তারা ইচ্ছে করলেও বাংলাদেশে থাকতে পারবে না। ওপারে গিয়ে আদৌ ঘরবাড়ি মিলবে কি না সে বিষয়েও সন্দেহ থাকলে নাগরিকত্বের টানে অনেকে বুক বেঁধেছে আশায়। মনোয়ার তার স্ত্রী পুত্রকে পর্যন্ত ছাড়তে রাজি নাগরিকত্বের টানে,জন্মভূমির টানে অন্যদিকে সালমা তার জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়তে নারাজ তাই সে ঝগড়া করে তার দুই পুত্রকে নিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দিয়েছিল । কিন্তু শেষ অবধি তারা। ভালোবাসার টানের কাছে পরাভূত হল জন্মভূমির টান-
"  আমি এতকিছু বুঝতে পারি না ।আমি আমার তমাল তুষারকে বুকের মধ্যে চাই ।নইলে আমি কেমন বাবা -- ও চিৎকার করে কেঁদে উঠলে ওর চারপাশে দাঁড়ানো মানুষেরা চোখের পানি মোছে ।সোহান বণিক ওর মাথায় হাত রেখে বলে সালমা তোকে ছাড়া থাকতে পারবে না রে মনোয়ার ।ও তো জন্মভূমির টানে থাকতে চেয়েছে ।কিন্তু ওর তো ভালবাসার টান আছে।
এখানেই যেন অস্পষ্ট হয়ে আসে ছিটমহল ,  মনোয়ারের চোখে সালমার ছবি ছাড়া কিছুই ফুটে ওঠে না।তাদের মধ্যে আর কোনো কাঁটাতারের বন্ধন নেই ,রয়েছে শুধুই ভালোবাসার পারিবারিক বন্ধন।
গল্পকার এখানে ছিটমহল বাসীদের সুখ দুঃখে ভরা কিছু স্মৃতি এবং নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে আঁকলেন ছিটমহলবাসীদের শরীরেই আঁকলেন নতুন মানচিত্র।  একদিকে ভালোবাসা ও অন্যদিকে অধিকার , সব কিছুকে মিলিয়ে মিশিয়ে গল্পকার সৃষ্টি করলেন এক নতুন মানচিত্র যেখানে কোনো কাঁটাতার নেই, রয়েছে শুধুই ভালবাসা।

গল্পকার একদিকে একটি প্রেমকে বলি দিলেন অন্যদিকে প্রেমকে ঘিরেই গড়ে তুললেন এক গভীর মনস্তত্ত্বকে। যেখানে কাউকে তিনি দিলেন জন্মভূমির নাগরিকত্ব আবার কাউকে তিনি দিলেন ভালোবাসার নাগরিকত্ব। একদিকে ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া , প্রেমিকাকে ছেড়ে যাওয়া অন্যদিকে   আত্মপরিচয় পরিচয় পাওয়া ,নিজের দেশ পাওয়া ।গল্পকার এখানে যেন একটি প্রশ্ন চিহ্ন  দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। একদিকে সেমন্তীর ভালোবাসার বন্ধন কে ছিঁড়ে দিয়েছেন আবার অন্যদিকে জন্মভূমির টানে বাংলাদেশে থাকতে চাওয়া সালমা হেরে যায় মনোয়ারের নিখাদ প্রেমের সামনে। সব গ্লানি ভুলে সোহন বণিক বলে ওঠে-" ছিট মানচিত্র পেয়েছে এজন্য আমরা সবাই খুশি"।

এভাবে ছিটবাসীদের  আঁতের কথা বের করে আনলেন গল্পকার সেলিনা হোসেন ,তুলে আনলেন জীবনধারীনি ধরলার কথা, প্রেমের পরিণতির কথা।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির স্বাদের আড়ালে লুকোনো তীব্র যন্ত্রণাকে ও স্মৃতিগুলোকে জাগ্রত করে দিয়ে তিনি "মধ্যরাতের ঘরবদল " এর মাধ্যমে  ছড়িয়ে দিলেন বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আবার কারও মনে ছড়িয়ে দিলেন তীব্র বিষাদ। এভাবেই গল্পকার বের করে আনলেন ছিটবাসীদের আঁতের কথা। ছিটবাসীদের ইউনিক একটি সমস্যাকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ছিটবাসীদের পুরো শরীর জুড়েই সৃষ্টি করলেন মানচিত্র।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন