শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

অলোক গোস্বামী : লিটল ম্যাগাজিনে সৃজন সাহিত্যের ধারা

অলোক গোস্বামী
লিটল ম্যাগাজিনে সৃজন সাহিত্যের ধারা


সাহিত্য অকাদেমি এবং কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি এবং গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত,“বাংলা সাময়িক পত্রের ২০০ বৎসর পূর্তির মুহূর্ত্বে বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের স্থানাঙ্ক নির্ণয়” আলোচনাচক্রে উপস্থিত স্বজনদের আমার শ্রদ্ধা জানাই।

বিশিষ্ট জনকে প্রথামাফিক সম্বোধনের পরিবর্তে ‘স্বজন’ সম্বোধন করছি কারণ দুদিন ব্যাপি এই আলোচনা অনুষ্ঠানের মূল বিষয় যেহেতু বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের স্থানাঙ্ক নির্ণয় সুতরাং বলাবাহুল্য যাঁরা এই অনুষ্ঠানে বক্তা কিংবা  শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন এবং হবেন, তাঁরা প্রত্যেকেই লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে যুক্ত। সেটা সম্পাদনার দিক থেকেই হোক কিংবা লেখা কর্মের দিক থেকেই হোক কিংবা পাঠক হিসেবেই হোক। মূল কথা হলো লিটল ম্যাগাজিন তাঁদের চিন্তনে উজ্বল স্থান দখল করে আছে। সেই আকর্ষণেই তারা আজ এসেছেন। জানি, আগামী কালও আসবেন। সুতরাং তাঁরা স্বজন ছাড়া আর কী হোতে পারেন! কিন্তু আমি কিভাবে তাদেরও স্বজন, সেটাও তো ব্যাখ্যা করা উচিৎ। সুতরাং এ প্রসঙ্গে নিজের পরিচয় দেয়াটাও খুবই জরুরি হয়ে পড়ছে, আশা রাখি এহেন প্রয়াসকে কেউ আত্মপ্রচার ভাববেন না।

লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বিষয়ে কথা বলতে গেলে একটা উপমার সাহায্য নিতে হবে। যেমন ধরুন, আমরা জানি যে কই মাছ বিশেষ পরিস্থিতিতে গাছ বেয়ে বেশ খানিকটা উঠে পড়ে কিন্তু তাবলে আমরা কেউ ভাবি না যে ,কই মাছ বৃক্ষবাসী। আমরা জানি, জলই তার সংঘারাম। তেমনই আমিও লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে সাহিত্য জীবন শুরু করার পর এমন কিছু পত্র-পত্রিকায় লিখেছি এবং লিখছি যেগুলোকে তথাকথিত বাণিজ্যিক পত্রিকা বলা হয়ে থাকে। অথচ আজও নিজেকে লিটল ম্যাগাজিনের সামান্য একজন অক্ষরকর্মিই মনে করি। এই মনোভাব নিছকই যে বিনয় নয় তার প্রমাণ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকের তরফ থেকে লেখার আমন্ত্রণ পেলে আজও গর্ববোধ করি। লিটল ম্যাগাজিন সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের কথা জানতে পারলে অনাহুত ভাবেও ছুটে যাই। সর্বোপরি,এতটা বয়স পেরিয়ে আজও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজেই যুক্ত আছি এবং পত্রিকাটির মান কিভাবে উন্নততর করা যায়, তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করি। সুতরাং এরপর উপস্থিত গুণী মানুষদের সঙ্গে যদি একাত্মতা বোধ করি,যদি স্বজনবোধে আপ্লুত হই, আশা রাখি সেই আচরণ ঔদ্ধত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে না।

দুদিন ব্যাপী এই আলোচনা অনুষ্ঠানে আমাকে যে বিষয় বরাদ্দ করা হয়েছে সেটা হলো,“ লিটল ম্যাগাজিনে সৃজন সাহিত্যের ধারা।” কিন্তু সে প্রসঙ্গে আলোচনা করার আগে আমি কয়েকটা কথা বলে নিতে চাই।
বাংলা সাময়িক পত্রের তালিকা থেকে আলাদা করে ‘সবুজপত্র’কে যদি প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে শনাক্ত করি তাহলে সেটার প্রকাশকাল ছিল ১৯১৪। অর্থাৎ অনুষ্ঠানের শিরোনাম অনুযায়ী সাময়িক পত্রের বয়স যদি ২০০বছর হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে লিটল ম্যাগাজিনও এমন কিছু কচি নয়, রীতিমত ১০৪বছরের তরুণ। সবুজপত্রকে লিটল ম্যাগাজিনের শিরোপা দিতে যদি কারো আপত্তি থেকে থাকে তাহলে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে বেছে নিতে পারি। তার প্রকাশকালও ১৯২৩। যদি ‘প্রগতি’ পত্রিকাকে নির্বাচন করি তাহলে সালটা দাঁড়ায় ১৯২৬। ‘কবিতা’ পত্রিকার ক্ষেত্রে সালটা ১৯৩৫। অহেতুক নামের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। মূল কথাটা হলো,অনেক বাছাবাছির পরও লিটল ম্যাগাজিনের বয়স ৮৩ এর চে’ কমানো যাচ্ছে না।

এবার আসা যাক সাহিত্য অকাদেমি এবং লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি এবং গবেষণা কেন্দ্রের বয়স প্রসঙ্গে। সাহিত্য আকাদেমি গঠিত হয়েছিল ১৯৫৪তে। অর্থাৎ ৬৪ বছর আগে। লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি এবং গবেষণা কেন্দ্রের শুরু ১৯৭৮। অর্থাৎ বয়স ৪০ বছর।

আমার এই বয়স সংক্রান্ত কচকচিতে অনেকে বিরক্ত হোতে পারেন,মনে হোতেই পারে ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি,সেক্ষেত্রে আমার বিনীত কৈফিয়ৎ এটাই,কোথাও না কোথাও,কেউ বা কাহারা, ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত নির্ঘাৎ গেয়েছিল,গাওয়ার গুরুত্বটা অনুভব করেছিল নাহলে তো এই প্রবাদটার জন্মই হোত না। আমার বক্তব্য থেকে আশা রাখি বুঝিয়ে দিতে পারবো কেন শিবের গান গাইছি।
তো এবার আপনারা নিজেরাই হিসেব করে দেখুন,কতগুলো বছর পেরিয়ে আসতে হলো এই দুটো সংস্থার যুক্ত হয়ে এরকম একটা মহৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে!

তবে সময় যতই লাগুক,ঘটনাটা ঘটলোই।‘যা হয়নি তা কখনও হবেনা’ এই চালু গুজবটাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিলো দুদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং এই আয়োজন নিঃসন্দেহে  লিটল ম্যাগাজিনের ঊষ্ণিষে একটি দৃপ্ত পালক যুক্ত করলো।

এবার মূল বক্তব্যে আসা যাক। যদিও জানিনা আমার জন্য  বরাদ্দ বিষয়ে কতটা থাকতে পারব! কেননা মাঝে মধ্যে শিবগীতি গেয়ে ওঠার পুরোনো অভ্যেস তো রাতারাতি মুছে ফেলা যায় না। সুতরাং আশা রাখি স্বজনবৃন্দের প্রশ্রয় পাবো।

বক্তব্যের শুরুতে যে সংশয়টা তুলে ধরেছিলাম শোতৃবৃন্দকে অনুরোধ করবো সেটা আরেকবার স্মরণ করতে। যদি ইতিমধ্যে ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে মনে করিয়ে দিচ্ছি, কোন পত্রিকাকে লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে! আমি যেটাকে লিটল ম্যাগাজিন আখ্যা দেব সেটা কি অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? সেই সংশয় থেকেই আলোচনার শুরুতে পরপর বেশ কয়েকটি পত্রিকার নাম উচ্চারণ করে আপনাদের ওপরে দায়ভারটা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, আপনারাই ঠিক করে নিন কোন পর্বটাকে শুরুয়াৎ হিসেবে ধরবেন। আমি কোনো সাতেপাঁচে থাকবো না। কেননা স্বীয় অভিজ্ঞতা মারফত এটুকু বুঝেছি যে বিষয়টা বেশ বিপজ্জনক। কবিতার সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে যেমন নানা মুনির নানা মত আছে তেমনি মতবিরোধ আছে লিটল ম্যাগাজিনের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও। এ প্রসঙ্গে নানা রকম সংজ্ঞা ব্যবহৃত হোতে দেখেছি। কেউ বলেছেন, যে পত্রিকা দীর্ঘজীবি সেটা লিটল ম্যাগাজিন নয়। কারো মতে, যে পত্রিকা আকৃতিতে ঢাউস এবং বিক্রয়মূল্য অধিক হওয়া সত্ত্বেও যার প্রতিটি কপি বিক্রি হয় তা কখনোই লিটল ম্যাগাজিন হোতে পারে না। কারো মতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সেই লিটল ম্যাগাজিন জাতিচ্যূত হয়ে পড়ে।

 এরকম আরও অজস্র শর্ত আরোপিত হোতে দেখেছি। তবে সব শর্ত ভেঙে মূল যে নির্যাসটা পেয়েছি সেটা হলো, বেশীর ভাগ সম্পাদকের কাছেই একমাত্র তাঁর পত্রিকাটিই আগমার্কা লিটল ম্যাগাজিন। বাদবাকি সব আরূঢ় ভণিতা মাত্র। অবশ্য কখনও সখনও আরও দুয়েকটি নামকে স্বীকৃতি দিতে দেখেছি কিন্তু সেই ঔদার্যের পেছনে চক্ষুলজ্জা কিংবা অন্য কোনো শর্ত কাজ করছে কিনা সেটা জানার দুঃসাহস হয়নি।
তবে মতবিরোধ যতই থাকুক, একটি সংজ্ঞার ব্যাপারে অধিকাংশ সম্পাদককে একমত হোতে দেখেছি, সেটা হলো লিটল ম্যাগাজিন হলো সাহিত্যের আঁতুড়ঘর। এখানে লেখক জন্মাবে, হাঁটতে শিখবে, তারপর দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়বে প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার ঘরে। ওপরে উঠতে হলে যেহেতু পিছুটান রাখতে নেই তাই লিটল ম্যাগাজিনের আঙিনায় তার আর কোনোদিন ফেরা হবে না। বড়জোর সাক্ষাৎকারে লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে।

সবচে যেটাতে বিস্মিত হয়েছি সেটা হলো ওই সামান্য স্বীকৃতিটুকুতেই বাঘা সম্পাদকদের চোখেমুখে চরম তৃপ্তি ফুটে উঠেছে! ক্ষোভ, অভিমান কিংবা অপমানিত বোধ করার কোনো লক্ষণই তাদের ব্যবহারে ধরা পড়েনি।

শুধু এটাই নয়, আরও একটা বিষয়কে  লিটল ম্যাগাজিন জগতে প্রাধান্য পেতে দেখেছি সেটা হলো, কোনো একটি বাণিজ্যিক পত্রিকাকে প্রতিদ্বন্দী হিসেবে বেছে নিয়ে আবার তাকেই মডেল করে এগিয়ে চলতে। ফলতঃ বিশুদ্ধ সাহিত্য চর্চার পরিবর্তে সেখানে পাঁচমিশেলি বিষয়কেই প্রাধান্য পেতে দেখেছি। যেন কোনো মনিহারি বিপনি, শোকেসে বিবিধ পণ্য সাজিয়ে রেখেছ যাতে কোনো ক্রেতাকে বিফল হয়ে ফিরে যেতে না হয়।

তাবলে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন জগতের সামগ্রিক চিত্রটাই যে এরকম এবং সেটা অদ্যাবধি প্রচলিত রয়েছে তা কিন্তু বলছি না। বলার স্পর্ধাও রাখিনা কারণ আমার জন্ম কর্ম সবকিছুই কোলকাতা থেকে ছশো কিলোমিটার দূরের একটা শহরে। যখন লিটল ম্যাগাজিন জগতে প্রবেশ করেছিলাম তখন আমার শহরে এবং পাশ্ববর্তি শহরগুলোতেও ওরকম ধ্যান ধারণারই অহরহ প্রকাশ দেখতাম।
তবে কোনো ধ্যান ধারণাই তো আকাশ থেকে পড়ে না, পারিপার্শ্বিক থেকেই গড়ে ওঠে। আর বাঙালি মননে সবচে প্রভাব বিস্তারকারী মহানগরটির অমন ধ্যান ধারণা গড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ছিল কিনা, সেটা বলতে পারব না।

সে যা-ই হোক, কেন জানিনা, ওই  ধাত্রি পান্না বৃত্তি আমার কাছে অস্বস্তিকর ঠেকেছিল। স্ফুলিঙ্গে বাতাস জুগিয়েছিল কিছু ব্যতিক্রমী লেখাপত্র যে সবের মারফত বুঝেছিলাম, লিটল ম্যাগাজিনের দায়িত্ব কখনওই প্রতিষ্ঠানে লেখক/কবি সাপ্লাই করা নয়। লিটল ম্যাগাজিন কোনো লঞ্চিং প্যাড নয়। লিটল ম্যাগাজিন মানেই সাহিত্য আন্দোলন কারণ সে পাঠক রুচির তোয়াক্কা রাখে না। পাঠকের মনোরঞ্জনের দায় তার নেই বরং তার একমাত্র কাজই হলো স্থায়ী রুচির বদল ঘটানো। সাহিত্যের পরিধিটাকে বিস্তৃত করা।
এরপর আমি এবং আমার বন্ধুরা নিজেদের লিটল ম্যাগাজিনগুলোর ঝাঁপ বন্ধ করে শুরু করেছিলাম নতুন একটি পত্রিকা। নাম রেখেছিলাম ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।’ এবং সেটি ছিল যৌথ সম্পাদিত। সেখানে কোনো সম্পাদকের নাম নয়, মুদ্রিত হোত শুধুই যোগাযোগের ঠিকানা। আমাদের আগে এমন পত্রিকা বাংলাভাষায় প্রকাশিত হয়েছে কিনা সেটা আজও জানা নেই।

 কর্মকাণ্ড এখানেই থেমে থাকেনি, লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী এবং গবেষণা কেন্দ্রের আদলে আমার শহরেও গড়ে তুলেছিলাম লিটল ম্যাগাজিন এবং লিটল ম্যাগাজিনের লেখকদের বইপত্র নিয়ে একটি প্রদর্শনী তথা বিক্রয়কেন্দ্র। নাম রেখেছিলাম-সেমিকোলন।একটা পোস্টকার্ড মারফত আমন্ত্রণ পেয়েই নিজ খরচে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ছুটে গিয়েছিলেন মাননীয় শ্রী সন্দীপ দত্ত।

 যদিও আমাদের পত্রিকাটিও, হয়ত চালু সংজ্ঞাকে মান্যতা দিতেই,বছর পাঁচেকের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং জনগণ তো বটেই, আমাদের বিপ্লবীয়ানা শহরের লেখক, কবি, সম্পাদকবৃন্দের অনাগ্রহের কারণ হওয়ায় সেমিকোলনেরও অকাল প্রয়াণ ঘটেছিল।

সেদিন যতই অভিমান জাগুক, এখন, ত্রিশ বছর পেরিয়ে নিজেদের কর্মকান্ডে গর্ববোধই করি। কেননা যে ক’দিনই হোক, যতটুকই হোক, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে এগিয়ে যেতে সাহায্য তো করেছিলাম। অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলাম আরও কিছু অনামী অচেনা মানুষকে যারা একই ভাবে কাজ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তারা থেমে যাবার পর এসেছে অন্যরা। সময়ের ফারাক থাকা সত্ত্বেও এই পদক্ষেপগুলো আদৌ বিচ্ছিন্ন নয় বরং সম্মীলিত। এই সম্মীলিত পদক্ষেপের ফলেই লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুল পদক্ষেপগুলোও পারেনি গতিরোধ করতে। আর তাই লিটল ম্যাগাজিনকে কে বা কাহারা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই তথ্য আজ আর প্রাধান্য পায় না। তার পরিবর্তে উঠে আসে সোমেন চন্দ, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার,শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষ,বাসুদেব দাশগুপ্ত,মলয় রায়চৌধুরী,উদয়ন ঘোষ,অরূপরতন বসু,কৃষ্ণগোপাল মল্লিক,সুবিমল মিশ্র,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,দেবেশ রায় এবং এরকম আরও অসংখ্য নাম। এদের ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনাকে পাঠকের সামনে প্রথম তুলে ধরেছে লিটল ম্যাগাজিনই। গড়পড়তা সাহিত্যের পরিবর্তে পাঠককে আগ্রহী করেছে নতুন রচনারীতির স্বাদ গ্রহণ করতে। সেই প্রচেষ্টা যে বিফল হয়নি তার প্রমাণ,পরবর্তিতে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো বাধ্য হয়েছে নিজেদের ছাঁচ থেকে বেরিয়ে ওদের কারো কারো লেখা ছাপতে। সবার ক্ষেত্রে অবশ্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়নি। সেসব লেখকেরা জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা না রেখে শুধু মাত্র লিটল ম্যাগাজিনকেই তাদের রচনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। লিটল ম্যাগাজিন শুধু তাদের লেখাই প্রকাশ করেনি, সীমিত সামর্থ সত্বেও সেসব লেখকেদের বইপত্রও প্রকাশ করেছে। করে চলেছে।

সুতরাং থোড় বড়ি খাড়া সাহিত্যের চর্চা করার পরিবর্তে ব্যতিক্রমী এবং নিরীক্ষা মূলক সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে  বাংলা সাহিত্যের সৃজনীধারাটাকে সজীব রেখেছে যে একমাত্র লিটল ম্যাগাজিনই সেটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 লিটল ম্যাগাজিন যদি এই দায়িত্ব পালন না করতো তাহলে বাংলা সাহিত্যের দশা কী হোত তার প্রমাণও হাতের কাছে মজুত আছে। বাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রিকাগুলো পাঠক মনোরঞ্জনের ফাঁদে আটকা পড়ে রীতিমত ধুঁকতে শুরু করেছে। একদা হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হওয়া দুর্গাপুজো সংখ্যাগুলো এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বকর্মা পুজো সংখ্যায়। তাতেও যেহেতু সামাল দেয়া যাচ্ছে না তাই এখন সাহিত্য সম্ভারগুলোর সঙ্গে বিনামূল্যে চামচ, শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো, শ্যাম্পুর স্যাসে বিতরণ করেও লোক টানতে হচ্ছে। এরপর আগামীতে যদি পুজো সংখ্যাগুলো জন্মাষ্টমী সংখ্যায় পরিণত হয় এবং বাই ওয়ান গেট ওয়ান ব্যবস্থা চালু হয় তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যেহেতু চক্ষুলজ্জা বশতঃ প্রসাদ কবির সুরে স্বখাত সলিল সংক্রান্ত গানটা ওরা গাইতে পারছে না তাই নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে অজুহাত দিচ্ছে বাঙালি পাঠকের উদাসীনতাকে।কিন্তু সেই অজুহাত যে কতটা মিথ্যে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি পাঠকের আগ্রহের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। আমার বক্তব্যকে কারো যদি অতিশয়োক্তি মনে হয় তাহলে তাকে অনুরোধ করব বইমেলায় কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গিয়ে লিটল ম্যাগাজিন বিক্রির পরিসংখ্যানটা জেনে নিতে।

এই জনপ্রিয়তাও শুধু নতুন রীতির গল্প কবিতা প্রকাশের কারণে বৃদ্ধি পায়নি, সাহিত্য সংস্কৃতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে যে ধরণের চর্চা লিটল ম্যাগাজিন করে চলেছে সেসব বাণিজ্যিক পত্রিকার কাছে কল্পনাতীত। এমন কী যে লেখকদের ভাঙিয়ে প্রতিষ্ঠান চিরকাল ব্যবসা করে এসেছে তাঁদের সাহিত্যের মূল্যায়ণ করার দায়িত্বটাও লিটল ম্যাগাজিনই স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। বলাবাহুল্য এই দায়িত্ববোধ সম্পূর্ণভাবেই সাহিত্যের স্বার্থে, পাঠকের স্বার্থে।

এ প্রসঙ্গে তিনজন সাহিত্যিকের কথা বলে এই বক্তব্য শেষ করবো যারা বিগ হাউসগুলোতে চিরকাল লেখালিখি করা সত্বেও লিটল ম্যাগাজিনের সংশ্রব এড়াতে পারেননি। শুধু লেখালিখি নয়, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনাও করেছেন। তাঁরা হলেন বিমল কর,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সদ্য প্রয়াত রমাপদ চৌধুরী। কেন এই দায় ওঁরা অনুভব করেছিলেন সেটা বলতে পারব না তবে এটা জানি যে আগামীতে তাঁদের চিন্তা এবং সাহিত্যকর্মের সঠিক মূল্যায়ন করার দায়িত্ব কোনো বাণিজ্যিক পত্রিকা নয়, পালন করবে লিটল ম্যাগাজিনই।

পরের কথা পরে, আপাততঃ এটুকুই বলতে চাই যে ওই মানুষগুলো প্রকৃতই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন।
নমস্কার।   
 

(নিবন্ধটি ৪ই অক্টোবর ২০১৮,সাহিত্য অকাদেমি সভাঘরে প্রদত্ত বক্তব্যের লিখিত রূপ)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন