শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

নির্মাল্য ঘোষের রম্য গল্প : ভোট-রঙ্গ

নির্মাল্য ঘোষ
ভোট-রঙ্গ

উত্তেজনায় রাত্রিতে ঘুমই আসল না। সরকারী চাকুরী জীবনে প্রথম ভোটের ডিউটি এসেছে- তাও আবার লোকসভা নির্বাচনে।  ফার্স্ট পোলিং অফিসার। আগামীকাল ট্রেনিং হবে। জলপাইগুড়ি ফনীন্দ্র দেব বিদ্যালয়ে। এতদিন ভোট দিয়ে এসেছি -এবার ভোট নিতে যাওয়া- ভাবা যায়? দেশের গণতন্ত্র রক্ষার কাণ্ডারী নির্বাচন প্রক্রিয়ার আমিও একজন অফিসিয়াল কর্মী – ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় যেন। দু চাকার বাইক নিয়ে যখনি রাস্তায় বের হচ্ছি, মনে হচ্ছে যেন লাল বাতি লাগান চার চাকা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি – অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
যা হোক, প্রথম ট্রেনিং দুর্দান্ত লাগল। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন খুঁটি নাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শেখান হল। আমি হাঁ করে শুনে গেলাম বক্তব্য। বিবিধ ফর্ম কিভাবে ভর্তি করতে হবে, ইভিম মেশিন কিভাবে চালাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।   ট্রেনিং এর সময় দেওয়া শুধু মাত্র লাল এক কাপ চা খেয়ে মনে হল প্যারিসে বসে রেড ওয়াইন খাচ্ছি যেন। সব কিছুতেই একটা ভীষণ রকম ভালো লাগা। কি অদ্ভুত!
এরপর দ্বিতীয় ট্রেনিং। জলপাইগুড়ির গর্বের আর্ট  গ্যালারীতে । এদিন আবার পোলিং টীমের সঙ্গেও দেখা হওয়ার দিন। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখলাম প্রিসাইডিং অফিসার, ফার্স্ট পোলিং, সেকেণ্ড পোলিং, থার্ড পোলিং অফিসার সবাই বসে আছেন। প্রিসাইডিং অফিসার বেশ রাশভারী – বছর পঞ্চাশেক বয়স ; সেকেণ্ড পোলিং অফিসার একটি ছোকরা মত ছেলে – টি শার্ট পরে বসে আছে আর পান চিবুচ্ছে – টেরিকাটা চুল; থার্ড পোলিং অফিসার ঘাটের মরা যেন – রোগা হ্যাংলা, সব চুল শাদা – দেখে মনে হয় বয়স খুব কম করেও সত্তর হবে – অথচ এখনো চাকুরি করছে কি করে? ভাবতে ভাবতে ট্রেনিং শুরু হয়ে গেল।
ট্রেনিং শেষে প্রাপ্তি হল একখানি ভোট পরিচালনার গাইড বই – টীমের আর কেউ না, শুধু প্রিসাইডিং অফিসার আর আমি পেলাম। গর্বে বুক ফুলে গেল। প্রিসাইডিং অফিসার বললেন –“ ভালো করে পড়বেন, আমার অবর্তমানে তো আপনাকেই ভোট পরিচালনার দ্বায়িত্ব নিতে হবে…”
“ কেন, আপনি ভোটের সময় বর্তমান থাকবেন না?” আমার অবাক প্রশ্ন।
প্রিসাইডিং অফিসার আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে গট মট করে হাঁটা দিলেন। আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম।  যা হোক, নিজেকে শান্ত করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
ভোটের আগের দিন আমরা জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ডি সি আর সি তে মিলিত হলাম। ডি কোডিং এর পর জানা গেল আমাদের বুথ পড়েছে ধুপগুড়ির গাদং এ। কাছাকাছি হওয়াতে আমরা একটু খুশী হলাম- জলপাইগুড়ি থেকে মাত্র পঞ্চান্ন কিলোমিটার।  প্রিসাইডিং অফিসার চলে গেলেন মোবাইল ফোন নম্বর রেজিস্ট্রেশন করাতে।  লম্বা লাইন – উনি রেজিস্ট্রেশন করিয়ে আসলে তারপর আমরা যাব ভোটের মালপত্তর সংগ্রহ করতে। আমরা একটু ছায়াতে গিয়ে বসলাম। ছোকরা থার্ড পোলিং অফিসার ছেলেটিকে দেখলাম একটি সুন্দরী মহিলা পুলিসের সঙ্গে দিব্বি ভাব জমিয়ে আড্ডা মারছে – ভোটের ডিউটি নিয়ে তার যেন কোনো তাপ উত্তাপই নেই। আর ফোর্থ পোলিং দাদুকে দেখলুম এক টিপ নস্যি বের করে আরাম করে নাকে গুঁজে চোখমুখ লাল করে একটা পেল্লায় হাঁচি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। আমি বেচারা এক কাপ লাল চা নিয়ে চুমুক লাগাতে থাকলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মোবাইল রেজিস্ট্রেশন করিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার ফিরে আসলেন। আমরা চললাম ভোটের মালপত্তর সংগ্রহের নির্দিষ্ট লাইনের দিকে। হঠাৎই একদল লোক ছুটে এল হৈ হৈ রৈ রৈ করে – ঘিরে ফেলল আমাদের। লোকগুলোকে দেখে ভদ্রলোকই মনে হল। সঙ্গে চারজন পুলিশকেও দেখলাম। ওদের মধ্য থেকে একজন আমাদের প্রি সা ই ডিং অফিসারের দিকে তেড়ে এল। চীৎকার করে বলে উঠল :
“আমার মানি ব্যাগ টা তাড়াতাড়ি বের করুন…”
“ আপনার মানিব্যাগ তো আমার কাছে নেই…. আমি কোত্থেকে বের করব?” প্রিসাইডিং অফিসার বিস্মিত, সঙ্গে আমরাও…
“ বেশী চালাকি করার চেষ্টা করবেন না…. ফল খারাপ হবে…বের করুন তাড়াতাড়ি….” সঙ্গের লোকজনও ভদ্রলোককে সঙ্গ দিল সমস্বরে।
“আমি চালাকি করছি না…. আপনারা করছেন…” প্রিসাইডিং ভ্রু কুঞ্চিত করে উত্তর দিল।
“ তবে রে শালা…তোর একদিন কি আমার একদিন আজকে…” ভদ্রলোক তেড়ে আসল প্রিসাইডিং অফিসারের দিকে…অন্যরা কোনোমতে আটকাল, কিন্তু তারাও প্রিসাইডিংকে গালাগালি করতে থাকল। আমরা হতভম্ব – কিছুই বুঝতে পারছি না। কিছুক্ষণ দুই পক্ষের বাদানুবাদ শুনে কিছু জিনিস পরিষ্কার হল, সেটা এরকম :
রেগে যাওয়া ভদ্রলোকও প্রিসাইডিং অফিসার – মোবাইল রেজিস্ট্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের প্রিসাইডিং অফিসার । হঠাৎ ভদ্রলোক খেয়াল করেন তার পকেটের টাকা ভর্তি মানি ব্যাগটি উধাও। চারিদিকে খোঁজ খোঁজ…শেষে পুলিশের সাহায্যে সি সি টিভি ফুটেজে দেখা যায় যে ভদ্রলোকের পকেট থেকে কোনোভাবে মানি ব্যাগটি পড়ে যায় আর সেটি দেখে ফেলেন পিছনে দাঁড়ান আমাদের প্রিসাইডিং অফিসার। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ফুটেজে দেখা যায় যে উনি ব্যাগটি ফেরত না দিয়ে নিজের পকেটে পুরে নেন। ভদ্রলোকের খেয়াল হয় যে আমাদের প্রিসাইডিং অফিসার ওনার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন –দুজনের মধ্যে কথাও হয়েছিল -তাই চিনতে অসুবিধে হয়নি - উনি পুলিশের সাহায্য নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে পাকড়াও করেছেন আমাদের প্রিসাইডিং অফিসারকে।
এবার পুলিশের একজন এসে কলার ধরলেন আমাদের প্রিসাইডিং অফিসারের –“ বের করুন ব্যাগটা না হলে কিন্তু…..”
আমাদের প্রিসাইডিং অফিসার এবার ধীরে ধীরে মাঠের মধ্যে বসে পড়লেন।  মাথা নীচু করে নিজের এট্যাচি ব্যাগ টা খুললেন আস্তে আস্তে – তারপরে আমাদের অবাক করে দিয়ে টাকা ভর্তি একটি মানি ব্যাগ বের করে এগিয়ে  দিলেন ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক চীৎকার করে উঠলেন : “ এই তো…এই তো আমার মানি ব্যাগ…শালা চোর, ছোটো লোক, আবার ভদ্রলোকের পোষাক পরেছে….”
চোর প্রিসাইডিং অফিসার মাথা নীচু করে বসে থাকলেন। লোকজন গালাগালি দিতে দিতে ফিরে গেল।  সেক্টর অফিসার আমাকে এসে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন- “ যা বুঝতে পারছি, বাস্তবে হয়ত আপনাকেই প্রিসাইডিং অফিসারের দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে…উনি নাম কে ওয়াস্তা থাকবেন।“  আমি ঢোঁক গিলে একটা কাষ্ঠ হাসি হাসলাম। বাস্তবেও সেবার আমাকেই প্রিসাইডিং অফিসারের সব কাজ করতে হয়েছিল যদিও উনি সঙ্গেই ছিলেন, কিন্তু সেক্টর ওনাকে আর বিশ্বাস করতে পারেননি।
যদিও এ ঘটনা বহু বছর আগের, কিন্তু আমার প্রথম ভোটের ডিউটির এই ভোটরঙ্গ আমার স্মৃতি পটে চির মুদ্রিত হয়ে আছে – ভোটের আমোচনীয় কালির মতই। সত্যি কত ধরণের লোক আছে এই পৃথিবীতে – ভাবলে অবাক লাগে।
                                                 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন