শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

আত্মকথা : তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

"ছ-সাতটি কবিতার বই, তিনশোর বেশি ছোটোগল্প, তিরিশটির মতো উপন্যাস লেখার পরে আজও মনে হয় সেই লেখাটা আজও লেখা হয়নি যা লিখতে চেয়েছি আশৈশব।" ------ তপন বন্দ্যোপাধ্যায়



একটা সরল সত্য দিয়েই শুরু করা যাক এই লেখা। এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার নিজের কাছে নায়ক। কেউ কেউ অন্যের কাছেও। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নায়করূপী এই যে 'আমি'র সদা বিচরণ, সেই আমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে যার যার পৃথিবী।

পৃথিবীর আরও একটি সরল সত্য এই যা  মানুষ তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নায়ক থাকে। তার 'আমি'র চারপাশে ব্যপ্ত হয়ে থাকে তার চেতনাবিম্ব। মানুষের এই চেতনাবিম্বে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য ভাবনা। কোনও ভাবনা চিরস্থায়ী হয় না। ভাবনাগুলো পরমুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নিয়মে। কোনও কোনও ভাবনা কিছুক্ষণ পরপর ফিরে আসে। আবার মিলিয়ে যায় কেননা পরের ভাবনা মানুষকে খোঁচাতে থাকে। পরের ভাবনাটি সরিয়ে দেয় আগের ভাবনাকে। কিছুক্ষণ পর তৃতীয় ভাবনা সরিয়ে দেয় দ্বিতীয় ভাবনাটি। এরকম অজস্র ভাবনা সারাক্ষণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কে। কাগজে লিখে না রাখলে মানুষের সব ভাবনাই বিলীন হয়ে যায় একটু পর পর। তাই পৃথিবীর মানুষের সেই ভাবনাটুকু ধরা থাকে যা মুদ্রিত হয় দুই মলাটের মধ্যে। মানুষের ভাবনা তার চেতনাবিম্বে তখন রূপান্তরিত হয় অক্ষর শিল্পে।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের চেতনাবিম্ব যেহেতু আলাদা, তার অনুভব, তার উপলব্ধি সবই আলাদা। প্রতিটি মানুষের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনও তাই ভিন্ন। এই কোটি কোটি সম্পর্কের খতিয়ান, তার চেতনা বিম্ব নিয়েই গড়ে ওঠে পৃথিবীর অক্ষরশিল্প।

মানুষের চেতনা বিম্বের একটা অংশই তো গল্প-উপন্যাসের উৎস। পৃথিবীর যেকোনও মানুষ যদি সামনে চলতে চলতে সহসা পিছন ফিরে তাকান, তিনি মুহূর্তে আবিষ্কার করবেন তারঁ জীবনের ওঠাপড়া, ভাঙাগড়া। তারঁ জীবনের প্রতিটি বাঁকেই অপেক্ষা করে থাকে কিছু নতুন ঘটনা, কিছু অভিনব রোমাঞ্চ। সবাই সেই রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারেন তা নয়। অনেকেরই মনে হয় জীবনটা বড়ো একঘেয়ে, খুবই গতানুগতিক। কিন্তু আদতে তা নয়। মানুষ ইচ্ছে করলেই তার জীবন উপভোগ করতে পারে নিত্যনতুন ভঙ্গিমায়। প্রত্যেক দিনই মানুষের চেতনা বিম্ব কিছু না কিছু পরিবর্তন সাধিত হয় কালের অমোঘ নিয়মে। সেই চেতনা বিম্ব তিনি কী রঙ দেবেন তা মানুষ নিজেই ভাববেন, নিজের মতো করেই গড়বেন তারঁ জীবন। একটু একটু করে এগোবেন তার জীবনের প্রান্তে। একটু একটু করে আবিষ্কার করবেন নিজেকে। জীবনের পথে মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে দেখবেন নিজেকে। সে দেখা বড়ো বিস্ময়ের। কখনও আনন্দের, কখনও আবিষ্কারকের।

মানব জীবনের অনেকটাই পার হয়ে হঠাৎ কোনও দিন পিছন ফিরে তাকালে এখনও দেখতে পাই ছোট্ট আমিটাকে। ছোটবেলার কিছু ফটোগ্রাফ থাকার দৌলতে নিজের মুখটা নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায় প্রতিনিয়ত। সেই প্রাথমিকে পড়ার সময় থেকে শুরু করেছিলাম ছড়া লেখা। ছন্দ মিলিয়ে মিল দিয়ে লেখা অসংখ্য ছড়া একসময় হারিয়ে গেছে আমার ঠাইঁনাড়া জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে। ঠাইঁনাড়া বলছি এই কারণেই যে শৈশব-কৈশোরে একটি গ্রামে আমার বড়ো হওয়া, সেখান থেকে একসময় কলেজ পড়তে কোলকাতায় আসা। কোলকাতায় কতোবার যে বাসা বদল হয়েছে আমার জীবনে, পরবর্তীকালে পেশার সূত্রে এতো এতো জেলায় থিতু হয়েছি বছরের পর বছর যে এখন পিছন ফিরলে পুরোটা আমিকে আর একসঙ্গে দেখতে পাই না। চোখে পড়ে আমার অস্তিত্বের টুকরো। টুকরো টুকরো হয়ে আমারই মুখোমুখি ছড়িয়ে আছি আমি।

এই অনেকগুলো টুকরো নিয়েই আজকের আমি। সেই ছড়াকার একসময় লিখতে শুরু করেছিল কবিতা। জীবন তখন বয়ে চলেছে মহাকালের কী এক অনিবার্য টানে। জীবন তখন রোদে শুকোতে শুকোতে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বিকেলের মরা আলোয় নিজেকে সেঁকতে সেঁকতে, রাতের অন্ধকারে চেতনালুপ্ত হয়ে পুনর্জন্ম নিতে নিতে, একসময় পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ক্রমশ।

তারপর একসময় হাতে উঠে এলো এক-একটি ছোটোগল্প।  তারপর এক-একটি উপন্যাস।

ছ-সাতটি কবিতার বই, তিনশোর বেশি ছোটোগল্প, তিরিশটির মতো উপন্যাস লেখার পরেও আজও মনে হয় সেই লেখাটা আজও লেখা হয়নি যা লিখতে চেয়েছি আশৈশব। অল্প বয়সের প্রগলভতায় মনে হত একটি বা দুটি কবিতার বই বা কিছু ছোটোগল্প বা একটি-দুটি উপন্যাস, ব্যস্, তাহলেই একজন কলমচি হয়ে ওঠে কবি বা লেখক। আজ জীবনের খাদের প্রান্তে পৌঁছে উপলব্ধি করি কবি বা লেখক কোনও কিছুই খুব সহজে হওয়া যায় না।

লেখক হওয়া কঠিন, সুকঠিন।
কী করে একজন কলমচি লেখক হয় তা এক আশ্চর্য রহস্য।
লেখক অর্থে এখন যা বুঝি তিনি আসলে একজন 'আউটসাইডার'। তিনি পৃথিবীতে আসেন বিশ্বপথিকের মতো। হি ইস জাস্ট অ্যা ট্রাভেলার ইন দিস ওয়ার্ল্ড। আসেন, বাস করেন, সবকিছু দেখেন নির্বিকার ভঙ্গিতে। তার মধ্যেই অনুভব করেন সবকিছু। কখনও খুব ঘনিষ্ঠ হন ঘটমান বিষয়ের সঙ্গে। পরক্ষণেই বিচ্ছিন্ন করেন নিজেকে। তখন বিষয়টি দেখেন অনেকখানি দূরে দাঁড়িয়ে।

সেসময় প্রতিটি মানুষই লেখকের চোখে একটি চরিত্র। প্রতিটি ঘটনাই কোনও না কোনও গল্পের প্লট। জীবনের প্রতিটি অংশই একটি উপন্যাস। কিন্তু কোনও মানুষ তার লেখার চরিত্র হয়ে উঠলে, কিংবা কোনও ঘটনা গল্প হয়ে ঢুকে পড়বে তারঁ লেখায় বা জীবনের কোনও এপিসোডকে তিনি উপন্যাস হিসেবে গড়ে তুলবেন তা লেখকের নিজস্ব ব্যাপার। তখন লেখক নিজেকেও দেখতে পান। একটু দূর থেকেই দেখেন নিজেকে। দেখতে দেখতে তারঁ লেখার মধ্যে একসময় ঢুকে পড়েন নিজেই। গল্পের সঙ্গে এগোতে থাকেন ধীর পায়ে। গল্পের অন্য চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। হাঁটতে থাকেন পরিনতির দিকে। লেখক আর লেখার চরিত্ররা তখন একাকার। এভাবেই লেখকের এক-একটি লেখার গড়ে ওঠার ইতিহাস। প্রতিটি লেখাই একটি নতুন পৃথিবীর নির্মাণ।

তবে যিনি লেখেন তিনিই লেখক নন। দীর্ঘকাল লেখালেখির পরেও আমার এখনও মনে হয় না আমি একজন লেখক। সব সময়েই ভাবি আসল লেখাটা লেখা হয়নি আজও। হয়তো কোনও দিনই হবে না। পৃথিবীর বহু লেখকই আছেন যারাঁ সারাজীবন চেষ্টা করেও তার ইঙ্গিত লেখাটি শেষ পর্যন্ত লিখে উঠতে পারেননি। তবু লেখক না লিখেও পারেন না। লেখাটা লেখকের জীবনে একটা ধারাবাহিক ঘটনা। এভাবে লিখতে লিখতে একটা লেখা হয়তো পাঠকের প্রশংসা কুড়োলো, ঠিক পরের লেখাটায় হয়তো নিন্দে। এভাবে নিন্দা ও প্রশংসার সমভিব্যাহারে লেখকের একটু একটু করে লেখক হয়ে ওঠা।
আবার কোনও লেখার অবিশ্রান্ত প্রশংসাতেও লেখকের আত্মশ্লাঘার কোনও কারণ নেই। কোনও লেখার নিন্দে হলেও মুষড়ে পড়া অনুচিত। লেখা ভালো না হলে তার নিন্দে হবেই। মুষড়ে না পড়ে লেখককে তখন ভাবতে হবে কী কারণে লেখাটা প্রকৃত লেখা হয়ে উঠলো না৷ ভাবতে হবে পরের লেখাটা আরও ভালো করে লেখা চাই। আগের লেখাটির ত্রুটি খুঁজে বার করতে হবে। পরের লেখা থেকে দূর করতে হবে সেই ত্রুটি।
স্বীকার করা ভালো যে, কেউ আমার লেখার নিন্দে করলে তিনি পরোক্ষে আমার উপকারই করেছেন। কোনও সংকলনে আমার লেখা বাদ পড়লে তাতে আরও উসকে উঠছে আমার জেদ। কোনও বড়ো পত্রিকা আমাকে লিখতে না ডাকলে ভেবেছি তাহলে আরও ভালো লিখতে হবে। ভালো লেখাটাই হচ্ছে সব নিন্দে, উপেক্ষা আর অবহেলার জবাব। কারণ আমি তো জানিই কোনও লেখকই তারঁ লেখা সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত মনে করতে পারেন না। প্রায় সব লেখাই লেখকের আরও একটু মনোযোগ পেলে আরও পারফেকশনে পৌঁছাতে পারে। এভাবেই তো একজন লেখকের সারা জীবনের দৌড়।

আমি তাই আজও নিজেকে 'কমপ্লিট রাইটার' ভেবে উঠতে পারিনি। তবু লিখি, প্রতিনিয়তই লেখার মধ্যে অবস্থান করি। লেখা এখন আমার কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। সারাদিন শত ব্যস্ততার মধ্যেও নতুন কোনও লেখা নিয়ে অনুশীলন চলে মনে মনে। লেখার বিষয়, তার চরিত্র চিত্রন, তার আঙ্গিক, তার ভাষা, তার উপস্থাপনা ------ এসবই জারিত হয় মগজের গোপন গহবরে। কবে যেন এভাবেই ঢুকে পড়েছি একটা প্রসেসের মধ্যে। এখন ইচ্ছা করলেও তার ভেতর থেকে আর বেরিয়ে আসা যায় না।

এখন একটা উপলব্ধি করতে পারি, দশটা ভালো গল্প কিংবা একটা কি দুটো ভালো উপন্যাস লিখেও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। লেখাটা হচ্ছে সারাজীবনের ব্যাপার। একজন লেখকের অনেক কিছুই বলার থাকে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় মানুষের এই পৃথিবী, তার জীবনযাপন। তা নানাভাবে না এঁকে তোলা পর্যন্ত নিস্তার থাকে না লেখকের।
কীভাবে এরকম একটি নির্দিষ্ট জগতের মাঝে ঢুকে পড়েছি তা ভাবতে এখন বিস্ময় জাগে। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর টেবিলে ঘাড় গুঁজে একনাগাড়ে দৌড়ের পরও যেন ক্লান্তি নেই৷ নেই, তার কারণ এতো লেখার পরেও মনে হয় এখনও সেই পারফেকশনে পৌঁছাতে পারিনি যা কোনও লেখকের একান্ত অভীষ্ট।

লেখালেখির এই দৌড়টা কিন্তু শুরু হয়েছিল বহুকাল আগে৷ তখন আমার বয়স পাঁচ, দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের খাতায় লিখে ফেলেছিলাম একটা পংক্তি চারেকের ছড়া। পাঠ্যপুস্তকের ছড়া ও কবিতা পড়েই বোধহয় লেখার প্রথম প্রেরণা।

তারপর লেখালেখির সঙ্গে কিভাবে জীবনটা জড়িয়ে গেল, সেকথা পত্রস্থ করার আগে একটা তথ্য কবুল করা ভালো যে, সেই শৈশব থেকেই কিভাবে যেন আমার একটা ধারণা জন্মেছিলো ----- লেখালেখিই আমার ভবিতব্য। নইলে অধুনা উত্তর ২৪ পরগনার এক অজ গাঁয়ে ------ যেখানে সাহিত্যের দন্ত্য স সম্পর্কেও কোনও বাসিন্দার ধারণা ছিলো না, সেই পরিবেশে ক্লাস টু-এ পড়া একটি বালক কেনই বা তার নোট বইতে লিখে যাবে একটার পর একটা ছড়া!

জীবনের অনেকগুলো বছর পার হয়ে এখন আশ্চর্য হই সেই বালকটির স্পর্ধার কথা ভেবে। বালকটি তখনই নিশ্চিত ছিলো সে বড়ো হয়ে কবি হবে, কিংবা লেখক। আজ এতো বছর পরে সেই ছোট্ট 'আমি'টার দিকে তাকালে এরকম কিছু দৃশ্য পর পর ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন