শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

বিজয়া দেবের গল্প : স্বপ্নকথা

বিজয়া দেব
স্বপ্নকথা
           

শীতের রাতে বর্ষা রাতের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল কথার। কী কালো মেঘ! কী ঝড়! কী বিদ্যুৎ চমকানো! আর বিদ্যুতের ঝলকানিতে একটা মুখ ঝলসে উঠছিল- সে মুখটা সে কখনও দেখে নি। মাথায় একঢাল চুল, কপালে বড়সড় টিপ আর পরনে ধূসর শাড়ি। চেহারাটা এখনও স্পষ্ট প্রকট হয়ে আছে। অচেনা মানুষ স্বপ্নে আসে যখন, তখন বেশ কৌতূহল হয়। মানুষটাকে ভালো করে চিনে নিতে মন যায়। রাস্তার চলমান মানুষের সাথে ঐ মুখের মিল খুঁজে নিতে ইচ্ছে যায়।
  তাই হল কথার আজ। কলেজ থেকে ফিরে মার সাথে পার্কে গেল আর খোশগল্পে ব্যস্ত কিছু মহিলার মাঝে স্বপ্নে দেখা মানুষটির মিল খুঁজে বেড়াতে লাগল এবং বেশ আশ্চর্যের মতই হঠাৎ করে একখণ্ড কালো মেঘ এই মাঘ মাসের শীতের বিকেলে আকাশে ধীরে ধীরে ডানা বিস্তার করতে শুরু করল। প্রকৃতির খেয়াল, রাতে এক পশলা বৃষ্টি হল, সাথে খানিকটা হাওয়া, একটু আধটু বিদ্যুৎ চমকাল –কিন্তু এই বলে স্বপ্নের মহিলাকে খুঁজে পেল না কথা।

  পরদিন ঐ স্বপ্নের মহিলার চেহারার আদল খানিকটা ফিকে হয়ে গেল এবং আরও দুদিন পর তা মিলিয়েও গেল।

  স্বপ্ন স্বপ্নই হয়। বাস্তবের সাথে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বপ্নে অপূর্ণতা থাকে, তারা খণ্ড, ছায়াময়, নিরন্তর কিন্তু অস্পষ্ট। আবার চমৎকার মুহূর্তগুলোকে মানুষ স্বপ্ন বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। যেমন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-‘ স্বপনে দোঁহে ছিনু কী মোহে যাবার বেলা হল’, যখন দোঁহে মোহে ছিল তখন ছিল স্বপনে আর যাবার বেলায় অবশ্যই স্বপ্নভঙ্গ। অর্থাৎ চমৎকার মুহূর্তগুলোই স্বপ্ন। আর মানুষ খুব আনন্দে, ভালোতে বেঁচে থাকতে চায়, তাই সে স্বপ্নেই বেঁচে থাকে।

  কথা এক নিরালা বিকেলে ভাবল স্বপ্নেরা আসলে দলবেঁধে আসে আবার দলবেঁধে চলেও যায়। যাবার পর হেমন্তের ফসল তুলে নেওয়া ধূ ধূ মাঠের মত মনটা স্বপ্নহীন পড়ে থাকে। তখন দিনগুলোতে দৈনন্দিনতা ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।

   পরদিন সকালবেলা ঘুম উঠেই দরজা খুলে দেখল কথা এক রুখুসুখু ভিখারিনি দোরে দাঁড়িয়ে। পরনে ময়লা শাড়ি, গায়ে ছেঁড়া কম্বল, কপালে একখানা বড়সড় উজ্জ্বল টিপ। গোটা অবয়বের সাথে টিপটা খুব বেমানান। চেহারাটা চেনা চেনা, কোথাও যেন দেখা গেছে। কিন্তু কোথায়?

   ভিখারিনি চলে গেল। তার দেহের দুর্গন্ধ ও চুলের জট একটা বিপরীত আবহ তৈরি করলেও কথার মনে হল যেন কোত্থেকে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘের দল তাকে ঘিরে ফেলছে। যেন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে হাজারও নক্ষত্রের ফুলকি, যেন বনবাদাড় ভেদ করে তীব্রগতিতে ছুটে চলেছে যূথবদ্ধ হরিণী। সময়টাকে ঠিক চিনে নিতে না পারলেও হঠাৎ করেই অভিমন্যু সেনকে একটা ফোন করল কথা।  অভিমন্যু সেন তার জীবনে এসেছিল ভালবাসার প্রতীক হয়ে। ভালবাসাবাসি হয়নি কখনও, তবু পরিচয় প্রসঙ্গের আড়ালে এক ক্ষীণ ভালবাসার স্রোত তিরতির করে বয়ে যেত, প্রতীকী প্রেমের মতই। অভিমন্যু সেন ফোন পেয়ে যেন একটু অবাকই হল। তবে কণ্ঠের আবেশময়তা বুঝিয়ে দিল সেই সংকেতধর্মী প্রেম মরে যায়নি আজও। কথা অভিমন্যুকে জিজ্ঞেস করল- কেমন আছেন?-অভিমন্যু সেন বলল- এতদিন পর? মনে পড়ল আমায়? ভাবছিলাম বুঝি ভুলেই গেছেন! – শুনে একটু অবাক হল কথা। অভিমন্যু ভুলে যায়নি তাহলে! অনেকদিন ত দেখা নেই। ফোনটোন হয়নি। তবু সে বেঁচে আছে অভিমন্যুর মনে, এটাই আশ্চর্যের। নাহলে সময়টা পেঁজা তুলোর মত, আসছে সরে যাচ্ছে। বৃহৎ বলে কিছুই আর নেই। বড্ড সাময়িক।
অভিমন্যু বলল-একদিন আসবেন? গল্প হবে।
কথা বলল- যেতে পারি।
-হ্যাঁ আসুন, কতদিন হল আপনার মুখোমুখি হই নি।
-আসব।
-অনেকদিন পর আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরবে, গাছপালা সজীব হবে।
কথা একটু শব্দ করে হাসল। বলল- বিদ্যুৎ চমকাবে, তবে ঝড় হবে না।
অভিমন্যু একটু ভেবে নিয়ে বলল- প্রকৃতির আগাম বার্তা আবহবিদদেরও ভুল হয় কথা। ও কথা থাক। তাহলে বলুন কবে?
-যেদিন আমার ফুলবাগানে হাস্নুহানা ফুটবে সেদিন।
- কুঁড়ি এসেছে?
-হ্যাঁ।
- বেশ। আমি অপেক্ষায় রইলাম।
তারপরের দিন পার্কে সেই ভিখারিনির দেখা পেল কথা। আজও তার কপালে পূর্ণিমার চাঁদের মত গোলাকার টিপ,আর একঢাল চুল, পরনে সেই দুর্গন্ধ ছেঁড়া শাড়ি। কথা ভাবল সামনের দিনে পার্কে একখানা নতুন শাড়ি নিয়ে আসবে সাথে শীতের আচ্ছাদনি।

  সময় কীভাবে কেটে যায়! হাসনুহানা ফুটল, ফুলের গন্ধে ম ম করছিল চারপাশ কিন্তু অভিমন্যু সেনের সাথে দেখা হল না কথার। কথাকে চলে যেতে হয়েছিল রাখুকাকার বাড়ি।  রাখুকাকা তখন খুব অসুস্থ, বিছানায় শোয়া,নিদারুণ শ্বাসকষ্ট, কষ্টে দিনযাপন চলছিল। সেই ভিখারিণিকে শাড়ি ও চাদর দেওয়া হল না। সব ফুরিয়ে গেল হঠাৎই। রাখুকাকা জীবনের মায়া কাটিয়ে চলে গেল। স্নেহের একটি বড় জায়গা হঠাৎই সরে গেল। মা খুব কাঁদল। কথার পিতৃহীন জীবনে ও কথার মার স্বামীহীন জীবনে রাখুকাকা অনেক জায়গা জুড়ে ছিল। রাখুকাকা কথার বাবার খুব কাছের মানুষ ছিল। রক্তের সম্পর্কে তাদের কেউ নয়, অথচ খুব কাছের, যেন রবীন্দ্রনাথের সেই প্রাণের মানুষ’ টি। রাখুকাকা তাকে ঘুড়ি ওড়াতে শিখিয়েছিল। মনে পড়ে মা বলেছিল- তুমি বড় পাগল রাখু, কথাকে শেখাচ্ছ ঘুড়ি ওড়াতে? মেয়েরা কী কখনও তেমন করে ঘুড়ি ওড়ায়? – রাখুকাকা হেসে বলেছিল – তুমি আরো বড় পাগল বৌদি। স্বাধীনতার সুখে ছেলেমেয়ে করছ! – বলে রাখুকাকার কী হাসি! মা খুব লজ্জা পেয়ে গেছিল। কথাও খুব হেসেছিল। হাসবে না? ঘুড়ি ওড়াতে গেছে তার আবার ছেলেমেয়ে!

 রাখুকাকার মৃত্যুটা যেন হঠাৎই এল। কথা ভাবতেও পারেনি রাখুকাকা এভাবে চলে যাবে। রাখুকাকার শেষযাত্রার পর কথা দেখল আকাশবাতাস জুড়ে সাদা রঙের ছড়াছড়ি। চারপাস যেন বরফের মত সাদা হয়ে গেছে। গাছপালা, মাটিজমি, নদীনালা, পথপ্রান্তর সবই যেন সাদা, সবই যেন একরঙা। কোথাও কিছু নেই, কতগুলো শুকনো বটপাতার ওপর পা মড়মড়িয়ে চলে গেলে যে ধ্বনির দ্যোতনা হয় , তাও যেন নেই। এরকম নিবিড় শূন্যতা তাকে জড়িয়ে রেখেছিল মাস দুই। তারপর সজীব চঞ্চল জীবন তাকে ফিরিয়ে আনল রঙে, উষ্ণতায়। কিন্তু কেন কে জানে হাসনুহানা গাছটা শুকিয়ে উঠল একদিন। মা বলল গাছে পোকা ধরেছিল। এরকম সময়ে একদিন মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল, মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠল অভিমন্যু সেন। ফোন তুলতেই অভিমন্যু বলল –ওহো কথা! তোমাকে ফোন করি নি। ভুল করে তোমার নং এ লেগে গেছে। স্যরি কথা, ডোন্ট মাইন্ড! ভালো আছো ত? হাসনুহানা আর ফুটলই না?
-ফুটেছিল। ঝরে গেল তাড়াতাড়ি। হাসনুহানা গাছটা আর নেই।
-তাই নাকি? আপনি যত্ন করলে গাছটা ঠিক বেঁচে যেত কথা।
-যত্ন করিনি বলছেন?
- সেভাবে হয়ত করেননি।
ফোনটা কেটে গেল।
এদিকে মা শুধু স্মৃতিচারণ করে। সময় চলে গেলে সোনালি হয়ে যায়। গোল্ডেন টাইম। নদী, নৌকো, দু’পাশে ছড়ানো গ্রামীন জীবন –যেন পটে আঁকা ছবি। স্মৃতি খানিকটা এমনি। রাত হলে মা শচীন দেববর্মণ শোনে-মন দিল না বঁধু/মন নিল যে শুধু, শোনো গো দখিন হাওয়া / প্রেম করেছি আমি। নিজেও সাথে গুনগুন করে গান গায়। টুকরো টুকরো জীবন ছড়ানো চারপাশে- তার থেকে মা যেন খণ্ড খণ্ড অংশ তুলে নেয়। স্বপ্নময় অতীত। কথা বোঝে। মা নিজেকে সোনালি স্বপ্নের সাথে মিশিয়ে দিয়ে বাঁচতে চায়।

  একদিন হঠাৎই কলেজ করিডরে অভিমন্যুকে দেখা গেল। কলেজে এসেছে সে। তবে কথার সাথে দেখা করতে নয়। কথা ক্লাস নিচ্ছিল বি,এ ফার্স্ট ইয়ার এ। টেনিসনের কবিতা। তিন-চারটে মেয়ে সেকেন্ড বেঞ্চে ফুসুর ফুসুর করছিল। মেয়ে দুটোকে সাবধান করতে যাবে, হঠাৎ লম্বা করিডরে চোখ পড়ল। অভিমন্যু। তাকে দেখেছে কি? বোধহয় না। বোটানির অধ্যাপক অরণ্যের সাথে কথা বলতে বলতে পেরিয়ে গেল করিডরের দৃশ্যমান অংশটুকু। একটু আনমনা হয়ে পড়ল কথা। এবার সেকেন্ড বেঞ্চের মেয়েগুলো ফুসুর ফুসুর থামিয়ে তাকেই পর্যবেক্ষণ করছে। বেশ কৌতূহলী দৃষ্টি তাদের। কেন? ওদের কথা বলা থেমে গেল কেন? তার মুখে কি আলোছায়া খেলল? সেটা চোখে পড়ল বুঝি মেয়েগুলির?


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন