শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

সুকুমার সরকারের অণুগল্প : বহিত্র

সুকুমার সরকার
বহিত্র

কফি খেতে খেতে আড্ডাস্থল থেকে বেরিয়ে এলো সায়ন্তন । বেরিয়ে এসে দরজার বাম পাশে রাখা ডাইনোসরের মতো হা করা ডাস্টবিনে কাগজের কাপটি ফেলে দিয়ে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলো । কয়েক ধাপ নামতেই পেছন থেকে খপ করে জামার কলার টেনে ধরলো আয়েশা । বললো , কী ব্যাপার ! কাউকে কিছু না বলে উঠে এলে যে ? আড্ডা ভালো লাগছে না বুঝি ?

এমন ভাবে আয়েশা সায়ন্তনের জামার কলার ধরেছে যে , অনিচ্ছাতেও সায়ন্তনকে ঘুরে দাঁড়াতে হলো । আয়েশা দু'স্টেপ ওপরে , সায়ন্তন দু'স্টেপ নিচে । আয়েশার পরনে জিন্সের হটপ্যান্ট আর ওপরে একটি ছোট্ট গেঞ্জি মতো কিছু । প্যান্ট আর গেঞ্জির মাঝখানে আট ইঞ্চির মতো ফাঁকা অংশ দিয়ে আয়েশার শাদা চামড়ার নরম সেক্সি কোটিদেশ দেখা যাচ্ছে ।

দু'স্টেপ ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশার সেই সেক্সি কোটিদেশ সায়ন্তনের মুখ বরাবর । মুহূর্তে সায়ন্তনের মাথা ঘুরে গেল । নিজেকে সামলাতে না পেরে আয়েশার সেই বেরিয়ে থাকা কোটিদেশ দুই হাতে জড়িয়ে ধরে গভীর একটি চুমু দিল । আয়েশা চোখ বন্ধ করে সায়ন্তনের চুম্বন গ্রহণ করে একটু যেন শিহরিত হয়ে ওঠলো । এই মুহূর্তের করণীয় কী সেটা আয়েশা জানে । জামার কলার ছেড়ে এক হাতে সায়ন্তনের মাথা নিজের কোমরের সঙ্গে চেপে ধরলো । আরেক হাতে সায়ন্তনের মাথার চুল বুলাতে লাগলো । পাশ দিয়ে বয়স্ক কেউ একজন ওপরে উঠছিলেন । দৃশ্যটি তাঁর চোখে পড়ল । সায়ন্তন আর আয়েশা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ করলো না ।
-- হঠাৎ রাগ করে উঠে যাচ্ছিলে কেন ? আয়েশা বলে উঠল ।
-- রাগ করে নয় , এমনি !
-- ওটুকু বুঝি ! এমনি নয় !
-- বোঝোই যখন , কারণ জিগ্যেস করছো কেন ?
-- চলো , অন্য কোথাও যাই !
-- অন্য কোথাও মানে ?
-- চলো প্রিন্সেপ ঘাটে চলো । ওখানে গঙ্গার ধারে বসবো । নৌকায় উঠে নদীতেও ঘুরতে পারি ।
-- হঠাৎ এতটা একলা হতে চাইছো কেন ?
-- তুমি তো তাই চাও ! বন্ধুদের সঙ্গে আমাকে দেখলেই তো তোমার মাথা গরম হয়ে যায় !
-- বোঝোই যখন তখন অন্যের সঙ্গে মেশো কেন ?
-- আরে বাবা , ওরাও তো আমার বন্ধু , না কি ! এক সঙ্গে পড়ি । তা ছাড়া , তুমি তো তখনো এসে পৌঁছাওনি । তুমি অমন করলে ওরা কী ভাববে বলো তো ?
-- ওরা কী ভাববে সেটা ভাবছ ! ওদের সঙ্গে তুমি ইয়ার্কি ফাজলামি করলে , কথা বললে আমার কী হয় সেটা বোঝো না ? আমার ভেতরটায় অস্থির অস্থির লাগে ! গা হাত পা কেমন জ্বালা করে !
-- তুমি আসলেই একটা পাগল ! বিকৃত মনের ? এমন করলে তো তোমার সঙ্গে সম্পর্কই টিকে রাখা যাবে না !
-- বোঝোই যখন তখন ওদের সঙ্গে মেশো কেন ?

সায়ন্তনের এই কথার কোনো উত্তর দিল না আয়েশা । মনে মনে ভাবল , এই বিকৃত মানসিকতার ছেলের সঙ্গে কেন প্রেমে জড়িয়ে পড়লাম ! এই ধরনের ছেলেদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়াও কঠিন ! এরা কোনো কিছুকে নিজের ভাবলে সেই জিনিসকে অন্যকে ছুঁতে পর্যন্ত দেয় না !
সায়ন্তন আয়েশার চুপ করে থাকা দেখে আবার বলে উঠল , সারাটা জীবন তুমি শুধু আমাকে ছাড়া অন্য কারও কথা ভাববে না ! কারও সঙ্গে মিশবে না !
আয়েশা সায়ন্তনের এই বিকৃত মানসিকতার সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলে উঠলো , পোশাক আশাকে তো নিজেকে কেতাদুরস্ত আধুনিক মনে করো ! কাউকে তোয়াক্কা না করে কলেজের সিঁড়িতেই প্রেমিকার কোমর জড়িয়ে ধরতে পারো ! অথচ প্রেমিকার স্বাধীনতার ব্যাপারে এখনো মান্ধাতা আমলের রয়ে গেছ ! প্রেমের বেলাতেই এমন ! বিয়ে করলে কী করবে ?
-- পোশাকে তুমি তো আমাকেও ছাড়িয়ে গেছ !
-- সে তো তোমার জন্যই ! তুমিই বলো , সালোয়ার কামিজ পড়ে এলে আমাকে ব্যাকডেটেড লাগে ! আসলে মনের দিক থেকে তুমি নিজেই ব্যাকডেটেড ! পোশাকের খোলা মেলা আসলে সেক্সয়ের জন্য । সেক্স ছাড়া তুমি কিচ্ছু বোঝো না ! তাই আমি অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেই তোমার খারপ লাগে ! সবাইকে নিজের মতো ভাবো !
-- এখানেই বকবক করবে , না কি এই যে এক্ষুণি বললে গঙ্গার ঘাটের দিকে যাবে , তো চলো ? অস্থির সায়ন্তন বলে উঠলো ।
আয়েশা সায়ন্তনের বেষ্ঠিত বাহুর থেকে নিজেকে ছড়িয়ে নিয়ে সায়ন্তনের হাত ধরে সিঁড়ি থেকে নিচের দিকে নামতে বললো , তা হলে বেশ ভালোই হয় না ? নদীর ঘাটে গিয়ে গঙ্গা বক্ষে নৌকার ছইয়ের আড়ালে নিজের সেক্সটাও মিটিয়ে নিতে পারো !
আয়েশার হাত ধরে নামতে নামতে সায়ন্তনও বলে উঠলো , আমি কি তোমার সঙ্গে জোর করি ? তুমি মজা পাও না ?
আয়েশা সায়ন্তনের এই কথার কোনো উত্তর দিল না ।

সায়ন্তনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবলো , এ সবের পরিণতি কী ? শরীর সর্বস্ব এই প্রেমের আদৌও কি কোনো পরিণতি আছে ! নিজেকে একটু নিয়ন্ত্রণে রাখলে কি ভালো হতো না ! নিজেকে নষ্ট করে সভ্যতার ভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ে এ কোনো সভ্যতার জন্ম দিচ্ছি আমরা ? কিন্তু ফেরারও কি পথ আছে ? নাকি চাকাহীন বহিত্র যানের মতো সময়ের ভিন্ন স্রোতে কেবলি ভাসতে থাকবো ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন