রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২০

গৌতম দে'র গল্প : গ্যাসবেলুন

গৌতম দে
গ্যাসবেলুন


ব্রিজের তলায় এসে বাসটি দাঁড়ায়। ব্রজেন মিত্তির বাসের জানলা দিয়ে মাথাটা একটু বের করেন। ওপরের দিকে তাকান। আঁতকে ওঠেন। আবার সেই ব্রিজ ভাঙার আতঙ্ক জেগে উঠল ব্রজেন মিত্তিরের মনে। পোস্তার ব্রিজ, মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়া আহত আর নিহতরা যেন সমস্বরে শেষবারের মতো চিৎকার করছে বাঁচাও...বাঁচাও...আমাদের বাঁচাও...।
ভাবতে ভাবতে তিনি এই শীতে কুলকুল করে ঘামতে থাকেন। নানাবিধ ভাবনা মনের মধ্যে ধাক্কা মারে। যদি এখন এই ব্রিজটা হুড়মুড় করে মাথার ওপর ভেঙে পড়ে তখন কী হবে? তিনটি মেয়ের এখনও বিয়ে দিতে পারেননি। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। টানাটানির সংসার। বউটার বাতের ব্যামো। আরও কতশত ভাবনা!
ব্রজেন মিত্তির ড্রাইভারকে নরম সুরে বলেন-একটু আগে গিয়ে বাসটা দাঁড় করান না ভাই...।
-দেখতেই তো পাচ্ছেন সামনে জায়গা নেই। বলে ড্রাইভার আবার বিড়িতে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
ড্রাইভারের এই উত্তর ব্রজেনবাবুর মনোঃপূত হয়নি মোটে। তিনি সিট থেকে একটু উঠে আবারও বাসের জানলা দিয়ে মাথা বের করে সামনের দিকে দেখার চেষ্টা করেন। এখনও চার হাত জায়গা আছে সামনের দিকে। একটু আগিয়ে বাসটা রাখলে কোনও ক্ষতি নেই। ব্রিজটা ভেঙে পড়লে তিনি বাঁচলেও বাঁচতে পারেন। সামনের দিকে বসে আছেন। ব্রজেন মিত্তির তবুও আগবাড়িয়ে আবারও ড্রাইভারকে বলেন-দেখো না ভাই, একটু চেষ্টা করে...।
-কি দেখবো? ড্রাইভার মুখ ঘুরিয়ে ব্রজেনবাবুর দিকে কটমট করে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। তারপর নরম গলায় বলে-কারোর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না, শুধু আপনার হচ্ছে?
-ঠিক বলেছ। তিনি আমতা আমতা করে বলেন-একটু আগিয়ে রাখলে ক্ষতি কী!
-কেন? ব্রিজটা ভেঙে পড়বে নাকি!
-পড়তেও তো পারে। বলে ব্রজেন মিত্তির পাশের যাত্রীর সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আশ্চর্য হন, এমন নিরুত্তাপ মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর ড্রাইভারকে আবারও বলেন-একটু আগিয়ে রাখলে তো দোষের কিছু দেখি না। পোস্তার ব্রিজটা ভাই নতুন ছিল। ভেঙে পড়ল। কত মানুষের প্রাণ গেল। কি দাদা তাই তো? পাশের যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন।
-তাদের পরিবার টাকা পেল। চাকরি পেল। বলতে বলতে ড্রাইভার আবার একটা বিড়ি ধরায়। তারপর আবার বলে-আমি মন থেকে চাইছি, এই ব্রিজটাও ভেঙে পড়ুক মাথায়। আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না।
-কেন ভাই? তোমার এই কচি বয়সে এমন মৃত্যু চিন্তা কেন? সামনে লম্বা জীবন পড়ে রয়েছে...
-সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরি, তাতে সংসার চলে না মশাই...।
-তাই! তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করেন-অনেকটা আমার মতো...।
-অবাক হলেন? দিন দিন তেলের দাম বাড়ছে। তার ওপর ‘সেল’ কম হলেই অমনি মালিকের খিস্তি খেউর...।
ড্রাইভারের কথা কানে যায় না ব্রজেন মিত্তিরের। তিনি চোখ বুজে ভাবতে থাকেন, এইমাত্র তুমুল শব্দ করে মাথার ওপর ব্রিজটা ভেঙে পড়ল। ধুলোয় ধুলোয় ভরে গেল। চিড়েচ্যাপটা যানবাহনের সঙ্গে বহু মানুষ। প্রবল চিৎকার। চোখেমুখে বাঁচার আকুতি। অনেকের মতো তিনিও ভীষণ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। রক্ত ঝরছে। একটু একটু করে মারা যাচ্ছেন। তবুও ডান পা-টা প্রবলভাবে নড়াবার চেষ্টা করছেন। পাশের যাত্রীর গায়ে লাগতেই ব্রজেন মিত্তিরকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে ওঠে-ও দাদা, লাথি মারছেন কেন?
-স্যরি...স্যরি। ভুল হয়ে গেছে। নিমেষে ভাবনাগুলো কাচের গেলাসের মতো ভেঙে পড়ে। তারপর কাঁচুমাচু মুখ করে বলেন-ভেবেছিলাম, ব্রিজটা ভেঙে পড়েছে মাথার ওপর। আমি মারা গেছি...।
-আপনি তো মশাই আচ্ছা ক্যালানে তো! বলতে বলতে পাশের যাত্রীটি বিরক্তি প্রকাশ করে উঠে দাঁড়ায়।
সিগন্যাল পেতেই বাসটা যেন ছাড়া গরুর মতো বেপরোয়া হয়ে ছোটে সামনের দিকে। চারদিকে হর্নের শব্দ।
তারমানে তিনি বেঁচে আছেন এখনও। মনে হয়, মাথাটা যেন বাসের জানলার বাইরে গ্যাসবেলুনের মতো সাঁইসাঁই করে বাতাসে উড়ছে। ডান হাতে ধরা প্যাঁচানো সুতোটায় বাঁ হাতের তালু মুঠি হয়ে ওঠে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন