শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

শুভাশিস দাশের অণুগল্প : অভিশাপ

শুভাশিস দাশ
অভিশাপ

ভোর চারটে কুড়ির বামনহাট শিলিগুড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠেই বাবার কথা মনে পড়ে গেলো বিভাসের ।
স্কুল পড়বার সময় বাবা একদিন খেতে বসে ওপার থেকে ছেড়ে আসার গল্প করছিলেন । বাপ ঠাকুরদার
চোদ্দ পুরুষের ভিটে ছেড়ে এপারে এই বামনহাটে চলে আসার গল্প । ঊনিশশ পঁয়শটটি সালের পাক ভারত
যুদ্ধের পর আর সেখানে থাকেন নি বাবা । তখন বড়দা কোলে ।
বামনহাট থেকে লালমনিরহাট খুব বেশি দূরে নয় । দূরত্বটা শুধু মাঝে দুদেশের সীমান্ত !
বিভাসদের দেশের বাড়ি ছিল ওপারের লালমনিরহাট রেল জংশনের পাশে । অবশ্য বিভাস সেসব কিছুই দেখে নি । বামনহাট হাইস্কুলে যখন সে ক্লাশ নাইনে পড়ত তখন একদিন তার এক নিকট আত্মীয়ের সাথে
লালমনিরহাট ঘুরে এসেছিল । তখন অবশ্য ওদের বাপ ঠাকুরদার বাড়ির জায়গা রেলের দখলে চলে গিয়েছে ।
তবুও একবার দেখে এসেছে তাতেই শান্তি ।
ট্রেন হুইসেল দিয়ে ছেড়ে দিলো । এই বামনহাটও জংশন । অবিভক্ত ভারতে এই রেলপথ ছিল জমজমাট ।
দিনহাটার রাষ্ট্রীয় কোন ব্যাংক আধার কার্ড করছে । সকাল সকাল লাইনে না দাঁড়ালে হবে না তাই এই
সাত সকালে গিয়ে ধর্না দিতে হবে । বিভাসের কামরায় আরো অনেকেই উঠেছে দিনহাটাতে গিয়ে ব্যাংকে
লাইনে দাঁড়ানোর জন্য । মকবুল মাস্টারও উঠেছে । গাঁয়ের পরিচিত মানুষ । তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটে এই বামনহাটে । বিভাসকে দেখে কাছে এসে ওর পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো কিরে এত সকালে ? আধার কার্ড ?
হ্যা কাকা ! লাইনে দাঁড়াতে যাচ্ছি । তুমি ? বিভাস বলে ।
আমার একটু বিডিও অফিসে যেতে হবে রে , নাতিটার ডিজিটাল রেশন কার্ড এখনো হয় নি ।
আর বলিস কেন ! কী যে চলছে ! একটার পর একটা ফেকরা লেগেই আছে ।
তবে লাকিলি বাবার জমির দলিলের একটা অংশ পেয়েছি অন্তত দেশটা হয়তো ছাড়াতে পারবে না ।
আচ্ছা বল তো এই যে দেশ টা এখানে আমরা সবাই তো মিলে মিশে আছি । হঠাৎ কেমন করে সব ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে না ? আরে বাবা অনুপ্রবেশ ? ঠেকাও না ! তোমাদের তো বর্ডারে কাঁটাতার আছে , আছে সীমান্ত রক্ষী !
ভোরের গাড়ি তাই এদিক থেকে সঠিক সময়েই যায় । মকবুল কাকার সাথে কথা বলতে বলতে গাড়ি দিনহাটা
স্টেশনে ঢুকে পড়ল । গাড়ি থেকে নেমে বিভাস একটা সিটি রিকশা নিয়ে সোজা ইউনিয়ন ব্যাংকে গেলো ।
বিভাস যখন সেখানে পৌঁছল তখন দশ জনের লাইন হয়ে গেছে । দু একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে । আর লাইনে
কাগজে নাম লিখে ইটে চাপা দেয়া । বিভাস এগারো নম্বরের সিরিয়ালে রইল । পাশের বয়স্ক মানুষটিকে জিজ্ঞেস করলো বাড়ি কোথায় ? তিনি বললেন কূর্সাহাট । সেখান থেকে রাত তিনটের সময় সাইকেলে চেপে রওনা দিয়েছেন ।
কী আর করা যাবে বলো ? বৃদ্ধ বললেন । আমাদের সব থেকেও কিছু নেই । সব অদৃষ্ট !
আসলে এটা অভিশাপ , বুঝলে ? এটা অভিশাপ ! নইলে এক জীবনে কত বার প্রমাণ দিতে হবে ?
সূর্যের আলো ফুটছে । বিভাসের মনে হলো এবার বুঝি সব আঁধার কেটে যাবে । তবু কোথাও একটা অজানা আতংক তাড়া করছে সবসময় ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন