শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

রমানাথ রায়ের মুখোমুখি : প্রগতি মাইতি ও রাজেশ ধর

'কাপুরুষরা কখনো ভালো লেখক হতে পারে না।'



( সাহিত্যিক রমানাথ রায়ের জন্ম ১৯৪০ সালে, মধ্য কলকাতায়। পৈতৃক নিবাস যশোহর, বাংলাদেশ। " শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন" - এর অন্যতম পুরোধা। রাজ্য সরকারের বিদ্যাসাগর পুরস্কার লাভ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, আজকাল, বর্তমান - ইত্যাদি কাগজে লিখেছেন। কিন্তু তাঁর উত্থান লিটল ম্যাগাজিন থেকে। এখনও লিটল ম্যাগাজিনের সাথে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্যে ' জাদু বাস্তবতা'  নিয়ে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তারঁ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : প্রিয় গল্প, দু'ঘন্টার ভালোবাসা, শ্রেষ্ঠ গল্প, গল্প সমগ্র। উপন্যাস  : ছবির সঙ্গে দেখা, ভালোবাসা চাই, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, কাঁকন, অন্যায় করিনি, উপন্যাস সমগ্র ইত্যাদি।)


পারক : শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন এর কি উদ্দেশ্য ছিল?

বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর মানিক প্রমুখ ও লেখকদের হাতে তথাকথিত বাস্তববাদী সাহিত্যের যে ধারা তৈরি হয়েছিল তাকে বর্জন করাই ছিল শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্যের উদ্দেশ্য। আমরা চেয়েছিলাম বাস্তবের সঙ্গে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে নতুন সাহিত্য রচনা করতে।

পারক : এই আন্দোলনকে সফল হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়?

 আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও অনেকটাই সফল হয়েছে। কারণ এখন অনেকেই তথাকথিত বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারা থেকে সরে এসেছেন, তাদের লেখায় ফ্যান্টাসি আসছে।

পারক : ওই সময় এই আন্দোলনে কে কে ছিলেন?

এই আন্দোলনে প্রথমে আমি ছাড়া ছিলেন শেখর বসু, আশীষ ঘোষ, সুব্রত সেনগুপ্ত, কল্যান সেন। পরবর্তীকালে এসেছেন অমল চন্দ্র, বলরাম বসাক এবং সুনীল জানা।

পারক : আপনি প্লটে বিশ্বাস করেন না কেন?

 প্লট সব সময় কার্যকারণে গঠিত হয়। সেখানে প্রতিটি কাজের পিছনে কারণ থাকে। কারণ ছাড়া কার্য হয়না। বিজ্ঞানের এই নিয়মকে আমরা মানতে চায়নি। আমরা দেখেছি অনেক কার্যের কারণ সব সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হাইজেনবার্গের 'অনিশ্চয়তার তত্ত্ব' তো সেই কথাই বলে। তাছাড়া আমাদের জীবনে এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যার কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই কারণেই আমরা প্লট নির্ভর গল্প বর্জন করে ছিলাম।

পারক : আপনার গল্প উপন্যাসে দেখা গেছে আপাত অ্যাবসার্ড  চরিত্র এসেছে। এর পিছনে উদ্দেশ্য কি?

 পুরনো যুগের বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারায় আধুনিক যুগের সমস্যা বা চরিত্রদের প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই অ্যাবসার্ড সাহিত্যের রচনারীতিকে গ্রহণ করা হয়েছে। এটাও একটা রচনাশৈলী। বর্তমান যুগকে প্রকাশ করতে হলে এই রচনারীতি আমার কাছে জরুরী বলে মনে হয়েছে। এই রকমই জরুরি মনে হয়েছিল ত্রৈলোক্যনাথ, সুকুমার রায় বা রাজ শেখর বসুর কাছে। আমাদের পৌরাণিক গল্পে বা মঙ্গলকাব্যের আমরা এই রচনারীতি দেখেছি, এই রচনারীতি আমরা কথাসরিৎসাগর বা আরব্য রজনীতেও দেখেছি। আমরা আমাদের এই মহান ঐতিহ্য থেকে সরে এসে পাশ্চাত্যের বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারায় গল্প উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে নিম্নমানের একঘেয়ে রচনা রীতিতে আটকে গেছি।

পারক : আপনার প্রায় সব গল্প উপন্যাসে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শ্লেষ আছে এর কারণ কি?

সমাজ ও চরিত্রদের অসঙ্গতিকে ফুটিয়ে তোলা এর উদ্দেশ্য। চিরকালীন মূল্যবোধে যা স্বাভাবিক বলে মনে হয় তা যখন আর স্বাভাবিক থাকে না, হয়ে ওঠে অসঙ্গতিতে ভরা, তখনই তা কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শ্লেষের প্রয়োজন হয় তখনই। আমার সব লেখায় যে ব্যঙ্গ বা কৌতুক আছে তা বলা যায় না, তবে অনেক লেখাতেই এসব আছে। আমার কি তাহলে দুটো মুখ? এক মুখে হাসি আর এক মুখে বেদনা! জানিনা, আমার পাঠকরাই এর সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।

পারক : আপনি কি মনে করেন কথা সাহিত্যে হাস্যরস অনিবার্য?

সাহিত্যে কোন কিছু অনিবার্য নয়। প্রত্যেক লেখকেই তার মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নিজস্ব রচনারীতি নির্মাণ করেন। সেখানে হাস্যরস থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তবে তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি বা সরসতা গল্প বা উপন্যাসকে অনেকখানি সুপাঠ্য করে তোলে। তাই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের লেখা আমাদের আজও আকর্ষণ করে, আর সরলতার অভাবে তারাশঙ্কর, বা মানিক আমাদের আকর্ষণ করে না। পাশ্চাত্য সাহিত্যেও বর্তমানে হাস্যরসকে আশ্রয় করা হচ্ছে। তাদের রচনায় কৌতুক রসের প্রাবল্য দেখা যায় কাফকা, বোর্হেস, মার্কেজ, ক্যালভিনো, কুন্দেরা প্রমূখ লেখকদের রচনা তার প্রমাণ।

পারক : আপনার উত্তরণ লিটিল ম্যাগাজিন থেকে। ষাট সত্তরের দশকের লিটিল ম্যাগাজিনের সঙ্গে এই সময়ের লিটল ম্যাগাজিনের কোনো পার্থক্য দেখতে পান?

 ছয়-সাতের দশকের লিটিল ম্যাগাজিনগুলো অর্থাভাবে ভুগত, তাই সেই সময় লিটিল ম্যাগাজিনগুলো ছিল ক্ষীণকায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হত না। তা না হলেও সেই সব ম্যাগাজিনে ছিল স্পর্ধা, অহংকার ও যৌবনের দীপ্তি। নতুন চিন্তা ভাবনার নিয়মিত প্রকাশ হত সেখানে। এক কথায় সেখানে থাকত একটা বেপরোয়া ভাব। কিন্তু এখনকার লিটিল ম্যাগাজিন ক্রমশই যেন রক্ষণশীল হয়ে উঠছে। গল্প উপন্যাস বা কবিতায় বিদ্রোহী মনের পরিচয় সেভাবে থাকছে না। সবাই যেন এখন একটা স্থিতাবস্থা চাইছে, অথচ এখন লিটিল ম্যাগাজিনগুলো বেশ স্থূলকায়। দেখে মনে হয় এদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো, কিন্তু সর্বত্র চিন্তার দৈন্যতা কেন? কেন গতানুগতিক? অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা নগন্য।

পারক : এই প্রজন্মের গল্পকারদের গল্প কি আপনি পড়েন? পড়লে কেমন লাগে?

 পড়ি। এই প্রজন্মের গল্পকারদের গল্প নিয়মিত পড়ি। ভাল লাগলে  লেখককে জানাতে ভুলি না।

পারক : এই প্রজন্মের গল্পকারদের বিশেষ কিছু কি বলবার আছে?

 না, বিশেষ কিছু বলার নেই। আমি চাই সবাই নিজের নিজের মত করে লিখুন। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করুন। শুধু একটাই অনুরোধ, গতানুগতিক লেখা লিখবেন না।

পারক : সাহিত্যিকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে কি?

মানুষ মাত্রই দায়বদ্ধ হয়ে বেঁচে আছে। সে দেশের কাছে দায়বদ্ধ, পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ, পাড়ার কাছে দায়বদ্ধ, রাজনৈতিক দলের কাছে দায়বদ্ধ, বন্ধুদের কাছে দায়বদ্ধ, সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। তার দায়বদ্ধতা শেষ নেই। এত দায়বদ্ধতার কারণে সে হাঁপিয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। তাই সে এইসব দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। লেখক কোন অসাধারণ মানুষ নয়। সেও একজন সাধারন মানুষ। তার আছে এইসব দায়বদ্ধতা। এছাড়াও তার আছে সম্পাদকের কাছে দায়বদ্ধতা। এত দায়বদ্ধতা নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হয়। এ খুব কষ্টের, খুব যন্ত্রণার। তবে সবার উপরে শিল্পের কাছে তার দায় বদ্ধতা। নিজের সময় ও সমাজের কথা লিখলেও যদি তা শিল্প না হয়ে ওঠে তাহলে তার কোন মূল্য নেই। লেখক অবশ্যই তার সময় ও সমাজের কথা বলবে, তবে তা যেন প্রচারধর্মী না হয়, বক্তব্যধর্মী না হয়। সময় ও সমাজ হচ্ছে মাটির মতো, যার বুকে শিকড় চালিয়ে যেমন ফুল গাছের জন্ম হয়, তেমনি জন্ম হয় শিল্প-সাহিত্যের এখানে দায়বদ্ধতার কোন ব্যাপার নেই।

পারক : জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ আপনার সাহিত্যে নজর কাড়ে। এখন আর কোন কোন কথাকার জাদুবাস্তবতার গল্প লেখেন? আপনি কি মনে করেন গল্পে জাদুবাস্তবতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে?

 ল্যাটিন আমেরিকার লেখকদের মতো সেই অর্থে আমার গল্পে জাদুবাস্তবতা নেই। যা আছে আমার গল্পে তা হল অ্যাবসার্ডিটি। মঙ্গল কাব্যের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু সুকুমার রায়, ত্রৈলোক্যনাথে অ্যাবসার্ডিটি কি নেই? আমি ছোটবেলায় সুকুমার রায়ের লেখা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের 'মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত', একে তুমি কি বলবে! সুতরাং বাংলা সাহিত্যে এটা ছিল এবং আছে। এই সময় অনেকে অ্যাবসার্ড গল্প লিখেন কেন? তোমার অনেক গল্পেও (প্রগতি মাইতি) আমি অ্যাবসার্ডিটি খ্ব্বুঁজে পেয়েছি। সায়ন্তনী ভট্টাচার্য্য এ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আরো অনেকে লিখছেন অর্থাৎ আগের মত এই প্রজন্মে অনেকেই তাদের গল্পে অ্যাবসার্ডিটি আনছে। অ্যাবসার্ডিটি যদি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ না করতে পারে তাহলে সুকুমার রায়ের লেখাগুলো ব্যর্থ বলা যাবে কি!

পারক : আগামীতে বাংলা সাহিত্যে কোনো বাঁক বদল হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। কখন কোন প্রতিভার উন্মেষ হবে তা বলা মুশকিল। তবে সাহিত্য তো স্থবির কিছু নয়, তা গতিশীল। বাংলা সাহিত্যে নানা সময়ে নানা পরিবর্তন হয়েছে এবং কিছু বাঁক বদল হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে হবে না তা বলা যায় না, বরং তা হতেই পারে। যদিও এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্য কেমন যেন গর্তের মধ্যে পড়ে পাক খাচ্ছে। এখান থেকে সাহিত্যকে তুলে আনতে হবে, গতিশীল করতে হবে।

পারক : শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য। বেকারি বেড়েই চলেছে। জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া। মধ্যবিত্ত ও গরীব মানুষ দিশাহারা অথচ তেমন কোনো প্রতিবাদ আন্দোলন নেই। একজন প্রবীণ কথাকার হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

 শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য দেখা যাচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। এ অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মর্যাদা হারিয়ে ফেলছে। এরকম চলতে থাকলে একদিন শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে। শিক্ষার সাথে সাথে স্বাস্থ্য! সেখানেও আমরা পিছিয়ে পড়ছি। কলকারখানা তেমন করে হচ্ছে না, ফলে বেকারি তো বাড়বেই। শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান করতে হবে, আর এখানেই চূড়ান্ত সংকট। ব্যাপক কর্মসংস্থানের কথা কেউই ভাবছেন না। সবদিক থেকে একটা অদ্ভুত সংকট এসে উপস্থিত অথচ বিরোধী শক্তির তেমন কোনো আন্দোলন চোখে পড়ছে না। শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকাটাও একটা সমস্যা বলে মনে করি। লেখক কবিদেরও সাহসী হতে হবে, কলম ধরতে হবে। কাপুরুষরা কখনো ভালো লেখক হতে পারে না।




২টি মন্তব্য: