শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

অমিত মুখোপাধ্যায়ের গল্প : খানিকটা খাবার

অমিত  মুখোপাধ্যায়
খানিকটা খাবার


সেই কবে থেকে বাগানের বাইরে যেতে চায় গোন্দু।চা আঁকড়ে বাঁচার ইচ্ছে একটুও তার নেই। সারা জীবন ধরে চ্যাপ্টা-মাথা সবুজ বামনদের ছাউনি আর বনবাদাড়ি দিগন্ত দেখে তার চোখ পচে যেতে বসেছে।ওই সব হাত-পা-খোয়ানো, ঘাড়হীন, সার-দেওয়া সমান মাপের চেহারাগুলো কখনো সখনো আদৌ জীবন্ত বলে মনে হয় না।বুঝি নিষ্প্রাণ গালিচা পাতা রয়েছে সব দিকে !ভোরবেলা থেকে তাদের জল, সার, ওষুধ দিয়ে সেবা কর।পাশে কোথাও নতুন বাচ্চার দলকে তৈরি কর,বড় কর,নিয়ে এসে নতুন ইস্কুল বসাও। তারপর বৃষ্টি ঠাণ্ডা গরম এসব বুঝে পাতার বাড় দেখে দু’বার কি তিন বার চুল আর কান ছাঁটতে যাও।তার জন্য স্থায়ী শ্রমিকে কুলোবে না, ফালতুদের লাগাও। ...তবু তখন একঘেয়ে সবুজের মাঝে নানা জামাকামিজের রঙ দেখতে ভালো লাগে।যত মাথা কাটো,তত বেঁটে গাঁটু ছাত্রের দল বাধ্য কান আর ঘাড় মেলে গোল পাকিয়ে থাকবে।

এমন ম্যাদামারা জীবন মোটে পছন্দ নয় গোন্দুর।ঝাঁক বেঁধে সবাই একই কাজে জীবন খতম করে দিচ্ছে।তারপর বেশির ভাগ মরদ ছুটবে নেশা করতে।দিন না-ফুরোতে ডেরায় গিয়ে ঢোকো।চিতা বেরিয়ে এসে চিত করে দেবে।ছিনিয়ে নেবে গরু-ছাগল, নিদেন মুরগি !বাড়াবাড়ি করলে বনকর্মীরা খাঁচা পাতবে। হাতি হাতিয়ে নেবে চাল আটা কলা কাঁঠাল।শুঁড়ে চালান করবে চোলাই।গুঁড়ি মেরে থাকবে অজগর,যা পাবে গিলবে।চিতা বা অজগর ধরা পড়লে তবু জঙ্গলে চালান যায়।তাতে যতই জঙ্গল ভরে উঠুক না কেন!কিন্তু গণেশ বাবাজিদের ঢোকাবে কোথায়?বেশি জ্বালালে ভেঙেচুরে দলে দেবে পায়ে।

ঘাপটি মেরে থাকে বাগানের মালিকরাও।বুনো জীবদের মতো এরাও একের পর এক ক্ষতি করে কখন পালিয়ে যায়।জমি, বাগানের অংশ, আসবাব এসব সম্পত্তি বেচে দেয়।মাইনে,অন্য সুবিধা বন্ধ করে,ফি পুজোয় বোনাস দেওয়া নিয়ে নখড়া করে।চাঁটি খেয়ে আরও মুখ থুবড়ে পড়ে বাগান।কখনো বাগান একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে তো সর্বনাশ!বেকার হয়ে যাওয়া লোক তো চারপাশের জগতের কিছু জানে না!মদেশিয় ভাষায় কথা বলে নানা প্রদেশ থেকে আসা নানা ভাষা-বলা নিজেদের লোকের সাথে।পুরুষের পর পুরুষ নিজেদের বাগান আর লাইনে বন্দী করে ফেলেছে যে!অন্য কাজও বিশেষ জানে না।কম খেতে পাওয়া দুবলা শরীর নিয়ে ইটভাঁটিতে, পাথরভাঙা বা কোথাও গুদামের মাল ওঠা-নামানোর কাজ বেশি করতে পারে না।ছেলেরা ছোটে ভূটান থেকে কাশ্মীর।মেয়েরা নিখোঁজ হতে থাকে।...বাপু যতই বোঝাক, এমন জগতে সে পড়ে থাকবে কেন !

আরে বাবা, সে তো পড়ালেখা কিছু করেছে!বারো কেলাস কিছু কম হলো!.বাপু জোর করে থামিয়ে দিতে চায়।বোঝাতে চায় যে গোন্দুকে তো আর পাতা-শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে না!বাপু যেহেতু মানিজারের কাজ করে, তার কিছু কথা সাহেব রাখে।সে নাকি গোন্দুকে পাহারাদার রাখতে রাজি হয়েছে।...আরে সে তো বুধুয়া অচানক মরে গেল বলে।মানিজার ভাবছে ভীতু বাপের ছেলেও নরম হবে।সবাই নিজের পেটোয়া লোক চায় কিনা!...কিন্তু মানিজার নিজে চলে গেলে!ওরা তো আকছার কাজ ছেড়ে বেশি মাইনেয় অন্য বাগানে দৌড়ায়।তখন কি হবে?বাপুর কপাল ভালো বলে এসকল সমঝতেই চায় না।

চুপিচুপি নানা জায়গায় চাকরির চেষ্টা জারি রেখেছে সে।শহরে কত রকম কাজ!কত সুযোগ সুবিধে! এখানে কারও শরীর খারাপ হলে ডাক্তার আর দাওয়াই জোগাড় করতেই বিমার-আদমি আর বাড়ির লোক-দুতরফেই  জান নিকলে যাবার দশা হয়।বাগানের ডাক্তার তো যা-ই বিমার হোক,এক কিসিমেরই ট্যাবলেট দেয়!কোম্পানি হয়ত আর কিছু দেয়ই না তাকে!

তা বাদে শহরের জীবনে কত রকম মজা থাকে।কত আজব কিসিমের চিজ ছড়িয়ে থাকে।ওর বন্ধু উইলিয়ম টোপ্পো বলে যে এনজয় করা কাকে বলে তা শহরেই বোঝা যায়।টোপ্পোর বাপ বাগানের স্টোর দেখাশোনা করে।বহুত পয়সা।অনেক খরচা করে ছেলেকে পড়তে শহরে পাঠিয়েছে।কয়েক দিনেই তার চুল রঙদার, চামড়া চকচকে,হাত উল্কিভরা হয়েছে।জামাকাপড় বাহারি আর মুখ নায়কের মতো দেখায়।খালি বলে,তুই চলে আয়, তামাশা কাকে বলে দেখবি।কত কায়দার সব মজা লোটা!না এলে সব বলা যাবে না।...তারপর থেকে অস্থির হয়ে আছে সে।

                                                 ******      দুই      ******

বাপু বলে, চল,জমিটুক দেখে আসি।কাল যাওয়া হয় নাই।সামান্য জমি, কিন্তু ধানি জমি তো!তোর যে জমির টান নাই।দেখভাল করতে পাঠাতেই পারি না।ধান,সবজি যে-টুক হয়,মাগ্গির দিনে তা-ই লাভ!চা-ঝোপের মাঝখান দিয়ে যেতে দূরে জঙ্গলের গায়ে খানিক নামো জমি।অন্যদেরও তেমন আছে পাশে।জল-কাদা কাজে লাগিয়ে চাষ।বাপুই বেশির ভাগ কাজ করে।জোর করে সাথে নিলে তবে সে যায়।একা যেতে তার অল্প ভয়ই করে।কখন বন থেকে চিতাবাঘ লাফ দিয়ে পড়ে!বা হাতি এসে পিষে দেয়!হেঁটে চলার পথে সে বোঝে যে বাপু তাকে আজ নিয়ে চলেছে  বোঝাবার জন্যে।সে যাতে পাহারাদারের কাজটা নেয়।অনেক সব সুবিধের কথা বলে চলেছে।নিজের বাড়িতে সকলের সাথে থাকতে পারবে।চেনা জায়গায় চেনা মানুষের সাথে করা অনেক সহজ।এমন সুযোগ সকলে পায় না।তা ছাড়া বাপুর ছেলে হবার জন্যে পরিচিতি,...বাড়তি সুবিধে...এই সব আর কী!

বাপুকে দোষ দেয় না গোন্দু।তার হাতে পয়সা নেই,অন্য উপায় নেই।এই বাগিচাই বাপুর দুনিয়া।পাকা নোকরি,বাসা,জল,আলো,কম খাজনার চাষজমি,অন্য কিছু সুবিধে- এ সব পেয়েছে সততা আর খাটুনির জোরে।কেবল মালিক আর মানিজারকে সে ভয় পায়।বাড়তি মান্য করাটা তাই চোখে লাগে।যে ব্যাটারা পাতা-শ্রমিকদের দাস বানিয়ে রেখে আলাদা রাজত্ব চালায়,যখন তখন মাইনে বাকি রাখে,বাগান বন্ধ করে দেয়,তাদের আবার অত ভক্তি করা কেন?চাকরি করছ ঠিক ভাবে,তা-ই তো যথেষ্ট,অত কাছে ঘেঁষতে যাওয়া কেন?মাটি ছিটিয়ে সে জমি কোপায় আর দেখে বাপুর কিন্তু তার মতো অত জোরে শ্বাস পড়ছে না!তা হলে সে কি বেশি হাঁপিয়ে পড়ছে!

ফেরার পথে  কলমি, বতুয়া, ঢেঁকি শাক, গিমা শাক, খারকোন, কচু – আগাছার মাঝে যা মেলে তুলে আনে বাপু।চারদিকে আরও কত শাক-পাতা বেড়ে ওঠে এখানে!বাপুর কাছ থেকে চিনে নিতে হবে।



                                                             ****** তিন ******

চায়ের চেহারা কাজে লাগাতে সিনেমার দল এসেছে।চায়ের চাদর,চায়ের গালিচা – এসব কত ভালো কথা বলে হাসাহাসি করছে।লজেন চকলেট দিচ্ছে বাচ্চাদের।হিরোইনটা ঝক্কাস সেজে নাচ দেয়। ব্যস্ততা,হইচই,আলো সাজানো,পেছন দিক খালি করার জন্য চেঁচানো,হঠাৎ তারপর সব চুপ।ছবি নিবার তরে লোকটা ঝুঁকে পুরো কুঁজো হয়ে যায়।ক্যামেরা চালু হতেই হিরো হিরোইনটা কেমন কলের পুতুল হয়ে যায়। ...অত লোক জমেছে, তার মাঝে গোন্দুকে এটাসেটা কাজ দেয় সিনেমাওলারা।পিঠ চাপড়ে দেয়।যাবার আগে টাকাও দেয়।ওদের দলে চাকরির কথা তখন তোলে গোন্দু।

আররে, চাআকরিই !ভাইটি জানিস না, এ এক আজব দুনিয়া।আজ আছে কাল নেই।দিব্যি জায়গা তোদের, নিজের মুলুক ছেড়ে যাবি কেন রে!যা পারিস এখানে করে নে!বাইরে সব কিছু ছিবড়ে হয়ে গেছে ভাইটি!নতুন কাজ ছেড়ে দে,পুরনো লোক কাজ রাখতে জেরবার হয়ে যাচ্ছে!সব সময় গেল গেল ভয়ে মরছে!

কাজে লাগতেই হয় গোন্দুকে।শালো,এত জায়গায় এত দিন ধরে চেষ্টা করেও একটা চাকরি বাইরে কোথাও জোটাতে পারল না!কম সে কম পরীক্ষা বা ইন্টারভ্যু তো নিতে পারতিস!নইলে বুঝবি কেমন করে!নাকি ধরে নিলি চা-পাহাড়িয়ার দেশের ছেলের দম নেই!বাড়ির হাল এদিকে খারাপ।ভাই আর বোনের পড়ার খরচ বাড়ছে।জিনিসের দাম লাফ দেয়।গত ঝড়ে বাসার চাল উড়ে গেল।কোম্পানি কাউকে কিছু দিল না।বাপুর এতদিনের কষ্টে জমানো টাকা বেরিয়ে গেল। ...তাই ঢুকে পড়তেই হলো তাকে। ...আর প্রথম রাতেই নাটক !

সাথে আরেক নাইট গার্ড ফুকনদা আছে।প্রথম দিকে শেখাতে হবে তো গোন্দুকে!মানিজার-বাংলোর গেটের পরে বাঁয়ের গুমটি ঘরে দুজনে বসে আছে।পাখা আছে যে ওখানে!বাইরে তখনো গরম হাওয়া।কী দিনকল পড়ল রে গোন্দু!ফুকনদা বলে,রাতভর পসিনা ঝরানোর মাফিক সিনা তৈয়ার করতে হবে।গরমি কা টেম পুড়বি পুরা মরসুম,জাড় কা টেম জমে যাবি রে! ছোড়ো উ সব, শুনো, অব হম শোতে হেঁ,তুম খয়াল রখখো।যো বতায়া সো ইয়াদ রখখো।এক বাজে তক্ উঠ যায়েঙ্গে।তব হমারে জম্মিদারি।...বলে দুম করে ঘুমিয়ে পড়ে ফুকন। ... বারোটা নাগাদ কিসের শব্দ!বাংলোর পেছন দিকে মনে নেয়!ধুপ্ করে ফের শব্দ! ...ও ফুকনদা,উঠ্! ও দিকে আওয়াজ হয়! ...আঁ উঁ করে পাশ ফিরে সে বলে,আরে কৈসা আওয়াজ!পাখা বন্ধ করে দুজনে কান খাড়া করে থাকে।নাঃ, কিছু তো শোনা যায় না!

-ছোড়ো, কেয়া উল্টা সিধা শুনা!পহেলা ডিপটি হ্যায় না! ডর লগা তুমহে !

-আরে নেহি,  দো দফে শুনা !

তবু দুজনে গুমটির বারান্দায় দাঁড়িয়ে গরমে ঘামতে থাকে।...কয়েক মুহূর্ত পরে বাংলোর বাঁ দিক থেকে পচা গন্ধ ভেসে আসে।অভিজ্ঞ ফুকন তখনি সতর্ক হয়ে যায়।আঁধারের মাঝে ঘনতর কালো কিছু নীরবে সরে যায় ওদিকের লোহার গেটের দিকে।হাতি !বিশাল মাপের গজরাজ!কতগুলো আছে! বোঝার আগেই লোহায় ঘা পড়ার শব্দ!...ফের আরও জোরালো ঘা!বিরাট ধাতব শব্দে ভেঙে হুড়মুড় করে পড়ে কাঠামো।কালো পাহাড় বুঝি হাওয়ায় ভেসে সরে যায়।না, আর কিছু  দেখা যায় না।তা মানে একটাই হাতি ছিল।

-চল ছুট,পিছে দেখতেঁ হ্যায়।

-আরে ইয়ে দেখিয়ে দাদা পিছে কা দিবার তোড় দিয়া !

বোঝা গেল বন থেকে বেরিয়ে এদিক দিয়ে যাবার সময় গণেশজী পাকা কাঁঠালের গন্ধে মাথা ঠিক রাখতে পারে নি।দেওয়ালের বাধা চুকিয়ে জমিয়ে ফলাহার করে আর পেছনে তাকাতে চায় নি।সোজা পথের কারবারি সামনে হেঁটে আরেক বাধা পেরিয়ে নৈশযাত্রায় ফের গেছে।

সেরাতে আর ঘুম হয় নি দুজনের।মানিজারকে একই রকম জবান দিতে হবে,যাতে বোঝা যায় সম্পত্তি নষ্টে তাদের কোন দোষ ছিল না।বাকি রাত ধরে ফুকন জংলি প্রাণীদের চলাফেরার নানা রকম সকম বোঝায় নয়া পাহারাদারকে।বন্ধু হয়ে যায় দুজনে।

                                                          ****** চার ******

বাসায় ফিরছে গোন্দু।বাপু কাজে পাঠিয়েছিল কালচিনিতে।অনেক বেশি সময় লেগেছে কাজ  সারতে। তারপর বাসও এসেছে দেরিতে।বাগানের কাছে নামতে রাত হয়ে গেছে।অথচ আজ রাতে পাহারা দেবার আছে।বাসায় ঢুকে খাবার সময়টুকু পাবে না হয়ত।এখনো অনেকটা পথ।জোর হেঁটে সবে বাগানে ঢুকেছে।এক জায়গায় আগের মতো পচা গোবরের মতো গন্ধ পায়।ভয় পায় কি সে!না না, কেবল সতর্ক হয়ে নজর রেখে চলে।চা-ঝোপের মাঝ দিয়ে আরও কিছু পথ এগোতে তার মনে হয় ওখানে সামনে ওই গাছদুটো তো ছিল না!ফুকনদা বলেছিল রাতে হাতিকে আঁধার কোন গাছের মতোই দেখায়।সন্দেহজনক কালো কিছু দেখলে সতর্ক হতে হবে।পচা গন্ধ বলছে গণেশজী হবে!দাঁড়িয়ে পড়ে সে।একটা গামার গাছ ছুঁয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।তেমনই বলেছিল ফুকনদা।আর সত্যিই মাঝারি গাছটির সেই গুঁড়ি তাকে অচেনা আশ্বাসের ছোঁয়া দেয়।

কত অনন্ত সময় চলে যায়।বনের জানোয়ারের কী বিস্তর ধৈর্য রে বাবা!ও কি পাতা খেয়ে চলেছে,নাকি গোন্দুকে দেখে থমকে গিয়ে বুঝে নিতে চায়! গোন্দুর পা টনটন করে।ঘুম ঘিরে আসে।...আরে কখন নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল গণেশজী!আর কয়েক মিনিট দেখে পা টিপে টিপে এগোয় সে।রাত কি মাঝখানে পৌঁছে গেছে ! পাহারার চিন্তা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।...খাবার চাই,যা হোক কিছু খাবার !পেট কেমন করে।ক্লান্তিতে জোর কমে আসে।খুব একটা বেশি পথ যেতে পারে নি তখনো ...হায় রে,সামনে ও কী জ্বলে !জোড়া চোখ !ফুকনদা শিখিয়েছে যে বাগানে আঁধারে কিছু জ্বললেও থেমে লুকিয়ে পড়তে হবে।স্থির দাঁড়ালে হয় ওরা খেয়াল করবে না,নইলে অচেনা ঝামেলা এড়িয়ে অন্য দিকে চলে যাবে।নড়াচড়া দেখে সে,  ...বাপ রে চিতা !...ফের দাঁড়াও। মাথা নিচু করে চায়ের গন্ধ শুঁকতে থাক আর খেয়াল রাখো।...আবার আরেক জন্ম কেটে যায়।চিতাবাঘ অতি ধীরে পাশের লাইনে ঝুপড়ির দিকে যায়।এদিক ওদিক সাবধানে দেখে,পা টিপে,থমকে কান পেতে, চোরের মতো। তা দেখে ঐ দশাতেও ওর হাসি পায়।লাইনে গিয়ে সিঁদ কাটার মতো বেড়া কাটে চিতা।তখনি ছাগলের আর্ত চিৎকার জাগে।ঢিল ছোঁড়ে সে।ঝোপ-নাড়ানো,মাটি-কাঁপানো শব্দে বাঘ পালায়।তখনি আরেক চিন্তা তার মনে জাগে।আজ রাতে বেচারার আর খাওয়ার মতো কিছু জুটবে কিনা কে জানে !বনের হরিণ,খরগোশ,শজারু থেকে বুনো শুয়োর তক্ সাফ করে দেয় মানুষ।ওরা পেটের টানে ঝুঁকি নিয়ে বন থেকে বেরোতে যে বাধ্য হয়!বিপুল লাফ দিয়ে অবিশ্বাস্য জোরে ছোটা সেরা শিকারির কী দশা!চুরি করে পেট চালাতে হয়!খাঁচায় ধরা পড়তে হয়।সমান মরিয়া গরিবদের হাতে মার খেতে হয়!

এগিয়ে চলে গোন্দু।আজ দুপুর অবধি সে ভেবেছে  বাইরে কাজ পেলেই এ বাগান ছেড়ে চলে যাবে। এখন, এখুনি তার মনে হচ্ছে সে সাবালক হয়েছে, নিজের মাটি ছেড়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?সবাই তো শুধু খাবারের খোঁজে জঙ্গল ছেড়ে আসছে।...বাইরের দুনিয়াতেও সেই রুজি নিয়ে, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি, মারামারি।সে তো আজ কালচিনি থেকে শুনে এল কী হাল হয়েছে দীন দুনিয়ার। নাঃ মন বদলে গেছে তার।বাইরের ওই দুনিয়ায় পেটে দেবার কিছু জুটছে না!রুজি নেই।আরও ভয়ের নাকি যা-আছে তা কেড়ে নেবার জন্য কত রকম নতুন কল-কায়দা হচ্ছে।প্রতি দিন নতুন সব কার্ড নিতে বলা হচ্ছে।শেষ পর্যন্ত হয়ত পরিচয় আর দেশ অবধি মুছে ফেলে দেবে!হাজার শহুরে মজার ব্যবস্থা করে রেখেছে এসব ফাঁদগুলো লুকানোর জন্য!ওই জীবন টোপ্পোদের জন্য,যারা সব জমানা থেকেই সুবিধে নিয়ে চলবে।এরা কখনো অন্যদের কথা ভাবে না,ভাববে না।

আজ কালচিনিতে লোকেদের দেখে সে অবাক হয়ে গেছে।কত যে দুশ্চিন্তায় আছে সীমান্ত চা-বাগানের মানুষ!অনেকেই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।বড় আর বুড়ো মানুষগুলো ক্লাসে পড়া না-পারার ছাত্রের মতো ভয়ে ছোট হয়ে গেছে।এইসব দেখার সাথে সাথে গোন্দুর স্বপ্নের বড় দুনিয়াটাও যে কখন ছোট হয়ে গেছে! ... গোন্দু বাংলোর দুয়ারের আলো দেখতে পায়, মনে হতে থাকে নতুন দুয়ার খুলে গেছে তার।যা লড়াই করার, নিজের জায়গা থেকেই করবে!সাথে অন্য কিছু করতে বাড়তি খাটবে।...তা ছাড়া সে তো বুনোদের সাথে সহাবস্থানের মন্ত্র শিখে ফেলেছে !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন