শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

মণিদীপা দাসের গল্প : পাপ

মণিদীপা দাস

পাপ

(১)

বৃষ্টিটা একেবারে ঝেঁপে এল। অবশ্য অনেকক্ষণ ধরেই আসবে আসবে করছিল। আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহেই বেশ ঢেলে দিচ্ছে এবছর। নিতাই মন্ডলের মুদিখানা এখন লোকজনে ভর্তি। এমনিতেই এরকম সময় খদ্দের মাসকাবারি সদাইপাতির জন্য ভীড় করতে থাকে। তার উপর বৃষ্টির জন্য যে যেখান থেকে পারে ছুটে এসে ঠাঁই নিয়েছে। সাঁতরাদের মেজো মেয়ে বুলা একঘন্টা আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে নিতাই ইচ্ছে করেই দাঁড় করিয়ে রাখে। মিশকালো পেত্নী একটা! চল্লিশ পার হয়ে গেছে। বিয়ে হয়নি। বাপের বাড়ি ঝি গিরি করে কাটায়। কেই বা নেবে ওকে? লম্বা হাড়গিলের মত। ইদানীং আবার গায়ে মাংস লেগেছে কিকরে যেন! রং - চটা চুড়িদারের ভেতর থেকে ভরা বুক চোখে বড্ড বেশী লাগছে। নিতাইয়ের সত্তর পার হওয়া বুড়ো শরীর ভেতরে ভেতরে জেগে ওঠে।

আড়াইটা নাগাদ বৃষ্টি থামল। হাতের মুঠোয় ধরা ফর্দটা আর একবার মিলিয়ে নিল বুলা। দুটো ব্যাগই ভর্তি হয়ে গেছে। যথেষ্ট ভারী ।জর্জেটের ওড়নাটা বাঁ কাঁধ ঘিরে কোমরে বেঁধে নেয় সে। তারপর বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

(২)

জলে থইথই দোকানের সামনেটা। পুরোনো ইঁটের রাস্তার ধারে বলে নীচু টুকরো জমি জলে ভরে যায়। বর্ষা বলে শুকিয়ে যেতে পারে না। বুলার হাওয়াই চপ্পলটা একেবারে চলার যোগ্য নয়।  জলের গর্ত এড়ানোর জন্য যেই একটা পা একটু বেশী বাড়িয়েছে টান লেগে একটা স্ট্র্যাপ খুলে গেল। বিচ্ছিরি অবস্থা। আর একটু হলে পা টা পিছলে যেত কিন্তু অনাদিদার ভাইপো সুরঞ্জন হঠাৎ করে ধরে ফেলল বুলাকে। হাঁ করে সবাই তাকিয়ে দেখল, সুরঞ্জন বুলার হাত থেকে বড় বড় দুটো ঝোলা নিজের হাতে তুলে নিল। বুলার মাথাটা অস্বস্তিতে ঝুঁকে গেছে। সুরঞ্জনের পেছন পেছন ছেঁড়া চপ্পলটা আর না ছেঁড়া একপাটি দুটোই হাতে ঝুলিয়ে মাথা হেঁট করে হাঁটতে লাগলো বাড়ির দিকে।

(৩)

"কি কেস রে লালটু?" - দোকানের মধ্যে থেকে পাড়ার ক্লাবের স্বপন বলে ওঠে।

"কি জানি স্বপনদা.. কিছুই তো বুঝতাছি না। সুরোর মাথাটা গেল নাকি একেবারে?"

"দেখগা কিছু লটঘট আছে নাকি?"

"কিন্তু সুরোর তো এই দোষ ছিলনা স্বপনদা। বুলা তো পাড়ার মাইয়া.."

"ওইসবের জন্য পাড়া - বেপাড়া লাগেনারে ভাই.. তয় বুলারে তো কোনদিন কারোর দিকে চোখ তুইলা তাকাইতে দেখি নাই। সবাইরে তো এহনো দাদা কাকা বইলাই ডাকে। "

" এখনো আবাগীর সবকিছু শুকায়নি তো তাই.. "চাপা গলায় হিসহিসিয়ে বলে ওঠে নিতাই মণ্ডল। এতক্ষণ বাকি সবাই স্বপন আর লালটুর কথা শুনছিল। এখন নিতাইয়ের মুখ থেকে যে কথা বেরোলো তাতে একটা হাসির রোল উঠল।দোকানভর্তি সব পুরুষমানুষ।

(৪)

বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ার আগেই সুরঞ্জনের কাছ থেকে ব্যাগগুলো প্রায় কেড়ে নেয় বুলা। সুরঞ্জনের জানা আছে কেন ওরকম করল বুলা। শুধু চলে যাবার আগে একবার চারচোখ এক হয়। অনেক না বলা কথা বলা হয়ে যায় যেন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরঞ্জন নিজের বাড়ির দিকে এগোয়। বুলা বড় বড় পা ফেলে ঢুকে পড়ে বাড়িতে। চটি দুটো উঠোনে ছুঁড়ে দিয়ে ব্যাগ নামিয়ে একটু হাঁফিয়ে নেয়। বুকটা বড্ড ধকধক করছে। ভয় আর ভালোলাগা একসাথে মিশে গিয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বড় বৌদির গলার আওয়াজ পেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে।

চুড়িদারের পায়জামাটাতে কাদার ছিটে লেগেছে ।ওটা ছেড়ে মেঝেতে রাখে। ওপরের জামাটাও খুলে ফেলে। পুরোনো কাঠের আলমারির প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া আয়নাতে নিজেকে দেখে বুলা। কালো রঙের ব্রা পরা সুন্দর বুকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, ভগবান শুধু ওটুকুই দিয়েছেন তাকে। সুরঞ্জনের মুখটা ভেসে ওঠে। চোখ বুজে ভাবনার ঘোরে তলিয়ে যায় সে।

(৫)

বিকেল পেরিয়ে রাত নেমে গেছে অনেকক্ষণ। নটা নাগাদ আজ নিজের ঘরে তক্তাপোষের উপর শুয়ে এক পা অন্য পায়ে তুলে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে একমনে ভেবে যাচ্ছিল সুরঞ্জন ওবেলার কথা। ঘরটা অন্ধকার। আজ আড্ডায় যেতে ইচ্ছে করেনি। আজকাল সুরো প্রায়ই আর আড্ডা মারতে যায়না। কেমন যেন ভালো লাগেনা। একলা ঘরে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আর একটা মানুষ যদি থাকত! মানুষ নাকি মেয়েমানুষ? হুম্।মেয়েমানুষই।যে তার একান্ত নিজের।আর কতকাল এভাবে চলা যায়? ভালো লাগলো একদম। বুলার মুখটা ভেসে ওঠে। মেয়েটা কালো কিন্তু মুখটা বড্ড মায়াভরা। ওকে বড্ড আপন করে পেতে ইচ্ছে করে।

কাকা অনাদি ঘোষের একতলার তিনটে ঘরের দুটোতেই একটা পরিবার ভাড়া থাকে। একপাশের ছোট ঘরটা সুরোর জন্য বরাদ্দ। বাপ মা হারা ছেলে। কাকার ব্যবসার জন্য মালপত্র আনাটাই তার কাজ। অনাদি ভাইপোকে নিজের ব্যবসাতে ঢোকায়নি। পাছে ভাগ চেয়ে বসে। তার চেয়ে কিছু কাজ করে দিক। বিনিময়ে দু'বেলা থাকা - খাওয়া আর বাড়ির যত বেগার খাটা ভাইপোকে দিয়ে করিয়ে নেয়। সুরোর বয়সও পঁয়তাল্লিশ ছাড়িয়েছে এবছর ।

(৬)

"আজকে অনাদিদার ভাইপো নাকি তোর ব্যাগ বয়ে দিয়ে গেছে?" বড়বৌদির গমগমে গলায় প্রশ্নটা শুনে পেছন থেকে চমকে উঠল বুলা।সে তো এই ভয়েই কাঁটা হয়ে ছিল। কিন্তু বাধা দিতে পারেনি সুরঞ্জনকে।

আমতা আমতা করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, "হ্যাঁ"

"কেন? এত দরদ কিসের? তুই না করতে পারলিনা? "

মাথা নীচু করে ঢোঁক গিলে ছেঁড়া জামাটা সেলাই করতে থাকে বুলা।

"শোন, এসব যেন আর না হয়। পাড়ায় কথা উঠেছে। তোর বড়দা এসে বলল। এরপর ওর সাথে দেখা হলে এড়িয়ে যাবি।"

চুপচাপ সেলাইটা চালিয়ে যায় বুলা। বুকের ভেতর বড্ড ভয় করছে। এর আগের দিনের ঘটনাটা তো কেউ জানেই না। সেই যে সেদিন রাত আটটায় রাস্তার ধারে সুরঞ্জনের সাথে তার দেখা হয়েছিল। সুরঞ্জন তাকে টেনে নিয়ে গেছিল অন্ধকার ফাঁকা জমিটার পাঁচিলের গায়ে। না, গায়ে হাত দেয়নি। শুধু হাত দুটো ধরে বলেছিল, "আমায় বিয়ে করবে বুলা? হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে কয়েক মুহূর্ত লেগে গিয়েছিল। তারপর অনেকটা অস্বস্তি। কিন্তু আরো অনেকটা ভালোলাগা। কেউ তো আছে যে তাকে বউ করতে চায়। চোখে জল এসে গিয়েছিল। কিন্তু অনেক বাধা। অনেক ভয়। বাড়িতে জানলে রক্ষা নেই যে!

(৭)

"কি সব শুনছি সুরো? তুই নাকি ওপাড়ার বুলার ব্যাগ বয়ে দিয়েছিস পরশু দিন? হঠাৎ করে কি হল? তোর তো মেয়েছেলের দোষ ছিল না! আমার বাড়িতে থেকে এসব চলবে না বাপু বলে দিচ্ছি.."-দুদিন পর অনাদি ঘোষ ভাইপোকে সমঝে দিতে এল।

"মেয়েছেলের দোষ আবার কি? আমি ওসব করিনা। তাছাড়া বুলা তো পাড়ার মেয়ে। তোমরা তো ভালো করেই জানো ওকে। "

" বাব্বা খুব বুলি ফুটেছে দেখছি! ওই কেলে কুচ্ছিত মেয়েটার ওপর এত দরদ হল কিকরে? তোর ব্যাপার কি রে? তুই কি বিয়ে-টিয়ের চিন্তা করছিস নাকি? তা দুটো পেট চালানোর ক্ষমতা আছে তো? ওর তো মা বাপ কেউ নেই। দাদা বৌদিরা দয়া করে খেতে দেয়। "

একটু চুপ করে থাকে সুরঞ্জন। কি বলবে সে? বুলা তো পাকা কথা কিছু দেয়নি। অবশ্য দেবেই বা কিকরে? সবসময় ভয়ে মরে থাকে আর সংসারের যাবতীয় খাটুনি খেটে অনেক রাতে ঘুমাতে যায়।

" শোন সুরো, যা তা একটা মেয়ের খপ্পরে পড়লেই হলনা।তুই বড় হয়েছিস ঢের। ভুলভাল কিছু করার আগে দশবার ভাববি। আর.. তোর বাপ মা যে তোর জন্য কিছুই রেখে যায়নি সেটা তুই জানিস। আমার ছেলেমেয়েদেরকে দিয়ে থুয়ে তোর জন্য আর কিছু দিতে পারব না। আমারও বয়স হয়েছে।" গম্ভীর মুখে ভাইপোকে সাবধান করে দিয়ে অনাদি নিজের ঘরে চলে যায়।

(৮)

মশার কামড়ে অস্থির লাগছে। তবু আওয়াজ করার উপায় নেই। আজ সুরঞ্জন যে ছাড়বে না তা বুঝতে পারছিল বুলা। কিন্তু সে কি করবে? দাদা - বৌদিরা জানতে পারলে শেষ করে দেবে যে!

"শোনো, আর বেশী সময় নেই। সামনের সপ্তাহের মধ্যে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। ওরা জানতে পারলে তোমাকে আটকে রাখবে। খুব সাবধানে চলতে হবে।"

"তুমি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে? কিন্তু.. আমি তো খুব খারাপ দেখতে.. আমার তো পয়সাকড়ি কিছুই নেই.. তাছাড়া পাড়ার কেউ মেনে নেবে না। বিয়ে করলে কোথায় থাকব? কি খাবো? "

" আমি শিয়ালদায় একটা আলাদা বিজনেস শুরু করেছি। ওখানেই থাকার ব্যবস্থা হবে। মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে নেব। আমার দু'একজন বন্ধু আছে। "

" কিন্তু আমি.. কিছু বুঝতে পারছি না.. তুমি আমাকে ফেলে পালিয়ে যাবে না তো? তুমি কি সব সত্যি বলছ? "

" এতদিন তো আমাকে চেনো। কখনো খারাপ কিছু দেখেছ?"

সংশয়ভরা মুখে চুপ করে তাকিয়ে থাকে বুলা। বিশ্বাস - অবিশ্বাসের দোলাচলে কি বলবে জানে না সে।

" বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না বুলা? আমাকে কি পছন্দ নয়? তবে আমার কেন আজকাল মনে হয় তুমি আমাকে পছন্দ করো? "

অন্ধকার ঝোপের আড়ালে সুরঞ্জনকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে বুলা। মুখের কথা মনের কথা কান্নাতে মিশে বেরিয়ে আসে দ্রুত।

(৯)

"দাঁড়া..কোথা থেকে এলি তুই?" কোমরে হাত দিয়ে বড়দা দাঁড়িয়ে আছে। বুলা কেঁপে ওঠে।

"কিরে? বল? এই রাতের বেলা কোথায় গেছিলি?"

"মিতাবৌদি একটা সেলাই দিয়েছিল অনেক দিন আগে.."হঠাৎ করেই একটা মিথ্যা কথা বলে দিয়ে দ্রুত কলঘরের দিকে চলে যায় বুলা।

ফিরে আসার সময় কান পাতে বড়বৌদির ঘরে। বৌদি ফিসফিস করে দাদাকে বলছে, "এটা তোমার মা লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল। আজ পেলাম পুরোনো আলমারিতে ।আমি ঠিক জানি ওটা বুলার বিয়ের জন্য রেখে গেছিল.. "

" আরে.. বেশ ভারী তো হারটা.. তোমার কাছে রেখে দাও। ভুলেও বুলাকে দেখিও না।"

"পাগল? আমার মিনু আর তনুর জন্য অনেক গয়না লাগবে। আমি তো যত সব সোনাদানা ছিল আগেই সরিয়েছি। শুধু এটাই কিভাবে যেন দেখিনি এতদিন.. "

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। বুলা সব জানে। মা বাবার চলে যাবার পর সে যে কিভাবে এই সংসারে বেঁচে আছে তা তার থেকে ভালো আর কে জানে? নিজের ঘরের দিকে এগোয় সে।

(১০)

"কি গো দেখলে?"

"না না কোথ্থাও নেই গো.. কোথ্থাও খুঁজে পেলাম না।"

"তাহলে ভোলাদার কথাই ঠিক।ওই অনাদিদার ভাইপোটাই সব নষ্টের গোড়া।"

"আমি ভাবতেও পারছি না গো.. এত তাড়াতাড়ি কি সব হয়ে গেল!"

"পাপ পাপ.. এর ফল ভুগতে হবে ওকে দেখে নিও তুমি.."

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ সবার আড়ালে বাড়ি ছেড়েছে বুলা আর সুরঞ্জন। বৃষ্টি হয়ে যাবার পর রাস্তায় লোক প্রায় নেই। বেশীরভাগ বাড়ির জানলা বন্ধ। বুলা রাতে খাবার পর কলতলায় এঁটো বাসন মাজার নাম করে গেট খুলে বেরিয়ে আসে। আগেই রেডি ছিল। বৌদি এইসময় টিভি সিরিয়াল দেখে।ভাইঝিরা ঘুমিয়ে পড়েছে। বড়দা বাথরুমে আর ছোড়দা ছোটবৌদি বেড়াতে গেছে।

দুজনে আলাদা রাস্তা ধরে খানিকটা হেঁটে স্টেশন পৌঁছে দ্রুত শিয়ালদহগামী ট্রেনে উঠে পড়েছে। অল্পই লোকজন এসময়। সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে পাশাপাশি বসল দুজনে। এতক্ষণ ভয় ছিল খুব। কিন্তু এখন অনেকটা ভালো লাগছে। সুরঞ্জনের গাঁ ঘেঁষে বসে বুলা। সে ডান হাত দিয়ে বুলাকে আগলে রাখে। বাঁ হাতটা ধরে আছে বুলার বাঁ হাত। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

1 টি মন্তব্য: