শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

সত্যম ভট্টাচার্যের অণুগল্প : হার

সত্যম ভট্টাচার্য
হার
                                         
রমেনবাবু যখন দাওয়ায় ঢুকলেন তখন সময়টা দুপুর পেরিয়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে।শীতকাল,ঝুপ করে বিকেলটা কখন শেষ হয়ে সন্ধ্যে নেমে যায় বোঝাই যায় না।তাই সবাই দ্রুতগতিতে হাতের কাজ শেষ করতে চাইছে।চারিদিকের মাঠ ন্যাড়া করে ধান কেটে আধিয়াররা নিয়ে এসেছে এই বড়বাড়ির দাওয়ায়।কাটা ধান এখানে ঝেড়ে ওজন করে এবাড়ির ভাগ মিটিয়ে তারা নিয়ে যাবে বিক্রী করতে বা বাড়িতে।সম্বতসরের তাদের এই আয়ের পথ।তাই এরজন্য প্রাণ উজাড় করা পরিশ্রম করতে তারা পিছপা হন না। 
              
এই বড়বাড়ির বর্তমান মালিক রমেনবাবু এই গ্রামে এখন আর থাকেন না।বহুদিন থেকেই তিনি পাশের শহর নিবাসী।এমনিতে ন মাসে ছ মাসে একবার আসেন।আর বেশী আসেন এই ধান কাটা আর ঝাড়ার সময়টাতে। যদিও তার লোক রাখা আছে।তারাই জমি অনুযায়ী ধানের ভাগ বুঝে নেবার কাজটা করে থাকে। রমেনবাবুর বাবা কিন্তু প্রচুর ভূসম্পত্তির অধিকারী হয়েও কখোনো গ্রাম ছেড়ে যাননি।বরং কৃষকদের প্রতি তার ছিল এক অদ্ভূত মায়া।তারাও তাকে সবসময় নিজের লোক বলেই মনে করতো।এটা কিন্তু তারা রমেন বাবুকে মনে করে না।কোথাও মনের কোণে তাই তার প্রতি একটা উষ্মা বা দূরত্ব থেকেই যায়। সবাই সেটাকে চেপে রাখলেও পাগলা হরি কিন্তু তা পারে না বা রাখতেও চায় না।তাই রমেনবাবুও পাগলা হরিকে একটু এড়িয়েই চলতে চান। তাই দাওয়ায় ঢুকেই তিনি যদিও আওয়াজ ছাড়লেন-সব কাজ চলতেছে তোমাদের ঠিক মতো?-আড়চোখে হরিকে একবার দেখেই তিনি কিন্তু উঠোনের অন্যদিকে চলে গেলেন। আশু- সাধন আর বাকি সবাই মাথা নেড়ে জানালো যে মোটামুটি কাজ চলছে।এবারে রমেনবাবু গেলেন দাওয়ার সেই প্রান্তে যেদিকে তার লোকরা আধিয়ারদের ঝাড়া ধান ওজন করে নিচ্ছে।সেখানে বসে খানিকক্ষণ তিনি ওজন দেখলেন।কখোনো আধিয়ারদের আওয়াজ দিলেন-ওরে ওজনে কিন্তু আমাকে মারিস না,তাহলে না খেয়ে মরবো।আবার কখোনো যারা ধান ওজন করে নিচ্ছে তাদের বললেন-কারুর যেন একফোঁটা ধানও বেশী না যায়।
                                     
সমস্ত কাজ করে চললেও রমেনবাবু কিন্তু মাঝেমাঝে নজর রাখছিলেন পাগলা হরিকে আর মনে মনে চাইছিলেন লোকটার সামনে যেন না পড়তে হয়।কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস।তখন আলো কমে গিয়ে অনেকটাই অন্ধকার নেমে এসেছে।বেশীরভাগ লোকই ধান ঝেড়ে মেপে দিয়ে বেরিয়ে গেছে।রমেনবাবুও বেরুবেন।উঠোনে তখন একাই পাগলা হরি, ধান ঝাড়ছে।রমেনবাবু বেরুতে গিয়ে না চাইলেও শেষ অব্দি পারলেন না।হরির সামনে দাড়িয়ে তাকালেন ওর দিকে,চোখে চোখ মিললো।মুচকি হেসে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে তিনি যখন ভাবলেন বাচা গেলো,শুনতে পেলেন হরি বলছে-পরিশ্রম, না হলে আপনারা খাবেন কি?রমেনবাবু আর মাথা তুললেন না।                                                   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন