সোমবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২০

কমলকুমার মজুমদারের গল্প : লালজুতো

চিরায়ত গল্প : কমলকুমার মজুমদার

লালজুতো
------------------


গৌরীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার দরুন কিছু ভালো লাগছিল না। মনটা বড্ড খারাপ—নীতীশ ভাবতেই পারছে না, দোষটা সত্যিই কার। অহরহ মনে হচ্ছে—আমার কি দোষ? জীবনে অমন মেয়ের সঙ্গে সে কখনোই কথা বলবে না।

দক্ষিণ দিককার বারান্দা দিয়ে যতবার যায় ততবারই দেখে, গৌরী পর্দা সরিয়ে এদিক পানে চেয়ে আছে, ওকে দেখলেই পলকে পর্র্দা ফেলে দেয়। এ চিন্তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে মনটা সদা চঞ্চল হয়ে রয়েছে; কী করে, কোথায় বা যায়? কোনো কাজেই মন টিকছে না! অবশেষে বিকেল বেলা মনে পড়ল—জুতোজোড়া নেহাত অসম্মানজনক হয়ে পড়ছে, অনেক অনুনয়-বিনয় করে ঠাকুমার কাছে ব্যাপারটা বলতে—টাকা পাওয়া গেল।

নিজের জিনিস নিজে কেনার মতো স্বাধীনতা বোধহয় আর কিছুতেই নেই, অথচ মুশকিলও আছে যথেষ্ট। যদিও সরকার মশায়ের গ্রাম্য পছন্দের আওতায় নিজের একটা স্বাধীন পছন্দ গড়ে উঠেছিল, কিন্তু তাকে বিশ্বাস নেই—কি জানি যদি ভুল হয়? যদি দিদিরা বলে, ‘ওমা এই তোর পছন্দ?’ সিদ্ধান্ত যদি হয়—’তা মন্দ কী বাপু বেশ হয়েছে, ঘষে-মেজে অনেক দিন পায় দিতে পারবে ‘খন!’ এর চাইতে গুরু শ্লেষ আর কী হতে পারে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নীতীশ রাস্তা দিয়ে চলেছে। ছোট দোকানে যে তার পছন্দসই জুতো পাওয়া যেতে পারে না, এ ধারণা তার বদ্ধমূল, তাই বেছে বেছে একটা বড় দোকানে গিয়ে উঠল।

জুতোওয়ালা এমন করে কথা বলে, যে তার ওপর কথা বলা চলে না, মনে হয় যেন ওকথাগুলো নীতীশের। যে জুতোজোড়া পছন্দ হলো, সেটা সোয়েড আর পেটেন্ট লেদারের কম্বিনেশন। ক্লাসের ছেলেরা হিংসে করে মাড়িয়ে দিতে পারে, গৌরীর মনে হতে পারে, কেন ছেলে হয়ে জন্মালুম না?

দাম ছ-টাকা; ঠিক পাঁচ টাকাই তার কাছে আছে। দরকষাকষি করতে লজ্জা হয়, পছন্দ হয়নি বলে যে অন্য দোকানে যাবে তারও জো নেই, কারণ শুধু তার জন্যে অতগুলো বাঙ্ নামিয়ে দেখিয়েছে। আজকাল তো সব কিছুই সস্তা, কিছু কম বললে দেয় না? ইচ্ছে আছে, কিছু পয়সা যদি সম্ভব হয় তো বাঁচিয়ে একখানা মোটা খাতা কিনবে, গৌরীর হাতের লেখা ভালো, ভাব হলে, তার ওপর সে মুক্তোর মতো অক্ষরে বসিয়ে দেবে—নীতীশ ঘোষ—সেকেন্ড ক্লাস... অ্যাকাডেমি।

লজ্জা কাটিয়ে বলে ফেললে, সাড়ে চারে হয় না?

জুতোওয়ালা বললে, আপনার পায়ে চমৎকার মানিয়েছে, একবার আয়নায় দেখুন না, দরাদরি আমরা করি না।

নীতীশ পিছন ফিরে আয়নার দিকে যেতে গিয়ে দেখে, নিকটে এক ভদ্রলোক বসে আছেন, যার বয়েস সে আন্দাজ ঠিক করতে পারে না, তবে তার দাদার মতো হবে; যাকে আমরা বলব আটাশ হতে তিরিশের মধ্যে; তাঁর হাতে ছোট্ট ছোট্ট দুটি জুতো, কোমল লাল চামড়ার। দেখে ভারি ভালো লাগল—জুতোজোড়া সেই নরম কোমল পায়ের, যে পা দুখানি আদর করে স্নেহভরে বুকে নেওয়া যায়, সে চরণ পবিত্র, সুকোমল, নিষ্কলুষ।

সহসা যেমন দুর্বার দখিন হাওয়া আসে, তেমনি এর অজানা মধুর আনন্দ, ওই কিশোর নীতীশের বুকের মধ্যে। ছোট লাল জুতো দেখলে ওর যে বিপুল আনন্দ হতে পারে, এ কথা ওর জানা ছিল না—জানতে পেরে আরও খুশি হলো, খুশিতে প্রাণ ছেয়ে গেল। ইচ্ছে হলো, জুতোজোড়া হাতে করতে, ইচ্ছে হলো হাত বুলোতে। কোনো রকমে সে লজ্জা ভেঙে বললে, মশাই দেখি, ওই রকম জুতো।

ক-মাসের ছেলের জন্যে চান?

ভীষণ সমস্যা, ক-মাসের ছেলের জন্যে চাইবে? বললে, ছ-সাত, না না আট-দশ মাসের আন্দাজ।

একটি ছোট্ট বাঙ্, তার মধ্যে ঘুমন্ত দুটি জুতো, কি মধুর। নীতীশের চোখের সামনে সুন্দর দুটি মঙ্গল চরণ ভেসে উঠল। মনে হলো, ও পা দুটি তার অনেক দিনের চেনা, অনেক স্বপ্নমাখা আনন্দ দিয়ে গড়া। হাসি চাপতে পারলে না, হাসি যেন ছুটে আসছে, না হেসে থাকতে পারল না।

মনে করতে লাগল, কার পায়ের মতো? কার পা? কিছুতেই মনে আসছে না, টুটুল? না—টুটুল তো বেশ বড়। ইচ্ছে হলো জুতোজোড়া কিনে ফেলে। জিগগেস করল, ওর দাম?

এক টাকা।

নিজের টাকা দিয়ে কিনতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু সাহস হলো না। কিন্তু উদ্বৃত্ত টাকাও যে তার কাছে এখন নেই, হয়তো কিছু সস্তায় হতে পারে। কি করা যায়, ‘কি হবে কিনে?’ বলে বিদায় দেওয়া যায় না? যাক টাকা পেলে কেনা যাবে। নিজের জুতো কেনাও হলো না, দরে পোষাল না বলে। যখন সে উঠতে যাচ্ছে, তখন তার মনে হলো, পিছন থেকে জুতোজোড়া তাকে টানছে, বিপুল তার টান! যেন ডাকছে, কি মোহিনী শক্তি! একবার মনে হলো কিনে ফেলে, কি আর বলবে, বড়জোর বকবে, তবুও সাহস হলো না।

চিরকাল সে ছোট ছেলে দেখতে পারে না, ছোট ছেলে তার দু-চক্ষের বিষ, ভেবেই পেত না টুটুলকে কি করে বাড়ির লোকে সহ্য করে... কি করে লোকে ছোট ছেলেকে কোলে নেয়? নিজের ওই স্বভাবের কথা ভেবে লজ্জা হলো, তবু—তবু ভালো লাগছিল, যতবার ভুলবার চেষ্টা করে ততবার ভেসে আসে সেই লাল জুতো—মধুর কল্পনা পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে সেই লাল জুতোর পানে দেখে সে আস্তে আস্তে দোকান থেকে বার হয়ে এলো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কত অসম্ভব কল্পনাই না তার মনে জাগছিল। তার মনে তখন, পিতা হবার দুর্বার বাসনা। গৌরীর সঙ্গে যদি বিয়ে হয়, তাহলে? বেশি ছেলে মেয়ে সে পছন্দ করে না, একটি মেয়ে সুন্দর ফুটফুটে দেখতে, কচি-কচি হাত পা, মনের মধ্যে অনুভব করল, যেন একটা কচি-কচি গন্ধও পেল।

গৌরী সন্ধেবেলায়, প্রায় অন্ধকার বারান্দায় বসে, রুপোর ঝিনুকে করে তাকে দুধ খাওয়াবে : ঝিনুকটা রুপোর বাটিতে বাজিয়ে বাজিয়ে বলবে, আয় চাঁদ আয় চাঁদ—কী মধুর! আকাশে তখন দেখা দেবে একটি তারা।... আমায় বাবা বলে ডাকবে, শুনতে পেল—ছোট দুটি বাহু মেলে আধো-আধো গদ্গদভাবে ডাকছে, বাবা—হাতে দুটি সোনার বালা। দেখতে যেন পেল, গৌরী তাঁকে পিছন থেকে ধরে দাঁড় করিয়েছে, মাঝে মাঝে শিশু টাল সামলাতে পারছে না, উল্লাসে হাতে হাত ঠেকছে, হাসি-উচ্ছল মুখ। আমি হাত দুটো ধরে বলব, ‘চলি-চলি পা-পা টলি-টলি যায়, গরবিনী আড়ে আড়ে হেসে হেসে চায়’...

কি নাম হবে? গৌরী নামটা পৃথিবীর মধ্যে নীতীশের কাছে মিষ্টি কিন্তু ও নামটা রাখবার উপায় নেই, লক্ষ লক্ষ নাম মনে করতে করতে সহসা নিজের লজ্জা করতে লাগল, ছি-ছি সে কি যা-তা ভাবছে! কিন্তু আবার সেই বাহু মেলে কে যেন ডাকল—’বাবা’।
না, ছেলেমেয়ে বিশ্রী, ‘বিশ্রী’ শুধু এই ওজর দিয়ে প্রমাণ করতে হলো যে—যদি টুটুলের মতো মধ্যরাতে চিৎকার করে কেঁদে উঠে—উঃ কি জ্বালাতন!

যে জুতো দেখে ওর মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, ইচ্ছে হচ্ছিল সেই লাল জুতো-জোড়ার কথা সকলকে বলে, কিন্তু সংকোচও আছে যথেষ্ট, পাছে গৌরীকে নিয়ে যা কল্পনা করেছে তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। যদিও প্রকাশ হবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, তবুও মনে হচ্ছিল, হয়তো প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। একেই তো গৌরী এলে, ঠাকুমা থেকে আরম্ভ করে বাড়ির সকলে ঠাট্টা করে। ঠাট্টা করার কারণও আছে; একদা স্নানের পর তাড়াতাড়ি করে নীতীশ ভাত খেতে গেছে, ঠাকুমা বললেন—নীতীশ তোর পিঠময় যে জল, ভালো করে গাটাও মুছিস নি? পাশেই গৌরী দাঁড়িয়েছিল, সে অমনি আঁচল দিয়ে গাটা মুছিয়ে দিলে পরম স্নেহে—অবশ্য নীতীশ তখন ভীষণ চটেছিল। এই রকম আরো অনেক ব্যাপার ঘটেছিল, যাতে করে বাড়ির মেয়েদের ধারণা, নীতীশের পাশে গৌরীকে বেশ মানায়—বিয়ে হলে ওরা সুখী হবে এবং তাই নিয়ে ওঁরা ঠাট্টাও করেন।

কি করে, আর কাউকে না পেয়ে নীতীশ তার বড় বউদিকে বললে, জানো বড় বউদি, আজ যা একজোড়া জুতো দেখে এলুম, ছোট্ট জুতো টুটুলের পায়ে বোধহয় হবে—কী নরম, তোমায় কী বলব! দাম মাত্র এক টাকা! অবশ্য নীতীশের ভীষণ আপত্তি ছিল টুটুলের নাম করে অমন সুমধুর ভাবনাটাকে মুক্তি দেওয়ায়, কিন্তু বাধ্য হয়ে দিতে হলো।

বউদি বললেন, বেশ, কাল আমি টাকা দেব’খন—তুমি এনে দিও।

মনটা ভয়ানক ক্ষুণ্ন হলো, কী জানি সত্যি যদি আনতে হয়—শেষে কি না টুটুলের পায় ওই জুতোজোড়া দেখতে হবে! তবে আশা ছিল এইটুকু যে, বউদি বলার পরই সব কথা ভুলে যান।

নীতীশ পড়ার ঘরে গিয়ে বসল। পড়ায় আজ তার কিছুতেই মন বসছিল না, সর্বর্দা ওই চিন্তা। তার কল্পনা অনুযায়ী একটি শিশুর মুখ দেখতে ভয়ানক ইচ্ছে হলো—এ-বই সে-বই ঘাঁটে, কোথাও পায় না, যে শিশুকে সে ভেবেছে তার ছবি নেই—কোথায়? কোথায়?
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে গৌরীর গলা পাওয়া গেল, অস্বাভাবিক কণ্ঠে সে কথা বলছে। প্রতিবার ঝগড়ার পর নীতীশ এ ব্যাপারটাকে লক্ষ করেছে, গৌরীকে সে বুঝতে পারে না। হয়তো গৌরী আসতে পারে, এই ভেবে সে বইয়ের দিকে চেয়ে বসে রইল।

উদ্দাম দুর্বার বাতাসে ত্রাসে কেঁপে ওঠে যেমন দরজা জানলা, গৌরী প্রবেশ করতেই পড়ার ঘরখানা তেমনি কেঁপে উঠল। হাসতে হাসতে ওর কাঁধের ওপর হাত দিয়ে বললে, লক্ষ্মীটি আমার ওপর রাগ করেছ?...

কথাটা কানে পৌঁছতেই রাগ কোথায় চলে গেল।

রাগের কারণ আছে। গৌরী ফোর্থ ক্লাসে উঠে ভেবেছে যে সে একটা মস্ত কিছু হয়ে পড়েছে—অঙ্ক কি মানুষের ভুল হয় না? হলেই বা তাতে কী? প্রথমবার নয় পারেনি, দ্বিতীয়বার সে তো রাইট করেছে। না পারার দরুন গৌরী এমনভাবে হাসতে লাগল এবং এমন মন্ত্র উচ্চারণ করলে যে অতি বড় শান্ত ভদ্রলোকেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, নীতীশের কথা তো বাদই দেওয়া যাক।

নীতীশের রাগ পড়েছিল, কিন্তু সে মুখ তুলে চাইতে পারছিল না; সেই কল্পনা তার মনের মধ্যে ঘুরছিল।
রাগ করেছ? আচ্ছা আর বলব না, কক্ষনো বলব না—বাবা বলিহারি রাগ তোমার! কই আমি তো তোমার ওপর রাগ করিনি?
মানে? আমি কি তোমায় কিছু বলেছি যে রাগ করবে?
গৌরীর এইসব কথা শুনলে ভারি রাগ ধরে, কিছু বলাও যায় না।
চুপ করে আছ যে? এই অঙ্কটা বুঝিয়ে দাও না ভাই...
অঙ্ক-টঙ্ক হবে না—
লক্ষ্মীটি তোমার দুটি পায়ে পড়ি।

এতক্ষণ বাদে ওর দিকে নীতীশ চাইল। ওকে দেখে বিস্ময়ের অবধি রইল না, সেই শিশুর মুখ; যাকে সে দেখেছিল নিজের ভিতরে, অবিকল গৌরীর মতোই ফর্সা—ওই রকম সুন্দর চঞ্চল, কাল চোখ।
কী দেখছ?
লজ্জা পেয়ে ওর অঙ্কটা করে দিলে। তারপর নানান গল্পের পর, লাল জুতোজোড়ার কথা ওকে বলে বললে, কী চমৎকার! মনে হবে তোমার সত্যি যেন ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা।
ছোট্ট দুটি চরণ কল্পনা করে গৌরীর বুকও অজানা আনন্দে দুলে উঠল—যে আনন্দ দেখা দিয়েছিল নীতীশের মনে। গৌরী বললে, আচ্ছা কাল তোমায় আমি পয়সা দেব, আমার টিফিনের পয়সা জমানো আছে—কেমন?
নীতীশ ভদ্রতার খাতিরে বললে, তোমার পয়সা আমি নেব কেন?
কথাটা গৌরীর প্রাণে বাজল, সে অঙ্কের খাতাটা নিয়ে বিলম্বিত গতিতে চলে গেল। নীতীশ অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল।
দিনদুয়েক গেল পয়সা সংগ্রহে। এই দুদিনের মধ্যে গৌরী এ বাড়ি আর আসেনি। ঠাকুমা জিগগেস করলেন, নীতীশ, গৌরী আসে না কেন রে?

আমি কী জানি?
কথাটা ঘরে থেকে শুনেই গৌরী তৎক্ষণাৎ গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়াল।
ঠাকুমা বললেন, আসো না কেন?
জ্বর।
জ্বর কথাটা নীতীশকে মোটেই বিচলিত করল না, ও জানে, ওটা একটা ফাঁকি ছাড়া আর কিছু নয়।
টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জুতোজোড়া আনতে, রাস্তা থেকে টাকাটা ভাঙিয়ে নিলে, কারণ হারিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, প্রতি মোড়ে মোড়ে গুনে দেখতে লাগল পয়সা ঠিক আছে কি না।
জুতোর দোকানে ঢুকেই বললে, দিন তো মশাই সেই লাল জুতো; সেই যে সেদিন দেখে গিয়েছিলুম?
দোকানদার একজোড়া দেখালে। ও বললে, না—না, এটা নয়, দেখুন তো ওই শেলফে?
পাওয়া গেল সেই স্বপ্নময় জুতো! কী জানি কেন আরো ভালো লাগল—ওর মধ্যে কী যেন লুকিয়ে আছে। চিত্তের মধ্যে একটি হিংস্র আনন্দ দেখা দিল—দর নিয়ে গোল বাধল না, একটি টাকা দিয়ে জুতোজোড়া নিলে। জুতোওয়ালা বললে, আবার আসবেন। মনে হলো বোধহয় ঠকিয়েছে।

রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে অনেকবার ইচ্ছে হলো বাঙ্টা খুলে দেখে—কিন্তু পারল না।

একবার মনে হলো, এ দিয়ে কী হবে? কার জন্যেই বা কিনল? সে কি পাগল! মিথ্যে মিথ্যে টাকা তো নষ্ট হলো?
ভিতর হতে কে যেন উত্তর দিল, ‘কেন, টুটুলের পায় যদি হয়?’ টুটুলের কথা মনে হতেই একটু ভয় হলো, যদি তার পায় সত্যই হয়, তাহলেই তো হয়েছে।

আবার প্রশ্ন কিন্তু কার জন্যে সে কিনেছে? বেশ ভালো লাগল বলে কিনেছি! ভালো লাগে বলে তো মানুষ অনেক কিছু করে, বাজি পোড়ায়, গঙ্গায় গয়না ফেলে—এ তবু, একজোড়া জুতো পাওয়া গেল তো। বাজে খরচ হয়নি, বেশ করেছে, একশো বার কিনবে।

সহসা জিহ্বায় দাঁতের চাপ লাগতেই মনে পড়ল, কেউ যদি মনে করে তাহলে জিব কাটে, কে মনে করতে পারে? গৌরী? আজ গৌরীকে ডেকে দেখতে হবে। বাড়িতে পৌঁছে, সকলকে মূল্যবান জিনিসটা দেখাতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সাহস হলো না, যদি ঠাট্টা করে? প্রথমত সে নিজেই ঠিক করতে পারছে না,—কার জন্যে কিনল, কেন কিনল?

টুটুল বারান্দায় তখন খেলা করছিল, তার পায়ের মাপটা নিয়ে জুতোটা মেপে দেখল, টুটুলের পা কিঞ্চিৎ বড়—কিন্তু ওর মনে হলো অসম্ভব বড়! শঙ্কিত চিত্তে ঠাকুমার কাছে গিয়ে বললে, তোমাদের সেই লাল জুতোর কথা বলেছিলুম, এই দেখো।

ভাঁড়ার ঘর হাসি উচ্ছলিত। ঠাকুমা বললেন, ওমা—কোথা যাব, ছেলে না হতেই জুতো! হৈ হৈ পড়ে গেল। নীতীশের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, বললে আমি টুটুলের জন্যে এনেছিলুম...

কে শোনে তার কথা! বুঝতে না পেরে, পড়ার ঘরে গিয়ে আলোটা জ্বেলে বসল, সামনে জুতোজোড়া প্রাণভরে দেখতে লাগল। এ দেখা যেন নিজেকে দেখা। ভাবলে, গৌরীকে কি করে ডাকা যায়?

গৌরী গোলমাল শুনে, জানলায় এসে দাঁড়িয়ে দেখছিল—ব্যাপারটা কি সে বুঝতে পারে নি। মনে হচ্ছিল, নীতীশ একবার ডাকে না?
সহসা চিরপরিচিত ইশারায়—না থাকতে পেরে নেমে এলো, আসতেই নীতীশ বললে, তোমায় একটা জিনিস দেখাব, দাঁড়াও।

গৌরী উদ্গ্রীব হয়ে ওর দিকে চাইল। নীতীশের শার্ট বোতামহীন দেখে বললে, তোমার গলায় বোতাম নেই, দেব?
দাও।
গৌরীর চুড়িতে সেফটিপিন ছিল না, শুধু একটি ছিল ব্লাউজে, বোতামের পরিবর্তে—না ভেবেই সেটা দিয়ে বুঝল ব্লাউজ খোলা, বললে—দাও ওটা, তোমায় একটা এনে দিচ্ছি।

থাক।
থাক কেন, এনে দিই না? কাতর কণ্ঠে বললে।
থাক, বলে হাসিমুখে সে জুতোর বাঙ্টা খুলে গৌরীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে, তার মুখ আনন্দে উৎফুল্ল।

সুনিবিড় প্রেমে কালো চোখ দুটো স্বপ্নময় হয়ে এলো। গৌরী জুতোজোড়া দেখে, কেঁপে উঠল! তার দেহে বসন্ত মধুর শিহরণ খেলে গেল। মনে হলো, এ যেন তারই শিশুর জুতো! অস্পষ্টভাবে বললে, আঃ...! তার দেহ আনন্দে শিথিল হয়ে আসছিল। যেন কোনো রমণীয় সুখ অনুভব করে, আবার বললে, আঃ।... সব কিছু যেন আজ পূর্ণ হলো। নিজেদের কল্পনায় যে সুন্দর ছিল, যেন তাকেই রূপ দেবার জন্যে আজ দুজনে আবদ্ধ হলো।

নীতীশ বিস্ময় ভরে দেখে ভাবছিল একি! পাশের বাড়িতে তখন সেতারে চলছিল তিলক-কমোদের জোড়—তারই ঘন ঝঙ্কার ভেসে আসছিল। ওই সংগীত এবং এই জীবনের মহাসংগীত তাদের দুজনকে আড়াল করে রাখলে, হিংস্র বাস্তবের রাজ্য থেকে। যে কথা অগোচরে অন্তরের মধ্যে ছিল, সে আজ দুলে-দুলে উথলে উঠল। বহু জনমের সঞ্চিত মাতৃস্নেহ-মাতৃত্ব।

দেখতে পেল, সুন্দর অনাগত শিশু, যে ছিল তার কল্পনায়; অঙ্গটি তার মাতৃস্নেহের মাধুর্য দিয়ে গড়া, যাকে দেখতে অবিকল নীতীশের মতো; তার আত্মা যেন শিশুর তনুতে তনু নিল। ইচ্ছে করল বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে—বুকে জড়িয়ে ধরে বেদনা-মাখা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়তে। জুতো দুটোয় আস্তে আস্তে হাত বুলোতে বুলোতে সহসা গভীরভাবে চেপে ধরল, তারপর বুকের মধ্যে নিয়ে যত জোরে পারে তত জোরে চেপে, সুগভীর নিশ্বাস নিলে, মনে হলো যেন তার সাধ মিটেছে। ভগ্নস্বরে কণ্ঠ হতে বেরিয়ে এলো, আঃ...

আনন্দে বিস্ফারিত আঁখিযুগল। নিজেকে যেন অনুভব করলে। আজ শান্ত হলো তার লক্ষ বাসনা লক্ষ বেদনা—লক্ষ স্বপ্ন মূর্তি পেল।
বিশ্বগত অপূর্ণতা তা তারা এই তরুণ বয়সেই উপলব্ধি করলে; পূর্ণতার সম্ভাবনায় দুজনেই মহা-আনন্দে-মদে মত্ত হয়ে উঠল।

গৌরীর হৃদয়ের ভিতর দিয়ে, ওই লাল জুতো পরে, নীতীশ টলমল করে চলল, আর—গৌরী চলতে শুরু করলে, নীতীশের হৃদয়ের মধ্যে দিয়ে পথ করে। আচম্বিতে সশব্দে জুতোজোড়াকে চুম্বন করলে। তারপর নীতীশের দিকে চেয়ে, ঈষৎ লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠে জিগগেস করলে, কার জন্যে গো?

মৃদু হেসে বললে, তোমার জন্যে!
বারে তুমি যেন কী! অতটুকু জুতো, আমার পায় কখনো হয়? কার লক্ষ্মীটি বলো না? তোমার বুঝি?
ধেৎ! আমার হতে যাবে কেন?
ভুরু কুঁচকে বললে, তবে কার? চোখের তারা নেচে উঠল।
তোমার পুতুলের?
ওমা—তা হতে যাবে কেন? তুমি এনেছ, নিশ্চয় তোমার ছেলের?

আচ্ছা, বেশ দুজনের—
হ্যাঁ—অসভ্য, বলে গ্রীবাটাকে পাশের দিকে ফিরিয়ে নিজের মধুর লজ্জাটা অনুভব করলে। লাল জুতোজোড়া তখনো তার কোলে, যেন মাতৃমূর্তি।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প : অতসী মামি

চিরায়ত গল্প : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

অতসী মামি
---------------


যে শোনে সেই বলে, হ্যাঁ, শোনবার মতো বটে!

বিশেষ করে আমার মেজমামা। তার মুখে কোনো কিছুর এমন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা খুব কম শুনেছি।

শুনে শুনে ভারী কৌতুহল হল। কী এমন বাঁশি বাজায় লোকটা যে সবাই এমনভাবে প্রশংসা করে? একদিন শুনতে গেলাম। মামার কাছ থেকে একটা পরিচয়পত্র সঙ্গে নিলাম।

আমি থাকি বালিগঞ্জে, আর যাঁর বাঁশি বাজানোর ওস্তাদির কথা বললাম তিনি থাকেন ভবানীপুর অঞ্চলে। মামার কাছে নাম শুনেছিলাম, যতীন। উপাধিটা শোনা হয়নি। আজ পরিচয়পত্রের উপরে পুরো নাম দেখলাম, যতীন্দ্রনাথ রায়।

বাড়িটা খুঁজে বার করে আমার তো চক্ষুস্থির! মামার কাছে যতীনবাবুর এবং তার বাঁশি বাজানোর যে রকম উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছিলাম তাতে মনে হয়েছিল লোকটা নিশ্চয় একজন কেষ্টবিষ্টু গোছের কেউ হবেন। আর কেষ্টবিষ্টু গোছের একজন লোক যে বৈকুণ্ঠ বা মথুরার রাজপ্রাসাদ না হোক, অন্তত বেশ বড়ো আর ভদ্রচেহারা একটা বাড়িতে বাস করেন এও তো স্বতঃসিদ্ধ কথা। কিন্তু বাড়িটা যে গলিতে সেটার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, এ যে ইট-বার করা তিনকালের বুড়োর মতো নড়বড়ে একটা ইটের খাঁচা! সামনেটার চেহারাই যদি এ রকম, ভেতরটা না জানি কী রকম হবে।

উইয়ে ধরা দরজার কড়া নাড়লাম।

একটু পরেই দরজা খুলে যে লোকটি সামনে এসে দাঁড়ালেন তাকে দেখে মনে হল ছাইগাদা নাড়তেই যেন একটা আগুন বার হয়ে পড়ল।

খুব রোগা। গায়ের রঙও অনেকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবু একদিন চেহারাখানা কী রকম ছিল অনুমান করা শক্ত নয়। এখনও যা আছে, অপূর্ব!

বছর ত্রিশেক বয়স, কী কিছু কম? মলিন হয়ে আসা গায়ের রং অপূর্ব, শরীরের গড়ন অপূর্ব; মুখের চেহারা অপূর্ব। আর সব মিলিয়ে যে রূপ তাও অপূর্ব। সব চেয়ে অপূর্ব চোখ দুটি। চোখে চোখে চাইলে যেন নেশা লেগে যায়।

পুরুষেরও তা হলে সৌন্দর্য থাকে! ইট-বার-করা নোনা-ধরা দেয়াল আর উইয়ে-ধরা দরজা, তার মাঝখানে লোকটিকে দেখে আমার মনে হল ভারী সুন্দর একটা ছবিকে কে যেন অতি বিশ্রী একটা ফ্রেমে বাঁধিয়েছে।

বললেন, আমি ছাড়া তো বাড়িতে কেউ নেই, সুতরাং আমাকেই চান। কিন্তু কী চান?

আমার মুগ্ধ চিত্তে কে যেন একটা ঘা দিল। কী বিশ্ৰী গলার স্বর! কর্কশ! কথাগুলি মোলায়েম কিন্তু লোকটির গলার স্বর শুনে মনে হল যেন আমায় গালাগালি দিচ্ছেন। ভাবলাম, নির্দোষ সৃষ্টি বিধাতার কুষ্ঠিতে লেখে না। এমন চেহারায় ওই গলা! সৃষ্টিকর্তা যত বড়ো কারিগর হোন, কোথায় কী মানায় সে জ্ঞানটা তার একদম নেই।

বললাম, আপনার নাম তো যতীন্দ্রনাথ রায়? আমি হরেনবাবুর ভাগনে।

পরিচয়পত্রখানা বাড়িয়ে দিলাম।

এক নিশ্বাসে পড়ে বললেন, ইস! আবার পরিচয়পত্র কেন হে? হরেন যদি তোমার মামা, আমিও তোমার মামা। হরেন যে আমায় দাদা বলে ডাকে! এসো, এসো, ভেতরে এসো।

আমি ভেতরে ঢুকতে তিনি দরজা বন্ধ করলেন।

সদর দরজা থেকে দু-ধারের দেয়ালে গা ঠেকিয়ে হাত পাঁচেক এসে একটা হাত তিনেক চওড়া বারান্দায় পড়ে ডান দিকে বাঁকতে হল। বাঁদিকে বাঁকবার জো নেই, কারণ দেখা গেল সেদিকটা প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করা।

ছোট্ট একটু উঠান, বেশ পরিষ্কার। প্রত্যেক উঠানের চারটে করে পাশ থাকে, এটারও তাই আছে দেখলাম। দুপাশে দুখানা ঘর, এ বাড়িরই অঙ্গ। একটা দিক প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করা, অপর দিকে অন্য এক বাড়ির একটা ঘরের পেছন দিক জানালা দরজার চিহ্নমাত্র নেই, প্রাচীরেরই শামিল।


আমার নবলব্ধ মামা ডাকলেন, অতসী, আমার ভাগনে এসেছে, এ ঘরে একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়ে যাও। ও ঘরটা বড়ো অন্ধকার!

এ-ঘর মানে আমরা যে ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ও-ঘর মানে ওদিককার ঘরটা। সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক তরুণী, মস্ত ঘোমটায় মুখ ঢেকে।

যতীন মামা বললেন, এ কী! ঘোমটা কেন? আরে, এ যে ভাগনে!

মামির ঘোমটা ঘুচবার লক্ষণ নেই দেখে আবার বললেন, ছি ছি, মামি হয়ে ভাগনের কাছে ঘোমটা টেনে কলাবউ সাজবে?

এবার মামির ঘোমটা উঠল। দেখলাম, আমার নতুন পাওয়া মামিটি মামারই উপযুক্ত স্ত্রী বটে। মামি এ-ঘরের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে দিলেন। ঘরে তক্তপোশ, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদির বালাই নেই। একপাশে একটা রং-চটা ট্রাঙ্ক আর একটা কাঠের বাকসো। দেয়ালে এক কোণ থেকে আর এক কোণ পর্যন্ত একটা দড়ি টাঙানো, তাতে একটি মাত্র ধুতি ঝুলছে। একটা পেরেকে একটা আধ ময়লা খদ্দরের পাঞ্জাবি লটকানো, যতীন মামার সম্পত্তি। গোটা দুই দু-বছর আগেকার ক্যালেন্ডারেব ছবি। একটাতে এখনও চৈত্রমাসের তারিখ লেখা কাগজটা লাগানো রয়েছে, ছিঁড়ে ফেলতে বোধ হয় কারও খেয়াল হয়নি।


যতীন মামা বললেন, একটু সুজিটুজি থাকে তো ভাগনেকে করে দাও। না থাকে এক কাপ চাই খাবেখন।

বললাম, কিছু দরকার নেই যতীন মামা। আপনার বাঁশি শুনতে এসেছি, বাঁশির সুরেই খিদে মিটবে এখন। যদিও খিদে পায়নি মোটেই, বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি।

যতীন মামা বললেন, বাঁশি? বাঁশি তো এখন আমি বাজাই না।

বললাম, সে হবে না, আপনাকে শোনাতেই হবে।

বললেন, তা হলে বসো, রাত্রি হোক। সন্ধ্যার পর ছাড়া আমি বাঁশি ছুই না।

বললাম, কেন?

যতীন মামা মাথা নেড়ে বললেন, কেন জানি না ভাগনে, দিনের বেলা বঁশি বাজাতে পারি না। আজ পর্যন্ত কোনোদিন বাজাইনি। হ্যাঁ গা অতসী, বাজিয়েছি?

অতসী মামি মৃদু হেসে বললেন, না।

যেন প্রকাণ্ড একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল এমনিভাবে যতীন মামা বললেন, তবে?

বললাম, মোটে পাঁচটা বেজেছে, সন্ধ্যা হবে সাতটায়। এতক্ষণ বসে থেকে কেন আপনাদের অসুবিধা করব, ঘুরে-টুরে সন্ধ্যার পর আসব এখন।

যতীন মামা ইংরেজিতে বললেন, Tut! Tut! তারপর বাংলায় যোগ দিলেন, কী যে বল ভাগনে! অসুবিধেটা কী হে অ্যাঁ! পাড়ার লোকে তো বয়কট করেছে অপবাদ দিয়ে, তুমি থাকলে তবু কথা কয়ে বাঁচব।

আমি বললাম, পাড়ার লোকে কী অপবাদ দিয়েছে মামা? অতসী মামির দিকে চেয়ে যতীন মামা হাসলেন, বলব নাকি ভাগনেকে কথাটা অতসী? পাড়ার লোকে কী বলে জানো ভাগনে? বলে অতসী আমার বিযে করা বউ নয়!—চোখের পলকে হাসি মুছে রাগে যতীন মামা গরগর করতে লাগলেন, লক্ষ্মীছাড়া বজ্জাত লোক পাড়ার, ভাগনে। রীতিমতো দলিল আছে বিয়ের, কেউ কি তা দেখতে চাইবে? যত স—

ত্রস্তভাবে অতসী মামি বললে, কী যা-তা বলছ?

যতীন মামা বললেন, ঠিক ঠিক, ভাগনে নতুন লোক, তাকে এ সব বলা ঠিক হচ্ছে না বটে। ভারী রাগ হয় কিনা! বলে হাসলেন। হঠাৎ বললেন, তোমরা যে কেউ কারু সঙ্গে কথা বলছ না গো!

মামি মৃদু হেসে বললে, কী কথা বলব?

যতীন মামা বললেন, এই নাও! কী কথা বলবে তাও কি আমায় বলে, দিতে হবে নাকি? যা হোক কিছু বলে শুরু কর, গড়গড় করে কথা আপনি এসে যাবে।

মামি বললে, তোমার নামটি কী ভাগনে?

যতীন মামা সশব্দে হেসে উঠলেন। হাসি থামিয়ে বললেন, এইবার ভাগনে, পালটা প্রশ্ন কর, আজ কী রাঁধবে মামি? ব্যস, খাসা আলাপ জমে যাবে। তোমার আরম্ভটি কিন্তু বেশ অতসী।

মামির মুখ লাল হয়ে উঠল।

আমি বললাম, অমন বিশ্রী প্রশ্ন আমি কক্‌খনো করব না মামি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার নাম সুরেশ।

সতীন মামা বললেন, সুরেশ কিনা সুরের রাজা, তাই সুর শুনতে এত আগ্রহ। নয় ভাগনে?


হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ইস! ভুবনবাবু যে টাকা দুটো ফেরত দেবে বলেছিল আজ! নিয়ে আসি, দুদিন বাজার হয়নি। বসো ভাগনে, মামির সঙ্গে গল্প করো, দশ মিনিটের ভেতর আসছি।

ঘরের বাইরে গিয়ে বললেন, দোরটা দিয়ে যাও অতসী। ভাগনে ছেলেমানুষ, কেউ তোমার লোভে ঘরে ঢুকলে ঠেকাতে পারবে না।

মামির মুখ আরক্ত হয়ে উঠল এবং সেটা গোপন করতে চট করে উঠে গেল। বাইরে তার চাপা গলা শুনলাম, কী যে রসিকতা কর, ছি! মামা কী জবাব দিলে- শোনা গেল না।

মামি ঘরে ঢুকে বললে, ওই রকম স্বভাব ওঁর। বাক্‌সে দুটি মোটে টাকা, তাই নিয়ে সেদিন বাজার গেলেন। বললাম, একটা থাক। জবাব দিলেন, কেন? রাস্তায় ভুবনবাবু চাইতে টাকা দুটি তাকে দিয়ে খালি হাতে ঘরে ঢুকলেন।

আমি বললাম, আশ্চর্য লোক তো! মামি বললে, ওই রকমই। আর দাখো ভাই—

বললাম, ভাই নয়, ভাগনে।

মামি বললে, তাও তো বটে। আগে থাকতেই যে সম্বন্ধটা পাতিয়ে বসে আছ! ওঁর ভাগনে না হয়ে আমার ভাই হলেই বেশ হত কিন্তু। সম্পর্কটা নতুন করে পাতো না? এখনও এক ঘণ্টাও হয়নি, জমাট বাঁধেনি।

আমি বললাম, কেন? মামি-ভাগনে বেশ তো সম্পর্ক!

মামি বললে, আচ্ছা তবে তাই। কিন্তু আমার একটা কথা তোমায় রাখতে হবে ভাগনে। তুমি ওঁর বাঁশি শুনতে চেয়ো না।

বললাম, তার মানে? বাঁশি শুনতেই তো এলাম!

মামির মুখ গম্ভীর হল, বললে, কেন এলে? আমি ডেকেছিলাম? তোমাদের জ্বালায় আমি কি গলায় দড়ি দেব?

আমি অবাক হয়ে মামির মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। কথা জোগায় না।

মামি বললে, তোমাদের একটু শখ মেটাবার জন্য উনি আত্মহত্যা করছেন দেখতে পাও না? রোজ তোমরা একজন না একজন এসে বাঁশি শুনতে চাইবে। রোজ গলা দিয়ে রক্ত পড়লে মানুষ কদিন বাঁচে!

রক্ত!

রক্ত নয়? দেখবে? বলে মামি চলে গেল। ফিরে এল একটা গামলা হাতে করে। গামলার ভেতরে জমাট-বাধা খানিকটা রক্ত।

মামি বললে, কাল উঠেছিল, ফেলতে মায়া হচ্ছিল তাই রেখে দিয়েছি। রেখে কোনো লাভ নেই জানি, তবু—

আমি অনুতপ্ত হয়ে বললাম, জানতাম না মামি। জানলে ককখনো শুনতে চাইতাম না। ইস, এই জন্যেই মামার শরীর এত খারাপ?

মামি বললে, কিছু মনে করো না ভাগনে। অন্য কারও সঙ্গে তো কথা কই না, তাই তোমাকেই গায়ের ঝাল মিটিয়ে বলে নিলাম। তোমার আর কী দোষ, আমার অদৃষ্ট!

আমি বললাম, এত রক্ত পড়ে, তবু মামা বাঁশি বাজান?

মামি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, হ্যাঁ, পৃথিবীর কোনো বাধাই ওঁর বাঁশি বাজানো বন্ধ করতে পারবে না। কত বলেছি, কত কেঁদেছি শোনেন না।

আমি চুপ করে রইলাম।

মামি বলে চলল, কতদিন ভেবেছি বাঁশি ভেঙে ফেলি, কিন্তু সাহস হয়নি। বাঁশির বদলে মদ খেয়েই নিজেকে শেষ করে ফেলবেন, নয়তো যেখানে যা আছে সব বিক্রি করে বাঁশি কিনে না খেয়ে মরবেন।

মামির শেষ কথাগুলি যেন গুমরে গুমরে কেঁদে ঘরের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আমি কথা বলতে গেলাম, কিন্তু ফুটল না।

মামি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, অথচ ওই একটা ছাড়া আমার কোনো কথাই ফেলেন না। আগে আকণ্ঠ মদ খেতেন, বিয়ের পর যেদিন মিনতি করে মদ ছাড়তে বললাম সেইদিন থেকে ও জিনিস ছোঁয়াই ছেড়ে দিলেন। কিন্তু বাঁশির বিষয়ে কোনো কথাই শোনেন না।

আমি বলতে গেলাম, মামি—

মামি বোধ হয় শুনতেই পেল না, বলে চলল, একবার বাঁশি লুকিয়ে রেখেছিলাম, সে কী ছটফট করতে লাগলেন যেন ওঁর সর্বস্ব হারিয়ে গেছে।

বাইরে কড়া নাড়ার শব্দ হল। মামি দরজা খুলতে উঠে গেল।

যতীন মামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, দিলে না টাকা অতসী, বললে পরশু যেতে।

পিছন থেকে মামি বললে, সে আমি আগেই জানি।

যতীন মামা বললেন, দোকানদারটাই বা কী পাজি, একপো সুজি চাইলাম, দিল না। মামার বাড়ি এসে ভাগনেকে দেখছি খালি পেটে ফিরতে হবে।

মামি ম্লান মুখে বললে, সুজি দেয়নি ভালোই করেছে। শুধু জল দিয়ে তো আর সুজি হয় না।

ঘি নেই?

কবে আবার ঘি আনলে তুমি?

তাও তো বটে! বলে যতীন মামা আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। দিব্য সপ্রতিভ হাসি।

আমি বললাম, কেন ব্যস্ত হচ্ছেন মামা, খাবারের কিছু দরকার নেই। ভাগনের সঙ্গে অত ভদ্রতা করতে নেই।

মামি বললে, বসো তোমরা, আমি আসছি। বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মামা হেঁকে বললেন, কোথায় গো? বারান্দা থেকে জবাব এল, আসছি।

মিনিট পনেরো পরে মামি ফিরল। দু হাতে দুখানা রেকাবিতে গোটা চারেক করে রসগোল্লা, আর গোটা দুই সন্দেশ।

যতীন মামা বললেন, কোথেকে জোগাড় করলে গো? বলে, একটা রেকাবি টেনে নিয়ে একটা রসগোল্লা মুখে তুললেন।

অন্য রেকাবিটা আমার সামনে রাখতে রাখতে মামি বললে, তা দিয়ে তোমার  দরকার কী?

যতীন মামা নিশ্চিন্তভাবে বললেন, কিছু না! যা খিদেটা পেয়েছে; ডাকাতি করেও যদি এনে থাক কিছু দোষ হয়নি। স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে সাধ্বী অনেক কিছুই করে।

আমি কুণ্ঠিত হযে বলতে গেলাম, কেন মিথ্যে—

বাধা দিয়ে মামি বললে, আবার যদি ওই সব শুরু কর ভাগনে, আমি কেঁদে ফেলব।

আমি নিঃশব্দে খেতে আরম্ভ করলাম।

মামি ওঘর থেকে দুটো এনামেলের গ্রাসে জল এনে দিলেন। প্রথম রসগোল্লাটা গিলেই মামা বললেন, ওযাক্‌! কী বিশ্রী রসগোল্লা! রইল পড়ে, খেয়ো তুমি, নয় তো ফেলে দিয়ো। দেখি সন্দেশটা কেমন!

সন্দেশ মুখে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ এ জিনিসটা ভালো, এটা খাব। বলে সন্দেশ দুটো তুলে নিয়ে রেকাবিটা ঠেলে দিয়ে বললেন, যাও তোমার সুজির ঢিপি ফেলে দিয়োখন নর্দমায়।

অতসী মামির চোখ ছলছল করে এল। মামার ছলটুকু আমাদের কারুর কাছেই গোপন রইল না। কেন যে এমন খাসা রসগোল্লাও মামার কাছে সুজির টিপি হয়ে গেল বুঝে আমার চোখে প্রায় জল আসবার উপক্রম হল।

মাথা নিচু করে রেকাবিটা শেষ করলাম। মাঝখানে একবার চোখ তুলতেই নজরে পড়ল মামি মামার রেকাবিটা দরজার ওপরে তাকে তুলে রাখছে।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে মামি ঘরে ঘরে প্রদীপ দেখাল, ধুনো দিল। আমাদের ঘরে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে মামি চুপ করে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবতে লাগল।

যতীন মামা হেসে বললেন, আরে লজ্জা কীসের! নিত্যকার অভ্যাস, বাদ পড়লে রাতে ঘুম হবে না।  ভাগনের কাছে লজ্জা করতে নেই।

আমি বললাম, আমি, না হয়—

মামি বললে, বসো, উঠতে হবে না, অত লজ্জা নেই আমার। বলে, গলায় আঁচল দিয়ে মামার পায়ের কাছে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল।

লজ্জায় সুখে তৃপ্তিতে আরক্ত মুখখানি নিয়ে অতসী মামি যখন উঠে দাঁড়াল, আমি বললাম, দাঁড়াও মামি, একটা প্রণাম করে নিই।

মামি বললে, না না ছি ছি—

বললাম, ছিছি নয় মামি। আমার নিত্যকার অভ্যাস না হতে পারে, কিন্তু তোমায় প্রণাম না করে যদি আজ বাড়ি ফিরি রাত্রে আমার ঘুম হবে না ঠিক। বলে মামির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।

যতীন মামা হো হো করে হেসে উঠলেন।

মামি বললে, দ্যাখো তো ভাগনের কাও!

যতীন মামা বললেন, ভক্তি হয়েছে গো! সকালসন্ধা স্বামীকে প্রণাম করো জেনে শ্রদ্ধা হয়েছে ভাগনের।

কী যে বল!—বলে মামি পলায়ন করল। বারান্দা থেকে বলে গেল, আমি রান্না করতে গেলাম।

যতীন মামা বললেন, এইবার বাঁশি শোনো।

আমি বললাম, থাকগে, কাজ নেই মামা। শেষে আবার রক্ত পড়তে আরম্ভ করবে।

যতীন মামা বললেন, তুমিও শেষে ঘ্যানঘান পানপ্যান আরম্ভ করলে ভাগনে? রক্ত পড়বে তো হয়েছে কী? তুমি শুনলেও আমি বাজাব, না শুনলেও বাজাব। খুশি হয় রান্নাঘরে মামির কাছে বসে কানে আঙুল দিয়ে থাকো গে।

কাঠের বাক্সোটা খুলে বাঁশির কাঠের কেসটা বার করলেন। বললেন, বারান্দায় চলো, ঘরে বড়ো শব্দ হয়।

নিজেই বারান্দায় মাদুরটা তুলে এনে বিছিয়ে নিলেন। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে বাঁশিটা মুখে তুললেন।

হঠাৎ আমার মনে হল আমার ভেতরে যেন একটা উন্মাদ একটা খ্যাপা উদাসীন ঘুমিয়ে ছিল আজ বাঁশির সুরের নাড়া জেগে উঠল। বাঁশির সুর এসে লাগে কানে কিন্তু আমার মনে হল বুকের তলেও যেন সাড়া পৌঁছেছে। অতি তীব্র বেদনার মধুরতম আত্মপ্রকাশ কেবল বুকের মাঝে গিয়ে পৌঁছায়নি, বাইরের এই ঘরদোরকেও যেন স্পর্শ দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছে, আর আকাশকে বাতাসকে মৃদুভাবে স্পর্শ করতে করতে যেন দূরে, বহুদূরে, যেখানে গোটা কয়েক তারা ফুটে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি, সেইখানে স্বপ্নের মায়ার মধ্যে লয় পাচ্ছে। অন্তরে ব্যথা বোধ করে আনন্দ পাবার যতগুলি অনুভূতি আছে বাঁশির সুর যেন তাদের সঙ্গে কোলাকুলি আরম্ভ করেছে।

বাঁশি শুনেছি ঢের। বিশ্বাস হয়নি এই বাঁশি বাজিয়ে একজন একদিন এক কিশোরীর কুল মান লজ্জা ভয় সব ভুলিয়ে দিয়েছিল, যমুনাতে উজান বইয়েছিল। আজ মনে হল, আমার যতীন মামার বাঁশিতে সমগ্র প্রাণ যদি আচমকা জেগে উঠে নিরর্থক এমন ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তবে সেই বিশ্ববাঁশির বাদকের পক্ষে ওই দুটি কাজ আর এমন কী কঠিন!

দেখি, মামি কখন এসে নিঃশব্দে ওদিকের বারান্দায় বসে পড়েছে। খুব সম্ভব ওই ঘরটাই রান্নাঘর, কিংবা রান্নাঘরে যাবার পথ ওই ঘরের ভেতর দিয়ে।

যতীন মামার দিকে চেয়ে দেখলাম, খুব সম্ভব সংজ্ঞা নেই। এ যেন সুরের আত্মভোলা সাধক, সমাধি পেয়ে গেছে।

কতক্ষণ বাঁশি চলেছিল ঠিক মনে নেই, বোধ হয় ঘণ্টা দেড়েক হবে। হঠাৎ এক সময়ে বাঁশি থামিয়ে যতীন মামা ভয়ানক কাশতে আরম্ভ করলেন। বারান্দার ক্ষীণ আলোতেও বুঝতে পারলাম, মামার মুখ চোখ অস্বাভাবিক রকম লাল হয়ে উঠেছে।

অতসী মামি বোধ হয় প্রস্তুত ছিল, জল আর পাখা নিয়ে ছুটে এল। খানিকটা রক্ত তুলে মামির শুশ্রূষায় যতীন মামা অনেকটা সুস্থ হলেন। মাদুরের ওপর একটা বালিশ পেতে মামি তাকে শুইয়ে দিল। পাখা নেড়ে নীরবে হাওয়া করতে লাগল।

তারপর এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আজ আসি যতীন মামা।

মামা কিছু বলবার আগেই মামি বললে, তুমি এখন কথা কয়ো না। ভাগনের বাড়িতে ভাববে, আজ থাক, আর একদিন এসে খেয়ে যাবে এখন। চলো আমি দরজা দিয়ে আসছি।

সদরের দরজা খুলে বাইরে যাব, মামি আমার একটা হাত চেপে ধরে বললে, একটু দাঁড়াও ভাগনে, সামলে নিই।

প্রদীপের আলোতে দেখলাম, মামির সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। একটু সুস্থ হয়ে বললে, ওর রক্ত পড়া দেখলেই আমার এরকম হয়। বাঁশি শুনেও হতে পারে। আচ্ছা এবার এসো ভাগনে, শিগগির আর একদিন আসবে কিন্তু।

বললাম, মামার বাঁশি ছাড়াতে পারি কি না একবার চেষ্টা করে দেখব মামি?

মামি বাগ্রকণ্ঠে বললে, পারবে? পারবে তুমি? যদি পার ভাগনে, শুধু তোমার যতীন মামাকে নয়, আমাকেও প্রাণ দেবে।

অতসী মামি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললে।

রাস্তায় নেমে বললাম, খিলটা লাগিয়ে দাও মামি।

কেবলই মনে হয়, নেশাকে মানুষ এত বড়ো দাম দেয় কেন। লাভ কী? এই যে যতীন মামা পলে পলে জীবন উৎসর্গ করে সুরের জাল বুনবার নেশায় মেতে যান, মানি তাতে আনন্দ আছে। যে সৃষ্টি করে তারও, যে শোনে তারও। কিন্তু এত চড়া মূল্য দিয়ে কী সেই আনন্দ কিনতে হবে? এই যে স্বপ্ন সৃষ্টি, এ তো ক্ষণিকের। যতক্ষণ সৃষ্টি করা যায় শুধু ততক্ষণ এ  স্থিতি। তারপর বাস্তবের কঠোরতার মাঝে এ স্বপ্নের চিহ্নও তো খুঁজে পাওয়া যায় না। এ নিরর্থক মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে ভোলাবার প্রয়াস কেন? মানুষের মন কী বিচিত্র। আমারও ইচ্ছে করে যতীন মামার মতো সুরের আলোয় ভুবন ছে্য়ে ফেলে, সুরের আগুন গগনে বেয়ে তুলে পলে পলে নিজেকে শেষ করে আনি! লাভ নেই? নাই বা রইল।

এতদিন জানতাম, আমিও বাঁশি বাজাতে জানি। বন্ধুরা শুনে প্রশংসাও করে এসেছে। বাঁশি বাজিয়ে আনন্দও যে না পাই তা নয়। কিন্তু যতীন মামার বাঁশি শুনে এসে মনে হল, বাঁশি বাজানো আমার জন্যে নয়। এক একটা কাজ করতে এক একজন লোক জন্মায়, আমি বাঁশি বাজাতে জন্মাইনি। যতীন মামা ছাড়া বাঁশি বাজাবার অধিকার কারও নেই।

থাকতে পারে কারও অধিকার। কারও কারও বাঁশি হয়তো যতীন মামার বাঁশির চেয়েও মনকে উতলা করে তোলে, আমি তাদের চিনি না।

একদিন বললাম, বাঁশি শিখিয়ে দেবে মামা?

যতীন মামা হেসে বললে, বাঁশি কি শেখাবার জিনিস ভাগনে? ও শিখতে হয়।

তা ঠিক। আর শিখতেও হয় মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, সমগ্র সত্তা দিয়ে। নইলে আমার বাঁশি শেখার মতোই সে শিক্ষা ব্যৰ্থ হয়ে যায়।

অতসী মামিকে সেদিন বিদায় নেবার সময় যে কথা বলেছিলাম সে কথা ভুলিনি। কিন্তু কী করে যে যতীন মামার বাঁশি ছাড়াব ভেবে পেলাম না। অথচ দিনের পর দিন যতীন মামা যে এই সর্বনাশা নেশায় পলে পলে মরণের দিকে এগিয়ে যাবেন। কথা ভাবতেও কষ্ট হল। কিন্তু করা যায় কী? মামির প্রতি যতীন মামার যে ভালোবাসা তার বোধ হয় তল নেই, মামির কান্নাই যখন ঠেলেছেন তখন আমার সাধ্য কী তাকে ঠেকিয়ে রাখি!

একদিন বললাম, মামা, আর বাঁশি বাজাবেন না।

যতীন মামা চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, বাঁশি বাজাব না? বল কী ভাগনে? তাহলে বাঁচব কী করে?

বললাম, গলা দিয়ে রক্ত উঠছে, মামি কত কাঁদে।

তা আমি কি করব? একটু-আধটু কাঁদা ভালো। বলে হাকলেন, অতসী! অতসী!

মামি এল।

মামা বললেন, কান্না কী জন্যে শুনি? বাঁশি ছেড়ে দিয়ে আমায় মরতে বল নাকি? তাতে কান্না বাড়বে, কমবে না।

মামি ম্লানমুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মামা বললেন, জানো ভাগনে, এই অতসীর জ্বালায় আমার বেঁচে থাকা ভার হয়ে উঠেছে। কোথেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন, নড়বার নাম নেই। ওর ভার ঘাড়ে না থাকলে বাঁশি বগলে মনের আনন্দে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতাম। বেড়ানো-টেড়ানো সব মাথায় উঠেছে।

মামি বললে, যাও না বেড়াতে, আমি ধরে রেখেছি?

রাখোনি? বলে মামা এমনিভাবে চাইলেন যেন নিজের চোখে তিনি অতসী মামিকে খুন করতে দেখেছেন আর মামি এখন তাঁর সমুখেই সে কথা অস্বীকার করছে।

মামির চোখে জল এল। অশু-জড়িত কণ্ঠে বললে, অমন কর তো আমি একদিন—

মামা একেবারে জল হয়ে গেলেন। আমার সামনেই মামির হাত ধরে কোঁচার কাপড় দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন, ঠাট্টা করছিলাম, সত্যি বলছি অতসী,–

চট করে হাত ছাড়িয়ে মামি চলে গেল!

আমি বললাম, কেন মিথ্যে চটালেন মামিকে?

যতীন মামা বললেন, চটেনি। লজ্জায় পালাল।

কিন্তু একদিন যতীন মামাকে বাঁশি ছাড়তে হল। মামিই ছাড়াল।

মামির একদিন হঠাৎ টাইফয়েড জ্বর হল।

সেদিন বুঝি জ্বরের সতেরো দিন। সকাল নটা বাজে। মামি ঘুমুচ্ছে, আমি তার মাথায় আইসব্যাগটা চেপে ধরে আছি। যতীন মামা একটু টুলে বসে স্নানমুখে চেয়ে আছেন। রাত্রি জেগে তার শরীর আরও শীর্ণ হয়ে গেছে, চোখ দুটি লাল হয়ে উঠেছে। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, চুল উশকোখুশকো।

হঠাৎ টুল ছেড়ে উঠে মামা ট্রাঙ্কটা খুলে বাঁশিটা বার কবলেন। আজ সতেরো দিন এটা বাক্সেই বন্ধ ছিল।

সবিস্ময়ে বললাম, বাঁশি কী হবে মামা?

ছেঁড়া পাম্পশুতে পা ঢুকোতে ঢুকোতে মামা বললেন, বেচে দিয়ে আসব।

তার মানে? যতীন মামা ম্লান হাসি হেসে বললেন, তার মানে ডাক্তার বোসকে আর একটা কল দিতে হবে।

বললাম, বাঁশি থাক, আমার কাছে টাকা আছে।

প্রত্যুত্তরে শুধু একটু হেসে যতীন মামা পেরেকে টাঙানো জামাটা টেনে নিলেন।

যদি দরকার পড়ে ভেবে পকেটে কিছু টাকা এনেছিলাম। মিথ্যা চেষ্টা। আমার মেজো মামা কতবার কত বিপদে যতীন মামাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছেন, যতীন মামা একটি পয়সা নেননি। বললাম, কোথাও যেতে হবে না মামা, আমি কিনব বাঁশি।

মামা ফিরে দাঁড়ালেন। বললেন, তুমি কিনবে ভাগনে? বেশ তো! বললাম, কত দাম? বললেন, একশো পঁয়ত্ৰিশে কিনেছি, একশো টাকায় দেব। বাঁশি ঠিক আছে, কেবল সেকেন্ড হ্যাণ্ড এই যা।

বললাম, আপনি না সেদিন বলছিলেন মামা, এ রকম বঁশি খুঁজে পাওয়া দায়, অনেক বেছে আপনি কিনেছেন? আমি একশো পঁয়ত্রিশ দিয়েই ওটা কিনব।

যতীন মামা বললেন, তা কি হয়। পুরনো জিনিস–

বললাম, আমাকে কি জোচ্চোর পেলেন মামা? আপনাকে ঠকিয়ে কম দামে বাঁশি কিনব?

পকেটে দশ টাকার তিনটে নোট ছিল, বার করে মামার হাতে দিয়ে বললাম, ত্রিশ টাকা আগাম নিন, বাকি টাকাটা বিকেলে নিয়ে আসব।

যতীন মামা কিছুক্ষণ স্তব্ধভাবে নোটগুলির দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, আচ্ছা!

আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। যতীন মামার মুখের ভাবটা দেখবার সাধা হল না।

যতীন মামা ডাকলেন, ভাগনে—

ফিরে তাকালাম।

যতীন মামা হাসবার চেষ্টা করে বললেন, খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে ভেব না, বুঝলে ভাগনে?

আমার চোখে জল এল। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে মামির শিয়রে গিয়ে বসলাম।

মামির ঘুম ভাঙেনি, জানতেও পারল না যে রক্তপিপাসু বাঁশিটা ঝলকে ঝলকে মামার রক্ত পান করেছে, আমি আজ সেই বাঁশিটা কিনে নিলাম।

মনে মনে বললাম, মিথ্যে আশা। এ যে বালির বাঁধ! একটা বাঁশি গেল, আর একটা কিনতে কতক্ষণ? লাভের মধ্যে যতীন মামা একান্ত প্রিয়বস্তু হাতছাড়া হয়ে যাবার বেদনাটাই পেলেন।

বিকালে বাকি টাকা এনে দিতেই যতীন মামা বললেন, বাড়ি যাবার সময় বাঁশিটা নিয়ে যেও। আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, থাক না এখন কদিন, এত তাড়াতাড়ি কীসের?

যতীন মামা বললেন, না। পরের জিনিস আমি বাড়িতে রাখি না। বুঝলাম, পরের হাতে চলে যাওয়া বাঁশিটা চোখের ওপরে থাকা তাঁর সহ্য হবে না।

বললাম, বেশ মামা, তাই নিয়ে যাবখন।

মামা ঘাড় নেডে বললেন, হ্যাঁ, নিয়েই যেও | তোমার জিনিস এখানে কেন ফেলে রাখবে। বুঝলে না?

উনিশ দিনের দিন মামির অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠল।

যতীন মামা টুলটা বিছানার কাছে টেনে টেনে মামির একটা হাত মুঠো করে ধরে নীরবে তার রোগশীর্ণ ঝরা ফুলের মতো ম্লান মুখের দিকে চেয়েছিলেন, হঠাৎ অতসী মামি বললে, ওগো আমি বোধ হয় আর বাঁচব না।

যতীন মামা বললেন, তা কি হয় অতসী, তোমায় বাঁচতে হবেই। তুমি না বাঁচলে আমিও যে বাঁচব না?

মামি বললে, বালাই, বাঁচবে বইকী। দ্যাখো, আমি যদি নাই বাঁচি, আমার একটা কথা রাখবে? যতীন মামা নত হয়ে বললেন, রাখব। বলো।

বঁশি বাজানো ছেড়ে দিয়ো। তিলতিল করে তোমার শরীর ক্ষয় হচ্ছে দেখে ওপারে গিয়েও আমার শান্তি থাকবে না। রাখবে আমার কথা?

মামা বললেন, তাই হবে অতসী। তুমি ভালো হয়ে ওঠ। আমি আর বঁশি ছোঁব না।

মামির শীর্ণ ঠোঁটে সুখের হাসি ফুটে উঠল। মামার একটা হাত বুকের ওপর টেনে শ্রান্তভাবে মামি চোখ বুজল।

আমি বুঝলাম যতীন মামা আজ তাঁর রোগশয্যাগতা অতসীর জন্য কত বড়ো একটা ত্যাগ করলেন। অতি মৃদুস্বরে উচ্চারিত ওই কটি কথা, তুমি ভালো হয়ে ওঠ, আমি আর বঁশি ছোব না, অন্যে না বুঝুক আমি তো যতীন মামাকে চিনি, আমি জানি, অতসী মামিও জানে ওই কথা কটির পেছনে কতখানি জোর আছে! বাঁশি বাজাবার জন্য মন উন্মাদ হয়ে উঠলেও যতীন মামা আর বাঁশি ছোঁবেন না।

শেষ পর্যন্ত মামি ভালো হয়ে উঠল। যতীন মামার মুখে হাসি ফুটল। মামি যেদিন পথ্য পেল সেদিন হেসে মামা বললেন, কী গো, বাঁচবে না বললে ? অমনি মুখের কথা কি না! যে চাঁড়াল খুড়োর কাছ থেকেই তোমায় ছিনিয়ে এনেছি, যম ব্যাটা তো ভালোমানুষ।

আমি বললাম, চাঁড়াল খুড়ো আবার কী মামা?

মামা বললেন, তুমি জান না বুঝি? সে এক দ্বিতীয় মহাভারত।

মামি বললে, গুরুনিন্দা কোরো না।

মামা বললেন, গুরুনিন্দা কী? গুরুতর নিন্দা করব। ভাগনেকে দেখাও না। অতসী তোমার পিঠের দাগটা।

মামির বাধা দেওয়া সত্ত্বেও মামা ইতিহাসটা শুনিয়ে দিলেন। নিজের খুড়ো নয়, বাপের পিসতুতো ভাই। মা বাবাকে হারিয়ে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত ওই খুড়োর কাছেই অতসী মামি ছিল। অত বড়ো মেয়ে, তাকে কিলচড় লাগাতে খুড়োটির বাধত না, আনুষঙ্গিক অন্য সব তো ছিলই। খুড়োর মেজাজের একটি অক্ষয় চিহ্ন আজ পর্যন্ত মামির পিঠে আছে। পাশের বাড়িতেই যতীন মামা বাঁশি বাজাতেন আর আকণ্ঠ মদ খেতেন। প্রায়ই খুড়োর গর্জন আর অনেক রাতে মামির চাপা কান্নার শব্দে তার নেশা ছুটে যেত। নিতান্ত চটে একদিন মেয়েটাকে নিয়ে পলায়ন করলেন এবং বিয়ে করে ফেললেন।

মামার ইতিহাস বলা শেষ হলে অতসী মামি ক্ষীণ হাসি হেসে বললে, তখন কি জানি মদ খায়! তাহলে কক্‌খনো আসতাম না।

মামা বললেন, তখন কী জানি তুমি মাথার রতন হয়ে আঠার মতো লেপটে থাকবে! তাহলে কক্‌খনো উদ্ধার করতাম না। আর মদ না খেলে কি এক ভদ্রলোকের বাড়ি থেকে মেয়ে চুরি করার মতো বিশ্রী কাজটা করতে পারতাম গো! আমি ভেবেছিলাম, বছরখানেক—

মামি বললে, যাও, চুপ করো। ভাগনের সামনে যা তা বকো না।

মামা হেসে চুপ করলেন।



মাস দুই পরের কথা।

কলেজ থেকে সটান যতীন মামার ওখানে হাজির হলাম। দেখি, জিনিসপত্র যা ছিল বাঁধাছাঁদা হয়ে পড়ে আছে।

অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, এ সব কী মামা?

যতীন মামা সংক্ষেপে বললেন, দেশে যাচ্ছি।

দেশে? দেশ আবার আপনার কোথায়?

যতীন মামা বললেন, আমার কী একটা দেশও নেই ভাগনে? পাঁচশো টাকা আয়ের জমিদারি আছে দেশে, খবর রাখ?

অতসী মামি বললে, হয়তো জন্মের মতোই তোমাদের ছেড়ে চললাম ভাগনে। আমার অসুখের জন্যই এটা হল।

বললাম, তোমার অসুখের জন্য? তার মানে?

মামা বললেন, তার মানে বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছি। যিনি কিনেছেন পাশের বাড়িতেই থাকেন, মাঝখানের প্রাচীরটা ভেঙে দুটো বাড়ি এক করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

আমি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললাম, এত কাণ্ড করলে মামা, আমাকে একবার জানালে না পর্যন্ত! করে যাওয়া ঠিক হল?

বাঁধা বিছানা আর তালাবন্ধ বাক্সের দিকে আঙুল বাড়িয়ে মামা বললেন, আজ। রাত্রে ঢাকা মেলে রওনা হব। আমরা বাঙাল হে ভাগনে, জানো না বুঝি? বলে মামা হাসলেন। অবাক মানুষ! এমন অবস্থায় হাসিও আসে!

গম্ভীরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আচ্ছা, আসি যতীন মামা, আসি মামি। বলে দরজার দিকে অগ্রসর হলাম।

অতসী মামি উঠে এসে আমার হাতটা চেপে ধরে বললে, লক্ষ্মী ভাগনে, রাগ কোরো না। আগে থাকতে তোমায় খবর দিয়ে লাভ তো কিছু ছিল না, কেবল মনে ব্যথা পেতে। যা ভাগনে তুমি, কত কী হাঙ্গামা বাঁধিয়ে তুলতে ঠিক আছে কিছু?

আমি ফিরে গিয়ে বাঁধা বিছানাটার ওপর বসে বললাম, আজ যদি না আসতাম, একটা খবরও তো পেতাম না। কাল এসে দেখতাম, বাড়িঘর খাঁখাঁ করছে।

যতীন মামা বললেন, আরে রামঃ! তোমায় না বলে কি যেতে পারি? দুপুরবেলা সেনের ডাক্তারখানা থেকে ফোন করে দিয়েছিলাম তোমাদের বাড়িতে। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরলেই খবর পেতে|

বাড়ি আর গেলাম না। শিয়ালদহ স্টেশনে মামা-মামিকে উঠিয়ে দিতে গেলাম। গাড়ি ছাড়ার আগে কতক্ষণ সময় যে কী করেই কাটল! কারও মুখেই কথা নেই। যতীন মামা কেবল মাঝে মাঝে দু একটা হাসির কথা বলছিলেন এবং হাসাচ্ছিলেনও। কিন্তু তার বুকের ভেতর যে কী করছিল সে খবর আামার অজ্ঞাত থাকেনি।

গাড়ি ছাড়বার ঘণ্টা বাজলে যতীন মামা আর অতসী মামিকে প্রণাম করে গাড়ি থেকে নামলাম। এইবার যতীন মামা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আর বোধ হয় মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হল না !

জানালা দিয়ে মুখ বার করে মামি ডাকলে, শোনো। কাছে গেলাম। মামি বললে, তোমাকে ভাগনে বলি আর যাই বলি, মনে মনে জানি তুমি আমার ছোটো ভাই। পার তো একবার বেড়াতে গিয়ে দেখা দিয়ে এসো। আমাদের হয়তো আর কলকাতা আসা হবে না, জমির ভা্রী ক্ষতি হয়ে গেছে। যেও, কেমন ভাগনে?

মামির চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরে পড়ল। ঘাড় নেড়ে জানালাম, যাব।

বাঁশি বাজিয়ে গাড়ি ছাড়ল। যতক্ষণ গাড়ি দেখা গেল অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। দূরের লাল সবুজ আলোকবিন্দুর ওপারে যখন একটি চলন্ত লাল বিন্দু অদৃশ্য হয়ে গেল তখন ফিরলাম। চোখের জলে দৃষ্টি তখন ঝাপসা হয়ে গেছে।



মানুষের স্বভাবই এই যখন যে দুঃখটা পায় তখন সেই দুঃখটাকেই সকলের বড়ো কবে দেখে। নইলে কে ভেবেছিল, যে যতীন মামা আর অতসী মামির বিচ্ছেদে একুশ বছর বয়সে আমার দুচোখ জলে ভরে গিয়েছিল সেই যতীন মামা আর অতসী মামি একদিন আমার মনের এক কোণে সংসারের সহস্ৰ আবর্জনার তলে চাপা পড়ে যাবেন।

জীবনে অনেকগুলি ওলট-পালট হয়ে গেল। যথাসময়ে ভাগ্য আমার ঘাড় ধরে যৌবনের কল্পনার সুখস্বৰ্গ থেকে বাস্তবের কঠোর পৃথিবীতে নামিয়ে দিল। নানা কারণে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ল। বালিগঞ্জের বাড়িটা পর্যন্ত বিক্রি করে ঋণ শোধ দিয়ে আশি টাকা মাইনের একটা চাকরি নিয়ে শ্যামবাজার অঞ্চলে ছোটো একটা বাড়ি ভাড়া করে উঠে গেলাম। মার কাঁদাকাটায় গলে একটা বিয়েও করে ফেললাম।

প্রথমে সমস্ত পৃথিবীটাই যেন তেতো লাগতে লাগল, জীবনটা বিস্বাদ হয়ে গেল, আশা-আনন্দের এতটুকু আলোড়নও ভেতরে খুঁজে পেলাম না।

তারপর ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে গেল। নতুন জীবনে রসের খোঁজ পেলাম। জীবনের জুয়াখেলায় হারজিতের কথা কদিন আর মানুষ বুকে পুষে রাখতে পারে?

জীবনে যখন এই সব বড়ো বড়ো ঘটনা ঘটছে তখন নিজেকে নিয়ে আমি এমনি ব্যাপৃত হয়ে পড়লাম যে কবে এক যতীন মামা আর অতসী মামির স্নেহ পরমসম্পদ বলে গ্রহণ করেছিলাম সে কথা মনে ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে গেল। সাত বছর পরে আজ ক্কচিৎ কখনও হয়তো একটা অস্পষ্ট স্মৃতির মতো তাদের কথা মনে পড়ে।

মাঝে একবার মনে পড়েছিল, যতীন মামাদের দেশে চলে যাওয়ার বছর তিনেক পরে। সেইবার ঢাকা মেলে কলিশন হয়। মৃতদের নামের মাঝে যতীন্দ্রনাথ রায় নামটা দেখে যে খুব একটা ঘা লেগেছিল সে কথা আজও মনে আছে। ভেবেছিলাম একবার গিয়ে দেখে আসব, কিন্তু হয়নি। সেদিন আপিস থেকে ফিরে দেখি আমার স্ত্রীর কঠিন অসুখ। মনে পড়ে যতীন মামার দেশের ঠিকানায় একটা পত্র লিখে দিয়ে এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম, ও নিশ্চয় আমার যতীন মামা নয়। পৃথিবীতে যতীন্দ্রনাথ রায়ের অভাব তো নেই। সে চিঠির কোনো জবাব আসেনি। স্ত্রীর অসুখের হিড়িকে কথাটাও আমার মন থেকে মুছে গিয়েছিল।

তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে আরও চারটে বছর কেটে গেছে।

আমার ছোটো বোন বীণার বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়।

পুজোর সময় বীণাকে তারা পাঠালে না। অগ্রহায়ণ মাসে বীণাকে আনতে ঢাকা গেলাম। কিন্তু আনা হল না। গিয়েই দেখি বীণার শাশুড়ির খুব অসুখ। আমি যাবার আগের দিন হু হু করে জ্বর এসেছে। ডাক্তার আশঙ্কা করছেন নিউমোনিয়া।

ছুটি ছিল না, ক্ষুন্ন হয়ে একাই ফিরলাম। গোয়ালন্দে স্টিমার থেকে নেমে ট্রেনের একটা ইন্টারে ভিড় কম দেখে উঠে পড়লাম। দুটি মাত্র ভদ্রলোক, এক-কোণে র‍্যাপার মুড়ি দেওয়া একটি স্ত্রীলোক, খুব সম্ভব এদের একজনের স্ত্রী, জিনিসপত্রের একান্ত অভাব। খুশি হয়ে একটা বেঞ্চিতে কম্বলের ওপর চাদর বিছিয়ে বিছানা করলাম। বালিশ ঠেসান দিয়ে আরাম করে বসে, পা দুটো কম্বল দিয়ে ঢেকে একটা ইংরেজি মাসিকপত্র বার করে ওপেনহেমের ডিটেকটিভ গল্পে মনঃসংযোগ করলাম।

যথাসময়ে গাড়ি ছাড়ল এবং পরের স্টেশনে থামল। আবার চলল। এটা ঢাকা মেল বটে, কিন্তু পোড়াদ পর্যন্ত প্রত্যেক স্টেশনে থেমে থেমে প্যাসেঞ্জার হিসাবেই চলে। পোড়াদ-র পর ছোটোখাটো স্টেশনগুলি বাদ দেয় এবং গতিও কিছু বাড়ায়।

গোয়ালদের পর গোটা তিনেক স্টেশন পার হয়ে একটা স্টেশনে গাড়ি দাঁড়াতে ভদ্রলোক দুটি জিনিসপত্র নিয়ে নেমে গেলেন। স্ত্রীলোকটি কিন্তু তেমনিভাবে বসে রইলেন।

ব্যাপার কী? একে ফেলেই দেখছি সব নেমে গেলেন। এমন অন্যমনস্কও তো কখনও দেখিনি! ছোটোখাটো জিনিসই মানুষের ভুল হয়, একটা আস্ত মানুষ, তাও আবার একজনের অর্ধাঙ্গ, তাকে আবার কেউ ভুল করে ফেলে যায় নাকি?

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম পিছনে দৃকপাত-মাত্র না করে তাঁরা স্টেশনের গেট পার হচ্ছেন। হয়তো ভেবেছেন, চিরদিনের মতো আজও স্ত্রীটি তার পিছু পিছু চলেছে।

চেঁচিয়ে ডাকলাম ও মশায়—মশায় শুনছেন?

গেটের ওপারে ভদ্রলোক দুটি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বাঁশি বাজিয়ে গাড়িও ছাড়ল।

অগত্যা নিজের জায়গায় বসে পড়ে ভাবলাম, তবে কি ইনি একাই চলেছেন নাকি? বাঙালির মেয়ে নিশ্চয়ই, র‍্যাপার দিয়ে নিজেকে ঢাকবার কায়দা দেখেই সেটা বোঝা যায়। বাঙালির মেয়ে, এই রাত্রিবেলা নিঃসঙ্গ যাচ্ছে, তাও আবার পুরুষদের গাড়িতে!

একটু ভেবে বললাম, দেখুন, শুনছেন?

সাড়া নেই।

বললাম, আপনার সঙ্গীরা সব নেমে গেছে, শুনছেন?

এইবার আলোয়ানের পোঁটলা নড়ল, এবং আলোয়ান ও ঘোমটা সরে গিয়ে যে মুখখানা বার হল দেখেই আমি চমকে উঠলাম।

কিছু নেই, সে মুখের কিছুই এতে নেই। আমার অতসী মামির মুখের সঙ্গে এ মুখের অনেক তফাত। কিন্তু তবু আমার মনে হল, এ আমার অতসী মামিই!

মৃদু হেসে বললে, গলা শুনেই মনে হয়েছিল এ আমার ভাগনের গলা। কিন্তু অতটা আশা করতে পারিনি। মুখ বার কবতে ভয় হচ্ছিল, পাছে আশা ভেঙে যায়।

আমি সবিস্ময়ে বলে উঠলাম, অতসী মামি!

মামি বললে, খুব বদলে গেছি, না?

মামির সিথিতে সিঁদুর নেই, কাপড়ে পাড়ের চিহ্নও খুঁজে পেলাম না।

চার বছর আগে ঢাকা-মেল কলিশনে মৃতদের তালিকায় একটা অতি পরিচিত নামের কথা মনে। পড়ল। যতীন মামা তবে সত্যিই নেই।

আস্তে আস্তে বললাম, খবরের কাগজে মামার নাম দেখেছিলাম মামি, বিশ্বাস হয়নি সে আমার যতীন মামা। একটা চিঠি লিখেছিলাম, পাওনি?

মামি বললে, না। তারপরেই আমি ওখান থেকে দু-তিন মাসের জন্য চলে যাই।

বললাম, কোথায়?

আমার এক দিদির কাছে। দূর সম্পর্কের অবশ্য।

আমায় কেন একটা খবর দিলে না মামি?

মামি চুপ করে রইল।

ভাগনের কথা বুঝি মনে ছিল না?

মামি বললে, তা নয়, কিন্তু খবর দিয়ে আর কী হত। যা হবার তা তো হয়েই গেল। বাঁশিকে ঠেকিয়ে রাখলাম, কিন্তু নিয়তিকে তো ঠেকাতে পারলাম না। তোমার মেজোমামার কাছে তোমার কথাও সব শুনলাম, আমার দুর্ভাগ্য নিয়ে তোমায় আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে হল না। জানি তো, একটা খবর দিলেই তুমি ছুটে আসবে!

চুপ করে রইলাম। বলবার কী আছে। কী নিয়েই বা অভিমান করব? খবরেব কাগজে যতীন মামার নাম পড়ে একটা চিঠি লিখেই তো আমার কর্তব্য শেষ করেছিলাম।

মামি বললে, কী করছ এখন ভাগনে?

চাকরি। এখন তুমি যাচ্ছ কোথায়?

মামি বললে, একটু পরেই বুঝবে। ছেলেপিলে কটি?

আশ্চর্য! জগতে এত প্রশ্ন থাকতে এই প্রশ্নটাই সকলের আগে মামির মনে জেগে উঠল!

বললাম, একটি ছেলে।

ভারী ইচ্ছে করছে আমার ভাগনের খোকাকে দেখে আসতে। দেখাবে একবার? কার মতো হয়েছে? তোমার মতো, না তার মার মতো? কত বড়ো হয়েছে?

বললাম, তিন বছর চলছে। চলো না আমাদের বাড়ি মামি, বাকি প্রশ্নগুলির জবাব নিজের চোখেই দেখে আসবে?

মামি হেসে বললে, গিয়ে যদি আর না নড়ি?

বললাম, তেমন ভাগ্য কি হবে! কিন্তু সত্যি কোথায় চলেছ মামি? এখন থাক কোথায়?

মামি বললে, থাকি দেশেই। কোথায় যাচ্ছি, একটু পরে বুঝবে। ভালো কথা, সেই বাঁশিটা কী হল ভাগনে?

এইখানে আছে।

এইখানে? এই গাড়িতে?

বললাম, হুঁ। আমার ছোটো বোন বীণাকে আনতে গিয়েছিলাম, সে লিখেছিল বাঁশিটা নিয়ে যেতে। সবাই নাকি শুনতে চেয়েছিল।

মামি বললে, তুমি বাজাতে জান নাকি? বার করো না বাঁশিটা?—

ওপর থেকে বাঁশির কেসটা পাড়লাম। বাঁশিটা বার করতেই মামি ব্যগ্র হাতে টেনে নিয়ে এক দৃষ্টিতে সেটার দিকে চেয়ে রইল। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, বিয়ের পর এটাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করেছিলাম, মাঝখানে এর চেয়ে বড়ো শত্ৰু আমার ছিল না, আজ আবার এটাকে বন্ধু মনে হচ্ছে। শেষ তিনটা বছর বাঁশিটার জন্য ছটফট করে কাটিয়েছিলেন। আজ মনে হচ্ছে বাঁশি বাজানো ছাড়তে না বললেই হয়তো ভালো হত। বাঁশির ভেতর দিয়ে মরণকে বরণ করলে তবু শান্তিতে যেতে পারতেন। শেষ কটা বছর এত মনঃকষ্ট ভোগ করতে হত না।

বাঁশির অংশগুলি লাগিয়ে মামি মুখে তুলল। পরক্ষণে ট্রেনের ঝমঝমানি ছাপিয়ে চমৎকার বাঁশি বেজে উঠল। পাকা গুণীর হাতের স্পর্শ পেয়ে বাঁশি যেন প্রাণ পেয়ে অপূর্ব বেদনাময় সুরের জাল বুনে চলল।

আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। এ তো অল্প সাধনার কাজ নয়। যার তার হাতে বাঁশি তো এমন অপূর্ব কান্না কাঁদে না। মামির চক্ষু ধীরে ধীরে নিমীলিত হয়ে গেল। তার দিকে চেয়ে ভবানীপুরেব একটা অতি ক্ষুদ্র বাড়ির প্রদীপের স্বল্পালোকে বারান্দার দেয়ালে ঠেস দেওয়া এক সুর-সাধকের মূর্তি আমার মনে জেগে উঠল।

মাঝে সাতটা বছর কেটে গেছে। যতীন মামার যে অপূর্ব বাঁশির সুর একদিন শুনেছিলাম, সে সুর মনের তলে কোথায় হারিয়ে গেছে। আজ অতসী মামির বাঁশি শুনে মনে হতে লাগল সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলি যেন ফিরে এসে আমার প্রাণে মৃদুগুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে।

এক সময়ে বাঁশি থেমে গেল। মামির একটা দীর্ঘনিশ্বাস ঝরে পড়ল। আমারও!

কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললাম, এ কথাটাও তো গোপন রেখেছিলে!

মামি বললে, বিয়ের পর শিখিয়েছিলেন। বাঁশি শিখবার কী আগ্রহই তখন আমার ছিল। তারপর যেদিন বুঝলাম বাঁশি আমার শত্ৰু সেইদিন থেকে আর ছুঁইনি। আজ কতকাল পরে বাজালাম। মনে হয়েছিল, বুঝি ভুলে গেছি!

ট্রেন এসে একটা স্টেশনে দাঁড়াল। মামি জানালা দিয়ে মুখ বার করে আলোর গায়ে লেখা স্টেশনের নামটা পড়ে ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে বললে, পরের স্টেশনে আমি নেমে যাব ভাগনে।

পরের স্টেশনে! কেন?

মামি বললে, আজ কত তারিখ, জান?

বললাম, সতেরোই অঘ্রান।

মামি বললে, চার বছর আগে আজকের দিনে—বুঝতে পারছ না তুমি?

মুহুর্তে সব দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। ঠিক! চার বছর আগে এই সতেরোই অঘ্রান ঢাকা মেলে কলিশন হয়েছিল। সেদিনও এমনি সময়ে এই ঢাকা মেলটির মতো সেই গাড়িটা শত শত নিশ্চিন্ত আরোহীকে পলে পলে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

বলে উঠলাম, মামি!

মামি স্থিরদৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললে, সামনের স্টেশনের অল্প ওদিকে লাইনের ধারে কঠিন মাটির ওপর তিনি মৃতু্যযন্ত্রণায় ছটফট করেছিলেন। প্রত্যেক বছর আজকের দিনটিতে আমি ওই তীর্থদর্শন করতে যাই। আমার কাছে আর কোনো তীর্থের এতটুকু মূল্য নেই।

হঠাৎ জানালার কাছে সরে গিয়ে বাইরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে মামি বলে উঠল, ওই ওই ওইখানে! দেখতে পাচ্ছ না? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একটু স্নেহশীতল স্পর্শের জন্য ব্যগ্র হয়ে রয়েছেন। একটু জল, একটু জলের জন্যেই হয় তো!–উঃ মাগো, আমি তখন কোথায়!

দু-হাতে মুখ ঢেকে মামি ভেতরে এসে বসে পড়ল।

ধীরে ধীরে গাড়িখানা স্টেশনের ভেতর ঢুকল।

বিছানাটা গুটিয়ে নিযে আমি বললাম, চলো মামি, আমি তোমার সঙ্গে যাব।

মামি বললে, না।

বললাম, এই রাত্রে তোমাকে একলা যেতে দিতে পারব না মামি।

মামির চোখ জ্বলে উঠল, ছিঃ! তোমার তো বুদ্ধির অভাব নেই ভাগনে। আমি কি সঙ্গী নিয়ে সেখানে যেতে পারি? সেই নির্জন মাঠে সমস্ত রাত আমি তার সঙ্গ অনুভব করি, সেখানে কি কাউকে নিয়ে যাওয়া যায়! ওইখানের বাতাসে যে তার শেষ নিশ্বাস রয়েছে! অবুঝ হয়ো না—

গাড়ি দাঁড়াল।

বাঁশিটা তুলে নিযে মামি বললে, এটা নিয়ে গেলাম ভাগনে! এটার ওপর তোমার চেয়ে আমার দাবি বেশি।

দরজা খুলে অতসী মামি নেমে গেলেন। আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম। আবার বাঁশি বাজিয়ে গাড়ি ছাড়ল। খোলা দরজাটা একটা করুণ শব্দ করে আছড়ে বন্ধ হয়ে গেল।

রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২০

গৌতম দে'র গল্প : গ্যাসবেলুন

গৌতম দে
গ্যাসবেলুন


ব্রিজের তলায় এসে বাসটি দাঁড়ায়। ব্রজেন মিত্তির বাসের জানলা দিয়ে মাথাটা একটু বের করেন। ওপরের দিকে তাকান। আঁতকে ওঠেন। আবার সেই ব্রিজ ভাঙার আতঙ্ক জেগে উঠল ব্রজেন মিত্তিরের মনে। পোস্তার ব্রিজ, মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়া আহত আর নিহতরা যেন সমস্বরে শেষবারের মতো চিৎকার করছে বাঁচাও...বাঁচাও...আমাদের বাঁচাও...।
ভাবতে ভাবতে তিনি এই শীতে কুলকুল করে ঘামতে থাকেন। নানাবিধ ভাবনা মনের মধ্যে ধাক্কা মারে। যদি এখন এই ব্রিজটা হুড়মুড় করে মাথার ওপর ভেঙে পড়ে তখন কী হবে? তিনটি মেয়ের এখনও বিয়ে দিতে পারেননি। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। টানাটানির সংসার। বউটার বাতের ব্যামো। আরও কতশত ভাবনা!
ব্রজেন মিত্তির ড্রাইভারকে নরম সুরে বলেন-একটু আগে গিয়ে বাসটা দাঁড় করান না ভাই...।
-দেখতেই তো পাচ্ছেন সামনে জায়গা নেই। বলে ড্রাইভার আবার বিড়িতে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
ড্রাইভারের এই উত্তর ব্রজেনবাবুর মনোঃপূত হয়নি মোটে। তিনি সিট থেকে একটু উঠে আবারও বাসের জানলা দিয়ে মাথা বের করে সামনের দিকে দেখার চেষ্টা করেন। এখনও চার হাত জায়গা আছে সামনের দিকে। একটু আগিয়ে বাসটা রাখলে কোনও ক্ষতি নেই। ব্রিজটা ভেঙে পড়লে তিনি বাঁচলেও বাঁচতে পারেন। সামনের দিকে বসে আছেন। ব্রজেন মিত্তির তবুও আগবাড়িয়ে আবারও ড্রাইভারকে বলেন-দেখো না ভাই, একটু চেষ্টা করে...।
-কি দেখবো? ড্রাইভার মুখ ঘুরিয়ে ব্রজেনবাবুর দিকে কটমট করে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। তারপর নরম গলায় বলে-কারোর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না, শুধু আপনার হচ্ছে?
-ঠিক বলেছ। তিনি আমতা আমতা করে বলেন-একটু আগিয়ে রাখলে ক্ষতি কী!
-কেন? ব্রিজটা ভেঙে পড়বে নাকি!
-পড়তেও তো পারে। বলে ব্রজেন মিত্তির পাশের যাত্রীর সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আশ্চর্য হন, এমন নিরুত্তাপ মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর ড্রাইভারকে আবারও বলেন-একটু আগিয়ে রাখলে তো দোষের কিছু দেখি না। পোস্তার ব্রিজটা ভাই নতুন ছিল। ভেঙে পড়ল। কত মানুষের প্রাণ গেল। কি দাদা তাই তো? পাশের যাত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন।
-তাদের পরিবার টাকা পেল। চাকরি পেল। বলতে বলতে ড্রাইভার আবার একটা বিড়ি ধরায়। তারপর আবার বলে-আমি মন থেকে চাইছি, এই ব্রিজটাও ভেঙে পড়ুক মাথায়। আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না।
-কেন ভাই? তোমার এই কচি বয়সে এমন মৃত্যু চিন্তা কেন? সামনে লম্বা জীবন পড়ে রয়েছে...
-সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর যে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরি, তাতে সংসার চলে না মশাই...।
-তাই! তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করেন-অনেকটা আমার মতো...।
-অবাক হলেন? দিন দিন তেলের দাম বাড়ছে। তার ওপর ‘সেল’ কম হলেই অমনি মালিকের খিস্তি খেউর...।
ড্রাইভারের কথা কানে যায় না ব্রজেন মিত্তিরের। তিনি চোখ বুজে ভাবতে থাকেন, এইমাত্র তুমুল শব্দ করে মাথার ওপর ব্রিজটা ভেঙে পড়ল। ধুলোয় ধুলোয় ভরে গেল। চিড়েচ্যাপটা যানবাহনের সঙ্গে বহু মানুষ। প্রবল চিৎকার। চোখেমুখে বাঁচার আকুতি। অনেকের মতো তিনিও ভীষণ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। রক্ত ঝরছে। একটু একটু করে মারা যাচ্ছেন। তবুও ডান পা-টা প্রবলভাবে নড়াবার চেষ্টা করছেন। পাশের যাত্রীর গায়ে লাগতেই ব্রজেন মিত্তিরকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে ওঠে-ও দাদা, লাথি মারছেন কেন?
-স্যরি...স্যরি। ভুল হয়ে গেছে। নিমেষে ভাবনাগুলো কাচের গেলাসের মতো ভেঙে পড়ে। তারপর কাঁচুমাচু মুখ করে বলেন-ভেবেছিলাম, ব্রিজটা ভেঙে পড়েছে মাথার ওপর। আমি মারা গেছি...।
-আপনি তো মশাই আচ্ছা ক্যালানে তো! বলতে বলতে পাশের যাত্রীটি বিরক্তি প্রকাশ করে উঠে দাঁড়ায়।
সিগন্যাল পেতেই বাসটা যেন ছাড়া গরুর মতো বেপরোয়া হয়ে ছোটে সামনের দিকে। চারদিকে হর্নের শব্দ।
তারমানে তিনি বেঁচে আছেন এখনও। মনে হয়, মাথাটা যেন বাসের জানলার বাইরে গ্যাসবেলুনের মতো সাঁইসাঁই করে বাতাসে উড়ছে। ডান হাতে ধরা প্যাঁচানো সুতোটায় বাঁ হাতের তালু মুঠি হয়ে ওঠে।


শনিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২০

আত্মকথা : তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

"ছ-সাতটি কবিতার বই, তিনশোর বেশি ছোটোগল্প, তিরিশটির মতো উপন্যাস লেখার পরে আজও মনে হয় সেই লেখাটা আজও লেখা হয়নি যা লিখতে চেয়েছি আশৈশব।" ------ তপন বন্দ্যোপাধ্যায়



একটা সরল সত্য দিয়েই শুরু করা যাক এই লেখা। এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তার নিজের কাছে নায়ক। কেউ কেউ অন্যের কাছেও। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নায়করূপী এই যে 'আমি'র সদা বিচরণ, সেই আমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে যার যার পৃথিবী।

পৃথিবীর আরও একটি সরল সত্য এই যা  মানুষ তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নায়ক থাকে। তার 'আমি'র চারপাশে ব্যপ্ত হয়ে থাকে তার চেতনাবিম্ব। মানুষের এই চেতনাবিম্বে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য ভাবনা। কোনও ভাবনা চিরস্থায়ী হয় না। ভাবনাগুলো পরমুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নিয়মে। কোনও কোনও ভাবনা কিছুক্ষণ পরপর ফিরে আসে। আবার মিলিয়ে যায় কেননা পরের ভাবনা মানুষকে খোঁচাতে থাকে। পরের ভাবনাটি সরিয়ে দেয় আগের ভাবনাকে। কিছুক্ষণ পর তৃতীয় ভাবনা সরিয়ে দেয় দ্বিতীয় ভাবনাটি। এরকম অজস্র ভাবনা সারাক্ষণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কে। কাগজে লিখে না রাখলে মানুষের সব ভাবনাই বিলীন হয়ে যায় একটু পর পর। তাই পৃথিবীর মানুষের সেই ভাবনাটুকু ধরা থাকে যা মুদ্রিত হয় দুই মলাটের মধ্যে। মানুষের ভাবনা তার চেতনাবিম্বে তখন রূপান্তরিত হয় অক্ষর শিল্পে।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের চেতনাবিম্ব যেহেতু আলাদা, তার অনুভব, তার উপলব্ধি সবই আলাদা। প্রতিটি মানুষের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনও তাই ভিন্ন। এই কোটি কোটি সম্পর্কের খতিয়ান, তার চেতনা বিম্ব নিয়েই গড়ে ওঠে পৃথিবীর অক্ষরশিল্প।

মানুষের চেতনা বিম্বের একটা অংশই তো গল্প-উপন্যাসের উৎস। পৃথিবীর যেকোনও মানুষ যদি সামনে চলতে চলতে সহসা পিছন ফিরে তাকান, তিনি মুহূর্তে আবিষ্কার করবেন তারঁ জীবনের ওঠাপড়া, ভাঙাগড়া। তারঁ জীবনের প্রতিটি বাঁকেই অপেক্ষা করে থাকে কিছু নতুন ঘটনা, কিছু অভিনব রোমাঞ্চ। সবাই সেই রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারেন তা নয়। অনেকেরই মনে হয় জীবনটা বড়ো একঘেয়ে, খুবই গতানুগতিক। কিন্তু আদতে তা নয়। মানুষ ইচ্ছে করলেই তার জীবন উপভোগ করতে পারে নিত্যনতুন ভঙ্গিমায়। প্রত্যেক দিনই মানুষের চেতনা বিম্ব কিছু না কিছু পরিবর্তন সাধিত হয় কালের অমোঘ নিয়মে। সেই চেতনা বিম্ব তিনি কী রঙ দেবেন তা মানুষ নিজেই ভাববেন, নিজের মতো করেই গড়বেন তারঁ জীবন। একটু একটু করে এগোবেন তার জীবনের প্রান্তে। একটু একটু করে আবিষ্কার করবেন নিজেকে। জীবনের পথে মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে দেখবেন নিজেকে। সে দেখা বড়ো বিস্ময়ের। কখনও আনন্দের, কখনও আবিষ্কারকের।

মানব জীবনের অনেকটাই পার হয়ে হঠাৎ কোনও দিন পিছন ফিরে তাকালে এখনও দেখতে পাই ছোট্ট আমিটাকে। ছোটবেলার কিছু ফটোগ্রাফ থাকার দৌলতে নিজের মুখটা নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায় প্রতিনিয়ত। সেই প্রাথমিকে পড়ার সময় থেকে শুরু করেছিলাম ছড়া লেখা। ছন্দ মিলিয়ে মিল দিয়ে লেখা অসংখ্য ছড়া একসময় হারিয়ে গেছে আমার ঠাইঁনাড়া জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে। ঠাইঁনাড়া বলছি এই কারণেই যে শৈশব-কৈশোরে একটি গ্রামে আমার বড়ো হওয়া, সেখান থেকে একসময় কলেজ পড়তে কোলকাতায় আসা। কোলকাতায় কতোবার যে বাসা বদল হয়েছে আমার জীবনে, পরবর্তীকালে পেশার সূত্রে এতো এতো জেলায় থিতু হয়েছি বছরের পর বছর যে এখন পিছন ফিরলে পুরোটা আমিকে আর একসঙ্গে দেখতে পাই না। চোখে পড়ে আমার অস্তিত্বের টুকরো। টুকরো টুকরো হয়ে আমারই মুখোমুখি ছড়িয়ে আছি আমি।

এই অনেকগুলো টুকরো নিয়েই আজকের আমি। সেই ছড়াকার একসময় লিখতে শুরু করেছিল কবিতা। জীবন তখন বয়ে চলেছে মহাকালের কী এক অনিবার্য টানে। জীবন তখন রোদে শুকোতে শুকোতে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বিকেলের মরা আলোয় নিজেকে সেঁকতে সেঁকতে, রাতের অন্ধকারে চেতনালুপ্ত হয়ে পুনর্জন্ম নিতে নিতে, একসময় পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ক্রমশ।

তারপর একসময় হাতে উঠে এলো এক-একটি ছোটোগল্প।  তারপর এক-একটি উপন্যাস।

ছ-সাতটি কবিতার বই, তিনশোর বেশি ছোটোগল্প, তিরিশটির মতো উপন্যাস লেখার পরেও আজও মনে হয় সেই লেখাটা আজও লেখা হয়নি যা লিখতে চেয়েছি আশৈশব। অল্প বয়সের প্রগলভতায় মনে হত একটি বা দুটি কবিতার বই বা কিছু ছোটোগল্প বা একটি-দুটি উপন্যাস, ব্যস্, তাহলেই একজন কলমচি হয়ে ওঠে কবি বা লেখক। আজ জীবনের খাদের প্রান্তে পৌঁছে উপলব্ধি করি কবি বা লেখক কোনও কিছুই খুব সহজে হওয়া যায় না।

লেখক হওয়া কঠিন, সুকঠিন।
কী করে একজন কলমচি লেখক হয় তা এক আশ্চর্য রহস্য।
লেখক অর্থে এখন যা বুঝি তিনি আসলে একজন 'আউটসাইডার'। তিনি পৃথিবীতে আসেন বিশ্বপথিকের মতো। হি ইস জাস্ট অ্যা ট্রাভেলার ইন দিস ওয়ার্ল্ড। আসেন, বাস করেন, সবকিছু দেখেন নির্বিকার ভঙ্গিতে। তার মধ্যেই অনুভব করেন সবকিছু। কখনও খুব ঘনিষ্ঠ হন ঘটমান বিষয়ের সঙ্গে। পরক্ষণেই বিচ্ছিন্ন করেন নিজেকে। তখন বিষয়টি দেখেন অনেকখানি দূরে দাঁড়িয়ে।

সেসময় প্রতিটি মানুষই লেখকের চোখে একটি চরিত্র। প্রতিটি ঘটনাই কোনও না কোনও গল্পের প্লট। জীবনের প্রতিটি অংশই একটি উপন্যাস। কিন্তু কোনও মানুষ তার লেখার চরিত্র হয়ে উঠলে, কিংবা কোনও ঘটনা গল্প হয়ে ঢুকে পড়বে তারঁ লেখায় বা জীবনের কোনও এপিসোডকে তিনি উপন্যাস হিসেবে গড়ে তুলবেন তা লেখকের নিজস্ব ব্যাপার। তখন লেখক নিজেকেও দেখতে পান। একটু দূর থেকেই দেখেন নিজেকে। দেখতে দেখতে তারঁ লেখার মধ্যে একসময় ঢুকে পড়েন নিজেই। গল্পের সঙ্গে এগোতে থাকেন ধীর পায়ে। গল্পের অন্য চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। হাঁটতে থাকেন পরিনতির দিকে। লেখক আর লেখার চরিত্ররা তখন একাকার। এভাবেই লেখকের এক-একটি লেখার গড়ে ওঠার ইতিহাস। প্রতিটি লেখাই একটি নতুন পৃথিবীর নির্মাণ।

তবে যিনি লেখেন তিনিই লেখক নন। দীর্ঘকাল লেখালেখির পরেও আমার এখনও মনে হয় না আমি একজন লেখক। সব সময়েই ভাবি আসল লেখাটা লেখা হয়নি আজও। হয়তো কোনও দিনই হবে না। পৃথিবীর বহু লেখকই আছেন যারাঁ সারাজীবন চেষ্টা করেও তার ইঙ্গিত লেখাটি শেষ পর্যন্ত লিখে উঠতে পারেননি। তবু লেখক না লিখেও পারেন না। লেখাটা লেখকের জীবনে একটা ধারাবাহিক ঘটনা। এভাবে লিখতে লিখতে একটা লেখা হয়তো পাঠকের প্রশংসা কুড়োলো, ঠিক পরের লেখাটায় হয়তো নিন্দে। এভাবে নিন্দা ও প্রশংসার সমভিব্যাহারে লেখকের একটু একটু করে লেখক হয়ে ওঠা।
আবার কোনও লেখার অবিশ্রান্ত প্রশংসাতেও লেখকের আত্মশ্লাঘার কোনও কারণ নেই। কোনও লেখার নিন্দে হলেও মুষড়ে পড়া অনুচিত। লেখা ভালো না হলে তার নিন্দে হবেই। মুষড়ে না পড়ে লেখককে তখন ভাবতে হবে কী কারণে লেখাটা প্রকৃত লেখা হয়ে উঠলো না৷ ভাবতে হবে পরের লেখাটা আরও ভালো করে লেখা চাই। আগের লেখাটির ত্রুটি খুঁজে বার করতে হবে। পরের লেখা থেকে দূর করতে হবে সেই ত্রুটি।
স্বীকার করা ভালো যে, কেউ আমার লেখার নিন্দে করলে তিনি পরোক্ষে আমার উপকারই করেছেন। কোনও সংকলনে আমার লেখা বাদ পড়লে তাতে আরও উসকে উঠছে আমার জেদ। কোনও বড়ো পত্রিকা আমাকে লিখতে না ডাকলে ভেবেছি তাহলে আরও ভালো লিখতে হবে। ভালো লেখাটাই হচ্ছে সব নিন্দে, উপেক্ষা আর অবহেলার জবাব। কারণ আমি তো জানিই কোনও লেখকই তারঁ লেখা সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত মনে করতে পারেন না। প্রায় সব লেখাই লেখকের আরও একটু মনোযোগ পেলে আরও পারফেকশনে পৌঁছাতে পারে। এভাবেই তো একজন লেখকের সারা জীবনের দৌড়।

আমি তাই আজও নিজেকে 'কমপ্লিট রাইটার' ভেবে উঠতে পারিনি। তবু লিখি, প্রতিনিয়তই লেখার মধ্যে অবস্থান করি। লেখা এখন আমার কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। সারাদিন শত ব্যস্ততার মধ্যেও নতুন কোনও লেখা নিয়ে অনুশীলন চলে মনে মনে। লেখার বিষয়, তার চরিত্র চিত্রন, তার আঙ্গিক, তার ভাষা, তার উপস্থাপনা ------ এসবই জারিত হয় মগজের গোপন গহবরে। কবে যেন এভাবেই ঢুকে পড়েছি একটা প্রসেসের মধ্যে। এখন ইচ্ছা করলেও তার ভেতর থেকে আর বেরিয়ে আসা যায় না।

এখন একটা উপলব্ধি করতে পারি, দশটা ভালো গল্প কিংবা একটা কি দুটো ভালো উপন্যাস লিখেও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। লেখাটা হচ্ছে সারাজীবনের ব্যাপার। একজন লেখকের অনেক কিছুই বলার থাকে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় মানুষের এই পৃথিবী, তার জীবনযাপন। তা নানাভাবে না এঁকে তোলা পর্যন্ত নিস্তার থাকে না লেখকের।
কীভাবে এরকম একটি নির্দিষ্ট জগতের মাঝে ঢুকে পড়েছি তা ভাবতে এখন বিস্ময় জাগে। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর টেবিলে ঘাড় গুঁজে একনাগাড়ে দৌড়ের পরও যেন ক্লান্তি নেই৷ নেই, তার কারণ এতো লেখার পরেও মনে হয় এখনও সেই পারফেকশনে পৌঁছাতে পারিনি যা কোনও লেখকের একান্ত অভীষ্ট।

লেখালেখির এই দৌড়টা কিন্তু শুরু হয়েছিল বহুকাল আগে৷ তখন আমার বয়স পাঁচ, দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের খাতায় লিখে ফেলেছিলাম একটা পংক্তি চারেকের ছড়া। পাঠ্যপুস্তকের ছড়া ও কবিতা পড়েই বোধহয় লেখার প্রথম প্রেরণা।

তারপর লেখালেখির সঙ্গে কিভাবে জীবনটা জড়িয়ে গেল, সেকথা পত্রস্থ করার আগে একটা তথ্য কবুল করা ভালো যে, সেই শৈশব থেকেই কিভাবে যেন আমার একটা ধারণা জন্মেছিলো ----- লেখালেখিই আমার ভবিতব্য। নইলে অধুনা উত্তর ২৪ পরগনার এক অজ গাঁয়ে ------ যেখানে সাহিত্যের দন্ত্য স সম্পর্কেও কোনও বাসিন্দার ধারণা ছিলো না, সেই পরিবেশে ক্লাস টু-এ পড়া একটি বালক কেনই বা তার নোট বইতে লিখে যাবে একটার পর একটা ছড়া!

জীবনের অনেকগুলো বছর পার হয়ে এখন আশ্চর্য হই সেই বালকটির স্পর্ধার কথা ভেবে। বালকটি তখনই নিশ্চিত ছিলো সে বড়ো হয়ে কবি হবে, কিংবা লেখক। আজ এতো বছর পরে সেই ছোট্ট 'আমি'টার দিকে তাকালে এরকম কিছু দৃশ্য পর পর ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়।

রমানাথ রায়ের মুখোমুখি : প্রগতি মাইতি ও রাজেশ ধর

'কাপুরুষরা কখনো ভালো লেখক হতে পারে না।'



( সাহিত্যিক রমানাথ রায়ের জন্ম ১৯৪০ সালে, মধ্য কলকাতায়। পৈতৃক নিবাস যশোহর, বাংলাদেশ। " শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন" - এর অন্যতম পুরোধা। রাজ্য সরকারের বিদ্যাসাগর পুরস্কার লাভ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, আজকাল, বর্তমান - ইত্যাদি কাগজে লিখেছেন। কিন্তু তাঁর উত্থান লিটল ম্যাগাজিন থেকে। এখনও লিটল ম্যাগাজিনের সাথে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্যে ' জাদু বাস্তবতা'  নিয়ে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তারঁ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : প্রিয় গল্প, দু'ঘন্টার ভালোবাসা, শ্রেষ্ঠ গল্প, গল্প সমগ্র। উপন্যাস  : ছবির সঙ্গে দেখা, ভালোবাসা চাই, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, কাঁকন, অন্যায় করিনি, উপন্যাস সমগ্র ইত্যাদি।)


পারক : শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন এর কি উদ্দেশ্য ছিল?

বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর মানিক প্রমুখ ও লেখকদের হাতে তথাকথিত বাস্তববাদী সাহিত্যের যে ধারা তৈরি হয়েছিল তাকে বর্জন করাই ছিল শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্যের উদ্দেশ্য। আমরা চেয়েছিলাম বাস্তবের সঙ্গে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে নতুন সাহিত্য রচনা করতে।

পারক : এই আন্দোলনকে সফল হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়?

 আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ না হলেও অনেকটাই সফল হয়েছে। কারণ এখন অনেকেই তথাকথিত বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারা থেকে সরে এসেছেন, তাদের লেখায় ফ্যান্টাসি আসছে।

পারক : ওই সময় এই আন্দোলনে কে কে ছিলেন?

এই আন্দোলনে প্রথমে আমি ছাড়া ছিলেন শেখর বসু, আশীষ ঘোষ, সুব্রত সেনগুপ্ত, কল্যান সেন। পরবর্তীকালে এসেছেন অমল চন্দ্র, বলরাম বসাক এবং সুনীল জানা।

পারক : আপনি প্লটে বিশ্বাস করেন না কেন?

 প্লট সব সময় কার্যকারণে গঠিত হয়। সেখানে প্রতিটি কাজের পিছনে কারণ থাকে। কারণ ছাড়া কার্য হয়না। বিজ্ঞানের এই নিয়মকে আমরা মানতে চায়নি। আমরা দেখেছি অনেক কার্যের কারণ সব সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হাইজেনবার্গের 'অনিশ্চয়তার তত্ত্ব' তো সেই কথাই বলে। তাছাড়া আমাদের জীবনে এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যার কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই কারণেই আমরা প্লট নির্ভর গল্প বর্জন করে ছিলাম।

পারক : আপনার গল্প উপন্যাসে দেখা গেছে আপাত অ্যাবসার্ড  চরিত্র এসেছে। এর পিছনে উদ্দেশ্য কি?

 পুরনো যুগের বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারায় আধুনিক যুগের সমস্যা বা চরিত্রদের প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই অ্যাবসার্ড সাহিত্যের রচনারীতিকে গ্রহণ করা হয়েছে। এটাও একটা রচনাশৈলী। বর্তমান যুগকে প্রকাশ করতে হলে এই রচনারীতি আমার কাছে জরুরী বলে মনে হয়েছে। এই রকমই জরুরি মনে হয়েছিল ত্রৈলোক্যনাথ, সুকুমার রায় বা রাজ শেখর বসুর কাছে। আমাদের পৌরাণিক গল্পে বা মঙ্গলকাব্যের আমরা এই রচনারীতি দেখেছি, এই রচনারীতি আমরা কথাসরিৎসাগর বা আরব্য রজনীতেও দেখেছি। আমরা আমাদের এই মহান ঐতিহ্য থেকে সরে এসে পাশ্চাত্যের বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারায় গল্প উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে নিম্নমানের একঘেয়ে রচনা রীতিতে আটকে গেছি।

পারক : আপনার প্রায় সব গল্প উপন্যাসে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শ্লেষ আছে এর কারণ কি?

সমাজ ও চরিত্রদের অসঙ্গতিকে ফুটিয়ে তোলা এর উদ্দেশ্য। চিরকালীন মূল্যবোধে যা স্বাভাবিক বলে মনে হয় তা যখন আর স্বাভাবিক থাকে না, হয়ে ওঠে অসঙ্গতিতে ভরা, তখনই তা কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শ্লেষের প্রয়োজন হয় তখনই। আমার সব লেখায় যে ব্যঙ্গ বা কৌতুক আছে তা বলা যায় না, তবে অনেক লেখাতেই এসব আছে। আমার কি তাহলে দুটো মুখ? এক মুখে হাসি আর এক মুখে বেদনা! জানিনা, আমার পাঠকরাই এর সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।

পারক : আপনি কি মনে করেন কথা সাহিত্যে হাস্যরস অনিবার্য?

সাহিত্যে কোন কিছু অনিবার্য নয়। প্রত্যেক লেখকেই তার মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নিজস্ব রচনারীতি নির্মাণ করেন। সেখানে হাস্যরস থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তবে তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি বা সরসতা গল্প বা উপন্যাসকে অনেকখানি সুপাঠ্য করে তোলে। তাই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের লেখা আমাদের আজও আকর্ষণ করে, আর সরলতার অভাবে তারাশঙ্কর, বা মানিক আমাদের আকর্ষণ করে না। পাশ্চাত্য সাহিত্যেও বর্তমানে হাস্যরসকে আশ্রয় করা হচ্ছে। তাদের রচনায় কৌতুক রসের প্রাবল্য দেখা যায় কাফকা, বোর্হেস, মার্কেজ, ক্যালভিনো, কুন্দেরা প্রমূখ লেখকদের রচনা তার প্রমাণ।

পারক : আপনার উত্তরণ লিটিল ম্যাগাজিন থেকে। ষাট সত্তরের দশকের লিটিল ম্যাগাজিনের সঙ্গে এই সময়ের লিটল ম্যাগাজিনের কোনো পার্থক্য দেখতে পান?

 ছয়-সাতের দশকের লিটিল ম্যাগাজিনগুলো অর্থাভাবে ভুগত, তাই সেই সময় লিটিল ম্যাগাজিনগুলো ছিল ক্ষীণকায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হত না। তা না হলেও সেই সব ম্যাগাজিনে ছিল স্পর্ধা, অহংকার ও যৌবনের দীপ্তি। নতুন চিন্তা ভাবনার নিয়মিত প্রকাশ হত সেখানে। এক কথায় সেখানে থাকত একটা বেপরোয়া ভাব। কিন্তু এখনকার লিটিল ম্যাগাজিন ক্রমশই যেন রক্ষণশীল হয়ে উঠছে। গল্প উপন্যাস বা কবিতায় বিদ্রোহী মনের পরিচয় সেভাবে থাকছে না। সবাই যেন এখন একটা স্থিতাবস্থা চাইছে, অথচ এখন লিটিল ম্যাগাজিনগুলো বেশ স্থূলকায়। দেখে মনে হয় এদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো, কিন্তু সর্বত্র চিন্তার দৈন্যতা কেন? কেন গতানুগতিক? অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা নগন্য।

পারক : এই প্রজন্মের গল্পকারদের গল্প কি আপনি পড়েন? পড়লে কেমন লাগে?

 পড়ি। এই প্রজন্মের গল্পকারদের গল্প নিয়মিত পড়ি। ভাল লাগলে  লেখককে জানাতে ভুলি না।

পারক : এই প্রজন্মের গল্পকারদের বিশেষ কিছু কি বলবার আছে?

 না, বিশেষ কিছু বলার নেই। আমি চাই সবাই নিজের নিজের মত করে লিখুন। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করুন। শুধু একটাই অনুরোধ, গতানুগতিক লেখা লিখবেন না।

পারক : সাহিত্যিকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে কি?

মানুষ মাত্রই দায়বদ্ধ হয়ে বেঁচে আছে। সে দেশের কাছে দায়বদ্ধ, পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ, পাড়ার কাছে দায়বদ্ধ, রাজনৈতিক দলের কাছে দায়বদ্ধ, বন্ধুদের কাছে দায়বদ্ধ, সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। তার দায়বদ্ধতা শেষ নেই। এত দায়বদ্ধতার কারণে সে হাঁপিয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। তাই সে এইসব দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। লেখক কোন অসাধারণ মানুষ নয়। সেও একজন সাধারন মানুষ। তার আছে এইসব দায়বদ্ধতা। এছাড়াও তার আছে সম্পাদকের কাছে দায়বদ্ধতা। এত দায়বদ্ধতা নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হয়। এ খুব কষ্টের, খুব যন্ত্রণার। তবে সবার উপরে শিল্পের কাছে তার দায় বদ্ধতা। নিজের সময় ও সমাজের কথা লিখলেও যদি তা শিল্প না হয়ে ওঠে তাহলে তার কোন মূল্য নেই। লেখক অবশ্যই তার সময় ও সমাজের কথা বলবে, তবে তা যেন প্রচারধর্মী না হয়, বক্তব্যধর্মী না হয়। সময় ও সমাজ হচ্ছে মাটির মতো, যার বুকে শিকড় চালিয়ে যেমন ফুল গাছের জন্ম হয়, তেমনি জন্ম হয় শিল্প-সাহিত্যের এখানে দায়বদ্ধতার কোন ব্যাপার নেই।

পারক : জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ আপনার সাহিত্যে নজর কাড়ে। এখন আর কোন কোন কথাকার জাদুবাস্তবতার গল্প লেখেন? আপনি কি মনে করেন গল্পে জাদুবাস্তবতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে?

 ল্যাটিন আমেরিকার লেখকদের মতো সেই অর্থে আমার গল্পে জাদুবাস্তবতা নেই। যা আছে আমার গল্পে তা হল অ্যাবসার্ডিটি। মঙ্গল কাব্যের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু সুকুমার রায়, ত্রৈলোক্যনাথে অ্যাবসার্ডিটি কি নেই? আমি ছোটবেলায় সুকুমার রায়ের লেখা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের 'মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত', একে তুমি কি বলবে! সুতরাং বাংলা সাহিত্যে এটা ছিল এবং আছে। এই সময় অনেকে অ্যাবসার্ড গল্প লিখেন কেন? তোমার অনেক গল্পেও (প্রগতি মাইতি) আমি অ্যাবসার্ডিটি খ্ব্বুঁজে পেয়েছি। সায়ন্তনী ভট্টাচার্য্য এ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আরো অনেকে লিখছেন অর্থাৎ আগের মত এই প্রজন্মে অনেকেই তাদের গল্পে অ্যাবসার্ডিটি আনছে। অ্যাবসার্ডিটি যদি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ না করতে পারে তাহলে সুকুমার রায়ের লেখাগুলো ব্যর্থ বলা যাবে কি!

পারক : আগামীতে বাংলা সাহিত্যে কোনো বাঁক বদল হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। কখন কোন প্রতিভার উন্মেষ হবে তা বলা মুশকিল। তবে সাহিত্য তো স্থবির কিছু নয়, তা গতিশীল। বাংলা সাহিত্যে নানা সময়ে নানা পরিবর্তন হয়েছে এবং কিছু বাঁক বদল হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে হবে না তা বলা যায় না, বরং তা হতেই পারে। যদিও এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্য কেমন যেন গর্তের মধ্যে পড়ে পাক খাচ্ছে। এখান থেকে সাহিত্যকে তুলে আনতে হবে, গতিশীল করতে হবে।

পারক : শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য। বেকারি বেড়েই চলেছে। জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া। মধ্যবিত্ত ও গরীব মানুষ দিশাহারা অথচ তেমন কোনো প্রতিবাদ আন্দোলন নেই। একজন প্রবীণ কথাকার হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

 শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য দেখা যাচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। এ অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মর্যাদা হারিয়ে ফেলছে। এরকম চলতে থাকলে একদিন শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে। শিক্ষার সাথে সাথে স্বাস্থ্য! সেখানেও আমরা পিছিয়ে পড়ছি। কলকারখানা তেমন করে হচ্ছে না, ফলে বেকারি তো বাড়বেই। শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান করতে হবে, আর এখানেই চূড়ান্ত সংকট। ব্যাপক কর্মসংস্থানের কথা কেউই ভাবছেন না। সবদিক থেকে একটা অদ্ভুত সংকট এসে উপস্থিত অথচ বিরোধী শক্তির তেমন কোনো আন্দোলন চোখে পড়ছে না। শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকাটাও একটা সমস্যা বলে মনে করি। লেখক কবিদেরও সাহসী হতে হবে, কলম ধরতে হবে। কাপুরুষরা কখনো ভালো লেখক হতে পারে না।




পুরুষোত্তম সিংহ - শওকত আলীর গল্প : মানবতার এক অন্য নামান্তর

পুরুষোত্তম সিংহ
শওকত আলীর গল্প : মানবতার এক অন্য নামান্তর


দেবেশ রায় ‘উপন্যাস নিয়ে ‘ গ্রন্থে লিখেছিলেন –“দুনিয়ার খবর রাখতে গিয়ে নিজেদের খবর আমাদের বড় একটা রাখা হয় না, নিজেদের লেখা ভাল করে পড়াও হয় না, নিজেদের লেখা ভাল করে বুঝে নেয়ার জন্যে নতুন নতুন দিক থেকে চিন্তার সময় সুযোগও ঘটে না।“ (দে’জ, পৃ. ৪২ ) সত্যি আমরা আমাদের শিকড় সন্ধান বুঝি ভুলে যাচ্ছি। শওকত আলী (১৯৩৬) আমার জেলার মানুষ (রায়গঞ্জ )। আমরা ভুলেছিলাম সে সত্য। তিনি নিজেই জানিয়েছেন রায়গঞ্জের করেনেশন স্কুলে পড়েছিলেম। দেশভাগের আগে ওপার বাংলায় চলে যান। শওকত আলীর কাছ থেকে আমরা বেশ কিছু গল্পগ্রন্থ পেয়েছি। ‘উন্মুল বাসনা’ (১৯৬৮ ) দিয়ে সে যাত্রা শুরু, পাশাপাশি রয়েছে ‘লেলিহান স্বাদ’ (১৯৭৮ ) ‘শুন হে লখিন্দর’ (১৯৮৮ )। গল্প উপন্যাসে তিনি কী লিখতে চান ? নিজে দেখেছেন দুই শ্রেণির মানুষের যাওয়া আসার চিত্র। এপারের মুসলিমরা উদ্বাস্তু হয়ে ওপারে গিয়ে নতুন বাসস্থান খুঁজছে, ওপারের হিন্দুরা সর্বস্ব হারিয়ে শুধুমাত্র স্মৃতিকে সঙ্গী করে পাড়ি দিচ্ছে নতুন দেশে। এই সর্বস্ব হারা উদ্বাস্তু মানুষগুলির যন্ত্রণা, প্রেম, বেদনা, হাহাকারই তিনি লিপিবদ্ধ করতে চাইলেন। তবে এই ধ্বংস লীলার মধ্যেও যে বেঁচে থাকার ফুল ফুটে উঠতে পারে তা তিনি দেখাতে চেয়েছেন। জীবনের নঞর্থক দিকগুলি ভুলে গিয়ে জীবনসমুদ্র মন্থন করে অমৃত পান করতে চেয়েছেন তিনি গল্পে –
“তবে আমার উপলব্ধি এই রকম যে মিথ্যাচার, লোভ, দমন পীড়ন, জিঘাংসা হত্যা –তেই জীবনধারার অবসান হয় না। সমস্ত রকম ধ্বংস ও বিপর্যয়ের পরও জীবনের ধারা অনবরত বয়ে চলে এবং সৃজনশীলতার ফুল ফোটায়। জীবনের কথাই যদি সাহিত্যের কথা হয়, তাহলে পাশবিকতা ধ্বংস ও বিপর্যয় যেমন বাস্তবতা ও সাহিত্যের বিষয়, তেমনি ঐ সবের পাশাপাশি ফুল ফোটানোর বাস্তবতাও সাহিত্যের বিষয়।“ ( ভূমিকা, গল্প সমগ্র, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৬, অরিত্র, ঢাকা ১১০০, পৃ. ৩ )
 এই বোধ থেকেই তিনি গল্প লিখে বসেন। রবীন্দ্রনাথ, তারশঙ্কর, ওয়ালীউল্লাহের গল্পের যে করুণা তা লেখককে আকর্ষণ করেছিল। সেই করুণা থেকেই তিনি গল্পে মানবিকতার ওপর জড় দেন। নিজেই জানিয়েছেন –“ মানবিকতা বোধকে জাগ্রত না করলে কোনো গল্পকে সাহিত্যকর্ম বলতে আমার বাধে’ ‘ (তদেব, পৃ. ৪ )। তবে সে প্রকরণ ভিন্ন। ক্রোধ, প্রতিরোধ, আবেগ, ঘৃণা, লাঞ্ছনা, হত্যার দৃশ্য ঘটিয়েও তিনি চরিত্রকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেতে চান। চরিত্রের আত্মসমীক্ষণে চরিত্রকে বিবেকবোধের আলোয় উজ্জ্বলিত করেন। আমরা শুধু শওকত আলীর মুসলিম জনজীবন নিয়ে লেখা গল্পগুলির দিকে নজর দেব।

‘জানোয়ার’ গল্পে পশুর ধর্মের সঙ্গে মানুষের ধর্মকে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক। আসলে মানুষও কখনও কখনও পশুর পর্যায়ে নেমে যায়, সেই বোধেই লেখক আমাদের নিয়ে যান। শওকত আলী গল্পে সবসময় মানবতাবোধের ওপর জোড় দেন। ঘটনাকে সামনে রেখে তিনি মানুষের চেতনাকে জাগিয়ে তোলেন। মানবসভ্যতা আজ ভয়ংকর সংশয় ও প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে তিনি মানুষকে জীবনচেতনায় দীক্ষিত করতে চান। এ গল্প যেন চরিত্র চিত্রশালা। অনেকগুলি চরিত্রকে সামনে রেখে একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে লেখক তাঁর গন্তব্য পথে এগিয়ে গেছেন। সেলিম সাহেবকে হাতে রেখে জমীর চৌধুরী সব কাজ হাসিল করে নিতে চায়। তেমনি সেলিম হাসেবকে নিয়ে গেছে দরিদ্র বিন্দাবন হাড়ির বাড়িতে। বিন্দাবনের বাড়িতে আছে  কলাবতী ও মনোহরের বউ। এই দুই নারীর প্রতি সেলিমের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে সব কাজ গুটিয়ে নেওয়াই লক্ষ জমীর চৌধুরীর। তেমনি বিন্দাবন দরিদ্র বলে সেও নারী মাংসকে সামনে রেখে কিছু অর্থের সুবিধা করতে চেয়েছে। তবে এসব ধরা পড়ে যায় রহমত বুড়ার চোখে। সেলিম সাহেবের ইচ্ছা বাঘ শিকার করবে। টোপ হিসাবে কখনও ছাগল, কখনও কুকুর নেওয়া হয়েছে। বাঘ শিকার যে আদৌও হবে না তা আমরা জানি। শিকারকে বাঁচিয়ে রাখতে টোপ হিসাবে যেমন ছাগল, কুকুর ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি সাহেবের টোপ দুই নারী। জানোয়ার শুধু পশু নয় মানুষের বিবেক বোধও যেন আজ জানোয়ার হয়ে গেছে। তবে যুগে যুগে চেতনা জাগরণকারী মানুষ ছিল, থাকবে, তবে সংখ্যায় হয়ত তা নগণ্য। এ গল্পে আছে রহমত বুড়া। সে সত্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু এই সংশয়ের বিশ্বে মানুষ তো সত্যকে চাপা দিয়ে মিথ্যাকে আশ্রয় করেই বাঁচতে চায়। আর গরিব মানুষের কাছে বিবেক বোধের মূল্য কতখানি ? দরিদ্র মানুষের পক্ষে মূল্যবোধ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই বিন্দাবনরাও সে মূল্যবোধ বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি। তবে রহমতের চেতনা জেগে আছে। সেই ধ্রুব সত্যেই লেখক আমাদের নিয়ে যান।

মানুষের চেতনা সর্বদা ঠিক থাকে না বা থাকা সম্ভবও নয়। নিরীহ শান্ত ভদ্র মানুষটিও কখন যেন রাগান্বিত হয়ে ওঠে। বিশেষ পরিস্তিতি, খণ্ড মুহূর্তই যেন মানুষকে নিয়ে যায় এক বিশেষ স্তরে। সেই খণ্ড মুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য চরিত্রকে হয়ত দায়ী করা যায় না কিন্তু মানুষের দৃষ্টিতে সে অপরাধী। একটি মানুষ খুনি –এই সত্য মানুষ বহন করে চলে কিন্তু কেন খুন করল তা বহন করে চলে না। তেমনই একটি গল্প হল ‘ফেরতা’।গুলশান ও জয়নালকে নিয়ে এ গল্প গড়ে উঠেছে। দাঙ্গার সময় অনাথ এক মেয়ে শাহজাদীকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল শুলশানের পিতা হায়দর আলি। পিতার মৃত্যুতে দরিদ্র সংসার চালাতে গুলশানকেই পথে নামতে হয়। অর্থ রোজগারের আশায় সে বর্ডার থেকে মাল পারাপার করে। নিজের ভাইয়ের সঙ্গে শাহজাদীকেও সমান ভালোবাসতো গুলশান। এই শাহজাদী একদিন পালিয়ে যায় বেলায়ত চৌধুরীর সঙ্গে। যা মেনে নিতে পারেনি গুলশান। সে আজ বেরিয়েছে শাহজাদী ও বেলায়েত চৌধুরীর খোঁজে। জয়নাল জানে ওস্তাদের রাগের কথা। সে বরাবার সবধান করেছে কিন্তু গুলশান শোনেনি। ফলে জয়নাল নিজেই গিয়েছে গুলশানের সঙ্গে। যে গুলশান বেলায়তকে অপদস্ত করতে বাড়ি থেকে এসেছিল সেই গুলশান শাহজাদীর কথা শুনে আজ কিছু করতে পারেনি। তবে বেলায়ত আজ নানাভাবে গুলশানকে বিরক্ত করেছে। তবে শাহজাদীর কথা ভেবে গুলশান সমস্ত সহ্য করে গেছে। বেলায়েতের বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরা যাক –
“যা যা ! বিরক্ত হয়ে যেন মাছি তাড়ালো বেলায়েত চৌধুরী। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রুপের বিষ ঢেলে ঢেলে বলতে লাগলো, যে নফর হবার যুগ্যি নয়, তাকে অমন একটা শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করতে যাবে। তোর ওস্তাদের আশা কত ! সেই মেয়েকে আমি উদ্ধার করেছি, বিয়ে করেছি। এখন ভয় করতে যাবো ঐ হাআরামজাদাকে, দু পয়সার মুরোদ নেই যায় !  আসুক না  আমার সমানে , দেখি তার কত সাহস !” ( তদেব, পৃ. ১০৩ )
গুলশানও রাগ প্রকাশ করে কখনও বলেছে -
“গুলশান দু’পা এগিয়ে গেল। বললো, বললাম তো চুপ কর। যেন চাপা গলার বিড়বিড় করছে লোকটা। অস্পষ্ট বললো, চুপ করে যা, আমি তোকে খুন করতে চাই না। চুপ করে যা, তোর শাহজাদীর কথা ভেবে চুপ করে যা। চুপ কর তুই, নইলে জান নিয়ে নেবো।“ (তদেব, পৃ. ১০৪ )
তবে গুলশান নিজেকে সামলে রেখেছে। কিন্তু একটি মানুষের ধর্যের বাঁধ আর কতক্ষণ থাকে ? শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখতে পারেনি গুলশানও । শেষ পর্যন্ত ক্রোধের কাছে পরাজিত হয়ে খুন করে ফেলে বেলায়েতকে। মানুষ চরিত্রকে সবসময় ধরে রাখতে পারে না। গুলশানও পারেনি। তবে এই খুনের জন্য তাঁর অনুশোচনা আছে। ফেরার সময় গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। এক অপরাধপ্রবণ মন নিয়েই সে ফিরে চলেছে বাড়িতে। এ যাত্রা সুখের বা আনন্দের নয়। নিজের সমস্ত ক্রোধকে দমন করা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। লেখক শওকত আলীও গল্পের স্বাভাবিক পরিণতির দিকেই নজর দিয়েছেন।

এক অদ্ভুত নারী নূরবানুকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘রাস্তার দৃশ্য’ গল্পটি। নূরবানুকে সামনে রেখে লেখক সরকারি অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ দমনে সরকারের ব্যবস্থা, সরকারের প্রকৃত অবস্থা কেমন ও সাধারণ মানুষ সরকারকে কোন চোখে দেখেছে তা তুলে ধরেছেন। স্টেশনে মারা যায় নূরবানুর স্বামী সদরালি। স্বামীর মৃত্যুতে তাঁর সব বোধ দিশেহারা হয়ে যায়। নূরবানুকে কেন্দ্র করে স্টেশনে সরকারি লোক সহ সাধারণ মানুষের কোলাহল নিয়েই এ গল্প গড়ে উঠেছে। কেউ নুরবানুর দুঃখ বোঝেনি। সকলেই দায়িত্ব সামলাতে চেয়েছে, কেউ সহানুভূতি বা করুণা প্রকাশ করেছে। তবে লেখক নূরবানুকে বড় কঠিন করে গড়ে তুলেছেন। স্বামীর মৃত্য উর পর সে একটি কথাও বলেনি। এমনকি নিজের কন্যা ফুলবানু কোথায় চলে গেল সেদিকেও নজর নেই। এই নূরবানুকে কেন্দ্র করে স্টেশনে রীতিমত নাটকীয় অবস্থা শুরু হয়েছে। পুলিশ এসেছে জিজ্ঞাসাবদের জন্য কীভাবে মারা গেল স্বামী, তবে নূরবানু মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ হয়নি। স্টেশনের জনগন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দেওয়া খাদ্যের প্রলোভন, সাধারণ মানুষের দেওয়া খাদ্য ও টাকা সে কিছুই গ্রহণ করেনি, শুধু মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। এমনকি এক ব্যক্তি টাকা ভিক্ষা দিতে চাইলেও সে নেয় না অথচ ভিক্ষারিদের কোলাহলে সে পদপৃষ্ট হয়েছে –
“নূরবানু  ধাক্কা খেয়ে পেছনে ছিটকে যায়। সেখান থেকে কে যেন আবার তাকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয় তাকে। কার পায়ের চাপে ভিক্ষের থালাটা মচ মচ শব্দ করে দুমড়ে যায়। কে একজন তার পায়ের ওপর ভর দিয়ে চলে যায়। কারো পা তার পেটের ওপর পড়ে, কেউ পিষে দেয় তার নাকমুখ।

এবং কিছুক্ষণ পর ভিড়টা সরে গেলে নূরবানু চৌরাস্তার মোড়ে কাত হয়ে পড়ে থাকে। তার দেহটিও, তখন ঐ দিনের বেলা, দুপুরের রোদে অদ্ভুত একটি দৃশ্য হয়ে ওঠে। কেননা আল্লাহর দুনিয়ায় তখন সূর্য একেবারে মাথার উপরে।“ (তদেব, পৃ. ১৩৬ )
স্বামীর মৃত্যুতে নুরবানুর সমস্ত চেতনা লোপ পেয়েছে। অথচ নূরবানু দুঃখ কেউ বোঝেনি। আজ ব্যস্ত সময়ের কাছে মানুষের প্রয়োজনই হয়ত বড় হয়ে উঠেছে। অপরের দুঃখে আমরা  হয়ত কিছু অর্থ বা সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারি আর কিছু নয়। লেখক আত্মবিধ্বংসী সময়ের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন। যে সময় নিজেই আমাদের মুখে চাবুক মারে। শওকত আলীর গল্প যেন আত্মদর্শনের প্রতিচ্ছবি। সে দর্শনে পাঠক মগ্ন হয়ে নিজেই বিবেকবোধের জাগরণে জাগরিত হয়।

মুসলিম জীবনের প্রেম রোমান্সকে কেন্দ্র করে এক রোমান্টিক গল্প হল ‘সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ’। প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার যেমন আছে, তেমনি আছে ভালোবাসা ও প্রেমের অধিকার। সে অধিকার বয়স, শরীর মনের কোন ব্যবধান নেই। আসলে জীবনে বেঁচে থাকাটাই প্রধান কথা। শওকত আলীর গল্পে যৌনতার প্রাধান্য তেমন দেখা যায় না। তিনি বিভিন্ন দিক থেকে জীবনের ওপর আলো ফেলতে চান। ফলে এক সহজাত সহজ সরল প্রবণতা তাঁর গল্পে লক্ষ করা যায়। এ গল্প সিরাজ ও সাহানাকে নিয়ে এক প্রেমের গল্প। দুজনেরই বয়স অতিক্রান্ত। তবুও তাঁরা মিলিত হয়েছে জীবনের দাবি নিয়ে। এই সাক্ষাতে বা মিলনে যৌনতার কোন  ইঙ্গিত নেই। আসলে জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে তাঁরা মিলিত হতে চেয়েছে। সিরাজ স্ত্রীকে হারিয়েছে, সাহানাও স্বামীকে হারিয়েছে। সিরাজের ছেলে আছে, সাহানারও মেয়ে আছে। তবুও তাঁরা ছিল নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত , বিষন্ন। সিরাজের নানা বন্ধু, আত্মীয় ছিল কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যুর পর কাউকেই উপযুক্ত সঙ্গী বলে মনে হয়নি। তাই নিজের নিঃসঙ্গতা কাটাতে সে বন্ধুর জন্য আবেদন জানিয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। ফলে বন্ধু হয়েছে সাহানা। এতদিন পত্রালাপে কথাবার্তা চললেও আজ তাঁরা দেখা করেছে। যদিও সাহানার আসতে অনেক দেরি বলে সিরাজ বাড়ি চলে যেতে চেয়েছিল। তবুও শেষ পর্যন্ত দেখা হয়েছে। মুখোমুখি বসে দুজনে নিজেদের প্রেম-প্রেমহীনতা, সংসার, একাকিত্ব নিয়ে নানা গল্পে মেতে উঠেছে। সিরাজ যৌনতার ইঙ্গিত দিলেও সাহানা তা প্রত্যাক্ষান করেছে। আসলে সমস্ত কিছু জীবনে বয়ে নিয়েও যে বাঁচতে হয়, সেই বাঁচার দাবি নিয়েই তাঁরা এগিয়ে এসেছে –“সিরাজকেও চুপচাপ থাকতে হলো। জীবনের এই একটা জায়গা সর্বক্ষণ থাকবে –শোকের জায়গা, নিঃস্ব হওয়ার জায়গা –যাই বলা যাক, এটা চিরকাল থেকে যাবে। কারণ এটা তো অস্তিত্বেরই একটা অংশ। এ জায়গাটুকু বাদ দিলে নিজেকেই বাদ দিয়ে দিতে হয়।“ (তদেব, পৃ. ১৪৮ ) সমস্ত না থাকার মধ্যেও তাঁরা বাঁচতে চেয়েছে। জীবনের দাবি নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছে, আর সেই স্বপ্নেরই কারিগর লেখক শওকত আলী।

জীবনের পাশাপাশি আছে মৃত্যু, সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘অচেনা ঘাতক’ গল্প। শওকত আলী গল্পে বারবার মানবতার ওপর জোড় দিয়েছেন। ফলে তাঁর গল্পে মানুষই বড় হয়ে উঠেছে। এ মানুষ প্রবৃত্তি সর্বস্ব মানুষ নয়।  মানুষের যে বিবিধ অবস্থা, মনস্তাত্ত্বিকতা, একটি মানুষ কোন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে ঘাতক হয়ে ওঠে সে পরিস্তিতির ওপর জোড় দিয়েছেন ‘অচেনা ঘাতক’ গল্পে। এই আঘাতের জন্য তিনি চরিত্রকে দায়ী করেননি, দায়ী করেছেন পরিস্তিতিকে। মহাতাব ভাল গান গাইতো, সে ছিল দিলওয়ারের বন্ধু। এই মহাতাব একদিন হায়দারকে দেহাতী ভূত বলায় সে আঘাত করেছিল ফলে মারা যায় মহাতাব। এই ঘটনার সাক্ষী ছিল দিলওয়ার। দিলওয়ারের চোখে অপরাধী হায়দার। হায়দারের ও দিলওয়ার সংলাপ নিয়ে গল্প গড়ে উঠেছে। তাঁর অপরাধ, ঘটনা, অনুশোচনা সব মিলিয়ে গল্প এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে। কিন্তু আজ হায়দারের মনে হয়েছে দিলওয়ার মনে হয় তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে, তাই সে দিলওয়ারের কাছ থেকে পালাতে চেয়েছে। তখনই দিলওয়ারের আঘাতে মৃত্যুশয্যায় চলে যায় হায়দার। দিলওয়ার চোখে অপরাধী ছিল হায়দার, আজ সে নিজেই অপরাধী হয়ে যাচ্ছে। একটি মৃত্যুকে সামনে রেখে লেখক আরকটি মৃত্যু ঘটিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন মৃত্যুর জন্য হিংসা , রাগ ক্রোধ দায়ী নয়। দায়ী পরিস্তিতি। আসলে মানবমনের নানা জটিলতা, বহু রিপু, মনস্তাত্ত্বিকতা ও অবস্থা নিয়ে বর্তমান। আসলে মানুষ অবস্থার দাস। ফলে যেকোন মুহূর্তে চরিত্রের নৈতিক পতন ঘটতে পারে, তার জন্য চরিত্র কোনভাবেই দায়ী নয়।

এক চুরির ইতিবৃত্ত নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘অচেনা’ গল্পটি। তবে এ চুরি ধরা পড়েনি। তবে বিবেকবোধে আঘাত দিয়েছে। তবে চুরি ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আসলে মানুষকে বেঁচে থাকতে নানা উপায় অবলম্বন করতে হয়। আর দরিদ্র নিম্নবিত্ত জীবনে সে সংগ্রাম ভয়ংকর। দরিদ্র মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে। আর সেই টিকে থাকারই গল্প লিখেছেন শওকত আলী। কিসমত আলী অভারের তাড়নায় হারিয়েছে স্ত্রীকে। সামান্য খাদ্যের জন্য ভিটেমাটি বন্দক দিতে হয়েছে। ফলে মহাজন চৌধুরী বাড়িতে আজ সে চুরির পথ বেঁছে নিয়েছে। আগেও চুরি করেছে তবে তা সামান্য। কখনও শাবল, কখনও সামান্য সরষে। কিন্তু আজ অভাবই তাঁকে এ পথে নিয়ে গেছে। প্রথমে চুরি নিয়ে দ্বিধা থাকলেও আজ সব দ্বিধা কেটে গেছে। কিসমত আলী আজ এসেছে চৌধুরী বাড়িতে চুরি করতে। কিন্তু সহজেই তো কেউ ঘুমায় না, ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষে যখন সে ধান বস্তা ভর্তি করে চলে যাবে তখন ঘুম ভেঙে গেছে দাসী জয়গুনের। কিসমতও মতিচ্ছন্ন হয়ে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে না গিয়ে উঠোন দিয়েই গেছে। দৈবক্রমে আকাশের চাঁদ তখন মেঘে ঢেকে গেছে। কিসমতকে দেখেছে চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে ও জয়গুন। বড় ছেলে চিনতে না পারলেও জয়গুন বোধহয় চিনতে পেরেছিল। কিন্তু এই কিসমত ও তার অভাবী ছেলেদের জন্য জয়গুনের সহানুভূতি আমরা আগেই দেখেছি। বোধহয় সেজন্যেই সে কিছু বলেনি। লেখকের লক্ষ কিসমত চরিত্র। সামান্য ধানের জন্য গোটারাত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। সে মহাজনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা বিদ্রোহ করেনি, চুরির পথ বেঁছে নিয়েছে। এই চুরিতে অপরাধবোধ বা অনুশোচনা আছে তবে পরক্ষণেই মনে হয়েছে –“  ই বড় পাপ বাহে – তার কানের কাছে তখন মুহুর্মূহু বলে যেতে থাকে অচেনা –অজানা একটা স্বর – ই বড় পাপের কাম,  ই কাম ভালো নহে। কথাটা সে শুনতে পায় এবং মাথা নাড়ায় – না, পাপ নহে, পাপ কিসের ? পাপ ক্যানে হোবে ?” (তদেব, পৃ. ১৬৫ ) এই পাপবোধ লুপ্ত হয়ে যায় অভাববোধের কারণেই। দরিদ্র মানুষের প্রতি এক সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে শওকত আলী এইসব চরিত্র এঁকেছেন। ফলে চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবণতা খুব সহজেই ধরা পড়ে।

আকরাম ড্রাইভার ও কাশেম ড্রাইভারকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘কুলায় প্রত্যাশী’ গল্প। এ গল্প এক যাত্রাপথের গল্প। আকরাম ড্রাইভার চলেছে এক বোবা মেয়েকে নিয়ে। সেই যাত্রাপথের বিবরণ, আকরামের চেতনায় নানা ভাবনা, কাশেম সম্পর্কে নানা কথা, সেই বোবা মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসা, তার ওপর ভালোবাসা জন্মানো , আবার সেই মেয়ের পালিয়ে যাওয়া এবং তার খোঁজে আবার আকরামের বেরিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটি সুখপাঠ্য গল্প । জাহিদ ও মেজর আহসানকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘প্যাট্রিজ’ গল্প। মেজর আহসান জাহিদকে শুনিয়েছে পাখি শিকারের গল্প। শিকারের রহস্যময়তা, আনন্দ, উন্মত্ততা সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত শিকার হয়েছে নারী। নারীও যেন পুরুষের লালসার কাছে এক শিকারের বস্তু। আর সে শিকারের জন্য পুরুষের বক্র দৃষ্টি ক্রমাগত ধাবিত হয়।

‘জ্যোৎস্না রাতে দাও বন্দুকের খেলা’ গল্প গড়ে উঠেছে কিছু দরিদ্র মানুষের ডাকাতি কেন্দ্র করে। শওকত আলী ঘটা করে কখনই মুসলিম জীবনের ইতিবৃত্ত লিখতে বসেননি। তাঁর অভিজ্ঞতা মুসলিম জীবনকেন্দ্রিক বলে গল্পে মুসলিম জীবন এসেছে। আর সেদেশে সংখ্যা গুরু মুসলিম বলেই এমনটা হয়েছে। মুসলিম জীবনের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দুও এসেছে। আসলে তিনি মানুষের গল্প লিখতে চেয়েছেন, মানবতার মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন। ফলে তাঁর গল্পে মুসলিম জীবনকে পৃথক করে দেখার কোন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না। এ গল্পে হিন্দু মুসলিম কিছু চরিত্রকে সামনে রেখে তিনি দরিদ্র মানুষের বেদনা, আত্মযন্ত্রণার ভাষ্য রচনা করতে চেয়েছেন। আব্দুল, গোবিন্দ, মানু বিশ্বাস ও আইয়ুবালী এঁরা সবাই ডাকাতি করে। এঁদের মধ্যে আব্দুলের বন্দুক আছে বলে একটু বাড়তি খ্যাতি পায়। একদিন ডাকাতিতে গিয়েছে, আব্দুল না খেয়ে যাওয়ার জন্য প্রচন্ড ক্ষুধায় সে কাতর। ডাকাতিতে তাঁরা সফল হয়নি, ফলে বাড়ি ফেরার সময় হামলা করে শুকবর মিঞার বাড়ি। শুকবর মিঞা এমনিতেই গরিব সেখানে কী পাবে ডাকাতের দল ! কিন্তু আব্দুল এখানে ভাত খেতে চেয়েছে। পোহাতু পান্তা ভাত এনে দিয়েছে, জ্যন্ত মুরগি ধরেছে। এই ডাকাত দলের ইতিবৃত্ত দেখলে পাঠকের আপাত হাসি পাবে, কিন্তু উভয়ই যখন দরিদ্র তখন ডাকাতি তো এমনই হবে। আসলে দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম নেই, রীতি, নিয়ম, প্রথা নেই। তাই আব্দুলরা ক্ষুধার কাছে ভুলে গেছে যে তাঁরা ডাকাত। আইয়ুবালীরা ডাকাতিতে গিয়ে নারী ধর্ষণে যুক্ত থাকলেও আজ নূরবানুকে কিছু করেনি। গর্ভবতী নূরবানুকে গোবিন্দ আঘাত করতে গেলেও প্রতিরোধ করেছে আব্দুল। হয়ত নিজের স্বজাতি বলেই। সে ডাকাত কিন্তু গর্ভবতী মহিলাকে খুন করা তাঁদের ধর্ম নয় তা বুঝিয়ে দিয়েছে আব্দুল।

‘শিকার’ কয়েকটি মুসলিম যুবক যুবতীর রহস্য অভিযানের গল্প। শিকারে বেরিয়েছে মহিউদ্দিন, আহসান, শহর আলি, মাসুদরা। এক তরতাজা মন নিয়ে আনন্দের আমেজে ভোররাতে শিকারে চলেছে সবাই। বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দিকে লেখক নজর দেননি। শিকারকে সামনে রেখে তিনি মাসুদ ও নীলার অবৈধ প্রেমের দিকে নজর দিয়েছেন। মুসলিম জীবনে এই অবৈধ প্রেম আরও ভয়ংকর। তবে এ প্রেমের জন্য মাসুদ ও নীলার কোন ভয় বা সংকোচ নেই। কিন্তু অবৈধ প্রেমকে সমাজ সর্বদা দেখেছে ব্যঙ্গের চোখে। তাই এ প্রেম কথকের দৃষ্টিতে মনে হয়েছে অনৈতিক। তবে একটি প্রেমকে কেন্দ্র করে রমণী ও পুরুষ যদি মিলিত হয় সেখানে নৈতিকতা বা অনৈতিকতার কোন প্রসঙ্গ নেই, সরল দুটি হৃদয় মিলিত হয়েছে লেখকের দৃষ্টি সেদিকে। আর এই প্রেম সহজাত নয় লেখকের মতে পরিস্তিতির শিকার। তবে কথকের মনে হয়েছে –“অন্যের প্রেমিকা যে বউ , তার সঙ্গে যে স্বামী সংসার করে তার মতো মূর্খ কে আছে !” (তদেব, পৃ. ১৩৩ ) তবে মাসুদেরও স্ত্রী রয়েছে, নীলারও সংসার রয়েছে। তবুও তাঁরা মিলেছে, মিলনের আনন্দ উপভোগ করেছে। আর এই মিলনকে লেখক নিয়ে গেছেন শিকারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশে। যে সজীব মন নিয়ে ভোরে তাঁরা শিকারে গিয়েছিল বাড়ি ফিরেছে ক্লান্ত বিদ্ধস্ত হয়ে।

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে আজ পর্যন্ত কত গল্প লেখা হয়েছে আর লেখা হবে লক্ষ থেকে লক্ষাধিক কিন্তু মানুষের চেতনাকে আঘাত করতে না পারলে হয়ত সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। সমাজ সংশোধন বা সমাজের কল্যাণের জন্য লেখক কলম ধরবেন এমন কোন দাসখত রাষ্ট্রের কাছে দিয়ে বসেননি। তবে শৌখিন মজদুরি হবেন এও বুঝি কাম্য নয় ! কেননা আজ রাষ্ট্র,সময় , সমাজ , মানুষ এক ভয়ৎকর বিপদের সম্মুখীন। সেখান থেকে বাঁচার রসদ, সঠিক পথ, মানুষে মানুষে সৌভ্রাত্বের বন্ধন লেখককেই গড়ে তুলতে হবে। সেদিক থেকে শওকত আলীর গল্প আজ অবশ্যই পাঠ্য।

খোকন বর্মন - মধ্যরাতের ঘরবদল : সেলিনা হোসেন

খোকন বর্মন
মধ্যরাতের ঘরবদল : সেলিনা হোসেন


আকাশের সীমান্ত নেই।মেঘেদের কি কখনো দেশভাগ হয়? তবে ধরণীর সীমান্ত আছে ,মানুষের তৈরি সীমান্ত  সেই সীমান্তের অংশ ছিটমহল ।

আমরা হিন্দুরো শুয়োর নোয়াই আর মুসলিমেরও গরু নোয়াই আজকের মধরাতের  পর থেকে আর এই অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করবে না। কিছুক্ষন পর আমরা পাব নতুন সূর্য, একটা  নতুন ভোর সেই ভোরের আলো গায়ে মেখে  আমরা শামুকের মতো খোলস ছড়াব।এখন থেকে আমরা শক্ত পায়ে হাঁটব ,হামাগুড়ি দেওয়ার দিন ফুরিয়ে এসেছে ,আজ থেকে আমরা বন্দী মানুষ না মধ্যরাতের পর থেকে আমরা স্বাধীন আমরা স্বাধীন।
ছিটমহলের কথা শুনলেই আমাদের হৃদয়ের রংমহল যেন মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে আসে । এই মানবজীবন ,ধরলা নদী, প্রেমপ্রীতি ,গাঢ় স্মৃতিকে এক সূত্রে গেঁথে ছিটজীবনের সাতরং আঁকলেন  ওপর বাংলার গল্পকার সেলিনা হোসেন। ছিটবাসীদের গ্লানিময়জীবন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে তুলে ধরলেন "মধ্যরাতের ঘরবদল " এ।

ইউনিক একটি সমস্যাকে তুলে ধরলেন জীবনের কঠোর বাস্তবতায়। ছিটমহলবাসীদের আঁতের কথা তুলে আনলেন আমাদের সামনে। নাগরিকত্ব এবং নিখাদ প্রেমের মধ্যে স্বাধীনতা প্রাপ্তির স্বাদকে সামনে রেখে তিনি বের করে আনলেন  আঁতের কথা, সৃষ্টি করলেন একটি স্বতন্ত্র ধারার।সোলেমান মিয়া মনে করেন এতদিন বাদে সে মানুষ হল অন্যদিকে  অবনীশ জন্মভূমি  কিছুতেই ছাড়বে না  প্রয়োজনে প্রেম ছাড়বে
খুব সহজেই যেন তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে প্রথম প্রেমের স্মৃতি আঁকড়েই সে না হয় বেঁচে থাকবে ।প্রেমকে উপেক্ষা করে অবনীশের কাছে বড়ো হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়,দেশপরিচয়।

আশায় বাঁচে চাষা ।এতদিন পাটগ্রামের ভুয়ো ঠিকানা নিয়ে লেখাপড়া করেছে, এতদিন তার মনে ছিল প্রবল ভয়। সে এখানকার ডিগ্রি দিয়ে চাকরি করতে পারবে না কিন্তু আজ মধ্যরাতের পর থেকে সে ভয় আর তার মধ্যে থাকল না।এখন সে দেশ পাবে ,নাগরিকত্ব পাবে ,চাকরি পাবে, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে ।
সেমন্তী চায় না কেউ তাকে ছিটমহলের বাসিন্দা বলুক ,এখন সে দেশ পাবে ।এ আশায় যেন মিশে রয়েছে তার স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ। এসবের ঘোর কেটে গেলে সে আবার দুঃখে ডোবে।এভাবেই একটি প্রেম   মধ্যরাত্রে  অগ্রসর হতে থাকে মৃত্যুর দিকে।

সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তান দুটো দেশ তৈরি হয় কিন্তু ছিটবাসীরা কোনো দেশ পায় নি তখন থেকেই তাদের মনে দেশপ্রাপ্তির আকাঙ্খা  ।সেই দিন টিও ছিল শুক্রবার আর আজকের মধ্যরাত্রের স্বাধীনতার দিনটিও শুক্রবার  ,মাঝখানের আটষট্টি বছরের স্মৃতি রোমন্থন করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে হারাধন। তাদের জীবনের আর একটি শুক্রবার এবং মধ্যরাত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার আনন্দ মিলে মিশে এক হয়ে যায়,স্মৃতি তাদের কাঁদায়  ,আনন্দে চোখের জল বেরিয়ে আসে । ছিটবাসীদের তীব্র যন্ত্রণার কথা তিনি তুলে আনলেন।মেঘলা আকাশে যেন পূর্ণিমার আলোছায়া সৃষ্টি হয়। হারাধন এবং সোলেমান মিয়ার মধ্যে ।

ধরলাতে জল নেই,ঢেউ নেই ,এর পর আর ধরলা নদীকে দেখতে পাবে না সোহন বণিক।
ধরলা তাকে কত সুখ দিয়েছে দুঃখ দিয়েছে,কতবার তাকে কাঁদিয়েছে ,কতবার তাকে দিয়েছ সুখ  এসব  তার কাছে শুধুই স্মৃতি নয় ,ধরলা তাকে যেন বাঁচতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম । এই নদী তার ভিটেমাটি ভেঙেছে বহুবার ,সে গাছতলায়  থেকেছে। আবার ধরলার পাশে বসেই সে পেয়েছে আনন্দ ।ধরলা এখানে যেন একজন মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ। মধ্যরাতের পর থেকে সে আর ধরলা নদীকে দেখতে চাইলেও দেখতে পাবে না ,তার মন ভারী বিষণ্ণ ।মায়ের উপর রেগে গিয়ে আবার মায়ের কোলে মাথা ঠেকিয়েই যেন চিরসুখ। এবার সে কার কোলে মাথা ঠেকাবে?এভাবে পরিচয়হীন মানুষের কষ্ট দূর করেছে ধরলা।তার নেওয়ার মতো কিছু নেই এই ধরলার স্মৃতি ছাড়া।

একদিকে নিখাদ ভালোবাসার টান এবং অন্যদিকে জন্মভূমির টান ,সালমা ও মনোয়ারকে সামনে রেখে  তাদের মনস্তত্ত্বকে আবিষ্কার করলেন গল্পকার।অনেকেই জন্মভূমিকে ছাড়তে নারাজ ,যে জমির ধান খেয়ে বেঁচে আছে ,যে জমি বাঁচিয়ে রাখে তাকে কি ছেড়ে যাওয়া যায় । কোনো মুসলিম তো এই সুনীলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নি তবে কেন আমি এই জন্মভূমি ছাড়ব ।আমি  কি ভারতে যাওয়ার আবেদন করবে পারি?

যারা একবার ইন্ডিয়া যাওয়ার আবেদন করেছিল তারা ইচ্ছে করলেও বাংলাদেশে থাকতে পারবে না। ওপারে গিয়ে আদৌ ঘরবাড়ি মিলবে কি না সে বিষয়েও সন্দেহ থাকলে নাগরিকত্বের টানে অনেকে বুক বেঁধেছে আশায়। মনোয়ার তার স্ত্রী পুত্রকে পর্যন্ত ছাড়তে রাজি নাগরিকত্বের টানে,জন্মভূমির টানে অন্যদিকে সালমা তার জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়তে নারাজ তাই সে ঝগড়া করে তার দুই পুত্রকে নিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দিয়েছিল । কিন্তু শেষ অবধি তারা। ভালোবাসার টানের কাছে পরাভূত হল জন্মভূমির টান-
"  আমি এতকিছু বুঝতে পারি না ।আমি আমার তমাল তুষারকে বুকের মধ্যে চাই ।নইলে আমি কেমন বাবা -- ও চিৎকার করে কেঁদে উঠলে ওর চারপাশে দাঁড়ানো মানুষেরা চোখের পানি মোছে ।সোহান বণিক ওর মাথায় হাত রেখে বলে সালমা তোকে ছাড়া থাকতে পারবে না রে মনোয়ার ।ও তো জন্মভূমির টানে থাকতে চেয়েছে ।কিন্তু ওর তো ভালবাসার টান আছে।
এখানেই যেন অস্পষ্ট হয়ে আসে ছিটমহল ,  মনোয়ারের চোখে সালমার ছবি ছাড়া কিছুই ফুটে ওঠে না।তাদের মধ্যে আর কোনো কাঁটাতারের বন্ধন নেই ,রয়েছে শুধুই ভালোবাসার পারিবারিক বন্ধন।
গল্পকার এখানে ছিটমহল বাসীদের সুখ দুঃখে ভরা কিছু স্মৃতি এবং নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে আঁকলেন ছিটমহলবাসীদের শরীরেই আঁকলেন নতুন মানচিত্র।  একদিকে ভালোবাসা ও অন্যদিকে অধিকার , সব কিছুকে মিলিয়ে মিশিয়ে গল্পকার সৃষ্টি করলেন এক নতুন মানচিত্র যেখানে কোনো কাঁটাতার নেই, রয়েছে শুধুই ভালবাসা।

গল্পকার একদিকে একটি প্রেমকে বলি দিলেন অন্যদিকে প্রেমকে ঘিরেই গড়ে তুললেন এক গভীর মনস্তত্ত্বকে। যেখানে কাউকে তিনি দিলেন জন্মভূমির নাগরিকত্ব আবার কাউকে তিনি দিলেন ভালোবাসার নাগরিকত্ব। একদিকে ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া , প্রেমিকাকে ছেড়ে যাওয়া অন্যদিকে   আত্মপরিচয় পরিচয় পাওয়া ,নিজের দেশ পাওয়া ।গল্পকার এখানে যেন একটি প্রশ্ন চিহ্ন  দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। একদিকে সেমন্তীর ভালোবাসার বন্ধন কে ছিঁড়ে দিয়েছেন আবার অন্যদিকে জন্মভূমির টানে বাংলাদেশে থাকতে চাওয়া সালমা হেরে যায় মনোয়ারের নিখাদ প্রেমের সামনে। সব গ্লানি ভুলে সোহন বণিক বলে ওঠে-" ছিট মানচিত্র পেয়েছে এজন্য আমরা সবাই খুশি"।

এভাবে ছিটবাসীদের  আঁতের কথা বের করে আনলেন গল্পকার সেলিনা হোসেন ,তুলে আনলেন জীবনধারীনি ধরলার কথা, প্রেমের পরিণতির কথা।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির স্বাদের আড়ালে লুকোনো তীব্র যন্ত্রণাকে ও স্মৃতিগুলোকে জাগ্রত করে দিয়ে তিনি "মধ্যরাতের ঘরবদল " এর মাধ্যমে  ছড়িয়ে দিলেন বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আবার কারও মনে ছড়িয়ে দিলেন তীব্র বিষাদ। এভাবেই গল্পকার বের করে আনলেন ছিটবাসীদের আঁতের কথা। ছিটবাসীদের ইউনিক একটি সমস্যাকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ছিটবাসীদের পুরো শরীর জুড়েই সৃষ্টি করলেন মানচিত্র।


রণজিৎ শীল - ইলিয়াসের দুধে ভাতে উৎপাত : মানবতার প্রতীকী সংকট

রণজিৎ শীল
ইলিয়াসের দুধে ভাতে উৎপাত : মানবতার প্রতীকী সংকট 


আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) বাংলাদেশ তথা বাংলা সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক ।দেশভাগের কিছু পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের  সময়  তৈরি করা মন্বন্তর , কালোবাজারি , খাদ্য সংকটের মতো কালো মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে  জন্ম নেওয়া সাহিত্যিকের রচনার শিরা উপশিরায়  ঘুরে ফিরে বাংলাদেশের নানা সময়ের ঘটনা  ফল্গুধারার মতো বয়ে চলেছে একটু লক্ষ করলে বোঝা যায়  ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ৫৪ বছরের জীবনে মাত্র দুটি উপন্যাস  ও  ২২-২৩ টি গল্প রচনা করেছেন সত্য  ।সংখ্যার বিচারে নয় ভাবনার গভীরতায় , ভাষার দৃঢ়তায়, শৈলীগত নবনির্মাণে  ইলিয়াস এক বলিষ্ঠ লেখক এবিষয়ে সংশয় নেই। বাবা স্কুল হেডমাস্টার অর্থাৎ নিজে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও মধ্যবিত্ত জীবনচর্চার স্বাভাবিক পরিণতিতে তাঁর অবস্থান দৃঢ় ছিলনা ।তাই পরবর্তী জীবনে মধ্যবিত্তের  খোলস ছেড়ে বেরিয়ে ফিরে যান চাষি মজুরের জীবনে ।তাঁর এই সময়ের গল্প গুলিতে এই বীক্ষা ও চিন্তনের পরিবর্তন অন্যমাত্রা দান করেছে ।তাঁর  গল্পে দেখা যায়  আপসহীন  আক্রমণের ভঙ্গী যেমন স্বতন্ত্র  ,তেমনি  আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষা তীরের ফলার মতো  শানিত ,সজারু কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ ।তার গল্পের মুল  কাহিনী বাস্তবের কপি পেস্ট নয় বরং গল্পের চরিত্ররা অনেক বেশি  স্বপ্রতিভ।একজন সাহিত্যিকের সাথে কথোপকথনে  ইলিয়াস নিজেই বলেছিলেন যে- তার গল্পের চরিত্ররা আগের থেকে ভাবনার ফলশ্রুতি নয় বরং তার গল্পের চরিত্ররাই গল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ।আখতারুজ্জামান নিজে ওতপ্রোত ভাবে রাজনীতি করেননি সত্য কিন্তু রাজনৈতিক উত্থানপতন ,আন্দোলনের গতিপথ ,বিপ্লবের ভয়াল রুপ প্রত্যক্ষ করেছেন।ঢেউ লেগেছে তার অতল হৃদয়ে , তার হৃদয়কে আরথিন ছাড়া বিদ্যুৎ এর মতো ঝলসে দিয়েছে পূর্ব  পাকিস্থানের মুক্তি যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি কৃষক ,মজদুর ,সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার  কঠিন  লড়াই ।  অনুভব কয়েছেন এপার  বাংলার নকশাল আন্দোলনের তীব্রতা ।সাহিত্য ক্ষেত্রে ইলিয়াস মানিক বন্দোপাধ্যায়ের   উত্তরসূরী হলেও অনেক জায়গায় তিনি মানিকের পথ থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেছেন অটুট রেখেছেন আপন ঘরানা ।মানিক সাম্যবাদে বিশ্বাসী । তাঁর  বিশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে তাঁর  সাহিত্যে ।শ্রমিক শ্রেণি, মজদুর সমাজ হয়ে উঠেছে  তাঁর  রচনার নিয়ন্ত্রক ।কিন্তু সুকৌশলে ইলিয়াস সেই মোহ কাটিয়ে বাংলা সাহিত্যে  এক নব নির্মাণ করলেন মজদুর নয় অভিজাত নয় তাঁর গল্পের নায়ক সময়  ।গল্পের চরিত্ররা শ্রেণি ভিত্তিক  নিয়ন্ত্রক না হয়ে, হয়ে উঠল  সময় কেন্দ্রিক নায়ক ।কিন্তু সাম্যবাদের কথা সরাসরি না বললেও  অধিকারের কথা ,জীবনের প্রয়োজনীয়  প্রাপ্য আদায়ের অঙ্গীকার  ।তাঁর গল্পের পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন দেশভাগের যন্ত্রণা ,পাকিস্থান সরকারের পূর্ব পাকিস্থানের বাংলা ভাষী মানুষের প্রতি বৈষম্য মূলক  আচরণ,খাদ্য সংকট ,গ্রামের নিঃস্ব মানুষের হাহাকার ,তার গল্পের ধমনীতে নিত্য প্রবাহিত ।এর আগেই বলা হয়েছে ইলিয়াস নিজেই বলেছেন যে তার গল্পের চরিত্ররা আপন গৌরবেই মহীয়ান । যেখানে লেখকের আর কর্তৃত্ব চলেনা, চলেনা রিমোড কন্ট্রোল।তার-ই এক প্রতিভাস আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “দুধে ভাতে উতপাত”    নামক গল্পটি ।গল্পটি  রচিত হয়েছে ১৯৬৫-৭৮ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে ।অর্থাৎ দেশভাগ , পাকিস্থান ,স্বাধীন বাংলাদেশ হাতে পেয়েছে ততদিনে পূর্ব বঙ্গের সাধারণ মানুষ ।এই    গল্পের মূল প্লট অতি সাধারণ হলেও এর প্রতীকী আবদার অনেক গভীর ।হাশমত  মহুরি   পেশায়  ব্যবসায়ী  ।জয়নাবকে  সন্তানের বা সংসারের খাবার জোগারের জন্য ধারে চাল নিতে হয়।আধ্মন চালের দাম শোধ না করতে পারায় জরদস্তি জয়নাবের কালো  দুধেল গরু হাশমতের  বোন জামাই  হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায়  ।প্রতিবাদ করার প্রয়াস পর্যন্ত তখন সে পায় না ।মানসিক দ্বন্দ্ব  যন্ত্রণা  তার পাজরের হাড় ভেঙ্গে দিয়েছে । তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে ,সন্তান সন্ততির অতিসাধারণ প্রত্যাশা একটু খানি দুধ ও ভাত  না দিতে পারার   আক্ষেপ ।শেষে জয়নাব রোগ যন্ত্রণার বিষময় দেহ   নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বিছানায় ।জয়নাবের ও   তার সন্তানের দুধভাত খাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ শুধু তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা  বললে ভুল হবে ।সেদিনের তামাম পূর্ব পাকিস্থানের সাধারণ মানুষের অন্তরের আর্তি –ই নয় রীতি মতো ক্ষোভ ভাবলে অত্যুক্তি হবেনা বলেই আমার মনে হয় ।যে আশা নিয়ে বাঙালি নতুন সূর্যের আলোতে অবগাহন করবে বলে আনন্দে আতখানা হয়ে পড়েছিল সে স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে ।জয়নাবের দুধ ভাত খাবার ও সন্তানদের খাওয়ানোর  আশার অন্তরালক্ষে  কোথায় যেন  ঘুরে দাঁড়াবার প্রয়াস ,অধিকার লাভের তীব্র বাসনা ,ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার রক্তিম মুখ ভেসে উঠেছে  পাঠকের কল্পনালোকে ।তাই তো জয়নাব বারবার ছেলেকে বলে ওঠে “ওইদুল্লা   বাবা আমার কালা গাইটা আনতে পারলি না? হাশমত  মউরির পোলায় দড়ি ধইরা টাইনা  লইয়া গেলো ।একটা বছর পার হইয়া গেলো একটা   দিন দুগা ভাত মাখাইতে পারলাম না ।“ মাতৃ হৃদয়ের এই যে হাহাকার এটা শুধু ব্যক্তি জয়নাবের নয় ।দেশভাগ  পরবর্তীপূর্ব বাংলার  বাঙালি জাতির মাতার  আর্তনাদ ছাড়া আরকী?।
                   
ইলিয়াস অতি সন্তর্পণে পাঠকের ভাবালুতাকে এড়িয়ে নিয়ে আবেগে মাতিয়ে দিতে  সক্ষম এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ।মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য,বস্ত্র বাসস্থানের মতো ন্যূনতম বিষয় যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে তখন আর মানুষের ধর্ম ,জাতি  লিঙ্গ , আপন -পর মাথায় থাকে না ।পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কল্পনায়  আপন সন্তান সন্ততি নিয়ে স্বপ্নের নীড় রচনা করে। , যখন সে তার সামান্য অংশটুকু হাতের কাছ থেকে দূরে চলে যায় তখন সে অসহায় বাইসনের   মতো হিংস্র  হয়ে ওঠে । যখন কালো  গরুটিকে  হারুন মৃথা  নিয়ে যেতে নেয় তখন জয়নাব হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে ছেলেকে  “বুইড়া মরদটা কী দ্যাহস ? গরু লইয়া যায়  খাড়াইয়া খাড়াইয়া কী দ্যাহস “ অর্থাৎ জয়নাব প্রতিবাদের বিষ শল্য নিক্ষেপ করেছেন সুকৌশলে এটা সচেতন পাঠকের বুঝতে  বিন্দুমাত্র  অসুবিধা   হয়না  ।  এ যেন নিজের প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার  ,নিজের অধিকার আদায়ের এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ,পৃথিবীতে বাঁচার সংগ্রামের  এক প্রতীকী ডাক । অবহেলিত ,বঞ্চিত , প্রলেতারিয়াৎ মানুষের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সংকল্পটি সুচালো সূচের মতো ফুটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন ইলিয়াস ।এইখানেই ইলিয়াস স্বতন্ত্র  ,এইখানেই ইলিয়াসের লেখক সত্তার অনন্য  ব্যক্তিত্ব ।


                    এখানেই গল্প শেষ করেননি   লেখক ।জয়নাব  ছেলে ওইদুল্লাকে  শেষ বারের মতো আদেশ দিলে   ছেলে বেরিয়ে পড়েছে  মাতার  আদেশ কায়েম করার সঙ্কল্প নিয়ে।গল্পে কোথাও সরাসরি বিদ্রোহের কথা নেই তবে ঝাঁঝ চোরাস্রোতের মতো প্রবহমান  ।  তাইতো এই গল্পের গতি বুঝতে তিন সেকেন্ড সময় লাগেনা পাঠকের ।এইখানেই ইলিয়াসের কলম  স্বাতন্ত্র্য ।

এই গল্পে  যখন দেখা যায়  দরিদ্র ঘরের   ওইদুল্লা  মহুরির বাড়িতে যায়  তখন দেখে সেখানে  অ্যালুমিনিয়াম  থালা থেকে গম ছিটিয়ে মুরগিকে খাওয়াতে তা দেখে তার মনে হয়  সব কটা মুরগির  ঠোঁট কামড়িয়ে  গম গুলি দাঁতে চিবিয়ে ফেলে ।এই বক্তব্যের  অন্তরালে  ওইদুল্লার শুধু নয় সেই সময়ের অস্থির দোলাচল সময়ের  বাঙালি জাতির অন্তরের এক হিম -শীতল কষ্টের আগুনকে  আবিষ্কার করা  যায় ।  এখানেই যা মানুষের প্রয়োজন তা যেন হয়ে উঠেছে  বিলাসিতা ।দুধ ভাত বাঙালি জাতির অতি প্রাচীন কাল থেকেই প্রত্যাশিত বিষয় ।আমরা কবি রায়গুণাকর  ভরত চন্দ্রের মুখেও  অষ্টাদশ  শতকে শুনেছি ঈশ্বরী পাটনির বর প্রার্থনা “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে” অর্থাৎ ন্যূনতম   প্রয়োজন টুকু মিটলেই তারা সুখী-খুশি ।এই গল্পে দেখেছি  আমরা যখন ওহিদুল্লা  মহুরির বাড়িতে গিয়ে নিজেদের বিক্রি করা গরুর দুধ আবদার করে  মাতা জয়নাবের শেষ ইচ্ছে দুধ ভাত খাওয়ার  ইচ্ছে  পূরণের জন্য। সে বলে তার মায়ের হাউস অর্থাৎ শখ হয়েছে দুধ ভাত খাওয়ার । দু দুটো আন্দোলন হয়েছে ।নতুন স্বাধীন সূর্যও  উঠেছে কিন্তু  বাঙালি সাধারণ মানুষ সূর্য গ্রহণের গাঢ়  অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে পারেনি ।বাংলাদেশের কৃষকদের এই খাদ্য সংকট , অভাব অনটন  এক নির্মম সত্য এইভাবেই ইলিয়াস সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই গল্পের শাখা প্রশাখায়।

  এই গল্পে আমরা  অবাক হই  না যখন  দেখি মহুরির অনুপস্থিতিতে  হারুন মৃথার কটূক্তি শুনি  ” তর মায়ের প্যাট খারাপ , তগো হইছে মাথা খারাপ ।“ এ তো ৭০ দশকের বাংলাদেশের কঠিন নিরেট সত্য ।ইলিয়াস ধরতে চেয়েছেন এই সময়কে ,বোঝাতে চেয়েছেন দেশভাগ ,স্বাধীনতার পর   মেকি ভেগ ধারীদের আসল রুপ ।আখতারুজ্জামান ইলিয়াস  এই গল্পে এই  সময়ের মানুষের প্রতিদিনের  জীবন যাপনের   একটি স্পষ্ট ছবি এঁকে আঘাত করেছেন মানবতার সোনালী অট্টালিকায় ।ইলিয়াস বাংলাদেশের  সাধারণ মানুষের নাড়ীর যন্ত্রণা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তো  তিনি ইলিয়াস ।